#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_৪৬ (মিলন তিথি)
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম
জেনিন তার বিশাল মেহগনি টেবিলের সামনে বসে একটি পুরোনো ফাইল দেখছিল, কিন্তু তার দৃষ্টি বারবার ল্যাপটপের পাশের জীর্ণ ফ্রেমটার দিকে চলে যাচ্ছিল। নোবারা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ জেনিনকে পর্যবেক্ষণ করল। সে জানে, জেনিনের এই গাম্ভীর্য আসলে একধরণের আত্মরক্ষা..সে তার ভেতরের নরম মানুষটিকে এই কঠিন আবরণের নিচে লুকিয়ে রাখে।
নোবারা ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকে জেনিনের কাঁধে হাত রাখল। জেনিন চমকে তাকাল না, বরং নোবারার হাতের স্পর্শ পেয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।
নোবারা খুব নিচু স্বরে বলল,
“কাল নানামি ভাইয়ার জন্মদিন।”
জেনিনের শরীরটা মুহূর্তেই শক্ত হয়ে গেল। সে ফাইলটা সজোরে বন্ধ করে একপাশে সরিয়ে রাখল। “মনে আছে আমার। কিন্তু ওই নামটা নিয়ে আজ আর কথা না বলি। আমার অনেক কাজ বাকি।”
“কাজ তো কোনোদিন শেষ হবে না” নোবারা জেনিনের রোলিং চেয়ারটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। সে জেনিনের দুচোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, “আজ তনুজার সাথে আমার দেখা হয়েছিল। মেয়েটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। ও নানামি ভাইয়াকে ভালোবাসে ঠিকই, কিন্তু সে তো এক অন্ধকার গহ্বরে নিজেকে বন্দি করে রেখেছে। আর সেই গর্ত থেকে ওকে টেনে বের করার ক্ষমতা একমাত্র আপনার আছে।”
জেনিন উঠে দাঁড়িয়ে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে ঝিরঝিরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে, ঠিক যেমনটা পনেরো বছর আগে সেই রাতে হয়েছিল যখন জেনিন দেশ ছেড়েছিল!
জেনিনের গলায় তিতা স্বাদ। “সে তো আমাকে অপরাধী মনে করে নূরা। ও তো সুযোগ পেলেই আমাকে হ্যান্ডকাফ পরাতে চায়। যে বন্ধু আমার পরিস্থিতির কথা কোনোদিন বোঝার চেষ্টা করেনি, তার জন্মদিনে গিয়ে আমি কী বলব?”
নোবারা জেনিনের পেছনে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল। জেনিনের পিঠের ওপর মাথা রেখে সে বলল, “নানামি ভাইয়া আপনাকে অপরাধী মনে করে না জেনিন। তাছাড়া জেনিন নূরশাদ যদি আজ শহরের ডন হতে পারে, তবে সে কি তার পুরোনো বন্ধুর জন্য এক রাত সাধারণ জেনিন হতে পারে না? আপনিই তো বলেছেন আপনি চাইলে সবই পারেন।”
জেনিন কোনো কথা বলল না। তার মনের ভেতরে এখন এক বিশাল সংঘাত। একদিকে পনেরো বছরের অপমান আর ভুল বোঝাবুঝি, অন্যদিকে শৈশবের স্মৃতি…যখন নানামি তার জন্য টিফিন ভাগ করে রাখত, যখন স্কুলে কেউ জেনিনকে একা করলে নানামি সবার আগে প্রতিবাদ করত। ইউজি আসার আগে নানামিই তো ছিল জেনিনের পৃথিবী।
ঠিক তখনই দরজায় টোকা দিয়ে ইউজি ভেতরে ঢুকল। তার হাতে আইপ্যাড, চোখে চিরচেনা বুদ্ধিমত্তার ঝিলিক। সে দেখল জেনিন আর নোবারার গম্ভীর চেহারা।
“বস, ইন্টারফেয়ার করার জন্য সরি,” ইউজি সোফায় ধপাস করে বসল। “কিন্তু ম্যাম যা বলছেন, তাতে আমার সাপোর্ট আছে।”
জেনিন ভ্রু কুঁচকে তাকাল। “তুমিও? ইউজি, তুমি কি জানো জায়দান আমাকে ধরার জন্য কতগুলো স্পেশাল স্কোয়াড রেডি রেখেছে?”
