soulmate_to_Enemy #পর্ব_৫৫ (CID-র হামলা)

0
2

#soulmate_to_Enemy
#পর্ব_৫৫ (CID-র হামলা)
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম

আজ এক বিশেষ দিন। আজ জেনিন আর নোবারা নতুন করে কবুল বলার কথা, আজ ইউজি আর নীলিমার জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হওয়ার কথা। ভিলা জুড়ে সাদা গোলাপ আর রজনীগন্ধার সুবাস ম ম করছে। মা হালিমা তসবিহ হাতে দোয়া পড়ছেন, নীলিমা তার বিয়ের লাল শাড়িতে আয়নার সামনে বসে লাজুক হাসছে, মেয়েটা অনাথ। এতো দিন একাই ছিল, কিন্তু নোবারা নিয়ে এসেছে ওকে ভিলায়, যাতে বিয়ের দিনটা খুশিতে কাটে।

জেনিন নূরশাদ আজ খুব ভোরেই তৈরি হয়ে নিয়েছে। তার পরনে শেরোয়ানির বদলে কুচকুচে কালো একটি শার্ট এবং ব্ল্যাক ডেনিম। তার চোখের কালো মণি আজ স্থির, কোনো এক অজানা গন্তব্যের দিকে তার নজর। গতকাল নোবারা কেউ একজন কে মেসেজ পাঠিয়েছিল। কিন্তু তাকে বললো তনুজাকে পাঠিয়েছে। কিন্তু জেনিনের মন এটা মানতে চাইছে না। উপরন্তু মাহিতো নামের সিআইডি অফিসার আসায় নোবারার চেহারায় যে আতঙ্ক দেখেছে সে, এইসফ কিছু তার সমাধান করতেই হবে।

নোবারা যখন ঘরে ঢুকেছিল, জেনিন তখন তার পিস্তলের ম্যাগাজিনটা চেক করছিল। নোবারা শান্ত গলায় বলল, “আজ অন্তত আপনি কোথাও যাবেন না প্লিজ।”

কিন্তু জেনিন কোনো উত্তর দেয়নি, কেবল নোবারার কপালে একটি শীতল চুমু খেয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল। জেনিন জানে, মাহিতো নামের ওই বিষাক্ত সাপটিকে আজ না থামালে তার সাজানো বাগান তছনছ হয়ে যাবে।

<><><><><><><><><>

শহরের উপকণ্ঠে এক নির্জন শিল্পাঞ্চল। সেখানে এক বিশাল পরিত্যক্ত গোডাউন, যার দেয়ালগুলো নোনা ধরে খসে পড়ছে। জেনিন তার এসইউভি নিয়ে যখন সেখানে পৌঁছাল, তখন চারপাশটা অস্বাভাবিক নীরব। সে গাড়ি থেকে নামতেই দেখল গোডাউনের চারিদিকে সিআইডির স্পেশাল ফোর্সের জওয়ানরা পজিশন নিয়ে আছে। মাহিতো গোডাউনের মাঝখানে একটি ভাঙা চেয়ারে বসে আয়েশ করে সিগারেট ফুঁকছে। ওর কপালে কাটা জায়গাটা সুতো দিয়ে সেলাই করা, মুখের প্রায় অনেক জায়গায় এমন। চুলগুলো ছাই রঙের, দেখতে বিভৎস লাগছে ওকে। জেনিনকে দেখে মাহিতো উঠে দাঁড়াল। তার ঠোঁটে এক পৈশাচিক হাসি।

“স্বাগত, মি: জেনিন নূরশাদ ওরফে মাফিয়া জেড,” মাহিতো হাততালি দিয়ে উঠল। “আমি জানতাম আপনি আসবেন। নিজের ভালোবাসার মানুষকে বাঁচানোর জন্য মানুষ কত কী-ই না করে!”

জেনিন ধীর পায়ে মাহিতোর দিকে এগিয়ে গেল। তার প্রতিটি পদক্ষেপ যেন এক একটি ভূমিকম্প। “আমার ধৈর্য পরীক্ষা করবেন না। আপনি নোবারাকে নিয়ে কী লুকোচ্ছেন তা পরিষ্কার করে বলুন, নাহলে এই গোডাউন আপনার কবর হবে।”

মাহিতো হো হো করে হেসে উঠল। “কবর? মিস্টার জেড, কবর তো আপনার জন্য খোঁড়া হয়েছে। আপনি যাকে ‘নূরা’ বলে ডাকেন, সে আসলে আমাদের ডিপার্টমেন্টের। সে একজন আন্ডারকাভার সিআইডি অফিসার, NA ওরফে নোবারা আকারি। আপনাকে ধ্বংস করার জন্যই তাকে পাঠানো হয়েছিল।”

জেনিনের কানে কথাগুলো বাজ পড়ার মতো শোনাল। তার পা যেন মাটির সাথে গেঁথে গেল। নোবারা? তার সহজ-সরল নূরা? যে কিনা সামান্য রক্ত দেখলে ভয় পায়, সে একজন সিআইডি অফিসার? সে তার কাছে এসেছিল তাকে ধ্বংস করতে? জেনিনের মস্তিষ্কে এক তীব্র যন্ত্রণা শুরু হলো। তার আইকিউ, তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধি আজ সব অকেজো হয়ে গেল। সে কেবল নোবারার পবিত্র হাসি আর তার মায়াবী চোখের কথা ভাবছে। মাহিতো ঠিক তখনই নোবারার আইডি কার্ড আর কিছু গোপন ডকুমেন্টস জেনিনের দিকে ছুঁড়ে মারল।

