Soulmate_to_Enemy |৭৭|

0
1

#Soulmate_to_Enemy |৭৭|
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম

(বড় পর্ব এলার্ট—সময় নিয়ে পড়বেন)

বোর্ড মিটিংয়ের কেবিন, নুরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজ। মেহগনি কাঠের দীর্ঘ টেবিলটার ওপর লুকাসের হাতের তালুর চাপটা পড়ার সাথে সাথেই একটা তীক্ষ্ণ, শুষ্ক শব্দ হলো। সেই শব্দের প্রতিধ্বনি যেন পুরো বোর্ডরুমের বারো জন ডিরেক্টরের মেরুদণ্ড বেয়ে এক হিমশীতল স্রোত নামিয়ে দিল! বিশাল ঘরের ভেতর এখন আর কোনো ফিসফিসানি নেই। এতক্ষণ যারা নোবারাকে একজন দুর্বল, অসহায়, গর্ভবতী নারী ভেবে নূরশাদ সাম্রাজ্যের আন্তর্জাতিক রুটগুলো নিজেদের নামে লিখে নেওয়ার জন্য লালা ঝরাচ্ছিল, তারা এখন নিজেদের চেয়ারের সাথে আক্ষরিক অর্থেই লেপ্টে আছে। আসাদুল্লাহ সাহেবের কপাল বেয়ে এক ফোঁটা ঠাণ্ডা ঘাম চশমার কাঁচের ওপর এসে পড়ল। তিনি শুকনো থুতু গিলে লুকাসের পেছনের চারজন ফ্রেঞ্চ শুটারের কোটের নিচে থাকা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের আকৃতির দিকে তাকালেন। ওগুলো কোনো সাধারণ পিস্তল নয়, ওগুলো নিমিষেই পুরো তলাটাকে লাশের স্তূপে পরিণত করার জন্য যথেষ্ট।

লুকাস এর ফ্যাকাশে ঠোঁটের কোণে এক বিন্দু করুণা বা দয়া নেই। সে নোবারার সামনে থেকে সামান্য সরে এসে আসাদুল্লাহ সাহেবের একদম মুখোমুখি দাঁড়াল। লোকটার চিবুকটা ভয়ে কাঁপছে দেখে লুকাস আসাদুল্লাহর টাইয়ের নটটা ধরল। অত্যন্ত নিখুঁত, পরিপাটি কিন্তু বিষাক্ত ব্রিটিশ অ্যাক্সেন্টে সে কথা বলতে শুরু করল,
“You were talking about sharing markets, weren’t you, Mr. CFO?”
(আপনি যেন বাজার ভাগাভাগির কথা বলছিলেন, মিস্টার সিএফও?)

লুকাসের গলার স্বরটা বড্ড নিচু, যেন কোনো গভীর কুয়ো থেকে উঠে আসছে। আসাদুল্লাহ সাহেব কোনোমতে নিজের মাথাটা ডানে-বামে নাড়ানোর চেষ্টা করলেন, কিন্তু টাইয়ের টানে তার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল।

লুকাস তার পকেট থেকে একটা ছোট, নমনীয় ব্ল্যাকবেরি ডিভাইস বের করে টেবিলের ওপর ছুড়ে দিল।

“Open it, Advisor. Take a look at your personal Swiss accounts. All of you.”

(এটা খোলো, অ্যাডভাইজার। তোমাদের সবার ব্যক্তিগত সুইস অ্যাকাউন্টগুলো একবার দেখে নাও।)

লিগ্যাল টিমের প্রধান ব্যারিস্টার রফিক কাঁপাকাঁপা হাতে ডিভাইসটা তুলে নিলেন। স্ক্রিনে ভেসে থাকা ডিজিটাল সংখ্যার দিকে তাকানো মাত্রই তার চোখের মণি দুটো ছিটকে বাইরে চলে আসার উপক্রম হলো। নুরশাদ ইন্ডাস্ট্রির বারো জন ডিরেক্টরের ব্যক্তিগত বেনামী অ্যাকাউন্ট, যা তারা সিঙ্গাপুর এবং সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে লুকিয়ে রেখেছিল, তার প্রতিটা সেন্টের ব্যালেন্স এখন আক্ষরিক অর্থেই জিরো দেখাচ্ছে। জেনিন নুরশাদ জেলে যাওয়ার ঠিক বারো ঘণ্টার মধ্যে এই পুরো টাকাটা আন্তর্জাতিক সাইবার উইং দিয়ে হ্যাক করে এক অজ্ঞাত অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করে দেওয়া হয়েছে।

“You thought the King was caged, so the hyenas could feast?”
(তোমরা ভেবেছিলে রাজা খাঁচাবদ্ধ, তাই হায়েনারা ভোজ করবে?)

লুকাস এবার আসাদুল্লাহর টাইটা এক ঝটকায় ছেড়ে দিল। আসাদুল্লাহ সাহেব ছিটকে নিজের চেয়ারে গিয়ে পড়লেন, তার ফুসফুস তখন অক্সিজেনের জন্য হাঁসফাঁস করছে। লুকাস টেবিলের চারদিকে এক ধীর বৃত্তে হাঁটতে শুরু করল। তার বুটের প্রতিটি খট খট শব্দ যেন এই বারো জন মানুষের জীবনের কাউন্টডাউন গুনছিল।

“Every single dollar you stole, every single corrupted file you created for the NBR, it’s all in my hands now. One text message from me to the Counter-Terrorism Unit, and you won’t just lose your seats here… you will rot in the same prison as Zenin Nurshad. But remember, in that prison, nobody protects the snitches.”

(তোমাদের চুরি করা প্রতিটা ডলার, এনবিআরের জন্য বানানো প্রতিটা জাল ফাইল..সব এখন আমার হাতে। আমি যদি কাউন্টার-টেররিজম ইউনিটকে একটা মেসেজ পাঠাই, তবে তোমরা শুধু এই আসনই হারাবে না…জেনিন নুরশাদের সাথে একই জেলে পচবে। কিন্তু মনে রেখো, সেই জেলে বিশ্বাসঘাটকদের কেউ বাঁচায় না।)

রুমের ভেতর তখন কেবল প্রবীণ কর্মকর্তাদের দ্রুত নিশ্বাসের শব্দ। ব্যারিস্টার রফিক টেবিলের ওপর নিজের দুই হাত জোড় করে নোবারার দিকে তাকালেন। তার চোখে এখন মৃত্যুর ভয়। তিনি কাঁপা কাঁপা গলায় বললছন,
“ম্যাম…দয়া করে। আমরা শুধু…আমরা শুধু কোম্পানির শেয়ার বাঁচাতে চেয়েছিলাম। আমরা কসম করছি!”

