#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_৭২(মালিকানা হস্তান্তর)
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম
ডিবি অফিসের আন্ডারগ্রাউন্ড সেল। ঘড়ির কাঁটা নেই, সূর্যের আলো নেই, কেবল একটি সরু ভেন্টিলেটর দিয়ে আসা ক্ষীণ ধুলোমাখা আলোটুকু জানান দিচ্ছে যে বাইরে পৃথিবীটা এখনো সচল। জেনিন তার ছোট লোহার খাটিয়াটাতে শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে আছে। তার দু হাত মাথার নিচে রাখা, আর কবজিতে রুপোলি হাতকড়াটার ঠান্ডা স্পর্শ তাকে প্রতি মুহূর্তে তার বর্তমান অবস্থানের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।
নোবারার সাথে শেষ সাক্ষাতের পর জেনিন নিজেকে এক ধরণের অদ্ভুত শূন্যতায় ডুবিয়ে দিয়েছে। সে আর কারো সাথে কথা বলে না, খাবার দিলেও তা পড়ে থাকে অবহেলায়। ডিবির ইনভেস্টিগেশন অফিসাররা বারবার তাকে জেরা করতে এলেও সে কেবল মৌনতা দিয়ে তাদের উত্তর দেয়। কারণ তার আইকিউ তাকে বলছে, এই মুহূর্তে মুখ খোলা মানেই নিজের জালে নিজেই জড়িয়ে পড়া।
সেলের ভারী লোহার দরজাটা ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে খুলে গেল। জেনিন নড়ল না। সে জানে, এটা হয়তো রাইহান নয়তো কোনো কনস্টেবল হবে। কিন্তু পদশব্দটা এবার একটু অন্যরকম। অনেক বেশি ভারী এবং সুশৃঙ্খল।
“জেনিন নুরশাদ, উঠে বসুন।”
কণ্ঠস্বরটি কমিশনার সাহেবের। জেনিন ধীরে ধীরে উঠে বসল। তার চোখের নিচে কালি পড়েছে, গাল ভেঙে গেছে, কিন্তু সেই দোর্দণ্ড প্রতাপী চাউনি এখনো ম্লান হয়নি। সে কমিশনারের চোখের দিকে সোজা তাকাল।
কমিশনার সাহেব হাতে একটি ফাইল নিয়ে সেলের ভেতরে ঢুকলেন। তার পেছনে রাইহান দাঁড়িয়ে আছে, যার চোখে এখনো নানামিকে ফাঁসানোর সেই পৈশাচিক আনন্দ খেলা করছে।
“আপনার সেই ডিলটা নিয়ে কথা বলতে এসেছি,” কমিশনার সাহেব জেনিনের সামনে রাখা একটি টুলের ওপর বসলেন। “আপনি বলেছিলেন ইউজিকে মুক্তি দিলে আপনি আমাদের সব বড় নেটওয়ার্কের তথ্য দেবেন। কিন্তু গত তিন দিনে আপনি একটা শব্দও উচ্চারণ করেননি। এটা কি আপনার কোনো নতুন চাল?”
জেনিন ম্লান হাসল। তার কন্ঠস্বর বড্ড খসখসে। “চাল আমি চালি না কমিশনার সাহেব। চাল চালে আপনাদের সিস্টেম। আমি শুধু জানতে চাই, ইউজি কি এখনো মুক্ত? ও কি নূরাকে পাহারা দিচ্ছে?”
কমিশনার সাহেব বিরক্তির সাথে ফাইলটা নাড়াচাড়া করলেন। “ইউজিকে আমরা ছাড়ার প্রসেস শুরু করেছি, কিন্তু তার আগে আমাদের নিশ্চিত হতে হবে যে নানামি জায়দানের সাথে আপনার ঠিক কী কথা হয়েছিল। নানামি কি আপনাকে পালাতে সাহায্য করেছিল? কর্ণফুলী ব্রিজে সে যে গুলিটা করেছিল, সেটা কি স্রেফ বাতাস লক্ষ্য করে ছিল?”
