Soulmate_to_Enemy #পর্ব_৭৩

0
2

#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_৭৩ (আদালতে মাফিয়ার বিচারকার্য!)
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম

ঢাকার জজ কোর্ট এলাকা। সকাল থেকেই জনস্রোত আছড়ে পড়ছে আদালত প্রাঙ্গণের প্রতিটি মোড়ে। আকাশটা আজ মেঘলা, থমথমে এক গুমোট ভাব বাতাসে। তবে মানুষের উত্তেজনা সেই গুমোট আবহাওয়াককেও ছাপিয়ে গেছে। রাস্তার দু-ধারে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে শত শত সাধারণ মানুষ, যাদের অনেকের হাতে জেনিন নূরশাদের ছবি সংবলিত প্ল্যাকার্ড, আবার কারো চোখে তীব্র ঘৃণা।

আদালত ভবনের ছাদে এবং আশেপাশের উঁচু দালানগুলোতে র‍্যাবের স্নাইপার পজিশন নিয়েছে। পুলিশের রায়ট কার, জলকামান আর প্রিজন ভ্যানগুলো এমনভাবে মোতায়েন করা হয়েছে যেন কোনো বড় ধরণের দাঙ্গা দমনের প্রস্তুতি চলছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে খবর আছে, জেনিনের প্রতিপক্ষ গ্যাংগুলো এই সুযোগে তাকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে, আবার তার অনুসারীরাও তাকে ছিনিয়ে নেওয়ার পাগলামি করতে পারে।

সকাল থেকেই সংবাদপত্রের প্রতিটি পাতা এবং টেলিভিশন স্ক্রিনের শিরোনামগুলো কেবল একটি নামেই আবর্তিত হচ্ছিল।

যমুন টিভি-“পতন নাকি পুনর্জন্ম? আজ কাঠগড়ায় জেনিন নুরশাদ।”

চ্যানেল আই ব্রেকিং নিউজ- “আদালতে নিয়ে আসা হচ্ছে জেনিন নুরশাদকে; এলাকাজুড়ে পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা বেষ্টনী।”

টেলিভিশন রিপোর্টাররা মাইক্রোফোন হাতে জনস্রোতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে হাঁপাচ্ছেন।

প্রথম আলো-র রিপোর্টার লাইভে বলছিলেন,

“দর্শক, আমি এখন ঢাকা জজ কোর্টের
প্রধান ফটকের সামনে। ঠিক ১০ মিনিট পর জেনিন নুরশাদকে বহনকারী প্রিজন ভ্যানটি এখানে পৌঁছানোর কথা। আপনারা দেখতে পাচ্ছেন, মানুষের ভিড় সামলাতে পুলিশকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। একদিকে নূরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজের শত শত শ্রমিক যারা তাদের মালিকের মুক্তি চাইছে, অন্যদিকে জেনিনের হাতে সর্বস্ব হারানো বিচারপ্রার্থীদের হাহাকার। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আজ সর্বোচ্চ সতর্কতায়।”

ভিড়ের এক পাশে দাঁড়িয়ে নুরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজের কয়েকশ নারী শ্রমিক বিলাপ করছিলেন। তাদের হাতে কোনো শ্লোগান নেই, কেবল চোখের জল। তাদের কাছে জেনিন কোনো ডন নয়, বরং সেই অন্নদাতা যে তাদের সন্তানদের পড়ার খরচ দেয়।

“আমাদের বাবারে ফিরায় দেন! হ্যায় তো চোর-ডাকাত না, হ্যায় গরিবের মা-বাপ!” এক বৃদ্ধা বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন।

ঠিক তার বিপরীতে একদল মানুষ কালো কাপড় বেঁধে বিক্ষোভ করছিল। এরা জেনিনের অপরাধ সাম্রাজ্যের শিকার। তাদের একজনের হাতে একটি ছবি, তার নিখোঁজ হওয়া ছেলের।
“আমরা বিচার চাই! জেনিন নুরশাদের ফাঁসি চাই! কত মায়ের বুক খালি করেছে এই লোকটা, আজ ওর কোনো মাফ নেই!”

আদালত পাড়ার চায়ের দোকানগুলোতেও তর্কের তুফান বইছিল। সাধারণ মানুষের কাছে জেনিন এক রহস্যময় চরিত্র। কেউ তাকে বাংলার রবিন হুড বলছে, কেউ বলছে নরকের কীট!

বেলা ১১টা বাজার ঠিক পাঁচ মিনিট আগে সাইরেনের তীব্র শব্দে প্রকম্পিত হয়ে উঠল আদালত চত্বর। একে একে ছয়টি পুলিশের পাহারাদার জিপ আর দুটি র‍্যাবের গাড়ি আদালত প্রাঙ্গণে ঢুকল। একদম মাঝখানে সেই বুলেটপ্রুফ প্রিজন ভ্যান। ভ্যানটি থামামাত্রই কয়েক হাজার ক্যামেরা ফ্ল্যাশ একসাথে জ্বলে উঠল। দরজা খুলতেই বেরিয়ে এল সাদা পোশাকধারী সশস্ত্র কমান্ডোরা।
তারপর, বেরিয়ে এল সে।

—জেনিন নুরশাদ—

তার পরনে একটি ধবধবে সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট। তার দু-হাতে ভারী হাতকড়া। দীর্ঘ পনেরো দিনের নির্জন কারাবাস আর মানসিক দহনে সে কিছুটা রোগা হয়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু তার শরীরী ভাষায় কোনো পরাজয়ের চিহ্ন নেই। জেনিন গাড়ি থেকে নেমে একবার আকাশের দিকে তাকাল। তার চোখ দুটো যেন জ্বলছে। ধীরস্থির পায়ে, মাথা উঁচু করে সে এগোতে লাগল।

সাংবাদিকরা একে অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছিলেন একটা মন্তব্য শোনার জন্য।
“জেনিন নুরশাদ, আপনি কি সব অপরাধ স্বীকার করবেন?”

