#Soulmate_to_Enemy |৬৯|
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম
পাহাড়ের চূড়ায় সূর্যের আলো পড়ার আগেই তনুজা রান্নাঘরে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। নোবারার জন্য বিশেষ পুষ্টিকর নাস্তা, ফলের রস আর গরম দুধের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। বাড়িতে অন্তঃসত্ত্বা একটা মেয়ে আছে, তার যত্ন না করলে কি হয়? মা হালিমা বেঁচে থাকলে হয়তো তিনিই নোবারার সমস্ত দেখভাল করতেন। তবে মেয়ের এমন বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে তিনি যে নিজেকে সামলে নিতে পারতেন, তার কোন নিশ্চয়তা ছিল না। জেনিন নুরশাদ নেই আজ কতদিন! এই কয়েকদিন এ নোবারার বড় পরিবর্তন হয়েছে বটে। চঞ্চল হরিণীর মতো ছোটাছুটি করা মেয়েটা কেমন খিটখিটে বদমেজাজি হয়ে গিয়েছে। কথা বলাও বন্ধ। যদিও অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর থেকে খাবারে নিয়মিত হয়েছে।
নোবারা তার বিছানায় হেলান দিয়ে বসে আছে। তার চোখের নিচে হালকা কালি, রাতের ঘুমহীনতা তাকে অনেকটা ফ্যাকাশে করে দিয়েছে। ঠিক এই সময় নানামি ঘরে ঢুকল। তার পেছনে তনুজা হাতে খাবারের ট্রে নিয়ে। নানামির পরনে আজ সাদা লিনেনের শার্ট, চোখেমুখে এক ধরণের অপরাধবোধ আর অতিরিক্ত যত্নের ছাপ।
“কেমন আছো নোবারা?” নানামি খুব নরম স্বরে জিজ্ঞেস করল। সে নোবারার বিছানার পাশে একটা চেয়ার টেনে বসল।
নোবারা কোনো উত্তর দিল না। সে জানালার দিকে তাকিয়ে রইল। নানামি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তনুজার দিকে তাকাল। তনুজা ট্রের ওপর থেকে ফলের রসটা নিয়ে নোবারার সামনে ধরল।
“একটু খেয়ে নাও। দেখো, তোমার গায়ের রঙ একদম ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। এখন তো আর তুমি একা নও, তোমার ভেতরে একটা প্রাণ বড় হচ্ছে। তাকে তো কষ্ট দিতে পারো না,” তনুজা খুব মায়াবী গলায় বলল। সে নোবারার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল।
তনুজার এই অকৃত্রিম ভালোবাসা নোবারার হৃদয়ে সবসময় নাড়া দেয়। তনুজা তাকে নিজের বোনের মতো আগলে রেখেছে ঠিকই, কিন্তু আজ এই যত্নের আড়ালে নোবারা কী যেন একটা অমঙ্গলের সুর খুঁজে পাচ্ছে। নানামি আজ অতিরিক্ত চুপচাপ। সে নোবারার চোখের দিকে তাকাতে পারছে না।
“নোবারা,” নানামি আবার মুখ খুলল। “আমি আজ শহরের সবচাইতে বড় গাইনোকোলজিস্ট ডাক্তার সিদ্দিককে ডেকেছি। তিনি কিছুক্ষণ পরেই আসবেন। তোমার এই শারীরিক এবং মানসিক ধকল তোমার প্রেগন্যান্সিতে প্রভাব ফেলতে পারে। আমরা কোনো ঝুঁকি নিতে চাই না।”
নোবারা এবার ধীরে ধীরে নানামির দিকে তাকাল। তার কণ্ঠে বরফশীতল শ্লেষ,
“ঝুঁকি নিতে চান না? নাকি সিআইডি থেকে অর্ডার এসেছে যে, জেনিন নূরশাদের সন্তানকে সুস্থভাবে পৃথিবীর আলো দেখতে হবে, যাতে আপনারা তাকে দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন?”
নানামির মুখটা মুহূর্তের জন্য কালো হয়ে গেল। সে চোখ সরিয়ে নিল।
“তুমি ভুল ভাবছো। আমি শুধু চাই তুমি সুস্থ থাকো।”
“সুস্থ?” নোবারা হাসল। “যে বাড়ির চারপাশে দিনরাত পুলিশ বন্দুক নিয়ে ঘুরছে, যে ঘরের জানালার বাইরে ছায়াদের আসা-যাওয়া নিষিদ্ধ, সেখানে সুস্থ থাকা যায়? আপনারা আজ আমাকে এতো যত্ন করছেন কেন? তনু তো আমাকে ভালোবাসে, সেটা আমি জানি। কিন্তু আপনি? আপনি তো খু’নিকে মারার পুরস্কার পেয়েছেন। এখন কি খু’নের দায় থেকে মুক্তি পেতে আমার সেবা করছেন?”