নোবারা এতক্ষণ জেনিনের চওড়া চামড়ার চেয়ারটায় সম্পূর্ণ নিস্পৃহ হয়ে বসে ছিল। তার চেহারার কান্নাভেজা অবয়বটা এখন এক নিষ্ঠুর গাম্ভীর্যে ঢেকে গেছে। সে লুকাসের দিকে একবার তাকাল। লুকাস জেনিনের স্ত্রীর চোখের ভাষা খুব ভালো করেই পড়তে পারছে। পাঁচ বছর আগে প্যারিসের মাটিতে জেনিনের যে তেজ সে দেখেছিল, এই মেয়ের চোখের গভীরেও ঠিক সেই একই শীতল আগুনের শিখা জ্বলছে।

নোবারা লিগ্যাল ফাইলটার ওপর থেকে কলমটা তুলে এক পাশে ছুড়ে দিল, লুকাস নামের এক বিশ্বস্ত শ্যুটার এর গল্প সে জেনিনের কাছে শুনেছিল, আজ তাকে সামনাসামনি দেখছে আর বুঝতে পারছে, জেনিন যখন কাউকে বিশ্বাস করে তখন তাকে 0% ও সন্দেহ করা যায় না, সে আসলেই বিশ্বাসযোগ্য হয়। নোবারা অত্যন্ত নিখুঁত গলায় লুকাসের দিকে তাকিয়ে বলল,
“Get them out of my sight, Lucas. I don’t want to see these faces in this building by tomorrow morning.”

(ওদের আমার চোখের সামনে থেকে দূর করো, লুকাস। আগামীকাল সকালের মধ্যে এই ভবনে আমি এই মুখগুলো আর দেখতে চাই না।)

“With pleasure, Madame,” লুকাস মাথা নিচু করে জবাব দিল।

সে তার পেছনের শুটারদের দিকে তাকাল। কোনো কথা হলো না, শুধু চোখের এক ইশারায় সেই ফ্রেঞ্চ শুটাররা আসাদুল্লাহ সাহেব এবং ব্যারিস্টার রফিকসহ বারো জন ডিরেক্টরকে চেয়ার থেকে টেনে তুলল। কোনো হট্টগোল হলো না, কোনো চিল-চিৎকার হলো না। জেনিন নুরশাদের তৈরি করা আন্ডারওয়ার্ল্ড প্রটোকলের এটাই নিয়ম, সবকিছু নিঃশব্দে, নিখুঁতভাবে শেষ হয়ে যায়। কর্মকর্তারা নিজেদের ফাইলপত্র ফেলে কুকুরের মতো মাথা নিচু করে বোর্ডরুম থেকে বেরিয়ে গেল। মাত্র দশ মিনিটের মধ্যে নূরশাদ সাম্রাজ্যের ভেতরের সবচাইতে বড় প্রশাসনিক বিদ্রোহটা এক তুড়িতে ধূলিসাৎ হয়ে গেল।

বিশাল বোর্ডরুমটায় এখন কেবল তিনজন মানুষ। নোবারা, ইউজি এবং লুকাস। তনুজা কে নিতে নানামি বিল্ডিং এর নিচে এসেছিল বিধায় সে এইসব ঝামেলা শুরু হওয়ার আগেই চলছ গিয়েছে। ইউজি এতক্ষণ পর নিজের চোখে সানগ্লাসটা খুলল। তার কপালে সামান্য ঘাম জমেছে। সে ধীর পায়ে এগিয়ে এসে লুকাসের সামনে দাঁড়াল। দুই পুরোনো লড়াকু যোদ্ধা, যারা সুদূর ইউরোপের মাটিতে একাধারে জেনিনের ছায়াসঙ্গী ছিল, তারা একে অপরের দিকে তাকাল।

“You arrived just in time, Lucas,” ইউজির গলার স্বরে এক চিলতে স্বস্তি।
(তুমি একদম সঠিক সময়ে এসেছ, লুকাস।)

লুকাস নিজের ব্লেজারের বোতামটা খুলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার চেহারার সেই খুনে ভাবটা এবার কিছুটা ম্লান হয়ে এক ক্লান্তির রূপ নিল। সে নোবারার দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত বিনীত কণ্ঠে বলল,

“Samad, the chief security agent at the boss’s villa, sent me the news that the boss had been arrested. I couldn’t resist coming after hearing this news!)

(আমার কাছে বসের ভিলার চিফ সিকিউরিটি এজেন্ট সামাদ সাহেব খবর পাঠিয়েছিলেন যে বসকে গ্ৰেফতার করা হয়েছে। এই খবর শুনে আর না এসে থাকতে পারলাম না।)

নোবারা চেয়ার ছেড়ে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার এক হাত এখনো তার পেটের ওপর আলতো করে রাখা, যেখানে তাদের অনাগত সন্তানটি এক নতুন ভবিষ্যতের অপেক্ষায় বড় হচ্ছে। নোবারা জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরের ঢাকার ব্যস্ত রাস্তা, মিডিয়ার গাড়ি আর পুলিশের প্রটোকলগুলো এখান থেকে খুব ছোট দেখাচ্ছে।

“How is the Paris route, Lucas?”
নোবারা পেছনে না ফিরেই ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করল।

লুকাস জবাব দিল,
“Completely secure, Madame। The French borders are cleared. The new shipments have already reached London under the seal of Nurshad Industries. The international market doesn’t care if Zenin is in a cell or a palace; as long as Panthera Leo breathes, nobody dares to touch our containers.”

(সম্পূর্ণ নিরাপদ, ম্যাম। ফরাসি সীমান্ত পরিষ্কার করা হয়েছে। নতুন চালানগুলো ইতিমধ্যেই নূরশাদ ইন্ডাস্ট্রির সিলমোহরে লন্ডনে পৌঁছে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজার এটা পরোয়া করে না যে জেনিন সেলে আছে নাকি রাজপ্রাসাদে, যতদিন প্যান্থেরা লিও নিশ্বাস নিচ্ছে, কেউ আমাদের কন্টেইনার ছোঁয়ার সাহস পাবে না।)

ইউজি এগিয়ে এসে নোবারার পাশে দাঁড়াল।
“ম্যাম…আমাদের এবার সেন্ট্রাল জেলের দিকে রওনা হওয়া দরকার। নানামি ভাই আজ দুপুরের শিফটে বসের সাথে একটা বিশেষ সাক্ষাতের অনুমতি ও নিজের পদের ঝুঁকি নিয়ে ম্যানেজ করেছে।”

নোবারা ঘুরে দাঁড়াল। তার চোখের কৃত্রিম ফোলা ভাব আর ক্লান্তির ছায়াটা সে আবার ফিরিয়ে আনল। কারণ, ভবনের নিচে নামামাত্রই তাকে আবার নিঃস্ব, কান্নায় ভেঙে পড়া স্ত্রীর অভিনয়টা করতে হবে।

লুকাস নোবারার এই রূপবদল দেখে মনে মনে জেনিনের চয়েসের তারিফ না করে পারল না। সে এগিয়ে এসে বলল,
“I am coming with you, Madame. I need to see boss. I have some reports from the European syndicate that only he can decode.”

