Soulmate_to_Enemy |৬৮| লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম

0
2

#Soulmate_to_Enemy |৬৮|
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম

রাঙামাটির বাংলোর পুব দিকের বারান্দায় একটা বেতের চেয়ারে আধশোয়া হয়ে বসে আছে নোবারা। তার কোলে রাখা জেনিনের কালো রঙের শালটা। গত কয়েকদিন ধরে সে এই শালটাকে নিজের কাছ থেকে এক মুহূর্তের জন্যও সরাচ্ছে না। এর প্রতিটি সুতোর ভাঁজে ভাঁজে এখনো জেনিনের সেই আভিজাত্যমাখা ঘ্রাণ লেগে আছে, যা নোবারার অস্তিত্বকে টিকিয়ে রেখেছে।

নোবারার শরীরের পরিবর্তন এখন স্পষ্ট। তার পেটটা একটু উঁচু হয়েছে, যা তার পরনের ঢিলেঢালা সাদা সালোয়ার কামিজের ওপর দিয়েও বোঝা যাচ্ছে। সে আলতো করে নিজের পেটের ওপর হাত রাখল। এই স্পর্শে এখন আর কেবল নিজের চামড়ার অনুভূতি নেই, আছে এক নতুন স্পন্দনের ছোঁয়া।

“শুনছো সোনামণি?” নোবারা খুব নিচু স্বরে, প্রায় ফিসফিস করে বলল। “আজকের সকালটা দেখেছো? ওই দেখো, পাহাড়ের গায়ে মেঘগুলো কেমন তোমার পাপার মতো জেদ করে আটকে আছে। ঠিক তোমার পাপার মতোই অকাল্ট, কারো কথা শোনে না।”

নোবারার ঠোঁটে এক বিষণ্ণ হাসি ফুটে উঠল। সে জানালার বাইরে দিগন্ত বিস্তৃত পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখদুটো জলে ছলছল করছে। এই মুহূর্তে সে জেনিন নূরশাদকে এতটাই মিস করছে যে, তার মনে হচ্ছে বুকের ভেতরটা কোনো এক অদৃশ্য করাত দিয়ে কেউ চিরে ফেলছে। জেনিন থাকলে আজ দৃশ্যটা অন্যরকম হতো। জেনিন হয়তো নোবারার পাশে হাঁটু গেড়ে বসত, তার পেটে কান পেতে শুনত অনাগত সন্তানের হৃদস্পন্দন। হয়তো জেনিন তার সেই গম্ভীর গলায় বলত,
“নূরা, আমাদের বাচ্চাটা যেন একদম আপনার মতো জেদী না হয়, আমার তো একজন নূরাকে সামলাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে!”

নোবারা নিজের চোখের জল মুছে নিল। সে এখন আর আগের মতো দুর্বল হতে চায় না। সে জানে, এই বাচ্চাটিই এখন তার একমাত্র সম্বল, জেনিনের রেখে যাওয়া শ্রেষ্ঠ উপহার।

“জানো বাবু,” নোবারা আবার কথা বলতে শুরু করল। “তোমার পাপা খুব অদ্ভুত মানুষ ছিলেন। সবাই তাকে ভয় পেত, সবাই তাকে ঘৃণা করত। কিন্তু আমি জানি, ওই পাথরের মতো মানুষটার ভেতরে এক মহাসমুদ্রের মতো ভালোবাসা ছিল। সে আমায় আগলে রাখত সব বিপদ থেকে। অথচ দেখো, আজ যখন তাকে আমার সবচাইতে বেশি দরকার, তখন সে এক রহস্যময় ছায়া হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।”

নোবারা তার গলার লকেটটা বের করল। লকেটটা সূর্যের আলোয় চিকচিক করছে।

বারান্দায় বাতাসের বেগ বাড়ল। নোবারা চাদরটা আরও ভালো করে জড়িয়ে নিল। তার মনে পড়ছে সেই কর্ণফুলী ব্রিজের রাতের কথা। জেনিনের সেই রক্তাক্ত নিথর দেহ। কিন্তু প্রতি রাতে যে ছায়ামানবটি তার ঘরে আসে, তার স্পর্শে নোবারা বুঝতে পারে, জেনিন মরেনি। জেনিন মরে যেতে পারে না। জেনিন নুরশাদ হারতে শেখেনি।