“বিশ্বাস হচ্ছে না তো? দেখুন এই ছবিগুলো! দেখুন তার ট্রেনিংয়ের ভিডিও!” মাহিতো চিৎকার করে বলছে। কিন্তু জেনিন যখন কাগজের স্তূপের দিকে হাত বাড়াতে যাবে, ঠিক তখনই বাইরে এক বিকট গর্জন শোনা গেল। একটি স্পোর্টস বাইক তীব্র গতিতে গোডাউনের ভেতরে ঢুকে পড়ল। বাইকটি গোডাউনের মেঝের ওপর ঘর্ষণ তৈরি করে জেনিন আর মাহিতোর মাঝখানে এসে এক অদ্ভুত ড্রিলিং পজিশন নিল।

বাইক আরোহীর পরনে ব্ল্যাক ট্যাকটিক্যাল স্যুট, যা তার শরীরের প্রতিটি ভাঁজকে তীক্ষ্ণ করে তুলেছে। মাথায় একটি কালো হেলমেট। তার পিঠে একটি সাব-মেশিনগান ঝোলানো। আরোহীটি জেনিনকে লক্ষ্য করে বাইক নিয়ে গোল গোল ঘুরতে শুরু করল। তার বাইকের টায়ারের ধোঁয়ায় পুরো গোডাউন আচ্ছন্ন হয়ে গেল। জেনিন বিরক্ত হয়ে চিৎকার করে উঠল, “WTH! Who are you?”

বাইক আরোহী কোনো কথা বলছে না। সে জেনিনের চারপাশে এক অদ্ভুত সুরক্ষাবলয় তৈরি করছে। জেনিন তার পিস্তল বের করে আরোহীর দিকে তাক করল। এমনিতেই মাহিতোর বলা কথাগুলো তার মস্তিষ্কে হাতুড়ি পেটাচ্ছে। তার উপর এই অসহ্য কাজ কারবার! জেনিন গর্জে উঠল,
“পরিচয় দাও! কে তুমি?”

বাইক আরোহী হঠাৎ ব্রেক কষল। টায়ারের তীক্ষ্ণ শব্দে কান ঝালাপালা হয়ে গেল। চারপাশের সিআইডি অফিসাররা তখন বিভ্রান্ত, যদিও তারা পজিশন নিয়ে আছে। মাহিতো অবাক হয়ে দেখছে, তার তো এমন কোনো ব্যাকআপ প্ল্যান ছিল না। তাহলে এ কে?

বাইক আরোহী খুব ধীরে তার বাইক থেকে নামল। তার চলাফেরার মধ্যে এক অদম্য তেজ, এক পেশাদার যোদ্ধার ছাপ। জেনিন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। এই ভঙ্গি, এই উচ্চতা, সবই যেন তার বড্ড চেনা। তার উপর সেই ল্যাভেন্ডার এর খুশবু!

আরোহীটি তার মাথার হেলমেটটা খুব ধীরলয়ে খুলল। সাথে সাথে একরাশ কালো রেশমি চুল পনিটেইল থেকে খুলে পিঠের ওপর ছড়িয়ে পড়ল। জেনিনের হাত থেকে পিস্তলটা প্রায় পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। তার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে নোবারা! কিন্তু এ তো তার নূরা নয়! তার চোখে আজ আগুনের ফুলকি, তার কপালে যুদ্ধের ঘাম। সে জেনিনের দিকে তাকিয়ে এমন এক দৃষ্টি দিল যা জেনিন আগে কখনো দেখেনি।

মাহিতো স্তব্ধ হয়ে চিৎকার করে উঠল, “NA! তুমি এখানে কী করছ? আবার কোন চাল চাললে তোমাকে শ্যুট করার পারমিশন আছে আমার।”

নোবারা মাহিতোর দিকে ফিরেও তাকাল না। সে জেনিনের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার চোখে তখন জল আর তেজ মিলেমিশে একাকার। সে জেনিনের হাত ধরে খুব চাপা কিন্তু কঠোর স্বরে বলল, “জেনিন, আমার ওপর রাগ করার জন্য সারাজীবন পাবেন। এখন কথা না বাড়িয়ে বাইকে উঠুন। আমাদের এখান থেকে বের হতে হবে। মাহিতো আপনাকে মারার জন্য পুরো ফোর্স নিয়ে এসেছে! তাছাড়া আপনি প্রটোকল ছাড়া বের হলেন কিভাবে?”

জেনিন নড়ল না। সে পাথর হয়ে তাকিয়ে আছে নোবারার এই নতুন রূপের দিকে। সে ভাবছে, এই মেয়েটিই কি তাকে কফি বানিয়ে খাওয়াত? এই মেয়েটিই কি সামান্য রিকশা ভ্রমণের জন্য জেদ করত? জেনিনের দুর্ধর্ষ মাফিয়া ইমেজ আজ যেন ধুলোয় মিশে গেছে। সে কেবল ফিসফিস করে বলল, “নূরা….সিআইডি?”

