#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_৭৮ (আত্মহ’ত্যা নাকি রহস্য?)
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার। ত্রিশ দিন আগে যে মানুষটির গলায় মৃত্যুদণ্ডের পরোয়ানা ঝোলানো হয়েছিল, আজ সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। জেনিন নুরশাদ, নামটি এখন আর কেবল একটি অপরাধী ফাইলের অংশ নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের এক গভীরতম মাথাব্যথার নাম। গত ত্রিশ দিনে জেনিন জেলের ভেতরে এক অলৌকিক শান্ত ভাব বজায় রেখেছে। কোনো আপিল নয়, কোনো প্রাণভিক্ষার আবেদন নয়, জেনিন যেন এক অদ্ভুত তৃপ্তিতে তার শেষ মুহূর্তগুলোর জন্য অপেক্ষা করছে।
সেলে বসে জেনিন যখন তার ডাণ্ডাবেড়ির দিকে তাকিয়ে থাকে, তখন তাকে কোনো অসহায় কয়েদি মনে হয় না। জেল কর্তৃপক্ষ আজ সকাল থেকেই তটস্থ। জেনিন নুরশাদের মতো একজন হাই-প্রোফাইল আসামির ফাঁসি কার্যকর করা মানে প্রশাসনের জন্য এক বিশাল অগ্নিপরীক্ষা। জেলের ভেতরে ও বাইরে নিরাপত্তা বেষ্টনী এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যে একটি পিঁপড়াও গলে যাওয়ার উপায় নেই।
সকাল পৌনে আটটা। জেলের লৌহকপাটের ওপাশে ভারী বুটের আওয়াজ পাওয়া গেল। জেলার সাহেব এবং আইজি প্রিজন স্বয়ং জেনিনের সেলের সামনে এসে দাঁড়ালেন। নিয়মানুযায়ী, দণ্ড কার্যকর করার আগে আসামির শেষ ইচ্ছা জানতে চাওয়া হয়। জেনিন মাথা তুলে তাকাল। তার মুখভর্তি খোঁচা খোঁচা দাড়ি, চোখের মণি দুটো আজও আগের মতোই ধকধক করছে।
“জেনিন নুরশাদ…” আইজি প্রিজন গম্ভীর গলায় বললেন। “আজ সূর্য ডোবার পর আপনার সাজা কার্যকর করা হবে। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আপনার শেষ ইচ্ছা জানতে চাওয়া হচ্ছে।”
জেনিন খাটিয়া ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। শিকলের ঝনঝনানি শব্দটা আজ যেন একটু বেশিই করুণ শোনাল। আইজি প্রিজনের এই শেষ ইচ্ছা শব্দটা জেনিনের মস্তিষ্কের কোনো এক অন্ধকার কোণায় ১৫ বছর আগের এক প্রগাঢ় স্মৃতির ধুলো উড়িয়ে দিল।
সেদিনও বৃষ্টি ছিল। সেন্ট জুড হাই স্কুলের লাইব্রেরিতে নোবারা তার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে হুট করে চোখ দুটো বন্ধ করে দুই হাত জোড় করেছিল , মুনাজাতে র মতো। জেনিন তখন বইয়ের পাতা উল্টাতে উল্টাতে চশমার আড়াল থেকে নোবারার নিষ্পাপ মুখটা দেখে জিজ্ঞেস করেছিল,
“কী হচ্ছে এসব, নোবারা?”
নোবারা চোখ খুলে এক গাল হেসে বলেছিল,
“আরে জেনিন ভাইয়া, আপনি বুঝবেন না! দেখুন ঘড়িতে ঠিক ১১:১১ বাজে। এটা হলো অ্যাঞ্জেল নাম্বার। এই ১১:১১ তে মন থেকে কোনো উইশ বা শেষ ইচ্ছা চাইলে প্রকৃতির কোনো অদৃশ্য শক্তি নাকি সেটাকে সরাসরি কবুল করে নেয়! এটাকে বলে ১১:১১ উইশ!”
জেনিন তখন অবজ্ঞার হাসি হেসে বলেছিল,
“স্টুপিড থিওরি!”
কিন্তু আজ, এই মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জেনিনের মনে হলো, তার জীবনের ঘড়িতেও যেন আজ এক অলৌকিক ১১:১১ বাজতে চলেছে। জীবনের শেষ ইচ্ছা? জেনিন নুরশাদ তো প্রকৃতির নিয়মে চলা কোনো সাধারণ মানুষ নয়, সে নিজের ইচ্ছা নিজেই তৈরি করে। কিন্তু আজ সে প্রকৃতির ১১:১১ উইশ-এর থিওরিটাকেই সত্য প্রমাণ করতে চায় তার নূরার জন্য। তার শেষ ইচ্ছাটা আসলে কোনো ফাঁসি এড়ানোর আর্তি নয়, ওটা হলো মহাবিশ্বের বুকে নোবারার সাথে তার ভালোবাসাকে চিরদিনের মতো গেঁথে দেওয়ার এক গোপন আধ্যাত্মিক প্রবেশদ্বার!
