#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_৭৬ (প্যারিসের আন্ডারওয়ার্ল্ড)
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার। কনডেমড সেলের টিমটিমে হলুদ বাতিটা যখন ছায়ারাজ জেড এর পাথুরে মুখের ওপর এসে পড়ল, তখন তার ঠোঁটের কোণে ঝুলছিল এক অকাট্য, রহস্যময় হাসি। নোবারাকে দেওয়া তার শেষ নির্দেশ, সারা শহরের সামনে এক নিঃস্ব, কান্নায় ভেঙে পড়া নারীর নিখুঁত অভিনয় করার গোপন চাল, ইতিমধ্যেই রাজপথের বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছে। জেনিন খাটিয়ার ওপর শান্ত হয়ে বসল। লোহার হাতকড়া আর ডাণ্ডাবেড়ির ভারী ধাতব শিকলগুলো মেঝের নোনা ধরা ইটের ওপর সামান্য নড়ে উঠতেই এক কর্কশ ঝনঝনানি শব্দ তুলল।
কিন্তু জেনিনের প্রখর মস্তিষ্ক এখন ঢাকার এই স্যাঁতসেঁতে কালকুঠুরিতে নেই। তার চিন্তার অদৃশ্য সুতো আজ থেকে পাঁচ বছর পেছনে, সুদূর ইউরোপের কেন্দ্রবিন্দুতে ছুটে গেছে। ঢাকার জজ কোর্টের চতুর প্রসিকিউটর এডভোকেট মোজাম্মেল সাহেব এজলাসে দাঁড়িয়ে জেনিনের যে আন্তর্জাতিক কোডনেমটি উচ্চারণ করেছিলেন, প্যানথেরা লিও, তা কেবল কোনো রূপকথার গল্প ছিল না! ঢাকার মানুষ জেনিন নুরশাদকে চেনে একজন দোর্দণ্ড প্রতাপী মাফিয়া জেড বা অন্নদাতা ব্যবসায়ী হিসেবে। কিন্তু সুদূর প্যারিসের আন্ডারওয়ার্ল্ডের কুখ্যাত, অন্ধকার গলিপথগুলো ভালো করেই জানে, কেন এই বাঙালি যুবককে সেখানে আক্ষরিক অর্থেই ডাকা হতো বনের রাজা সিংহ বা The King of the Jungle!
পাঁচ বছর আগে—প্যারিস, ফ্রান্স।
রাত তখন আনুমানিক দুটো। আইফেল টাওয়ারের ঝলমলে আলো তখন দূর থেকে প্যারিসের বুকে এক মায়াবী ছায়া ফেলছিল। কিন্তু সিন নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা লা কার্তেল দে লা সিন (La Cartel de la Seine) নামক আন্ডারওয়ার্ল্ডের আস্তানায় তখন বইছিল মৃত্যুর হিমশীতল হাওয়া। একটি পরিত্যক্ত ফ্রেঞ্চ ওল্ড ক্যাসেল এর ভূগর্ভস্থ গোপন হলরুম। চারদিকের পাথুরে দেয়াল বেয়ে নোনা জল চুইয়ে পড়ছে। হলরুমের ঠিক মাঝখানে একটা বিশাল মেহগনি কাঠের গোল টেবিল। সেই টেবিলকে ঘিরে বসে আছে ইউরোপের ড্রাগ সাম্রাজ্যের চারজন সবচাইতে ক্ষমতাধর গডফাদার। তাদের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে ভারী স্বয়ংক্রিয় সাব-মেশিনগান হাতে এক ডজনেরও বেশি ফ্রেঞ্চ বডিগার্ড।
টেবিলের প্রধান আসনে বসে আছে লুক বার্নার্ড। লোকটার বয়স পঞ্চাশের কোঠায়, ডান গালে একটা গভীর কাটার দাগ। প্যারিসের পুরো ড্রাগ সিন্ডিকেট আর অবৈধ অস্ত্রের বাজারের ৭০ ভাগই এই বার্নার্ডের নিয়ন্ত্রণে। তার ঠিক বাঁ পাশে বসে আছে রাশিয়ান মাফিয়ার কুখ্যাত কিলার দিমিত্রি, ইতালিয়ান আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রতিনিধি মারিও, এবং আলবেনিয়ান গ্যাং লিডার নিকোলা। আজকের এই জরুরি ও গোপন মিটিং ডাকার একমাত্র কারণ…প্যারিসের মাটিতে এক নতুন এশিয়ান সিংহের পদচারণা, যে গত মাত্র ছয় মাসে তাদের পুরো রুটটা একা নিজের বুদ্ধিতে দখল করে নিয়েছে। নূরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজের লেবেলে প্যারিসের বুক চিরে কোটি কোটি ইউরোর যে ছায়াবাণিজ্য চলছে, তা এই চার গডফাদারের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে।
“We are losing millions every week, Bernard!” দিমিত্রি তার হাতের দামি ভদকার গ্লাসটা টেবিলে আছড়ে মেরে ক্ষিপ্ত গলায় বলল। তার চোখের মণি রাগে লাল হয়ে উঠেছে। সে টেবিলের ওপর ঝুঁকে পড়ে আবার গর্জে উঠল,
“This bloody Bengali bastard, Zenin Nurshad, is wiping us out from the French borders! Our supply lines from Marseille are gone. How the hell did a single man bypass the border security of entire France?”
(এই বাস্টার্ড বাঙালি জেনিন নুরশাদ ফরাসি সীমান্ত থেকে আমাদের নিশ্চিহ্ন করে দিচ্ছে! মার্সেই থেকে আমাদের রসদ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। কীভাবে একজন লোক পুরো ফ্রান্সের সীমান্ত নিরাপত্তা ভেদ করে গেল?)
জ্যঁ-লুক বার্নার্ড খুব শান্ত ভঙ্গিতে তার ঠোঁটের কোণে চেপে রাখা চুরুটের ধোঁয়া বাতাসে ওড়াল। তার চোখের চাউনিতে এক ক্রুর, হিংস্র হিংসা। সে চুরুটটা অ্যাশট্রেতে পিষে মেরে অত্যন্ত নিচু, থমথমে গলায় বলল,
“Calm down, Dmitri. You are talking about Zenin Nurshad. In the streets of Paris, they don’t call him by his name anymore. The informants call him Panthera Leo. Do you know why? Because he doesn’t hunt like a wolf in packs. He hunts like a lone lion. Quiet, patient, and fatal.”