নোবারার বুকটা ফেটে যাচ্ছিল, কিন্তু সে নিজেকে শক্ত করল। সে একবার পেছন ফিরে তাকাল। মাহিতোর হাতের বন্দুকের নলটা তখনো তাদের দিকে লক্ষ্য স্থির করে আছে। নোবারা আবার জেনিনের দিকে ফিরে তার কণ্ঠস্বর আরও নিচু করে আনল, যাতে শুধু জেনিনই শুনতে পায়।
“আমি আপনার স্ত্রী জেনিন। এর বাইরে আমার আর কোন পরিচয় নেই। যে পরিচয়টা আমি আপনার কাছে লুকিয়েছিলাম, যে পরিচয়টা দিয়ে আপনাকে ধ্বংস করার শপথ নিয়েছিলাম। কিন্তু আজ সেই শপথ, সেই ক্যারিয়ার, সেই দেশপ্রেম, সবই আমি নিজের হাতে পুড়িয়ে দিয়ে এসেছি।”

নোবারা এবার জেনিনের হাতটা নিজের গালের সাথে চেপে ধরল। তার স্পর্শে আজ কোনো প্রেমিকার আকুতি নয়, বরং এক সঙ্গিনীর মরণপণ লড়াইয়ের জেদ। সে দৃঢ় গলায় বললো,
“শুনুন, জেনিন নূরশাদ যদি আজ এই রাস্তায় মরে পড়ে থাকে, তবে সিআইডি অফিসার নোবারাও আজ এখানেই আত্মাহুতি দেবে। প্লিজ বাইকে উঠুন জেনিন! নিজের জন্য না হলেও, আপনার এই অপরাধী প্রেমিকার শেষ ইচ্ছেটা পূরণ করতে!”

নোবারার এই আর্তচিৎকারে জেনিনের পাথুরে হৃদয়টা যেন এক মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠল। সে মাহিতোর দিকে একবার ঠান্ডা দৃষ্টিতে তাকাল, সেই দৃষ্টিতে ছিল এক চরম ঘৃণা আর বিশ্বাসঘাতকতার দহন। জেনিন বুঝতে পারল, নোবারা আজ যা করেছে, তা কেবল তার ক্যারিয়ার নয়, বরং নিজের জীবনকেও নরকের মুখে ঠেলে দেওয়ার নামান্তর।

মাহিতো তখন পাগলের মতো হাসছে। সে তার ফোর্সকে নির্দেশ দিল, “অফিসার নোবারা আকারি সিআইডির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে! ওকে আর মাফিয়া জেডকে একসাথে খতম করো! গুলি চালাও!”

গোডাউনের ভেতর শুরু হলো এক প্রলয়ংকরী যুদ্ধ। নোবারা জেনিনকে টেনে বাইকের পেছনে বসাল। জেনিন এখনো ঘোরের মধ্যে, সে যেন একটি জীবন্ত লাশ হয়ে নোবারাকে আঁকড়ে ধরল। নোবারা বাইকের এক্সিলারেটরে চাপ দিল। বাইকটি গোডাউনের ধূলিধূসরিত মেঝের ওপর দিয়ে বাতাসের গতিতে ছুটতে শুরু করল। মাহিতোর ফোর্স বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়ছে। নোবারা এক হাতে হ্যান্ডেল ধরে অন্য হাতে তার পিস্তল দিয়ে নিখুঁত নিশানায় সিআইডি জওয়ানদের কুপোকাত করছে। জেনিন নূরশাদ, যে কিনা হাজার হাজার মানুষকে এক ইশারায় নিয়ন্ত্রণ করত, সে আজ তার প্রিয়তমার পেছনে বসে এক অসহায় দর্শকের মতো দেখছে, কীভাবে ন্যায় আর অন্যায় একে অপরের সাথে লড়ছে!

জেনিন, যাকে পুরো আন্ডারওয়ার্ল্ড ‘মাফিয়া Z’ বলে চেনে, যার একটি চোখের পলক শহরের অর্ধেক শান্তিতে ঘুম পাড়িয়ে দেয় অথবা চিরতরে জাগিয়ে রাখে, সে আজ সম্পূর্ণ স্তব্ধ। তার তীক্ষ্ণ আইকিউ, যা যেকোনো জটিল ষড়যন্ত্রের জাল সেকেন্ডে ছিন্ন করে ফেলে, আজ তা যেন কোনো এক অদৃশ্য হিমবাহে জমে বরফ হয়ে গেছে। তার চোখের সামনে তারশান্ত, নিরীহ ‘নূরা’ আজ এক দুর্ধর্ষ যোদ্ধার বেশে রণক্ষেত্রে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এই বৈপরীত্য জেনিনের মগজে এক তীব্র যন্ত্রণা তৈরি করছিল।

নোবারা বাইক নিয়ে গোডাউনের পেছনের গেট দিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু সেখানে মাহিতোর বিশাল বাহিনী আগে থেকেই ব্যারিকেড দিয়ে রেখেছে। মাহিতো চিৎকার করে বলছিল,
“এনএ! তুমি আজ নিজের কবর নিজে খুঁড়লে! একজন খুনি, একজন মাফিয়ার জন্য তুমি তোমার দেশ, তোমার শপথকে বিক্রি করে দিলে? এর শাস্তি তোমাকে পেতেই হবে।”

নোবারা কোনো উত্তর দিল না। সে বাইকটি এক ঝটকায় ঘুরিয়ে গোডাউনের একদম ভেতরের দিকে নিয়ে গেল। কিন্তু গোডাউনের পেছনের দিকটা ছিল বন্ধ, সেখানে বিশাল লোহার দেয়াল আর ভাঙাচোরা কন্টেইনারের স্তূপ। রাস্তা শেষ। নোবারা বাইক থেকে নেমে জেনিনকে টেনে নিচে নামাল। জেনিন এখনো কোনো কথা বলছে না, কেবল তার কালো চোখ দুটো নোবারার চেহারার ওপর স্থির হয়ে আছে। সে যেন বোঝার চেষ্টা করছে, এই স্যুটের নিচে থাকা মেয়েটিই কি তার নূরা, নাকি এ অন্য কেউ? বিষ্ময় যখন সীমা ছাড়িয়ে যায়, মানুষ তখন হিতাহিত জ্ঞান ও হারিয়ে ফেলে। দ্যা গ্ৰেট শ্যাডো কিং এর ও হয়েছে তা!