“জানি বস,” ইউজি আইপ্যাডে একটা গ্রাফ দেখাল। “কিন্তু আমি গত দুই মাস ধরে এসি নানামিকে নজরে রেখেছি। ওনি মুখে আইনের কথা বলে, কিন্তু তলে তলে ওনি আপনার বিরুদ্ধে থাকা অনেক এভিডেন্স নিজের হাতে ডেস্ট্রয় করেছে। সরি টু সে বাট ওটা না করলে আপনি আজ সিইও-র চেয়ারে নয়, গারদের পেছনে থাকতেন বস।”
জেনিন স্তব্ধ হয়ে গেল। ইউজির এই তথ্য জেনিনের ইগোর মূলে কুঠারাঘাত করল। নানামি তাকে বাঁচিয়েছে? যে নানামিকে সে শত্রু মনে করত, সে গোপনে তাকে পাহারা দিয়েছে?
জেনিন ধীর পায়ে তার টেবিলের ড্রয়ার থেকে স্কুল এ তাদের ছবি বের করল, যা সে কোনোদিন ফেলে দিতে পারেনি। সে দেখল ছবির সেই কিশোর নানামিকে, যার হাসিতে কোনো ছলনা ছিল না।
“ও কি সত্যিই আমাদের যাওয়ার পর কোনো রিয়েক্ট করবে না?” জেনিন সংশয় নিয়ে জিজ্ঞেস করল।
“সেটা তনুজার দায়িত্ব,” নোবারা আশ্বস্ত করল। “তনুজা চায় ওর স্বামী যেন আবার হাসতে শেখে। জেনিন, আমরা যাব। কোনো প্রটোকল ছাড়া, কোনো অস্ত্র ছাড়া। রাজি?”
জেনিন দীর্ঘক্ষণ জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকল। বৃষ্টির জল জানালার কাঁচে আলপনা আঁকছে। সে নিজের হাতের সেই আংটিটা স্পর্শ করল যা নোবারা তাকে দিয়েছিল। জেনিন বুঝতে পারল, ক্ষমতা আর প্রতিপত্তি তাকে অনেক কিছু দিয়েছে, কিন্তু তার আত্মার এক অংশ আজও সেই স্কুলে ফেলে আসা বন্ধুত্বের কাছে পড়ে আছে।
“ঠিক আছে,” জেনিন খুব শান্ত গলায় বলল। “কাল রাত এসি নানামি জায়দানের জন্য নয়, কাল রাত আমার পনেরো বছরের হারানো বন্ধু জায়দানের জন্য। ইউজি, কালকের জন্য সব সিকিউরিটি অ্যালার্ট অফ করে দাও। আমি চাই না কেউ জানুক আমি কোথায় যাচ্ছি।”
ইউজি হাসল। “ওকে বস! কাল গাড়ি আমিই ড্রাইভ করব।”
নোবারা জেনিনের হাতটা নিজের গালে ঠেকাল। জেনিন তাকে নিজের কাছে টেনে নিল। জেনিন নূরশাদের কঠোর সাম্রাজ্যে আজ এক অদ্ভুত কোমলতা ছড়িয়ে পড়েছে। সে বুঝতে পেরেছে, রাজত্ব জয় করা সহজ, কিন্তু এক সময়কার প্রিয় বন্ধুর হৃদয়ে আবার জায়গা করে নেওয়াটা পৃথিবীর সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জ।
<><><><><><><><><>
ঘড়ির কাঁটা বারোটা ছুঁইছুঁই। জেনিন তার বিশাল ওয়াক-ইন ক্লোজেট থেকে বেরিয়ে এল। পরনে সাধারণ একটা নেভি ব্লু পোলো শার্ট আর ডেনিম। তার দাম্ভিক থ্রি-পিস স্যুট কিংবা কবজিতে বাঁধা প্যাট্রেক ফিলিপ..আজ কিছুই নেই। তার চোখেমুখে এক ধরণের কিশোরসুলভ অস্থিরতা, যা গত পনেরো বছরে কেউ দেখেনি।