(শান্ত হও, দিমিত্রি। তুমি জেনিন নুরশাদের কথা বলছো। প্যারিসের রাস্তায় এখন আর তাকে তার নামে ডাকা হয় না। খবরদাতারা তাকে প্যান্থেরা লিও বলে ডাকে। তুমি কি জানো কেন? কারণ..কারণ সে নেকড়ের পালের মতো শিকার করে না। সে শিকার করে একাকী সিংহের মতো। শান্ত, ধৈর্যশীল এবং মারাত্মক।”)
“I don’t give a damn if he is a lion or a tiger!” ইতালিয়ান মারিও তার কোমরে গোঁজা ৯ এমএম পিস্তলটা বের করে টেবিলের ওপর দড়াম করে রাখল। তার চোয়াল রাগে চিবিয়ে উঠছে। সে মারমুখী ভঙ্গিতে বলল,
“He is in Paris tonight. My sources confirmed he is staying at the Hotel Ritz. We have over fifty shooters ready outside. Let’s paint the Seine river with his blood before sunrise!”
(সে আজ রাতে প্যারিসে আছে। আমার সূত্র নিশ্চিত করেছে যে সে হোটেল রিটজে থাকছে। বাইরে আমাদের পঞ্চাশ জনেরও বেশি শুটার প্রস্তুত আছে। চলো, সূর্যোদয়ের আগেই তার রক্ত দিয়ে সিন নদীকে রাঙিয়ে দিই!)
ঠিক সেই মুহূর্তেই হলরুমের বিশাল, নিরেট ওড কাঠের দরজাটা কোনো প্রকার টোকা বা সংকেত ছাড়াই ধীরগতিতে খুলে গেল। দরজা খোলার কর্কশ শব্দে পুরো হলের চারজন গডফাদার এবং তাদের এক ডজন সশস্ত্র গার্ড এক ঝটকায় দরজার দিকে নিজেদের বন্দুক তাক করল। সবার আঙুল তখন ট্রিগারে স্থির। ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা যেন এক সেকেন্ডে হিমাঙ্কের নিচে নেমে গেল!
কিন্তু দরজার ওপাশে কোনো হামলাকারী ছিল না, কোনো গ্যাং ওয়ারের চিল চিৎকার ছিল না। চারদিকের ভারী ধোঁয়ার কুয়াশা চিরে ধীর পায়ে, অত্যন্ত রাজকীয় ভঙ্গিতে ভেতরে প্রবেশ করল এক দীর্ঘদেহী যুবক।
—জেনিন নুরশাদ—
তার পরনে কুচকুচে কালো একটি স্লিম-ফিট ব্লেজার, ভেতরে ধবধবে সাদা শার্ট, যার ওপরের দুটো বোতাম খোলা। তার চোখে সোনালী ফ্রেমের সাদা কাঁচের চশমা, যার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক জোড়া শান্ত, কুচকুচে কালো মণি। জেনিনের এক হাত তার প্যান্টের পকেটে গোঁজা, আর অন্য হাতে সে খুব আলতো করে ধরে আছে একটি জ্বলন্ত দামি সিগারেট। তার সারা শরীর থেকে ছড়াচ্ছিল এক তীব্র পুরুষালি পারফিউম হয়তো Blue de Chanel এর আর তামাকের হালকা সুবাস। তার পেছনে কোনো বডিগার্ড নেই, কোনো অস্ত্রধারী লড়াকু বাহিনী নেই। সে সম্পূর্ণ একা!
প্যারিসের চারজন সবচাইতে দুর্ধর্ষ মাফিয়া ডন স্তম্ভিত হয়ে গেল। যে মানুষটিকে মারার জন্য তারা একটু আগে এখানে বসে ফাঁদ বুনছিল, সেই মানুষটি খোদ তাদেরই বাঘের গুহায় নিজে হেঁটে চলে এসেছে! জেনিনের এই অভাবনীয়, বুক কাঁপানো দুঃসাহস দেখে গার্ডদের হাতের বন্দুকগুলো পর্যন্ত এক মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠল।
জেনিন ঘরের ভেতরের এতগুলো বন্দুকের নলের দিকে একটা বারও তাকাল না। সে যেন কোনো বিলাসবহুল হোটেলের লাউঞ্জে হাঁটছে, এমন এক শান্ত ও উদাসীন ভঙ্গিতে মেহগনি টেবিলটার দিকে এগিয়ে এল।
সে টেবিলের একদম শেষ মাথায়, লুক বার্নার্ডের ঠিক মুখোমুখি খালি চেয়ারটার সামনে এসে দাঁড়াল। জেনিন তার হাতের সিগারেটের ছাইটা খুব আলতো করে মারিওর রাখা পিস্তলটার ব্যারেলের ওপর ঝাড়ল। তার ঠোঁটের কোণে খেলে গেল চিরচেনা, ধারালো ও অহংকারী ম্লান হাসি।
“Good evening, gentlemen,” জেনিন অত্যন্ত নিচু, গম্ভীর এবং বুক কাঁপানো ব্রিটিশ অ্যাক্সেন্টে কথা বলতে শুরু করল।
তার গলার স্বরে কোনো ভয় বা উত্তেজনার লেশমাত্র নেই। সে চেয়ারটা একটু পেছনে টেনে অত্যন্ত রাজকীয় ভঙ্গিতে বসল। এক পা অন্য পায়ের ওপর তুলে, চেয়ারের পেছনের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে সে বার্নার্ডের চোখের দিকে সরাসরি তাকাল।
“I heard you were planning a funeral for me. So, I thought, why not save your fuel? I brought the body myself.”
(শুনলাম তুমি আমার শেষক্রিয়ার আয়োজন করছো। তাই ভাবলাম, তোমার জ্বালানিটা বাঁচিয়ে রাখলে কেমন হয়? শরীরটা আমি নিজেই নিয়ে এসেছি।)
লুক বার্নার্ডের চোখ দুটো এক মুহূর্তের জন্য সংকুচিত হলো। এই ছেলের ধমনীতে রক্ত চলে নাকি বরফগলা ঠাণ্ডা জল, সে বুঝতে পারছে না! এতগুলো বন্দুকের মুখে দাঁড়িয়ে কেউ এতটা নিশ্চিত কীভাবে থাকতে পারে?
বার্নার্ড নিজের দম্ভ সামলে নিয়ে হাতের ইশারায় তার গার্ডদের বন্দুক নামাতে বারণ করল। সে টেবিলের ওপর ঝুঁকে পড়ে জেনিনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“You have guts, Z. Or maybe you are just stupid. Do you realize where you are standing right now? This is my territory. One signal from my hand, and your brilliant brain will be splattered on this floor.”
