Soulmate_to_Enemy |৭১| লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম

0
2

#Soulmate_to_Enemy |৭১|
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম

ঢাকার ডিবি অফিস। মিন্টো রোডের এই বিশাল ভবনটি যেন আজ এক অদৃশ্য দুর্গ। করিডোরে করিডোরে ভারী বুটের শব্দ আর অফিসারদের চাপা গুঞ্জন। গত কয়েক দিনে পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন পুরো প্রশাসনকে নাড়িয়ে দিয়েছে। আন্ডারওয়ার্ল্ডের সম্রাট জেনিন নূরশাদকে কোনো জেলের সেলে নয়, বরং ডিবি অফিসের মাটির নিচের সেই হাই-সিকিউরিটি জোনেই রাখা হয়েছে। তবে এই জোনে প্রবেশাধিকার এখন অত্যন্ত সীমিত। এমনকি যার হাতে জেনিন ধরা দিয়েছে, সেই অফিসার নানামি জায়দানকেও আজ এই জোনে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না।

ডিবি প্রধানের কক্ষের বাইরে নানামি দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনে ইউনিফর্ম থাকলেও তাকে আজ একজন গর্বিত অফিসারের চেয়ে অপরাধীর মতো বেশি দেখাচ্ছে। তার সামনে দুজন সশস্ত্র গার্ড রাইফেল উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, যাদের সে নিজেই একসময় নির্দেশ দিত। আজ তারাই তাকে নিজের বন্ধুর সেলের দিকে যেতে বাধা দিচ্ছে।

“আমাকে ভেতরে যেতে দিন। নুরশাদের সাথে আমার কিছু জরুরি কথা আছে,” নানামির কণ্ঠস্বর যথেষ্ট কর্কশ।

“দুঃখিত স্যার। কমিশনার সাহেবের কড়া অর্ডার। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত আপনার জেনিন নুরশাদের সেলে প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ,” এক কনস্টেবল মাথা নিচু করে উত্তর দিল।

নানামি দাঁতে দাঁত চিপে করিডোর থেকে সরে এল। সে বুঝতে পারছে, পাশা উল্টে গেছে। যে জেনিনকে সে নিজের হাতে গুলি করে বীর সেজেছিল, সেই জেনিনকে আবার জীবিত অবস্থায় নিজের গাড়িতে করে ফিরিয়ে আনাটাই তার ক্যারিয়ারের সবচাইতে বড় কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশাসনের ওপরতলার কর্মকর্তাদের কাছে এখন নানামি কোনো নায়ক নয়, বরং এক রহস্যময় খলনায়ক।

ঠিক তখনই করিডোরের শেষ মাথায় এএসপি রাইহানকে দেখা গেল। তার হাতে একগুচ্ছ ফাইল আর চোখে তীক্ষ্ণ গোয়েন্দা দৃষ্টি। সে নানামির দিকে এগিয়ে এল, কিন্তু তার হাঁটার ছন্দে কোনো সহমর্মিতা নেই।

“নানামি সাহেব, কমিশনার স্যার আপনাকে কনফারেন্স রুমে ডাকছেন। এখনই,” রাইহান খুব সংক্ষিপ্ত ভঙ্গিতে বলল।

নানামি রাইহানের চোখের দিকে তাকাল।
“জেরার জন্য?”

রাইহান একটু হাসল, তবে সেই হাসিতে কোনো বন্ধুত্ব ছিল না। “আমরা এটাকে ইন্টারনাল ক্লারিফিকেশন বলতে পারি। চলুন।”

কনফারেন্স রুমের ভেতরে এসি-র ঠান্ডা বাতাস বইছে, কিন্তু নানামির কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে। বড় গোল টেবিলটার ওপাশে বসে আছেন ডিবি কমিশনার এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন বিশেষ প্রতিনিধি। টেবিলে রাখা আছে জেনিনের পুরনো ফরেনসিক রিপোর্ট, ব্রিজের ওপর পাওয়া রক্তের ডিএনএ রিপোর্ট এবং জেনিনের বর্তমান স্বীকারোক্তির অনুলিপি।