ইউজি নিচে পার্কিং লটে অপেক্ষা করছে। সে আজ তার ল্যাপটপ ব্যাগ নেয়নি, বরং একটা পুরনো দিনের সিডি প্লেয়ার আর কিছু পছন্দের গানের কালেকশন গুছিয়ে রেখেছে। আর নোবারা? সে আজ সেজেছে একদম সাধারণ ভাবে, গাঢ় লাল রঙের শাড়ির সাথে খোলা চুলে, ঠিক জেনিনের মনমতো, ব্লাডরোজ।
গাড়িটা যখন ভিলার গেট দিয়ে বেরোল, তখন জেনিন ড্রাইভিং সিটের পাশে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। ইউজি ড্রাইভ করছে খুব সাবলীল ছন্দে। পেছনের সিটে নোবারা বসে আছে একগুচ্ছ রজনীগন্ধা হাতে নিয়ে। জেনিন একবারও পিছন ফিরে তাকাল না, কিন্তু তার মনের ভেতরে এক বিশাল কালবৈশাখী ঝড় বয়ে যাচ্ছিল।
“ইউজি, রাস্তা কি ক্লিয়ার?” জেনিন খুব শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল।
“একদম ক্লিয়ার বস। এসি নানামির বাড়ির সামনের সিসিটিভিগুলো আমার টিম অলরেডি একটা লুপে ফেলে দিয়েছে। আগামী এক ঘণ্টা ওখানে আমাদের গাড়ি ছাড়া আর কিচ্ছু দেখা যাবে না,”
ইউজি ড্যাশবোর্ডে একটা টোকা দিয়ে হাসল। “বস, আজ কিন্তু আপনাকে একদম ক্লাস টেনের জেনিনের মতো লাগছে, ঐ যে আপনার ল্যাপটপের কভার ফটোর মতো।”
জেনিন একটু ম্লান হাসল। স্মৃতি সব তো আজও তার মগজে টাটকা। নানামির মা তার জন্মদিনে তাদের জন্য পায়েস রেঁধেছিলেন। জেনিন ভাবল, পনেরো বছর অনেক কিছু কেড়ে নিলেও সেই স্বাদটা কি আজও কোথাও বেঁচে আছে?
গাড়িটা ধানমন্ডির নিরিবিলি গলিতে এসে থামল যেখানে নানামির ফ্ল্যাট। এলাকাটা নিঝুম। ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোয় কুয়াশাগুলো কেমন যেন ধোঁয়াটে দেখাচ্ছে। জেনিন গাড়ি থেকে নেমে এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়াল। সামনেই সেই বিল্ডিং, যার তিন তলায় নানামি তার নিজের তৈরি এক নিঃসঙ্গ দুর্গে বাস করে।
তনুজা দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে ঘড়ি দেখছিল। তার বুকের ধকধকানি যেন পাশের ঘর থেকেও শোনা যাচ্ছে। নানামি তখনো স্টাডি রুমে। তনুজা জানে, নানামি এখন ডায়েরি লিখছে অথবা পুরোনো কোনো অ্যালবামের পাতায় হাত বোলাচ্ছে। সে নিঃশব্দে মেইন ডোরটা আনলক করে দিল।
জেনিন, নোবারা আর ইউজি লিফটে করে তিন তলায় উঠে এল। জেনিন যখন খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকল, তখন তার নাকে ভেসে এল তনুজার রান্নার পরিচিত সুগন্ধ, হয়তো শ্বাশুড়ির কাছ থেকে শিখেছে। নানামির মা বাবা তো কেউ সাথে থাকে না, যাতে নানামিকে তনুজার সাথে মানিয়ে নিতে সুযোগ করে দিতে পারে। কিন্তু তা আর হলো কই!