“আমি তোমার পাপাকে খুব ঘৃণা করতে চেয়েছিলাম” নোবারা পেটের ওপর হাত বোলাতে বোলাতে বলল। “সে তো অপরাধী ছিল, তাই না? আমি তো সিআইডি অফিসার ছিলাম। আমাদের তো একসাথে থাকার কথাই ছিল না। কিন্তু ভালোবাসা কি আর পরিচয় দেখে আসে? আমি ওর ওই রাগী চোখের আড়ালে এক অসহায় শিশুকে দেখেছিলাম। আজ তুমি যখন আমার ভেতরে নড়াচড়া করো, আমি বুঝতে পারি, সেদিন আমি ভুল করিনি। আমি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পুরুষটাকেই ভালোবেসেছিলাম।”

নোবারা হঠাৎ থেমে গেল। তার নাকে সেই পরিচিত সুঘ্রাণটা এল, খুব সামান্য, যেন বাতাসের সাথে ভেসে আসা কোনো স্মৃতির কণা। সে দ্রুত চারপাশে তাকাল। কেউ নেই। নানামি আর তনুজা বাজারে গেছে, পুরো বাড়ি ফাঁকা। নোবারা আবার শান্ত হয়ে বসল।

“তুমি কি জানো মাম্মাম, তোমার পাপা তোমাকে অনেক বড় করবে। সে তোমাকে শেখাবে কীভাবে ঝড়ের বিপরীতে দাঁড়াতে হয়। তবে আমি চাই না তুমি তোমার পাপার মতো হও। আমি চাই তুমি খুব শান্ত হও। তোমার পাপার ওই অশান্ত আত্মাটা যেন তোমার ভেতর দিয়ে একটু শান্তি পায়।”

নোবারার দু চোখ দিয়ে এবার অবিরত জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। সে ডুকরে কেঁদে উঠল।
“জেনিন… আপনি কোথায়? আপনি কি একবারও আসবেন না? আপনি কি জানেন আমার কতটা কষ্ট হচ্ছে আপনাকে ছাড়া? আমি আর পারছি না!”

নোবারা তার নিজের পেটের ওপর মাথা নামিয়ে আনল। সে যেন তার সন্তানের সাথেই জেনিনকে খুঁজছে। “আমি জানি ওনি ফিরে আসবেন। ওনি মেঘ হয়ে আসুক, কিংবা কুয়াশা হয়ে, ওনি আসবেই। আর যেদিন আসবে, সেদিন আমি তাকে অনেক বকব। তাকে বলব, কেন আমাদের এভাবে একা ফেলে গেলেন?”

রাঙামাটির এই নির্জন বাংলোর বারান্দায় এক হবু মায়ের এই একাকী বিরহ যেন পাহাড়ের গায়ে প্রতিধ্বনি তুলছে। নোবারা এখন আর সিআইডি অফিসার নয়, সে কেবল এক বিরহী নারী, যে তার মৃতপ্রায় ভালোবাসাকে একটি নতুন প্রাণের মাঝে পুনর্জীবিত করার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। জেনিন নূরশাদ তার জীবনের সূর্য ছিল, আর সেই সূর্যের অনুপস্থিতিতে সে এখন জোছনা হয়ে তার সন্তানকে আগলে রাখছে।

নোবারা জানালার দিকে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে শেষবারের মতো বলল,
“আসবেন তো জেনিন? আপনার নূরার জন্য না হলেও, আপনার সন্তানের জন্য কি একবারও সামনে আসবেন না?”