(আমিও আপনার সাথে আসছি, ম্যাম। আমার বসের সাথে দেখা করা দরকার। ইউরোপীয় সিন্ডিকেটের কিছু রিপোর্ট আছে যা কেবল তিনিই ডিকোড করতে পারবেন।)

ইউজি এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সে লুকাসের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“Are you crazy, Lucas? This is Dhaka Central Jail, not a port in Marseille. You are a foreigner, a white man. If the intelligence branch or the jailers see a foreign face trying to visit a top-tier condemned mafia boss, the entire media will blow up. Your name isn’t even in the prison visitor log.”

(তুমি কি পাগল হয়েছ, লুকাস? এটা ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার, মার্সেইয়ের কোনো বন্দর নয়। তুমি একজন বিদেশী, শ্বেতাঙ্গ লোক। গোয়েন্দা শাখা বা জেলারেরা যদি দেখে একজন বিদেশী মুখ শীর্ষ স্তরের মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মাফিয়া বসের সাথে দেখা করার চেষ্টা করছে, তবে পুরো মিডিয়া তোলপাড় হয়ে যাবে। প্রিজন ভিজিটর লগ এ তোমার নাম পর্যন্ত নেই।)

লুকাস নিজের ঠোঁটের কোণে এক ধূর্ত হাসি ফুটিয়ে তুলল। সে নিজের কোটের পকেট থেকে একটি লাল রঙের অফিসিয়াল পাসপোর্ট এবং বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি বিশেষ ক্লিয়ারেন্স লেটার বের করল।

“The boss always has a plan, Yuji,” লুকাস চশমাটা চোখে দিয়ে বলল।
“According to this paper, I am an international legal consultant and… a distant relative, a half-brother by blood from his late father’s European past. The papers are legally verified in the government database. Don’t worry about the language; I have a tool.”

(বসের সবসময় একটা প্ল্যান থাকে, ইউজি। এই কাগজ অনুযায়ী, আমি একজন আন্তর্জাতিক আইনি পরামর্শদাতা এবং…ওনার প্রয়াত বাবার ইউরোপীয় অতীতের এক দূর সম্পর্কের ভাই, রক্তের অর্ধেক ভাই। কাগজগুলো সরকারি ডাটাবেজে আইনিভাবে যাচাই করা। ভাষা নিয়ে চিন্তা করো না; আমার কাছে একটা হাতিয়ার আছে।)

নোবারা আর ইউজি একে অপরের দিকে তাকাল। জেনিন নুরশাদ জেলের ভেতরে বসেও কতটা নিখুঁতভাবে চাল চালছে, তার প্রমাণ এই লাল পাসপোর্ট। সে নিজের বাবাকে নিয়েও এক কাল্পনিক গল্প সাজিয়ে এই ক্লিয়ারেন্স তৈরি করে রেখেছে, যাতে কোন বিপদ হলেই লুকাস সরাসরি জেলের ভেতর ঢুকতে পারে!

“ঠিক আছে,” নোবারা লম্বা নিশ্বাস নিয়ে বলল। “লেটস গো। আমাদের সময় বড্ড কম।”

<><><><><><><><><>

দুপুর আড়াইটা। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার।
বাইরে কড়া পুলিশ পাহারা। নানামি জায়দান নিজের সিভিল পোশাকে, একটা সাধারণ সানগ্লাস পরে ফটকের ঠিক পাশের আরপি গেটের কাছে দাঁড়িয়ে জেলের জেলার এবং ডেপুটি জেলারের সাথে কথা বলছিল। তার সরকারি আইডি কার্ডের দাপট এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ চিঠির কারণে জেল কর্তৃপক্ষ আজ কিছুটা নরম।

একটি কালো রঙের গাড়ি এসে ফটকের সামনে থামল। গাড়ি থেকে প্রথমে নামল ইউজি, তারপর অত্যন্ত সাবধানে নোবারাকে নামিয়ে আনল। নোবারার শাড়ির আঁচলটা বাতাসে উড়ছিল, তার ফ্যাকাশে মুখ আর ক্লান্ত হাঁটার ভঙ্গি দেখে ফটকে ডিউটিরত পুলিশ কনস্টেবলরাও এক মায়াবী দৃষ্টিতে তাকাল। মেয়েটা কত কষ্ট করে এই অবস্থায় ও এখনো চলাফে করছে!

কিন্তু সবার চোখ আটকে গেল যখন গাড়ির পেছনের সিট থেকে নামল এক দীর্ঘদেহী, শ্বেতাঙ্গ বিদেশী লোক। লুকাসের পরনে এখন আর দামী ব্লেজার নেই, সে পরে এসেছে একটা সাধারণ হালকা নীল রঙের শার্ট, যাতে তাকে কোনো কর্পোরেট কর্মকর্তা বা সাধারণ আইনি পরামর্শদাতার মতো দেখায়।

জেলার সাহেব চশমাটা নাকের ওপর সোজা করে নানামির দিকে তাকিয়ে একটু কড়া গলায় বললেন, “মিস্টার জায়দান…আপনি তো বলেছিলেন আসামির স্ত্রী আর ওনার পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট আসবে। এই বিদেশী ভদ্রলোক কে? ওনার তো কনডেমড সেলে ঢোকার পারমিশন জেনারেল অর্ডারে নাই।”

নানামি কিছু বলার আগেই লুকাস ধীর পায়ে এগিয়ে এল। তার মুখমণ্ডল এখন সম্পূর্ণ গম্ভীর, কিন্তু চোখের কোণায় এক অদ্ভুত, নাটকীয় বিষাদের ছায়া। সে জেলার সাহেবের একদম সামনে এসে দাঁড়াল।

ইউজি আর নোবারা পেছনের দিকে দাঁড়িয়ে লুকাসের পরবর্তী মুভমেন্ট দেখার জন্য অপেক্ষা করছিল। তারা ভাবছিল লুকাস হয়তো তার ধারালো ইংরেজিতে আইনি হুমকি দেবে। কিন্তু লুকাস যা করল, তা দেখার জন্য এই পৃথিবীর কেউ প্রস্তুত ছিল না।

লুকাস নিজের ডান হাতটা বুকের বাঁ পাশে রাখল। তারপর তার শতভাগ ফ্রেঞ্চ ও ব্রিটিশ চোয়ালটা নাড়িয়ে, অত্যন্ত অদ্ভুত, আধো-ভাঙা, কর্কশ এবং বিকৃত উচ্চারণে বাংলা বলতে শুরু করল। ঠিক যেভাবে আজ থেকে দুশো বছর আগে ব্রিটিশ সাহেবরা এ দেশের সাধারণ মানুষের সাথে ভাঙা বাংলায় কথা বলতো,
“ওহ্… ওতিথি জেইলার সাহেফ! আপনি আমাকে চিনিতে পারিতেছেন না? আমি… আমি জেনিন নুরশাদ এর ভাই হোই। ওর্ধেক রোকত… মাই ব্রাদার!”