“আপনার ডিল কি সফল হয়েছে?”

“আপনার স্ত্রীর জন্য আপনার শেষ বার্তা কী?”

জেনিন কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু একবার ভিড়ের দিকে তাকাল। তার নজরে পড়ল কিছু শ্রমিকের চোখের জল। মুহূর্তের জন্য জেনিনের চোয়াল শক্ত হয়ে এল, তারপর সে শান্ত ভঙ্গিতে আদালত কক্ষের করিডোরে ঢুকে পড়ল।

আদালত কক্ষের ভেতরের এক কোণে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে নানামি জায়দান। তার চোখেমুখে এক অদ্ভুত, ক্লান্ত প্রশান্তি, যেন এক দীর্ঘ ঝড়ের পর নাবিক অবশেষে তীরের দেখা পেয়েছে। তার ঠিক পাশেই অ্যালার্ট পজিশনে দাঁড়িয়ে আছে ইউজি। ইউজির বাঘের মতো তীক্ষ্ণ চোখ দুটো প্রতিটা সেকেন্ডে আদালতের ভেতরের ছোটখাটো মুভমেন্ট, এমনকি প্রহরীদের হাতের বন্দুকের ট্রিগারের নড়াচড়া পর্যন্ত নিখুঁতভাবে মেপে নিচ্ছে। জেনিন নূরশাদের আসনটা আজ শূন্য নয়, কিন্তু তার পাশে বসার জন্য নির্ধারিত প্রথম সারির কাঠের চেয়ারটা তখনো খালি পড়ে আছে। নোবারা নূরশাদ তখনো এসে পৌঁছায়নি। সেই খালি আসনটা যেন এক নীরব হাহাকার
ছড়াচ্ছে পুরো ঘরে!

বাইরে তখন স্লোগান, উল্লাস আর বিশৃঙ্খলার শব্দে কান পাতা দায়। রাজপথের উত্তাল জনতাকে সামলাতে পুলিশকে রীতিমতো লাঠিচার্জ করতে হচ্ছে। দেশের প্রতিটা নিউজ চ্যানেলে ব্রেকিং নিউজ স্ক্রল হচ্ছে, লাইভ কাভারেজে কোটি কোটি দেশবাসী রুদ্ধশ্বাসে টিভির সামনে বসে অপেক্ষা করছে, কী হতে চলেছে মাফিয়া জেডের ভাগ্যে?

অবশেষে বিচারক মহোদয় গম্ভীর মুখে এজলাসে এসে বসলেন। আদালত কক্ষের কোলাহল এক নিমেষে স্তব্ধ হয়ে গেল। জজ সাহেবের ইশারায় জেনিন নুরশাদকে যখন লোহার ডাণ্ডাবেড়ি পরা অবস্থায় ছোট কাঠের খাঁচাসদৃশ কাঠগড়াটায় এনে দাঁড় করানো হলো, তখন এক পিনপতন নীরবতা নেমে এল। জেনিনের হাত ও পায়ের ভারী শিকলগুলো নড়ে উঠতেই এক বিষণ্ণ, কর্কশ ধাতব শব্দ পুরো ঘরে প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠল। জেনিন কোনো প্রকার কুন্ঠা বা দ্বিধা ছাড়াই সরাসরি জজ সাহেবের চোখের দিকে তাকাল। তার শরীরী ভাষায় কোনো অনুশোচনা নেই, কোনো প্রাণভিক্ষার আকুতি নেই, আছে কেবল এক ধরণের নির্লিপ্ত অহংকার। এটি কোনো সাধারণ বিচার নয়, এটি জেনিন নুরশাদের জীবনের সবচাইতে বড় পারফরম্যান্স! সে কোনো ডিফেন্স লয়ার বা আইনজীবী রাখেনি, সে নিজেই নিজের হয়ে লড়বে।

প্রসিকিউটর এডভোকেট মোজাম্মেল সাহেব নিজের কালো কোটটা টেনেটুনে সোজা করলেন। চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে টেবিলের ওপর রাখা এক বিশাল ঢাউস ফাইল টেনে নিলেন তিনি। জেনিনের দিকে এক চরম অবজ্ঞা আর তাচ্ছিল্যের দৃষ্টি হেনে তিনি জজ সাহেবের দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন।

মোজাম্মেল সাহেবের চড়া কণ্ঠস্বর পুরো এজলাসে আছড়ে পড়ল,
“মাননীয় আদালত! আজ আমরা এখানে কোনো সাধারণ চোর বা পকেটমারের বিচারের জন্য দাঁড়াইনি। আজ এই কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছে এমন একজন আসামী, যাকে এদেশের অন্ধকার জগতের অদৃশ্য ছায়াসাম্রাজ্যের সম্রাট বলা চলে। জেনিন নূরশাদ ওরফে জেড।”

