Soulmate_to_Enemy #পর্ব_৫৩

0
2

#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_৫৩
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম

আজকের রাতটা একটু অন্যরকম, চাঁদের আলোটা বড্ড ফিকে, যেন কোনো অশুভ সংকেত দিচ্ছে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে জেনিন। জেনিন নূরশাদ, যাকে একসময় শহরবাসী ‘দুর্ধর্ষ মাফিয়া জেড কিংবা শ্যাডো কিং হিসেবে চিনত, আজ সে দাঁড়িয়ে আছে স্রেফ একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে..যে কিনা নিজের স্ত্রীর জন্য একটু বেশিই চিন্তিত।

বাইরে বসন্তের মাতাল হাওয়া বইছে, কিন্তু জেনিনের বুকের ভেতরে কেমন যেন এক অস্থিরতা কাজ করছে। গত কয়েকদিন ধরে সে নিজের শরীরের ভেতর এক অদ্ভুত পরিবর্তন অনুভব করছে। কখনও কখনও তার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে, হৃৎপিণ্ডের ছন্দটা অনিয়মিত হয়ে পড়ে। ডাক্তার বা কোনো বিশেষজ্ঞের পরামর্শ সে নেয়নি, প্রয়োজনও মনে করেনি। তার গভীর মনস্তাত্ত্বিক অভিজ্ঞতা তাকে বলছে, তার এই শরীরে আর আগের মতো তেজ নেই। সে বুঝতে পারছে, সময় ফুরিয়ে আসছে। মাফিয়া জগতের অন্ধকার গলিতে সে যে পরিমাণ পাপ আর রক্ত ঝরিয়েছে, তার হিসাব হয়তো এখন শোধ করার পালা।

জেনিন তার শার্টের বোতামটা একটু আলগা করে দিল। তার মনে পড়ছে সেই সব রাতগুলোর কথা, যখন সে মানুষের গলা চিবিয়ে ধরত। সে তখন হাসত, কারণ তার কাছে জীবন ছিল একটি খেলার মাঠ। কিন্তু এখন? এখন সে কেবল নোবারার হাসিটা শুনতে চায়। নোবারার চোখের কোণে কোনো দুঃশ্চিন্তার রেখা পড়লে সে বিচলিত হয়ে ওঠে।

সে কি সত্যিই শেষ হয়ে যাচ্ছে? নাকি এই সবকিছু কেবল তার মনের ভুল? জেনিন জানালার কাঁচে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখল। এই প্রতিচ্ছবিতে সেই নিষ্ঠুর জেনিন নূরশাদ নেই, আছে এক শান্ত, বিষণ্ণ মানুষ। সে ঠিক করল, যদি তার সময় সত্যিই শেষ হয়ে আসে, তবে সে এমন কোনো চিহ্ন রেখে যাবে না যা নোবারার জীবনকে কোনোদিনও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। যদিও ইতোমধ্যেই সে তার যাবতীয় অশুভ ব্যবসা, বেনামি অ্যাকাউন্ট, এবং শত্রুদের তালিকা…সবকিছু ধীরে ধীরে গুটিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে।

হঠাৎ তখনই দরজায় টোকা পড়ল। জেনিন দ্রুত নিজের ভাবনার জগত থেকে বেরিয়ে এল। সে তার চোখের আদ্রতা লুকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল,
“ভেতরে এসো।”

ইউজি ভেতরে ঢুকল। তার হাতে কিছু ফাইল। সে আজ খুব অন্যমনস্ক। ইউজি জেনিনের খুব কাছের মানুষ, সে জানে জেনিন এখন সব কিছু পরিবর্তন করার চেষ্টা করছে।

“বস, আগামীকালের ড্রিলিং প্রজেক্টের ব্যাপারে আপনার সিদ্ধান্ত প্রয়োজন,” ইউজি ফাইলগুলো টেবিলের ওপর রেখে বলল।