লুকাসের মুখ থেকে এমন আধ ভাঙ্গা বাংলা বের হওয়া মাত্রই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ইউজি নিজের মুখটা এক ঝটকায় অন্য দিকে ফিরিয়ে নিল। ইউজির ফেসটা রাগে নয়, বরং এক অবিশ্বাস্য হাসির চোটে লাল হয়ে উঠল। গত পাঁচ বছরে সুদূর ইউরোপের আন্ডারওয়ার্ল্ডে যে লোকটার এক ইশারায় মানুষের বুক কাঁপত, সেই লুকাস আজ জেলের গেটে দাঁড়িয়ে ব্রিটিশ সাহেবদের মতো করে আধো-ভাঙা বাংলায় জেনিনের ভাই সাজার নাটক করছে! ইউজি নিজের ঠোঁট দুটো কামড়ে ধরে হাসি আটকানোর এক আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল। তার মনে হলো, জেনিন নুরশাদ এই লোকটাকে দিয়ে শুধু কাজই করায় না, মাঝে মাঝে চরম বিনোদনের ব্যবস্থাও করে।

জেলার সাহেব সম্পূর্ণ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন। তিনি লুকাসের লাল পাসপোর্ট আর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ক্লিয়ারেন্স লেটারটা হাতে নিয়ে ওল্টাতে ওল্টাতে বললেন,
“ভাই? জেনিন নুরশাদের ভাই মানে? ওনার তো কোনো ভাই নাই জানা মতে।”

লুকাস নিজের চোখ দুটোকে আরও একটু ছোট করে, মুখের চামড়া কুঁচকে আবার সেই অদ্ভুত সাহেবদের মতো বাংলায় বলল,
“আরেহ্ সাহেফ! আমার ফাদার… মানে ওনার ফাদার, অনেক বছর আগে প্যারিস গিয়াছিলেন। ওখানকার এক ফ্রেঞ্চ লেডি… মাই মাদার! সো, জেনিন আমার নিজের ব্রাদার হোই। ওনার এই ফাঁসির খবর শুনিয়া আমার হার্ট… বড্ড বেশি ব্রোকেন হইয়া গিয়াছে! আমি ওনার লাস্ট টাইম একটু আইনি হেলপ করিতে চাই। প্লিজ সাহেফ, ডু নট স্টপ এ ব্রাদার!”

নোবারা নিজের শাড়ির আঁচলটা মুখের ওপর চেপে ধরল। একদিকে জেনিনের ফাঁসির রায়ের গভীর বেদনা, আর অন্যদিকে লুকাসের এই অবিশ্বাস্য অ্যাক্টিং, দুটোর মাঝখানে পড়ে নোবারার চোখের কোণ দিয়ে জল বেরিয়ে এল। জেলার সাহেব ভাবলেন নোবারা হয়তো স্বামীর শোকে কাঁদছে, কিন্তু আসলে নোবারা লুকাসের এই আজব বাংলা শুনে নিজের ভেতরের হাসিটা কোনোমতে চেপে রাখার যুদ্ধ করছিল।

নানামি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য দ্রুত এগিয়ে এলো। সে জেলার সাহেবের কাঁধে হাত রেখে গম্ভীর গলায় বলল,
“জেলার সাহেব, পেপারসগুলো কিন্তু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সরাসরি ভেরিফাইড। আসামির ব্যক্তিগত জীবনের অনেক গোপন অধ্যায় থাকে যা ফাইলে আসে না। যেহেতু ফরেন মিনিস্ট্রির একটা প্রেসার আছে, আর উনি একজন ইন্টারন্যাশনাল লইয়ারও বটে, তাই ওনাকে ঢুকতে দেওয়াটাই আমাদের জন্য সেফ হবে। বেশি ঝামেলা করলে মিডিয়া আবার অন্য গন্ধ খুঁজবে।”

জেলার সাহেব আর কথা বাড়ালেন না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিল আর লুকাসের এই অদ্ভুত ভাই হওয়ার আর্তি দেখে তিনি নিজের পকেট থেকে ওয়াকিটকিটা বের করলেন।

“কন্ট্রোল রুম, ৩ নম্বর গেট খোলো। কনডেমড সেলের আসামি জেনিন নুরশাদের সাক্ষাতপ্রার্থীদের ভেতরে আসার অনুমতি দেওয়া হলো। বডি সার্চ করে ভেতরে নাও।”

<><><><><><><><><>

কারাগারের ভেতরের দীর্ঘ, অন্ধকার ও স্যাঁতসেঁতে করিডোর। বাইরের দুপুরের তীব্র রোদ এই পাথুরে দেয়ালগুলোর ভেতরে এসে এক মরা, ধূসর আলোয় পরিণত হয়েছে। করিডোরের দুই পাশে লোহার বড় বড় খাঁচাসদৃশ সেল, যেখান থেকে সাধারণ কয়েদিদের শুকনো, ফ্যাকাশে মুখগুলো গ্রিলের ফাঁক দিয়ে উঁকি মারছিল। চারদিকের বাতাসে এক নোনা ধরা ইট, ফিনাইল আর কয়েদিদের ঘামের এক ভ্যাপসা কটু গন্ধ।

নোবারা ধীর পায়ে হেঁটে আসছিল। তার প্রতিটা পদক্ষেপের সাথে সাথে তার বুকের ভেতরের ধকধকানি শব্দটা বাড়ছিল। লুকাস আর ইউজি তার ঠিক পেছনে আসছিল। লুকাস জেলের ভেতরের এই নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা দেয়ালগুলো নিজের চোখ দিয়ে নিখুঁতভাবে মেপে নিচ্ছিল।

করিডোরের প্রতিটা মোড়ে কতজন সশস্ত্র সেন্ট্রি দাঁড়িয়ে আছে, সিসিটিভি ক্যামেরাগুলোর ব্লাইন্ড স্পট কোনগুলো, সবকিছু তার প্রখর মাফিয়া মস্তিষ্ক এক পলকেই ডিকোড করে নিচ্ছিল।

তারা যখন কনডেমড সেলের বিশেষ সংরক্ষিত জোনে এসে পৌঁছাল, তখন চারদিকের স্তব্ধতা আরও গাঢ় হয়ে গেল। এখানকার দেয়ালগুলো অন্য সেলের চেয়েও বেশি পুরু।

প্রধান কারারক্ষী লোহার ভারী ও মরচে ধরা শিকের বড় তালাটা এক বিকট কর্কশ শব্দে খুলে দিল।

