#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_৭৯ (জাইনা নুরশাদ)
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম
পাঁচটি বছর। ক্যালেন্ডারের পাতায় দিনগুলো কেবল সংখ্যা হয়ে ধরা দিলেও নোবারা নুরশাদের কাছে এই পাঁচটি বছর ছিল একেকটি শতাব্দীর সমান দীর্ঘ। জেনিন নুরশাদ মারা যাওয়ার পাঁচ বছর পরের ২০২৭ সালের এক স্নিগ্ধ সকাল।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মর্গ থেকে জেনিন নুরশাদের নিথর দেহটা যখন অফিশিয়ালি বের করা হয়েছিল, তখন রাষ্ট্র আর প্রশাসনের ভেতর এক তুমুল, শ্বাসরুদ্ধকর আইনি যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছিল। একজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হাই-প্রোফাইল আসামী, যে কি না রাষ্ট্রের চোখে এক ভয়ঙ্কর মাফিয়া, সে জেলের বাইরে গিয়ে এভাবে নিজের সাজা নিজে কার্যকর করে নেবে, এটা প্রশাসন কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিল না। প্রথম কয়েকটা মাস নোবারাকে আক্ষরিক অর্থেই আইনি নরকের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছিল। ডিবি অফিস, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আর আদালতের চক্কর কাটতে কাটতে তার গায়ের চামড়া যেন পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল।
আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আর সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নোবারা এবং ইউজিকে চিল পাখির মতো ছেঁকে ধরেছিল। তাদের একটাই সন্দেহ ছিল, জেনিন নুরশাদ কি সত্যিই মারা গেছে? তবে নানামির সাহায্য অবশেষে জেনিনের লাশ দাফন করা গিয়েছিল। প্রসাশনের শর্ত ছিল একটাই, কোনো শোরগোল করা যাবে না, নুরশাদ সাম্রাজ্যের হাজারো শ্রমিক বা অনুরাগীদের নিয়ে কোনো বিশাল জানাজা করা যাবে না। রাষ্ট্র ভয় পাচ্ছিল, জেনিনের জানাজায় যদি লাখো মানুষের ঢল নামে, তবে সেটা একটা নতুন বিদ্রোহের জন্ম দিতে পারে।
পরিশেষে, প্রশাসনের কড়া পাহাড়ায়, এক নিঝুম রাতে জেনিন নুরশাদকে সমাহিত করা হয় ঢাকার এক ঐতিহাসিক পবিত্র ভূমিতে…আজিমপুর কবরস্থান। ঢাকার বুকে শত বছরের ইতিহাস বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রাচীন কবরস্থানের এক কোণে, পুরোনো এক শ্যাওলা ধরা মেহগনি গাছের ছায়ায় চিরদিনের মতো ঘুমিয়ে আছে নুরশাদ সাম্রাজ্যের অধিপতি।
কিন্তু অদ্ভুত, বড্ড অদ্ভুত বিষয় হলো….গত পাঁচ বছরে নোবারা এই কবরে তেমন একটা পা রাখেনি! পাঁচটা বছরে হয়তো আঙুলে গোনা দুই থেকে তিনবার সে আজিমপুরের সেই মেহগনি গাছের তলায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউজি অনেকবার বলেছে, “চলুন বসের কবরে একটু জিয়ারত করে আসি।” কিন্তু নোবারা প্রতিবারই ঠান্ডা চোখে ইউজিকে মানা করে দিয়েছে।
কেন যায় না নোবারা ওই কবরে? কারণ, তার ভেতরের প্রখর সিআইডি সত্তা আর জেনিনের প্রতি থাকা অন্ধ প্রেম কিছুতেই ওই সাড়ে তিন হাত মাটির অন্ধকারকে জেনিনের শেষ ঠিকানা বলে মেনে নিতে পারে না! নোবারার মনে হয়, ওই আজিমপুরের মাটিতে জেনিনের যে দেহটা চাপা দেওয়া হয়েছে, ওটা তো কেবল একটা রক্ত-মাংসের খোলস ছিল। জেনিন নুরশাদ নামের অপরাজেয় সিংহটি কি কখনো ওইটুকু অন্ধকার খাঁচায় বন্দি থাকতে পারে? যে মানুষটা মরার আগের মুহূর্তেও মুক্ত আকাশের নিচে ডানা কাটা ফিনিক্স পাখির মতো উড়াল দিয়ে নিজের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিল, সে আজিমপুরের মাটিতে মৃত হয়ে পড়ে আছে, এটা ভাবলেই নোবারার দম বন্ধ হয়ে আসে। নোবারার কাছে জেনিন বেঁচে আছে নুরশাদ ভিলার প্রতিটি দেয়ালে, নূরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজের প্রতিটি ইটের স্পন্দনে, আর তাদের ভালোবাসার শ্রেষ্ঠ ফসল জাইনার টলটলে চোখের মণিতে। জেনিন তো তার প্রতিটি নিশ্বাসে, তার ঘাড়ের ওপর রাখা অদৃশ্য ভারী হাতের স্পর্শে জড়িয়ে আছ, তবে সে কেন আজিমপুরের ওই ঠান্ডা মাটির বুকে জেনিনকে খুঁজতে যাবে?