তনুজা ড্রয়িংরুমে এসে দাঁড়াল। জেনিনকে দেখে সে এক পলক স্থির হয়ে রইল। ছবির চেয়েও জেনিন সামনাসামনি অনেক বেশি প্রভাবশালী, তাছাড়া লোকটা এতোটা লম্বা যে তনুজার ঘাড় ব্যথা করার উপক্রম হলো। কিন্তু আজ জেনিনের চোখে এক অদ্ভুত করুণা। সেটা তনুজার চোখ এড়ায়নি। সে জেনিনকে সবিনয়ে সালাম দিল।
এরপর তনুজা আঙুল দিয়ে স্টাডি রুমের দিকে ইশারা করল। জেনিন একাই সেদিকে এগোল। নোবারা আর ইউজি ড্রয়িংরুমেই রয়ে গেল। জেনিন যখন স্টাডি রুমের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল, সে দেখল নানামি তার পিঠ ফিরিয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে আছে। রুমের আলো খুব আবছা। টেবিলের ওপর এক গ্লাস ওয়াইন আর সেই কাটা ছবিটা পড়ে আছে।
“আজ কোনো খাবার দিও না। আমি খেতে পারব না,” নানামি খুব ভারী গলায় বলল, সে ভাবল হয়তো তনুজা ভেতরে ঢুকেছে।
জেনিন কোনো কথা বলল না। সে নিঃশব্দে এগিয়ে গিয়ে টেবিলের ওপর রাখা কাটা ছবির টুকরো দুটো পাশাপাশি মেলাল।
“ছবি কাটলেই কি পনেরো বছরের স্মৃতি কাটা যায় জায়দান?” জেনিন খুব শান্ত কিন্তু গভীর গলায় প্রশ্নটা ছুড়ে দিল।
নানামি যেন কোনো ইলেকট্রিক শক খেল। সে বিদ্যুদ্বেগে ঘুরে দাঁড়াল। তার সামনে জেনিন নূরশাদ দাঁড়িয়ে। কোনো বডিগার্ড নেই, কোনো অস্ত্র নেই..শুধু পুরোনো বন্ধুত্বের এক পাহাড় সমান দাবি নিয়ে। নানামির চোখের মণি স্থির হয়ে গেল। সে ভাবল সে হয়তো স্বপ্ন দেখছে অথবা ওয়াইনের ঘোরে কোনো হ্যালুসিনেশন হচ্ছে।
“নুর….নুরশাদ?” নানামির গলা দিয়ে যেন আওয়াজ বেরোচ্ছে না।
“তোর জন্মদিনে কি বন্ধু আসতে পারে না?” জেনিন এক পা এগিয়ে এল। “নাকি এখন পুলিশ এসি হওয়ার পর পুরোনো বন্ধুদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে আসতে হবে?”
নানামি হঠাত্ করে ফেটে পড়ল। ওয়াইন এর নেশা খানিকটা ধরেছে তাকে। সে টেবিল চাপড়ে চিৎকার করে উঠল। “বন্ধু? তুই কোন মুখে এই কথাটা বললি? পনেরো বছর আগে তুই যখন আমাকে একা ফেলে দেশ ছেড়ে গেলি, তখন তোর বন্ধুত্বের কথা মনে ছিল না?”
জেনিন নানামির এই বিস্ফোরণটা সহ্য করল। সে মাথা নিচু করে রইল। “আমি জানি জায়দান, আমার ভুল ছিল। আমি ভেবেছিলাম তুই আমাকে ঘৃণা করবি আমার মাফিয়া পরিচয়ের জন্য। আমি চাইনি আমার অন্ধকারের ছায়া তোর ক্যারিয়ারে পড়ুক।”
“ঘৃণা? নূরশাদ, আমি তোকে ঘৃণা করলে কি আজও এই ফটোটা আগলে রাখতাম?” নানামি টেবিলের ওপর রাখা ছবিটা জেনিনের দিকে ছুড়ে মারল। “কেন এসেছিস আজ? আমাকে উপহাস করতে?”
জেনিন এবার আর চুপ থাকল না। সে সজোরে নানামির কলার চেপে ধরল এবং তাকে জানালার গ্রিলের সাথে চেপে ধরল। “উপহাস করতে আসিনি! এসেছি নিজের এক অংশ ফিরে নিতে। পনেরোটা বছর আমি জেনিন নুরশাদ কাউকে নিজের বন্ধু বলতে পারিনি শুধু তোর জন্য। তুই তো আমার সোলমেট ভাই, আমার আত্মার বন্ধু! আমি তোকে ছাড়া কিভাবে থেকেছি জানিস?”
