#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_৭৪ (আদালতের ফাঁ’সির রায়!)
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম
আদালতের জবানবন্দির পর জেনিন নুরশাদকে পুনরায় ডিবি অফিসের বিশেষ সেলে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তবে আজকের পরিবেশটা ভিন্ন। গত কয়েক ঘণ্টার ঝড়ে পুরো ঢাকা শহর তথা গোটা দেশ যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে। জেনিন নুরশাদ কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে যেভাবে পুরো সিস্টেমকে তুচ্ছজ্ঞান করে নিজের অপরাধ স্বীকার করেছে, তা কোনো আইনি লড়াই ছিল না, তা ছিল এক চরম ঔদ্ধত্যের বহিঃপ্রকাশ।
সেলের ভেতরে জেনিন এখন সম্পূর্ণ একা। তার সাদা শার্টের হাতাগুলো কনুই পর্যন্ত গোটানো। সে মেঝের ওপর পা ছড়িয়ে বসে দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে আছে। তার সামনে পড়ে আছে আধখাওয়া খাবারের থালা। জেনিনের দৃষ্টি সরু ভেন্টিলেটরের দিকে, যেখান দিয়ে বিকেলের মরা রোদের এক ফালি আলো মেঝেতে এসে পড়েছে। তার ঠোঁটে এক রহস্যময় হাসি। সে জানে, সে যা করেছে তা দাবাড়ুর শেষ চালের মতো, যেখানে রাজা নিজেকে বিলিয়ে দিয়েও কিস্তিমাত করে।
ওদিকে ডিবি অফিসের করিডোরে নানামি পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। তার সাসপেনশন অর্ডারটা এখনো কার্যকর, কিন্তু বিশেষ বিবেচনায় তাকে জেনিনের কাছাকাছি থাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। নানামির কানে এখনো জেনিনের কথাগুলো বাজছে, “ধূর্ত শিয়াল হয়, সিংহ নয়।”
ঠিক এই সময় রাইহান করিডোর দিয়ে গটগট করে হেঁটে এল। তার মুখে আজ সেই বিজয়োল্লাস নেই। জেনিন যেভাবে নিজে থেকে সব স্বীকার করেছে, তাতে রাইহানের তদন্তের কোনো কৃতিত্ব আর অবশিষ্ট নেই।
“খুশি তো নানামি সাহেব?” রাইহান দাঁত কিড়মিড় করে বলল। “আপনার বন্ধু তো হিরো সেজে গেল। কালকের সব খবরের কাগজে ওর এই রাজকীয় স্বীকারোক্তির গল্প ছাপানো হবে। আমাদের তদন্ত, আমাদের পরিশ্রম, সব ও এক নিমিষে মাটি করে দিল।”
নানামি রাইহানের দিকে না তাকিয়েই খুব শান্ত গলায় বলল, “জেনিন নুরশাদকে চেনা এত সহজ নয় রাইহান সাহেব। ও ধরা দিয়েছে কারণ ও চেয়েছিল। ও জবানবন্দি দিয়েছে কারণ ও আপনাকে আপনার ক্ষুদ্রতা বোঝাতে চেয়েছে। আপনি ওকে শিকল পরিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু ওর ব্যক্তিত্বকে ছুঁতে পারেননি।”
রাইহান রাগে গজগজ করতে করতে চলে গেল। নানামি জানে, কাল সকালে আদালতের রায় ঘোষণা করা হবে। জেনিন যা করেছে, তাতে সর্বোচ্চ সাজার সম্ভাবনা শতভাগ। কিন্তু নানামির ভয় অন্য জায়গায়, জেনিন কি সত্যিই চিরতরে হারিয়ে যাবে?
এদিকে নানামির বাসায় ফিরে নোবারা এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। সে জেনিনের দেওয়া নীল রঙের ফাইলটা বুকের সাথে চেপে ধরে জানালার ধারে বসে আছে। সে এখন কয়েক হাজার শ্রমিকের অন্নদাতা মালকিন এবং এক বিশাল সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী তার শরীরে। জেনিন তাকে রিক্ত করেনি, বরং এক বিশাল দায়িত্বের সাগরে ভাসিয়ে দিয়ে গেছে।
তনুজা ঘরে ঢুকে দেখল নোবারা কাঁদছে না। তার চোখ দুটো পাথরের মতো স্থির। তনুজা এগিয়ে এসে নোবারার চুলে হাত বুলাল।
“নোবারা, কিছু খাবে?”