জেনিন জেলের শিকের দিকে তাকিয়ে রইল। সে জানে, নানামি এখন বিপদে আছে। সে জানে, তার একটা ভুল উত্তর নানামির ক্যারিয়ার আর জীবন দুটোই শেষ করে দেবে। জেনিন সোজা হয়ে বসল। তার হাতকড়ার শিকল টেবিলে বাড়ি খেয়ে এক তীক্ষ্ণ শব্দ তুলল।
“নানামি জায়দান একজন সৎ অফিসার,” জেনিন খুব শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল। “সেদিন কর্ণফুলী ব্রিজে সে আমাকে মারার জন্যই গুলি করেছিল। আমি যে বেঁচে গেছি, সেটা আমার ভাগ্য, জায়দানের কৃতিত্ব নয়। আপনারা ওকে সন্দেহ করে শুধু নিজেদের একজন যোগ্য অফিসারকেই হারাচ্ছেন না, বরং আমাকে হাসার সুযোগ দিচ্ছেন।”
“মিথ্যে কথা!” রাইহান চেঁচিয়ে উঠল। “আপনি ওকে বাঁচাতে চাইছেন কারণ ও আপনাদের ইনফরমার!”
জেনিন রাইহানের দিকে এমন এক দৃষ্টিতে তাকাল যে রাইহান মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।
“অফিসার রাইহান, আপনি হয়তো জেনিন নুরশাদকে চেনেন না। আমি কাউকে বাঁচানোর জন্য মিথ্যে বলি না। তাছাড়া সত্য এটাই যে, সেদিন জায়দান তার ডিউটি পালন করেছিল। আমাকে উদ্ধার করেছে ইউজি, জায়দান নয়।”
কমিশনার সাহেব জেনিনের চোখের দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখলেন। তিনি বুঝতে পারছেন, জেনিন কোনো এক অদৃশ্য গেম খেলছে।
“তাহলে আপনি কেন ওর জিপে করে ধরা দিলেন? কেন সরাসরি ডিবির কাছে এলেন না?”
“কারণ আমি চেয়েছিলাম জায়দান যেন তার হারানো সম্মান ফিরে পায়,” জেনিন দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “আমি জানতাম আমি ধরা না দিলে ও সারাজীবন বিভাগীয় তদন্তের মুখে থাকবে। কিন্তু আমি বুঝতে পারিনি যে আপনাদের ডিপার্টমেন্ট নিজের অফিসারদের ওপর কতটা অবিশ্বাসী।”
জেরার এই পর্যায়ে জেনিন হঠাৎ থামল। তার কানে যেন হঠাৎ করেই নোবারার কান্নার শব্দ বাজছে। সে টেবিলের ওপর ঝুঁকে এল।
“কমিশনার সাহেব, আমার ডিল ইউজিকে নিয়ে। জায়দানকে নিয়ে নয়। আপনারা জায়দানকে যা খুশি করুন, কিন্তু ইউজি যদি আজ বিকেলের মধ্যে নোবারার কাছে না পৌঁছায়, তবে আমার মুখ থেকে একটা তথ্যও বের হবে না। আর মনে রাখবেন, জেনিন নুরশাদকে কথা বলানোর ক্ষমতা এই আধুনিক রিমান্ডের কোনো যন্ত্রেরও নেই।”
জেনিনের এই খোলাখুলি হুমকি কমিশনারকে কিছুটা চিন্তায় ফেলে দিল। তিনি জানেন, জেনিনের নেটওয়ার্ক উদ্ধার করতে না পারলে সরকারের ওপর চাপ বাড়বে। তিনি উঠে দাঁড়ালেন।
“আপনার শর্ত বিবেচনা করা হচ্ছে,” কমিশনার যাওয়ার আগে শেষবার ঘুরে তাকালেন। “তবে মনে রাখবেন জেনিন, আপনি এখন খাঁচায় বন্দি সিংহ। আপনার গর্জন এখন আর বাইরের দুনিয়াকে কাঁপাতে পারবে না।”
লোহার দরজাটা আবার বন্ধ হয়ে গেল। জেনিন আবার তার খাটিয়ায় শুয়ে পড়ল। তার মনের আয়নায় এখন কেবল নোবারার ফ্যাকাশে মুখটা ভাসছে। রিক্ততার এই সেলে বসে সে এখন তার জীবনের সবচাইতে বড় জুয়াটা খেলছে, যার একদিকে তার মুক্তি, আর অন্যদিকে নোবারার নিরাপত্তা।
<><><><><><><><><>