“বসুন, নানামি সাহেব,” কমিশনার খুব ধীর স্বরে বললেন।

নানামি বসল। তার ঠিক উল্টো দিকে রাখা হয়েছে সেই বড় স্ক্রিনটি, যেখানে কর্ণফুলী ব্রিজের রাতের সিসিটিভি ফুটেজ বারবার চালানো হচ্ছে।

“আমাদের কিছু বিষয় বুঝতে খুব সমস্যা হচ্ছে, নানামি,” কমিশনার কথা শুরু করলেন।
“এক মাস আগে আপনি রিপোর্ট দিয়েছিলেন যে, আপনি জেনিন নূরশাদকে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি করেছেন। ফরেনসিক রিপোর্ট বলছে, সেই দূরত্ব থেকে জেনিনের বাঁচার সম্ভাবনা ছিল শূন্য। অথচ এক মাস পর সেই জেনিন নুরশাদ আপনারই জিপে করে সুস্থ শরীরে মিন্টো রোডে হাজির হলো। আপনি কি দয়া করে আমাদের বলবেন, গুলিটা কি আসলেই জেনিনের শরীরে লেগেছিল? নাকি ওটা স্রেফ একটা আকাশকুসুম নাটক ছিল?”

নানামি সোজা হয়ে বসল। “স্যার, আমি গুলি করেছি। ওটা কোনো নাটক ছিল না। ও নদীতে পড়ে গিয়েছিল।”

“নদীতে পড়ে গিয়েছিল, নাকি আপনি ইউজিকে সুযোগ করে দিয়েছিলেন ওকে উদ্ধার করার?” স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি এবার তীক্ষ্ণ গলায় প্রশ্ন করলেন। “আপনার আর জেনিনের বন্ধুত্ব তো শৈশবের। আপনারা কেমন ঘনিষ্ঠ ছিলেন তা আমরা তদন্ত করেই বের করেছি, সেন্ট জুড হাই স্কুল থেকে আপনাদের দুজনের জান প্রান বন্ধুত্ব! আমাদের এখন সন্দেহ হচ্ছে, আপনি জেনিনকে আইনের হাত থেকে বাঁচাতে এই পুরো ফেব্রিক্টেড ডেথ বা সাজানো মৃত্যুর গল্প ফেঁদেছিলেন। আর এখন যখন দেখছেন জেনিনের নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়ছে, তখন ওকে আবার সারেন্ডার করিয়ে নিজের প্রমোশন আর জেনিনের নিরাপত্তা, দুটোই নিশ্চিত করতে চাইছেন।”

নানামির চোয়াল শক্ত হয়ে এল।
“এটা ভিত্তিহীন অভিযোগ। আমি জেনিনকে ঘৃণা করি।”

“ঘৃণা করেন?” রাইহান সাহেব এবার মাঝখানে কথা বলে উঠলেন। “ঘৃণা করলে একজন খু’নিকে নিজের জিপে করে একা রাঙামাটি থেকে ঢাকা নিয়ে আসতেন না। নিয়ম অনুযায়ী আপনার উচিত ছিল লোকাল থানা বা র‍্যাবকে ইনফর্ম করা। আপনি তা না করে ওকে একান্তে সময় দিয়েছেন। ওই পথে আপনাদের মধ্যে কী ডিল হয়েছে? জেনিন আপনাকে কত টাকা অফার করেছে? নাকি নোবারার নিরাপত্তার বিনিময়ে আপনি নিজের ইউনিফর্ম বিক্রি করেছেন?”

“মুখ সামলে কথা বলুন রাইহান!” নানামি চেঁচিয়ে উঠল।

কমিশনার টেবিল চাপড়ে পরিস্থিতি শান্ত করলেন। “শান্ত হোন নানামি। পরিস্থিতি আপনার বিপক্ষে। প্রথমবার আপনি জেনিনকে বাঁচিয়েছিলেন, এটা এখন আমাদের কাছে ধ্রুবসত্যের মতো। দ্বিতীয়বার আপনি ওকে নিয়ে এসেছেন কারণ আপনি জানতেন ও ধরা না পড়লে আপনার প্রমোশন আর বীরত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। কিন্তু আপনি এটা ভুলে গেছেন যে ডিবি অফিস আপনার ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। জেনিনের সাথে আপনার এখন আর কোনো যোগাযোগ থাকবে না। এমনকি আপনি এই কেস থেকেও অফিশিয়ালি সাসপেন্ডেড।”

নানামি স্তব্ধ হয়ে গেল। তার পায়ের নিচ থেকে যেন মাটি সরে যাচ্ছে। সে তো সব করেছিল নোবারার জন্য, জেনিনের সেই আকুল আহ্বানে সাড়া দিয়ে। সে ভেবেছিল জেনিন ধরা দিলে সব শান্ত হয়ে যাবে। কিন্তু সে বুঝতে পারেনি যে, জেনিনকে বাঁচানো আর মারার এই লুকোচুরি খেলায় সে নিজেই এখন আইনের প্রধান টার্গেট!