নোবারা মাথা নাড়ল।
“তনু, জেনিন আমাকে সব দিয়ে দিল। কিন্তু আমি তো শুধু ওকে চেয়েছিলাম। এই বিশাল নুরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজ দিয়ে আমি কী করব যদি জেনিনই না থাকে?”
“জেনিন তোমাকে শুধু সম্পদ দেয়নি” তনুজা খুব ধীর স্বরে বলল। “সে তোমাকে এক অপরাজিত পরিচয় দিয়ে গেছে। সে জানত সে আর ফিরতে পারবে না, তাই সে নিজেকে তোমার আর তোমার সন্তানের ভবিষ্যতের আড়ালে লুকিয়ে ফেলল। ওটাই ওর ভালোবাসা।”
নোবারা জানালার বাইরে দিগন্তের দিকে তাকাল। তার মনে হচ্ছে, জেনিন নুরশাদ নামের পাহাড়টা আজ ধসে পড়েছে, আর সে সেই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে এক নতুন যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। কাল সকালে আদালতের রায় যাই হোক না কেন, নোবারা জানে, জেনিন নূরশাদের তাকে সারাজীবন ছায়ার মতো আগলে রাখবে।
রাত আরো গভীর হলো। দেয়ালের ছোট ভেন্টিলেটর দিয়ে এক চিলতে ফ্যাকাশে চাঁদের আলো এসে পড়েছে জেনিনের ডান হাতের ওপর। সে সেলের বাইরে ডিউটিতে থাকা বিশ্বস্ত গার্ডের দিকে তাকিয়ে এক টুকরো কাগজ আর একটা কলম চেয়ে নিল। কোনো আইনি আবেদন নয়, রাষ্ট্রপতির কাছে কোনো প্রাণভিক্ষার আর্জির খসড়া নয়, মাফিয়া জেড আজ গভীর রাতে তার জীবনের সবচেয়ে পবিত্র দলিলটা লিখতে বসল। সে লিখছে তার সেই অনাগত সন্তানের জন্য, যাকে সে এই নশ্বর পৃথিবীতে কোনোদিন নিজের বুকে জড়িয়ে ধরার সুযোগ হয়তো পাবে না!
চিঠির শুরুটা ছিল বড্ড অদ্ভুত, একাধারে নিষ্ঠুর ও পরম মায়াবী,
“পৃথিবীর সবচাইতে প্রিয় আগন্তুক,
আমি হয়তো তোমার প্রথম কান্না শোনার জন্য হাসপাতালের করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকতে পারব না, কিংবা তোমার ছোট্ট আঙুলটা ধরে কোনো বিকেলে বাগানে হাঁটতে পারব না। কিন্তু তুমি যখন এই চিঠিটা পড়বে, তখন জানবে, তোমার অস্তিত্ব আমার এই অপরাধের অন্ধকার জীবনে এক টুকরো স্বর্গীয় আলোর মতো ছিল।
নূরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজ আর এই বিশাল সাম্রাজ্য আমি আজ তোমার মায়ের নামে রেখে গেলাম, যা একদিন তোমার হবে। আমার একটা অনুরোধ রেখো, এই রাজত্ব থেকে আসা প্রতিটা টাকা যেন সৎ পথে, নিরণ্ন মানুষের মুখে অন্ন তুলে দিতে আর অসহায় শিশুদের আশ্রয়ের জন্য ব্যয় হয়। এই অর্থের পেছনে যেন কোনো অশ্রু বা দীর্ঘশ্বাস না থাকে, সেটা খেয়াল রেখো। তোমার মা হয়তো তোমাকে আমার বীরত্বের গল্প বলবে না, সে হয়তো তার ভেতরের অভিমান আর কষ্ট থেকে আমার এই অন্ধকার মাফিয়া জীবনের নৃশংসতার কথাই তোমাকে জানাবে। কিন্তু তুমি শুধু এইটুকু সত্য জেনে বড় হবা, তোমার বাবা একসময় পুরো শহরটাকে নিজের হাতের মুঠোয় নিয়েছিল, পুরো সিস্টেমটাকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল কেবল তোমার মায়ের একটা ছোট্ট হাসির জন্য, তাকে পৃথিবীর বুকে সুরক্ষিত রাখার জন্য!”