বাতাস যেন উত্তর দিল এক শীতল পরশে। নোবারা চোখ বন্ধ করল। সে অনুভব করল, জেনিন খুব কাছেই আছে। কোনো এক কুয়াশার আড়ালে দাঁড়িয়ে সেও হয়তো শুনছে তার প্রিয়তমা স্ত্রীর এই করুণ আকুতি। নোবারা শান্তিতে একটু ঘুমিয়ে পড়ল, তার হাতটা তখনো তার গর্ভের ওপর পরম মমতায় রাখা।

কিন্তু নোবারা যখন আধো-তন্দ্রার ঘোরে জেনিনের কথা ভাবছিল, ঠিক তখনই বাংলোর কাঠের সিড়িতে কারোর পরিচিত জুতো মসমস শব্দ শোনা গেল। এই হাঁটার ছন্দ নানামির নয়, আর তনুজার পায়ের শব্দ অনেক বেশি হালকা। নোবারা চোখ না খুলেই অনুভব করতে পারল, কেউ একজন বারান্দার দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। বাতাসে এক চিমটি বারুদ আর পারফিউমের সেই পুরনো মিশ্রণ, যা কেবল জেনিনের খুব কাছের মানুষদের শরীর থেকেই পাওয়া যায়!

নোবারা ধীরলয়ে চোখ মেলল। সামনে তাকিয়েই তার বুকটা ধক করে উঠল। দরজায় দাঁড়িয়ে আছে মায়া। তবে আগের সেই রূঢ়, পেশাদার মায়া নয়। আজ মায়ার চোখেমুখে এক অন্যরকম প্রশান্তি আর গভীর মমতা। তার পরনে কালো লেদার জ্যাকেট আর জিন্স, চোখে চশমা। সে হাতের একটা বড় কাগজের প্যাকেট শক্ত করে ধরে আছে।

“ম্যাম…” মায়া খুব নিচু স্বরে ডাকল।

নোবারার ঠোঁটে এক টুকরো ম্লান হাসি ফুটে উঠল। “মায়া? তুমি এখানে? নানামি তোমাকে ঢুকতে দিল?”

মায়া পা টিপে টিপে নোবারার সামনে এসে বসল। সে চারপাশে একবার দেখে নিয়ে গলা আরও নিচু করল। “ইন্সপেক্টর নানামিকে ম্যানেজ করা এখন আর কঠিন কাজ নয় ম্যাম। তাছাড়া তনুজা আমাকে সাহায্য করেছেন। তিনি জানেন, আপনার এই মুহূর্তে কার সঙ্গ সবচাইতে বেশি দরকার।”

মায়া নোবারার হাতের ওপর নিজের হাত রাখল। তারপর তার দৃষ্টি গেল নোবারার স্ফীত পেটের দিকে। মায়ার চোখের মণি মুহূর্তের জন্য উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে এক ঝটকায় হাঁটু গেড়ে নোবারার সামনে বসল।

“ম্যাম! এটা কি সত্যি? আমি যা শুনছি…” মায়ার কণ্ঠে এক ধরণের অবিশ্বাসে ভরা আনন্দ।

নোবারা মাথা নাড়ল। সে মায়ার হাতটা নিয়ে নিজের পেটের ওপর রাখল।
“হ্যাঁ মায়া। জেনিনের শেষ চিহ্ন। ওর আমানত।”

মায়া যেন বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। সে স্থির হয়ে বসে রইল কিছুক্ষণ। তারপর তার গাল বেয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল।
“বস… বস যদি আজ থাকতেন! ওনার চেয়ে খুশি বোধহয় এই পৃথিবীর কেউ হতে পারত না!”

মায়া তার সাথে আনা প্যাকেটটা খুলল। ভেতর থেকে বের করল ছোট ছোট কিছু মোজা, একটা নীল রঙের নরম কম্বল আর জেনিনের পরিচিত ব্র্যান্ডের কিছু ডার্ক চকলেট।

“এসব কী মায়া?” নোবারা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।

“এগুলো আমি আনিনি ম্যাম,” মায়া রহস্যময় চোখে তাকাল। “এগুলো ইউজি ভাই পাঠিয়েছেন। আসলে… ওনার পক্ষ থেকেই এগুলো এসেছে।”

ওনার পক্ষ থেকে শব্দটা শোনামাত্রই নোবারার সারা শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠল। সে মায়ার হাত শক্ত করে ধরল।
“মায়া, সত্যি করে বলো তো, জেনিন কি বেঁচে আছে? ওই ছায়ামানবটা কি জেনিন? তুমি জানো মায়া, আমি জানি তুমি জানো!”