জেনিন জেলের শিকের কাছে এসে দাঁড়াল। তার ঠোঁটে এক ম্লান কিন্তু রহস্যময় হাসি।
“আমার শেষ ইচ্ছা খুব সাধারণ, আবার হয়তো আপনাদের জন্য কিছুটা অস্বাভাবিক!” জেনিন খুব শান্ত স্বরে বলতে শুরু করল। “আমি জেলখানার এই চার দেয়ালের ভেতরে কোনো খাবার খেতে চাই না। আমি চাই, একটি রুফটপ বা ছাদের নিচে আকাশের খোলা বাতাসে শেষবারের মতো বসতে। এবং সেখানে আমার স্ত্রী নোবারার নিজ হাতের রান্না করা খাবার আমি তার হাত থেকেই খেতে চাই। কোনো সিকিউরিটি ক্যামেরা থাকবে না, কোনো বন্দুকের নল আমাদের দিকে তাক করা থাকবে না। কেবল আমি, নূরা এবং এক টুকরো খোলা আকাশ।”
আইজি প্রিজন ভ্রু কুঁচকালেন।
“আপনি কি জানেন আপনি কী চাইছেন? একজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে জেলের বাইরে কোনো ভবনের ছাদে নিয়ে যাওয়া অসম্ভব। এটা সিকিউরিটি ব্রিচ।”
জেনিন একটুও বিচলিত হলো না। সে সরাসরি আইজি প্রিজনের চোখের দিকে তাকাল।
“আমি জানি আমি কী চাইছি। আমি পালাব না। পালালে আমি স্বেচ্ছায় ধরা দিতাম না। আপনারা চাইলে আমাকে দশ স্তরের বেষ্টনী দিয়ে ঘিরে রাখতে পারেন, কিন্তু আমার বসার জায়গাটা যেন মুক্ত আকাশের নিচে হয়। আমি নুরশাদ সাম্রাজ্যের অধিপতি হিসেবে মরতে চাই না, আমি কেবল একজন তৃষ্ণার্ত প্রেমিক হিসেবে বিদায় নিতে চাই, আমার নূরার কাছে। এইটুকু সম্মান কি রাষ্ট্র একজন মানুষকে দিতে পারে না?”
জেনিনের এই বিচিত্র ইচ্ছার খবর মুহূর্তেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পর্যন্ত পৌঁছে গেল। ডিবি অফিসে বসে নানামি তখন উত্তেজনায় কাঁপছে। নানামি জানত জেনিন কিছু একটা করবে, কিন্তু এই রুফটপ ডিনারের আইডিয়াটা তার কাছেও এক বিশাল ধাঁধা মনে হলো।
মন্ত্রণালয়ে তখন জরুরি বৈঠক। গোয়েন্দা প্রধান আপত্তি তুললেন,
“জেনিন নুরশাদ একজন জিনিয়াস। রুফটপ মানেই স্নাইপারের ঝুঁকি অথবা কোনো ড্রোন অ্যাটাক। ও যদি সেখান থেকে উড়ে চলে যায়? ওর নেটওয়ার্ক এখনো সক্রিয়।”
নানামি সেই বৈঠকে উপস্থিত ছিল। সে উঠে দাঁড়িয়ে তার রিভলভারটা টেবিলের ওপর রাখল। “স্যার, জেনিন পালাবে না। ও জবানবন্দি দিয়েছে কারণ ও মরতে চায়। কিন্তু ওর এই শেষ ইচ্ছাটা যদি পূরণ না হয়, তবে নুরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজের কয়েক হাজার শ্রমিক রাস্তায় নামবে। জেনিনের ইমেজ এখন আর সাধারণ মাফিয়ার মতো নেই। মানুষ ওকে একজন রবিন হুড হিসেবে দেখছে। ওর এই শেষ ইচ্ছা পূরণ করা মানে প্রশাসনের একটা বড় বিজয় দেখানো যে, আমরা কতটা মানবিক।”
দীর্ঘ তিন ঘণ্টার বাদানুবাদ আর আইনি কাটাছেঁড়ার পর বিশেষ একটি শর্তে পারমিশন এল। ডিবি অফিসেরই একটি অত্যন্ত সুরক্ষিত এবং চারদিকে কাঁচের দেয়াল দিয়ে ঘেরা রুফটপে জেনিনকে নেওয়া হবে। সেখানে জেনিন এবং নোবারা একান্তে সময় কাটাতে পারবে ঠিকই, কিন্তু পুরো রুফটপটি আক্ষরিক অর্থেই কয়েকশ স্নাইপার আর সশস্ত্র কমান্ডো দিয়ে ঘিরে রাখা হবে।
অনুমতির খবর যখন জেলে পৌঁছাল, জেনিন তখন তার ডায়েরিতে শেষ কিছু কথা লিখছিল। সে খবরটি শুনে কোনো উচ্ছ্বাস দেখাল না। সে যেন জানত যে এটাই হতে যাচ্ছে। সে জেলার সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ধন্যবাদ। তবে মনে রাখবেন, আমার এই শেষ ইচ্ছায় কোনো পুলিশি শব্দ যেন না থাকে। আমি চাই পনেরো মিনিটের জন্য হলেও জেনিন নুরশাদ এই পৃথিবী থেকে হারিয়ে গিয়ে কেবল নোবারার স্বামী হয়ে থাকতে।”
ওদিকে সবাই তখন চিন্তা করছে জেনিন কেন রুফটপ বেছে নিল? কেন সে জেলের ভেতর খাবার খেতে চাইল না? এই সবকিছুর পেছনে কি জেনিনের কোনো গোপন চাল আছে, নাকি এটি সত্যিই এক পরাজিত প্রেমিকের শেষ আর্তি? আকাশটা ক্রমেই লাল হয়ে আসছে, আর সেই সাথে ঘনিয়ে আসছে এক ঐতিহাসিক বিকেলের পদধ্বনি। জেনিন নুরশাদ এখন প্রস্তুত তার শেষ সফরের জন্য, যেখানে কোনো কারাগার নেই, আছে কেবল এক টুকরো খোলা আকাশ আর তার প্রাণপ্রিয়া নোবারা।
<><><><><><><><><>
সকাল পৌনে ১১ টা। শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত অভিজাত বহুতল ভবনের রুফটপ। চারপাশে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বেষ্টনী। ছাদে যাওয়ার প্রতিটি প্রবেশপথে মেটাল ডিটেক্টর আর সশস্ত্র কমান্ডো। প্রশাসনের কড়া নির্দেশ, কোনোভাবেই যেন জেনিন নুরশাদ তার জীবনের শেষ মুহূর্তগুলোতে কোনো বিশৃঙ্খলা করতে না পারে। তবে নানামি আজ এখানে নেই। সে নিজেকে এই দৃশ্য থেকে সরিয়ে নিয়েছে; নিজের বন্ধুর মৃত্যদণ্ড কার্যকর হওয়ার আগে তার শেষ মিলন দেখার ক্ষমতা নানামির নেই। সে দূরে কোথাও একাকী অন্ধকার ঘরে বসে নিজের অক্ষমতার দহনে পুড়ছে হয়তো!
