#Soulmate_to_Enemy |৭০|
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম
ঢাকা ডিবি অফিসের করিডোরে আজ যেন কোনো এক অদৃশ্য ভূমিকম্পের পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে। চারিদিকে অস্ত্রধারী পুলিশের সতর্ক পাহারা, এসআই থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সবার চোখেমুখে চাপা উত্তেজনা। ইন্টারোগেশন সেলের ভারী লোহার দরজার সামনে স্বয়ং ডিবি প্রধান এবং কর্নেল রাশেদ দাঁড়িয়ে আছেন। আজ বাংলাদেশের আন্ডারওয়ার্ল্ডের ইতিহাসের সবচাইতে বড় দিন। যে মানুষটিকে কর্ণফুলীর ঢেউ গ্রাস করেছিল বলে সবাই ভেবেছিল, যে মানুষটি এক মাস ধরে প্রশাসনকে নাকানিচুবানি খাইয়েছে, সেই জেড উরফে জেনিন নুরশাদ আজ সশরীরে এখানে উপস্থিত।
সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, জেনিনকে কোনো ঝটিকা অভিযানে ধরা হয়নি। সে নিজেই ঢাকার মিন্টো রোডে নানামির জিপ থেকে নেমে ধীরস্থির পায়ে আত্মসমর্পণ করেছে। আজই প্রথম প্রশাসনের সবাই, ডাইরেক্টরের থেকে শুরু করে কনস্টেবল পর্যন্ত, দেখতে পেল মাস্কের আড়ালের জেড কে!
ইন্টারোগেশন সেলের ভেতরে জেনিনকে একটি স্টিলের চেয়ারে বসানো হয়েছে। তার হাতে হাতকড়া নেই, কারণ সে স্বেচ্ছায় ধরা দিয়েছে এবং তার শর্ত ছিল তাকে কোনো শারীরিক আঘাত করা যাবে না। জেনিনের পরনে একটি কুচকুচে কালো শার্ট, হাতাগুলো কনুই পর্যন্ত গোটানো। তার মুখ কিছুটা ফ্যাকাশে, বাম কাধের ক্ষতটা এখনো তাকে মাঝেমধ্যে যন্ত্রণায় নীল করে দিচ্ছে, কিন্তু তার চোখ দুটো আগের মতোই তীক্ষ্ণ এবং শীতল। তবে ১৪৮ আইকিউ সম্পন্ন এই মস্তিষ্কের অধিকারী মানুষটি যখন শান্ত হয়ে বসে থাকে, তখন মনে হয় সে বন্দি নয়, বরং সে-ই পুরো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করছে!
নানামি কক্ষের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখেমুখে এক ধরণের অপরাধবোধ আর ক্লান্তির ছাপ। জেনিন তার দিকে একবার তাকিয়ে ম্লান হাসল।
এএসপি রাইহান টেবিলের ওপাশে বসে একটা ফাইল খুললেন। রেকর্ডিং ডিভাইস চালু করা হলো।
“সো, জেনিন নুরশাদ। আপনি মারা যাননি। কর্ণফুলীর নাটকটা বেশ ভালোই সাজিয়েছিলেন আপনি আর আপনার সেই বিশ্বস্ত কুকুর ইউজি।”
জেনিন খুব ধীর লয়ে রাইহানের দিকে তাকাল। তার কণ্ঠস্বর একদম স্থির,
“ইউজি আমার কুকুর নয়, ও আমার ভাই। ওর সম্পর্কে বাজে কথা বলবেন না।”
“কিভাবে বাঁচলেন আপনি?” কর্নেল রাশেদ পেছন থেকে গর্জে উঠলেন। “এক মাস কোথায় ছিলেন? কে আপনাকে আশ্রয় দিয়েছিল?”
জেনিন একটু হেলান দিয়ে বসল।
“আশ্রয় দেওয়ার মতো হিম্মত এ দেশে খুব কম মানুষেরই আছে। ইউজি আমাকে নদী থেকে বের করে এনেছিল। আমি পাহাড়ে ছিলাম। এক মাস আমি কেবল মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়েছি। কিন্তু আমি ফিরে এসেছি কারণ আমার কিছু হিসাব বাকি ছিল।”
“হিসাব?” রাইহান সাহেব ব্যঙ্গ করে হাসলেন। “আপনি নিজের ইচ্ছায় ধরা দিয়েছেন। কেন? জেনিন নুরশাদের মতো একজন মাফিয়া ডন, যে সারা জীবন আইনের চোখে ধুলো দিয়েছে, সে হঠাৎ এতো মহৎ হয়ে গেল কেন?”