(তোমার সাহস আছে, জেড। অথবা হয়তো তুমি নিছকই বোকা। তুমি কি বুঝতে পারছো এখন কোথায় দাঁড়িয়ে আছো? এটা আমার এলাকা। আমার হাতের একটা ইশারাতেই তোমার এই মেধাবী মগজটা এই মেঝেতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে!)
জেনিন চশমাটা নাকের ওপর একটু সোজা করল। সে নিজের হাতের সিগারেটটায় শেষ টান দিয়ে ধোঁয়াটুকু সরাসরি বার্নার্ডের মুখের ওপর ছাড়ল। তারপর অত্যন্ত শান্ত, ধীর অথচ মেরুদণ্ড কাঁপিয়ে দেওয়া কণ্ঠে জবাব দিল,
“Your territory, Bernard? A lion doesn’t care who owns the forest. Wherever he walks, that becomes his kingdom. You think you control Paris? Look closely at your men.”
(তোমার এলাকা, বার্নার্ড? একটা সিংহের কাছে বনের মালিক কে, তা কোনো ব্যাপার না। সে যেখানেই হাঁটে, সেটাই তার রাজ্য হয়ে যায়। তুমি ভাবো তুমি প্যারিসকে নিয়ন্ত্রণ করো? তোমার লোকদের দিকে ভালো করে তাকাও।)
জেনিনের কথা শেষ হওয়ামাত্রই, হলরুমের ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা বার্নার্ডের নিজের ব্যক্তিগত বডিগার্ডদের প্রধান—লুকাস—ধীর পায়ে এগিয়ে এল। কিন্তু সে জেনিনের দিকে বন্দুক তাক করল না, বরং সে নিজের হাতের এম-১৬ রাইফেলটা লুক বার্নার্ডের মাথার ঠিক পেছনে ঠেকিয়ে দিল!
শুধু লুকাস নয়, ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে থাকা আরও চারজন ফ্রেঞ্চ শুটার এক সেকেন্ডের মধ্যে নিজেদের অবস্থান বদলে বার্নার্ড, দিমিত্রি, মারিও আর নিকোলার কপালে বন্দুকের নল চেপে ধরল!
“What the fu*k?!” দিমিত্রি এক ঝটকায় সিট ছেড়ে উঠতে চাইল, কিন্তু তার পেছনের গার্ড তার কাঁধে বন্দুকের বাথ দিয়ে এক তীব্র আঘাত করে তাকে আবার চেয়ারে বসিয়ে দিল।
বার্নার্ডের ফ্যাকাশে মুখটা এবার আক্ষরিক অর্থেই মৃত্যুর মতো সাদা হয়ে গেল। তার কপাল বেয়ে ঠাণ্ডা ঘাম ঝরতে শুরু করেছে। সে নিজের বিশ্বস্ত গার্ড লুকাসের দিকে তাকিয়ে কাঁপা গলায় বলল,
“Lucas! Are you out of your mind? I paid you millions! I gave you everything!”
(লুকাস! তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? আমি তোমাকে লক্ষ লক্ষ টাকা দিয়েছি! আমি তোমাকে আমার সবকিছু দিয়ে দিয়েছি!)
লুকাস বার্নার্ডের কথার কোনো উত্তর দিল না। সে পাথরের মতো স্থির হয়ে জেনিনের দিকে তাকাল, যেন সে বার্নার্ডের কেনা কুকুর নয়, সে জেনিন নূরশাদের ছায়ারাজ্যের এক বিশ্বস্ত গোলাম!
জেনিন টেবিলের ওপর রাখা দিমিত্রির ভদকার বোতলটা টেনে নিল। নিজের জন্য একটা কাঁচের গ্লাসে সামান্য ওয়াইন ঢালতে ঢালতে সে খুব মৃদু স্বরে বলল,
“Money can buy loyalty, Bernard, but it can never buy fear. You paid him millions, but I hold the lives of his entire family in Marseille. I know which school his daughter goes to, I know which cafe his wife visits every afternoon. And the same goes for every single shooter standing in this room right now.”
(বার্নার্ড, টাকা দিয়ে আনুগত্য কেনা যায়, কিন্তু ভয় কেনা যায় না। তুমি ওকে লক্ষ লক্ষ টাকা দিয়েছ, কিন্তু মার্সেইতে ওর পুরো পরিবারের জীবন আমার নিয়ন্ত্রণে। আমি জানি ওর মেয়ে কোন স্কুলে পড়ে, আমি জানি ওর স্ত্রী প্রতিদিন বিকেলে কোন ক্যাফেতে যায়। আর এই মুহূর্তে এই ঘরে দাঁড়িয়ে থাকা প্রত্যেকটি শুটারের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য!)
জেনিন গ্লাসটা হাতে নিয়ে একটু নাড়াল। বরফের টুকরোগুলো গ্লাসের গায়ে লেগে এক সুক্ষ্ম ধাতব শব্দ তুলল, যা এই মুহূর্তে ঘরের চার গডফাদারের কাছে চার্চের শেষ ঘণ্টার মতো শোনাল।
জেনিন বার্নার্ডের চোখের দিকে তার সম্মোহনী ও প্রখর দৃষ্টিপাত স্থির রেখে বলল,
“You see, Bernard, while you were calculating your profits in millions, I was calculating your expiration dates. I didn’t bypass your border security. I bought the people who guard it. I didn’t destroy your supply lines. I simply became the only line you have left.”
(দেখো, বার্নার্ড, তুমি যখন লক্ষ লক্ষ টাকায় তোমার মুনাফা হিসাব করছিলে, আমি তখন তোমার মেয়াদ শেষ হওয়ার তারিখ হিসাব করছিলাম। আমি তোমার সীমান্ত নিরাপত্তা ভেদ করিনি। আমি এর রক্ষীদের কিনে নিয়েছি। আমি তোমাদের সরবরাহ ব্যবস্থা ধ্বংস করিনি। আমিই তোমাদের একমাত্র অবশিষ্ট রক্ষাকবচ হয়ে উঠেছি।)
আলবেনিয়ান গ্যাং লিডার নিকোলা এতক্ষণ চুপ ছিল। সে এবার ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে নিজের দুই হাত টেবিলের ওপর তুলে বলল,
“What do you want, Z? Tell us your price. We can share the market. 50-50. Just let us live!”
(তুমি কী চাও, জেড? তোমার দামটা বলো। আমরা বাজারটা ভাগ করে নিতে পারি। ৫০-৫০। শুধু আমাদের শান্তিতে থাকতে দাও!)