ছাদের ওপরটা খুব সাদামাটা, একটি ছোট গোল টেবিল, দুটি চেয়ার। উপরে উন্মুক্ত আকাশ। চারদিকে কাঁচের রেলিং, যার ওপাশে পুরো ঢাকা শহরটা জেনিনের পায়ের নিচে। জেনিনকে যখন ছাদে আনা হলো, তার ডাণ্ডাবেড়ির শব্দটা এই নিরিবিলি পরিবেশে এক প্রলয়ংকারী যন্ত্রণার সুর তুলল। তবে তার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তার শিকল খুলে নেওয়া হলো, যদিও চারপাশে নিরাপত্তা এতোটাই বেশি যে, জেনিন পালানোর জন্য এক পাও নড়লেই তাকে শ্যুট করে ঝাঁঝড়া করে দেওয়া হবে।
নোবারা আগে থেকেই সেখানে বসে ছিল, কিছুক্ষণ আগেই তার কাছে ফোন এসেছিল জেনিন নুরশাদের শেষ ইচ্ছা জানাতে। তার সামনে রাখা টিফিন ক্যারিয়ার, যাতে সে জেনিনের জন্য নিজ হাতে শেষবারের মতো খাবার সাজিয়ে এনেছে। জেনিনকে দেখামাত্রই নোবারা উঠে দাঁড়াল। তার চোখে আজ কোনো জল নেই, কেবল এক বিশাল শূন্যতা। লোকটার আজ ফাঁসির দিন চলে এলো, অথচ লোকটা একবারো বললো না সে কি করতে চলেছে! ইউজি ,নানামি কে নোবারা কত শুধালো তাকে একটু কিছু বলার। কিন্তু কেউ কিছু বললো না। নোবারার আক্ষরিক অর্থেই চিন্তা হতে লাগলো। লোকটা কি সত্যিই হারিয়ে যাবে? তাকে কি শান্তনা দেওয়ার জন্য এতদিন ফিরে আসবো বলছিল!
জেনিন এসে চেয়ারে বসল। তার হাত দুটো টেবিলের ওপর রাখল। নোবারা কম্পিত হাতে থালায় ভাত বেড়ে দিল। সে জেনিনের মুখের সামনে এক লোকমা খাবার ধরল। জেনিন কোনো কথা না বলে নোবারার চোখের দিকে তাকিয়ে সেই অন্ন গ্রহণ করল। এই শান্ত পরিবেশের আড়ালে যে কত বড় ঝড় বইছে, তা কেবল এই দুজনই জানে।
“নূরা,” জেনিন খুব মৃদু আর নিস্তেজ স্বরে ডাকল, যেন কোনো সুদূর অতীত থেকে ভেসে আসা এক ক্লান্ত বাঁশির সুর। “আপনি কি জানেন? এই পুরো শহরটা একদিন আমার হাতের তালুর মতো ছিল। আমি চেয়েছিলাম এই আকাশটা, এই পৃথিবীর সব সুখ আপনার পায়ের নিচে এনে দিতে। অথচ দেখুন, আজ আমি এই খাঁচায় বন্দি!”
নোবারা আর পারল না। জেনিনের মুখের দিকে তাকিয়ে তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না, সে কেবল যন্ত্রণায় মাথা নাড়ল। জেনিন ম্লান হাসল, সেই হাসিতে বিরহ আর কষ্টের এক গভীর সমুদ্র। সে নিজের হাতকড়া পরা হাতটা বাড়িয়ে নোবারার ভেজা গালটা আলতো করে ছুঁয়ে দিল।
“একদিন এক চঞ্চল হরিণীর মতো কিশোরী মেয়ে আমার জীবনে ঝড় হয়ে এসেছিল, মনে আছে নূরা? সে আমার ভেতরের অন্ধকার জানত না, সে শুধু জানত কীভাবে অবুঝের মতো জেদ করে তার জেনিন ভাইয়াকে নিজের মায়ায় বেঁধে ফেলতে হয়। সেই নীল রঙের স্কুল ড্রেস, সেই কালো-নীল রঙের ব্যাগ আর সেই মিষ্টি মেয়েটা… সব আজও আমার এই বুকে নিখুঁতভাবে খোদাই করা আছে জানেন?”
জেনিন নোবারার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তার কণ্ঠস্বর হঠাৎ এক অদ্ভুত সুরের মূর্ছনায় ভেসে গেল। পনেরো বছর ধরে নিজের বুকে জমানো না বলা ভালোবাসা, একাকীত্বের দিনগুলো আর নোবারাকে পাওয়ার রূপকথার মতো গল্পটা, কত সুন্দর ছিল তাদের সেই দিনগুলো!
নোবারা আবার খাবার মুখে তুলে দিল জেনিনের মুখে। তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না।
জেনিন হাসল, তবে সেই হাসিতে বিরহ আর কষ্টের এক গভীর সমুদ্র। সে নোবারার হাতের কবজিটা আলতো করে ধরল। “আপনি কাঁদছেন না? ওহ, আমি ভুলে গিয়েছিলাম, আমার নূরা তো পাহাড়ের মতো শক্ত ,সে তো সিআইডি অফিসার। কিন্তু আজ কি পাহাড়টাও একটু টলে উঠবে না? আজ তো আমার বিদায়ের লগ্ন।”
নোবারা এবার ডুকরে কেঁদে উঠল। সে জেনিনের হাত দুটো নিজের বুকে চেপে ধরল।
“কেন জেনিন? কেন এমন হলো? কেন আমরা সাধারণ মানুষের মতো বাঁচতে পারলাম না? আমি আপনাকে ছাড়া এই পৃথিবীতে কিভাবে থাকবো? আমার তো কেউ নেই! আপনি কি সত্যিই হারিয়ে যাবেন?”