আইনজীবী প্রথম ফাইলটা খোলে একটা বিশেষ পৃষ্ঠা বের করলেন। আদালতের ভেতরের দর্শকরা সিটে নড়েচড়ে বসল। মোজাম্মেল সাহেব ফাইলটা উঁচিয়ে ধরে আবার বলতে শুরু করলেন,
“খু’ন, গুম, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা, অবৈধ অস্ত্রের বিশাল কারবার আর আন্তর্জাতিক ড্রাগ সিন্ডিকেটের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ততা, সবকিছুর অকাট্য প্রমাণ এই ফাইলে খোদাই করা আছে মাই অনার। কিন্তু সবচাইতে ভয়ংকর তথ্যটা অন্য জায়গায়।”

মোজাম্মেল সাহেব জেনিনের দিকে এক পা এগিয়ে গেলেন। জেনিন তখনো দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে এক অদ্ভুত ম্লান হাসিতে মগ্ন। তার এই পাত্তা না দেওয়ার ভাব দেখে আইনজীবী কিছুটা ক্ষিপ্ত হয়ে জজ সাহেবের উদ্দেশ্যে বললেন,
“মাননীয় আদালত, এই আসামী কতটা ধূর্ত তা তার মনস্তাত্ত্বিক প্রোফাইল না দেখলে বোঝা যাবে না। চিকিৎসা বিজ্ঞানের আন্তর্জাতিক গবেষণামতে, আমাদের মতো সাধারণ মানুষের আইকিউ যেখানে সাধারণত ৯০ থেকে ১১০ এর মধ্যে ওঠানামা করে, সেখানে এই দুর্ধর্ষ মাফিয়ার আইকিউ টেস্টের রেজাল্ট এসেছে অবিশ্বাস্য ১৪৮ এর চেয়েও বেশি! যা তাকে আক্ষরিক অর্থেই এক প্রখর প্রতিভাবান বা জিনিয়াস রেঞ্জে দাঁড় করায়। এই অতিমানবীয় বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়েই সে তার প্রতিটি ক্রাইম অপারেশন এতটা নিখুঁতভাবে করত যে, আন্ডারওয়ার্ল্ডে তাকে শ্যাডো কিং বা ছায়ারাজ বলে ডাকা হতো। এমনকি সুদূর প্যারিসের মাফিয়া ওয়ার্ল্ডেও তার একটা বিশেষ কোডনেম আছছ…প্যানথেরা লিও…যার অর্থ বনের রাজা সিংহ!”

কয়েক সেকেন্ড বিরতি নিলেন অ্যাডভোকেট সাহেব। অতঃপর পুনরায় বলা শুরু করলেন,

“মাননীয় আদালত, আসামী জেনিন আত্মসমর্পণ করেছে শোনার পর আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ICC থেকে মামলাটা তাদের অধীনে নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ প্রশাসনের ওপর তীব্র কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। শুধুমাত্র সে জন্মসূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক হওয়ায় আজ এই দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে আমরা তার বিচার করার সৌভাগ্য লাভ করেছি।”

আইনজীবীর মুখে জেনিনের এই দুর্ধর্ষতার বিবরণ শুনে আদালত কক্ষে বসা জুনিয়র লয়ার আর সাংবাদিকদের মধ্যে ফিসফিসানি শুরু হয়ে গেল। মোজাম্মেল সাহেব পরিস্থিতি সামলাতে নিজের গলার টাইটা একটু আলতো করে নিলেন এবং দ্বিতীয় একটি ফাইল মেললেন।

এডভোকেট মোজাম্মেল সাহেব একটু নাটকীয় বিরতি নিয়ে বললেন,
“এবার আসা যাক তার আত্মসমর্পণের মূল কারণ নিয়ে। আসামী জেনিন নুরশাদ তার জবানবন্দীতে দাবি করেছেন, তিনি তার স্ত্রী এবং অনাগত সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে অপরাধ জগত ছেড়ে আত্মসমর্পণ করেছেন। আমি জোর গলায় বলতে চাই, ভুল, সম্পূর্ণ ভুল মাই অনার! জেনিন নুরশাদের অবর্তমানেও তার স্ত্রী নোবারা আকারি সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তায় ছিলেন এবং ভবিষ্যতেও থাকবেন। আর এই নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার ব্লুপ্রিন্ট স্বয়ং এই জেনিন নূরশাদই তৈরি করে দিয়ে গেছেন। তাহলে আসল সত্যটা কী?”

মোজাম্মেল সাহেব এবার সরাসরি জেনিনের ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা নানামি জায়দানের দিকে আঙুল তুললেন। নানামি এক মুহূর্তে শক্ত হয়ে গেল।

“আসল সত্য হলো, জেনিন নূরশাদ আত্মসমর্পণ করেছেন তার পরম বন্ধু, কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের এসি নানামি জায়দানের কারণে! মাননীয় আদালত, যখন ওপর মহল থেকে নানামির ওপর তীব্র প্রেসার ক্রিয়েট করা হচ্ছিল জেনিনকে জ্যান্ত অথবা মৃত উদ্ধার করার জন্য, ঠিক তখনই এই আসামী নিজের সমস্ত দম্ভ বিসর্জন দিয়ে নিজে এসে ধরা দিয়েছেন। শুধুমাত্র নিজের বন্ধুর জীবন, তার সম্মান আর ক্যারিয়ার রক্ষা করতে এই মাফিয়া জেড আজ এই খাঁচায় বন্দি। নয়তো একে বন্দি করার ক্ষমতা এই পৃথিবীর কোনো এজেন্সির হতো কি না, তা নিয়ে খোদ রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মনেও সন্দেহ আছে! আজ যদি এই আদালতে আসামীর সর্বোচ্চ সাজাও হয়, তবে তার বিনিময়ে আমরা এটুকু বুক ঠুকে বলতে পারি, নানামি জায়দান নামের একজন সৎ অফিসার রক্ষা পেয়েছেন শুধুমাত্র এই অপরাধীর একতরফা বন্ধুত্বের বলিদানে!”