তনুজা পরিস্থিতি সামাল দিতে মাঝখানে কথা বলে উঠল। “নোবারা, প্লিজ ওভাবে বলো না। নানামি তোমার জন্য অনেক করছে। ও ওপরতলার সাথে লড়ছে তোমাকে এখানে নিরাপদে রাখার জন্য।”
ঠিক এই সময় দরজায় টোকা পড়ল। বাড়ির স্টাফ লিয়াকত কাকা একটা খাম হাতে ভেতরে ঢুকল। “এক মহিলা আপনার জন্য এই চিঠিটা দিয়ে গেছে। বলল খুব জরুরি।”
নোবারা খামটা নিল। খামের ওপর কোনো নাম নেই, কেবল একটা ছোট নীল ফুলের আঁকা। নোবারা বুঝতে পারল এটা মায়ার কাছ থেকে আসা মেসেজ। সে দ্রুত খামটা খুলল। ভেতরে খুব সুন্দর হস্তাক্ষরে লেখা মায়ার বার্তা,
“ম্যাম, বাগানের ফুলগুলো এখন পূর্ণ প্রস্ফুটিত। কিন্তু মালীকে আজ পাহারা দেওয়া হচ্ছে। আপনি নিজের ওপর খেয়াল রাখবেন। সামনের দিনগুলোতে আকাশ খুব মেঘলা হতে পারে। বাতাসের গতি পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাচ্ছি। মনে রাখবেন, সবচাইতে অন্ধকার রাতটাই ভোরের ইঙ্গিত দেয়!”
চিঠিটা পড়ে নোবারার হাতের আঙুলগুলো কেঁপে উঠল। মায়া তাকে সতর্ক করছে। ‘আকাশ মেঘলা হওয়া’ আর ‘বাতাসের গতি পরিবর্তন’, এগুলো নিছক কথা নয়। এর মানে প্রশাসন কোনো বড় পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে। হয়তো তাকে এখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হবে, কিংবা জেনিনের সন্ধানে তাকে কোনো ভয়ংকর টোপ হিসেবে ব্যবহার করা হবে।
নোবারা চিঠিটা মুঠোর ভেতর চেপে ধরল। সে লক্ষ্য করল নানামি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার হাতের দিকে তাকিয়ে আছে।
“কার চিঠি এসেছে?” নানামি জিজ্ঞেস করল।
নোবারা নির্লিপ্ত গলায় বলল,
“কেন? এটা কি চেক করার জন্য ল্যাবে পাঠাতে হবে?”
নানামি আর কিছু বলল না। কিছুক্ষণ পর ডাক্তার এলেন। তিনি নোবারাকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করলেন। আল্ট্রাসনোগ্রামের ছোট পোর্টেবল মেশিনে যখন অনাগত সন্তানের হৃদস্পন্দন শোনা গেল, ধুক ধুক ধুক, তখন পুরো ঘরে এক পিনপতন নীরবতা নেমে এল। নোবারার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। এই সেই শব্দ, যার জন্য জেনিন নুরশাদ হয়তো আজ পাহাড়ের কোনো অন্ধকার গুহায় বসে প্রার্থনা করছে!
ডাক্তার সাহেব নানামিকে বাইরে নিয়ে গিয়ে কিছু নিচু স্বরে কথা বললেন। নোবারা শুনতে পেল না, কিন্তু সে দেখল নানামির মুখ গম্ভীর হয়ে উঠছে।
তনুজা এসে নোবারাকে জড়িয়ে ধরল।
“বাবুটা কত সুন্দর সুস্থ আছে। তুমি আর চিন্তা করো না।”
নোবারা তনুজার কাঁধে মাথা রেখেও স্বস্তি পেল না। তার বারবার মনে হচ্ছে, এই অতিরিক্ত যত্ন, এই ডাক্তার ডাকা, মায়ার এই রহস্যময় মেসেজ, সবই কোনো এক বৃহৎ ঝড়ের পূর্বাভাস। তনুজার ভালোবাসা অকৃত্রিম হতে পারে, কিন্তু নানামির নিরবতা ভয়াবহ।
নোবারা মনে মনে ভাবল,
“সামনে কি খুব খারাপ কিছু হতে চলেছে? জেনিন কি আজ রাতেও আসবে না? ওরা কি জেনিনকে ধরে ফেলবে?”