মাহিতো তার ফোর্স নিয়ে গোডাউনের ভেতরে ঢুকে পড়ল। মাহিতোর হাতে একটি স্বয়ংক্রিয় রাইফেল। সে নোবারার দিকে তাকিয়ে এক পৈশাচিক হাসি দিল। “আজ তোমার নাটক শেষ। তুমি ভেবেছিলে জেনিনকে বাঁচিয়ে নিয়ে যাবে? জেড আজ মরবে, আর তার সাথে তুমিও মরবে বিশ্বাসঘাতকতার দায়ে।”

নোবারা জেনিনকে একটি বড় কন্টেইনারের আড়ালে ঠেলে দিয়ে সামনে এসে দাঁড়াল। আজ জেনিন নোবারার জন্য নয়, নোবারা জেনিনের জন্য লড়বে, তাও আবার নিজের পরিচয় ভুলে। তার হাতে দুটি গ্লক-১৭ পিস্তল। সে মাহিতোর চোখের দিকে তাকিয়ে খুব গম্ভীর গলায় বলল, “মাহিতো স‌্যার, আমি জেডকে নয়, আমি আমার স্বামীকে বাঁচাতে এসেছি। আর একজন সিআইডি অফিসারের চেয়ে একজন স্ত্রী কতটা ভয়ংকর হতে পারে, সেটা আপনি দেখবেন আজ।”

মাহিতো ইশারা করতেই তার দুজন অফিসার নোবারার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। শুরু হলো এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। নোবারা তার ট্যাকটিক্যাল দক্ষতার পূর্ণ ব্যবহার করছে। সে একেকজনকে লাথি আর পাঞ্চ দিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিচ্ছে। তার পনিটেইল করা চুলগুলো বাতাসের সাথে দুলছে, আর প্রতিটি মুভমেন্টে ফুটে উঠছে দীর্ঘ বছরের কঠিন ট্রেনিংয়ের ছাপ। জেনিন দাঁড়িয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখছে। সে দেখছে তার নূরা কীভাবে একজন দক্ষ ঘাতকের মতো লড়াই করছে। জেনিনের মনে পড়ল, একবার নোবারার আঙুল সামান্য কেটে গিয়েছিল বলে সে নূরশাদ ভিলা মাথায় তুলেছিল, আর আজ সেই নূরা নিজের রক্ত মাখা শরীরে দশজন সশস্ত্র মানুষের মোকাবিলা করছে।

লড়াইটা এবার মাহিতো আর নোবারার মাঝে ব্যক্তিগত রূপ নিল। মাহিতো তার রাইফেল ফেলে দিয়ে একটি ট্যাকটিক্যাল নাইফ বের করল। সে জানে নোবারার ফাইট স্টাইল। মাহিতো গর্জে উঠে নোবারার দিকে এগিয়ে এল। নোবারা তার এক হাত দিয়ে মাহিতোর কব্জি ধরল এবং অন্য হাত দিয়ে তার চোয়ালে এক প্রচণ্ড আঘাত করল। কিন্তু মাহিতোও কম নয়। সে নোবারাকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দিল। নোবারা দ্রুত রোল করে উঠে দাঁড়াল।

জেনিন এবার নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল। সে তার পকেট থেকে নিজের গোল্ডেন পিস্তলটা বের করতে চাইল, কিন্তু মাহিতোর একজন স্নাইপার ঠিক তখনই জেনিনের হাতের ওপর লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ল। পরপর জেনিনের পেটেও! জেনিনের হাতের পিস্তলটা ছিটকে দূরে পড়ে গেল। জেনিন ব্যথায় ককিয়ে উঠল। তার শরীর বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। সে উঠে দাঁড়াতে চাইলো। কিন্তু তখনই মাটিতে লুটিয়ে পড়ল! নোবারা জেনিনের গোঙানি শুনে এক মুহূর্তের জন্য অন্যমনস্ক হয়ে গেল।

“জেনিন!” সে চিৎকার করে উঠল।

আর ঠিক সেই সুযোগটাই নিল মাহিতো। মাহিতো নিচ থেকে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়াল এবং তার হাতে থাকা বিষাক্ত ছুরিটি নিয়ে পাগলের মতো নোবারার দিকে দৌড়ে এল। ওদিকে ইউজি তখন গোডাউনের ছাদ দিয়ে প্রবেশের চেষ্টা করছিল। জেনিন বেরিয়ে যাওয়ার পর নোবারা বের হওয়ায়, সন্দেহের বশে সে এখানে এসেছিল, তার শেরোয়ানি খুলে… নীলিমা কে বউ বেশে অপেক্ষা করিয়ে! কিন্তু নোবারার দিকে মাহিতোর আক্রমণ দেখতে পেয়ে সে চিৎকার করে ডাকলো,
“নোবারাআআআআ…..সরে যান!”