জেনিন ইউজির দিকে তাকাল। তার চোখের চেনা তেজটা আজ নেই, সেখানে যেন এক গভীর ক্লান্তি। সে মৃদু হেসে বলল, “ফাইলগুলো এখানেই থাকুক। কাল থেকে প্রজেক্টগুলো আমি আর দেখব না। তুমি বরং সব দায়িত্ব নিজেকে গুছিয়ে নিতে শিখো। আর হ্যাঁ, কাল যদি আমার কিছু হয়েও যায়, তুমি নোবারার খেয়াল রেখো।”

ইউজি অবাক হয়ে জেনিনের দিকে তাকাল। তার বসকে আজ খুব বিষন্ন লাগছে। ইউজি মজা করতে গিয়েই বললো,
“বস? আপনি কি অন্য কোনো মহিলার চক্করে পড়েছেন‌ নাকি? আপনার আবার কি হবে?”

জেনিন এক মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে গেল। তার মুখাবয়ব বিকৃত হয়ে বাংলার পাঁচ এর মতো হয়ে গেল! সে ইউজির বাম কানটা মুলে দিয়ে বললো,
“মহিলা? ইউজি, আমার জীবনে নোবারা ছাড়া আর কোনোদিন কেউ ছিল না, আর ভবিষ্যতেও আসবে না।”

ইউজি হো হো করে হেসে উঠল। সে জেনিনের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলল,
“বস, আমি তো মজা করছিলাম! আপনি হলেন দুর্ধর্ষ মাফিয়া জেড! আপনার কিছু হবে…এটা কেউ ভাবতেও পারে না।”

জেনিন কথাগুলো শুনল, কিন্তু তার ভেতরের গ্লানিটা কমল না। সে ইউজির কাঁধে হাত রেখে খুব গুরুত্বের সাথে বলল,
“মানুষ অমর নয় ইউজি। আমি তোমাকে বলছি, আমার কিছু হয়ে গেলে নোবারার সম্পূর্ণ নিরাপত্তা যেন তোমার হাতে থাকে। আমি এই দায়িত্বটুকু তোমাকেই দিয়ে যাচ্ছি। তুমি কি পারবে আমার নূরাকে রক্ষা করতে?”

ইউজির হাসিটা মুহূর্তের মধ্যে মিলিয়ে গেল। সে জেনিনের চোখের দিকে তাকাতেই তার মেরুদণ্ড দিয়ে একটা হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল। সে বুঝল, জেনিন কোনো নাটক করছে না। সে আসলেই কিছু একটা আঁচ করতে পারছে।

“বস, আপনি এমন কথা কেন বলছেন?” ইউজির কন্ঠস্বর কাঁপছে।

জেনিন জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতে তাকাতে বলল, “মাফিয়া জগতের অভিশাপগুলো খুব ধীর গতিতে আসে, কিন্তু নিশ্চিতভাবে আসে। আমি আজ আমার সব পাপের প্রায়শ্চিত্ত করছি নোবারাকে আগলে রেখে। যদি আমার সময় শেষ হয়েই যায়, তবে আমি চাই না আমার অতীতের অন্ধকার নোবারার ওপর এসে পড়ুক।”

ইউজি আর কোনো কথা বলতে পারল না। সে বুঝতে পারল, তার বস আজ এক অন্য জেনিন নূরশাদ..যে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসে নোবারাকে। জেনিন এখন আর সেই খলনায়ক নয়, সে এখন একজন রক্ষাকর্তা, যে নিজের অস্তিত্ব দিয়ে নোবারার শান্তি পাহারা দিচ্ছে।

ঘরের নীরবতা তখন ভারী হয়ে উঠেছে। বাইরে বাতাসের শব্দ যেন জেনিনের মনের এক গোপন আর্তনাদ বয়ে আনছে। সে জানে, সে যা কিছু গুটিয়ে নিচ্ছে, তা আসলে মৃত্যুর প্রস্তুতি ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু তার চোখে কোনো ভয় নেই, ভয় কেবল একটাই।।।নোবারার চোখে জল।

জেনিন ভুলিয়ে বালিয়ে ইউজি কে ঘর থেকে বের করে দিল। তার এখন কিছুই ভালো লাগছে না। শরীরটা অবশ হয়ে আসছে। ইউজিকে বাড়তি কোন চিন্তায় ফেলতে চায় না সে। সামনেই নতুন জীবন শুরু করবে নীলিমা কে নিয়ে। ছেলেটা ভালো থাকুক, সুখে থাকুক, এটাই চায় জেনিন। ব্যস, এই চাওয়াটা চোখের সামনে দেখতে পারবে কি না তা নিয়েই সন্দেহ তার!