মোজাম্মেল সাহেব তার দীর্ঘ বক্তব্য শেষ করে গম্ভীর মুখে নিজের আসনে গিয়ে বসলেন। পুরো আদালত কক্ষে যেন একটা বড়সড় সুনামি বয়ে গেল।

নানামি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে দেয়ালটা ধরে এক চরম অনুশোচনা আর অপরাধবোধের আগুনে পুড়তে পুড়তে মাথা নিচু করে ফেলল। তার চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসতে চাইল। জেনিন যে তাকে বাঁচানোর জন্যই নিজের জীবনটা এভাবে বাজি রেখেছে, এই সত্যটা আজ প্রকাশ্য আদালতে সর্বসমক্ষে তাকে এক চরম গ্লানির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিল। তনুজা থাকলে এতোক্ষণে হয়তো কান্না করে দিত, ভাগ্যিস এ তাকে আসতে নিষেধ করেছিল! ইউজি এক পাশে দাঁড়িয়ে নিজের চোয়াল শক্ত করে রইল, তার চোখে তখন জেনিনের প্রতি অপরিসীম শ্রদ্ধা আর আইনজীবীর প্রতি এক সুপ্ত ক্ষোভ জ্বলজ্বল করছে। সে পারছে না ছুটে গিয়ে আইনজীবীকে পরপর কয়েকটা গুলি চালিয়ে দিতে, তাও আবার মুখের ভেতর! তবুও সে নিজেকে বহু কষ্টের সংযত করে নিল।

অথচ, যার জন্য এই পুরো আদালতে এত হুলস্থুল, এত কান্না, এত আইনি মারপ্যাঁচ, সেই জেনিন নুরশাদ নিজের জায়গায় সম্পূর্ণ অবিচল! সে মোজাম্মেল সাহেবের এত বড় বড় অভিযোগের পাহাড়ের দিকে একটা বারও তাকাল না। সে যেন এই পুরো আদালত, বিচারক আর আইনকে তার পায়ের বুড়ো আঙুলের সমতুল্য মনে করছে। জেনিন কাঠগড়ার কাঠের রেলিংয়ে নিজের হাতকড়া পরা হাত দুটো আলতো করে রাখল। তার ঠোঁটের কোণে ঝুলছে চিরচেনা, ধারালো আর অহংকারী হাসি। আইনজীবী তার বদনাম করতে গিয়ে যে আসলে জেনিনের ক্ষমতারই জয়গান গেয়ে দিল, তা জেনিন খুব ভালো করেই উপভোগ করছে। যাক, আজকে ধরা না দিলে তার এতো জয়গান শুনা মিস হয়ে যেত বলে আফসোস
হচ্ছে না তার‌। হা হা হা!

মিনিট খানেক পর, পুরো আদালত কক্ষের স্তব্ধতাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে এডভোকেট মোজাম্মেল এবার সরাসরি জেনিনের দিকে ডান হাতের তর্জনী তুলে ধরলেন। তার চোখ দুটোতে একাধারে ক্ষোভ আর জেনিনের ওই পাথুরে শান্ত ভাবটা ভেঙে দেওয়ার এক মরিয়া চেষ্টা। তিনি নিজের গলার স্বর সর্বোচ্চ উঁচুতে তুলে গর্জে উঠলেন,
“আশ্চর্যের বিষয় হলো, আসামী তার পক্ষে কোনো আইনজীবী নিয়োগ করেনি। সে কি নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে মনে করে? নাকি সে জানে যে কোনো আইনজীবীই তার এই পাপাচার ঢাকতে পারবে না?”

মোজাম্মেল সাহেবের এই চড়া সুরের আক্রমণাত্মক প্রশ্নে পুরো এজলাসে এক মুহূর্তের জন্য গুঞ্জন শুরু হলো। পেছনে বসে থাকা সাংবাদিক আর দর্শকরা নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করতে লাগলেন। কিন্তু জেনিন? জেনিন নূরশাদ একটুও নড়ল না। তার চোখের পাতাটা পর্যন্ত কাঁপল না। কাঠগড়ার কাঠের রেলিংয়ে হাত রেখে সে যেভাবে প্রসিকিউটরের দিকে তাকিয়ে রইল, তাতে কোনো অপরাধবোধ তো দূর, উল্টো এক ধরণের অবজ্ঞাপূর্ণ ম্লান হাসি তার ঠোঁটের কোণে খেলে গেল। যেন কোনো এক দক্ষ অভিনেতা থিয়েটারের মঞ্চে এক আনাড়ি কৌতুক অভিনেতার অভিনয় দেখছে!

এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা ইউজির হাতের মুঠো আরও শক্ত হয়ে এল, তার চোয়াল জোড়া রাগে চিবিয়ে উঠল। জেনিনের দিকে কেউ এভাবে আঙুল তুলবে, এটা তার মাফিয়া সত্ত্বা নিতে পারছিল না। নানামি ইউজির কাঁধে হাত রেখে ইশারায় তাকে শান্ত থাকতে বলল, কিন্তু নানামির নিজের চোখ দুটোও তখন প্রসিকিউটরের দিকে তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে।

বিচারক সাহেব তার টেবিলের কাঠের হাতুড়িটা হালকা করে দুবার ঠুকলেন।
“অর্ডার…অর্ডার!”

মুহূর্তেই পুরো ঘর আবার নিস্তব্ধতায় ডুবে গেল। জজ সাহেব তার চশমাটা নাকের ওপর একটু নামিয়ে এনে জেনিনের দিকে সরাসরি তাকালেন। জেনিনের এই নির্লিপ্ততা খোদ বিচারককেও এক অদ্ভুত দোলাচলে ফেলে দিয়েছে। তিনি গম্ভীর, ভারী গলায় জেনিনকে সম্বোধন করলেন,
“আসামী জেনিন নুরশাদ, আপনি কি নিজের স্বপক্ষে কিছু বলতে চান? আদালত আপনাকে একজন সরকারি আইনজীবী দেওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছে।”

বিচারকের এই প্রস্তাবের পর পুরো এজলাসের সবার দৃষ্টি গিয়ে থমকে গেল জেনিনের ওপর। জেনিন এক মুহূর্ত সময় নিল। তার হাতকড়া পরা হাত দুটো সামান্য নড়তেই ডাণ্ডাবেড়ির সেই তীক্ষ্ণ ধাতব ঝনঝনানি শব্দটা আদালতের নিস্তব্ধ বাতাসে এক অদ্ভুত গম্ভীর সুর তুলল। জেনিন বিচারক সাহেবের চোখের দিকে তার সেই সম্মোহনী ও প্রখর দৃষ্টিপাত স্থির রেখে অত্যন্ত শান্ত, ধীর অথচ বুক কাঁপানো গম্ভীর কণ্ঠে জবাব দিল,
“ধন্যবাদ মাননীয় আদালত। কিন্তু যে জীবন আমি যাপন করেছি, তার ব্যাখা কোনো আইনজীবীর পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। আমি নিজের ডিফেন্স নিজেই করব। তবে আমার জবানবন্দি দেওয়ার আগে আমি একজন মানুষের জন্য অপেক্ষা করছি।”

ঠিক সেই মুহূর্তেই আদালত কক্ষের পেছনের ভারী দরজাটা খুলে গেল। দুজন কনস্টেবলের পাহাড়ায় ভেতরে প্রবেশ করল নোবারা।

পুরো কক্ষের সকল মানুষের দৃষ্টি এক নিমেষে নোবারার ওপর গিয়ে আছড়ে পড়ল। নোবারার পরনে একটি সাদা সুতির শাড়ী, তার ওপর হালকা নীল রঙের একটি চাদর জড়ানো, যাতে তার প্রেসনেনসির কারণে ফুলে ওঠা পেট দেখা না যায়। তার মুখটা ফ্যাকাশে, কিন্তু চোখের মণি দুটো যেন জ্বলছে। গর্ভাবস্থার এই ক্লান্তিতেও সে যখন ধীর পায়ে জেনিনের দিকে এগিয়ে আসছিল, মনে হচ্ছিল সে কোনো অজেয় সম্রাজ্ঞী।

জেনিন নোবারাকে দেখামাত্রই তার পাথরের মতো শক্ত মুখে এক মুহূর্তের জন্য কোমলতা খেলে গেল। সে হাতকড়া পরা হাত দুটো একটু উঁচিয়ে যেন নোবারাকে অভয় দিতে চাইল। নোবারা এসে কাঠগড়ার ঠিক তিন ফুট দূরত্বে রাখা বেঞ্চটিতে বসল। তার আর জেনিনের চোখের ভাষা বিনিময় হলো কয়েক সেকেন্ডের জন্য।

এসপি মাহমুদ আর ডিআইজি সাহেব পাশেই বসে ছিলেন। নোবারাকে এভাবে জেনিনের সামনে এসে বসতে দেখে তারা বিরক্তিতে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। কিন্তু নোবারার কাছে এই জগতটা আজ অর্থহীন। তার সমস্ত পৃথিবী এখন ওই কাঠের খাঁচার ভেতর বন্দি।

প্রসিকিউটর সাহেব আবার শুরু করলেন,
“মাননীয় আদালত, আমি চার্জশিটের প্রথম পাতা থেকেই শুরু করতে চাই। ২০১৯ সালের মে মাসে চট্টগ্রামের বন্দর এলাকায় যে তিনজনের লাশ পাওয়া গিয়েছিল…”

“আমি বাধা দিচ্ছি।” জেনিন খুব শান্ত স্বরে বলল।
সবাই চমকে উঠল। জেনিন বিচারকের দিকে তাকিয়ে বলল, “মাননীয় আদালত, প্রসিকিউটর সাহেবকে এই দীর্ঘ ফাইল পড়ে সময় নষ্ট করতে মানা করুন। আমি আজ আদালতে সময় নিতে আসিনি। আমি আপনাদের কাজ সহজ করে দিতে চাই।”

বিচারক অবাক হয়ে চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করলেন। “আপনি কী বলতে চাইছেন জেনিন নুরশাদ?”