জেনিন একটু থামল। কলমের ডগাটা কাগজের বুকে এক ফোঁটা কালির মতো জেদ নিয়ে চেপে বসল। সে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে চিঠির শেষে লিখল,
“যদি কখনো তোমার মনে হয় এই সমাজ তোমাকে তোমার বাবার পাপের দোহাই দিয়ে ছোট করছে, তবে বুক টান করে দাঁড়িয়ে বলো, তুমি জেনিন নূরশাদের রক্ত। আমি মরে গেলেও আমার তৈরি করা ছায়া তোমাকে আজীবন এক অদৃশ্য ঢাল হয়ে আগলে রাখবে। তোমার মায়ের খেয়াল রেখো, সে বড্ড অবুঝ আর জেদী। তাকে কখনো একা হতে দিও না।
ইতি,
তোমার জন্মদাতা,
জেনিন নূরশাদ”
জেনিন খুব সাবধানে কাগজটা ভাঁজ করল। তার হাতকড়ার শিকলটা মৃদু টুং শব্দ করে কেঁদে উঠল যেন। সে চিঠিটা তার জেলের শক্ত বালিশটার নিচে গুঁজে রাখল, যাতে আগামীকাল সকালে ইউজি যখন তার সাথে শেষ দেখা করতে আসবে, তখন এটি নোবারার হাতে পৌঁছে দিতে পারে।
সে জানে, কালকের সূর্য তার জন্য এক দীর্ঘস্থায়ী অন্ধকার, লোহার ফাঁসির দড়ির এক নিষ্ঠুর আহ্বান নিয়ে আসবে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, জেনিনের মনে আজ বিন্দুমাত্র কোনো আক্ষেপ নেই, কোনো ভয় নেই। সে তার সাম্রাজ্য সঠিক মানুষের হাতে গুছিয়ে দিয়েছে, তার নূরাকে পৃথিবীর সমস্ত হিংস্রতা থেকে চিরকালের মতো নিরাপদ করেছে, আর নিজের জীবনের সব পাপের প্রায়শ্চিত্ত সে নিজেই বীরের মতো বেছে নিয়েছে।
বাইরে পাহারারত কনস্টেবলরা ক্লান্তিতে ঝিমোচ্ছে, কিন্তু জেনিন নূরশাদের চোখে ঘুম নেই। সে খাটিয়ার ওপর সোজা হয়ে বসে আছে, মেরুদণ্ড একদম টানটান। হাতকড়ার শিকলগুলো তার কবজিতে লেগে মৃদু শব্দ করছে, তবে সেই শব্দে কোনো অসহায়ত্ব নেই। আজ বিকেলে আদালতের দাপুটে জবানবন্দির পর জেনিন যেন এক অদ্ভুত মানসিক প্রশান্তি খুঁজে পেয়েছে। সে জানে, জেনিন নূরশাদকে কোনো দেয়াল বন্দী করতে পারে না যতক্ষণ তার মস্তিষ্ক স্বাধীন থাকে।
ঠিক রাত দুটোর সময় ডিবি অফিসের সংরক্ষিত করিডোরে আবার পদশব্দ শোনা গেল। নানামি আজ রাতে বাড়ি ফেরেনি। সে সিসিটিভি ফুটেজের রুমে বসে ছিল এতক্ষণ। জেনিনের প্রতিটি নড়াচড়া সে পর্যবেক্ষণ করছে।
নানামি সেলের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। গার্ডরা তাকে বাধা দেওয়ার সাহস পেল না, কারণ নানামি সাসপেন্ড হলেও তার চোখের কমান্ডিং তেজ এখনো অটুট। জেনিন মাথা তুলে তাকাল না।
“এত রাতে কেন? কোনো নতুন জেরা বাকি আছে?” জেনিনের কণ্ঠস্বর সেলের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হলো।
নানামি লোহার গ্রিলটা হাত দিয়ে ধরল।
“তুই কি একবারও ভেবে দেখেছিস নুরশাদ, কাল যখন রায় হবে, তখন নোবারার ওপর দিয়ে কী বয়ে যাবে? তুই নিজের ইগো চরিতার্থ করার জন্য সব অপরাধ স্বীকার করলি, কিন্তু ওকে যে এক জীবন্ত নরকে ফেলে গেলি, সেটা কি তোর মাথায় ঢোকেনি?”