ইউজি ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর জেনিন তার ডেস্কে বসল। ডেস্কে রাখা নোবারার নীল ফ্রকের স্কুল ড্রেস পড়া একটি ছোট ফ্রেমবন্দি ছবি, যা বিগত ১৫ বছর ধরেই তার সাথে ছিল। সেই ছবিটার দিকে তাকালে জেনিনের বুকের ভেতরে যে এক ধরণের হিমশীতল শূন্যতা তৈরি হয়, তা সে কাউকে বুঝতে দেয় না। ল্যাপটপের আলোয় তার মুখটা আরও ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে। সে তার সমস্ত ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের চাবিকাঠি…এনক্রিপ্টেড হার্ডড্রাইভ, অফশোর ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ডিটেইলস, এবং কয়েকশ বেনামি এজেন্টের গোপন কোডগুলো একটি বিশেষ সার্ভারে আপলোড করতে শুরু করল।

প্রতিটি ফাইল যখন সে এনক্রিপ্ট করছে, মনে হচ্ছে যেন তার জীবনের একেকটি অন্ধকার অধ্যায় সে চিরতরে মুছে ফেলছে। এই ব্যবসাগুলো গড়ার সময় সে একবারও ভাবেনি কার রক্ত ঝরছে, কার পরিবার নিঃস্ব হচ্ছে। আজকের জেনিন নূরশাদ সেই নিষ্ঠুরতার প্রতিফলন দেখে শিউরে উঠছে।

হঠাৎ দরজায় হালকা নড়াচড়া। নোবারা ঘরে ঢুকছে। জেনিন দ্রুত ল্যাপটপের স্ক্রিনটা বন্ধ করে দিল। নোবারা হাতে এক কাপ কফি নিয়ে এসেছে। তার পরনে হালকা সুতির শাড়ি, চুলে একটা সাধারণ ক্লিপ। এই সাধারণ সাজের মাঝেও নোবারার মাঝে এমন এক আভিজাত্য আছে যা জেনিনকে প্রতিদিন নতুন করে প্রেমে ফেলে।

“একি! অনেক রাত হয়েছে তো, এখনো কাজ করছেন যে?” নোবারা কফির কাপটা ডেস্কের ওপর রেখে জেনিনের পেছনে এসে দাঁড়াল। তার ঠান্ডা হাত দুটো জেনিনের কপালে আলতো করে রাখল।

জেনিন চোখ বন্ধ করল। নোবারার হাতের স্পর্শে তার সমস্ত অস্থিরতা যেন নিমেষেই ধুয়ে মুছে যেতে চাইছে। সে নোবারার হাতের ওপর নিজের হাত রেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“নূরা, আপনি কি কখনো ভেবেছেন যে, একদিন আমাকে আর পাশে পাবেন না?” জেনিন খুব নিচু স্বরে প্রশ্ন করল।

এমন আজব প্রশ্নে নোবারা অবাক হওয়ার বদলে হেসে উঠল। সবসময়ই জেনিনের এই কথাটা শুনতে শুনতে কথাটা তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ কিছুই মনে হয় না আর!

“আপনি তো অদ্ভুত কথা বলেন! আপনি ছাড়া আমার পৃথিবীটা চলবে কীভাবে? আপনি কোথাও যাবেন না, যেতে আমি দেবও না।”

জেনিন নোবারার দিকে ঘুরে তাকাল। সে নোবারাকে নিজের কোলে টেনে নিয়ে তার কপালে কপালে ঠেকিয়ে রাখল। “যদি পরিস্থিতি এমন হয় যে, আমাকে যেতেই হবে? আপনি কি নিজেকে গুছিয়ে নিতে পারবেন?”

নোবারার হাসিটা মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। জেনিনের চোখে এক ধরণের অসীম বিষাদ, যা সে আগে কখনো দেখেনি। নোবারা জেনিনের বুকের শার্টটা শক্ত করে ধরল। তার গলাটা ধরে আসছে!
“কী হয়েছে? আপনি কি অসুস্থ? ডাক্তার ডাকবো?”