জেনিন নোবারার চোখের দিকে একবার তাকাল। তারপর পুরো আদালত কক্ষের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট গলায় বলল, “এই ফাইলে জেনিন নূরশাদ আর জেডের নামে যতগুলো অভিযোগ আছে, তার নব্বই ভাগই সত্য। আমি কোনো অপরাধ অস্বীকার করছি না। আমি নুরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজের আড়ালে যে অন্ধকার জগতটা চালিয়েছি, তার প্রতিটি দায় আমি স্বীকার করে নিচ্ছি। জেরা করার প্রয়োজন নেই, আমি নিজেই সব স্বীকারোক্তি সই করে দিচ্ছি।”

পুরো আদালত কক্ষে এক প্রলয়ংকারী চিৎকার আর গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল। সাংবাদিকরা হুড়োহুড়ি শুরু করল। একজন মাফিয়া ডন এভাবে নিজে থেকে সব স্বীকার করে নেবে, এটা কেউ কল্পনাও করেনি। জেনিন যদি সব স্বীকার করে নেয়, তবে তার জন্য সরাসরি মৃ’ত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অনিবার্য!

নোবারা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে জল টলমল করছে। “জেনিন! আপনি কী বলছেন এসব?”

প্রসিকিউটর সাহেবও থতমত খেয়ে গেছেন। তার সাজানো মামলা এভাবে এক মিনিটে জেনিন নিজে শেষ করে দেবে, তা তিনি ভাবেননি। জেনিন বিচারকের দিকে তাকিয়ে আবার বলল,
“তবে আমার একটা শর্ত আছে। আমি আমার সব অপরাধ স্বীকার করছি ঠিকই, কিন্তু জেনিন নুরশাদ হিসেবে নয়, জেড হিসেবে। আমার এই অন্ধকার জগতের সাথে আমার ইন্ডাস্ট্রির শ্রমিকদের কিংবা আমার স্ত্রীর কোনো সম্পর্ক ছিল না। আমার সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী এখন নোবারা নুরশাদ। তাকে যেন কোনো ধরণের হয়রানির শিকার হতে না হয়।”

আদালত কক্ষের উত্তাল আবহে নোবারা কেবল ডুকরে কেঁদে উঠল। সে বুঝতে পারল, জেনিন নিজেকে বলির পাঁঠা বানিয়ে নোবারাকে আর তাদের সন্তানকে এক নিরাপদ জীবনের চাবিকাঠি দিয়ে দিচ্ছে। জেনিনের এই স্বীকারোক্তি মানেই তার চিরস্থায়ী বিদায়।

প্রসিকিউটর মোজাম্মেল সাহেব যে ফাইলটা নিয়ে এতক্ষণ দাপট দেখাচ্ছিলেন, সেটা এখন তার হাতে কাঁপছে। জেনিন নূরশাদ ওরফে জেড তার কাঠগড়ার চার দেয়ালের ভেতর থেকেও এমন এক ব্যক্তিত্ব ছড়িয়ে দিচ্ছে যে, পুরো এজলাস যেন এক অদৃশ্য সম্মোহনে আচ্ছন্ন। সে অপরাধ স্বীকার করেছে ঠিকই, কিন্তু সেই স্বীকারোক্তি কোনো ক্ষমা প্রার্থনা নয়, বরং এক দোর্দণ্ড প্রতাপী সম্রাটের শেষ রাজকীয় ঘোষণা।

জেনিন তার হাতকড়া পরা হাত দুটো টেবিলের ওপর রাখল। লোহার শিকলের ঝনঝনানি শব্দটা এবার কোনো বন্দির আর্তনাদ মনে হলো না, মনে হলো কোনো রণক্ষেত্রের দামামা। সে বিচারকের দিকে তাকিয়ে খুব ধীরস্থিরভাবে বলতে শুরু করল।
“মাননীয় আদালত, আমি যখন কথা বলি, তখন মাঝপথে কথা বলার ধৃষ্টতা এ পর্যন্ত কেউ দেখায়নি। আশা করি আজ এই পবিত্র স্থানেও সেই নিয়ম বহাল থাকবে।”

জেনিনের কণ্ঠস্বর নিচু, কিন্তু তাতে এক ধরণের অমোঘ গাম্ভীর্য। বিচারক নিজেও এক মুহূর্তের জন্য যেন স্থবির হয়ে গেলেন। জেনিন নোবারার দিকে তাকাল না, কিন্তু সে অনুভব করতে পারছে নোবারার কম্পিত নিঃশ্বাস।

“আমি খু’নি, এটা সত্য। কিন্তু আমি সেই সমাজকে হত্যা করেছি যা প্রতিদিন হাজারো নিরপরাধ মানুষকে তিলে তিলে মেরে ফেলে। আমি ড্রাগ সিন্ডিকেট চালিয়েছি, এটাও সত্য। কিন্তু সেই সিন্ডিকেটের হাত দিয়ে আমি এই শহরের বড় বড় মুখোশধারী ভদ্রলোকদের পকেট থেকে কোটি কোটি টাকা বের করে এনে আমার নুরশাদ ফাউন্ডেশনে দিয়েছি, যেখানে আজ পাঁচ হাজার অনাথ শিশু মানুষের মতো বড় হচ্ছে।”