মায়া এক মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে গেল। সে জানালার বাইরের পাহাড়গুলোর দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“ম্যাম, আমি কেবল এটুকুই বলতে পারি, জেনিন নূরশাদ কোনোদিন হারতে শেখেননি। তিনি কর্ণফুলীর জলে তলিয়ে যেতে পারেন না। জেনিন বস একটা আগ্নেয়গিরি, যা নিভে গেলেও তার ছাইয়ের নিচে আগুন থাকে। আপনি যে ছায়াকে দেখছেন, সে আপনারই ছায়া। সে আপনার থেকে দূরে যাবে কোথায়?”

নোবারা ডুকরে কেঁদে উঠল। সে মায়ার কাঁধে মাথা রাখল। “ও কেন সামনে আসছে না? ও কেন আমাকে এভাবে তিলে তিলে মারছে? আমি কি ওর ওপর কোনোদিন রাগ করেছি? আমি তো শুধু চেয়েছিলাম ও সুস্থ থাক।”

মায়া নোবারার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। “সময় ম্যাম… সময়ের একটা খেলা আছে। পুলিশ, সিআইডি, র‍্যাব, সবাই এখন ওই সিংহের খোঁজে আছে। সে যদি এখন সামনে আসে, তবে কেবল সে একা মরবে না, আপনাদের এই অনাগত সন্তানকেও বিপদে ফেলবে। সে চায় শত্রুরা ভাবুক সে মৃত। সে চায় নানামি ভাবুক সে জিতে গেছে। কারণ শত্রুর অসতর্কতাই এখন ওনার সবচাইতে বড় অস্ত্র।”

মায়া নোবারার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “ইউজি ভাই বলেছেন আপনাকে সাবধানে থাকতে। নানামি আপনাকে আগলে রাখছে ঠিকই, কিন্তু সে আসলে আপনাকে খাঁচায় বন্দি করে রেখেছে। আপনার ওপর নজরদারি আরও বাড়বে। তবে ভয় পাবেন না ম্যাম, গুহার ভেতর থেকে সিংহ আবার গর্জাবে!”

নোবারা চকলেটগুলো হাতে নিল। একটা ডার্ক চকলেটের মোড়ক খুলতেই সেই পরিচিত তিতকুটে স্বাদ তার জিহ্বায় লাগল। জেনিন সবসময় বলত, “নূরা, ডার্ক চকলেটের মতো আমাদের জীবনটাও তিতকুটে, কিন্তু এর শেষটা খুব তৃপ্তিদায়ক।”

মায়া উঠে দাঁড়াল।
“আমাকে এখন যেতে হবে ম্যাম। বেশিক্ষণ থাকা ঠিক হবে না। নানামি সন্দেহ করবে। তবে মনে রাখবেন, আপনি একা নন। এই পাহাড়ের প্রতিটি পাথরের আড়ালে ওনার চোখ আছে। আপনি শুধু নিজের আর এই ছোট বাবুর খেয়াল রাখুন।”

মায়া যাওয়ার আগে নোবারার কপালে একবার হাত রাখল। “ভালো থাকবেন জেনিন নুরশাদ এর রাণী। আমাদের ছোট রাজপুত্র বা রাজকন্যার জন্য আমরা সবাই অপেক্ষা করছি।”

মায়া চলে যাওয়ার পর বারান্দাটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কিন্তু নোবারার মনে এখন আর অন্ধকার নেই। মায়ার প্রতিটি শব্দ তার মনে এক নতুন আশার প্রদীপ জ্বেলে দিয়েছে। নোবারা বুঝতে পারল, এই লড়াইয়ে সে একা নয়। জেনিন নূরশাদ তার অন্ধকার সাম্রাজ্য থেকে এক অদৃশ্য সৈন্যবাহিনী দিয়ে তাকে পাহারা দিচ্ছে।