পলাতক ইঈজি নিজ থেকেই দরা দিয়েছিল, কারণ জেনিনের ডিল অনুযায়ী তাকে এমনিতেই মুক্তি দেওয়া হবে। ইউজিকে প্রশাসনিকভাবে মুক্তি দেওয়া হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই মুক্তি যেন সোনার খাঁচায় বন্দিত্বের চেয়েও ভয়ঙ্কর। ইউজির কবজিতে এখন হাতকড়া নেই, কিন্তু তার প্রতিটি কদমে, প্রতিটি নিশ্বাসে গোয়েন্দা নজরদারির অদৃশ্য শিকল জড়িয়ে আছে। ডিবির একটি বিশেষ দল সাদা পোশাকে সার্বক্ষণিক তাকে অনুসরণ করছে। কমিশনার সাহেবের নির্দেশ স্পষ্ট, ইউজিকে ব্যবহার করেই জেনিনের বাকি সাম্রাজ্যের হদিস বের করতে হবে। কারণ সেদিন যখন নানামির কাছে জেনিন ধরা দিয়েছিল, ইউজিকেও নানামি নিয়ে এসেছিল। তবে তাকে গ্ৰেফতার করে অন্য সেলে রাখা হয়েছিল বিধায় জেনিনের সাথে তার আর যোগাযোগ হয়নি।
বিকেলের পড়ন্ত রোদে ইউজি যখন নানামির বাসার সদর ফটকে এসে দাঁড়াল, তখন তার অবয়বে এক মাসের ক্লান্তি আর এক অজানা যুদ্ধের ছাপ। ইউজির পরনে একটা সাধারণ কালো হুডি, চোখের নিচে গভীর কালি। গেটের সেন্ট্রিরা তাকে চিনতে পেরেও কয়েক দফা চেক করল। জেনিনের ডান হাত হিসেবে পরিচিত এই মানুষটিকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, এটা যেন খোদ পুলিশের কাছেই এক অবিশ্বাস্য গল্প।
ইউজি ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকল। ড্রয়িংরুমে নানামি বসে ছিল। নানামি এখন আর উর্দি পরা দাপুটে অফিসার নেই, সে এখন একজন সাময়িক বরখাস্ত হওয়া সন্দেহভাজন। তার চোখেমুখে এক ধরণের স্থবিরতা। ইউজিকে দেখে নানামি সোজা হয়ে বসল। ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে থাকা গোয়েন্দা সদস্যরা উৎসুক চোখে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে।
সবাই ভেবেছিল ইউজি দেখা মাত্রই নানামির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। কারণ নানামিই সেই মানুষ যে জেনিনকে গুলি করেছিল, যে জেনিনের সাজানো জীবনটাকে নরকে পরিণত করেছিল। প্রতিশোধের নেশায় ইউজির উন্মাদ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যা ঘটল, তা উপস্থিত সবার ধারণার বাইরে।
ইউজি নানামির খুব কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তার চোখে কোনো রক্তবর্ণ আক্রোশ নেই, বরং সেখানে এক অদ্ভুত কৃতজ্ঞতা খেলা করছে। ইউজি মাথা নিচু করে নানামিকে এক ধরণের নীরব শ্রদ্ধা জানাল। তারপর খুব নিচু স্বরে বলল,
“নান্নামিন ভাই, আপনাকে ধন্যবাদ। বসের শেষ ইচ্ছাটুকু মর্যাদা দেওয়ার জন্য আপনি নিজের ক্যারিয়ারটাকে বাজি ধরলেন, এটা জেনিন বসের প্রতি আপনার বন্ধুত্বের শ্রেষ্ঠ প্রমাণ।”
নানামি ম্লান হাসল। সে ইউজির কাঁধে হাত রাখল। “কিন্তু আমি যে নুরশাদকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেই ডুবে গেলাম।”
ইউজি নানামির চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, “আপনি ডুববেন না। বস আপনাকে ডুবতে দেবেন না। তিনি খাঁচায় ঢোকার আগে আপনার সুরক্ষার ব্যবস্থা করেই গেছেন। আমাদের মাঝে শত্রুতা ছিল অফিসার, কিন্তু আজ এই মুহূর্তে আপনি আর আমি এক নৌকার যাত্রী। কারণ আমাদের দুজনেরই লক্ষ্য এখন এক, ম্যাম এবং বসের রক্তকে আগলে রাখা।”
এই দৃশ্য দেখে গোয়েন্দা সদস্যদের মাঝে খটকা তৈরি হলো। একজন দুর্ধর্ষ মাফিয়া এসিস্ট্যান্ট আর একজন দক্ষ পুলিশ অফিসার, এদের মধ্যে এই মেলবন্ধন কি কোনো বড় ষড়যন্ত্রের অংশ? নাকি জেনিন আড়ালে বসে এমন কোনো চাল চেলেছে যেখানে শত্রু আর মিত্রের সংজ্ঞা বদলে গেছে?