জেনিন একটু থামল। সে কাঠগড়ার ওপর ভর দিয়ে সামনের দিকে ঝুঁকলো। তার চোখের মণি দুটো যেন জ্বলন্ত কয়লা।

“প্রসিকিউটর সাহেব আমাকে ধূর্ত বললেন? ভুল বললেন অফিসার। ধূর্ত শিয়াল হয়, সিংহ নয়। আমি এই সিস্টেমের চোখে ধুলো দেইনি, আমি সিস্টেমটাকে নিজের হাতের ইশারায় চালিয়েছি। আজ আমি এখানে দাঁড়িয়েছি কারণ আমি ক্লান্ত নই, বরং আমি তৃপ্ত। আমি আমার সাম্রাজ্য নোবারার নামে লিখে দিয়েছি কারণ আমি জানি, আমার তৈরি করা এই বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালনার যোগ্যতা কেবল ওরই আছে। আর যারা ভাবছেন জেনিন নুরশাদকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়ে আপনারা শান্তি পাবেন, তাদের বলছি, জেনিন মরে গেলেও এই শহরে জেড-এর যে ছায়া আমি রেখে যাচ্ছি, তা আপনাদের ঘুম কেড়ে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট।”

পুরো আদালত কক্ষে এক রোমহর্ষক নীরবতা। কেউ টু শব্দ করার সাহস পাচ্ছে না। জেনিনকে আজ কোনো অপরাধী মনে হচ্ছে না, মনে হচ্ছে সে নিজেই এক বিচারক, যে পুরো ঘুণে ধরা সমাজটার বিচার করছে।

প্রসিকিউটর সাহেব তোতলাতে তোতলাতে বললেন,
“কিন্তু… কিন্তু জেনিন সাহেব, আপনি তো জেনেশুনে আইন ভেঙেছেন…”

জেনিন এবার সরাসরি প্রসিকিউটরের চোখের দিকে তাকিয়ে এক বিদ্রূপের হাসি হাসল।
“আইন? যে আইন ধনীদের জন্য রক্ষক আর গরিবের জন্য ভক্ষক, সেই আইনের প্রতি সম্মান দেখানোর রুচি আমার কোনোদিন হয়নি। আমি যা করেছি, নিজের শক্তিতে করেছি। আর আজ যা করছি, নিজের ইচ্ছায় করছি। জেনিন নুরশাদকে কেউ গ্রেফতার করতে পারেনি, সে নিজেই ধরা দিয়েছে। জেনিন নুরশাদকে কেউ সাজা দিতে পারবে না, সে নিজেই নিজের প্রায়শ্চিত্ত বেছে নিয়েছে।”

নোবারা স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে আছে। সে দেখছে সেই জেনিনকে, যার প্রেমে সে একদিন পড়েছিল। সেই উদ্ধত, নির্ভীক আর রহস্যময় মানুষটি। মানুষটা মরে যাবে, তাও অহংকার ছাড়বে না!

বিচারক সাহেব হাতুড়ি ঠুকে আজকের মতো আদালত মুলতবি ঘোষণা করলেন। চারদিকের কোলাহল, সাংবাদিকদের ক্যামেরার অবিরাম ফ্ল্যাশ আর আইনজীবীদের গুঞ্জনের মাঝেই পুলিশ কমান্ডোরা জেনিনকে ঘিরে ফেলল। জেনিনকে কাঠগড়া থেকে নামিয়ে যখন পেছনের দরজা দিয়ে বের করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন করিডোরের এক কোণে নোবারা এসে দাঁড়াল।

নোবারার সারা শরীর তখন কাঁপছে। গর্ভাবস্থার এই নাজুক সময়ে আদালতের ভেতরের রোমহর্ষক পরিস্থিতি এবং জেনিনের নিজের মুখে সব অপরাধ স্বীকার করে নেওয়ার ধাক্কাটা সে নিতে পারছিল না। তার ফুসফুস যেন বাতাস টানতে ভুলে যাচ্ছিল, চারপাশের দেয়ালগুলো গোল হয়ে তার দিকে ধেয়ে আসছিল, তার চেনা ভয়ঙ্কর প্যানিক অ্যাটাক আবার তাকে গ্রাস করতে শুরু করেছে। নোবারার হাত-পা বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে এল, সে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে কোনোমতে নিজের ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করল, কিন্তু তার অবশ হয়ে আসা শরীরটা ধীরে ধীরে মেঝের দিকে নুয়ে পড়তে লাগল।

“নূরা!”

সব প্রটোকল, সব আইনি বেষ্টনী আর শত শত বন্দুকের নলকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে জেনিন এক ঝটকায় পুলিশ অফিসারদের সরিয়ে নোবারার দিকে ছুটে এল। জেনিন তার হাতকড়া পরা দুই হাত বাড়িয়ে নোবারাকে মেঝেতে পড়ে যাওয়ার আগেই আগলে নিল। জেনিনের বুকের শক্ত ওমটা পেতেই নোবারা তার হাত দুটো দিয়ে জেনিনের শ্বেতশুভ্র শার্টের কলারটা খামচে ধরল। তার চোখ দিয়ে তখন অবাধ্য নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে, ঠোঁট দুটো নীল হয়ে গেছে।

“কেন করলেন এমন? কেন সব নিজের কাঁধে নিলেন?” নোবারা হিক্কা তুলে কেঁদে উঠল, তার কণ্ঠস্বর কান্নায় বুজে আসছিল। “আপনি কি জানেন না এই স্বীকারোক্তির মানে কী? ওরা আপনাকে ফাঁসি দেবে জেনিন! ওরা আপনাকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নেবে!”