জেনিন এবার সোজা হয়ে বসল। তার চোখের মণিগুলো যেন স্থির হয়ে গেল।
“আমি মহৎ নই। আমি কেবল একজন বাবা। আর একজন স্বামী।”
নিজ পরিবারের কথা বলতে গিয়েই জেনিনের কন্ঠস্বর এক মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠল। সে নিজেকে সামলে নিল দ্রুত। তার আইকিউ তাকে বলছে আবেগকে প্রশ্রয় দেওয়া মানেই দুর্বল হওয়া।
“আমি ইন্সপেক্টর নানামির সাথে ডিল করেছি,” জেনিন খুব শান্তভাবে বলল। “ইউজি এই মুহূর্তে ধরাছোঁয়ার বাইরে। ও এমন সব তথ্য আর নেটওয়ার্ক জানে যা আপনাদের পুলিশের জন্য সোনার খনি হতে পারে। আমার শর্ত খুব পরিষ্কার ছিল। ইউজিকে আপনারা কোনোদিন চার্জ করবেন না। ওর সব কেস ফাইল ক্লোজ করতে হবে এবং ওকে সম্পূর্ণ আইনি মুক্তি দিতে হবে।”
“কেন? ইউজিকে কেন বাঁচাতে চাইছেন?” কর্নেল রাশেদ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
জেনিন দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার হৃদয়ের গভীর থেকে আসা এক হাহাকার যেন ওই ছোট ঘরে ছড়িয়ে পড়ল। “আমি জানি, আমি হয়তো কোনোদিন আর জেলের বাইরে যেতে পারব না। আমার হাতে অনেক রক্ত, অনেক অপরাধের দাগ। কিন্তু নোবারা…নোবারা এখন একা নয়। ওর গর্ভে আমার সন্তান। আমার অবর্তমানে ইউজিই একমাত্র মানুষ, যে নোবারাকে আর আমার বাচ্চাকে পৃথিবীর সব অশুভ শক্তি থেকে আড়াল করে রাখবে। ও নানামির চেয়েও বড় দেওয়াল হয়ে ওদের পাহারা দেবে। ইউজিকে স্বাধীন রাখা মানেই আমার পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। নানামি এই শর্তে রাজি হয়েছে বলেই আমি আজ আপনাদের সামনে।”
নানামি মাথা নিচু করে রইল। সে জানে, এই ডিলটা অনৈতিক, কিন্তু জেনিনের এই নিঃস্বার্থ পিতৃত্ব আর ভালোবাসার সামনে সে হার মেনেছে।
রাইহান সাহেব জেনিনকে আরও অনেক প্রশ্ন করলেন। তার ড্রাগ সিন্ডিকেট, তার অস্ত্রের ব্যবসা, তার বিদেশি নেটওয়ার্ক, সব নিয়ে জেনিন খুব সংক্ষেপে কিন্তু নিখুঁত তথ্য দিল। সে এমনভাবে কথা বলছিল যেন সে কোনো কর্পোরেট মিটিংয়ে প্রেজেন্টেশন দিচ্ছে। তার বুদ্ধিদীপ্ত উত্তরে জেরা করার অফিসাররাই মাঝেমধ্যে খেই হারিয়ে ফেলছিলেন! একটা মানুষ এতো সুন্দর করে কিভাবে কথা বলতে পারে? তাও আবার কোন কুখ্যাত মাফিয়া!
“আপনি কি জানেন আপনার এই আত্মসমর্পণের ফলে আপনার পুরো সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়ে যাবে?” রাইহান সাহেব জিজ্ঞেস করলেন।
“সাম্রাজ্য তো বালির ঘর অফিসার,” জেনিন ম্লান হাসল। “আমি তো শুধু জেনিন নুরশাদ হিসেবে বাঁচতে চেয়েছিলাম, জেড হিসেবে নয়। কিন্তু নিয়তি আমাকে এক অন্ধকার গলিতে নিয়ে গিয়েছিল। আজ আমি সেই গলি থেকে বেরিয়ে আসতে চাই। নোবারার চোখে আমি হয়তো সারাজীবন খু’নিই থাকব, কিন্তু আমার সন্তান যেন অন্তত এটা জানে যে তার বাবা তার নিরাপত্তার জন্য নিজের স্বাধীনতা বিসর্জন দিয়েছে।”
জেরার এক পর্যায়ে নোবারার প্রসঙ্গ আবার এল। জেনিনের চোখের কোণে এক ফোঁটা লোনা জল চিকচিক করে উঠল। সে দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল।
<><><><><><><><><>
বিকেল গড়াতেই সারা দেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর ব্রেকিং নিউজ স্ক্রল লাল হয়ে উঠল। প্রতিটি চ্যানেলের পর্দায় বড় বড় হরফে লেখা হতে লাগল,
“অবশেষে ধরা পড়লেন আন্ডারওয়ার্ল্ডের সম্রাট জেনিন নূরশাদ ওরফে জেড।”
ঢাকার ডিবি অফিসের সামনে তখন তিল ধারণের জায়গা নেই। শত শত সংবাদকর্মী, ওবি ভ্যান এবং কৌতূহলী জনতার ভিড়ে মিন্টো রোড স্থবির হয়ে পড়েছে।
টেলিভিশন ক্যামেরা যখন জেনিনকে ডিবি অফিসের করিডোর দিয়ে নিয়ে যাওয়ার সেই অস্পষ্ট ফুটেজটি লাইভ সম্প্রচার করতে শুরু করল, তখন পুরো দেশ যেন দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেল। এটি কেবল একজন অপরাধীর ধরা পড়ার খবর ছিল না, এটি ছিল একটি দ্বৈত সত্তার উন্মোচন।
গাজীপুর এবং সাভারের জেনিন নুরশাদের টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিগুলোতে তখন কাজের শিফট চলছিল। ক্যান্টিনের বড় টেলিভিশন পর্দায় যখন জেনিনের শান্ত, কিন্তু বিধ্বস্ত মুখটা ভেসে উঠল, তখন শত শত শ্রমিক কাজ ফেলে স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।
“এ হতে পারে না! আমাদের স্যার কোনোদিন খারাপ লোক হতে পারেন না!” বয়স্ক এক ফোরম্যান ডুকরে কেঁদে উঠলেন।
সেখানে উপস্থিত হাজারো শ্রমিকের কাছে জেনিন কোনো জেড বা মাফিয়া ডন ছিল না। তাদের কাছে সে ছিল এমন এক মানুষ, যে লকডাউনের সময় নিজের পকেট থেকে বেতন দিয়েছিল, যার চ্যারিটি ফাউন্ডেশন থেকে হাজারো অনাথ শিশু পড়াশোনা করছে। সাভারের কারখানায় কাজ করা রহিমা খাতুন আঁচলে মুখ ঢেকে কাঁদতে কাঁদতে বলছিল, “আমার মেয়ের হার্টের অপারেশনের সময় কেউ ছিল না, এই স্যার নিজের গাড়িতে করে আমাদের হাসপাতালে নিয়ে গেছিলেন। আল্লাহ, তুমি এই দয়ালু মানুষটার বিচার করো না!”