নোবারা তখন দোতলার বারান্দায় বসে ছিল। ইউজির গলার আওয়াজ পেয়ে সে পাগলের মতো নিচে নেমে এল। ইউজিকে দেখে নোবারার দু চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরতে লাগল। ইউজি নোবারাকে দেখামাত্রই হাঁটু গেড়ে মেঝেতে বসে পড়ল। তার কাছে নোবারা এখন কেবল জেনিনের স্ত্রী নয়, সে জেনিনের রেখে যাওয়া শেষ পবিত্র আমানত।
“ম্যাম…” ইউজির কণ্ঠস্বর বুজে এল। “আমি ফিরেছি ম্যাম। বস আমাকে পাঠিয়েছেন।”
নোবারা কম্পিত হাতে ইউজির মাথায় হাত রাখল। “জেনিন কেমন আছে ইউজি? ওরা কি ওকে মারধর করছে? ও কি খেয়েছিল?”
ইউজি চোখ মুছে উঠে দাঁড়াল। সে নোবারাকে সান্ত্বনা দিতে গিয়েও পারল না। জেনিনের বর্তমান পরিস্থিতি সে জানে, কিন্তু নোবারাকে তা জানানো মানে এক নতুন প্যানিক অ্যাটাকের আমন্ত্রণ দেওয়া। “বস শক্ত আছেন ম্যাম। ওনি ভেঙে পড়ার মানুষ নন!”
নানামি পাশে এসে দাঁড়াল। সে তনুজাকে ইশারা করল নোবারাকে ভেতরে নিয়ে যেতে। ইউজি আর নানামি এখন ড্রয়িংরুমে একা। তাদের ওপর ডিবির কড়া নজর।
“ইউজি,” নানামি খুব গম্ভীর গলায় বলল। “তোমাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে মানে এই নয় যে তুমি স্বাধীন। নুরশাদের বিচারের দিন পর্যন্ত তুমি নজরবন্দি। আর আমি… আমি এখন একজন সাধারণ নাগরিকের চেয়েও কম কিছু। আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ এখন নুরশাদের ভাগ্য নির্ধারণ করবে। সাবধানে সবটা করতে হবে।”
ইউজি জানালার বাইরে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করল, “ঠিক বলেছেন, আমাদের বাতাসের বেগে বাকি কাজটুকু সম্পন্ন করতে হবে।”
<><><><><><><><><>
আগামী কাল জেনিন নূরশাদকে প্রথমবারের মতো আদালতে তোলা হবে। কালকের দিনটিই স্থির করবে জেনিনের পরবর্তী ঠিকানা, কাশিমপুর জেল নাকি অন্ধকার কোনো কালকুঠুরি। কিন্তু আজ রাতের এই শেষ প্রহরে, জেনিন কোনো আইনজীবীর মুখ দেখতে চায়নি। সে চেয়েছে নোবারাকে।
নানামি তার সমস্ত ব্যক্তিগত ও পেশাগত ক্ষমতা ব্যবহার করে এই শেষবারের মতো নোবারার সাথে জেনিনের একান্তে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করেছে। এটা হয়তো নানামির ক্যারিয়ারের শেষ ভুল, কিন্তু বন্ধুর প্রতি করা শেষ অঙ্গীকার।
লোহার ভারি দরজাটা খুলে যেতেই নোবারা ভেতরে পা রাখল। তার পরনে কালো রঙের একটি ঢিলেঢালা কামিজ, মাথায় চাদরটা পরম যত্নে জড়ানো। জেনিন টেবিলে মাথা নিচু করে বসে ছিল। নোবারার পদশব্দ পেতেই সে চোখ তুলল। এক রাতের ব্যবধানে জেনিনের চোখের কোণে রক্তবর্ণ আভা ফুটে উঠেছে।