“না নূরা, আমি সুস্থ,” জেনিন মিথ্যা আশ্বাস দিল। “আমি শুধু ভাবছিলাম, আমার মতো একজন খু|নীর মানুষের জীবনে আপনার মতো এত পবিত্র মানুষের জায়গা কীভাবে হলো। আমি আজ নিজেকে খুব ক্ষুদ্র মনে করছি।”

নোবারা জেনিনের ঠোঁটে আঙুল চেপে ধরল। “আপনি আমার কাছে পৃথিবীর সবচাইতে ভালো মানুষ। আপনি আমাকে আগলে রেখেছেন, আমাকে সম্মান দিয়েছেন। আমার জেনিনের চেয়ে পবিত্র ভালবাসা কার আছে? হুঁ?”

জেনিন কিছু বলতে পারলো না। সে কেবল নোবারাকে জড়িয়ে ধরে থাকল। তার চোখের কোণে বোধহয় এক ফোঁটা তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়লো, যা সে অতি সন্তর্পণে মুছে নিল।

পরদিন ভোরে জেনিন যখন ঘুম থেকে উঠল, সে দেখল তার বালিশের এক কোণে রক্ত লেগে আছে। সে দ্রুত উঠে বাথরুমে গেল। আয়নায় নিজের মুখটা দেখল। নাকের ভেতর থেকে সামান্য রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। সে ঠান্ডা পানি দিয়ে মুখ ধুল, কিন্তু তার ভেতরের ভয়টা কাটল না। সে দ্রুত ডাস্টবিনে রক্তমাখা টিস্যুটা ফেলে দিল, যেন নোবারা কোনোভাবেই এটা না দেখে।

রুমে ফিরে এসে দেখল নোবারা এখনো ঘুমাচ্ছে। জেনিন তার পাশে গিয়ে বসল। নোবারার শান্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে সে তার ডায়েরিটা খুলল। সেখানে সে একটি নতুন উইল তৈরি করছে।
সে তার উকিলকে মেসেজ করল, “পুরো নূরশাদ এন্টারপ্রাইজ এবং সমস্ত ব্যক্তিগত সম্পত্তি নোবারার নামে ট্রাস্ট করে দাও। আমার অবর্তমানে ইউজি হবে ওর রক্ষক, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে নোবারা নুরশাদের।”

জেনিন জানে, সে সময় কিনতে পারে না, কিন্তু সময়টা সে নোবারার জন্য যতটুকু সম্ভব সুন্দর করে দিয়ে যেতে চায়।

<><><><><><><><><>

পাঁচ ছয়দিন পর। পুরো ভিলা জুড়ে এখন নিস্তব্ধতা। ঘড়ির কাঁটা বারোটা পার করে একের দিকে এগিয়ে চলেছে, কিন্তু জেনিন নূরশাদের চোখের পাতায় ঘুমের লেশমাত্র নেই। সে ড্রয়িংরুমের সেই পুরোনো গ্রামোফোনটা চালিয়ে দিয়েছে। ভিনাইল রেকর্ড থেকে ভেসে আসছে পুরোনো কোনো এক বিষাদময় সুর।

নোবারা সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল। তার পায়ে শব্দ নেই, যেন সে বাতাসের ওপর হেঁটে আসছে। জেনিনকে একা অন্ধকারের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে ধীরপায়ে তার পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। জেনিন পিছু ফিরে তাকাল না, সে জানত নোবারা এসেছে। সে জানে নোবারার পায়ের শব্দ তার হৃদস্পন্দনের চেয়েও বেশি চেনা।

“আবার ঘুম আসছে না? এই কয়েকদিন আপনি একটুও ঘুমাননি!” নোবারা খুব নিচু স্বরে বললো। জেনিনের এই হঠাৎ আসা বিষন্নতা তাকে বড্ড উদ্বিগ্ন করছে। সে নিজেকেই দোষী মনে করছে। ভাবছে সে হয়তো জেনিনকে সুখী রাখতে পারছে না। প্রতিদিন কত কিই করে, জেনিনের মলমতো। আগে জেনিন এসব করলে খুশি হতো, এখনো হয়, তবে চোখে সেই পুরনো উজ্জলতা আর দেখা যায় না! জেনিন হাসেও না এখন!