“পাঁচ মিনিট সময় পাবেন,” রক্ষী কড়া গলায় বলে এক পাশে সরে দাঁড়াল।

নোবারা দরজার চৌকাঠ পেরিয়ে ভেতরে পা রাখল। সেলে মেঝের এক কোণে, জীর্ণ খাটিয়াটার ওপর শান্ত হয়ে বসে ছিল জেনিন নুরশাদ। তার পরনের গাঢ় ধূসর রঙের পাঞ্জাবিটা এখন মেঝের ধুলোয় কিছুটা মলিন। জেনিনের দুই হাতে ডাণ্ডাবেড়ি পরানো। লোহার শিকলগুলো মেঝের সাথে ঘষা লেগে এক তীক্ষ্ণ, ধাতব শব্দ তুলল যখন সে ধীরগতিতে নিজের মাথাটা তুলল। জেনিনের কুচকুচে কালো চোখের তীক্ষ্ণ মণি দুটো যখন দরজার দিকে তাকাল, তখন সেখানে কোনো কয়েদির ভয় ছিল না, ছিল এক অপরাজেয় রাজার রাজকীয় অভ্যর্থনা।

সে নোবারাকে দেখল, তারপর তার চোখ গেল নোবারার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা ইউজি এবং… লুকাসের ওপর।

লুকাসকে এই ঢাকার সেন্ট্রাল জেলের অন্ধকার কালকুঠুরির সামনে দেখামাত্রই জেনিনের চোখ দুটো এক মুহূর্তের জন্য প্রসারিত হলো। তার ঠোঁটের কোণে এক ম্লান, পরম তৃপ্তির ও অহংকারের চেনা হাসি ফুটে উঠল। সে বুঝতে পারল, তার ছায়ারাজ্যের বিশ্বস্ত গোলামেরা তার একটি ইশারায় সুদূর ইউরোপের সীমান্ত পেরিয়ে আজ খোদ এই মৃত্যুর খাঁচার ভেতরে এসে হাজির হয়েছে।

জেনিন ডাণ্ডাবেড়ির ঝনঝনানি শব্দ তুলে খাটিয়া থেকে নামল। লোহার শিকলগুলো মেঝের ওপর টেনে সে নোবারার একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। মাঝখানে কেবল কয়েকটা মোটা কালো লোহার শিকল।

লোহার গ্রিলের ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা লুকাসকে দেখে জেনিন নূরশাদের কুচকুচে কালো চোখের মণি দুটো এক মুহূর্তের জন্য প্রসারিত হয়েই আবার শান্ত হয়ে গেল। জেনিনের ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠা সেই চেনা, ম্লান এবং চরম অহংকারী হাসিটা যেন কনডেমড সেলের নোনা ধরা দেয়ালের সমস্ত অন্ধকারকে এক নিমেষে ফিকে করে দিল। সে ধীর পায়ে মেঝের ওপর লোহার ডাণ্ডাবেড়ি টেনে এগিয়ে এল। শিকলগুলোর কর্কশ ধাতব ঘর্ষণ শব্দ এই নিস্তব্ধ প্রকোষ্ঠে এক অদ্ভুত ছন্দের সৃষ্টি করল। জেনিন বুঝতে পারল, খাঁচায় বন্দি সিংহের একটা চিলতে ইশারাও কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে, যার টানে সুদূর ইউরোপের আন্ডারওয়ার্ল্ডের কুখ্যাত লড়াকু খোদ ঢাকার সেন্ট্রাল জেলের কালকুঠুরিতে এসে হাজির হয়েছে।

নোবারা লোহার গ্রিলের একদম কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তার চোখ দুটোতে তখন জেনিনের নির্দেশ মতো কান্নার ফোলা ভাব এবং এক নিঃস্ব নারীর অবয়ব লেপ্টে আছে। কিন্তু তার ভেতরের সিআইডি অফিসারের তীক্ষ্ণ সত্তাটা আজ অত্যন্ত সতর্ক। সে জানে, এই পাঁচ মিনিট কেবল আবেগ প্রকাশের জন্য নয়, এই পাঁচ মিনিট হলো এক অদৃশ্য যুদ্ধক্ষেত্রের ব্লু-প্রিন্ট সাজানোর চূড়ান্ত সময়।

জেনিন গ্রিলের ওপাশ থেকে নোবারার ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকাল। তার হাতকড়া পরা হাত দুটো সামান্য ওপরে উঠতেই লোহার চেইনটা টুং করে শব্দ করল। সে নোবারার চোখের ভাষা পড়ল, তারপর তার দৃষ্টি চলে গেল সরাসরি লুকাসের ওপর। লুকাস এতক্ষণ জেলের করিডোরে যে ভাঁড়ামির অভিনয়টা করছিল, জেনিনের মুখোমুখি দাঁড়ানো মাত্রই তার সেই ফ্রেঞ্চ মাফিয়ার খু’নে গাম্ভীর্যটা আবার ফিরে এল। সে জেনিনের সামনে এসে এক পরম বাধ্য দাসের মতো মাথা নিচু করে দাঁড়াল।

সময় মাত্র পাঁচ মিনিট, আর এই পাঁচ মিনিটের প্রতিটা সেকেন্ড একেকটি শতাব্দীর সমান মূল্যবান। জেনিন লুকাসের চোখের দিকে চিল পাখির মতো চাউনি নিক্ষেপ করল। কোনো ভূমিকা ছাড়াই, অত্যন্ত নিচু, গম্ভীর এবং বুক কাঁপানো ফ্রেঞ্চ-ব্রিটিশ মিশ্রিত অ্যাক্সেন্টে জেনিন সরাসরি ইংরেজিতে কথা বলতে শুরু করল। তার গলার স্বর এতটাই মৃদু ছিল যে সেলের ঠিক বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা কারারক্ষীর কান পর্যন্ত সেই তরঙ্গের একটা কণিকাই শুধু পৌঁছাতে পারত, কোনো অর্থ নয়।

“I didn’t expect you in Dhaka, Lucas,” জেনিন চোখ দুটো সামান্য সরু করে বলল।

লুকাস গ্রিলের একদম কাছে নিজের মুখটা নিয়ে এসে অত্যন্ত নিচু স্বরে জবাব দিল,
“Samad’s alert was critical, Boss. The European syndicate is shifting. Bernard’s old allies are trying to trace the London shipments. I had to secure the database before coming.”