“আমাদের সন্দেহ হচ্ছে,” কমিশনার আবার বলতে শুরু করলেন, “আপনি ইউজিকে পালানোর সুযোগ করে দিয়েছেন। জেনিনের আত্মসমর্পণের শর্ত হিসেবে আপনি ইউজির মুক্তি আর নোবারার নিরাপত্তার যে অলিখিত ডিল করেছেন, তা রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল। রাইহান, নানামির সার্ভিস রিভলভার আর আইডি কার্ড জমা নিন।”

নানামি যান্ত্রিকভাবে তার রিভলভার আর আইডি কার্ড টেবিলের ওপর রাখল। রাইহান সেগুলো তুলে নিল এক ধরণের পৈশাচিক তৃপ্তি নিয়ে।
“আপনার ওপর এখন থেকে নজরদারি থাকবে, নানামি,” কমিশনার শেষ কথাটি বললেন। “যতক্ষণ না জেনিন নুরশাদ আপনার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিচ্ছে বা আপনাকে ক্লিন চিট দিচ্ছে, ততক্ষণ আপনি এই অফিসের একজন সাধারণ সন্দেহভাজন ছাড়া আর কিছুই নন।”

নানামি কনফারেন্স রুম থেকে বেরিয়ে এল। করিডোরের শেষ মাথায় সেই অন্ধকার জোনের দরজাটা এখনো বন্ধ। ওই দরজার ওপাশে জেনিন হয়তো এখন নিশ্চিন্তে বসে আছে, কারণ সে তার ডিল সফল করেছে। কিন্তু নানামি আজ নিঃস্ব। সে জেনিনকে মারতে গিয়েও মারতে পারেনি, আর বাঁচাতে গিয়ে নিজেও ডুবে যাচ্ছে।

<><><><><><><><><>

রাঙামাটি থেকে ঢাকা ফেরার পর নানামির বাসায় তনুজা এবং নোবারা থিতু হয়েছে। ড্রয়িংরুমের বিশাল সোফাটায় নিথর হয়ে বসে আছে নোবারা। তার সামনে রাখা এক বাটি গরম স্যুপ আর কিছু ফল, যা এখন পুরোপুরি ঠান্ডা হয়ে গেছে। নোবারার দৃষ্টি জানালার বাইরে স্থির, কিন্তু সেখানে দেখার মতো কিছু নেই; তার সমস্ত চেতনা এখন মিন্টো রোডের সেই অন্ধকার সেলে বন্দি হয়ে আছে।

তনুজা এক গ্লাস জল নিয়ে নোবারার পাশে এসে বসল। তার নিজের চোখেও ঘুমের অভাব আর দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। সে জানে, এই মুহূর্তে নোবারাকে সান্ত্বনা দেওয়া মানে মরুভূমিতে জল খোঁজা। তবুও সে হার মানতে রাজি নয়।

“এক চুমুক স্যুপ খেয়ে নাও প্লিজ। তুমি সকাল থেকে দানাপানি কিছু পেটে দাওনি। শরীরটখ তো এমনিতেই দুর্বল, এখন যদি ভেঙে পড়ো তবে তোমার বাচ্চাটার কী হবে?” তনুজা খুব মায়াবী গলায় বলল, তার হাত নোবারার কাঁধে।

নোবারা কোনো উত্তর দিল না। তার কান্নার জল শুকিয়ে গালে সাদাটে দাগ পড়ে গেছে। সে শুধু একবার তনুজার দিকে তাকাল, সেই চোখে কোনো প্রাণ নেই।