দুজনের চোখের পলক স্থির। চারদিকে এক তীব্র উত্তেজনা। নানামির চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। সে জেনিনের হাতের বাঁধনটা ঢিলে করে দিল এবং জেনিনকে সজোরে জড়িয়ে ধরল।
“তুই কেন এতদিন আসিসনি? আমি তোকে কত মিস করেছি জানিস নুরশাদ?” নানামি ডুকরে কেঁদে উঠল। পনেরো বছরের জমানো পাহাড় সমান অভিমান সেই এক জড়িয়ে ধরায় গলে জল হয়ে গেল।
জেনিনও নানামিকে শক্ত করে ধরে রাখল। “মাফ করে দে জায়দান। আমি ফিরে এসেছি। আর কখনো যাবো না। আমি জেনিন নুরশাদ কথা দিচ্ছি।”
ড্রয়িংরুমে নোবারা আর তনুজা পর্দার আড়াল থেকে এই দৃশ্য দেখে চোখের জল মুছছিল। ইউজি দূরে দাঁড়িয়ে নিজের আইপ্যাডটা বন্ধ করে দিল। তার বসের এই রুপ এ একটু কমই দেখেছে। তাও দেখতে ভালোই লাগছে। কারণ তার বস তো পাথরের মতো থাকতো, কখনো মনের কথা মুখ ফুটে বলতোই না। আজ কত সুন্দর বন্ধুত্বের কাছে নতি স্বীকার করছে!
নোবারা যখন ঘরে ঢুকল, সে দেখল দুই বন্ধু একে অপরের কাঁধে হাত দিয়ে সোফায় বসে আছে। পনেরো বছর আগের সেই চিত্রপট আজ আবার জীবন্ত। নানামি নোবারার দিকে তাকাল। তার বুকটা হঠাৎই ধক করে উঠলো। নোবারাকে দেখে মনে হচ্ছে স্বর্গ থেকে কোন পরী নেমে এসেছে যেন। কিন্তু নানামি এটাই মাথায় আনলো না যে এই পরী জেনিন নুরশাদ এর পরী, জেনিনের নূরপরী! পাশে তনূজাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নানামি সহসাই নিজেকে সামলে নিল।
“নোবারা, তুমি আজ একে নিয়ে এসেছো?” নানামি হাসল, যে হাসিতে কোনো বিষাদ ছিল না।
“আমি আনিনি, জেনিন নিজেই আসবার জন্য ছটফট করছিল,” নোবারা রজনীগন্ধার তোড়াটা নানামির হাতে দিল। “শুভ জন্মদিন ভাইয়া।”
সেই রাতে নানামির বাসায় এক অদ্ভুত ডিনার হলো। তনুজা আজ পরম তৃপ্তিতে খাবার বেড়ে দিচ্ছিল। জেনিন আর নানামি খুনসুটিতে মেতে উঠল ঠিক স্কুল জীবনের মতো। ইউজি মাঝে মাঝে টেকনিক্যাল জোকস বলে পরিবেশটা আরও হালকা করে তুলছিল।
ডিনার টেবিলের ওপর ঝুলে থাকা ঝাড়বাতির আলোয় জেনিন আর নানামিকে পাশাপাশি বসে থাকতে দেখে নোবারার মনে হলো, এই দৃশ্যটি যেন কোনো এক প্রাচীন মহাকাব্যের শেষ অধ্যায়। যেখানে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী রাজা যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে বন্ধুত্বের পুরোনো চাদর গায়ে জড়িয়ে নিয়েছে। কিন্তু এই পুনর্মিলনের আনন্দ-উচ্ছ্বাসের আড়ালে একটি মন আজ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে..সেটি তনুজার।
খাবারের টেবিলে তনুজা আজ তার সর্বস্ব দিয়ে আয়োজন করেছে। ইলিশের দো পেঁয়াজা থেকে শুরু করে মাটন রেজালা…সবই টেবিলে সাজানো। কিন্তু তার নিজের গলার কাছে কী যেন একটা দলা পাকিয়ে আছে। সে দেখছিল নোবারাকে। নোবারা জেনিনের পাশে বসে আছে, জেনিন নিজ হাতে নোবারার পাতে মাছের কাঁটা বেছে দিচ্ছে। জেনিন নূরশাদ, যে কিনা এক ইশারায় আন্ডারওয়ার্ল্ড কাঁপায়, সে আজ তার স্ত্রীর সামনে কতটা নতজানু, কতটা যত্নশীল!