জেনিন এবার ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। সে গ্রিলের কাছে এগিয়ে এল। দুজনের মাঝখানে কেবল কয়েকটা লোহার শিকল। জেনিন খুব শান্ত স্বরে বলল, “ভুল বুঝছিস জায়দান। আমি নূরাকে নরকে ফেলিনি। আমি ওকে এক শক্তিশালী সিংহাসনে বসিয়েছি। ও সিআইডিতে থাকলে সারা জীবন তোদের মতো কিছু দুর্নীতিবাজ অফিসারের আন্ডারে ফাইল নিয়ে পড়ে থাকত। আর দহন? আমার নূরা স্ট্রং উইম্যান। ও জানে ওর স্বামী কোনো কাপুরুষ ছিল না।”
“তুই খুব স্বার্থপর নুরশাদ” নানামি দাঁতে দাঁত চিপে বলল। “তুই হিরো সাজলি, আর আমাকে বানালি এক ব্যর্থ অফিসার যে তার বন্ধুকে গুলি করেও মারতে পারল না।”
“আমি তোকে সুযোগ দিয়েছি জায়দান” জেনিন ম্লান হাসল। “আমি যদি কাল সব অস্বীকার করতাম, তবে বিচারটা ১০ বছর চলত। তুই এই ১০ বছর কোর্টের চক্কর কাটতে। আমি সব স্বীকার করে তোকে ওই ঝামেলা থেকে মুক্তি দিয়েছি।”
<><><><><><><><><>
ঢাকা জজ কোর্টের ৩ নম্বর স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল কক্ষ। বাইরের উত্তাল জনসমুদ্রের স্লোগান আর পুলিশের লাঠিচার্জের শব্দ এই নিরেট দেয়াল ভেদ করে ভেতরে আসতে পারছে না ঠিকই, কিন্তু ভেতরের বাতাসটা আজ এতটাই ভারী যে নিশ্বাস নিতে গেলে ফুসফুসে এক তীব্র টান লাগছে। ঘড়ির কাঁটা সকাল এগারোটা ছুঁইছুঁই। এজলাসের বিশাল সেগুন কাঠের তৈরি দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সশস্ত্র পুলিশ আর কমান্ডোদের বুটের খটখট শব্দ প্রতিটা সেকেন্ডে এক একটা আসন্ন প্রলয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছিল।
ঠিক ১০টা বেজে ৫৮ মিনিটে পেছনের লোহার খাঁচাসদৃশ গেটটা খুলে গেল। কড়া পুলিশ বেষ্টনীর মাঝখান থেকে ধীর স্থির পায়ে হেঁটে ভেতরে প্রবেশ করল সে, জেনিন নূরশাদ।
আজকের জেনিনকে দেখে আদালত কক্ষে উপস্থিত প্রবীণ সাংবাদিকদেরও কলম থমকে গেল। তার পরনে কোনো কয়েদির পোশাক নেই, সে পরে এসেছে একটি গাঢ় ধূসর রঙের সুতির পাঞ্জাবি, যার হাতা দুটো অত্যন্ত নিখুঁত ও পরিপাটি করে কনুই পর্যন্ত ভাঁজ করা। তার দু-হাতে পরানো রুপোলি হাতকড়া। দীর্ঘ পনেরো দিনের নির্জন কারাবাস জেনিনের চেহারার ধারালো আভিজাত্যকে এতটুকু ম্লান করতে পারেনি, বরং তার কুচকুচে কালো চোখের মণির তীক্ষ্ণ চাহনি আজ আরও বেশি সম্মোহনী, আরও বেশি ভয়ঙ্কর লাগছিল। সে মাথা উঁচু করে, মেরুদণ্ড তীরের মতো সোজা রেখে কাঠগড়ার দিকে এগিয়ে গেল।