কিন্তু অনেক দেরি হয়ে গেছে। মাহিতো তার শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে ছুরিটি নোবারার পেটের এক পাশে বসিয়ে দিল। নোবারার চোখ দুটো তৎক্ষণাৎ বড় বড় হয়ে গেল। তার মুখ দিয়ে এক অস্ফুট আর্তনাদ বেরিয়ে এল। সে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। মাহিতো ছুরিটি বের করে নিয়ে আবার আঘাত করতে চাইল, কিন্তু নোবারা তার শেষ শক্তি দিয়ে মাহিতোর বুকে এক প্রচণ্ড লাথি মারল। মাহিতো ছিটকে গিয়ে লোহার রডের ওপর পড়ল।

নোবারা তার পেটের ক্ষতস্থানটা হাত দিয়ে চেপে ধরল। আঙুলের ফাঁক দিয়ে লাল রক্ত গলগল করে বেরিয়ে আসছে। তার সাদাটে মুখটা আরও ফ্যাকাশে হয়ে গেল। জেনিন এই দৃশ্য দেখে নিজের সমস্ত শারীরিক এবং মানসিক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল। তার পৃথিবী যেন মুহূর্তের মধ্যে থমকে গেল।

“নূরাআআআআ…..” জেনিন এক বুক ফাটা চিৎকার দিল। তার দুর্ধর্ষ মাফিয়া জেড সত্তা আজ মৃত, সেখানে কেবল এক স্বামী দাঁড়িয়ে আছে যার স্ত্রী তার চোখের সামনে রক্তাক্ত! অথচ আজ তার কোন ক্ষমতাই কাজ এ আসছে না!

নোবারা টলতে টলতে জেনিনের দিকে এগোতে চাইল। সে হাসার চেষ্টা করল, কিন্তু তার মুখ দিয়ে কেবল রক্ত বেরিয়ে এল। সে জেনিনের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, “আপনি… আপনি ঠিক আছেন?”

জেনিন নিজের আহত হাত নিয়েই হামাগুড়ি দিয়ে নোবারার দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। তার দু চোখ বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে। সে তার জীবনে অনেক রক্ত দেখেছে, অনেক মৃত্যু দেখেছে, কিন্তু আজ নিজের স্ত্রীর রক্ত তাকে মেরুদণ্ডহীন করে দিল। জেনিন আর নোবারার মাঝখানের সেই কয়েক ফুটের দূরত্ব যেন হাজার মাইলের পথ হয়ে দাঁড়াল।

মাহিতো রক্তাক্ত অবস্থায় উঠে দাঁড়িয়ে পৈশাচিক হাসি হাসল। সে তার ফোর্সের দিকে তাকিয়ে বলল, “সবগুলোকে শেষ করে দাও! এখনই!”

জেনিন যখন নোবারার রক্তাক্ত হাতটা ধরল, তখন গোডাউনের চারপাশ থেকে সিআইডির অবশিষ্ট ফোর্স জেনিনের ওপর বৃষ্টির মতো গুলি চালাতে শুরু করল। জেনিন নোবারাকে নিজের বুকের আড়ালে আগলে ধরল। সে আজ মাফিয়া হিসেবে নয়, সে আজ এক প্রেমিক হিসেবে নিজের জীবন দিয়ে তার নূরাকে শেষবারের মতো রক্ষা করতে চাইল। কিন্তু নিয়তি হয়তো অন্য কিছু লিখে রেখেছিল। জেনিনের কাঁধে আর পায়ে কয়েকটা গুলি লাগল, যদিও সে বুলেটপ্রুফ ভেস্ট পড়েছিল, তবে ভেস্ট অনাবৃত অংশে গুলি লেগেই যায়! সে নোবারার ওপর লুটিয়ে পড়ল। দুই রক্তাক্ত শরীর এখন গোডাউনের ধূলিধূসরিত মেঝের ওপর একাকার হয়ে আছে।

ইউজি তখন উন্মত্ত হয়ে ওপর থেকে নিচে ঝাঁপ দিল। তার হাতে থাকা মেশিনগান থেকে আগুনের বৃষ্টি ঝরল। ইউজি মাহিতোর প্রতিটি অফিসারকে পঙ্গপালের মতো নিধন করতে শুরু করল। তার চোখে তখন খু’নের নেশা। যে বস তাকে জীবন দিয়েছে, তাকে ছোট ভাইয়ের মতো আগলে রেখেছে এতোবছর, সেই বসের এই অবস্থা সে সহ্য করতে পারল না। ইউজি চিৎকার করে মাহিতোর কপালে, বুকে, হাতে, পিঠে, পায়ে সব জায়গায় বুলেট বিঁধিয়ে দিল। মাহিতোর নিথর দেহটা তৎক্ষণাৎ মেঝের ওপর আছড়ে পড়ল। তার শরীরের এমন একটা অংশ অবশিষ্ট নেই যেখান থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে না! ইউজি মাহিতোর শরীর ঝাঁঝড়া করে ফেলেছে বুলেটের আঘাতে।

কিন্তু গোডাউন জুড়ে তখন অন্য এক বিপদ ঘনিয়ে আসছে। গুলি বিনিময়ের ফলে গোডাউনে রাখা কেমিক্যাল ড্রামগুলোতে আগুন ধরে গেছে। আগুনের লেলিহান শিখা দ্রুত চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। শীঘ্রই এখান থেকে বের না হলে কেউ বাঁচতে পারবে না, যেকোনো সময় বিষ্ফোরণ হবে। ইউজি রক্তাক্ত অবস্থায় জেনিন আর নোবারার কাছে পৌঁছাল। তার নিজের শরীরেও বেশ কিছু ক্ষত, কিন্তু সে থামল না।

“বস! ম্যাম! চোখ খুলুন!” ইউজি চিৎকার করছে বারবার।

জেনিন আধোবোজা চোখে ইউজির দিকে তাকাল। তার কণ্ঠে কোনো প্রাণ নেই। সে কেবল ফিসফিস করে বলল, “নূরাকে…আমার নূরাকে বাঁচাও। আমার শেষ একটা কথা রাখো। আমাকে ছেড়ে দাও। নূরাকে বাঁচাও।”

ইউজি কাঁদছে। এই প্রথম বোধহয় সে কাঁদছে! সে জানে জেনিন নূরশাদকে ছাড়া তার কোনো অস্তিত্ব নেই। তার শিকড় তো কেবল জেড!