নোবারা জানালার বাইরে তাকিয়ে কম্বলটা নিজের পেটের ওপর জড়িয়ে নিল। সে এখন আর কাঁদবে না। সে জানে, এই মৌনতার পরেই আসবে সেই মহা-গর্জন। জেনিন নূরশাদ ফিরবে, খুব শীঘ্রই ফিরবে।

<><><><><><><><><>

রাঙামাটির বাংলোর ঝোপঝাড়ের আড়ালে সিভিল ড্রেসে থাকা র‍্যাবের বিশেষ দলটির ওয়াকিটকি থেকে মাঝেমধ্যে ঝিরঝিরে আওয়াজ ভেসে আসছে। নানামির বাংলোর চারপাশ এখন এক অদৃশ্য জালের মতো নজরদারিতে ঘেরা। কর্নেল রাশেদের নির্দেশ স্পষ্ট, ‘যদি কোনো ছায়াও নড়াচড়া করে, তবে তাকে জ্যান্ত ধরতে হবে।’

বাংলোর ছাদের এক কোণে বসে থাকা সেই ছায়ামানবটি আজ অনেকক্ষণ ধরে নিচের এই নড়াচড়া লক্ষ্য করছে। তার তীক্ষ্ণ নজর এড়িয়ে কিছুই যাচ্ছে না। সে দেখেছে কীভাবে পুলিশ সদস্যরা লেকের পাড়ে পজিশন নিচ্ছে। সে বুঝতে পেরেছে, তার প্রতি রাতের এই গোপন সফর আর গোপন নেই। প্রশাসনের শিকারি কুকুরগুলো তার গন্ধ পেয়ে গেছে।

ছায়ামানবটি একবার নোবারার জানালার দিকে তাকাল। সেখানে মোমবাতির ক্ষীণ আলো দেখা যাচ্ছে। নোবারা হয়তো আজও সেই চেনা সুঘ্রাণ আর পরিচিত স্পর্শের অপেক্ষায় জেগে আছে। ছায়ামানবটির বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল। সে জানালার কার্নিশ বেয়ে নিচে নামার জন্য প্রস্তুত হলো। তার ক্ষতটা এখনো পুরোপুরি সারেনি, একটু নড়াচড়া করলেই কালচে রক্ত চুইয়ে পড়ছে ব্যান্ডেজের আড়াল থেকে। কিন্তু ওই মায়াবী টানের কাছে এই শারীরিক যন্ত্রণা নগণ্য।

“সামনে এক পা-ও বাড়াবেন না!”
অন্ধকারের ভেতর থেকে ইউজির কণ্ঠস্বর ফিসফিস করে বেজে উঠল। ছায়ামানবটি থমকে দাঁড়াল। ইউজি ছায়ার মতো পেছন থেকে এসে তার হাত চেপে ধরল। ইউজির চেহারায় আজ প্রচণ্ড আতঙ্ক আর জেদ।

“ওরা ফাঁদ পেতেছে,” ইউজি দাঁতে দাঁত চিপে বলল। “নিচে চারজন স্নাইপার পজিশন নিয়ে আছে। আপনি যদি আজ ওই জানালায় হাত দেন, তবে ওটা আপনার জীবনের শেষ ভুল হবে। ওরা জেনিন নূরশাদকে চায় না, ওরা চায় তার জ্যান্ত শরীরটাকে খাঁচায় ভরতে।”

ছায়ামানবটি ইউজির হাত ঝটকা দিয়ে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল। তার চোখদুটো রক্তবর্ণ হয়ে উঠেছে। সে ইশারায় বোঝাতে চাইল, ‘নূরা অপেক্ষা করছে। আমাকে যেতেই হবে।’

“না!” ইউজি এবার আরও শক্ত করে তাকে জড়িয়ে ধরল। “ম্যাম সুরক্ষিত আছেন। ওরা ওনাকে কিছু করবে না। কিন্তু আপনি ধরা পড়া মানে আমাদের সব পরিকল্পনা শেষ। আপনি কি চান আপনার অনাগত সন্তান তার বাবাকে জেলখানায় দেখুক? আপনি কি চান নানামি জিতে যাক?”