কাঠগড়ার ঠিক প্রথম সারির কাঠের বেঞ্চটিতে বসে ছিল নোবারা। তার ডান পাশে তনুজা আর বাঁ পাশে এক পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে নানামি জায়দান। নোবারার চোখ দুটো আজ ফোলা, সারা রাত এক ফোঁটা ঘুমানোর সুযোগ পায়নি সে। তার ফ্যাকাশে ফেসের ওপর লেপ্টে থাকা চুলগুলো বারবার কপালের ঘামে ভিজে যাচ্ছিল। জেনিন কাঠগড়ায় এসে দাঁড়ানোর ঠিক আগের মুহূর্তে একবার নোবারার দিকে তাকাল। সেই কুচকুচে কালো চোখের স্থির দৃষ্টিটা নোবারার চোখের ওপর এসে পড়তেই নোবারার হৃদপিণ্ডটা যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। জেনিনের ঠোঁটের কোণে খুব হালকা, এক চিলতে চেনা আশ্বাসের হাসি ফুটে উঠল, যেন সে নোবারাকে বলতে চাইল, আমি আছি নূরা, ভয় পাবেন না।
ঠিক ১১টা বাজার সাথে সাথে এজলাসের পেছনের পর্দা সরিয়ে গম্ভীর মুখে এসে বসলেন বিচারক মীর মোশাররফ হোসেন। মুহূর্তের মধ্যে পুরো কক্ষের সমস্ত ফিসফিসানি উধাও হয়ে এক পিনপতন নীরবতা নেমে এল। ঘরের কোণে থাকা সিলিং ফ্যানটার ঘোরার কাঁপুনির শব্দটাও আজ বড্ড স্পষ্ট শোনাল। প্রসিকিউটর এডভোকেট মোজাম্মেল সাহেব নিজের কালো কোটের বোতামটা লাগিয়ে এক পরম তৃপ্তির ও জয়ের হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে নিজের ফাইলপত্র গোছাতে লাগলেন। তিনি জানেন, আজ তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক দিন। যদিও প্রতিপক্ষের সাথে কোন লড়াই ছাড়া!
বিচারক সাহেব তার চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে আনলেন। তার সামনে রাখা জেনিনের ঢাউস জবানবন্দির ফাইলটা শেষবারের মতো ওলটালেন। কলমটা হাতে নিয়ে তিনি অত্যন্ত গম্ভীর, ভারী ও ধাতব কণ্ঠে বলতে শুরু করলেন,
“আদালত সমস্ত তথ্য-প্রমাণ, রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার চার্জশিট এবং আসামির নিজের দেওয়া সজ্ঞানে ও স্বেচ্ছায় জবানবন্দি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করেছে। আসামি জেনিন নূরশাদ ওরফে জেড তার বিরুদ্ধে আনীত প্রতিটি অভিযোগ, যার মধ্যে রয়েছে একাধিক সুপরিকল্পিত হত্যা’কাণ্ড, আন্তর্জাতিক অবৈধ অস্ত্রের চোরাচালান এবং রাষ্ট্রবিরোধী আন্ডারওয়ার্ল্ড সিন্ডিকেট পরিচালনা, সবকিছুই কোনো প্রকার আত্মপক্ষ সমর্থন ছাড়াই আদালতের কাছে স্বীকার করেছেন। আইনের চোখে অপরাধীর এই নিঃশর্ত স্বীকারোক্তিই মামলার চূড়ান্ত এবং অকাট্য প্রমাণ হিসেবে গণ্য।”
বিচারক সাহেব এক সেকেন্ডের জন্য থামলেন। পুরো আদালত কক্ষের অক্সিজেন যেন কেউ এক নিমেষে শুষে নিল। নোবারা নিজের দুই হাত দিয়ে শাড়ির আঁচলটা শক্ত করে মুচড়ে ধরল। তার নিশ্বাস দ্রুত হচ্ছে, শরীরের ভেতরে অনাগত সন্তানের এক তীব্র অস্থিরতা সে অনুভব করতে পারছে।