আগুনের লেলিহান শিখা তখন গোডাউনের ছাদ স্পর্শ করতে চাইছে, কেমিক্যালের তীব্র গন্ধে দম বন্ধ হয়ে আসছে। ইউজি দেখল জেনিনের সেই বলিষ্ঠ হাত দুটো আজ নিস্তেজ হয়ে নোবারার রক্তমাখা শরীরের ওপর পড়ে আছে। যে মানুষটি পুরো আন্ডারওয়ার্ল্ডের কাছে ত্রাস, সে আজ নিজের জীবনের শেষ নিঃশ্বাসটুকু দিয়েও তার ভালোবাসাকে আগলে রাখার চেষ্টা করছে।

ইউজি জেনিনের বুকের ওপর আছড়ে পড়ে আর্তনাদ করে উঠল, “না বস! আপনাকে ছাড়া আমি অনাথ। আমি আপনাকে এখানে ম’রতে দেব না! এই আগুনের সাধ্য নেই জেড’-কে স্পর্শ করার!”

জেনিনের ঠোঁটের কোণে তখন এক চিলতে বিষণ্ণ হাসি। সে অতি কষ্টে ইউজির কলারটা টেনে ধরল, তার চোখ দিয়ে রক্তের সাথে মিশে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। সে অস্ফুট স্বরে বলল,
“ইউজি…তুমি যদি আমায় একটুও ভালোবাসো, তবে আমার নূরাকে এই নরক থেকে বের করে নিয়ে যাও। ইটস মাই অর্ডার উদয় গালিব। ওর গায়ে আগুনের একটা আঁচড় লাগলে পরপারেও আমি তোকে ক্ষমা করব না। ওকে বাঁচাও তুমি।”

ইউজি দেখল চারপাশের ড্রামগুলো ফুলতে শুরু করেছে, যেকোনো মুহূর্তে একটা দানবীয় বিস্ফোরণ পুরো এলাকা ছাই করে দেবে। সে পাগলের মতো একবার জেনিনের দিকে আর একবার নোবারার দিকে তাকাচ্ছে; তার বিবেক আর ভালোবাসা আজ এক অগ্নিপরীক্ষায় দাঁড়িয়ে।

ইউজির চারপাশের পৃথিবীটা যেন ধীর হয়ে এল।
সে কি করবে ভেবে পেল না। চোখ দিয়ে অঝোরে পানি নামছে তার। নিজেকে নিজেই কয়েকটা থাপ্পর দিল। আজ যদি সে আরেকটু সচেতন হতো, যদি সাথে তার এজেন্ট দের নিয়ে আসতো! তবে তার বস, আর ম্যামের এই দুর্দশা দেখতে হতো না তার! সে জেনিনের অর্ডার মানতে পারবে না। কারণ তাকে বাঁচাতে হলে জেনিন নোবারা দুজনকেই বাঁচাতে হবে। ওদের একজন ছাড়া অপরজনের কোন অস্তিত্বই নেই! আত্মার সম্পর্ক তাদের।

ইউজি এবার এদিক ওদিক তাকাতে লাগলো। তার মাথায় কিছুই আসছিল না। তখনই কিছু দূরে ময়লা একটা লাল ওড়নার মতো কিছু দেখতে পেল সে। ইউজি দৌড়ে গিয়ে ওড়নাটা নিয়ে এলো। সেটিকে জেনিনকে নিজের পিঠের সাথে শক্ত করে বাঁধল। কিন্তু নোবারাকে কি করবে বুঝতে পারলো না। সে কাঁপা কাঁপা হাতে নোবারাকে নিজের দুহাত দিয়ে পাঁজাকোলা করে নিল। এভাবে জেনিনের নূরাকে স্পর্শ করতে তার নৈতিকতায় বিঁধছে। কিন্তু নোবারার প্রাণ এর চেয়ে বড় কিছু নেই তার কাছে। সে জেনিনকে দেওয়া কথা রাখবেই।

আগুনের হলকা উদয় গালিব এর গায়ের চামড়া পুড়িয়ে দিচ্ছে, কিন্তু সে এক অমানুষিক শক্তি দিয়ে দুই রক্তাক্ত শরীর নিজের শরীরে নিয়ে গোডাউনের ভেঙে পড়া দরজার দিকে ছুটতে শুরু করল।

পেছনের গোডাউনটা তখন বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হচ্ছে। ইউজি যখন দুই দেহ নিয়ে বাইরে বের হয়ে এল, তখন তার পেছনের পুরো পৃথিবীটা যেন জাহান্নামের আগুনে জ্বলছে! সম্পূর্ণ গোডাউন এলাকা পুড়ে যাচ্ছে। ইউজি টলতে টলতে তার গোপন গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। সে জানে, হাসপাতালে গেলে পুলিশ ধরবে। তাকে যেতে হবে সেই জায়গায়, যেখানে জেনিন নূরশাদ তার জীবনের শেষ আশ্রয়স্থল বানিয়ে রেখেছে। নূরশাদ ভিলার গোপন ভূগর্ভস্থ মেডিকেল চেম্বার!