জেনিন নোবারার খুব কাছে এগিয়ে এল। সে নোবারার কানের কাছে মুখ নিয়ে এল। বাতাসের ঝাপটায় জেনিনের গলার সেই গম্ভীর স্বর নোবারার আত্মাকে কাঁপিয়ে দিল। জেনিন খুব মরমী সুরে একটি শায়েরী আওড়াল,
“Maut ko toh yunhi log badnaam karte hain… Takleef toh zindagi deti hai jaanam!
Hum toh musafir hain us raah-e-ishq ke,
Jahan manzil ka naam hi fana hai!”
শায়েরিটি শুনে নোবারা জেনিনের বুকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। শেষবার বাইপাস ভিলা থেকে বেরোনোর সময় নোবারা আবদার করেছিল ফিরে এসে তাকে শায়েরি শুনাবে। আজ প্রায় দুই মাস পর সে শায়েরি শুনছে, তাও এক বিদায়ী শায়েরী! নোবারা অনুভব করছিল জেনিনের হৃদপিণ্ডের দ্রুত স্পন্দন। জেনিন এবার খুব সাবধানে নোবারার পেটের ওপর নিজের হাত রাখল। সে অনুভব করল তার অনাগত সন্তানের উপস্থিতি। জেনিন নিচু হয়ে নোবারার পেটে একটি দীর্ঘ আর তপ্ত চুমু খেল। তার চোখ থেকে এক ফোঁটা লোনা জল নোবারার কাপড়ে মিশে গেল।
“আমার শেষ সম্পদটুকু আগলে রেখো নূরা,” জেনিন ফিসফিস করে বলল। “ও যেন জানে, তার বাবা হেরে গিয়ে মরেনি, সে তার ভালোবাসার পূর্ণতা পেতে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছে।”
এরপর জেনিন যখন সোজা হয়ে দাঁড়াল, তখন চারপাশের বাতাস যেন এক নিমেষে ভারী হয়ে গেল। প্রহরীরা দূর থেকে তার এই আকস্মিক মুভমেন্ট দেখে চট করে নিজেদের রাইফেলের ট্রিগারে হাত রাখল। তবে জেনিন নুরশাদ আজ সব আইনি খাঁচা আর বন্দিত্বের ঊর্ধ্বে। সে নোবারার অশ্রুসিক্ত, রক্তাক্ত চোখের দিকে তাকিয়ে তার চিরচেনা রাজকীয়, অহংকারী আর মায়াবী হাসিটা হাসল।
“একটা কথা মনে রাখবেন সবাই” জেনিন খুব শান্ত অথচ পাথরের মতো দৃঢ় গলায় প্রায় চিৎকার করেই বলল। “জেনিন নুরশাদকে মারার ক্ষমতা কোনো জল্লাদের হাতের দড়ির নেই। জেনিন নুরশাদ নিজের মৃত্যু নিজেই নির্বাচন করে। আমি জেলের অন্ধকার স্যাঁতসেঁতে ঘরে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলে মরার জন্য জন্মাইনি। আমি মরব এই মুক্ত আকাশের নিচে, এই পৃথিবীর বুকে নিজের শেষ অধিকারটুকু খাটিয়ে।”
নোবারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই জেনিন বিদ্যুতগতিতে কাঁচের রেলিংয়ের দিকে দৌড়ে গেল। “হোল্ড অন! ধরো ওকে!” বলে চিৎকার করে তেড়ে এল, কিন্তু জেনিন তখন সমস্ত পার্থিব নিয়মের বাইরে, সাধারণ মানুষের নাগালের বহু দূরে।
সে কাঁচের রেলিংয়ের একদম কিনারায় গিয়ে দাঁড়াল। নিচে দশ তলা গভীর শূন্যতা, আর উপরে খোলা অন্তহীন আকাশ। ঝোড়ো বাতাস তার রক্তভেজা শার্ট আর চুলগুলোকে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল।
ওপাশে থাকা শহরের প্রকাণ্ড একটি ডিজিটাল বিলবোর্ডের ঘড়ির দিকে। উজ্জ্বল লাল রঙের ডিজিটাল সংখ্যাগুলো সেখানে স্থির হয়ে জ্বলজ্বল করছে…১১:০৭!
জেনিনের ঠোঁটের কোণে এক অলৌকিক, মায়াবী হাসি ফুটে উঠল। তার অবাধ্য মস্তিষ্ক এক ঝটকায় তাকে নিয়ে গেল পনেরো বছর আগের সেন্ট জুড হাই স্কুলের লাইব্রেরি ঘরে। জেনিন সেদিন অবহেলা করলেও আজ এই মৃত্যুর কিনারায় দাঁড়িয়ে বুঝতে পারল, প্রকৃতি আজ তার সাথে এক অদ্ভুত খেলায় মেতেছে। ঘড়ির কাঁটায় এখন ঠিক ১১:০৭! জেনিন নুরশাদ আজ কোনো অপরাধী হিসেবে ফাঁসির মঞ্চে মরছে না, বরং এই মহাবিশ্ব আজ এক তৃষ্ণার্ত প্রেমিকের শেষ ইচ্ছাটা অক্ষরে অক্ষরে কবুল করে নিচ্ছে। খাঁচার বন্দিত্ব ছিঁড়ে, নিজের নূরার হৃদয়ে চিরদিনের মতো অমর হয়ে মুক্ত আকাশে ডানা মেলার এটাই তো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ! এটা কোনো আত্ম”হত্যা নয়, এটা জেনিন নুরশাদের নিজের শর্তে প্রকৃতির বুক থেকে কেড়ে নেওয়া তার জীবনের চূড়ান্ত ‘১১:১১ উইশ’!