বিচারক আবার বলতে শুরু করলেন,
“যদিও আসামির শিল্পক্ষেত্রে বিশাল অবদান, হাজারো শ্রমিকের কর্মসংস্থান এবং নুরশাদ ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে মানবিক ও জনকল্যাণমূলক কাজগুলো অনস্বীকার্য, কিন্তু আইনের শাসন এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নিরাপত্তার স্বার্থে তার দ্বারা সংঘটিত এই ভয়ঙ্কর অপরাধগুলো সম্পূর্ণ ক্ষমার অযোগ্য। অতএব…”
বিচারক মীর মোশাররফ হোসেন এবার তার হাতের ফাউন্টেন পেনটা শক্ত করে ধরলেন। পুরো এজলাসের সবার দৃষ্টি তখন সেই কলমের নিবের ওপর স্থির।
“সমস্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং আসামির নিজস্ব স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে, এই আদালত দণ্ডবিধির ৩০২ ধারা মোতাবেক আসামি জেনিন নূরশাদ ওরফে জেড-কে মৃ’ত্যুদণ্ড বা ফাঁ’সির আদেশ প্রদান করছে। আগামী এক মাসের মধ্যে, উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের উপস্থিতিতে আসামির এই দণ্ড কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হলো।”
বিচারক সাহেব তার কথা শেষ করেই এক ঝটকায় কলমের নিবটা মট করে ভেঙে ফেললেন। আইনের চিরন্তন নিষ্ঠুর নিয়ম, যে কলম কারো প্রাণ কেড়ে নেয়, তা আর দ্বিতীয়বার ব্যবহৃত হয় না।
“নাআআআআআ!”
পুরো আদালত কক্ষের নিস্তব্ধতাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে তনুজা ডুকরে কেঁদে উঠল। সে নোবারাকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে নিজের বুকের মাঝে আছড়ে পড়ল। কিন্তু নোবারা? নোবারা একটা চিৎকারও দিল না, তার চোখ থেকে এক ফোঁটা জলও গড়িয়ে পড়ল না। সে যেন এক জ্যান্ত পাথরের মূর্তিতে পরিণত হলো। তার চোখ দুটো প্রসারিত, ঠোঁট দুটো সামান্য হাঁ হয়ে আছে, যেন তার ভেতরের আত্মাটা ওই রায়ের সাথে সাথেই শরীর ছেড়ে চলে গেছে। অতি শোকে মানুষ যখন পাথর হয়ে যায়, নোবারার অবস্থা আজ ঠিক তাই। নানামি নিজের মুখটা অন্য দিকে ফিরিয়ে নিল। একজন কড়া পুলিশ অফিসার হওয়া সত্ত্বেও তার চোখের অবাধ্য লোনা জল তার ইউনিফর্মের ওপর টপটপ করে ঝরে পড়তে লাগল। তার মনে হচ্ছিল, এই ফাঁ’সির রায়টা জেনিনকে নয়, বরং আইনের বেড়া দিয়ে তার নিজের বন্ধুত্ব আর বিবেককে দেওয়া হয়েছে।
ওদিকে প্রেস গ্যালারিতে থাকা সংবাদকর্মীরা একে অপরের ওপর হোঁচট খেয়ে দৌড় দিল টেলিভিশনে লাইভ ব্রেকিং নিউজ দেওয়ার জন্য। মুহূর্তের মধ্যে পুরো দেশের টিভি স্ক্রিনে লাল অক্ষরে ভেসে উঠল,
“ব্রেকিং নিউজ: মাফিয়া সম্রাট জেনিন নূরশাদের ফাঁসির রায়!”