“আমি ওর কাছে যাব, তনু” নোবারার কণ্ঠস্বর বড্ড শুকনো, যেন মরুর বাতাস। “ওকে ওই অন্ধকার ঘরে একা রেখে আমি এখানে খেতে পারব না। তুমি নানামিকে বলো আমাকে একবার ওখানে নিয়ে যেতে। জেনিন একা থাকতে পারে না, ওর অনেক কষ্ট হচ্ছে।”

” বুঝার চেষ্টা করো,” তনুজা আলতো করে নোবারার হাত ধরল। “বাইরে পরিস্থিতি খুব খারাপ। নানামি অনেক চেষ্টা করছে। কিন্তু পুলিশ এখন কাউকেই ওর কাছে ঘেঁষতে দিচ্ছে না। তুমি এখন গেলে হিতে বিপরীত হবে।”

“আমি কোনো নিয়ম জানি না!” নোবারা হঠাৎ চিৎকার করে উঠল। সে সোফা থেকে উঠে দাঁড়াতে চাইল, কিন্তু দুর্বলতায় তার পা টলে উঠল।
“ও তো ধরা দিয়েছে! ও তো নিজে থেকে এসেছে! তবে কেন ওকে ওভাবে আটকে রাখা হয়েছে? কেন আমাকে একবার ছুঁতে দেওয়া হচ্ছে না? আমি ওর স্ত্রী, আমার কি কোনো অধিকার নেই?”

নোবারার বুকটা ধকধক করে উঠছে। তার নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। সে অনুভব করতে পারছে তার শরীরের ভেতরে এক তীব্র কম্পন শুরু হয়েছে। তনুজা দ্রুত তাকে জাপ্টে ধরল। “শান্ত হও নোবারা! নিজেকে সামলা। তোর প্যানিক হচ্ছে!”

ঠিক সেই মুহূর্তে সদর দরজা খোলার শব্দ হলো। নানামি ভেতরে ঢুকল। তার কাঁধ দুটো ঝুলে পড়েছে, ইউনিফর্মের সেই টানটান ভাবটা আজ নেই। তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে কয়েক বছরে বুড়ো হয়ে গেছে। তনুজা আশার দৃষ্টিতে নানামির দিকে তাকাল।

“নানামি! নোবারাকে একটু বুঝিয়ে বলুন। ও তো পাগল হয়ে যাচ্ছে জেনিনের কাছে যাওয়ার জন্য। আপনি কি কোনো পারমিশন জোগাড় করতে পেরেছেন?” তনুজা ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করল।

নানামি কোনো কথা না বলে সোফায় ধপ করে বসে পড়ল। সে নিজের দুই হাতের তালুতে মুখ ঢাকল। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর সে খুব নিচু আর ভাঙা গলায় বলল, “আমাকে সাসপেন্ড করা হয়েছে, তনুজা।”

ঘরটা মুহূর্তেই নিস্তব্ধ হয়ে গেল। তনুজা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। নোবারা বড় বড় চোখে নানামির দিকে তাকিয়ে আছে।

“সাসপেন্ড?” তনুজা ফিসফিস করে বলল। “কিন্তু কেন? আপনি তো ওকে ধরে এনেছেন!”

“ওরা আমাকে বিশ্বাস করছে না,” নানামি মুখ তুলল, তার চোখ দুটো লাল। সে নোবারার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমাকে আজ নুরশাদের সেলে পর্যন্ত ঢুকতে দেওয়া হয়নি। ওরা সন্দেহ করছে আমি আর নুরশাদ মিলে কোনো নাটক করছি। ওরা ভাবছে আমি ওকে সুযোগ করে দিয়েছি এক মাস পালিয়ে থাকার। এমনকি আমার গান আর আইডি কার্ডও জমা নিয়ে নিয়েছে। আমি এখন একজন সাধারণ অপরাধীর মতো নজরবন্দি।”

নোবারার কানে নানামির কথাগুলো ঠিকমতো ঢুকছিল না। তার মস্তিষ্ক কেবল একটা তথ্যই গ্রহণ করল, নানামিও জেনিনের কাছে যেতে পারছে না। এর মানে জেনিন এখন পুরোপুরি একা। ওই অন্ধকার চার দেয়ালের মাঝে জেনিন হয়তো এখন যন্ত্রণায় ছটফট করছে, আর তাকে দেখার কেউ নেই।