জানালার বাইরে পাহাড়ের মেঘগুলো আজ বড্ড স্থির। কোনো এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের হাতছানি নোবারার বুকের ভেতরটা হিম করে দিচ্ছে।
<><><><><><><><><>
ডাক্তার চলে গেছেন অনেক আগে, নানামি আর তনুজাও নিজেদের ঘরে। ডিনারের পর তনুজা খুব যত্ন করে নোবারাকে এক গ্লাস গরম দুধ খাইয়ে দিয়ে গেছে। ঘরের মোমবাতিটা নিভু নিভু করছে। নোবারা জানালার ধারের ইজি চেয়ারটায় বসে আছে। বাইরে পাহাড়ের অন্ধকার আজ যেন কোনো ক্ষুধার্ত দানবের মতো পুরো পৃথিবীকে গিলে নিতে চাইছে।
নোবারার মনে আজ এক আকাশ অভিমান জমা হয়েছে। এক সপ্তাহ। দীর্ঘ সাতটা দিন কেটে গেছে, অথচ সেই পরিচিত ছায়ার কোনো দেখা নেই। সেই মায়াবী সুঘ্রাণ, সেই শীতল পরশ, সেই অবশ করে দেওয়া রুমালের ঘ্রাণ, সব যেন উধাও। আগে নোবারা যখন সকালে ঘুম থেকে উঠত, তার শরীরটা এক অদ্ভুত ভারী অনুভূতিতে ছেয়ে থাকত। সে অনুভব করতে পারত কেউ একজন তাকে সারারাত নিজের উষ্ণতায় আগলে রেখেছিল। তার বালিশের পাশে কোনো না কোনো চিহ্ন পড়ে থাকত, কখনো লকেট, কখনো মালা, কখনো বা কেবল একটি বুনো ফুল।
কিন্তু যেদিন থেকে সে এই বাড়িতে নিজের গর্ভাবস্থার কথা উচ্চস্বরে স্বীকার করেছে, যেদিন থেকে জানাজানি হয়েছে যে সে কনসিভ করেছে, সেদিন থেকেই সেই ছায়ামানবটি যেন উধাও হয়ে গেছে। তার উপর পুরো বাড়িতে পুলিশি প্রটোকল!
“কেন আসছেন না?” নোবারা অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল। তার চোখের জল গড়িয়ে শাড়ির আঁচলে পড়ছে।
নোবারা হাত বাড়িয়ে নিজের স্ফীত পেটের ওপর রাখল। সে আলতো করে পেটে হাত বোলাতে বোলাতে অনাগত সন্তানের সাথে কথা বলতে শুরু করল। এটাই এখন তার রাতের একমাত্র সঙ্গী।
“জানো মাম্মাম, আমি কত আশা করেছিলাম আজ রাতে সে আসবে, তোমার গায়ের ওপর হাত রাখবে, আমাকে বলবে যে সে আছে। অথচ দেখো, এই বড় ঘরটাতে আমরা কত একা। তোমার পাপা কি আমাদের ভালোবাসে না?”
নোবারার কণ্ঠস্বর কান্নায় বুজে এল। সে ডুকরে কেঁদে উঠল। “সেদিন মায়া কত বড় বড় কথা বলে গেল। অথচ আজ সাতদিন হয়ে গেল ঘরের পর্দাগুলো একটুও নড়ল না। আমি জানি সে খুব কাছেই আছে। কিন্তু কেন আসছে না? আমি কি অপরাধ করেছি? নাকি সে আমাকে আর পছন্দ করছে না?”