নোবারা কোনো কথা না বলে জেনিনের সামনের চেয়ারটায় বসল। জেনিনের হাত দুটো টেবিলের ওপর রাখা, সেখানে এখন আর হাতকড়া নেই, কিন্তু সেই কবজিতে পড়ে থাকা গভীর দাগগুলো জেনিনের বন্দিত্বের করুণ গান গাইছে।
“আপনি কেন কোনো লয়ার রাখতে চাইছেন না জেনিন?” নোবারার কন্ঠস্বর বড্ড ভাঙা, বড্ড ক্লান্ত। “কাল কোর্টে কি আপনি নিজের সাথে নিজে লড়াই করবেন?”
জেনিন ম্লান হাসল। সে টেবিলের ওপর রাখা নীল রঙের একটি মোটা ফাইলের দিকে ইশারা করল। “লয়াররা সত্যকে সাজিয়ে বলে নূরা, কিন্তু আমি কাল সত্যটাকে উলঙ্গ রাখতে চাই। জেনিন নুরশাদ তার জীবনের শেষ খেলায় কোনো মিথ্যের আশ্রয় নিতে চায় না। কাল আমি যা বলব, তা হবে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ স্বীকারোক্তি।”
নোবারা হাত বাড়িয়ে জেনিনের হাতের ওপর নিজের হাত রাখল। জেনিনের ঠান্ডা হাতগুলো নোবারার উষ্ণতায় সামান্য কেঁপে উঠল।
“আপনি কি তবে সব মেনে নেবেন?” নোবারা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল। “সব খু’নের দায়? সব সিন্ডিকেটের দায়?”
“আমি অপরাধ করেছি নূরা, তা অস্বীকার করার ধৃষ্টতা আমার নেই,” জেনিন নোবারার চোখের দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত গলায় বলল। “কিন্তু কালকের বিচারের চেয়েও আমার কাছে আজকের এই মুহূর্তটা বেশি দামী। এই ফাইলটা দেখুন।”
নোবারা ফাইলটা খুলল। ভেতরে নুরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজের প্রতিটি কলকারখানা, জমি এবং সম্পত্তির বিশদ বিবরণ দেওয়া আছে। জেনিন খুব কৌশলে তার জীবনটাকে দুই ভাগে ভাগ করে রেখেছিল। এক ভাগে ছিল অন্ধকারের জেড, আর অন্য ভাগে ছিল শিল্পপতি জেনিন নুরশাদ।
জেনিনের টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস এবং জুয়েলারি ব্যবসার প্রতিটি পয়সা ঘাম ঝরানো পরিশ্রমের এবং সম্পূর্ণ হালাল। সে তার অন্ধকার জগতের একটা টাকাও এই ব্যবসায় বিনিয়োগ করেনি। তাই সরকারের পক্ষে এই শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো সিল করা বা বাজেয়াপ্ত করা আইনত অসম্ভব।
জেনিন একটি কলম এগিয়ে দিল নোবারার দিকে। “এখানে সাইন করুন। আজ রাত থেকে জেনিন নুরশাদের স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পত্তির মালিক আপনি। আমি চাই না কালকের পর আমার এই পবিত্র ব্যবসাটা নষ্ট হয়ে যাক। আমি চাই আমার অনুপস্থিতিতে আপনি এই কয়েক হাজার শ্রমিকের অন্ন সংস্থানের দায়িত্ব নিন।”
নোবারার হাত কাঁপছে।
“পাগল হয়েছেন আপনি? আমি এসব দিয়ে কী করব জেনিন? আমি কি সম্পদ চেয়েছিলাম আপনার কাছে?”