সোশ্যাল মিডিয়ায় নিমেষেই ছড়িয়ে পড়ল হাজারো পোস্ট। যাদের জেনিন ব্যক্তিগতভাবে সাহায্য করেছে, তারা তার মানবিক দিকগুলো নিয়ে স্ট্যাটাস দিতে শুরু করল। তাদের কাছে জেনিন ছিল এক রবিন হুড, যে ধনীদের থেকে কেড়ে নিয়ে গরিবদের বিলিয়ে দিত। নিউজ চ্যানেলগুলোর লাইভ কমেন্ট সেকশনে প্রার্থনা আর সহমর্মিতার বন্যায় ভেসে গেল।
কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠ ছিল ভয়াবহ। শহরের অভিজাত ক্লাব, অন্ধকার গলি আর জেনিনের হাতে সর্বস্ব হারানো পরিবারগুলোর মধ্যে বয়ে গেল আনন্দের হিল্লোল। ধানমণ্ডির এক বিলাসবহুল ড্রয়িংরুমে বসে কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী শ্যাম্পেন খুললেন। তাদের কাছে জেনিন মানেই ছিল এক মূর্তিমান আতঙ্ক, এক চাঁদাবাজ আর খুনি, যে তাদের ব্যবসায় ভাগ বসাত।
নিউজের ফুটেজ দেখে এক বৃদ্ধা চিৎকার করে উঠলেন, “আজ আমার আত্মা শান্তি পেয়েছে! ওই রাক্ষসটা আমার ছেলেকে গুম করেছিল! ওর ফাঁসি চাই!”
টেলিভিশন টকশো-গুলোতে অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলতে শুরু করলেন জেনিনের নির্মমতার কথা। কীভাবে সে একের পর এক গ্যাংস্টারকে সরিয়ে নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করেছিল। কীভাবে তার ইশারায় শহরের আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটত। যারা জেড বা দ্য শ্যাডো কিং কিংবা ছায়ারাজ নামটিকে চিনত, তাদের কাছে আজ এক সাক্ষাৎ শয়তানের পতন হয়েছে। বাজি ফোটানো হলো কারওয়ান বাজারের কিছু অংশে, যেখানে জেনিনের প্রতিপক্ষরা এখন নিজেদের ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন দেখছে।
নিউজ চ্যানেলগুলোর মধ্যে এখন এক অসম প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। প্রতিটি চ্যানেলের হেড অব নিউজ ফোন করছেন ডিবি অফিসে, সবাই জেনিন নূরশাদের একটা একান্ত সাক্ষাৎকার চায়।
চ্যানেল ২৪-এর এক তুখোড় নারী রিপোর্টার মাইক্রোফোন হাতে ক্যামেরার সামনে উত্তেজিত গলায় বলছিলেন, “দর্শক, আমরা ঠিক ডিবি অফিসের প্রধান ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। আমাদের বিশ্বস্ত সূত্র বলছে, জেনিন নুরশাদ নিজের দোষ স্বীকার করে নিয়েছেন। কিন্তু কেন তিনি হঠাৎ আত্মসমর্পণ করলেন? কেন তিনি এক মাস নিখোঁজ থাকার পর ফিরে এলেন? এই রহস্যের উত্তর পেতে পুরো জাতি আজ উন্মুখ। আমরা চেষ্টা করছি ভেতরে প্রবেশের, যাতে জেনিন নুরশাদের জবানবন্দি সরাসরি আপনাদের শোনাতে পারি।”
সংবাদপত্রগুলোতে জেনিনের জীবন নিয়ে দীর্ঘ ফিচার ছাপা হলো। তার ছোটবেলা, নানামির সাথে তার বন্ধুত্ব, আর কীভাবে একজন ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট অপরাধ জগতে পা রাখল, সবই এখন মুখরোচক গল্প। রিপোর্টাররা নানামির পিছু নিল। তারা জানতে চাইল, কীভাবে নানামি এই অসাধ্য সাধন করল। কিন্তু নানামি কোনো কথা না বলে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেল। রাঙামাটি থেকে ডিরেক্ট ঢাকায় সে একাই জেনিনকে নিয়ে এসেছে। এটা কিভাবে সম্ভব করেছে তার উত্তর দিতে দিতে ক্লান্ত সে!
ডিবি অফিসের ভেতরে একটি ছোট সেলে বসে জেনিন এই সব হট্টগোল থেকে অনেক দূরে। বাইরে তার জন্য মানুষ কাঁদছে নাকি উল্লাস করছে, তা নিয়ে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সে কেবল ইন্টারোগেশন রুমের ছোট টেলিভিশনটিতে এক নজর নিজের খবরটা দেখল।
“জেনিনের সাম্রাজ্যে পুলিশি হানা, উদ্ধার বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র।”
জেনিন ম্লান হাসল। সে জানত এমনটাই হবে। তার ভালো কাজগুলো চাপা পড়ে যাবে তার অপরাধের পাহাড়ের নিচে। কিন্তু তার মন পড়ে আছে রাঙামাটির বাংলোয়। সে ভাবছে, নোবারা কি এই খবরটা দেখছে? টিভিতে তার এই অপরাধীর চেহারা দেখে নোবারা কি তাকে আরও বেশি ঘৃণা করছে? নাকি নোবারার চোখের কোণেও এক ফোঁটা জল জমছে?