কিন্তু জেনিন নুরশাদ? সে নড়ল না। তার চওড়া কাঁধ দুটো এতটুকু নুয়ে পড়ল না। মৃত্যুর এই অমোঘ পরোয়ানা শোনার পরেও তার ফেসের ওপর এক তিল বিষাদ বা ভয়ের রেখা দেখা গেল না। সে বিচারকের দিকে তাকিয়ে খুব ম্লান কিন্তু চরম অহংকারী এক বুক কাঁপানো হাসি হাসল। তার সেই চোখ দুটো যেন বিচারককে নিভৃতে বলে দিল, ‘আপনার এই রায় আমার শরীরটা কেড়ে নিতে পারে জজ সাহেব, কিন্তু জেনিন নূরশাদের অহংকারকে ছোঁয়ার ক্ষমতা আপনার ওই আইনের হাতুড়িরও নেই।’
<><><><><><><><><>
আদালত কক্ষ থেকে প্রিজন ভ্যানে তোলার আগে, নানামির বিশেষ অনুরোধ এবং ডিআইজি সাহেবের মৌখিক অনুমতিতে জেনিনকে মাত্র পাঁচ মিনিটের জন্য নোবারার সাথে একান্তে দেখা করার সুযোগ দেওয়া হলো পাশের একটি ছোট, অন্ধকার ডিটেনশন রুমে। রুমের বাইরে রাইফেল হাতে দাঁড়িয়ে রইল ইউজি আর নানামি, যাতে কোনো পুলিশ বা সাংবাদিক ভেতরে উঁকি দেওয়ার ধৃষ্টতা দেখাতে না পারে।
ডিটেনশন রুমের ভেতরের পরিবেশটা ছিল এক চিলতে কবরের মতো নিস্তব্ধ। দেয়ালে একটা টিমটিমে হলুদ বাতি জ্বলছে। নোবারা দরজার পাশে দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, তার বুকের খাঁচাটা দ্রুত ওঠানামা করছে, প্যানিক অ্যাটাকের কারণে তার শরীর আর তার নিয়ন্ত্রণে ছিল না।
জেনিন খুব ধীর পায়ে লোহার ডাণ্ডাবেড়ির শব্দ তুলে নোবারার একদম সামনে এসে দাঁড়াল। হাতকড়া পরা হাত দুটো সামান্য উঁচুতে তুলতেই লোহার শিকলটা নোবারার গালের চামড়ায় এক হিমশীতল ছোঁয়া দিল।
“ফাঁসি…” নোবারার ঠোঁট থেকে শব্দটা এক অদৃশ্য ফিসফিসানি হয়ে বেরোল। তার কণ্ঠস্বর কাঁপছিল। “ওরা আপনাকে সত্যিই মেরে ফেলবে জেনিন? আমি… আমি এখন কী নিয়ে বাঁচব?”
জেনিন নোবারার এই বিধ্বস্ত, অবশ অবয়ব দেখে নিজের ভেতরের সবটুকু কঠোরতা বিসর্জন দিল। সে নোবারার চোখের কোণে জমে থাকা না পড়া লোনা জলটুকু নিজের হাতকড়ার মাঝখানের আঙুলগুলো দিয়ে পরম মায়ায় মুছিয়ে দিল। তারপর খুব মরমী, গভীর আর পুরুষালি এক কণ্ঠে ডাকল,
“নূরা…”
জেনিন নোবারার খুব কাছে ঝুঁকে এল।
“মৃত্যু তো একটা গন্তব্য মাত্র। আমি কোনোদিন খাটের ওপর শুয়ে, বৃদ্ধ হয়ে ধুঁকে ধুঁকে মরতে চাইনি। আমি রাজা হয়ে জন্মেছি, নিজের শর্তে রাজত্ব করেছি, আর আজ নিজের ইচ্ছাতেই নিজের প্রায়শ্চিত্ত বেছে নিয়েছি।”
নোবারা আর ধরে রাখতে পারল না নিজেকে। সে জেনিনের ধূসর পাঞ্জাবির কাপড়টা নিজের দুই হাত দিয়ে খামচে ধরল। জেনিনের সেই চওড়া, পাথুরে শক্ত বুকের ওপর নিজের মাথাটা চেপে ধরে সে এবার হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। তার কান্না যেন মর্গের সেই নিথর স্তব্ধতাকেও হার মানাচ্ছিল।
“আমি আপনার এই ছাইপাশ রাজকীয়তা চাই না জেনিন! আমি আপনার অহংকার চাই না! আমি শুধু আপনাকে সাধারণ একটা মানুষ হিসেবে পাশে চেয়েছিলাম! আমার এই পেটের বাচ্চার জন্য হলেও… আমাদের এই সন্তানের জন্য হলেও আপনি কি একটা বার জজ সাহেবের কাছে প্রাণভিক্ষা চাইতে পারতেন না? আপনার ইগো কি আমাদের চেয়েও বড় হলো?”
