#Soulmate_to_Enemy |৬৬|
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম
রাঙামাটি, চট্টগ্রাম বিভাগ। নোবারার হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরা জেড লেখা লকেটটা যেন তাকে এক অলৌকিক জীবনীশক্তি জোগাচ্ছে। এক মাসের পাথরচাপা নীরবতা ভেঙে নোবারার চোখে আজ এক অস্থির সংকল্প। সে বারবার জানালার দিকে তাকাচ্ছে, যেন ওই পাহাড়ের ভাঁজেই লুকিয়ে আছে কোনো এক গভীর রহস্য।
নানামি গত রাত থেকে এক অদ্ভুত অস্থিরতায় ভুগছে। লকেটের খবরটা সে এখনো জানে না, কিন্তু নোবারার আচরণের পরিবর্তন তার নজর এড়ায়নি। সে বুঝতে পারছে, এই চার দেয়ালের মাঝে নোবারার এই গুমোট দমবন্ধ করা পরিবেশ তাকে তিলে তিলে আরও অসুস্থ করে দিচ্ছে। নানামি চায় নোবারাকে এই পরিবেশ থেকে দূরে নিয়ে যেতে, এমন এক জায়গায় যেখানে মেঘেদের ছোঁয়া আছে, যেখানে নীল আকাশ আর পাহাড়ের মিতালি মানুষের মনে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখায়।
নানামি তনুজাকে বারান্দায় ডেকে নিয়ে এল। তার হাতে সাজেকের কিছু ট্রাভেল ম্যাপ আর বুকিং ডিটেইলস।
“তনুজা, আমি চাই নোবারাকে নিয়ে আমরা সাজেক যাই। এই এক মাস ও এই বদ্ধ ঘরে কাটিয়েছে। সাজেকের ওই উন্মুক্ত প্রকৃতি হয়তো ওর মনের ওপর থেকে এই বিষাদের মেঘগুলো সরিয়ে দেবে,” নানামি খুব আশা নিয়ে বলল।
তনুজা কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে বলল,
“কিন্তু নানামি, ও কি রাজি হবে? আপনি তো জানেন ও আপনাকে কতটা ঘৃণা করছে!”
নানামি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“আমি ওর সামনে যাব না তনুজা। তুমি ওকে রাজি করাও। তুমিই তো ওর সবচাইতে কাছের মানুষ এখন। ওকে বুঝিয়ে বল যে এটা ওর অনাগত সন্তানের স্বাস্থ্যের জন্যও ভালো। পাহাড়ের ওই নির্মল বাতাস ওকে একটু শান্তি দেবে।”
তনুজা কিছুক্ষণ ভেবে মাথা নাড়ল। সে জানে নোবারার এই অবস্থায় একটু মানসিক পরিবর্তন খুব জরুরি। সে ধীর পায়ে নোবারার ঘরে ঢুকল।
নোবারা তখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে লকেটটা গলার চেইনে পরার চেষ্টা করছিল। তনুজাকে দেখে সে লকেটটা শাড়ির আঁচলের নিচে লুকিয়ে ফেলল। তনুজা সেটা খেয়াল করেও না দেখার ভান করল।
“একটা কথা বলি নোবারা?” তনুজা খুব আদুরে গলায় জিজ্ঞেস করল।
নোবারা উদাসীনভাবে তনুজার দিকে তাকাল। তনুজা ওর হাত দুটো নিজের হাতে নিয়ে বলল, “আমাদের তো এখানে দম আটকে আসছে রে। নানামি বলছিল কয়েক দিনের জন্য সাজেক থেকে ঘুরে আসতে। ওই মেঘেদের রাজ্যে কয়েকটা দিন কাটাতে পারলে তোমার মনটাও একটু হালকা হতো। আর ডাক্তার বলেছে, তোমার এই অবস্থায় খোলামেলা জায়গায় থাকা খুব দরকার।”
নোবারা সাজেকের নাম শুনে একটু থমকাল। সাজেক, যেখানে আকাশ পাহাড়ের গায়ে চুমু দেয়। জেনিন একবার বলেছিল তাকে সাজেক নিয়ে যাবে, মেঘেদের দেশে তারা একটা ঘর বানাবে! সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো কই?