হঠাৎ নোবারার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসতে শুরু করল। তার চোখের সামনে চারপাশটা দুলছে। সে অনুভব করল তার ফুসফুস থেকে বাতাস উধাও হয়ে যাচ্ছে। সে নিজের গলা চেপে ধরল, যেন কেউ তার শ্বাসরোধ করে রেখেছে।

“নোবারা! কী হচ্ছে তোমার?” তনুজা আর্তনাদ করে উঠল।

নোবারার সারা শরীর ঘামতে শুরু করেছে। সে অসংলগ্নভাবে বলতে লাগল, “অন্ধকার… চারদিকে অন্ধকার… জেনিন… ওরা ওকে মেরে ফেলবে… নানামি, ওরা ওকে বাঁচতে দেবে না… আমি নিশ্বাস নিতে পারছি না!”

নোবারার প্যানিক অ্যাটাক আবারো শুরু হয়েছে। সে ছটফট করতে করতে মেঝেতে বসে পড়ল। তার চোখের মণি স্থির হয়ে আসছে। নানামি দ্রুত নোবারার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। সে নোবারার দুই হাত শক্ত করে ধরল।

“নোবারা, আমার দিকে তাকাও! নিশ্বাস নাও, লম্বা করে নিশ্বাস নাও!” নানামি চিৎকার করে বলছে।

কিন্তু নোবারার মনে হচ্ছে তার পৃথিবীটা এখন টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়ছে। তার গর্ভাবস্থার এই অবস্থায় এই মানসিক চাপ তার জন্য বিষের মতো কাজ করছে।

তনুজা দ্রুত ঘর থেকে ইনহেলার আর জল নিয়ে এল। নানামি নোবারাকে পাজাকোলা করে সোফায় শুইয়ে দিল। নোবারার ঠোঁটগুলো নীল হয়ে আসছে, সে কেবল বিড়বিড় করছে, “জেনিন… জেনিন…”

<><><><><><><><><>

ঘন্টাখানেক পার হয়ে গেছে। সোফার ওপর নিথর হয়ে শুয়ে থাকা নোবারার চোখের পাতা জোড়া কেঁপে উঠল। স্যালাইনের ঘ্রাণ আর তনুজার হাতের ভেজা কাপড়ের পরশ তার চেতনাকে ধীরে ধীরে ফিরিয়ে আনল। দীর্ঘ প্যানিক অ্যাটাক আর অবসাদের পর শরীরটা যেন সীসার মতো ভারী হয়ে আছে। ঠিক সেই সময় দরজার ওপাশে ভারী বুটের আওয়াজ আর গম্ভীঁর গলার আলাপচারিতা শোনা গেল।

নোবারা উঠে বসার চেষ্টা করতেই দেখল, দরজার মুখে দাঁড়িয়ে আছে তার পুরনো কর্মস্থল সিআইডি-র বেশ কয়েকজন বড় কর্মকর্তা। তাদের মধ্যে আছেন ডিআইজি মকবুল সাহেব এবং নোবারার সরাসরি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এসপি মাহমুদ। তাদের পরনে ইস্ত্রি করা কড়কড়ে ইউনিফর্ম, যা একসময় নোবারার গর্ব ছিল। কিন্তু আজ সেই পোশাক আর তার ওপরের মেডেলগুলো নোবারার চোখে কেবল বিদ্রূপের মতো দেখাচ্ছে।

নোবারা উঠে বসার চেষ্টা করলে তনুজা তাকে সাহায্য করতে গেল। ডিআইজি মকবুল সাহেব ঘরের ভেতরে এক পা এগিয়ে এলেন। তার চোখেমুখে কোনো সহানুভূতি নেই, বরং এক ধরণের তীব্র ঘৃণা আর বিরক্তি।

“জেগে উঠেছো এনএ?” ডিআইজি সাহেবের গলায় শ্লেষ ঝরে পড়ল। “নাকি এখনো মাফিয়া ডনের স্বপ্নের ঘোরে আছো?”