জেনিন নিকোলার দিকে তাকাল। তার চোখে তখন এক পরম অবজ্ঞা আর তাচ্ছিল্যের দৃষ্টি। সে ভদকার গ্লাসে একটা ছোট চুমুক দিয়ে অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে বলতে শুরু করল,
“50-50? You are bargaining with Panthera Leo, Nikola? A lion doesn’t share his prey with hyenas. The market is mine. 100%. From tonight, you don’t own the drugs, you don’t own the routes, you don’t even own the air you breathe in this city. Every gram of product that enters France will have the seal of Nurshad Industries. If I allow you to sell, you eat. If I close my hand, you starve.”
(৫০-৫০? তুমি সিংহের সাথে দর কষাকষি করছ, নিকোলা? একটা সিংহ হায়েনাদের সাথে তার শিকার ভাগ করে না। বাজারটা আমার..শতভাগ। আজ রাত থেকে, ড্রাগসের মালিক তুমি নও, পাচারের পথের মালিকও নও, এমনকি এই শহরের যে বাতাসে তুমি শ্বাস নাও, তারও মালিক তুমি নও। ফ্রান্সে প্রবেশ করা প্রতিটি গ্রাম পণ্যে নুরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজের সিলমোহর থাকবে।)
বার্নার্ড বুঝতে পারল, খেলাটা অলরেডি শেষ হয়ে গেছে। এই বাঙালি যুবকটি তাদের চারজনের পুরো ক্রাইম সাম্রাজ্যকে গত ছয় মাস ধরে স্টাডি করেছে, এবং আজ এক চালের ম্যাজিকে তাদের নিজেদের আস্তানায় তাদেরই বন্দি করে ফেলেছে। সে বুঝতে পারল, সুদূর প্যারিসের মাফিয়া ওয়ার্ল্ডে জেনিনকে কেন শ্যাডো কিং বা ছায়ারাজ বলে ডাকা হয়!
বার্নার্ড নিজের শুকনো থুতু গিলে খুব নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“And what if we refuse? What if we walk out of this door and call the international agencies? The ICC is already looking for you.”
(আর যদি আমরা অস্বীকার করি? যদি আমরা এই দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাই এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে ফোন করি? আইসিসি তো ইতিমধ্যেই তোমাকে খুঁজছে।)
জেনিন এবার হো হো করে হেসে উঠল। সেই হাসির শব্দে পুরো হলরুমের পাথুরে দেয়ালগুলো যেন কেঁপে উঠল। জেনিন নিজের চেয়ার ছেড়ে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। সে মেহগনি টেবিলটার ওপর দুই হাত রেখে বার্নার্ডের মুখের একদম কাছাকাছি নিজের মুখটা নিয়ে এল। চশমার আড়ালের কুচকুচে কালো চোখ দুটো যেন দুটো জ্বলন্ত কয়লা!
“Call them, Bernard. Please, do!”
ক্ষণিক থেমে জেনিন আবিরো বললো,
“Do you really think the French administration is clean? The minister who signs your warrants is the same man who cleared my shipment at the port two hours ago. If I fall, I will drag the entire French parliament down with me. And as for you four…”
(তুমি কি সত্যিই মনে করো ফরাসি প্রশাসন ক্লিন? যে মন্ত্রী তোমার পরোয়ানায় স্বাক্ষর করে, তিনিই দু’ঘণ্টা আগে বন্দরে আমার চালানটি ছাড়পত্র দিয়েছেন। যদি আমি ধ্বংস হয়ে যাই, তবে পুরো ফরাসি সংসদকেও আমার সাথে টেনে নামাব। আর তোমরা চারজনকেও..”
জেনিন সোজা হয়ে দাঁড়াল। সে নিজের ব্লেজারের বোতামটা লাগাতে লাগাতে লুকাসের দিকে তাকিয়ে ইশারা করল।
“If any of these gentlemen tries to speak outside this room, don’t just kill them. Erase their entire generation from the map of Europe. I don’t like unfinished businesses.”
(যদি এই ভদ্রলোকদের মধ্যে কেউ এই ঘরের বাইরে কথা বলার চেষ্টা করে, তাহলে শুধু তাদের হত্যা করবে না। ইউরোপের মানচিত্র থেকে তাদের পুরো প্রজন্মকে মুছে ফেলো। আমি অসমাপ্ত কাজ পছন্দ করি না।)
জেনিন ধীর পায়ে দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করল। তার যাওয়ার পথে চারপাশের ফ্রেঞ্চ শুটাররা এক গভীর শ্রদ্ধায় ও ভয়ে মাথা নিচু করে তাকে জায়গা করে দিচ্ছিল, যেন তারা কোনো সাধারণ মানুষকে নয়, বরং বনের আসল রাজাকে পথ ছেড়ে দিচ্ছে!
দরজার কাছে গিয়ে জেনিন এক মুহূর্তের জন্য থামল। সে পেছনে ফিরে না তাকিয়েই, অত্যন্ত শান্ত ও দম্ভ ভরা কণ্ঠে তার শেষ বাক্যটি বাতাসে ছুড়ে দিল,
“Welcome to my jungle, gentlemen. Try to survive.”
(আমার জঙ্গলে স্বাগতম, ভদ্রমহোদয়গণ। টিকে থাকার চেষ্টা কর।)
কথাটা শেষ করেই জেনিন নূরশাদ প্যারিসের অন্ধকার প্রাচীন দুর্গ চিরে বাইরের ঘন কুয়াশার মাঝে মিলিয়ে গেল। সেই রাতের পর থেকে সুদূর প্যারিসের আন্ডারওয়ার্ল্ডে আর কোনোদিন লুক বার্নার্ড বা অন্য কোনো গডফাদার জেনিন নূরশাদের রুটে বাধা দেওয়ার ধৃষ্টতা দেখায়নি। তারা জেনে গিয়েছিল, এই এশিয়ান সিংহ খাঁচায় বন্দি থাকলেও সে সিংহই থাকে!