নোবারা কিছুক্ষণ চুপ থেকে খুব ধীর স্বরে বলল, “নানামিও কি যাবে?”
তনুজা একটু ঘাবড়ে গেল,
“হ্যাঁ, ওনিই তো আমাদের ড্রাইভ করে নিয়ে যাবে। আসলে পাহাড়ি রাস্তা তো, ওনার মতো দক্ষ ড্রাইভার ছাড়া…”
নোবারা জানালার বাইরে কাপ্তাই লেকের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ঠিক আছে। আমি যাব। কিন্তু শর্ত একটাই, পুরো রাস্তায় ওনি যেন আমার সাথে একটাও কথা না বলে। ওনার কণ্ঠস্বর আমি সহ্য করতে পারি না।”
তনুজা হাফ ছেড়ে বাঁচল।
“ঠিক আছে বোন, আমি ওকে বলে দেব। ও কথা বলবে না। তুমি শুধু যাওয়ার জন্য তৈরি হও।”
সারাদিন ধরে বাংলোতে সাজেক যাওয়ার প্রস্তুতি চলতে লাগল। তনুজা পরম মমতায় নোবারার জন্য গরম কাপড়, কিছু দরকারি ওষুধ আর নোবারার পছন্দের কিছু বই ব্যাগে গুছিয়ে নিল। নোবারা নিজেই তার আলমারি থেকে একটা কালো রঙের শাল বের করল, এই শালটা জেনিনের খুব প্রিয় ছিল। সোনালী জরির কাজ করা এক অসম্ভব সুন্দর শাল। জেনিন বলতো, কালো রঙের পাশে সাদা আর পাশাপাশি সোনালী রংটা বড্ড বেশি মানায়!
নানামি বাইরে দাঁড়িয়ে সব আয়োজন তদারকি করছিল। সে জানত নোবারা রাজি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই ঘৃণা এখনো অটুট। তবুও সে খুশি যে অন্তত নোবারা এই ঘর থেকে বের হতে চাইছে। সে জিপ গাড়িটা চেক করিয়ে নিল, পাহাড়ি রাস্তার চড়াই-উতরাই পাড়ি দেওয়ার জন্য সব ধরণের প্রস্তুতি সম্পন্ন করল।
সূর্য যখন পাহাড়ের আড়ালে ঢলে পড়ছে, নোবারা তখন বারান্দায় এসে দাঁড়াল। সে লকেটটা শাড়ির ওপর দিয়ে একবার ছুঁয়ে দেখল। তার মনে হচ্ছে, এই যাত্রায় সে একা যাচ্ছে না।
“তৈরি তো?” তনুজা পেছন থেকে এসে ডাকল।
নোবারা শুধু মাথা নাড়ল।
নানামি ড্রাইভিং সিটে বসে আয়নায় নোবারার প্রতিচ্ছবি দেখল। নোবারার নিরাসক্ত শীতল চাহনি তাকে মনে করিয়ে দিল, মেঘের দেশে গেলেও জেনিন নূরশাদের স্মৃতি তাদের পিছু ছাড়বে না!