জেনিন শেষবারের মতো নোবারার দিকে তাকাল। সেই চোখে কোনো ভয় ছিল না, ছিল পনেরো বছর ধরে বুকে জমানো এক রূপকথার মতো গভীর আর্তি।
ঠিক ঝাঁপ দেওয়ার আগের মুহূর্তে, জেনিন তার মখমল কোমল অথচ ভাঙা কণ্ঠে নোবারার উদ্দেশ্যে শেষবারের মতো গেয়ে উঠল
তাদের ভালোবাসার পরম সত্য,
“Years ago, this story began…
She was mine, and I was her man.
I’m in love with a fairytale,
Even though it hurts…
Cause I don’t care if I lose my mind,
I’m already cursed…”
গানটা শেষ হতেই জেনিন চোখ মেলল। তার ঠোঁটের কোণে নোবারার জন্য লেপ্টে রইল এক শেষ অকৃত্রিম হাসির টুকরো। সে বুক ভরে এই পৃথিবীর মুক্ত বাতাস শেষবারের মতো টেনে নিয়ে বলল,
“মৃত্যু তো কেবল একটা অজুহাত নূরা, আমি তো আপনার ভালোবাসার গভীরে অমর হতে চললাম। জেনিন নুরশাদ আজ ফানা হলো… আলবিদা, আমার হৃদয়িনী!”
পরক্ষণেই, ঘড়ির কাঁটায় ১১:১১ বাজতেই এই অলৌকিক মুহূর্তটিকে সাক্ষী রেখে, জেনিন সেই দশতলার ছাদ থেকে ডানা কাটা ফিনিক্স পাখির মতো শূন্যে ঝাঁপ দিল!
“জেনিইইইইইইইইইইন…!”
নোবারার বুক চিরে এক অমানুষিক, প্রলয়ংকারী আর্তনাদ আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে দিল। সে উন্মাদের মতো দৌড়ে গিয়ে কাঁচের রেলিংটা খামচে ধরল। কিন্তু তখন সব শেষ। পিচঢালা কালো রাস্তার বুকে জেনিন নুরশাদ নামের অপরাজেয় সিংহটি আজ নিজের শর্তে, নিজের ভালোবাসার পূর্ণতা ছুঁয়ে চিরদিনের মতো ঘুমিয়ে পড়েছে।
নিচে যখন বিকট শব্দে একটা রাজত্বের অবসান হলো, তখন মনে হলো পুরো ঢাকা শহর এক নিমেষে বধির হয়ে গেছে। সাইরেনের তীক্ষ্ণ আওয়াজ, পুলিশ আর সাধারণ মানুষের আর্তচিৎকার, সবকিছু নোবারার কানের কাছে এসে এক অন্তহীন শূন্যতায় রূপ নিল। সে ছাদের রেলিংটা খামচে ধরে মাটির দিকে তাকিয়ে রইল। দশ তলা নিচে, পিচঢালা কালো রাস্তার বুকটা জেনিন নুরশাদের তাজা রক্তে লাল হয়ে যাচ্ছে। জেনিনের দোর্দণ্ড প্রতাপী শরীরটা আজ নিস্তেজ, কিন্তু এই দূর থেকেও নোবারা স্পষ্ট দেখতে পেল, জেনিনের ঠোঁটের কোণে লেপ্টে আছে এক অদ্ভুত বিজয়ী হাসি। সে ফাঁসিকে তুচ্ছ করে, রাষ্ট্রকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজের মৃত্যুর মালিক নিজেই হয়ে গেল। নোবারা ছাদের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তার চারপাশের আকাশটা আজ সত্যিই ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। জেনিন নুরশাদ শেষবারের মতো প্রমাণ করে দিয়ে গেলড় সিংহ খাঁচায় থাকলেও সে নিজের মৃত্যুর মালিক নিজেই থাকে।
মিনিট দশেকের মধ্যেই একটি সাদা অ্যাম্বুলেন্স সাইরেন বাজিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছাল। জেনিনের শরীরটাকে যখন স্ট্রেচারে তোলা হচ্ছিল, তখন উপস্থিত প্রতিটি কমান্ডো আর রক্ষীর হাত কাঁপছিল। যে জেনিন নুরশাদের এক ইশারায় পুরো আন্ডারওয়ার্ল্ড থমকে যেত, সেই মানুষটা আজ বড্ড হালকা হয়ে শুয়ে আছে। তার সেই শ্বেত শুভ্র শার্টটা এখন রক্তে লেপ্টে কাদা হয়ে গেছে। কপালে গভীর ক্ষত, যেখান থেকে এখনো চুইয়ে চুইয়ে রক্ত পড়ছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, জেনিনের মুখটা একটুও বিকৃত হয়নি। তার চোখ দুটো আলতো করে বোজা, যেন সে কোনো ক্লান্তিহীন, দীর্ঘ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
<><><><><><><><><>
রাত তখন গভীর। জেনিনের বডি নিয়ে আসা হয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মর্গে। বাইরে পাহারায় আছে বিশাল পুলিশ বাহিনী। ল্যাবের ভেতরে নিস্তব্ধতা এতটাই প্রখর যে ঘড়ির কাঁটার শব্দও সেখানে বজ্রপাতের মতো শোনায়। স্টেইনলেস স্টিলের ঠান্ডা টেবিলের ওপর জেনিনকে শোয়ানো হয়েছে। ফরেনসিক অফিসার ডক্টর জামান যখন সাদা চাদরটা সরালেন, তার হাতটা একবার থমকে গেল। তিনি অনেক লাশ দেখেছেন, কিন্তু এমন শান্ত বীরত্বমাখা লাশ তার জীবনে প্রথম। জেনিনের বুকের ছাতিটা বিশাল, যেন সেখানে এখনো এক সমুদ্র সাহস জমা হয়ে আছে।