জেনিন নোবারার হাতের মুঠোটা শক্ত করে ধরল। তার কণ্ঠে এক ধরণের আকুতি।
“এটা সম্পদ নয় নূরা, এটা আমার প্রায়শ্চিত্ত। আমার সব অনৈতিক কাজগুলো আমি নিজের সাথে কবরে নিয়ে যাব, কিন্তু এই যে হাজারো মানুষের মুখে অন্ন তোলার ইন্ডাস্ট্রিগুলো, এগুলো আমি আপনার নামে রেখে যাচ্ছি। আপনি আর আমাদের সন্তান যেন মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারেন। নূরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজের সাথে জেড বা অপরাধের কোনো সম্পর্ক নেই। এটা আপনার অধিকার।”
নোবারার চোখের জল দলিলের ওপর পড়ে কালি কিছুটা লেপে গেল। সে দেখল জেনিন আগেই সব নোবারার নামে লিখে দিয়েছে, কেবল নোবারার সম্মতির স্বাক্ষরটুকু বাকি।
“আপনি কি ফেরার সব পথ বন্ধ করে দিচ্ছেন?” নোবারা ডুকরে কেঁদে উঠল।
জেনিন উঠে দাঁড়াল। সে টেবিলের ওপর ঝুঁকে এসে নোবারার কপালে নিজের কপাল ঠেকাল।
“আমি এমন এক পথে হাঁটছি নূরা, যেখান থেকে ফেরার জন্য কোনো মানচিত্র কাজ করে না। কিন্তু আমি চাই আমার রক্ত যেন কোনোদিন অভাবের কারণে ভুল পথে না যায়। আপনি সিআইডি ছেড়েছেন, জায়দান সাসপেন্ড হয়েছে, আপনাদের এই ত্যাগের বদলে আমি শুধু এই নিরাপত্তাটুকু দিতে পারি।”
নোবারা কাঁপাকাঁপা হাতে দলিলে সই করল। আজ থেকে সে বিশাল এক সাম্রাজ্যের মালকিন, কিন্তু তার মনের জগতটা এখন ভিখারির মতো নিঃস্ব। জেনিন সেই দলিলগুলো সযত্নে তুলে ফাইলে রাখল এবং বেল টিপল সেন্ট্রিকে আসার জন্য।
“সময় শেষ,” জেনিন খুব নিচু স্বরে বলল। “কাল কোর্টে দেখা হবে। তবে মনে রাখবেন, জেডকে আপনারা যতই ঘৃণা করুন, জেনিন নুরশাদ কেবল আপনাকে আর ওই অনাগত প্রাণটাকেই ভালোবেসেছে।”
নোবারা যখন সেল থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে, সে অনুভব করল জেনিনের স্থির দৃষ্টি তার পিঠে বিঁধছে। জেনিন নূরশাদ আজ নিজেকে রিক্ত করে দিল তার প্রিয়তমার ভবিষ্যতের জন্য। কালকের সূর্য তার জন্য ফাঁসিকাষ্ঠ নিয়ে আসবে না কি আজীবন কারাদণ্ড, তা সে জানে না, কিন্তু সে এটুকু নিশ্চিত যে, তার নূরা আর তার সন্তান আজ থেকে নিরাপদ। অন্ধকারের রাজা আজ নিজের সিংহাসন ত্যাগ করল এক বাবার নিঃস্বার্থ দায়বদ্ধতায়।
চলবে ইংশাআল্লাহ.………………
(আগামী পর্বে আদালতের সিনটুকু লিখবো ইংশাআল্লাহ। দোয়া করবেন। আমি আবার সাইন্সের স্টুডেন্ট, আর্টসের হলে একটু আধটু জ্ঞান থাকতো! তাও লিখতে তো হবেই। কিন্তু তার আগে আপনারা আমাকে একটু উৎসাহ দিন তোহ!🥹❣️)