জেনিন নোবারার রেশমি চুলে নিজের মুখটা গুঁজে দিল। তার চেনা শরীরের ওম নোবারাকে এক মুহূর্তের জন্য অবশ করে দিল। জেনিন খুব নিচু, ভাঙা অথচ ইস্পাতকঠিন গলায় বলল,
“আমি যদি আজ ওই কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে প্রাণভিক্ষা চাইতাম, তবে জেনিন নুরশাদ সেই মুহূর্তেই মরে যেত। আমি নিজের তৈরি করা ইতিহাসের কাছে পরাজিত হতাম। আপনি কাঁদবেন না প্লিজ…আপনি যখন এভাবে ভেঙে পড়েন, তখন আমার মনে হয় এই জেনিন নূরশাদ সত্যি সত্যি হেরে গেছে।”
জেনিন এবার নোবারার মুখটা নিজের হাতকড়া পরা দুই হাতের মুঠোয় আলতো করে তুলে ধরল। তার চোখের কুচকুচে কালো মণি দুটো তখন এক অলৌকিক তেজে জ্বলছিল।
“শুনুন নূরা। কাল থেকে এই সমাজ আপনাকে কোনো অপরাধীর অপরাধী স্ত্রী হিসেবে দেখবে না। কাল থেকে আপনি নূরশাদ সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র সম্রাজ্ঞী। আপনার শরীরের ভেতর যে প্রাণটা প্রতিদিন বড় হচ্ছে, সে যেন কোনোদিন মাথা নিচু করে বড় না হয়। সে যেন বুক টান করে এই সমাজকে বলতে পারে, তার বাবা কোনো ভিখারির মতো প্রাণভিক্ষা করেনি, তার বাবা হাসিমুখে নিজের মৃত্যুকে বরণ করেছে কেবল তার মায়ের সম্মানের জন্য, তার নূরাকে সুরক্ষিত রাখার জন্য। মনে রাখবেন নূরা… জেনিন নূরশাদ মরে গেলেও তার তেজ আপনার ভেতরে থেকে যাবে।”
ঠিক তখনই দরজায় বাইরে থেকে পুলিশ কনস্টেবলের ভারী বুটের লাথি আর তাগাদা,
“টাইম আপ! আসামিকে বের করতে হবে!”
জেনিন নোবারার চোখের দিকে শেষবারের মতো তাকাল, যে চোখ যা দিয়ে সে পুরো আন্ডারওয়ার্ল্ড শাসন করত, আজ সেখানে কেবল নোবারার জন্য এক সমুদ্র ভালোবাসা। সে নোবারার কপালে তার হাতকড়া পরা হাত দুটোর আড়ালে এক দীর্ঘ, তপ্ত এবং পবিত্র চুম্বন এঁকে দিল। সেই একটি চুম্বনে যেন এক জীবনের না বলা সব কথা, সব অভিমান আর আসন্ন বিরহের হাহাকার এক হয়ে মিশে গেল।
“বিদায়, নূরা।” জেনিন খুব নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল।
সে নোবারার খামচে ধরা হাতটা আলতো করে নিজের শরীর থেকে ছাড়িয়ে নিল। নোবারা আবার জেনিনের হাতটা ধরার জন্য অন্ধের মতো হাত বাড়াল, কিন্তু ততক্ষণে কমান্ডোরা দরজার লক খুলে জেনিনকে নোবারার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছে।
জেনিন করিডোর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় একটি বারের জন্যও পেছনে ফিরে তাকাল না। তার লোহার ডাণ্ডাবেড়ির শব্দটা ক্রমশ দূরে মিলিয়ে যেতে লাগল। সে যখন প্রিজন ভ্যানের ভেতর গিয়ে বসল, তখন বাইরের হাজার হাজার মানুষের বিলাপ আর জেনিন নুরশাদ অমর হোক স্লোগানে পুরো জজ কোর্টের আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়ে উঠছিল। জেনিন ভ্যানের ছোট লোহার জানালা দিয়ে মেঘলা আকাশের দিকে তাকাল। তার মনে হলো, দাবাড়ুর শেষ চালে সে আজ সত্যি জয়ী। সে তার ভালোবাসাকে এক নিরাপদ দুর্গে রেখে নিজের শেষ গন্তব্যের দিকে পা বাড়াল।
চলবে ইংশাআল্লাহ………