নোবারা দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে বসল। তার মুখটা ফ্যাকাশে, কিন্তু চোখ দুটোয় হঠাত করেই এক তীক্ষ্ণ জেদ খেলে গেল। সে কারো চোখের দিকে তাকাচ্ছিল না, কেবল নিজের হাতের আঙুলগুলো মোচড়াচ্ছিল।

“আপনারা এখানে কেন?” নোবারার কণ্ঠস্বর বড্ড ক্ষীণ, কিন্তু তাতে এক ধরণের কাঠিন্য আছে।

এসপি মাহমুদ সাহেব সামনের চেয়ারটা টেনে বসলেন। তার দীর্ঘদিনের প্রিয় সাব-অর্ডিনেটকে এই অবস্থায় দেখে তিনি কিছুটা হতাশ।
“কেন এসেছি তুমি জানো না? পুরো ডিপার্টমেন্টের মাথা নিচু করে দিয়েছো তুমি। আমাদের সবচাইতে তুখোড় অফিসার কিনা জেনিন নূরশাদের মতো একটা অপরাধীর সাথে সংসার পাতল! একে বিশ্বাসঘাতকতা ছাড়া আর কী বলা যায়?”

নোবারার ঠোঁটে এক ম্লান হাসি ফুটে উঠল। সে জানালার দিকে তাকাল।
“বিশ্বাসঘাতকতা? আমি তো অনেক আগেই রিজাইন লেটার পাঠিয়ে দিয়েছি স্যার। আমি আর আপনাদের ডিপার্টমেন্টের কেউ নই।”

“সেই চিঠি এখনো গ্রহণ করা হয়নি!” ডিআইজি সাহেব গর্জে উঠলেন। তিনি টেবিলের ওপর হাত চাপড়ে বললেন, “তুমি একজন সরকারি কর্মচারী হিসেবে শপথ নিয়েছিলে। তোমাকে নুরশাদ ভিলায় পাঠানো হয়েছিল জেনিন নুরশাদ এবং মাফিয়া জেড একই ব্যক্তি কিনা তা নিশ্চিত হতে! অথচ তুমি এক দাগী আসামির সাথে সংসার করে বসেছো! জানো তোমার বিরুদ্ধে কতগুলো চার্জশিট তৈরি করা সম্ভব?”

নোবারা এবার শান্ত চোখে ডিআইজি সাহেবের দিকে তাকাল। তার চোখের কোণে এক ফোঁটা জলও নেই। “করুন চার্জশিট। আমাকে অ্যারেস্ট করুন। জেনিন যেখানে আছে, আমাকেও সেখানে নিয়ে যান। আমার তাতে কোনো আক্ষেপ নেই।”

ঘরের আবহাওয়া এক মুহূর্তে বরফ হয়ে গেল। তনুজা এক কোণে দাঁড়িয়ে কাঁপছে। এসপি মাহমুদ সাহেব একটু নরম হলেন। তিনি জানেন নোবারাকে রাগান্বিত করে কোনো লাভ নেই। তিনি ডিআইজি সাহেবকে থামিয়ে দিয়ে নোবারার আরও কাছে এগিয়ে এলেন।

“লিসেন এনএ, আবেগ দিয়ে জীবন চলে না,” এসপি সাহেব খুব নিচু স্বরে বলতে শুরু করলেন। “তুমি এখন গর্ভবতী। তোমার ভবিষ্যতের কথা ভাবো। জেনিন নুরশাদ কোনোদিন আলোর মুখ দেখবে না। ওর ফাঁ’সি হবে নয়তো আমৃত্যু জেল। তুমি কি একটা দাগী আসামীর স্ত্রীর তকমা নিয়ে সারা জীবন কাটাবে?”

এসপি সাহেব আবার বললেন,
“শোনো, আমরা আইজিপি স্যারের সাথে কথা বলেছি। তুমি যদি জেনিনের বিরুদ্ধে স্টেটমেন্ট দাও, যদি বলো যে ও তোমাকে ব্ল্যাকমেইল করে আটকে রেখেছিল, তবে আমরা তোমার ক্যারিয়ার বাঁচিয়ে দেব। তোমাকে আবার আগের পদে ফিরিয়ে নেওয়া হবে। ইভেন রিওয়ার্ডও পেতে পারো।”

নোবারা এবার সরাসরি এসপি মাহমুদের চোখের দিকে তাকাল। তার চোখে তখন এক ধরণের বিচিত্র করুণা। “রিওয়ার্ড? জেনিনকে বিক্রি করে আমি পদোন্নতি নেব স্যার?”