দুর্গের বাইরে তখন ফ্রেঞ্চ বসন্তের এক হিমশীতল হাওয়া বইছে। সিন নদীর ওপর জমে থাকা ঘন কুয়াশার চাদর ভেদ করে একটা কুচকুচে কালো রঙের মার্সিডিজ মেব্যাক এসে দাঁড়াল ক্যাসেলে ঢোকার ভাঙা পাথুরে রাস্তার মুখে। গাড়িটার হেডলাইটের তীব্র আলো কুয়াশা চিরে জেনিনের লম্বা অবয়বটাকে ছুঁয়ে গেল।
গাড়ির পেছনের দরজাটা এক সেকেন্ডের মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে গেল। জেনিন খুব ধীরস্থির পায়ে এগিয়ে গিয়ে গাড়ির নরম লেদার সিটে আরাম করে বসল। সে বসামাত্রই গাড়িটা কোনো শব্দ না করে প্যারিসের হাইওয়ের দিকে ডাইভ দিল।
ড্রাইভিং সিটে বসে থাকা যুবকটি আর কেউ নয়, উদয় গালিব উরফে ইউজি যাকে বিশ্বস্ততার প্রতীক হিসেবে মানে জেনিন। লন্ডনের আন্ডারওয়ার্ল্ড থেকে শুরু করে পুরো ইউরোপ এশিয়ার আন্ডারওয়ার্ল্ড এ নিজকে প্রতিষ্ঠিত করতে ইউজিই ছিল জেনিনের একমাত্র সহযোগী। ইউজি রিয়ার-ভিউ মিরর দিয়ে জেনিনের দিকে একবার তাকাল। জেনিন ততক্ষণে তার সোনালী ফ্রেমের চশমাটা খুলে সিটের পাশে রেখেছে এবং দুই আঙুলের মাঝে নতুন আরেকটি চুরুট ধরিয়েছে।
“বস, ক্যাসেলের ভেতরের সিগন্যাল সব গ্রিন দেখাচ্ছে। লুকাস অলরেডি বার্নার্ডের প্রাইভেট লকার আর সুইস অ্যাকাউন্টের অ্যাক্সেস কোড আমাদের হেডকোয়ার্টারে পাঠিয়ে দিয়েছে” ইউজি ফ্রেঞ্চ অ্যাক্সেন্টে মিশ্রিত ইংরেজিতে খুব নিচু স্বরে রিপোর্ট করল।
জেনিন জানালার কাঁচটা সামান্য নামিয়ে দিল। বাইরের ঠাণ্ডা হাওয়া এসে তার কপালের চুলগুলোকে এলোমেলো করে দিচ্ছিল। সে চুরুটের ধোঁয়াটা বাইরে ছেড়ে দিয়ে বলল,
“বার্নার্ডের অ্যাকাউন্ট আমার চাই না। ওটা লুকাসকে বোনাস হিসেবে দিয়ে দাও। লোভী কুকুরকে বেশিদিন না খাইয়ে রাখলে সে আবার অন্য মালিকের পায়ে গিয়ে কামড়াতে পারে। লয়ালটি মেইনটেইন করার জন্য ওর ওই টাকার দরকার আছে।”
ইউজি সামান্য হাসল।
“আর মার্সেই রুট? দিমিত্রি আর মারিও কি সত্যিই চুপ থাকবে? ওরা রাশিয়ান আর ইতালিয়ান আন্ডারওয়ার্ল্ডের বড় মাথা।”
“ওরা মাথা হতে পারে ইউজি, কিন্তু ওদের ধড়টা এখন আমার হাতের মুঠোয়,” জেনিন তার চোখ দুটো বুজে সিটের পেছনে মাথাটা এলিয়ে দিল। “আজ রাতে ওরা চারজন যখন নিজেদের বিছানায় ঘুমাতে যাবে, তখন প্রতিটা সেকেন্ডে ওদের মনে হবে, ওদের বালিশের নিচে আমার একটা করে বোম লুকানো আছে। ভয়… ইউজি, ভয় জিনিসটা ড্রাগসের চেয়েও বেশি অ্যাডিক্টিভ। একবার যদি কোনো মাফিয়ার মগজে এই ভয় ঢুকে যায়, সে আর কোনোদিন ট্রিগার চাপার সাহস পায় না।”
গাড়িটা তখন আইফেল টাওয়ারের ঠিক নিচের রাস্তা দিয়ে পার হচ্ছিল। ঝলমলে আলোর সেই আইকনিক টাওয়ারটার ছায়া এসে পড়ল জেনিনের ফেসের ওপর। জেনিন চোখ না খুলেই খুব ম্লান করে বলল,
“নূরশাদ ইন্ডাস্ট্রির প্যারিস উইংয়ের শিপমেন্টের কী খবর?”
“সব রেডি বস। কাল ভোর পাঁচটায় মার্সেই পোর্ট থেকে আমাদের প্রথম টেক্সটাইল এবং শিপিং কনটেইনারগুলো লন্ডনের উদ্দেশ্যে রওনা হবে। ফ্রেঞ্চ কাস্টমস অফিসাররা অলরেডি ফাইলে ক্লিন চিট সিল মেরে দিয়েছে। কেউ ভাবতেও পারবে না ওই সিল্ক আর সুতোর কার্টনের নিচে কী আছে।”
“গুড,” জেনিন এবার চোখ খুলল। তার চোখে আবার দূরদর্শী চাণক্যের চকমকি।
“ইউরোপের এই বাজারটা আমাদের আগামী পাঁচ বছর নিখুঁত ব্যাকআপ দেবে।”
ইউজি স্টিয়ারিং হুইলটা শক্ত করে ধরে জেনিনের সেই অপরাজেয় রূপটা দেখছিল। সে মনে মনে জানত, এই মানুষটা যেখানেই পা রাখবে, সেখানকার মাটি কাঁপতে বাধ্য।
<><><><><><><><><>
বর্তমান
ঢাকা-বাংলাদেশ
গুলশান এলাকায় নুরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজের প্রধান কার্যালয়। সাধারণত প্রতিদিন সকালে এই প্রকাণ্ড ভবনের সামনে হাজারো শ্রমিকের কোলাহল, সাইরেনের তীক্ষ্ণ আওয়াজ আর কারখানার চাকার ঘর্ঘর শব্দে এক ব্যস্ত মুখর পরিবেশ তৈরি হতো। কিন্তু আজকের সকালটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। পুরো নুরশাদ সাম্রাজ্যের ওপর যেন এক কালচে মেঘের ছায়া নেমে এসেছে। আদালতের ঐতিহাসিক ফাঁসির রায়ের পর এখানকার বাতাসও যেন ভারী হয়ে গেছে।
ভবনের মূল ফটকের সামনে গুটিগুটি পায়ে জটলা পাকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল কয়েকজন সিনিয়র সেকশন ইনচার্জ ও প্রবীণ শ্রমিক। তাদের সবার চোখ-মুখেই এক চাপা আতঙ্ক, এক গভীর শূন্যতা।
“বিশ্বাস হয় না রে ভাই,” ডাইং সেকশনের প্রবীণ ফোরম্যান কাসেম আলী নিজের মাথার ময়লা টুপিটা খুলে কপালে জমে থাকা ঘাম মুছতে মুছতে বললেন। তার কণ্ঠস্বর বড্ড ভাঙা শোনাল।
“বসের ফাঁসির রায় হয়া গেল? যে মানুষটা এই এত বড় ফ্যাক্টরি খাড়া করল, আমগো হাজারটা পরিবারের পেটের ভাত জোগাইল, তারে নাকি গলায় দড়ি দিবো?”
পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা কাটিং মাস্টার মকবুল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তার চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। সে চারদিকের নিস্তব্ধ ভবনটার দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল,
“বস মানুষটা বড্ড কড়া আছিল কাসেম ভাই। কথা কইলে মনে অইতো কলিজা কাঁপতাছে। কোনোদিন আমাগো সাথে হাইসা কথা কয় নাই। কারখানার কোণায় কার কী সমস্যা, কে অসুস্থ, সব খবর রাখতো ঠিকই, কিন্তু নিজের মুখে কোনোদিন ভালো সায় দেয় নাই। রুড আছিল, বড্ড রুড আছিল মানুষটা।”
“আইন-কানুন তো বুঝলাম না ভাই” কাটিং সেকশনের এক নারী শ্রমিক সুফিয়া খাতুন তার শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে যোগ করল। “আইন ওনারে ডাকাত কয়, খুনি কয়। কিন্তু আমাগো কাছে তো হ্যায় ভালাই আছিল। আমার মাইয়ার বিয়ার সময় যখন পকেটে এক টাকাও আছিল না, বসের রুমে গিয়া কাঁপতাছিলাম। ওনার পিয়নডায় আমারে বকা দিয়া বাইর করতে গেছিল। বস শুধু এক নজর ওনার চশমার ওপর দিয়া তাকাইয়া পিয়নরে কইল, ওনাকে ক্যাশ সেকশনে নিয়া যাও। এক লাখ টাকা ওনার এক ইশারায় পাইছিলাম। আজ সেই মানুষের এই দশা?”
ঠিক এই সময় প্রধান ফটকের সামনে এসে থামল একটি কুচকুচে কালো রঙের বুলেটপ্রুফ ক্যাডিলাক গাড়ি। গাড়িটা থামামাত্রই শ্রমিকদের ভেতরের ফিসফিসানি এক নিমেষে স্তব্ধ হয়ে গেল।
গাড়ির পেছনের দরজাটা খুলে গেল। সবার প্রথম বেরিয়ে এল ইউজি। ইউজির পরনে আজ একটি সম্পূর্ণ কালো ফর্মাল স্যুট, চোখে ডার্ক সানগ্লাস। তার দুই হাত কোটের সামনের বোতামের কাছে রাখা, চোখ দুটো চিল পাখির মতো চারপাশের প্রতিটি কোণ, প্রতিটি ছাদ আর শ্রমিকদের হাতের মুভমেন্ট মেপে নিচ্ছে। জেনিনের দেওয়া প্রটোকল অনুযায়ী সে এক ইঞ্চিরও সুরক্ষাবলয় আলগা হতে দিচ্ছে না।
ইউজি ধীর পায়ে গাড়ির পেছনের সিটের দরজাটা পুরোটা খুলে এক পাশে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
গাড়ি থেকে নামল,
—নোবারা নূরশাদ—
নোবারাকে দেখামাত্রই উপস্থিত শ্রমিকদের মাঝে একটা মৃদু গুঞ্জন উঠে আবার দমে গেল। জেনিনের নির্দেশ মতো নোবারা আজ তার জীবনের অন্যতম সেরা ও কঠিন অভিনয়ের মঞ্চে দাঁড়িয়েছে। তার পরনে একটি সাধারণ হালকা ফ্যাকাশে রঙের শাড়ি, চুলে কোনো পরিপাটি বাঁধন নেই। গর্ভাবস্থার এই পঞ্চম মাসে এসে তার শরীরটা স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা ভারী ও ক্লান্ত লাগছিল, কিন্তু তার চেয়েও বড় অবয়ব তৈরি করেছিল তার চোখ দুটো।
জেনিনের কথা মতো সে নিজের চোখ দুটোকে ফোলা ও লালচে করে রেখেছে। তার ঠোঁট দুটো শুকিয়ে আছে, যেন গত চব্বিশ ঘণ্টায় সে এক ফোঁটা জলও স্পর্শ করেনি। এক কান্নায় ভেঙে পড়া, নিঃস্ব, বিধবাপ্রায় নারীর নিখুঁত এক প্রতিচ্ছবি!
নোবারা যখন ধীর পায়ে নুরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজের মার্বেল পাথরের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠছিল, তখন তার এক হাত তার গর্ভের ওপর রাখা ছিল। তনুজা নোবারার ঠিক পাশেই তাকে আলতো করে ধরে এগোচ্ছিল। মেয়েটাকে এই অবস্থায় একা ছাড়তে তার মন সায় দেয়নি। তাই সেও চলে এসেছে।
ভবনের লবিতে দাঁড়িয়ে থাকা নুরশাদ সাম্রাজ্যের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা, ডিরেক্টররা এবং জুনিয়র এক্সিকিউটিভরা এক গভীর নীরবতায় মাথা নিচু করে নোবারাকে সম্মান জানাল। সবার মনেই এক বড় প্রশ্ন, এই ভাঙা, নিঃস্ব মেয়েটা কীভাবে এত বড় ডন জেডের শূন্য সিংহাসন সামলাবে? জেনিন নুরশাদ নিজের অবর্তমানে তার সমস্ত সম্পত্তি নোবারার নামে লিখে দিয়ে গেছে, কিন্তু এই বিশাল ডিরেক্টরদের বোর্ড কি নোবারার মতো এক প্রাক্তন সাধারণ মেয়েকে মেনে নেবে?
বিশ তলার প্রকাণ্ড ও বিলাসবহুল বোর্ডরুম।
বিশাল মেহগনি কাঠের তৈরি টেবিলটাকে ঘিরে বসে আছে নুরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজের বারো জন সবচাইতে প্রভাবশালী ডিরেক্টর, লিগ্যাল অ্যাডভাইজার এবং ফিন্যান্সিয়াল হেডস। টেবিলের একদম প্রধান আসনটি..যেখানে এতো বছর ধরে জেনিন নুরশাদ বসত, সেই বড় চেয়ারটা আজ খালি পড়ে আছে!