রিপোর্ট তৈরির সময় ডাক্তার প্রতিটি আঘাতের বিবরণ দিচ্ছিলেন খুব ভারী গলায়।
“মাল্টিপল ফ্র্যাকচার ইন লেগস অ্যান্ড রিপস… ইন্টারনাল হেমোরেজ…কজ অফ ডেথ, সেভিয়ার ব্রেন ইনজুরি ডিউ টু ফল ফ্রম হাইট।”
কিন্তু এই যান্ত্রিক শব্দগুলো জেনিন নুরশাদের গল্প বলতে পারছিল না। জেনিনের কানের পাশে তখনো একটি ছোট রক্তের ধারা জমে কালো হয়ে আছে। তার ডান হাতের তালুতে একটি গভীর দাগ, যা হয়তো রেলিং থেকে লাফ দেওয়ার সময় হয়েছিল। জেনিন আজ আর কথা বলছে না, কিন্তু তার নিথর দেহটা চিৎকার করে বলছে, সে হার মানেনি।
রাত তখন ঘড়ির কাঁটায় কাঁটায় তিনটে। ভারী লোহার দরজাটা হঠাৎ এক দীর্ঘ আর্তনাদের মতো ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে খুলে গেল। করিডোরের ঠান্ডা বাতাস মর্গের ভেতরে প্রবেশ করতেই চারপাশের গন্ধটা আরও ভারী হয়ে উঠল। নানামি নোবারাকে ধরে ধরে ভেতরে নিয়ে এল। নোবারার পা দুটো যেন আর তার শরীরের অংশ নয়, সেগুলো মাটির সাথে লেপ্টে যাচ্ছে, কোনো শক্তি নেই, কোনো সাড় নেই। নানামি নিজেই এক বিধ্বস্ত সৈনিকের মতো নোবারাকে আগলে রেখে টেবিলটার দিকে এগিয়ে নিয়ে গেল।
টেবিলের ওপর জেনিনের শরীরটা একটা ধবধবে সাদা চাদর দিয়ে ঢাকা ছিল, কেবল তার শান্ত, রাজকীয় মুখমণ্ডলটুকু চাদরের বাইরে উন্মুক্ত। নোবারা যখন টেবিলটার একদম কাছে এসে দাঁড়াল, তার চোখের বাদামি মণি দুটো স্থির হয়ে গেল। সে খুব ধীর পায়ে, কাঁপতে কাঁপতে নিজের ডান হাতটা বাড়িয়ে দিল জেনিনের গালের ওপর। হাতটা ছোঁয়া মাত্রই নোবারা এক তীব্র বিদ্যুতস্পৃষ্টের মতো শিউরে উঠল। বরফের চেয়েও ঠান্ডা! এক খণ্ড জমাটবদ্ধ হিমবাহ যেন শুয়ে আছে তার সামনে!
যে জেনিনের গায়ের চেনা ওমে, বুকের তপ্ত নিশ্বাসে নোবারা নিজের জীবনের সমস্ত ঝড়-ঝাপটা আর ভয় এক নিমেষে ভুলে যেত, যে জেনিনের সামান্য একটা আলতো আলিঙ্গন তাকে পুরো পৃথিবীর বিরুদ্ধে লড়াই করার সাহস দিত, সেই জেনিন আজ এতটাই নিস্পৃহ, এতটাই শীতল যে নোবারার হাতের ওমটুকুও তাকে স্পর্শ করতে পারছে না।
নোবারা আর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। সে টেবিলটার ওপর ভেঙে পড়ল। তার নিশ্বাস দ্রুত থেকে দ্রুততর হতে লাগল। সে তার মুখটা জেনিনের কানের খুব কাছে নিয়ে গেল। তার কণ্ঠস্বর আজ আর কাঁপছে না, সেখানে জমা হয়েছে এক গাঢ়, বুকভাঙা উন্মাদনা। সে ফিসফিস করে বলতে লাগল,
“জেনিন…এই জেনিন… একটু চোখ মেলুন না! দেখুন, আপনার নূরা এসেছে। আপনি তো আমাকে সবসময় স্টুপিড বলতেন, অবুঝ বলতেন। আজ কেন নিজে এত বড় অবুঝের মতো এখানে ঘুমিয়ে আছেন? আপনি না বলেছিলেন জেনিন নুরশাদ কখনো হারে না? আপনি না বলেছিলেন জল্লাদের দড়ি আপনাকে ছুঁতেও পারবে না? আপনি তো ঠিকই জিতে গেলেন জেনিন, কিন্তু আপনার এই নূরাকে চিরকালের মতো এক জীবন্ত লাশ বানিয়ে দিয়ে গেলেন কেন? আর একটুখানি সময়ের জন্য হলেও চোখ দুটো খুলুন, আগের মতো একটা কড়া ধমক দিন আমাকে! বলুন যে, ‘নূরা, বড্ড বেশি চিন্তা করেন আপনি!’ প্লিজ জেনিন, একটা বার কথা বলুন…”
নোবারা জেনিনের চওড়া, পাথুরে শক্ত বুকের ওপর নিজের মাথাটা ছেড়ে দিল। তার অবাধ্য চুলগুলো জেনিনের গালের ওপর ছড়িয়ে পড়ল। সে তার কানটা জেনিনের বুকের বাঁ পাশে চেপে ধরল। সে শুনতে চাইল সেই চেনা ধকধক শব্দটা, যে বুকটার স্পন্দনকে সে নিজের জীবনের একমাত্র সুর ভেবেছিল। কিন্তু সেখানে কেবল এক অনন্ত, নিশ্ছিদ্র আর বুক চিরে যাওয়া নিস্তব্ধতা। কোনো আওয়াজ নেই। জেনিনের হৃদযন্ত্রটা আজ আক্ষরিক অর্থেই এক পাথরের টুকরোয় পরিণত হয়েছে।
নোবারা এবার জেনিনের কপালে নিজের কপাল ঠেকাল। জেনিনের কপালের তাজা, গভীর ক্ষতস্থান থেকে আসা শুকনো রক্তের লোহার মতো কাঁচা সোঁদা গন্ধটা নোবারার নাকে লাগল। এই গন্ধটা যেন নোবারার মস্তিষ্কের শেষ সুস্থ কোষটাকেও পুড়িয়ে ছাই করে দিল। সে পাগলের মতো জেনিনের সেই হিমশীতল হাত দুটো নিজের দুই গালে, চোখে, কপালে ডলতে লাগল। যেন সে নিজের শরীরের সমস্ত রক্ত আর ওম ঢেলে দিয়ে জেনিনের ভেতরের প্রাণটাকে আবার টেনে আনবে!