এসপি সাহেব তাগাদা দিলেন, “ভুল মানুষ তো আসতেই পারে জীবনে। ওটা একটা দুঃস্বপ্ন ভেবে ভুলে যাও। ফিরে এসো আমাদের সাথে। ডিপার্টমেন্ট তোমাকে সুযোগ দিতে চায়।”

নোবারা একটু নড়েচড়ে বসল। সে খুব সাবধানে সোফা থেকে নামল। তার শরীর কাঁপছে, কিন্তু সে স্থির হয়ে দাঁড়াল সবার সামনে।

“আপনাদের এই ডিপার্টমেন্ট আমাকে কী দিয়েছিল স্যার?” নোবারা খুব ধীর লয়ে কথাগুলো বলছে। “একাকীত্ব আর নিয়ম-শৃঙ্খলার এক কারাগার। আর জেনিন?” সে একটু থামল। তার চোখে জেনিনের সেই শেষ বিকেলের ছায়া ভেসে উঠল। “জেনিন নুরশাদ আমাকে সেই জগতটা দিয়েছিল, যেখানে আমি শুধু একজন অফিসার নই, একজন নারী হিসেবে বেঁচে ছিলাম। ও অপরাধী হতে পারে, কিন্তু ও আমার স্বামী।”

“স্বামী!” ডিআইজি সাহেব বিদ্রূপ করে উঠলেন। “একজন খু’নি তোমার স্বামী হয় কী করে?”

নোবারার গলায় এবার এক অদম্য তেজ।
“ও খু’নি কি না, সেটা আদালত বিচার করবে। কিন্তু আমার কাছে ও এমন একজন মানুষ, যে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি আমাকে আগলে রেখেছে। আমি আপনাদের এই ইউনিফর্মের চেয়ে ওর ওই রক্তমাখা হাতটাকে বেশি পবিত্র মনে করি।”

এসপি মাহমুদ সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“তুমি ভুল করছো। এই জেদ তোমাকে ধ্বংস করে দেবে।”

“আমি ধ্বংস হয়েই আছি স্যার,” নোবারা দরজার দিকে ইশারা করল। “আপনাদের এই সুযোগ, এই ক্যারিয়ার, সব আমি প্রত্যাখ্যান করছি। আমার জেনিন নুরশাদ ছাড়া কাউকে দরকার নেই। আপনারা আসতে পারেন স্যার!”

নোবারার এই অনমনীয় রূপ দেখে সিআইডি অফিসাররা একে অপরের দিকে তাকালেন। তারা বুঝতে পারলেন, এই মেয়েটিকে আর ফেরানো সম্ভব নয়। সে লজিকের উর্ধ্বে চলে গেছে।

ডিআইজি সাহেব রাগে গজগজ করতে করতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। এসপি মাহমুদ যাওয়ার আগে শেষবার নোবারার দিকে তাকালেন।
“ভালো থেকো এনএ” তিনি বিষণ্ণ গলায় বললেন। “তবে মনে রেখো, জেনিন নুরশাদের জন্য তুমি যে বলিদান দিচ্ছো, তার মূল্য কোনোদিন এই সমাজ স্বীকার করবে না। কিন্তু তুমি আজ জিতে গেলে, একজন অফিসার নয়, একজন স্ত্রী হিসেবে তুমি জিতে গেলে!”

অফিসাররা চলে যাওয়ার পর ঘরটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল। নোবারা ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ল। সে তার প্রিয় ডিপার্টমেন্টের প্রতি তার চরম অবজ্ঞা করেছে আজ। যে কর্মস্থল তাকে একসময় পরিচয় দিয়েছিল, আজ সেই পরিচয়কেই সে পায়ের তলায় পিষে দিল তার ভালোবাসার জন্য। ভেতর থেকে এক অপরাধবোধ তাকে কুঁকড়ে ফেলছে! কিন্তু সে তার সিদ্ধান্তে অটল থাকলো। নিজের পদোন্নতি বা ক্যারিয়ার ফিরে পাওয়ার আশায় সে কখনোই তার স্বামীর বিরুদ্ধে রিপোর্ট দিবে না। কিন্তু এতেও কি তার স্বামী, জেনিন নুরশাদ বেঁচে ফিরবে?!

চলবে ইংশাআল্লাহ……..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here