জেনিন নোবারার এই বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে নিজের ভেতরের পাথুরে মাফিয়া সত্ত্বাকে আর ধরে রাখতে পারল না। তার চোখ দুটোতেও এক গভীর মায়া আর চাপা কান্না খেলা করে গেল। সে হাতকড়া পরা হাত দুটো দিয়েই নোবারার ফ্যাকাশে গাল দুটো আলতো করে চেপে ধরল। নোবারার কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে জেনিন খুব নিচু, ভাঙা অথচ ইস্পাতকঠিন শোনালো এমন এক কণ্ঠে বলল,

“শান্ত হোন নূরা, একদম শান্ত হোন। জেনিন নুরশাদকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলানোর দড়ি এই দুনিয়ার কোনো জল্লাদ এখনো তৈরি করতে পারেনি। আমি আপনাকে আর আমাদের অনাগত সন্তানকে এই নরকের মাঝে ফেলে রেখে কোথাও যাব না। আপনি একদম চিন্তা করবেন না, নিজের শরীরের যত্ন নিন, ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করুন। আমার এই শেষ সম্পদটুকুর খেয়াল রাখুন নূরা… আমি আপনার কাছে ঠিক ফিরে আসব। আর জেনিন নুরশাদ কখনো নিজের কথা খেলাফ করে না।”

নোবারা জেনিনের চোখের দিকে তাকাল, সেই চোখ, যা পুরো পৃথিবীর সামনে অহংকার ছড়ায়, আজ সেখানে কেবল নোবারাকে হারানোর এক তীব্র আর্তি। নোবারা জেনিনের হাতকড়া পরা হাত দুটো নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল। তার অবুঝ মন আজ কোনো যুক্তি মানতে চাইছে না। সে জেনিনের চোখের দিকে তাকিয়ে ভাঙা গলায় আকুল হয়ে জিজ্ঞেস করল,

“আপনি আমাকে এত করে চান জেনিন? এই অভাগীটার জন্য নিজের জীবনের সব দম্ভ, সব সাম্রাজ্য এভাবে বিলিয়ে দিলেন? আমার জন্য এত কিছু…এত করে আমাকে চান আপনি?”

জেনিন নোবারার চোখের পরম আকুতি আর নিখাদ ভালোবাসার দিকে তাকিয়ে এক ম্লান কিন্তু স্বর্গীয় হাসি হাসল। সে নোবারার কানের কাছে নিজের ঠোঁট দুটো নিয়ে এল। তার তপ্ত, পুরুষালি নিশ্বাস নোবারার গলার চামড়াকে ছুঁয়ে গেল। জেনিন খুব মরমী আর গভীর কণ্ঠে ফিসফিস করে জবাব দিল,

“I don’t want you, Noora…I just need you,
my breath!”

কথাটা শেষ করেই জেনিন নোবারার কপালে তার হাতকড়া পরা হাত দুটোর আড়ালে এক দীর্ঘ, তপ্ত এবং পবিত্র চুম্বন এঁকে দিল। নোবারা চোখ বন্ধ করে জেনিনের বুকের ভেতর নিজের শেষ আশ্রয়টুকু খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করল।

“টাইম আপ, স্যার! আসামিকে নিয়ে যেতে হবে!” পেছন থেকে পুলিশের আইজি প্রিজন কড়া গলায় নির্দেশ দিলেন।

কমান্ডোরা এসে নোবারার কাছ থেকে জেনিনকে আলতো করে সরিয়ে নিল। জেনিন আর বাধা দিল না। সে নোবারার হাতটা ছেড়ে দেওয়ার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল, যেন সেই চোখের মণি দুটোকে সে নিজের বুকে সারাজীবনের জন্য বন্দি করে নিয়ে যাচ্ছে।

ইউজি আর নানামি ততক্ষণে ছুটে এসেছে। ইউজি নোবারাকে এক হাত দিয়ে ধরে সোজা করে দাঁড় করাল, তার নিজের চোখও তখন লোনা জলে ভেজা। জেনিন যাওয়ার সময় ইউজির চোখের দিকে তাকিয়ে শুধু একবার মাথা ঝাঁকাল, যার অর্থ, আমার আমানত তোমার কাছে রইল।

চলবে ইংশাআল্লাহ……..

(বিশা….ল একখানা পর্ব, আদালত, আইন, সবনিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে, তিনদিন ধরে লিখলাম! এই পর্বটা লিখতে আমার বহু কষ্ট হয়েছে! হা….হ, তাও তো শেষ করতে পারলাম। তা বলছিলাম, আপনারা যদি কুট্টুস পাঠকদের মতো সুন্দর সুন্দর মন্তব্য করেন, রিয়েক্ট দিয়ে পেইজের রিচ ধরে রাখেন তো আমি এখন থেকে আপনাদের জন্যই নিয়মিত একটা পর্ব দিতে পারব। অবশ্যই আমরা এখন গল্পের শেষের দিকে চলে এসেছি। এখন আমাকে একটু তেল না দিলে গাড়ি চলবে কেমনে বলুন!?🫢🙌🏻)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here