রাঙামাটি থেকে সাজেকের পথটা যেন কোনো এক দক্ষ শিল্পীর আঁকা ক্যানভাস। খাগড়াছড়ির আঁকাবাঁকা পাহাড়ী রাস্তা আর চারপাশের ঘন সবুজ বনানীর বুক চিরে যখন নানামির জিপ গাড়িটা এগোচ্ছিল, তখন বাতাসের ঝাপটায় নোবারার উষ্কখুষ্ক চুলগুলো অবাধ্য হয়ে উড়ছিল। সাজেকের উপত্যকায় পা রাখতেই মনে হলো পৃথিবীটা একদম বদলে গেছে। চারদিকে পাহাড়ের সারি, আর সেই পাহাড়ের বুক ঘেঁষে ভেসে বেড়াচ্ছে সাদা তুলোর মতো মেঘ। কখনো সেই মেঘ জানালার ফাঁক দিয়ে গাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ছে, আবার কখনো চারপাশটা ঘন কুয়াশায় ঢেকে দিচ্ছে।
সাজেকের রুইলুই পাড়ার একটি উঁচু রিসোর্টে নানামি আগে থেকেই ঘর বুক করে রেখেছিল। রিসোর্টের বারান্দা থেকে দাঁড়ালে মনে হয় আকাশটা হাতের নাগালে। নিচে দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে মিজোরামের সীমান্ত রেখা।
নানামি আর তনুজার রসায়নটা এই পাহাড়ি পরিবেশে এক নতুন মাত্রা পেয়েছে। জেনিনকে মারার পর থেকে নানামি যে মানসিক অস্থিরতায় ভুগছিল, তনুজা তার সেই ক্ষতগুলো সারিয়ে তুলেছে অগাধ ধৈর্য আর ভালোবাসা দিয়ে। নানামি এখন বুঝতে পেরেছে, এই অনিশ্চিত জীবনে তনুজাই তার একমাত্র ধ্রুবতারা। নোবারা তার সামনে থাকা সত্ত্বেও, নানামির সমস্ত মনোযোগ এখন তনুজার দিকে। সে তনুজাকে এখন আর কেবল দায়িত্বের খাতিরে নয়, বরং তার হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দন দিয়ে নিজের স্ত্রী হিসেবে মেনে নিয়েছে।
রিসোর্টের বারান্দায় তনুজা দাঁড়িয়ে ছিল, পরনে একটা গাঢ় লাল রঙের চাদর। নানামি পেছন থেকে এসে তনুজার কোমরে হাত দিয়ে তাকে নিজের দিকে টেনে নিল। তনুজা একটু লজ্জা পেয়ে নোবারার ঘরের দিকে তাকাল, কিন্তু নানামি ভ্রুক্ষেপ করল না। সে তনুজার কাঁধে মুখ রেখে ফিসফিস করে বলল,
“জানো তনুজা, এই মেঘগুলো যেমন পাহাড়কে জড়িয়ে ধরে আছে, আমারও আজ তোমাকে সেভাবে জাপ্টে ধরে থাকতে ইচ্ছে করছে। অনেক যন্ত্রণার পর আজ একটু শান্তি পাচ্ছি।”
তনুজা হেসে ফেলল, তার গালে এক চিলতে লাজুক আভা ফুটে উঠল। সে নানামির হাতের ওপর নিজের হাত রেখে বলল,
“পাহাড় মানুষকে অনেক রোমান্টিক করে দেয়, তাই না? কিন্তু নোবারা আমাদের এভাবে দেখলে কষ্ট পাবে না তো?”
নানামি তনুজার কপালে একটা হালকা চুমু খেয়ে বলল, “নোবারা তার নিজের স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছে তনুজা। আমি চাই না আমার করুণা ওকে আরও ছোট করুক। আমি ওকে সবটুকু নিরাপত্তা দেব, কিন্তু আমার ভালোবাসাটা এখন শুধু তোমারই প্রাপ্য।”
তাদের এই নিভৃত প্রেমালাপ নোবারার কানে পৌঁছাল কি না জানা নেই, তবে নোবারা তখন তার নিজের ঘরের বারান্দায় এক কোণে বসে ছিল। তার পরনে সেই কালো শাল। সাজেকের এই মেঘাচ্ছন্ন দুপুরে সে মেঘের আসা-যাওয়া দেখছিল। সে দেখল কীভাবে মেঘগুলো পাহাড়কে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে আবার কিছুক্ষণ পর উধাও হয়ে যায়। ঠিক জেনিনের মতো। জেনিনও তার জীবনে মেঘ হয়ে এসেছিল, তাকে ভালোবাসায় ভিজিয়ে দিয়ে এখন সে অদৃশ্য!