(সামাদের সতর্কতা অত্যন্ত জরুরি ছিল, বস। ইউরোপীয় সিন্ডিকেট স্থানান্তরিত হচ্ছে। বার্নার্ডের পুরানো মিত্ররা লন্ডনের চালানগুলো ট্র্যাক করার চেষ্টা করছে। আসার আগে আমাকে ডাটাবেস সুরক্ষিত করতে হয়েছিল।)

জেনিন তার হাতকড়া পরা আঙুল দিয়ে গ্রিলের একটা শিকল আলতো করে ধরল। তার প্রখর ১৪৮ আইকিউ সম্পন্ন মস্তিষ্ক এক সেকেন্ডের মধ্যে পুরো হিসাবটা কষে নিল। সে খুব নিচু স্বরে, ঠোঁট দুটো প্রায় না নাড়িয়ে বলল,
“Listen to me closely. The London route is a distraction. Let them trace it. I want you to activate the Gideon Protocol tonight.”

(আমার কথা খুব মনোযোগ দিয়ে শোনো। লন্ডনের রুটটা একটা বিভ্রান্তি মাত্র। ওদের ওটা ট্র্যাক করতে দাও। আমি চাই তুমি আজ রাতেই গিডিওন প্রোটোকল চালু করো।)

লুকাসের চোখের মণি জেনিনের মুখে গিডিওন প্রোটোকল শব্দটা শোনামাত্রই এক মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠল। সে ভালো করেই জানে, এই প্রোটোকলের অর্থ হলো জেনিন নুরশাদের ছায়ারাজ্যের চূড়ান্ত এবং সবচাইতে ধ্বংসাত্মক চাল, যা কেবল তখনই ব্যবহৃত হয় যখন রাজাকে জীবন্ত কবর দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। লুকাস অবাধ্য নিশ্বাস চেপে মাথা নাড়ল।

“Understood, Boss. What about the split files?”

(বুঝতে পেরেছি, বস। স্প্লিট ফাইলগুলোর কী হবে?)

“They are embedded in the Zurich mainframe! Extract the third encrypted key. Yuji has the physical ledger. Combine them, and clear the tracks from Marseille to Lisbon. Once it’s done, disappear from the radar.”

(সেগুলো জুরিখের মেইনফ্রেমে গেঁথে দেওয়া আছে। তৃতীয় এনক্রিপ্টেড কি-টা বের করো। ইউজির কাছে ফিজিক্যাল লেজারটা আছে। ওগুলো একত্রিত করো, এবং মার্সেই থেকে লিসবন পর্যন্ত সব ট্র্যাক মুছে দাও। ওটা হয়ে গেলেই রাডার থেকে গায়েব হয়ে যাও।)

লুকাস জেনিনের এই নিখুঁত গাণিতিক ক্যালকুলেশন শুনে ভেতরে ভেতরে শিউরে উঠল। জেনিন নিজের ফাঁসির রায় মাথায় নিয়ে, এই স্যাঁতসেঁতে অন্ধকুঠুরিতে ভারী ডাণ্ডাবেড়ি পরে বসেও বাইরের পুরো পৃথিবীর মাফিয়া সিন্ডিকেটকে নিজের হাতের পুতুল বানিয়ে নাচিয়ে চলেছে।

নোবারা এক পাশে দাঁড়িয়ে জেনিন আর লুকাসের এই অতি গোপনীয় কথোপকথন দেখছিল। তাদের কথার প্রতিটি শব্দ ইংরেজিতে হলেও তার ভেতরের অর্থ নোবারার সম্পূর্ণ অজানা রয়ে গেল। সে শুধু বুঝতে পারছিল, জেনিন এমন এক প্রলয়ের জাল বুনছে যার শেষটা অত্যন্ত ভয়ঙ্কর হতে চলেছে!

জেনিন নোবারার দিকে একবার তাকাল, কিন্তু তার চোখের গভীর চাউনি নোবারাকে নিভৃতে সতর্ক করে দিল, এই প্ল্যান নোবারার না জানাই ভালো। কারণ নোবারা যদি জেনিনের এই আসল-নকল মৃত্যুর চূড়ান্ত সত্যটা জেনে ফেলে, তবে বাইরে গিয়ে সে আর কান্নায় ভেঙে পড়া নিঃস্ব স্ত্রীর নিখুঁত অভিনয়টা করতে পারবে না। মানুষের চোখের আসল আতঙ্ক আর অভিনয়ের মাঝে যে সুক্ষ্ম তফাত থাকে, তা জেনিনের শত্রুরা ধরে ফেলতে পারে। তাই নোবারাকে এই অন্ধকার চাল থেকে সম্পূর্ণ দূরে রাখা হচ্ছে কেবল তাকে সুরক্ষিত রাখার জন্য।

জেনিন লুকাসের দিকে তাকিয়ে তার শেষ নির্দেশটা বাতাসে ছুড়ে দিল,
“Tonight, Lucas. You leave Dhaka at midnight. No traces left behind.”

(আজ রাতেই, লুকাস। তুমি মাঝরাতে ঢাকা ছাড়বে। পেছনে কোনো চিহ্ন যেন না থাকে।)

“Consider it done, Boss,” লুকাস মাথা নিচু করে সায় দিল।

পাঁচ মিনিট এর মধ্যে অলরেডি তিন মিনিট পার হয়ে গেছে। ওদের কথোপকথন শেষ হওয়ামাত্রই হুট করে সেলের ভেতরের গম্ভীর পরিবেশটা এক অদ্ভুত দিকে মোড় নিল।

ইউজি এতক্ষণ দরজার পাশে এক পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে জেনিন আর লুকাসের এই মাফিয়া ডিল দেখছিল। কিন্তু জেনিন যখনই লুকাসের দিকে তাকিয়ে পরম তৃপ্তির ও বিশ্বাসের হাসিটা হাসল, তখন ইউজির ভেতরের পুরোনো, বিশ্বস্ত অনুগত সত্তাটার মাঝে এক চিলতে ঈর্ষার আগুন দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। ইউজি মনে মনে জানত, পুরো আন্ডারওয়ার্ল্ডে জেনিন নুরশাদ যদি কাউকে নিজের ছায়া হিসেবে বিশ্বাস করে, তবে সেটা সে নিজে, উদয় গালিব উরফে ইউজি। কিন্তু আজ এই ফ্রেঞ্চ শুটার লুকাস সুদূর প্যারিস থেকে এসে বসের এত কাছাকাছি দাঁড়িয়ে ডিল করছে, আর বসও তাকে দেখে এতটা খুশি!