“আমি কি সত্যিই আপনার জীবনে কেউ ছিলাম না জেনিন?” নোবারার চোখ থেকে এবার ফোঁটা ফোঁটা লোনা জল জেনিনের বন্ধ চোখের পাতার ওপর গিয়ে পড়তে লাগল। “আপনি এত বড় স্বার্থপর কীভাবে হলেন? ওই রুফটপে দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো আমাকে জড়িয়ে ধরে নিজের সন্তানের অস্তিত্ব ছুঁয়েও আপনার বুকটা কাঁপল না? আপনি একা এই অনন্ত শূন্যতায় লাফ দিয়ে মুক্তি পেয়ে গেলেন, আর আমাকে এই নরকের মাঝে একাকী তিলে তিলে মরার জন্য ফেলে গেলেন? আপনার এই নূরার কথা একটা বারও আপনার মনে পড়ল না জেনিন? আপনি ফিরে আসার মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে এতদিন আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন? আমি আপনাকে ছাড়া কীভাবে শ্বাস নেব, একটা বার বলে দিয়ে গেলেন না কেন? এই জেনিন, উঠুন না!”
মর্গের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা ফরেনসিক প্রধান ডক্টর জামান অত্যন্ত অপরাধী আর ভারী মুখে এগিয়ে এলেন। তার হাতে একটা ক্লিপবোর্ড, যাতে জেনিনের অফিশিয়াল মৃত্যুর দলিল রাখা। তিনি অত্যন্ত নিচু স্বরে বললেন, “ম্যাম… ডেথ সার্টিফিকেটটা একটু সাইন করতে হবে।”
নোবারা চাদর থেকে মুখ তুলে সেই কাগজের দিকে তাকাল। ডেথ সার্টিফিকেট এর ওপর বড় বড়, নিষ্ঠুর কালো কালিতে লেখা,
NAME: ZENIN NURSHAD
AGE: 32
STATUS: DECEASED (DEAD)
DATE: 01 APRIL, 2022
পয়লা এপ্রিল..এক নিষ্ঠুর এপ্রিল ফুল ডে’ বা এপ্রিলের প্রথম দিন। পুরো বিশ্ব যখন এই দিনটাকে সস্তা তামাশা, কৌতুক আর মেকি হাসির ছলে উদযাপনে মেতে ওঠে, প্রকৃতি ঠিক তখনই জেনিন নুরশাদের জীবনের সমীকরণটা মিলিয়ে দিয়ে এক নির্মম পরিহাসের জাল বুনল। নোবারা সেই তারিখটার দিকে তাকিয়ে আক্ষরিক অর্থেই এক পক্ষাঘাতগ্রস্ত পাথুরে মূর্তিতে পরিণত হলো। তার অবশ মগজের প্রতিটি স্নায়ু যেন একযোগে চিৎকার করে বলে উঠল, আজ তবে ১লা এপ্রিল? জেনিন কি তবে পুরো রাষ্ট্র, প্রশাসন, দেশের তাবড় তাবড় গোয়েন্দা আর খোদ তার নূরার সাথে জীবনের সবচাইতে বড় আর ভয়ঙ্কর এপ্রিল ফুল খেলাটা খেলে গেল? নাকি সে নিজেই এই নিষ্ঠুর প্রকৃতির এক চরম এবং শাশ্বত তামাশার শিকার হয়ে চিরদিনের মতো হারিয়ে গেল?
নোবারার চোখের জল তখন শুকিয়ে টকটকে লাল হয়ে উঠেছে। ১লা এপ্রিলের এই অভিশপ্ত তারিখটাই কি তবে জেনিন নূরশাদ নামের সেই অপরাজেয় সিংহের ফানা হয়ে যাওয়ার দিন ছিল? প্রতি বছর এই দিনে মানুষ যখন একে অপরকে বোকা বানিয়ে হাসবে, নোবারা তখন এই মর্গের হিমশীতল অন্ধকার আর জেনিনের বুকে কান পেতে এক অনন্ত শূন্যতার হাহাকার শুনবে। এই দিনটা আর কোনোদিন নোবারার জীবনে কৌতুক হয়ে ফিরবে না, এটা হয়ে রইল এক চিরন্তন প্রলয়ের ব্ল্যাক হোল, যা নূরশাদ সাম্রাজ্যের সূর্যকে এক নিমিষে গ্রাস করে নিয়েছে।
নোবারা কাগজটার দিকে তাকিয়ে এক বীভৎস, শুকনো হাসি হাসল। যে জেনিন নুরশাদের একটা নামের কাঁপুনিতে পুরো আন্ডারওয়ার্ল্ড থমকে যেত, যার একটা ইশারায় রাষ্ট্রের আইনও নিজের গতিপথ বদলে ফেলত, তাকে আজ একটা সামান্য কাগজের টুকরো আর DECEASED শব্দটা দিয়ে মৃত ঘোষণা করা হচ্ছে! এর চেয়ে বড় পরিহাস আর কী হতে পারে! লোকটা তো বলেছি ল সে ফিরে আসবে, তবে যে সে তার চোখের সামনে আত্মহত্যা করল! নোবারার মস্তিষ্ক এটা গ্রহণ করতে পারতেছে না। কাগজের বুকে ১লা এপ্রিলের সেই নিষ্ঠুর কালির দাগটার দিকে চেয়ে নোবারার হাত থেকে কলমটা ছিটকে মেঝের ওপর পড়ে গেল। সে আর সই করতে পারল না, সে আবার জেনিনের বুকের ওপর আছড়ে পড়ল।
অপরদিকে এতক্ষণ যে মানুষটা মর্গের দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে এক মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে ছিল, তার ভেতরের পাথরটা এবার ফেটে চৌচির হয়ে গেল। সে আর কেউ নয়, নানামি জায়দান!