পেছনে নোবারাকে শুইয়ে দিয়ে জেনিনকে তার সাথে ওড়নাটা দিয়ে বেঁধে রাখলো ইউজি। অতঃপর সে গাড়ি স্টার্ট দিল।তার দু চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে রক্ত আর ধোঁয়ায়। সে কেবল একটি কথাই বারবার বলছে, “বস, মরতে দেব না। আপনাকে মরতে দেব না।”

বাইরে তখন কালবৈশাখীর মতো তান্ডব শুরু হয়েছে, যেন আকাশও জেনিন আর নোবারার এই রক্তক্ষয়ী পরিণতির সাক্ষী হয়ে গুমরে মরছে। ইউজি তার সমস্ত শারীরিক শক্তি এক করে গাড়িটি নূরশাদ ভিলার গোপন গেট দিয়ে ভেতরে ঢোকাল। তার নিজের শরীর থেকে চুইয়ে পড়া রক্তে গাড়ির সিট ভিজে একাকার, কিন্তু তার সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। তার জেনিনের নিথর দেহ আর রক্তাক্ত নোবারা, এই দুটি প্রাণকে রক্ষা করাই এখন তার অস্তিত্বের একমাত্র লক্ষ্য।

ইউজি অতি কষ্টে ভিলার গ্ৰাউন্ড ফ্লোরের একটি বিশেষ বুকশেলফ সরালো, যার পেছনে লুকিয়ে আছে জেনিনের তৈরি করা আন্ডারগ্রাউন্ড মেডিকেল উইং। জেনিন এটা তৈরি করেছিল তার মাফিয়া জীবনের গোপন আঘাতগুলো সারিয়ে তোলার জন্য, যেখানে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সব চিকিৎসা সরঞ্জাম মজুত আছে। ইউজি যখন তাদের নিয়ে ভেতরে ঢুকল, জেনিনের ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডাক্তার রহমান এবং তার চারজন নার্স দ্রুত এগিয়ে এলেন। জেনিন আর নোবারার রক্তাক্ত অবস্থা দেখে অভিজ্ঞ ডাক্তার রহমানের হাতও এক মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠল।

“দ্রুত! ওদের অপারেশন টেবিলে তুলুন! বস-এর পালস খুব দুর্বল, আর ম্যামের ইন্টারনাল হেমোরেজ শুরু হয়েছে!” ডাক্তার রহমান চিৎকার করে নির্দেশ দিলেন।

ইউজি জেনিনকে নিজের পিঠ থেকে নামানোর সময় যন্ত্রণায় নীল হয়ে গেল। জেনিনের পিঠের ক্ষত থেকে তখনো রক্ত ঝরছে। জেনিন অচৈতন্য অবস্থায় কেবল একটি শব্দ উচ্চারণ করার চেষ্টা করল, “নূরা…”। অন্যদিকে নোবারার পেটের ক্ষতটা বড্ড গভীর। মাহিতোর বিষাক্ত ছুরির আঘাত তার লিভারের খুব কাছে পৌঁছে গেছে। দুটি অপারেশন টেবিল পাশাপাশি রাখা হলো। মাঝখানে কাঁচের দেয়াল, কিন্তু দুজনেই একে অপরের খুব কাছে।

অপারেশন থিয়েটারের উজ্জ্বল নীল আলোয় ডাক্তাররা দ্রুত হাতে কাজ শুরু করলেন। জেনিনের শরীর থেকে একে একে তিনটি বুলেট বের করা হলো। জেনিনের শক্ত শরীরটা আজ ওষুধের প্রভাবে নিস্তেজ। ডাক্তার রহমান জেনিনের কাঁধের ক্ষত পরিষ্কার করতে করতে কেঁদে উঠলেন! হয়তো মাফিয়া জেড পৃথিবীর সবচেয়ে নিষ্ঠুর ব্যাক্তি, কিন্তু তিনি তো দেখেছেন সেই জেনিন নুরশাদ নামের কোমল মানুষটিকে, যে তাকে এবং তার পরিবার কে শত্রুদের হাত থেকে রক্ষা করতে নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে দিয়েছিল। এই জেনিনের প্রতি ওনার মায়ার শেষ নেই। তাই হয়তো আজ তিনিও জেনিন এই রক্তাক্ত নিথর দশা দেখে কান্না থামাতে পারেননি!

এদিকে নোবারার অবস্থা ছিল আরও আশঙ্কাজনক। তার প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। ইউজিকে বাইরে বসিয়ে রাখা হয়েছিল, কিন্তু সে দরজার কাঁচ দিয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল তার বসের দিকে। ইউজির মনে পড়ল সেই দিনগুলোর কথা, যখন জেনিন তাকে রাস্তা থেকে তুলে এনে নিজের ভাইয়ের মর্যাদা দিয়েছিল। আজ সেই ভাই তার জীবন বাজি রেখে বসকে মৃত্যুর মুখ থেকে ছিনিয়ে এনেছে। কিন্তু মৃত্যু কি জেনিনকে ছাড় দিবে?