নোবারা হাসছে। তার প্রতিটি হাসিতে এক ধরণের মুক্তো ঝরানো আনন্দ। সে জেনিনের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে কিছু একটা বলছে, আর জেনিন মৃদু হেসে নোবারার হাতটা টেবিলের নিচেই আলতো করে চেপে ধরছে। এই যে সূক্ষ্ম ভালোবাসা, এই যে একে অপরের চোখের ভাষা পড়া…তনুজা গত ছয় মাসে এর এক শতাংশও নানামির কাছে পায়নি!
তনুজা যখন নানামির দিকে তাকাল, সে দেখল নানামিও নোবারার দিকেই তাকিয়ে আছে। নানামির চোখে এক অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতি..একদিকে বন্ধুকে ফিরে পাওয়ার তৃপ্তি, অন্যদিকে নোবারার এই অমলিন খুশি দেখে নিজের ভেতরের সেই পনেরো বছরের সুপ্ত প্রেমটা আবার আগ্নেয়গিরির মতো জেগে উঠতে চাইছে। নানামি দেখছে নোবারা কতটা সুখী। আর সেই সুখের কারিগর সে নিজে নয়, বরং জেনিন।
“তনুজা, রান্নাটা দারুণ হয়েছে,” নোবারা খুব আন্তরিকভাবে বলল। “জেনিন তো মাছের ব্যাপারে খুব খুঁতখুঁতে, দেখুন ও কত আয়েশ করে খাচ্ছে!”
তনুজা এক ম্লান হাসি দিল। “আপনার ভালো লেগেছে শুনে খুশি হলাম নোবারা ম্যাম।”
ম্যাম ডাকটা শুনে জেনিন একটু মুখ তুলে তাকাল। “আপনি ওকে ম্যাম ডাকছেন কেন? ও তো এখন থেকে আপনার পরিবারেরই একজন। নাম ধরে ডাকতেই পারেন।”
নানামি হঠাৎ করে বলে উঠল, “তুই তো নোবারাকে নূরা ডাকিস। তাই না নুরশাদ?”
কথাটার ভেতরে যে এক গভীর হাহাকার ছিল, তা কেবল তনুজাই টের পেল। জেনিন একটু গম্ভীর হয়ে নানামির দিকে তাকাল, তারপর খুব ধীর স্বরে বলল, “হ্যাঁ, ও নূরা। তবে ও শুধুই জেনিন নূরশাদের নূরা।”
এই একটি বাক্যে জেনিন তার সীমানা নির্ধারণ করে দিল। বন্ধুত্বের খাতিরে সে নানামিকে বুকে টেনে নিয়েছে ঠিকই, কিন্তু নোবারার ওপর তার একচ্ছত্র অধিকারের কথা মনে করিয়ে দিতে সে ভোলেনি। সে নোবারার ব্যাপারে কোন আপোষ সহ্য করে না।
খাবার শেষে ইউজি আর তনুজা ড্রয়িংরুমে গিয়ে বসল, যাতে জেনিন, নোবারা আর নানামি একটু একান্তে কথা বলতে পারে। কতবছর পর তারা তিন বন্ধু একসাথে হয়েছে। স্মৃতি রোমন্থন করুক একটু। ইউজি তার ল্যাপটপ ব্যাগ থেকে একটা ছোট গ্যাজেট বের করে তনুজাকে দেখাচ্ছিল, কিন্তু তনুজার মন সেখানে নেই। সে পাশের ঘর থেকে আসা জেনিন আর নোবারার মৃদু হাসির শব্দ শুনতে পাচ্ছিল।
তনুজা ভাবছিল..পনেরো বছর তো নানামিও নোবারাকে ভালোবেসেছে। কিন্তু জেনিনের ভালোবাসায় এমন কী জাদু ছিল যে নোবারা আজ পৃথিবীর সবচাইতে সুখী নারী? তনুজা নিজের জীবনের দিকে তাকাল। সে নানামির জন্য প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে ওঠে, তার ইউনিফর্ম ইস্ত্রি করে দেয়, তার পছন্দের খাবার রাঁধে…নানামির যত্ন এ খামতি হওয়ায় চিন্তায় চাকরি ও ছেড়ে দিয়েছে নিজ ইচ্ছায়…তাও নানামি কেন তাকে এই চোখে দেখে না? কেন নানামি আজও নোবারার হাসির শব্দে থমকে যায়?