জেরার টেবিলে জেনিনকে যখন বলা হলো মিডিয়া তার সাথে কথা বলতে চায়, সে শান্তভাবে প্রত্যাখ্যান করল। সে কেবল একটি কথাই বলল, “আমি কোনো সেলিব্রিটি নই যে ইন্টারভিউ দেব। আমি একজন কয়েদি। তবে একটা বার্তা পৌঁছে দিন, আমার সাম্রাজ্য হয়তো শেষ, কিন্তু আমার জেদ এখনো মরে যায়নি।”
ডিবি অফিসের স্পেশাল ইন্টারোগেশন জোনকে আজ কার্যত একটি দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত করা হয়েছে। জেনিন নুরশাদকে সাধারণ জেলখানায় পাঠানোর ঝুঁকি প্রশাসন নিতে পারছে না। প্রথমত, জেলের ভেতরে তার অগণিত শত্রু ওৎ পেতে আছে যারা সুযোগ পেলেই তাকে শেষ করতে চাইবে।
দ্বিতীয়ত, জেনিন নিজেই একটি জীবন্ত ল্যান্ডমাইন। তার ১৪৮ আইকিউ এবং অপরাধ জগতের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে সে যেকোনো মুহূর্তে জেল ভেঙে বেরিয়ে যেতে পারে। তাই ওপরতলার নির্দেশে তাকে এই ডিবি অফিসের মাটির নিচের একটি হাই-সিকিউরিটি সেলে রাখা হয়েছে, যেখানে সিসিটিভি ক্যামেরা আর সশস্ত্র গার্ডের নিশ্ছিদ্র বেষ্টনী চব্বিশ ঘণ্টা তাকে ঘিরে থাকে।
সেলে জেনিন একা। তার হাতে এখন হাতকড়া পরানো, যা একটি ভারি লোহার টেবিলের সাথে আটকানো। সে শান্তভাবে বসে ছিল, কিন্তু করিডোরের ওপাশ থেকে আসা এক পরিচিত কণ্ঠস্বর তার স্নায়ুতে এক তীব্র বৈদ্যুতিক ঝটকা দিল।
“আমাকে আটকাবেন না! আমি ওর সাথে দেখা করবই!”
নোবারা। রাঙামাটি থেকে পাগলের মতো ছুটে এসেছে সে। তার অবিন্যস্ত চুল, চোখের কোণে শুকিয়ে যাওয়া জলের দাগ আর ফ্যাকাশে মুখ। প্রেগন্যান্সির এই ধকল সত্ত্বেও সে কারো বাধা মানেনি। তনুজা আর নানামি তাকে আটকানোর চেষ্টা করেছিল, কিন্তু নোবারা আজ এক উন্মাদিনীর মতো আচরণ করছে।
ডিবি অফিসের ডিউটি অফিসাররা তাকে জেনিনের সেলের দিকে যেতে বাধা দিল।
“ম্যাম, এটা রেস্ট্রিক্টেড এরিয়া। আপনি ওনার সাথে দেখা করতে পারেন না। উনি একজন মোস্ট ওয়ান্টেড ক্রিমিনাল!”
“সরে দাঁড়ান আমার পথ থেকে!” নোবারার গলায় এক তীক্ষ্ণ আর্তনাদ। সে ধাক্কা দিয়ে এগোতে চাইল, কিন্তু দুজন কনস্টেবল তার হাত ধরে ফেলল। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে একজন কনস্টেবল নোবারার কাঁধ শক্ত করে চেপে ধরল তাকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য।
ঠিক সেই মুহূর্তে সেলের ভেতর থেকে এক ভয়ংকর গর্জন ভেসে এল। জেনিন, যে এতক্ষণ পাথরের মূর্তির মতো বসে ছিল, সে এক নিমেষে দানবীয় শক্তিতে উঠে দাঁড়াল। টেবিলের সাথে আটকানো হাতকড়া থাকায় সে সম্পূর্ণ নড়তে পারছিল না, কিন্তু তার ক্ষিপ্রতা ছিল চিতার মতো।
টেবিলের ওপর থাকা পানির গ্লাসটি সে এক ঝটকায় ভেঙে ফেলল। হাতের হাতকড়ার শিকলটি সে এক বিশেষ কোণে ঘুরিয়ে টেবিলটিকেই সজোরে মেঝের দিকে হেঁচকা টান দিল। প্রচণ্ড শব্দে লোহার টেবিলটা একটু সরে এল। জেনিন তার বাম হাতের শিকল দিয়ে পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা পাহারাদার সাব-ইন্সপেক্টরের গলায় পেঁচিয়ে তাকে কাছে টেনে নিল এবং তার মাথাটা সজোরে সেলের গরাদ বা গ্রিলের সাথে ধাক্কা মারল। অফিসারটি যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে লুটিয়ে পড়ল।
ততক্ষণে বাইরে নোবারার কাঁধ ধরা কনস্টেবলটি তাকে সরিয়ে নিতে চাইছে। জেনিনের চোখ তখন আগ্নেয়গিরির মতো জ্বলছে। সে গ্রিলের ফাঁক দিয়ে তার হাতকড়া পরা হাত দুটো বের করে বিদ্যুৎগতিতে ওই কনস্টেবলের ঘাড় জাপ্টে ধরল। হাতকড়ার লোহার শিকলটা কনস্টেবলের গলায় ফাঁস হয়ে চেপে বসল।
“ওর গায়ে হাত দেওয়ার সাহস তোকে কে দিয়েছে জানো’য়ার?” জেনিনের কণ্ঠস্বর যেন পাতাল থেকে উঠে আসা কোনো আদিম দানবের হুংকার।
জেনিন তার সর্বশক্তি দিয়ে কনস্টেবলকে গ্রিলের গায়ে আছড়ে মারল। মুহূর্তের মধ্যে দুজন অফিসার রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে রইল। জেনিন কথা কম বলে, কিন্তু তার কাজ কতটা নিখুঁত আর ভয়ংকর হতে পারে, তা উপস্থিত সবাই হাড়ে হাড়ে টের পেল। পুরো করিডোরে এক আতঙ্কিত নিস্তব্ধতা নেমে এল। জেনিন তার হাতকড়া পরা রক্তাক্ত হাত দুটো গ্রিলের ওপর রেখে হাপাচ্ছে। তার দৃষ্টি এখন স্থির নোবারার ওপর।