ঘন্টার পর ঘন্টা পার হয়ে গেল। ভিলার বাইরে নীলিমা আর হালিমা বেগম তখনো অঝোরে কাঁদছেন, কিন্তু ইউজি কাউকে ভেতরে ঢোকার অনুমতি দেয়নি। ভিলার ভেতরে তখন কবরের নিস্তব্ধতা। ভোরের আলো যখন জানালার পর্দা ভেদ করে ভেতরে ঢুকার চেষ্টা করছে, তখন ডাক্তার রহমান ক্লান্ত হয়ে অপারেশন থিয়েটার থেকে বেরিয়ে এলেন। তার মুখমন্ডলে এক গভীর দুশ্চিন্তার রেখা।

ইউজি দ্রুত উঠে দাঁড়াল। “ডাক্তার! বস ঠিক আছে তো? ম্যাম কেমন আছেন?”

ডাক্তার রহমান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “বসের শরীর থেকে বুলেট বের করা হয়েছে, তিনি বিপদমুক্ত। কিন্তু ম্যাম… তার অবস্থা খুব সংকটজনক। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়েছে এবং ছুরিতে এক ধরণের নিউরোটক্সিন ছিল। আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি। এখন সবটাই নির্ভর করছে তাদের বাঁচার ইচ্ছার ওপর।”

***ঘন্টা পাঁচেক পর ইউজি টলতে টলতে জেনিনের কেবিনে ঢুকল। জেনিনের জ্ঞান ফিরেছে কিছুক্ষণ আগে। তার চোখ দুটো রক্তবর্ণ, ঠোঁট দুটো শুকিয়ে সাদা। জেনিন ইউজিকে দেখামাত্রই হাত ইশারায় কাছে ডাকল। জেনিনের গলার স্বর এতটাই ক্ষীণ যে ইউজিকে কান পেতে শুনতে হলো।

“নূরা… ও কোথায়?” জেনিনের চোখ দিয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ল।

ইউজি নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “বস, ম্যাম পাশের রুমেই আছেন। ডাক্তাররা চেষ্টা করছেন। আপনি শান্ত হোন।”

জেনিন হঠাৎ অমানুষিক শক্তি দিয়ে নিজের হাত থেকে স্যালাইনের নলটা টেনে খুলে ফেলল। ইউজি বাধা দেওয়ার চেষ্টা করল কিন্তু জেনিনের দুর্ধর্ষ জেদ তাকে থামিয়ে দিল। জেনিন টলতে টলতে বেড থেকে নেমে দাঁড়াল। তার পিঠের আর কাঁধের সেলাইগুলো ছিঁড়ে রক্ত বেরোতে শুরু করলো। কিন্তু জেনিন ভ্রুক্ষেপ করল না। সে কাঁচের দেয়াল ধরে ধরে পাশের রুমে পৌঁছাল, যেখানে নোবারা লাইফ সাপোর্টে শুয়ে আছে।

জেনিন কাঁচের ওপর হাত রাখল। ওপাশে তার নূরা, তার আন্ডারকাভার অফিসার, তার বাল্যকালের প্রেম…তার জীবন বাঁচাতে গিয়ে আজ মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে। জেনিন তার মাথার চুল দুহাতে টেনে ধরে ফ্লোরে বসে পড়লো! আজ তার বড় আফসোস হচ্ছে একজন সাধারণ মানুষ না হওয়ায়! আজ যেন তার পাপের শাস্তি একদিনেই চলে আসছে এবং তার কাছ থেকে সবকিছু কেড়ে নিচ্ছে এমনকি তার নূরাকেও!

ইউজি পেছনের দিকে দাঁড়িয়ে দেখল তার সেই অজেয় বস আজ এক সাধারণ প্রেমিকের মতো কাঁদছে। জেনিন কাঁচের ওপাশে থাকা নোবারার হাতটা ছুঁতে চাইল, কিন্তু মাঝখানে দুর্ভেদ্য দেয়াল। জেনিন সেখানেই মেঝেতে বসে পড়ল। তার শরীর দিয়ে তখনো গলগল করে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। অথচ মানুষটার ব্যাথা শরীরে নয়, তার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে! সবকিছু ঠিকঠাক হতে হতেই কেন আবার বিগড়ে যায়? কেন জীবন তার প্রতি এতোটা নিষ্ঠুর?

ভিলার গোপন চেম্বারে তখন দুই রক্তাক্ত আত্মার লড়াই চলছিল। জেনিন নূরশাদ, যে কিনা কোনোদিন হার মানেনি, সে আজ খোদার কাছে নিজের জীবনের বিনিময়ে তার নূরার জীবন ভিক্ষা চাইছে। ইউজি আহত অবস্থায় দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল, তার চোখেও আজ জল। মাহিতো এবং তার দলবল চিরতরে নিঃশেষ হয়ে গেছে, কিন্তু এই বিশাল বিজয়ের আনন্দ আজ নূরশাদ ভিলার বাতাসে নেই। আছে কেবল বেঁচে থাকার এক তীব্র আকুতি।

ডাক্তার রহমান আবার ভেতরে ঢুকলেন। নোবারার হার্ট রেট হঠাৎ করে বাড়তে শুরু করেছে…তার শরীরটা হঠাৎ বেঁকে যাচ্ছে! জেনিন কাঁচের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে রইল। সে জানে, তার নূরা তাকে একা রেখে যাবে না, যেতেই পারে না। এই দীর্ঘ যুদ্ধের পর, এই বিশ্বাসের ভাঙা-গড়ার খেলায় জয় কার হবে? সময়ের চাকায় নূরশাদ ভিলার ভাগ্য আজ এক সুতোয় ঝুলছে।

চলবে ইংশাআল্লাহ……💔

(আপনারা রেসপন্স করা কমিয়ে দিয়েছেন যে! আমার লেখার মান কি খারাপ লাগছে? বলুন না!☹️)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here