বিকেলের দিকে নানামি আর তনুজা নোবারাকে নিয়ে হেলিপ্যাডের দিকে হাঁটতে বের হলো। পাহাড়ের চড়াই-উতরাই পথে নানামি তনুজার হাত শক্ত করে ধরে আছে, তাকে সাবধানে পথ চলতে সাহায্য করছে। তাদের এই সুখী দাম্পত্যের ছবিটা সাজেকের মেঘের রাজ্যে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য তৈরি করেছে। একদিকে পূর্ণতার আনন্দ, অন্যদিকে নোবারার শূন্যতার হাহাকার।
হেলিপ্যাডে পৌঁছাতেই চারপাশটা সোনালী আলোয় ভরে গেল। সূর্যাস্তের সেই মুহূর্তটা ছিল জাদুকরী। তনুজা উত্তেজনায় নানামির হাত ধরে লাফাচ্ছিল, “দেখুন! ওই পাহাড়টার গায়ে সূর্যটা কেমন মিশে যাচ্ছে!” নানামি হাসিমুখে তনুজার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। সে সূর্যের চেয়েও বেশি উজ্জ্বল আলো দেখছিল তনুজার হাসিতে।
নোবারা একটু দূরে একটা পাথরের ওপর বসল। সে দেখল এক দম্পতি পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, ছেলেটি মেয়েটির ছবি তুলে দিচ্ছে। দৃশ্যটা দেখে নোবারার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। একদিন এই সাজেকে সে আর জেনিনও এভাবে আসতে পারত। জেনিন হয়তো তাকে নিয়ে পাহাড়ি গান গাইত, কিংবা নোবারার জেদ পূরণ করতে তাকে মেঘের রাজ্য থেকে তারা পেড়ে এনে দিত! লোকটাকে তো কখনো বিশ্বাস করাই যেত না, এতো জেদী!
হঠাৎ এক ঝাপটা ঠান্ডা বাতাস নোবারার শরীর দিয়ে বয়ে গেল। বাতাসের সাথে সাথে এক অতি পরিচিত ঘ্রাণ তার নাকে এল। সেই একই সুগন্ধ, যা সে রাঙামাটিতে প্রতি রাতে অনুভব করে!
নোবারা দ্রুত চারদিকে তাকাল। পর্যটকদের ভিড়ের মাঝে সে একজনকে দেখতে পেল, কালো হুডি পরা এক দীর্ঘদেহী মানুষ, যে পাহাড়ের একদম কিনারে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।
নোবারার হৃদপিণ্ডটা সজোরে ধকধক করে উঠল। সে বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। নানামি আর তনুজা তখন ছবি তোলায় ব্যস্ত। নোবারা টলমলে পায়ে সেই কালো হুডি পরা মানুষটার দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। তার পায়ের নিচের ঘাসগুলো কুয়াশায় ভেজা। সে যতই এগোচ্ছে, সেই সুঘ্রাণটা ততই তীব্র হচ্ছে।
“জে…জে..জেনিন?” নোবারা খুব নিচু স্বরে ডাকল।
মানুষটি নড়ল না। নোবারার চোখ দিয়ে জল পড়তে শুরু করল। সে হাত বাড়িয়ে লোকটির জ্যাকেট ধরতে গেল, ঠিক সেই মুহূর্তেই এক বিশাল মেঘের স্তূপ তাদের মাঝখানে এসে দাঁড়াল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য নোবারা কিছুই দেখতে পেল না।
মেঘটা সরে যেতেই নোবারা দেখল সেখানে কেউ নেই। শুধু পাহাড়ের ঢাল আর কুয়াশা। নোবারা পাগলের মতো চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু তার গলা দিয়ে কোনো স্বর বের হলো না। সে মেঝের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।
নানামি আর তনুজা নোবারাকে ওভাবে পড়ে থাকতে দেখে দৌড়ে এল।
“নোবারা! কী হয়েছে? তুমি কাঁদছ কেন?” তনুজা ওকে জড়িয়ে ধরল।
নোবারা নানামির দিকে তাকাল। নানামির সুখী মুখটা দেখে নোবারার ঘৃণা আবার ফেটে পড়ল। সে নানামির হাত ঝটকা দিয়ে সরিয়ে দিল।