ইউজি আর নিজের ভেতরের ঈর্ষা চেপে রাখতে পারল না। সে ধীর পায়ে এগিয়ে এসে লুকাস আর জেনিনের মাঝখানে নিজের চওড়া শরীরটা গলিয়ে দিল। তার কপালে জমে থাকা ঘামটা মুছে সে নিজের সানগ্লাসটা কোটের পকেটে গুঁজে দিয়ে লুকাসের দিকে এক তীব্র, জ্বলন্ত চাউনি নিক্ষেপ করল।

“বস,” ইউজি তার গলার স্বর যতটা সম্ভব কড়া করে জেনিনকে বলল। “এই ঝামেলার ভেতর লুকাসকে ঢাকা ডেকে আনাটা কি খুব দরকার ছিল? এই যে গিডিওন প্রোটোকলের কথা বললেন, ওটার জন্য ফিজিক্যাল লেজার তো আমার কাছেই আছে। আমি একাই পুরো জুরিখ মেইনফ্রেম ওড়াতে পারতাম।”

লুকাস ইউজির আকস্মিক আক্রমণ দেখে নিজের ফ্রেঞ্চ আভিজাত্য ভুলে একটু বাঁকা হাসল। সে ইউজির দিকে ফিরে নিজের চওড়া কাঁধটা নাচিয়ে ইংরেজিতে বলল,
“Oh, shut up, Yuji! You are just jealous because boss trusts my calculations more than your raw muscles. Hacking a Zurich mainframe is not your London street hacking. One mistake there would have blocked the boss’s entire account.”

(আরে, চুপ কর, ইউজি! তুমি শুধু হিংসা করছ কারণ বস তোমার কায়িক শক্তির চেয়ে আমার হিসাব-নিকাশের ওপর বেশি ভরসা করেন। জুরিখের মেইনফ্রেম হ্যাক করা আর লন্ডনের রাস্তায় হ্যাকিং করা এক জিনিস না। সেখানে একটি ভুলের কারণেই বসের পুরো অ্যাকাউন্টটি ব্লক হয়ে যেত।)

“কাকে হ্যাকিং শেখাচ্ছো তুমি?” ইউজি এবার রাগে এক পা এগিয়ে এল লুকাসের দিকে। জেলের এই কনডেমড সেলের ভেতর, ফাঁসির আসামির সামনে দাঁড়িয়ে দুই ইন্টারন্যাশনাল লড়াকু যোদ্ধা রীতিমতো ঝগড়ায় মেতে উঠল। ইউজি আঙুল উঁচিয়ে বলল, “যখন তুমি প্যারিসের ক্যাসেলে বসে লুক বার্নার্ডের পা চাটতে, তখন আমি লন্ডনের আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যাংকিং সিস্টেম এক ল্যাপটপে ক্র্যাশ করেছি। বস, আপনি একে বেশি লাই দিচ্ছন। ও আজ মাঝরাতে প্যারিস চলে যাবে ভালো কথা, কিন্তু যাওয়ার আগে আমার হাতের এই এম-সিক্সটিনের একটা পাঞ্চ ও খেয়ে যেতে পারে।”

“Try me, Yuji!” লুকাসও নিজের ব্লেজারের হাতাটা সামান্য টেনে কুঁচকে তাকাল।

“Don’t think I’m dressing up as the boss’s brother. I forgot that route to Marseille.”

(আমি বসের ভাই সেজেছি বলে ভেবো না আমি মার্সেইর সেই রুট ভুলে গেছি।)

জেনিন নুরশাদ খাটিয়ার ওপর নিজের লোহার শিকলগুলো টেনে আবার বসল। তার দুই হাতে থাকা হাতকড়াটা মেঝের সাথে ঘষা লেগে ঝনঝন করে উঠল। সে এই দুই বিশ্বস্ত গোলামের বাচ্চাদের মতো ঝগড়া দেখে নিজের কপালের চুলগুলো এক হাত দিয়ে পেছনে ঠেলল। তার ঠোঁটের কোণে এবার এক চরম বিনোদনের হাসি ফুটে উঠল। জেনিন খুব ভালো করেই জানে, ইউজি তার প্রতি কতটা অন্ধ ভক্ত এবং অনুগত। ইউজির এই ঈর্ষা আসলে কোনো শত্রুতা নয়, এটা হলো বসের ভালোবাসার ওপর নিজের একচ্ছত্র অধিকার দাবি করার এক ছেলেমানুষি জেদ। এই ইউজি বেজির তো বস এর বউয়ের সাথেও ঝগড়া করার রেকর্ড আছে!

নোবারা এতক্ষণ জেনিনের বিরহে এবং লুকাসের ডিকোড না হওয়া কথায় চিন্তিত ছিল, কিন্তু ইউজি আর লুকাসের এই আকস্মিক এবং আজব ঝগড়া দেখে সে নিজের শাড়ির আঁচলটা মুখে চেপে ধরতে বাধ্য হলো। নোবারা জেনিনের দিকে তাকিয়ে আলতো করে মাথা নাড়ল। তার ফোলা চোখ দুটোর আড়ালে এক টুকরো চেনা অভিমান জেগে উঠল।

নোবারা জেনিনের দিকে তাকিয়ে বড্ড মিষ্টি কিন্তু তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,
“আপনার এই বেজি ছেলেটা এত্তো বড্ড জেলাস, জেনিন। সিআইডি অফিসার থাকাকালীন আমি যখন প্রথমবার নুরশাদ ইন্ডাস্ট্রিতে আপনার কেবিনে এসেছিলাম, তখন ও আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে ছিল যেন আমি ওর বসের সম্পত্তি চুরি করতে এসেছি। তখন আমার সাথে হিংসা করতো, আর আজ এই বেচারা বিদেশী লুকাস প্যারিস থেকে কষ্ট করে আপনার জন্য ছুটে এসেছে, এখন ওর সাথেও ঝগড়া লাগাচ্ছে! বেজির জেলাসি কোনোদিন যাবে না।”

জেনিন নোবারার চেনা অভিমানী কণ্ঠস্বর শুনে চোখ দুটো নোবারার চোখের ওপর স্থির করল। সেলের ভেতরের টিমটিমে হলুদ আলোয় জেনিনের চওড়া, পুরুষালি অবয়বটা এক পরম মায়াবী রূপ নিল। সে ডাণ্ডাবেড়ির শিকলটা আলতো করে টেনে নোবারার খুব কাছাকাছি এসে গ্রিলের ফাঁক দিয়ে নিচু স্বরে বলল,
“ইউজির জেলাসি তো তাও বোঝা যায় নূরা… কিন্তু আপনি নিজের জেলাসির কারণে মায়ার সামনে আমার যে মানহানি করেছিলেন, তা ভুলে যাচ্ছেন!”