জেনিন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘুরে দাঁড়াল। চাঁদের আলোয় তার মুখটা অদ্ভুত রকমের শান্ত লাগছে। সে নোবারার দিকে হাত বাড়াল। নোবারা সেই হাত ধরে জেনিনের ঠিক সামনে গিয়ে দাঁড়াল। জেনিন নোবারার কোমরে হাত দিয়ে তাকে নিজের সাথে লেপ্টে নিল।

“নূরা,” জেনিন ডাকল। তার গলার স্বর আজ কাঁচের মতো ভঙ্গুর।

“জি।”

“পৃথিবীর সবচাইতে দামী উপহার কী জানেন?”

নোবারা জেনিনের বুকের ওপর মাথা রাখল। “আপনার ভালোবাসা!”

জেনিন একটু হাসল, কিন্তু সেই হাসিতে কোনো আনন্দ নেই, আছে এক গভীর বেদনার ছোঁয়া। “না। দামী উপহার হলো..একটি সুস্থ, স্বাভাবিক মানুষ হয়ে বেঁচে থাকা। আমি আপনাকে অনেক কিছু দিয়েছি..টাকা, ক্ষমতা, নিরাপত্তা। কিন্তু আমি কি আপনাকে কখনো একটি সাধারণ মানুষের মতো অকৃত্রিম সময় দিতে পেরেছি?”

নোবারা জেনিনের শার্টের কলারটা খামচে ধরল। “আপনি আমার জন্য যতটুকু করেছেন, তাতেই আমি পূর্ণ। আমার আর কিছু প্রয়োজন নেই।”

জেনিন নোবারার মুখটা নিজের দুই হাতের মুঠোয় নিল। তার আঙুলগুলো নোবারার চোখের কোণে আলতো করে বুলিয়ে দিল। সে আজ নোবারার প্রতিটি রেখা নিজের স্মৃতিতে গেঁথে নিতে চায়। সে জানে, এই আঙুলের স্পর্শ, এই ঘ্রাণ…আর হয়তো বেশিদিন তার থাকবে না?

“জানেন নূরপরী, আমি শুধু চাই, আপনি আমাকে মনে রাখবেন…একজন মাফিয়া হিসেবে নয়, একজন মানুষ হিসেবে। যে আপনাকে পাগলের মতো ভালোবেসেছিল,” জেনিন ফিসফিস করে বলল।

নোবারার বুকটা ধক করে উঠল। সে জেনিনের চোখে চোখ রেখে বলল, “আপনি আজ এমন করছেন কেন? বলুন না!”

জেনিন নোবারার কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে রাখল। সে কোনো উত্তর দিল না। উত্তর দেওয়ার মতো সাহস তার নেই। সে শুধু নোবারার নিশ্বাস নিজের নাকে অনুভব করতে চায়। বাইরের বাগানে জোনাকির আলো জ্বলছে-নিভছে, যেন জীবনের অনিশ্চয়তা। জেনিন নূরশাদ আজ আর কোনো মাফিয়া নয়, সে কেবল একজন প্রেমিক…যে নিজের অস্তিত্ব বিলীন হতে দেখেও তার ভালোবাসার মানুষটিকে আড়াল করতে চাইছে।

জেনিন নোবারাকে নিজের বাহুবন্দি করে নিল। নোবারা জানে না যে এই আয়োজনটা আসলে একটা বিদায়ের প্রাক-প্রস্তুতি।

জেনিন নোবারাকে ডাইনিং টেবিলে নিয়ে গেল। সে নিজ হাতে নোবারার জন্য আঙুর আর চকোলেট কেটে দিল। নোবারা অবাক হয়ে দেখছিল, জেনিন আজ কত যত্ন করে তার প্রতিটি ছোট ছোট শখ পূরণ করছে। জেনিন তাকে খাওয়ানোর সময় প্রতিটি মুহূর্ত যেন এক একটা রত্ন হয়ে তার স্মৃতিতে জমা হচ্ছিল।