“ছুঁবেন না আমাকে! আপনি কেবল ধ্বংস করতে জানেন! খু’নি আপনি। নিজের বন্ধুর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে কত সুখে আছেন। নির্লজ্জ আপনি।”
নানামি স্তব্ধ হয়ে গেল। তনুজা নোবারাকে শান্ত করার চেষ্টা করল, কিন্তু নোবারা তখন উন্মাদিনীর মতো হাসছে। সে জানে, সে পাগল হয়ে যায়নি। সে জানে, এই সাজেকের মেঘের আড়ালে জেনিন নুরশাদ তাকে পাহারা দিচ্ছে। নানামি তনুজাকে নিয়ে সুখী হতে পারে, কিন্তু জেনিন নুরশাদ মরার পরেও নোবারার প্রতিটি নিশ্বাসে রাজত্ব করছে।
সাজেকের রাত নামল। কানজং রিসোর্টের বারান্দায় নানামি আর তনুজা কফির কাপ হাতে একে অপরের খুব কাছে বসে আকাশের তারা দেখছিল। তাদের জীবনে এখন বসন্ত। আর ওদিকে নিজের ঘরে নোবারা তার অনাগত সন্তানের সাথে কথা বলছিল,
“দেখো মাম্মমম, তোমার পাপা আমাদের সাথেই আছে। এই মেঘের দেশে ও আমাদের খুঁজতে এসেছে।”
নানামি আর তনুজা পাশের ঘরে অনেক আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে। পাহাড়ের এই ক্লান্তিকর ভ্রমণে শরীর এলিয়ে দিতেই তারা গভীর তন্দ্রায় আচ্ছন্ন। কিন্তু নোবারার চোখে আজ ঘুম নেই। সে তার ঘরের বারান্দার ইজি চেয়ারটায় বসে আছে। গায়ে সেই কালো শালটা জড়ানো, যা এখন তার একমাত্র বর্ম।
নোবারার হাতে সেই লকেটটা। সে লকেটটি আগুনের আলোর মতো ম্লান চাঁদের আলোয় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছে। তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বারবার বলছে, আজ রাতে কিছু একটা ঘটবে। সাজেকের এই মেঘগুলো শুধু জলকণা নয়, এরা যেন একেকটা বার্তাবাহক!
ঠিক রাত আড়াইটে। ঘরের কোণে রাখা একটা মোমবাতি হঠাৎ ফুঁ দিয়ে নেভানোর মতো নিভে গেল। নোবারা চমকে উঠল না, বরং তার মেরুদণ্ড দিয়ে এক শীতল স্রোত বয়ে গেল। সে অনুভব করল তার ঘরের পেছনের জানালাটা, যা সে অনেক আগেই বন্ধ করে রেখেছিল, তা ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছে। কাঠের পাল্লার সেই পরিচিত ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দটা আজ যেন কোনো পরিচিত সুরের মতো শোনাল।
নোবারা চেয়ার ছেড়ে উঠল না। সে শুধু তার পিঠের পেছনে কারো ভারী নিশ্বাসের শব্দ শুনতে পেল। সেই একই তীব্র সুঘ্রাণ, যা তাকে মুহূর্তের মধ্যে অবশ করে দেয়।
“আপনি এসেছেন?” নোবারা খুব নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল। তার কণ্ঠে কোনো ভয় নেই, আছে এক বুক হাহাকার আর পরম তৃপ্তি।
পেছন থেকে কোনো উত্তর এল না। শুধু একটা ছায়া ধীরে ধীরে তার ওপর দিয়ে মেঝেতে লম্বা হয়ে পড়ল। নোবারা সাহস সঞ্চয় করে ঘুরে দাঁড়াল। অন্ধকারে মানুষটির অবয়ব অস্পষ্ট, কেবল দীর্ঘদেহী এক কাঠামো। তার মুখে সেই একই কালো মাস্ক আর মাথায় হুডি। কেবল একজোড়া চোখ, যা অন্ধকারের মাঝেও নক্ষত্রের মতো জ্বলছে। সেই চোখে রাগ নেই, ঘৃণা নেই; আছে কেবল এক অসীম মায়া আর নাম না জানা এক হাহাকার।
নোবারা এক পা এগিয়ে গেল।
“কেন আপনি এভাবে লুকোচুরি করছেন? যদি আপনি আমার জেনিন হন, তবে কেন আমাকে এই যন্ত্রণার মাঝে ফেলে রেখেছেন? আর যদি আপনি অন্য কেউ হন, তবে কেন প্রতি রাতে আমার ঘুমের পাহারা দেন?”