নোবারা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখের সামনে এই রক্তপাত, এই ভয়ংকর তাণ্ডব, সবই তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে যে সে কাকে ভালোবেসেছে। সে জেনিনের সেলের একদম সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দুজনের মাঝখানে কেবল লোহার গরাদ।
জেনিনের সেই রক্তমাখা চোখ দুটো নোবারাকে দেখামাত্রই নরম হয়ে এল। সে তার হাতকড়া পরা হাত দুটো গরাদের ফাঁক দিয়ে নোবারার গালের কাছে নিয়ে এল, কিন্তু ছোঁয়ার সাহস পেল না। তার হাতে তখন অন্য মানুষের রক্ত।
“কেন এসেছেন নূরা?” জেনিন খুব নিচু স্বরে, ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল। “এই বীভৎস রূপটা কি দেখার খুব শখ ছিল আপনার?”
নোবারা কোনো কথা বলতে পারল না। সে শুধু জেনিনের হাতকড়া পরা হাতের ওপর নিজের কাঁপতে থাকা হাত দুটো রাখল। দীর্ঘ এক মাস পর সে তার জেনিনকে দেখতে পেল! কিন্তু তার ভাগ্য এতোটাই খারাপ হতে হলো যে জেনিন, তার স্বামী এখন গরাদের পেছনে! জেনিন আজ বন্দি, আজ সে খু’নি হিসেবে চিহ্নিত, কিন্তু নোবারার কাছে সে আজও সেই অবাধ্য প্রেমিকের মতো, যে পৃথিবীর সব নিয়মের তোয়াক্কা না করে তাকে আগলে রাখে।
সেলের বাইরে তখন সাইরেন বাজছে। আরও ফোর্স ছুটে আসছে জেনিনকে শান্ত করতে। কিন্তু সেই উত্তাল গোলমালের মাঝেও, ওই ছোট সেলের সামনে সময় যেন থমকে গেছে। নোবারা আর জেনিনের চোখের জল আজ একাকার হয়ে মিশে যাচ্ছে। সবাই দেখছে এক মাফিয়া ডনের আত্মসমর্পণ আর এক প্রাক্তন সিআইডি অফিসারের নীরব কান্না! অন্যায় এর জন্য আইন কখনো কাঁদতে পারে? তা আজ দেখছে সবাই। পাপ পুণ্য কে ছাড়িয়ে নোবারা জেনিন একে অপরকে ভালোবেসেছে। তাদের কি এই পরিণতি হওয়ার ছিল?
করিডোরের শেষ মাথায় ভারী লোহার দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে নানামি। তার কাঁধে ইউনিফর্মের নক্ষত্রগুলো আজ যেন অনেক বেশি ভারী মনে হচ্ছে। সে নোবারাকে ভেতরে যাওয়ার অনুমতি দিয়ে দিল। সে জানে, সে এক অপরাধীকে আশ্রয় দিচ্ছে না, সে এক ভেঙে যাওয়া আত্মাকে তার শেষ আশ্রয়টুকুর কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। নানামি নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করেনি, বরং সে বন্ধুত্বের এক চরম ঋণ শোধ করছে। সে পাহারারত কনস্টেবলদের ইশারা করল দূরে সরে যেতে। নোবারার জন্য আজ কোনো নিয়ম নেই, কোনো আইন নেই। কেবল আছে এক অবাধ্য হৃদয়ের আর্তনাদ।
দরজাটা খোলার শব্দ হতেই জেনিন মাথা তুলল। সেলের আবছা আলোয় সে দেখল নোবারা দাঁড়িয়ে আছে। নোবারার ফ্যাকাশে মুখ, ফোলা চোখ আর এলোমেলো চুলগুলো জেনিনের হৎপিণ্ডে সহস্র সূঁচের মতো বিঁধছে। জেনিন চেয়ার ছেড়ে উঠতে চাইল, কিন্তু হাতকড়ার শিকল টেবিলে বাড়ি খেয়ে এক তীক্ষ্ণ ঝনঝন শব্দ তুলল। সেই শব্দে নোবারার শরীরের ভেতরটা যেন কেঁপে উঠল।
নোবারা কোনো দ্বিধা করল না। সে প্রায় ছুটে গিয়ে জেনিনের বুকের ওপর আছড়ে পড়ল। সে তার দুই হাত দিয়ে জেনিনকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। নোবারার মুখ জেনিনের চওড়া কাঁধে লুকানো। তার কান্নার কোনো শব্দ নেই, কেবল শরীরটা বারবার প্রবল হেঁচকায় কেঁপে উঠছে। জেনিনের শার্টের কলার মুহূর্তেই ভিজে সিক্ত হয়ে উঠল।
জেনিন স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার হাতকড়া পরা হাত দুটো কাঁপছে। সে কি ছোঁবে নোবারাকে? এই অভিশপ্ত হাতে কি সেই পবিত্রতাকে স্পর্শ করার অধিকার তার আছে? কিন্তু নোবারার আকুল আলিঙ্গন জেনিনের সমস্ত যুক্তিকে মুহূর্তেই গুঁড়িয়ে দিল। সে তার মাথাটা নোবারার কাঁধে সঁপে দিল, যেন মস্তিষ্কের সকল ক্লান্তি সে বের করে দিচ্ছে তার নূরার সংস্পর্শে এসে!