ইউজির শেষ কথাটি তীরের মতো কাজ করল। ছায়ামানবটি স্থির হয়ে গেল। সে জানালার দিকে শেষবারের মতো তাকাল। আজ প্রথমবার সে নোবারার কাছে যেতে পারছে না। আজ কোনো বেহুঁশ করার রুমাল থাকবে না, কোনো নিবিড় আলিঙ্গন হবে না।

“চলুন এখান থেকে,” ইউজি তাগাদা দিল। “ওরা সার্চলাইট মারার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমাদের এখনই লেকের পেছনের দিক দিয়ে পাহাড় নামতে হবে।”

ছায়ামানবটি তার মুষ্টিবদ্ধ হাতটা পাশের শ্যাওলা ধরা দেয়ালে সজোরে মারল। তার হাতের আঙুল দিয়ে রক্ত ঝরতে শুরু করল, কিন্তু সেদিকে তার ভ্রুক্ষেপ নেই। সে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ইউজির পিছু পিছু অন্ধকারের গভীরে মিলিয়ে যেতে লাগল। প্রতিটি পদক্ষেপে তার মনে হচ্ছিল, সে তার কলিজাটাকে ওই বাংলোর ঘরে ফেলে যাচ্ছে।

এদিকে, নোবারা জানালার পাশে বসে রাত তিনটে বাজার অপেক্ষা করছে। সে আজ নীল পাথরের মালাটা হাতে জড়িয়ে রেখেছে। কিন্তু সময় পেরিয়ে যাচ্ছে, ঘরের পর্দাগুলো স্থির। সেই পরিচিত সুঘ্রাণ নেই, সেই শীতল বাতাসের ঝাপটা নেই।

নোবারা উঠে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে সার্চলাইটের আলো বনবন করে ঘুরছে। সে দেখল নিচে পুলিশ সদস্যদের আনাগোনা। নোবারার বুকটা ধক করে উঠল। সে বুঝতে পারল কেন সে আজ একা। কেন সেই ছায়া আজ তাকে ছুঁয়ে দেখেনি।

“আপনি কি ধরা পড়লেন?” নোবারা অস্ফুট স্বরে কেঁদে উঠল। সে জানালার কাঁচে কপাল ঠেকিয়ে ফেলল, তার অশ্রু ফোঁটায় জানালার কাঁচ ঝাপসা হয়ে এল। সে কেবল এই প্রশ্নের উত্তর ভেবে পেল না যে, কেন এতো কাছে থেকেও তারা এতো দূরে!?

চলবে ইংশাআল্লাহ………..

(সাইলেন্ট রিডার এবং অ্যাক্টিভ রিডার, দুই পক্ষকেই বলছি, এখন থেকে প্রতি পোস্টে যদি ৬০+ রিয়েক্ট উঠে, তবে আমি নিয়মিত দুটো পর্ব দিয়ে গল্পটা শীঘ্রই শেষ করে দিতে পারি। দেখুন, আমি খুব ভালো করেই জানি আমার গল্পটা এই মুহূর্তে ১০০ জনের উপরে পাঠক পড়তেছে, ড্যাশবোর্ডে 3k এবং স্টোরিতে ২০০+ ভিউজ দেখেই আমি বুঝে যাচ্ছি সেটা(চিরচেনা অচেনা গল্পটা লেখার সময়ই আমার অভিজ্ঞতা হয়ে গিয়েছে)। এখন আপনাদের হাতে সব, তাড়াতাড়ি গল্পটা পড়ে নতুন গল্পে মনোনিবেশ করবেন নাকি এভাবে গল্পটা চলতে থাকবে? বেশি কিছু না, গল্প করা শেষ হওয়া মাত্রই একটা রিয়েক্ট দিয়ে চলে যাবেন, টাটা করে। ব্যাস!🤷‍♀️)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here