ছায়ামানবটি এবারও নীরব। সে তার পকেট থেকে একটা ছোট হাতপাখা বের করল। এটি বাঁশ আর শোলার তৈরি একটা সাধারণ পাহাড়ি পাখা, কিন্তু এর গায়ে নিখুঁত নকশায় দুটি পাখির ছবি আঁকা, একটি উড়ছে, অন্যটি ডালে বসে তার পথ চেয়ে আছে। সে পাখাটি নোবারার হাতের তালুর ওপর রাখল।
নোবারার আঙুলগুলো ছায়ামানবটির হাতের স্পর্শ পেল। সেই স্পর্শটা বড্ড পরিচিত। সেই রুক্ষ কিন্তু উষ্ণ হাতের তালু, যার স্মৃতি নোবারার মস্তিষ্কের কোষে কোষে খোদাই করা। নোবারা হঠাৎ লোকটির হুডিটা টেনে সরাতে চাইল। সে দেখতে চায় এই ছায়ার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সেই মুখটি।
কিন্তু ছায়ামানবটি অত্যন্ত ক্ষিপ্রতায় নোবারার কবজি ধরে ফেলল। তার হাতের চাপটা বড্ড নিয়ন্ত্রিত, কিন্তু তাতে এক ধরণের আদেশ ছিল, ‘এখনো সময় হয়নি’। সে নোবারাকে আলতো করে ইজি চেয়ারে বসিয়ে দিল।
নোবারার চোখে জল চলে এল।
“আপনি কি জানেন? আমি মা হতে চলেছি। আপনার রক্ত আমার ভেতরে বড় হচ্ছে। আপনি কি একবারও আপনার সন্তানকে স্পর্শ করবেন না?”
ছায়ামানবটির শরীরটা এক মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠল। তার সেই দীর্ঘদেহী কাঠামোটা যেন এক মুহূর্তের জন্য নুয়ে পড়ল। সে ধীরপায়ে নোবারার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। সে কোনো কথা বলল না, কেবল নোবারার পেটের ওপর তার বড় হাতটি রাখল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য সাজেকের পুরো প্রকৃতি স্তব্ধ হয়ে গেল যেন! নোবারা অনুভব করল, তার গর্ভের সন্তানটি যেন সেই স্পর্শে সাড়া দিচ্ছে। এক অদ্ভুত প্রশান্তি নোবারার পুরো সত্তাকে গ্রাস করল।
ছায়ামানবটি এবার দ্রুত জানালার দিকে এগিয়ে গেল। নোবারা তাকে আটকানোর চেষ্টা করল না। সে জানে, এই মানুষটিকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ধরে রাখা সম্ভব নয়।
“আপনার কি কোনো নাম নেই?” নোবারা শেষবারের মতো জিজ্ঞেস করল।
জানালার কাছে গিয়ে মানুষটি একবার থামল। সে পেছনে না তাকিয়েই খুব ঘড়ঘড়ে, ফ্যাসফ্যাসে এক স্বরে বলল, যা সম্ভবত তার আসল কণ্ঠস্বর নয়, “নামে কী আসে যায় নূরা? আমি কেবল ছায়ামানব। সূর্যের আলোয় আমাকে পাবে না, কিন্তু তোমার জীবনের প্রতিটা অন্ধকার রাতে আমি থাকব।”
মানুষটি জানালার কার্নিশে হাত রেখে যেমন আচমকা এসেছিল, ঠিক তেমনি হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম করল। তাকে এভাবে আবার কুয়াশার মাঝে বিলীন হয়ে যেতে দেখে নোবারার ভেতরের সবটুকু ধৈর্য বাঁধ ভাঙল। সে কোনোমতেই এই ছায়াকে আজ হাতছাড়া করতে চায় না। নোবারা মরিয়া হয়ে বুক চেরা এক চিৎকার দেওয়ার জন্য মুখ খুলল, “তনুওওও”
“তুমি যদি আর একটা শব্দও উচ্চারণ করো, তবে আমি ঠিক এই মুহূর্তে তোমার ওই অবাধ্য ঠোঁট দুটো নিজের দখলে নিয়ে নেব। চুপ!”
ছায়ামানবটি বিদ্যুৎগতিতে ঘুরে দাঁড়িয়ে এক লাফে নোবারার একদম কাছে চলে এলো। তার কণ্ঠস্বর এবার আর সেই কৃত্রিম ঘড়ঘড়ে রইল না,বরং সেখানে ক্ষণিকের জন্য চেনা রাজত্ব আর চেনা জেদটা ঠিকরে বের হলো। তার দু-চোখের চাউনি ঘরের অন্ধকারকেও যেন পুড়িয়ে দিচ্ছে।
নোবারা থমকে গেল না, বরং তার জেদ আরও চড়া হলো। এই লোকটার এই চেনা হুকুম শোনার জন্যই তো তার আত্মাটা এতদিন হাহাকার করছিল! সে লোকটাকে আরও একটু উসকে দিতে, আরও একটু শাস্তি দিতে নিজের সর্বশক্তি দিয়ে এবার দ্বিগুণ জোরে চিৎকার করতে গেল, “তন..”