বেশ কিছুক্ষণ ওভাবেই কেটে গেল। জেনিনের সেলের স্যাঁতসেঁতে বাতাসে কেবল নোবারার চাপা কান্নার শব্দ। সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছে এই দুর্ভেদ্য লোহার খাঁচায়। বাইরের পৃথিবী জেনিনকে খুনি বলছে, কেউ তাকে শয়তান বলছে, কেউ বলছে ত্রাণকর্তা, কিন্তু এই আলিঙ্গনের ভেতরে জেনিন কেবল একজন পরাজিত প্রেমিক, যে তার শেষ সম্বলটুকু বুকের মাঝে আগলে রাখতে চাইছে।
নোবারার কান্না থামার কোনো নাম নেই। জেনিন অনুভব করল নোবারার হাতের আঙুলগুলো তার পিঠের মাংসপেশিতে বিঁধে যাচ্ছে, যেন সে জেনিনকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে চায় যাতে তাকে কেউ আর কেড়ে নিতে না পারে। জেনিন খুব ধীরে নোবারার কানের কাছে মুখ নিয়ে এল। তার কণ্ঠস্বর আজ বড্ড নিস্তেজ, বড্ড ভারী।
“নূরা…” জেনিন খুব মায়াবী স্বরে ডাকল। “আপনার এই মেঘভাঙা চোখের জল আমার সাজানো সব পাপের বিচার করে দিচ্ছে। দয়া করে থামুন।”
নোবারা আরও জোরে জেনিনকে জাপ্টে ধরল। সে কোনো কথা বলতে পারছে না। তার বুক ফেটে কান্না আসছে। যে মানুষটাকে সে এক মাস মৃত ভেবে নিজের ভেতরে দাফন করে রেখেছিল, তাকে আজ জীবন্ত স্পর্শ করার মধ্যে যে কী তীব্র যন্ত্রণা আর সুখ, তা কোনো অভিধানে নেই।
জেনিন এবার খুব সাবধানে নোবারার মুখটা নিজের দুই হাতের অঞ্জলিতে তুলে নিল। জেনিনের হাতের তালুয় তখনো নিজের শিকলের ঘর্ষণে হওয়া কালচে দাগ, কিন্তু নোবারার গাল স্পর্শ করতেই হাতগুলো পরম মমতা আর আদরে ভরে উঠল। সে নোবারার চোখের কোল বেয়ে নেমে আসা লোনা জলগুলো নিজের বুড়ো আঙুল দিয়ে মুছে দিল।
নোবারার ডাগর চোখ দুটো জেনিনের চোখের দিকে স্থির হয়ে আছে। সেখানে কোনো ঘৃণা নেই, কেবল আছে এক অনন্ত তৃষ্ণা। জেনিন নোবারার চোখের মণির দিকে তাকিয়ে দেখল তার নিজেরই প্রতিচ্ছবি। জেনিনের ঠোঁটে এক ম্লান, বেদনাসিক্ত হাসি ফুটে উঠল।
“নূরা,” জেনিন খুব সুন্দর শব্দ চয়নে কথা বলতে শুরু করল, তার গলার প্রতিটি স্বর যেন কোনো করুণ কাব্যের ছন্দ। “আমি আকাশ হতে চেয়েছিলাম আপনার মাথার ওপর, যাতে আপনাকে রোদ ছুঁতে না পারে। কিন্তু আমি আজ এক অন্ধকার গহ্বর হয়ে গেছি। এই যে আপনার গাল বেয়ে মুক্তোর মতো জলগুলো পড়ছে, যা একেকটা অভিশাপ আমার জন্য। আমি আপনাকে বসন্ত দিতে চেয়েছিলাম, অথচ দেখুন, আমি আপনাকে এক দীর্ঘ শীতের দহনে পুড়িয়ে মারছি।”
নোবারা এবার জেনিনের ঠোঁটের ওপর হাত রাখল। সে আর এসব কথা শুনতে চায় না। জেনিন নোবারার হাতের তালুতে আলতো করে একটা চুমু খেল।
“আপনি কাঁদলে আমার বিচার হতে দেরি হয়ে যায় নূরা,” জেনিন আবার বলতে লাগল। “আমি তো শুধু অপরাধী হিসেবে ধরা দিয়েছিলাম, কিন্তু আপনার এই চোখের জল আমাকে একজন কাপুরুষ বানিয়ে দিচ্ছে। এই শিকলগুলো আমাকে যতটা না ব্যথিত করছে, তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি ক্ষত তৈরি করছে আপনার এই নীরব হাহাকার। আপনি তো আইনের অফিসার ছিলেন, আপনি তো ন্যায়ের প্রতীক। তবে আজ এই অন্যায়ের প্রতিমূর্তিকে জড়িয়ে ধরে কেন নিজের পবিত্রতাকে ম্লান করছেন?”