জেনিনের আকস্মিক এবং পুরোনো রেফারেন্সের পাল্টা আক্রমণে নোবারার ফ্যাকাশে গাল দুটো এক সেকেন্ডের জন্য লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠল। সে নিজের মুখটা অন্য দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“ওটা…ওটা মোটেও আমার কোনো জেলাসি ছিল না।”

“স্টুপিড! মিথ্যে বলাটা এখনো শিখতে পারলেন না” জেনিন খুব মৃদু স্বরে হাসল।

ঠিক এই মুহূর্তেই লুকাস করিমুদ্দীনের মতো আবার সেই ব্রিটিশ সাহেবদের আধো-ভাঙা, বিকৃত বাংলা ভাষায় মাঝখান থেকে কথা বলে উঠল, কারণ জেলার সাহেব এর আগমন ঘটেছে যে। সে ইউজির দিকে তাকিয়ে নিজের হাত দুটো বাতাসে নাচিয়ে বলল,
“আরেহ্ ইউজি! তুমি বড্ড বেশি জিলাপি… আই মিন, জেলাস হোই! তুমি জেনিন ভাইয়ের সব প্রীতি…মানে ভালোবাসা একা খাইতে চাও? আমি তো ওনার রোকতের ভাই হোই! ওর্ধেক ফ্রেঞ্চ, ওর্ধেক বাঙালি! আমার মাদার জেনিন ভাইয়ের ফাদারকে প্যারিসের বুকে বড্ড বেশি লাভ করিয়াছিলেন। সো, তুমি আমার সাথে ফাইট করিও না, মাই ব্রাদার! আমার হার্ট বড্ড নরম।”

লুকাসের মুখ থেকে এমন গম্ভীর মুহূর্তে এমন আজব, ভাঙা এবং সাহেবদের মতো বিকৃত বাংলা উচ্চারণ বের হওয়ামাত্রই ইউজি আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না। সে নিজের মুখটা দুই হাত দিয়ে চেপে ধরে দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে হাসতে হাসতে প্রায় মেঝেতে বসে পড়ার উপক্রম হলো। জেনিন নুরশাদ নিজের কপালে হাত দিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল, যেন সে নিজের এই আন্তর্জাতিক কিলারদের এমন আজব রূপ দেখে চরম বিনোদিত অথচ বিরক্ত। নোবারাও নিজের শাড়ির আঁচলটা কামড়ে ধরে হাসি আটকানোর যুদ্ধ করছিল।

করিডোরের ওপাশ এ লুকিয়ে থাকা জেলার সাহেবের ভারী বুটের খটখট শব্দ এবং ওয়াকিটকির কর্কশ আওয়াজ পাওয়া গেল—”টাইম আপ! পাঁচ মিনিট শেষ! ভিজিটরদের বাইরে নিয়ে আসুন!”

কারারক্ষী লোহার দরজায় নিজের লাঠি দিয়ে কড়া নেড়ে উঠল। মুহূর্তের মধ্যে জেনিন নুরশাদের বিনোদিত অবয়বটা আবার এক অপরাজেয়, কঠোর মাফিয়া বসের রূপে বদলে গেল। সে সোজা হয়ে দাঁড়াল।

জেনিন লুকাসের চোখের দিকে তাকাল। তার কণ্ঠে এখন আর কোনো কৌতুক নেই, আছে কেবল এক চূড়ান্ত সেনাপতির আদেশ। সে বলল,
“Go, Lucas. Complete the grid. See you on the other side.”

(যাও, লুকাস। গ্রিডটা সম্পূর্ণ করো। ওপারে দেখা হবে।)

লুকাস জেনিনকে এক শেষ গভীর কুর্নিশ জানিয়ে বলল, “Goodbye, Boss. The Panthera Leo will never be caged.”

(বিদায়, বস। প্যান্থেরা লিও কোনোদিন খাঁচাবদ্ধ থাকবে না।)

লুকাস নোবারার দিকে ফিরল। সে নোবারার ফ্যাকাশে অথচ দৃঢ় চেহারার দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত বিনীতভাবে নিজের মাথাটা নোয়াল এবং অতঃপর এক গভীর মায়ায় ও শ্রদ্ধায় বলল,
“Take care of yourself, Madame. And take care of the royal blood inside you. This child will inherit a kingdom that the world has never seen before. My prayers are always with you.”

(নিজের যত্ন নেবেন, ম্যাম। এবং আপনার ভেতরের রাজকীয় রক্তের যত্ন নেবেন। এই সন্তান এমন এক সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী হবে যা পৃথিবী আগে কখনো দেখেনি। আমার প্রার্থনা সবসময় আপনার সাথে আছে।)

নোবারা ধীরগতিতে হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। তার চোখের কোণে আবার কান্নার জলীয় কণাগুলো জমা হতে শুরু করেছে, কারণ জেলের গেট দিয়ে বের হওয়ামাত্রই তাকে আবার সেই নিঃস্ব স্ত্রীর অভিনয়টা শুরু করতে হবে।

ইউজি জেনিনের দিকে শেষবারের মতো তাকাল। জেনিন ইউজির দিকে তাকিয়ে খুব মৃদু করে চোখটা বন্ধ করে ইশারা করল, যার অর্থ, ‘নূরাকে আগলে রেখো, ইউজি।’ ইউজি নিজের বুক টান করে জেনিনকে স্যালুট দেওয়ার ভঙ্গিতে মাথা নোয়াল।

লুকাস করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় আবার জেলার সাহেবকে দেখামাত্রই নিজের মুখটা কুঁচকে, সাহেবদের মতো কাঁদোকাঁদো গলায় আধো-ভাঙা বাংলায় চেঁচিয়ে উঠল,
“ওহ্ জেইলার সাহেফ! আমার ব্রাদার বড্ড বেশি কষ্টের মাঝে রহিয়াছে! ওনার এই হাতকোড়া আমার বুকটা চিল-মিকির…আই মিন, চূর্ণবিচূর্ণ করিয়া দিতেছে! আমি চলিয়া যাইতেছি সাহেফ, কিন্তু আমার সোল… মানে আত্মা এই ঢাকার জেলেই পড়িয়া রহিল হোই! গুডবাই সাহেফ! ওনেক ওনেক থ্যাঙ্ক ইউ!”

লুকাসের এই বিদায়বেলার আজব বাংলা শুনে জেলার সাহেব নিজের চশমাটা নাক থেকে খুলে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলেন। ওদিকে ইউজি আর নোবারা দ্রুত পায়ে করিডোর পার হয়ে বাইরের মেইন ফটকের দিকে এগিয়ে গেল, যাতে জেলার সাহেবের সামনে তাদের ভেতরের হাসিটা কোনোমতে প্রকাশ না পেয়ে যায়।

চলবে ইংশাআল্লাহ…

(খোদাআআআআআ,,,এই লুকাস কে লিখতে আমার পুরো দিন কেটে গেছে। বাই দ্য ওয়ে, কেমন লাগলো, জানাবেন প্লিজ। অনেক বড় পর্ব দেওয়ার জন্য সরিইইই। টা টা বিচ্ছুরা।😭 🫶🏻)

(আর হ্যাঁ, আগামী পর্ব পড়ার জন্য মানসিক ভাবে প্রস্তুত হয়ে যান। আগামী পর্বেই ফাঁসির ডেট। বাকিটা ফাঁশ করবো না, জেনিনের মতোই রহস্যময় থাকুক)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here