অথচ জানালার ঠিক ওপাশে, অন্ধকারের ঘন অরণ্যের ভেতর একটি বিশাল রেইনট্রি গাছের ডালে স্থির হয়ে বসে আছে সেই ছায়ামানব। নোবারার প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি কান্নার আওয়াজ তার কানে তপ্ত সিসার মতো বিঁধছে। ছায়ামানব গাছের ডালটা এত জোরে আচড়ে ধরেছে যে তার নখ দিয়ে কাঠ চিরে যাচ্ছে। তার চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে মাস্কের ভেতরটা ভিজে একাকার।
সে দেখতে পাচ্ছে নোবারা জানালার কাঁচে কপাল ঠেকিয়ে কাঁদছে। সে দেখতে পাচ্ছে নোবারার ফ্যাকাশে মুখ, তার অভিমানী চোখের চাউনি। তার ইচ্ছে করছে এক লাফে জানালার কাঁচ ভেঙে ভেতরে ঢুকে নোবারাকে নিজের বুকের ভেতর পিষে ফেলতে। সে বলতে চায়, “নূরা, আমি এখানেই আছি। আপনার প্রতিটি নিশ্বাসে আমি আছি।”
কিন্তু সে পারছে না।
নিচে বাংলোর চারপাশ ঘিরে এখন পুলিশের ডাবল গার্ড। নানামি আজ অতিরিক্ত সতর্ক। প্রতিটি ঝোপে সেন্সর লাগানো হয়েছে। জেনিন জানে, সে যদি আজ এক ইঞ্চিও নড়ে, তবে সাইলেন্সার লাগানো বন্দুকের গুলি তার বুক চিরে বেরিয়ে যাবে। আর সে মারা যাওয়া মানে, নোবারার চিরস্থায়ী বৈধব্য এবং তার সন্তানের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে যাওয়া। ইউজি তাকে পাহাড়ের পাদদেশ থেকে বারবার সিগন্যাল দিচ্ছে ফিরে যাওয়ার জন্য।
জেনিন তার পেটের ব্যান্ডেজে হাত দিল। ব্যথায় সে কুকড়ে যাচ্ছে, কিন্তু নোবারার কান্নার আওয়াজ তার সব যন্ত্রণাকে ছাপিয়ে যাচ্ছে। সে দেখল নোবারা জানালার সামনে থেকে সরে গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। নোবারা বালিশে মুখ গুঁজে এখনো ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
কিন্তু দূর থেকে কষ্ট পাওয়া ছাড়া তার করার কিছুই নেই। সে গাছ থেকে নেমে নিঃশব্দে অন্ধকারের গভীরে মিলিয়ে যেতে লাগল। প্রতিটি পা ফেলা তার জন্য ছিল যন্ত্রণাদায়ক। সে ফিরে যাচ্ছে নিজের অন্ধকার গুহায়, যেখানে তার নূরা নেই, কোনো আলো নেই। কেবল আছে এক বুক হাহাকার আর প্রতিশোধের নেশা।
<><><><><><><><><>
ঘড়ির কাঁটা তখন রাত তিনটে ছুঁইছুঁই। পুরো বাংলো নিস্তব্ধতায় মগ্ন, কেবল ঝিঁঝিঁ পোকার একঘেয়ে ডাক সেই নীরবতাকে আরও রহস্যময় করে তুলছে।
নানামি তার অন্ধকার ঘরে নিঃশব্দে তৈরি হচ্ছিল। তার পরনে কালো উইন্ডব্রেকার আর পায়ে মজবুত হাইকিং বুট। কোমরের হোলস্টারে সে নিজের সার্ভিস রিভলভারটা শেষবারের মতো চেক করে নিল। সিআইডির কঠোর জেরা, কর্নেল রাশেদের সন্দেহভাজন দৃষ্টি আর নোবারার ওই বিষাক্ত অবজ্ঞা, সবকিছু তাকে এক চরম সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিয়েছে। সে আর বসে থাকতে পারছে না। তাকে বের করতে হবে, কর্ণফুলীর সেই রাতে আসলে কী ঘটেছিল। জেনিনের লাশ কি সত্যিই নদী গিলে ফেলেছে, নাকি পাহাড়ের কোনো এক গুহায় এক অন্যরকম ইতিহাস লেখা হচ্ছে? তাকে সবটা জানতে হবে।
সে যখন সন্তর্পণে দরজা খুলে বাইরের করিডোরে পা রাখল, ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা নরম হাত তার কবজি চেপে ধরল। নানামি চমকে ফিরে তাকাল। অন্ধকারে তনুজার মুখটা খুব ফ্যাকাশে আর আতঙ্কিত দেখাচ্ছে। তনুজা তখনো তার রাতের ড্রেসের ওপর একটা চাদর জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
“কোথায় যাচ্ছেন এই মাঝরাতে?” তনুজা প্রায় ফিসফিস করে আর্তনাদ করে উঠল। তার চোখ দুটো জলে ছলছল করছে।
“তুমি ঘুমাও। আমাকে যেতে হবে,” নানামির কণ্ঠস্বর পাথরের মতো শক্ত।
“না, আমি আপনাকে কোথাও যেতে দেব না!” তনুজা নানামির পথ আগলে দাঁড়াল। “বাইরে পুলিশ পাহারা দিচ্ছে, চারদিকে র্যাবের নজরদারি। আপনি যদি এখন একা বেরিয়ে যান, তবে ওরা আপনাকে আর বিশ্বাস করবে না। নানামি, প্লিজ… আমাদের জীবনটা আবার সুন্দর হচ্ছে, কেন আপনি সব ধ্বংস করতে চাইছেন?”