নোবারা এবার ভাঙা গলায় অস্ফুট স্বরে বলল, “আপনি আমার সব জেনিন… আপনি ছাড়া আমার ন্যায়-অন্যায়ের কোনো সংজ্ঞা নেই। আমি কিচ্ছু জানি না, কিচ্ছু চিনি না। আমার শুধু আপনাকে দরকার।”
জেনিন নোবারার চিবুকটা একটু উঁচু করে ধরল। তার চোখের চাহনি আজ এতটাই গভীর যে মনে হচ্ছে সে নোবারার আত্মার ভেতরে প্রবেশ করতে চাইছে।
“আমি জানি নূরা, এই লোহা আর কংক্রিটের ওপারে আমাদের জন্য কোনো সুন্দর আকাশ নেই,” জেনিন খুব বিষণ্ণ গলায় বলল। “কিন্তু আমার ভেতরে যে অংশটুকু এখনো পবিত্র আছে, সেটুকু কেবল আপনার আর আমাদের এই অনাগত প্রাণের। আমি হয়তো আপনার সাথে সারাজীবন পথ চলতে পারব না, কিন্তু প্রতিটি অন্ধকার রাতে আমি আপনার ছায়া হয়ে পাশে থাকব। কাঁদবেন না প্লিজ!”
নোবারা আবার জেনিনের বুকে মাথা রাখল। সে অনুভব করছে জেনিনের হৃদস্পন্দন। এই সেই হৎপিণ্ড, যা নোবারার জন্য ধকধক করে। জেনিন নোবারার চুলে নিজের মুখ গুঁজে দিল।
“আমাদের এই বিচ্ছেদ কোনো শেষ নয় নূরা,” জেনিন ফিসফিস করে বলল। “এটা এক দীর্ঘ অপেক্ষার শুরু। আমি হয়তো অন্ধকারের ওপাড়ে চলে যাচ্ছি, কিন্তু আপনার ভেতরে যে প্রাণের স্পন্দন হচ্ছে, সে-ই হবে আমার প্রতিনিধি। তাকে বলবেন, তার বাবা কোনো বীর ছিল না ঠিকই, কিন্তু সে তার মায়ের হাসির জন্য পুরো পৃথিবীকে তুচ্ছ করতে জানত।”
নোবারা এতক্ষণ পাথর হয়ে ছিল। জেনিনের বুকের স্পন্দন তার কানে তপ্ত সিসার মতো বাজছিল। সে হুট করে জেনিনের শার্টের কলারটা খামচে ধরল। তার শরীরের সমস্ত শক্তি যেন ওই আঙুলের ডগায় এসে জমা হয়েছে। সে মুখ তুলল। তার ভেজা চোখের পাতাগুলো থরথর করে কাঁপছে।
“আপনি ধরা দিলেন কেন? কেন এভাবে আমাকে বারবার কষ্ট দিচ্ছেন। আমি আর সহ্য করতে পারছি না। আর পারছি না জেনিন!”
জেনিন কিছু বলল না। সে কেবল আঙুল দিয়ে নোবারার চিবুকটা ছুঁয়ে রইল।
নোবারা জেনিনকে এক ধাক্কায় সরিয়ে দিতে চাইল, কিন্তু পরক্ষণেই আবার আরও জোড়ে জড়িয়ে ধরল। “আপনি তো মরে গিয়েছিলেন, তাই না? তবে কেন এই জ্যান্ত লাশ হয়ে ফিরে এলেন?”
জেনিন এবার নোবারার কপালের অবিন্যস্ত চুলগুলো সযত্নে কানের পাশে গুঁজে দিল। তার চোখের চাহনি আজ যেন কোনো অতল সমুদ্র, যেখানে নোবারা তলিয়ে যাচ্ছে।
“কিছু মৃতদেহ কবরে শান্তি পায় না নূরা। কিছু আত্মা অভিশপ্ত হয়। আমি না ফিরলে আপনার এই অভিমানী চোখের জলগুলো মুছিয়ে দিত কে?”
নোবারা জেনিনের বুকের বোতামগুলো মুঠোয় পাকিয়ে ধরল। তার কান্নার বেগ এবার বাঁধ ভাঙল। “আমি চাইনি আপনি ফিরুন! আমি চাইনি আপনাকে এই শিকল পরা অবস্থায় দেখতে! আমার জেনিন তো সিংহ ছিল, সে কেন আজ এই খাঁচায় কুঁকড়ে আছে?”
জেনিন ম্লান হাসল। সে নোবারার কপালে নিজের কপাল ঠেকাল। দুই জোড়া তপ্ত নিশ্বাস একাকার হয়ে গেল। “সিংহ যখন তার শাবক আর সঙ্গিনীর নিরাপত্তার গন্ধ পায়, তখন সে স্বেচ্ছায় খাঁচায় ধরা দেয়। আমার স্বাধীনতা বড় ছিল না, বড় ছিল আপনার এই নির্বিঘ্নে ঘুমানোর অধিকার। আমি জেলখানায় পচে মরব ঠিকই, কিন্তু আপনি যখন রাতে জানালার দিকে তাকাবেন, তখন আর ভয়ে কুঁকড়ে যাবেন না। জানবেন, আপনার বিপদগুলো আজ আমার সাথে এই সেলে বন্দি।”
নোবারা ডুকরে কেঁদে উঠল। সে জেনিনের হাতকড়া পরা হাত দুটো নিজের বুকের কাছে টেনে নিল। লোহার শীতল পরশ তার চামড়ায় বিঁধছে!