এতক্ষণ সে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছিল নিজের অফিশিয়াল পোশাক আর আইনের দোহাই দিয়ে। কিন্তু জেনিনের এই শান্ত, নিথর অবয়ব নানামির এত বছরের জমে থাকা পুরুষালি অহংকার আর শক্ত মনটাকে এক নিমিষে গুঁড়িয়ে দিল। নানামি টলতে টলতে টেবিলের অন্য পাশে, ঠিক জেনিনের পায়ের কাছে গিয়ে সটান হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।
নানামির চোখের জল জেনিনের পায়ের ঠান্ডা, ফ্যাকাশে চামড়ার ওপর টপটপ করে গিয়ে পড়তে লাগল। সে জেনিনের পায়ের ওপর নিজের কপালটা ঠেকিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠল।
“ক্ষমা করিস নুরশাদ… আমাকে ক্ষমা করিস!” নানামির কণ্ঠস্বর কান্নায় ও হিক্কায় ভেঙে যাচ্ছিল। “আমি পারলাম না রে, তোকে বাঁচাতে পারলাম না! তুই ঠিকই বলেছিলি নুরশাদ, এই পচা সমাজ আর এই ঠুঁটো আইন তোকে শাস্তি দেওয়ার কোনো যোগ্যতা রাখে না। তুই মরিসনি রে ভাই, তুই নিজের শর্তে জিতে গেলি।”
নানামি জেনিনের পা দুটো নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে বাচ্চার মতো কাঁদতে লাগল। পনেরো বছর আগের স্কুলের দিনগুলো, তাদের একসাথে কাটানো মুহূর্তগুলো আজ এক একটা তীরের মতো নানামির বুক চিরে দিচ্ছিল।
“তুই শেষ সফরে চলে গেলি নুরশাদ, অথচ তোর এই ভাইটা তোকে একটা কাঁধ দেওয়ার যোগ্যতাও হারিয়ে ফেলেছে! এই আইন আমাকে তোকে শেষ কুর্নিশ জানানোর অধিকারটুকুও দিল না রে ভাই… আমাকে মাফ করে দিস…” নানামির এই অবরুদ্ধ, পুরুষালি কান্না মর্গের সেই নিরেট দেয়ালগুলোতে ধাক্কা খেয়ে এক প্রলয়ংকারী বিষাদের প্রতিধ্বনি তৈরি করছিল।
ভোর হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে, যখন পুব আকাশে আঁধার কেটে কুয়াশার চাদর জমতে শুরু করেছে, তখন জেনিনের বডি সাদা কাফনের কাপড়ে মুড়িয়ে দেওয়া হলো। কাফনের ওপরের অংশটুকু যখন আলতো করে খোলা ছিল, তখন জেনিনের কেবল অতি শান্ত, নিখুঁত মুখটা দেখা যাচ্ছিল। কোনো রাজমুকুট ছাড়াই জেনিনকে আজ এক অপরাজেয় রাজার মতো লাগছিল।
জেনিনকে যখন স্ট্রেচারে করে মর্গের দীর্ঘ, অন্ধকার করিডোর দিয়ে বাইরের দিকে নিয়ে আসা হচ্ছিল, তখন এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হলো। করিডোরের দুই পাশে পাহারারত কড়া র্যাব, সশস্ত্র কনস্টেবল থেকে শুরু করে জেলের সাধারণ কয়েদিরা পর্যন্ত, কোনো অফিশিয়াল আদেশ ছাড়াই স্বতঃস্ফূর্তভাবে মাথা নিচু করে, বুক টান করে স্যালুট পজিশনে দাঁড়িয়ে রইল। পুরো প্রশাসন যেন আজ থমকে গিয়ে তাদের এক অদৃশ্য, চিরন্তন সম্রাটকে শেষবারের মতো কুর্নিশ জানাচ্ছিল।
নোবারা তখনো এক হাত দিয়ে জেনিনের স্ট্রেচারের চাদরের পাশটা শক্ত করে ধরে অবশ পায়ে হাঁটছিল। তার চোখ দুটো দিয়ে আর জল পড়ছিল না, চোখগুলো লাল ও শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। তার মনে হচ্ছিল, সে জেনিনকে নিয়ে তাদের চেনা নুরশাদ ভিলার দিকে যাচ্ছে, যেখানে জেনিন তাকে জড়িয়ে ধরে বলবে, “নূরা, বড্ড বেশি ভয় পান আপনি!” কিন্তু বাস্তবতার নিষ্ঠুর হাত তাকে বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছিল, জেনিন আজ অন্য এক অন্তহীন বাড়ির যাত্রী!
নোবারা চোখ বুজে এক দীর্ঘ নিশ্বাস নিল। জেনিন নুরশাদ সশরীরে আজ এই পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু তার তেজ, তার জেদ আর তার অহংকারী ভালোবাসার রাজত্ব সে নোবারার ভেতরে অমর করে রেখে গেছে।
বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা সাদা অ্যাম্বুলেন্সটার ভেতরে জেনিনের নিথর শরীরটা তোলার ঠিক আগের মুহূর্তে, নোবারা শেষবারের মতো চাদরটা সরিয়ে জেনিনের ঠোঁটের ওপর নিজের কাঁপতে থাকা আঙুলগুলো রাখল। জেনিনের ঠোঁট দুটো আজ পুরোপুরি নীরব, তার মহাকাব্যিক রূপকথার গল্পটা আজ এখানেই সমাপ্ত!
চলবে ইংশাআল্লাহ……….
(আজ আমি কিছু বলবো না। গল্পটার আরো তিনটা পর্ব আসবে। জেনিন নুরশাদ এর বুদ্ধিমান পাঠকরাই কেবল ওই তিন পর্ব পড়বেন। কার তারা সাসপেন্স সহ্য করতে পারবেন। তারাই জিতবেন।🖤)