নানামি তনুজার দু কাঁধ ধরে খুব শান্ত অথচ দৃঢ় গলায় বলল, “তনুজা, আমি যদি আজ না যাই, তবে সারাজীবন আমি নিজের কাছে অপরাধী হয়ে থাকব। নুরশাদ কে আমি নিজের হাতে শেষ করেছি, কিন্তু এই নিখোঁজ লাশটা আমার ক্যারিয়ার আর আমার চরিত্রকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। আমি জানি এই পাহাড়ে কেউ একজন লুকিয়ে আছে। আমি সেই সত্যটা নিজের চোখে দেখতে চাই।”
“যদি কোনো বিপদ হয়? যদি ওরা আপনাকে মেরে ফেলে?” তনুজা ডুকরে কেঁদে উঠল। সে নানামির বুকে মাথা রেখে আঁকড়ে ধরল তাকে। “আমার কথা না ভাবলেও অন্তত নিজের কথা ভাবুন। পুলিশ আপনাকে অ্যারেস্ট করতে পারে!”
নানামি তনুজার কপালে একটা দীর্ঘ চুমু খেল। তার চোখে তখন এক অস্থির নেশা।
“কিচ্ছু হবে না। আমি পেছনের সিক্রেট গেট দিয়ে বেরিয়ে যাব। জিপটা আমি আগেই পাহাড়ের নিচে পজিশন করে রেখেছি। তুমি শুধু নোবারাকে চোখে চোখে রেখো। কেউ যেন টের না পায় আমি বাড়িতে নেই।”
তনুজা বুঝতে পারল নানামিকে আটকানোর সাধ্য তার নেই। নানামি এখন আর কেবল একজন স্বামী নয়, সে এক জেদী শিকারি। তনুজা হাত ছেড়ে দিয়ে দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।
“ফিরে আসবেন তো?”
“ফিরে আসবো, তোমার কাছেই ফিরে আসবো তনুজা।” এই কথাটি বলেই নানামি অন্ধকারের সাথে মিশে গেল।
সে অত্যন্ত নিপুণভাবে বাংলোর পেছনের খাড়া ঢাল দিয়ে নিচে নেমে এল। পুলিশের সেন্ট্রিরা তখন শীতের কামড়ে কিছুটা তন্দ্রাচ্ছন্ন। নানামি ঝোপঝাড়ের আড়াল দিয়ে কয়েক মাইল হেঁটে সেই গোপন জায়গায় পৌঁছাল যেখানে তার কালো জিপটি রাখা ছিল। ইঞ্জিনটা খুব সাবধানে স্টার্ট দিল সে, হেডলাইট নেভানো। কেবল বনের সামান্যতম আলোতে সে জিপটা নিয়ে পাহাড়ি রাস্তার চড়াই-উতরাই পাড়ি দিতে লাগল।
রাস্তাটা বড্ড বিপজ্জনক। একদিকে খাড়া পাহাড়, অন্যদিকে গভীর খাদ। কুয়াশার চাদর চিরে নানামির জিপটা যখন আরও গভীরে ঢুকছে, তখন তার মনে হচ্ছিল সে কোনো এক নিষিদ্ধ জগতে প্রবেশ করছে। পাহাড়ের এই নির্জনতায় প্রতিটি গাছের আড়ালে যেন ইউজির রাইফেল তাক করা আছে। কিন্তু নানামির ভয় নেই। তার মনে হচ্ছে, আজ রাতে সে কোনো এক অমোঘ আকর্ষণে টানছে, যে আকর্ষণ তাকে জেনিন নূরশাদের মুখোমুখি দাঁড় করাবে।
জিপটা যখন পাহাড়ের একদম চূড়ার কাছাকাছি পৌঁছাল, নানামি গাড়ি থামাল। এখান থেকেই পাহাড় এর গুহাগুলোর এলাকা শুরু। সে গাড়ি থেকে নেমে টর্চটা বের করল, কিন্তু জ্বালালো না। সে কান পেতে শোনার চেষ্টা করল কোনো মানুষের অস্তিত্ব। হঠাৎ ধোঁয়াশায় আড়াল থেকে এক দীর্ঘদেহী ছায়ামূর্তি বেরিয়ে এলো! নানামি সাথে সাথেই তার পজিশন নিয়ে নিল, গান লোড করে নিল মুহুর্তর মধ্যেই!
চলবে ইংশাআল্লাহ……
(আগে থেকেই বলে রাখি, এর পরবর্তী পর্ব পড়ে আমাকে জাজ করবেন না, এটা স্যাড এন্ডিং না হলেও সামনের পর্ব গুলো তে ট্রাজেডি ভরপুর থাকবে।
টা টা😐🫶)