“আমি থাকব কী করে?” নোবারা ফিসফিস করে বলল। “এই যে আমার ভেতরে আপনার অংশটা বড় হচ্ছে, ওকে আমি কী বলব? ও যখন জানতে চাইবে ওর বাবা কোথায়, আমি কি ওকে এই লোহার গ্রিলটা দেখাতে নিয়ে আসব?”
জেনিনের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। সে এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করল। নিজের অনাগত সন্তানের কথা ভাবতেই তার ভেতরে এক আদিম হাহাকার গুমরে উঠল। সে নোবারার পেটের ওপর নিজের রক্তাক্ত হাতটা খুব আলতো করে রাখল।
“ওকে বলবেন, ওর বাবা কোনো এক যুদ্ধের ময়দানে হারিয়ে গেছে। ওকে বলবেন, ওর বাবা ভীরু ছিল না। সে শুধু তার জগতটাকে পবিত্র রাখতে নিজেকে বিসর্জন দিয়েছে। নূরা, আপনি ওকে আমার অন্ধকার জগতটার কথা জানতে দেবেন না। ও যেন শুধু আপনার অফিসারের তেজটুকু পায়।”
“আপনি বড় স্বার্থপর জেনিন,” নোবারা জেনিনের চোখের দিকে তাকিয়ে অভিযোগের সুরে বলল। “সবকিছু আপনি নিজের ইচ্ছায় করেন। ভালোবাসাটাও নিজের ইচ্ছায় করেছেন, আর এই বিচ্ছেদটাও নিজের ইচ্ছায় ঘটাচ্ছেন। আমাকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমি আপনাকে এই অবস্থায় দেখতে চাই কি না?”
জেনিন দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“কিছু প্রশ্নের উত্তর না পাওয়াই ভালো। আমাদের গল্পটা কোনোদিন নীল খামে বন্দি হওয়ার মতো ছিল না নূরা, আমাদের গল্পটা ছিল বারুদ আর রক্তের। রক্ত ধুয়ে গেছে, এখন শুধু ছাই পড়ে আছে।”
বাইরে বুটের শব্দ শোনা যাচ্ছে। নানামির কাশির আওয়াজ পাওয়া গেল, সেটা আসলে এক ধরণের সতর্কবার্তা। সময় শেষ। নোবারাকে যেতে হবে।
জেনিন নোবারার কপালে শেষবারের মতো একটা গভীর চুমু খেল। সেই চুমুতে ছিল এক জীবনের তৃষ্ণা আর সহস্র বছরের বিরহ।
“যাও নূরা। আর ফিরে তাকাবেন না। আজ থেকে আপনার জেনিন কেবল এক টুকরো স্মৃতি।”
নোবারা জেনিনকে ছেড়ে দিল না। সে জেনিনের হাতকড়া পরা হাত দুটো নিজের গালে চেপে ধরে রইল। “আমি আসব। আমি রোজ আসব। আপনি মানা করলেও আসব।”
জেনিন নোবারার হাত দুটো খুব কষ্টে ছাড়িয়ে নিল। সে তার চেয়ারে গিয়ে বসল এবং মুখ ফিরিয়ে নিল দেয়ালের দিকে। তার হাতকড়ার শিকল টেবিলে বাড়ি খেয়ে কর্কশ শব্দ তুলল।
“মায়া বা ইউজি আপনাকে নিয়ে যাবে। চলে যান,” জেনিন আর তাকাল না। সে জানে, তাকালে সে আর স্থির থাকতে পারবে না।
নোবারা পিছু হটে আসতে লাগল। তার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়ছে। সে লোহার দরজার কাছে গিয়ে একবার থামল। জেনিন তখনো দেয়ালের দিকে মুখ করে বসে আছে, তার পিঠের পেশিগুলো কান্নার চাপে কেঁপে কেঁপে উঠছে।
দরজাটা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল। নোবারা করিডোরে এসে মেঝের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। নানামি তাকে ধরতে গেল, কিন্তু নোবারা ডুকরে কেঁদে উঠল।
সেলের ভেতর থেকে জেনিনের কোনো আওয়াজ পাওয়া গেল না!
বিচ্ছেদ হয়ে গেল। জেনিন নূরশাদ তার নিজের তৈরি অন্ধকারের খাঁচায় বন্দি হলো, আর নোবারা এক আকাশ রিক্ততা নিয়ে বেরিয়ে এল আলোয়। কিন্তু এই আলোতে কোনো উজ্জ্বলতা নেই, কেবল আছে এক দীর্ঘ প্রতীক্ষার ধোঁয়াশা।
চলবে ইংশাআল্লাহ।।।।।।।।।
(আচ্ছা আপনাদের কি মনে হয়, ইন্সপেক্টর নানামি যখন গতকাল পাহাড়ের গুহায় গিয়েছিল তখন সে কিন্তু একাই ছিল, মানে সে একা কিভাবে জেনিন কে ধরে আনলো, ইউজি বাধা দিল না কেন? চিন্তা করুন পাঠক, কিছুতো একটা গোলমাল আছেই!)