বোর্ডরুমের দরজাটা এক জোড়া সিকিউরিটি গার্ড ধীরগতিতে খুলে দিল। নোবারা ভেতরে প্রবেশ করল। তার কাঁপতে থাকা পা দুটো কোনোমতে সামলে সে টেবিলের দিকে এগিয়ে এল। তনুজা নোবারার জন্য জেনিনের ঠিক পাশের একটি ছোট চেয়ার টেনে দিল। কিন্তু নোবারা সেখানে বসল না।
সে অত্যন্ত ধীর পায়ে, নিজের শাড়ির আঁচলটা একটু শক্ত করে চেপে ধরে জেনিনের প্রধান সিংহাসনটার সামনে এসে দাঁড়াল। পুরো বোর্ডরুমের বড় বড় কর্মকর্তাদের শ্বাস যেন আটকে গেল।
নোবারা চেয়ারটার হাতলে নিজের বরফের মতো ঠান্ডা হাতটা রাখল। জেনিন আজ এখানে নেই, কিন্তু নোবারা স্পষ্ট অনুভব করতে পারছিল এই চামড়ার চেয়ারটায় এখনো জেনিনের চেনা পারিউম আর তামাকের একটা সূক্ষ্ম ঘ্রাণ লেপ্টে আছে। নোবারা একটা লম্বা নিশ্বাস নিল। তার চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা অবাধ্য জল গড়িয়ে পড়ল, এটি কোনো অভিনয় ছিল না, এটি ছিল জেনিনের জন্য তার ভেতরের আসল হাহাকার। সে চেয়ারটায় বসল। জেনিনের বিশাল সিংহাসনে নোবারার এই ফ্যাকাশে, গর্ভবতী শরীরটা বসার পর এক অদ্ভুত বৈপরীত্য তৈরি হলো। তবে তাকে বেশ মানিয়েছে বটে। কারণ একজন শক্তিশালী পুরুষের জায়গা একজন শক্তিশালী নারীই নিতে পারে। নোবারা তা প্রতি মুহূর্তে প্রমাণ করে যাচ্ছে।
“ম্যাম…” কোম্পানির চিফ ফিন্যান্সিয়াল অফিসার (CFO) আসাদুল্লাহ সাহেব চশমাটা নাকের ওপর সোজা করে অত্যন্ত নিচু ও কৃত্রিম সহানুভূতি মেশানো কণ্ঠে বললেন,
“বসের আকস্মিক রায় আমাদের সবাইকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু…কিন্তু নুরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ার বাজারে আজ সকাল থেকেই ধস নামা শুরু হয়েছে। বসের ফাঁসির রায় শোনার পর আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্টরা তাদের টেক্সটাইল অর্ডার বাতিল করার হুমকি দিচ্ছে। আমাদের এখনই একটা বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”
ফিন্যান্সিয়াল হেডের কথা শেষ হতে না হতেই লিগ্যাল টিমের প্রধান ব্যারিস্টার রফিক সাহেব ফাইল ওলটাতে ওলটাতে বললেন,
“আসাদ সাহেবের কথা ঠিক। তা ছাড়া, সিআইডি আর এনবিআর অলরেডি বসের পার্সোনাল অ্যাকাউন্ট আর নুরশাদ ফাউন্ডেশনের ট্যাক্স ফাইলগুলো ফ্রিজ করার জন্য নোটিশ পাঠিয়েছে। ম্যাম, আপনি যদি এই মুহূর্তে সব ফাইলে সই না করেন, তবে আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আমাদের পুরো প্রোডাকশন বন্ধ হয়ে যাবে।”
বোর্ডরুমের অন্য ডিরেক্টররা নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করতে লাগল। একজন ফিসফিস করে বলল, “মেয়েটা তো দেখছি ভয়ে কথাই বলতে পারছে না। জেনিন নুরশাদ নিজের অহংকারে পুরো কোম্পানিটাকে একটা বাচ্চার হাতে দিয়ে ধ্বংস করে গেল।”
নোবারা সবার কথা শুনছিল। জেনিনের নির্দেশ মতো সে তার মুখটা টেবিলের ওপর নিচু করে রাখল। তার কাঁধ দুটো সামান্য কাঁপছিল, যেন সে নিজের কান্না আটকানোর এক আপ্রাণ চেষ্টা করছে। চারপাশের ডিরেক্টররা নোবারার এই দুর্বলতা দেখে মনে মনে একটু স্বস্তি পেল, তারা ভাবল, এই মেয়েকে দিয়ে সহজেই নিজেদের স্বার্থে সব ফাইলে সই করিয়ে নেওয়া যাবে।
ইউজি এতক্ষণ বোর্ডরুমের ঠিক কোণায়, দেয়ালের ছায়ার সাথে মিশে এক পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে ছিল। তার কালো সানগ্লাসের আড়ালে থাকা চোখ দুটো এই কর্মকর্তাদের প্রতিটা মুখের লোভী অভিব্যক্তি নিখুঁতভাবে স্টাডি করছিল। সে ভালো করেই জানে, জেনিন এই কুকুরগুলোকে চেনার জন্যই নোবারাকে এই কান্নার অভিনয়টা করতে বলেছিল। জেনিন নুরশাদ অকারণে কোন কিছুই করে না তা আবারো প্রমাণ হয়ে গেল।
নোবারা ধীরে ধীরে তার মাথাটা তুলল। সে তার শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখের জলটা মুছল। তার কণ্ঠস্বর বড্ড দুর্বল ও ভাঙা শোনাল,
“আপনারা…আপনারা যা বলছেন, আমি তার কিছুই বুঝতে পারছি না,” নোবারা ফিসফিস করে বলল। সে তার সামনে রাখা লিগ্যাল ফাইলগুলোর দিকে তাকিয়ে নিজের হাত দুটোকে সামান্য কাঁপাল, যেন সে কলম ধরার শক্তিও পাচ্ছে না। “জেনিন আমাকে কোনোদিন এই ব্যবসার কাজ শেখায়নি। ও…ও তো সবসময় নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিত। আমি কীভাবে এত বড় কোম্পানির দায়িত্ব নেব?”
আসাদুল্লাহ সাহেব টেবিলের ওপর ঝুঁকে পড়ে মিষ্টি হেসে কলমটা নোবারার দিকে এগিয়ে দিলেন। “ম্যাম, আপনার কিছু বুঝতে হবে না। আমরা আছি তো। আপনি শুধু এই তিনটি প্রধান ফাইলে আপনার সইটা দিয়ে দিন। নুরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ার বাজারের উইংয়ের পুরো ডিরেকশন পাওয়ার আমরা আমাদের বোর্ডের হাতে ট্রান্সফার করে নিচ্ছি। এতে কোম্পানির শেয়ার আবার ঠিক হয়ে যাবে।”
নোবারা কলমটা হাতে নিল। তার আঙুলগুলো কাঁপছে। সে ফাইলের পাতার দিকে তাকাল। পাতার ওপরে বড় অক্ষরে লেখা,
Transfer of International Route and Logistics Controls.