তনুজা হঠাৎ আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সে দেখল তাকে কেমন যেন বিবর্ণ লাগছে। সে সুন্দরী, সে শিক্ষিতা, সে ধৈর্যশীল..তাও সে পরাজিত। সে পরাজিত হয়েছে নোবারার পনেরো বছরের প্রতীক্ষার কাছে। তনুজার দীর্ঘশ্বাস ঘরের বাতাসকে ভারী করে তুলল। সে বুঝতে পারলো না, তার এই কষ্টের সমাপ্তি কোথায়? নাকি কিছু কষ্ট এমনও থাকে যার কোন সমাপ্তি নেই, কেবল সময়ের সাথে সাথে অভ্যেসে পরিণত হয়!
<><><><><><><><><>
রাত দেড়টা। জেনিন আর নোবারা এবার বিদায় নেবে। ইউজি নিচে গিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিয়েছে। লিফটের সামনে নানামি আর জেনিন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। নোবারা তনুজাকে জড়িয়ে ধরে বিদায় নিচ্ছে।
“নুরশাদ” নানামি জেনিনের কাঁধে হাত রাখল। “আজকের এই রাতটা আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার। আমি অনেক ভুল করেছি রে। তোকে ভুল বুঝেছি, তোকে ধরার জন্য জাল বুনেছি। মাফ করে দিস ভাই।”
জেনিন নানামির হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল। “ভুল আমি আর তুই করিনি জায়দান, ভুল করেছিল সময়। কিন্তু আজ থেকে আর কোনো আড়াল থাকবে না। তুই পুলিশের এসি থাকবি, আমি আমার ব্যবসা করব। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে আমরা আবার স্কুলের করিডোরে ফিরে যাব। ঠিক তো?”
“ঠিক,” নানামি হাসল। তারপর সে নোবারার দিকে তাকাল। নোবারার চোখের প্রশান্তি দেখে নানামির ভেতরের সেই অবদমিত প্রেমটা শেষবারের মতো একবার হুংকার দিয়ে উঠল, কিন্তু সে তা দাফন করে ফেলল। সে বুঝতে পারল, নোবারা জেনিনের পাশে যতটা মানানসই, ততটা আর কারো পাশেই নয়। কখনোই নয়।
“নোবারা, এই পাগলটাকে একটু দেখে রেখো। ও তো এখনো আগের মতোই জেদি আছে,” নানামি খুব স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে বলল।
নোবারা হাসল। “চিন্তা করবেন না। ওনি এখন অনেক শান্ত হয়েছে। তাছাড়া ওনার জেদ কিভাবে দমিয়ে রাখতে হবে আমি তা ভালো করেই জানি!”
জেনিন মাথা চুলকে হাসলো। তারপর নোবারার হাত ধরে টেনে নিজের কাছে নিয়ে আসলো। নানামির সাথে নোবারা সামান্য হেসেও কথা বলুক তা সে কখনোই চায় না। বন্ধু বন্ধুর জায়গায় থাক, আর ঘরণী থাকুক তার হৃদয়ে!
লিফটে ওঠার আগে জেনিন হঠাত্ থেমে গেল। সে তার পকেট থেকে একটা কলমটা বের করল যা সে আজ ইন্টারভিউ সেশনে ব্যবহার করেছিল। সে কলমটা নানামির পকেটে গুঁজে দিল।
“বন্ধুত্বের পুনরায় শুরুটা আবার এই কলম দিয়েই হোক। আমাদের পরের ডিনার কিন্তু নূরশাদ ভিলায়। কোনো মানা শুনব না।”
লিফটের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। নানামি আর তনুজা করিডোরে দাঁড়িয়ে রইল। জেনিন আর নোবারা চলে যাওয়ার সাথে সাথে ফ্ল্যাটটা আবার পুরনো নিস্তব্ধতায় ডুবে গেল। কিন্তু আজ সেই নিস্তব্ধতা বিষাক্ত নয়, বরং এক ধরণের মুক্তির স্বাদ বয়ে এনেছে। কিন্তু, হঠাৎই নানামির চেহারায় আজ এক ভিন্ন হাসি দেখা গিয়েছে। অদ্ভুত বাঁকা হাসি। সে কি তবে বন্ধুত্বের আড়ালে অন্যকিছুর পরিকল্পনা করছে? তার নৈতিকতা কি আবার জেগে উঠেলো?
চলবে ইংশাআল্লাহ।।।।।।।