সকাল নয়টা, নুরশাদ ভিলা। শিশিরবিন্দুগুলো মুক্তোর মতো চিকচিক করছে। এই শান্ত সকালের নিস্তব্ধতা খান খান করে ভেঙে দিচ্ছে একটি ছোট্ট প্রাণের চঞ্চল পদধ্বনি আর খিলখিল হাসির শব্দ।
“মিনিপাপা! তুমি পারবে না! আমি অনেক দ্রুত দৌড়াতে পারি!”
একটি পাঁচ বছর বয়সী ফুটফুটে মেয়ে শিশু বাগানের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে প্রজাপতির মতো ডানা মেলে উড়ছে। তার পরনে একটা হালকা গোলাপি রঙের ফ্রক, দুই পাশে দুটো ঝুঁটি করা। গায়ের রঙটা ঠিক জেনিনের মতো উজ্জ্বল ফর্সা, আর চোখ দুটো? সেই কুচকুচে কালো টলটলে মণি, যা দেখলে মুহূর্তেই জেনিন নূরশাদের দোর্দণ্ড প্রতাপী চোখের কথা মনে পড়ে যায়। তবে এই চোখে কোনো অন্ধকার নেই, আছে কেবল এক রাশ দুষ্টুমি আর মায়া।
মেয়েটির নাম জাইনা নুরশাদ। জেনিন আর নোবারার প্রেমেরই শ্রেষ্ঠ ফসল! জেনিন যাওয়ার আগে বলে গিয়েছিল তার রক্ত যেন অভাবের মুখে না পড়ে, আর আজ সেই রক্তের প্রতিটি বিন্দুতে রাজকীয়তা মিশে আছে।
ইউজি আজ আর দুর্ধর্ষ হিটম্যান বা জেনিনের ডান হাত নেই। সে এখন জাইনার মিনিপাপা। তার পরনে আগের মতোই কালো টি-শার্ট আর কার্গো প্যান্ট, কিন্তু চেহারায় এক ধরণের কোমলতা চলে এসেছে। যদিও তার চোখে এখনো সেই তীক্ষ্ণতা বর্তমান, কিন্তু জাইনার সামনে সে একদম নখদন্তহীন বাঘ।
ইউজি জাইনার পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতে হাফিয়ে উঠেছে। তার হাতে একটি ছোট দুধের গ্লাস আর একটা স্যান্ডউইচ।
“জাইনা মা! আর একটুখানি… এই তো শেষ চুমুক। তুমি না বলেছিলে আজ মাম্মাম এর সাথে অফিসে যাবে? দুধ না খেলে কিন্তু ভাবী তোমাকে নিয়ে যাবে না!” ইউজি হাঁপাতে হাঁপাতে বলল।
জাইনা একটা বড় আমগাছের পেছনে লুকিয়ে উঁকি দিল। তার মুখে বিজয়ের হাসি।
“মাম্মাম বলেছে আমি বড় হয়ে গেছি। বড়রা দুধ খায় না, বড়রা কফি খায়! তুমি কফি নিয়ে এসো, তবেই খাবো।”
ইউজি কপালে হাত দিয়ে ঘাসেই বসে পড়ল। এই মেয়েটার জেদ আর যুক্তি অবিকল জেনিনের মতো। জেনিন যেমন ঠান্ডা মাথায় মানুষকে বিপদে ফেলত, জাইনা ঠিক সেভাবেই মিষ্টি কথায় ইউজিকে নাজেহাল করে ছাড়ে।
“ভাইয়ের মেয়ে বলে কথা!” ইউজি মনে মনে বিড়বিড় করল।