নোবারা মনে মনে হাসল। জেনিন ঠিকই বলেছিল, সিংহ খাঁচায় বন্দি হতেই হায়েনারা তার শিকার কেড়ে নেওয়ার জন্য লালা ঝরাতে শুরু করেছে। আসাদুল্লাহ সাহেব ভাবছেন নোবারা বোকো, কিন্তু সে ভুলে গেছে নোবারা একসময় সিআইডি-র আন্ডারকাভার ইনভেস্টিগেটর ছিল, এমনকি সে প্রায় দুইমাস জেনিন এর পিএ হিসেবেই ছিল এই নুরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজে! ফাইলটার ভেতরের ফাঁদ সে এক পলকেই ধরে ফেলেছে।
নোবারা কলমটা ফাইলের ওপর ছোঁয়ানোর ঠিক আগের মুহূর্তে…হঠাৎ নূরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজের পুরো ষষ্ঠ তলার সেন্ট্রাল এয়ার কন্ডিশনারের শোঁশোঁ আওয়াজটা বন্ধ হয়ে গেল। বোর্ডরুমের প্রধান ভারী ওড কাঠের দরজাটা কোনো প্রকার নক বা পারমিশন ছাড়াই এক বিকট শব্দে বাইরে থেকে খুলে গেল।
ভেতরের বারো জন ডিরেক্টর আর লিগ্যাল অ্যাডভাইজার চমকে উঠে দরজার দিকে তাকাল। ইউজির হাত এক সেকেন্ডের মধ্যে তার কোটের ভেতরের রিভলভারের গ্রিপে চলে গেল।
পর্দার ওপাশ থেকে করিডোরের আলো চিরে ভেতরের অন্ধকার বোর্ডরুমে প্রবেশ করল এক দীর্ঘদেহী, সুপরিচিত ফ্রেঞ্চ যুবক। তার পরনে দামী ইতালিয়ান ব্লেজার, চুলগুলো নিখুঁতভাবে ব্যাক-কম্ব করা। লোকটার ডান গালে একটা গভীর কাটার দাগ।
ইউজি এক পলকেই লোকটাকে চিনে ফেলল। তার সানগ্লাসের আড়ালের চোখ দুটো বিস্ময়ে সংকুচিত হলো।
লোকটি আর কেউ নয়…লুকাস।
সুদূর প্যারিসের আন্ডারওয়ার্ল্ডের গডফাদার লুক বার্নার্ডের প্রাক্তন বিশ্বস্ত বডিগার্ড এবং বর্তমান প্যারিস উইংয়ের আন্ডারগ্রাউন্ড লজিস্টিক হেড, লুকাস! যাকে জেনিন নুরশাদ পাঁচ বছর আগে মার্সেইতে তার পুরো পরিবারের জীবন কব্জা করে নিজের ছায়ারাজ্যের গোলাম বানিয়েছিল।
লুকাসের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে চারজন ফ্রেঞ্চ শুটার, যাদের কোটের নিচে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের অবয়ব স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। লুকাস অত্যন্ত ধীর পায়ে, বুটের খটখট শব্দ তুলে মেহগনি টেবিলটার দিকে এগিয়ে এল। তার মুখমণ্ডল পুরো ফ্যাকাশে ও গম্ভীর।
আসাদুল্লাহ সাহেব রেগে আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন,
“Who the hell are you?! This is a private board meeting! Security!”
(তুমি কে হে?! এটা একটা ব্যক্তিগত বোর্ড মিটিং! সিকিউরিটি!)
লুকাস আসাদুল্লাহ সাহেবের দিকে একটা নজরও দিল না। সে সরাসরি এগিয়ে এল টেবিলের প্রধান আসনে বসা নোবারা নুরশাদের সামনে। পুরো বোর্ডরুমের কর্তারা তখন ভয়ে ও বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেছে।
লুকাস নোবারার থেকে ঠিক তিন ফুট দূরত্বে এসে থামল। তারপর, পুরো ঘরের বারো জন ডিরেক্টরকে আক্ষরিক অর্থেই কোমায় পাঠিয়ে দিয়ে, লুকাস অত্যন্ত বিনীত ও গভীর শ্রদ্ধায় নোবারার সামনে নিজের মাথাটা নিচু করে কুর্নিশ জানাল। সে ফ্রেঞ্চ মিশ্রিত ইংরেজিতে অত্যন্ত নিচু অথচ স্পষ্ট স্বরে বলল,
“Bonjour, Madame Nurshad.”
লুকাস সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে নোবারার কাঁপতে থাকা হাতের দিকে তাকাল। তার চোখে তখন জেনিন নুরশাদের প্রতি থাকা এক অবিনশ্বর, ভয়ঙ্কর ভয়ের ছায়া। সে নোবারার দিকে তাকিয়ে বলল,
“Panthera Leo might be behind the bars in Dhaka, Madame… but the Jungle of Paris still obeys his shadow. I have come from France with a message for you. And for these gentlemen.”
(প্যান্থেরা লিও হয়তো ঢাকার কারাগারে বন্দী, ম্যাডাম… কিন্তু প্যারিসের জঙ্গল এখনও তার ছায়া মেনে চলে। আমি ফ্রান্স থেকে আপনার জন্য একটি বার্তা নিয়ে এসেছি। এবং এই ভদ্রলোকদের জন্যও।)
লুকাস এবার ঘুরে দাঁড়াল আসাদুল্লাহ সাহেব আর ব্যারিস্টার রফিকের দিকে। তার ডান গালের কাটার দাগটা ঘরের হলুদ আলোয় এক বীভৎস রূপ নিল। সে টেবিলের ওপর রাখা সেই ট্রান্সফার ফাইলটার ওপর নিজের হাতটা থাপ্পড় মেরে রাখল।
বোর্ডরুমের ভেতরের তাপমাত্রা যেন এক সেকেন্ডে হিমাঙ্কের নিচে নেমে গেল। নোবারা তার চোখের কৃত্রিম কান্নার পর্দাটা এক ঝটকায় সরিয়ে নিল। তার চোখের মণি দুটো এবার জেনিনের মতোই প্রখর ও ধারালো হয়ে উঠল। সে বুঝতে পারল, ঢাকার কনডেমড সেলে বসে জেনিন নূরশাদ তার প্রথম চালটি বাইরে ফেলে দিয়েছে!
চলবে ইংশাআল্লাহ…
(আজকে সব্বার মন্তব্য চাইইইই। সাইলেন্ট রিডার, অ্যাক্টিভ রিডার দুই পক্ষের। আমার চোখের বারোটা বেজেছে জানেন…হুদাই পানি পড়তেছে, আর জ্বলতেছে। এতোক্ষণ ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকতে গিয়ে হয়তো। যাগগে, মন্তব্য করুউউউউন!🫠🫶🏻)