রাত যখন গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে, জেনিন নোবারাকে কোলে করে নিয়ে ওপরে উঠে এল। তার শরীরে তখন এক তীব্র ব্যথা দানা বাঁধছে, কিন্তু সে নোবারার সামনে নিজের মুখভঙ্গি এমনভাবে রাখল যেন সে আজ পৃথিবীর সবচাইতে সুখী মানুষ।
বিছানায় নোবারাকে শুইয়ে দিয়ে সে তার পাশে শুয়ে পড়ল। নোবারা জেনিনের বুকের ওপর মাথা রাখল। জেনিন নোবারার চুল নিয়ে খেলছিল। সে তার ডায়েরিটা বালিশের নিচে রেখে দিয়েছে, সেখানে সে লিখে রেখেছে নোবারার জন্য তার শেষ উইল।

“শুভ রাত্রি, নূরা,” জেনিন ফিসফিস করে বলল।
“শুভ রাত্রি, আমার জেনিন,” নোবারা আধো ঘুমে উত্তর দিল।

জেনিন অন্ধকার সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখ দিয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল নোবারার চুলের ওপর। সে তার নিজের সৃষ্ট নরক আর নোবারার জন্য তৈরি করা স্বর্গের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। সে জানে, আগামীকাল তার জন্য কী অপেক্ষা করছে তা সে জানে না, কিন্তু সে প্রস্তুত…তার নূরা যেন ভালো থাকে, সেই প্রতিজ্ঞা নিয়ে।

পুরো ভিলা তখন নিঝুম। কেবল জেনিনের হৃদস্পন্দন ধীর লয়ে বেজে চলেছে, আর সেই স্পন্দনের প্রতিটি ধাক্কায় সে বলে যাচ্ছে..নোবারা, আমি তোমাকে বড্ড ভালোবাসি!

<><><><><><><><><>

গভীর রাত। পুরো ভিলা যখন নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে, নোবারাকে ঘুমের মধ্যে ছেড়ে জেনিন বাথরুমে গিয়ে ঝরনার নিচে দাঁড়িয়ে রইল। শরীর ভেজানোর কোনো ইচ্ছা তার নেই, সে কেবল ঝরনার শব্দের আড়ালে নিজের আর্তনাদ লুকাতে চাইছে। আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে সে আঁতকে উঠল। গত কয়েক মাসে তার শরীরের চামড়া কিছুটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে, চোখের নিচে গভীর কালো দাগ।

জেনিন তার শার্টের বোতামগুলো একে একে খুলল। বুকের বাঁ পাশে, ঠিক হৃৎপিণ্ডের ওপরের চামড়াটা কুঁচকে কালচে হয়ে আছে। সে আঙুল দিয়ে সেই জায়গাটা স্পর্শ করল। ব্যথায় তার মুখ দিয়ে একটা অস্ফুট চিৎকার বেরিয়ে এল।

জেনিন জানে, এটা কোনো সাধারণ অসুস্থতা নয়। এটি তার অতীত জীবনের পাপে ভরা কর্মফলের বহিঃপ্রকাশ। বহু বছর আগে, মাফিয়া জগতের শীর্ষে ওঠার লড়াইয়ে সে একটি বিশেষ ‘টক্সিক এক্সপেরিমেন্ট এর কবলে পড়েছিল। তখন সে ভেবেছিল, সে সেটাকে জয় করেছে। কিন্তু সেই বিষ তার শরীরের প্রতিটি রক্তকণিকায় ধীরগতির মরণব্যাধি হয়ে বাসা বেঁধেছিল। তখন সে একে পাত্তা দেয়নি, ভেবেছিল ক্ষমতা থাকলে সব কেনা যায়। কিন্তু আজ ক্ষমতা আছে, অর্থ আছে…কিন্তু সেই বিষ তার অস্তিত্বের মূলে আঘাত করেছে।

চিকিৎসকরা তাকে অনেক আগেই সতর্ক করেছিল যে, এটি শরীরের ভেতরে কোনো এক সময় বিস্ফোরণ ঘটাবে। জেনিন হেসে তাদের ধমক দিয়েছিল। কিন্তু আজ যখন আয়নায় সে দেখছে তার শিরাগুলো কালচে হয়ে আসছে, তখন সে বুঝতে পারছে ডাক্তাররা ঠিকই বলেছিল! কিন্তু যদি চিকিৎসায় কাজ না হয়!