কিন্তু তার মুখের সম্পূর্ণ শব্দটা বাতাসে ডানা মেলার আগেই চারপাশটা স্তব্ধ হয়ে গেল!
ছায়ামানবটি এক ঝটকায় নোবারার কোমর জড়িয়ে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিল। নোবারার চোখের পাতা জোড়া ভয়ে আর তীব্র আবেগে আপনাআপনি বুজে এলো। ঠিক পরমুহূর্তেই, নোবারার কাঁপতে থাকা ওষ্ঠাধরের ওপর নেমে এলো এক গভীর, গাঢ় আর তৃষ্ণার্ত স্পর্শ। এক তীব্র ভালোবাসার আবেশে ছায়ামানবটি নোবারার ঠোঁটের অবাধ্যতাকে নিজের ঠোঁটের বন্ধনে বন্দি করে নিল। এই ছোঁয়া নোবারার বড্ড চেনা! এই চন্দন আর তামাকের মিশ্রিত ওম, এই চেনা ঠোঁটের স্পর্শে নোবারার অবশ শরীরটা যেন এক লহমায় অবাধ্য এক জীবনীশক্তি ফিরে পেল। তার দু-হাত খুজে নিতে চাইল সেই চওড়া পিঠ।
কয়েক সেকেন্ডের অলৌকিক মায়াজাল ছিন্ন করে ছায়ামানবটি আলতো করে নোবারাকে ছেড়ে দিল। নোবারা তখনো এক ঘোরলাগা আচ্ছন্নতায় চোখ বন্ধ করে হাঁপাচ্ছে।
চলে যাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে, ছায়ামানবটি তার ডান হাতের তর্জনী দিয়ে নোবারার কপালে আলতো করে একটা ঠোকা মারল। ঠিক যেভাবে অতীতে এক জেদি মানুষ নোবারার পাগলামি দেখলে পরম আদরে কপালে টোকা দিয়ে তাকে শাসন করতো! অন্ধকারের মাঝেই ফিসফিস করে একটি চেনা সুর ভেসে এলো, “অলওয়েজ অ্যা স্টুপিড!”
নোবারা চোখ মেলেই দেখল জানালাটা খোলা, পাহাড়ি ঠান্ডা বাতাস ঘরের পর্দাগুলোকে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সেখানে আর কেউ নেই। আছে শুধু নোবারার ঠোঁটে লেগে থাকা এক উষ্ণ স্পন্দন আর কপালে সেই ভালোবাসার আলতো ছোঁয়া।
নোবারা এবার আর কাঁদল না, তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিজয়ের মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল। সে হাত দিয়ে নিজের ঠোঁট দুটো ছুঁয়ে দেখল, তারপর পেটে হাত রেখে বিড়বিড় করে বলল,
“দেখেছ মাম্মাম? তোমার পাপা এখনো ঠিক আগের মতোই একগুঁয়ে আছে!”
চলবে ইংশাআল্লাহ…….
(নোট: গল্পে প্রতিদিন ২.৫k এর উপর ভিউজ আসছে! সাইলেন্ট রিডাররা এভাবে রেসপন্স না করে গল্প পড়বেন না প্লিজ। একটা রিয়েক্ট দিতে তো এক সেকেন্ড ও সময় লাগেনা! মন্তব্য নাই করলেন নাহয়!)
(আর আমার পাঠকবিচ্ছুরা, আজকে একই দিনে দুটো পর্ব দিয়েছি দেখেছেন? আশা করি আপনাদের গঠনমূলক মন্তব্য বা সমালোচনা পাবো। আমি গল্প লিখি শখের বশে! ভার্সিটির ক্লাস শুরু হতে আরো মাসখানেক আছে। তাই দিনরাত কেবল গল্পই লিখি। আমি এটুকু আশা করবো, আপনারা যথারীতি রিয়েক্ট এবং কমেন্ট করবেন। আমাকে লেখার জন্য উৎসাহিত করবেন, নিরাশ নয়!🩷)