সে বাথরুম থেকে বেরিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের শার্টটা পরল। তার মনে পড়ছে সেই দিনটির কথা, যখন সে প্রথম নোবারার প্রেমে পড়েছিল। সে তখন ভেবেছিল, সে অমর। সে ভেবেছিল, নোবারার ভালোবাসার ছোঁয়ায় তার এই শরীর নবজীবন পাবে। কিন্তু না, ভালোবাসা শরীরকে সুস্থ করতে পারে, কিন্তু পচনশীল রক্তকে সে নতুন জীবন দিতে পারে না।

জেনিন ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার থেকে ডায়েরিটা বের করল। ডায়েরির পাতায় সে লিখে রেখেছে,
“মানুষ যখন তার সবচাইতে দামী সম্পদ খুঁজে পায়, ঠিক তখনই যেন ভাগ্যের পরিহাস শুরু হয়। আমি আমার নূরাকে পেয়েছি, কিন্তু আমার শরীর আজ সেই নূরাকে ছেড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমি জানি না এই যন্ত্রণা কেন, কিন্তু এটা আমার প্রাপ্য। আমি কত মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছি, আজ আমার জীবনই সেই হিসেব মেলাতে এসেছে।”

জেনিন ল্যাপটপের এনক্রিপ্টেড ফোল্ডারটার দিকে তাকাল। সেখানে নোবারার জন্য একটি ভিডিও মেসেজ রেকর্ড করা আছে। সে অনেক সাহস সঞ্চয় করে সেটি করেছে। ভিডিওতে সে তার নোবারার প্রতি তার এই শেষ মুহূর্তের ভালোবাসার কথা স্বীকার করেছে। সে জানে, এই ভিডিওটি নোবারার সামনে আসা মানে নোবারার পৃথিবীটা দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া। কিন্তু সে নোবারাকে মিথ্যে ভালোবাসার আশ্রয়ে রাখতে চায় না।

জেনিন বিছানায় ফিরে এসে নোবারার পাশে বসল। নোবারার শান্ত নিশ্বাস তার কানে এক অদ্ভুত সুরের মতো লাগছে। জেনিন নিজের হাতটা নোবারার গালের ওপর রাখল।

“নূরা,” সে ফিসফিস করে বলল, “আমি জানি না আগামীকাল সূর্যোদয় আমার জন্য কতটা দীর্ঘ হবে, কিন্তু আমি যদি কাল সকালে আর না জাগি, তবে জেনে রাখবেন…আমার মস্তিষ্ক এ শেষ চিন্তাটা কেবল আপনি ছিলেন।”

সে নোবারার চুলগুলোতে আলতো করে বিলি কেটে দিল। তার হাতের আঙুলগুলো কাঁপছে। সে বুঝতে পারছে, সময় সত্যিই ফুরিয়ে আসছে। অন্ধকার থেকে সে উঠে এসেছিল, এবং এই অন্ধকারই তাকে আবার ডেকে নিচ্ছে। কিন্তু যাওয়ার আগে সে নোবারার পৃথিবীকে সুরক্ষিত করে দিয়ে যেতে চায়…এমন এক রাজপ্রাসাদে, যেখানে কোনো ষড়যন্ত্র, কোনো শত্রু, আর কোনো মাফিয়া জগত তাকে স্পর্শ করতে পারবে না।

জেনিন নূরশাদ আজ আর পৃথিবীর কোনো শক্তির কাছে মাথানত করে নি, সে মাথা নত করেছে কেবল পরিস্থিতির কাছে…যা তাকে কেড়ে নিচ্ছে তার নূরা থেকে! সে কি শেষ পর্যন্ত নিজেকে নোবারার কাছে রাখতে পারবে? নাকি মহাকালের অতলে হারিয়ে যাবে?

চলবে ইংশাআল্লাহ।।।।।।।।।।।।।।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here