তবে এতো কিছুর মাঝেও নীলিমার কথা মনে পড়লে আজও ইউজির বুকটা খা খা করে ওঠে। সে বিয়ের কথা ভাবেনি কোনোদিন। নীলিমার শেষ বিকেলের স্মৃতি আর জেনিন-নোবারার এই আমানত রক্ষা করাই এখন তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। ইউজি জাইনার দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসল।
জাইনার জন্ম হয়েছিল জেনিনের মৃত্যু’র সাত মাস পর। সেই দিনটির কথা ভাবলে আজও নোবারার শরীর শিউরে ওঠে। পুরো দেশ যখন জেনিন নুরশাদের পতন উদযাপন করছিল, নোবারা তখন হাসপাতালের বেডে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিল। জেনিন পাশে ছিল না, কিন্তু নোবারা অনুভব করত জেনিনের অস্তিত্ব। জাইনা যখন প্রথম পৃথিবীর আলো দেখল, ডাক্তার তাকে নোবারার কোলে দেওয়ার পর নোবারা অবাক হয়ে দেখেছিল, মেয়েটি একবারও কাঁদেনি। সে বড় বড় চোখ মেলে নোবারার দিকে তাকিয়ে ছিল!
জাইনার বড় হওয়াটা ছিল এক নিঃসঙ্গতার গল্প। সে খুব ছোটবেলা থেকেই বুঝতে পেরেছিল তার মা আর সবার মতো নয়। তার মা নুরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজের সেই কঠিন সম্রাজ্ঞী, যাকে দেখলে বড় বড় ব্যবসায়ীরাও কাঁপেন। কিন্তু রাতের বেলা সেই মা-ই যখন জাইনাকে জড়িয়ে ধরে তার পাপার গল্প বলে, তখন জাইনা শান্ত হয়ে শোনে।
জাইনা কখনো তার বাবাকে দেখেনি, কিন্তু সে জানে তার বাবা একজন সুপারহিরো ছিলেন। তার কাছে জেনিনের কারাগারে থাকা অবস্থায় লেখা চিঠিটা দেওয়া হয়েছিল, যখন সে পাঁচ বছর বয়সে পদার্পন করেছিল। চিঠির প্রথমেই তার পাপা তাকে সম্বোধন করেছিলেন, ‘পৃথিবীর সবচাইতে প্রিয় আগন্তুক’। সেটা দেখলেই জাইনার মন ভালো হয়ে যায়। নোবারা তাকে শিখিয়েছে, তার পাপা কোথাও হারায়নি, তিনি আকাশের ওই সবচাইতে উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে তাকে পাহারা দিচ্ছেন। জাইনা মাঝেমধ্যে আকাশের দিকে হাত নেড়ে বলে,
“পাপা, দেখো আমি আজ মিনিপাপাকে হারিয়ে দিয়েছি!”
বাংলোর দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে নোবারা নিচের এই দৃশ্যটা দেখছে। তার পরনে এখন লিনেন শাড়ি, চোখে সোনালী ফ্রেমের চশমা। পাঁচ বছরে নোবারা অনেক বেশি গম্ভীর আর ব্যক্তিত্বময়ী হয়ে উঠেছে। সে আর জেনিন এর আবেগী প্রেমিকা নেই। নুরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজের প্রতিটি ইটের হিসাব এখন তার নখদর্পণে। নানামি আর তনুজা মাঝেমধ্যে আসে দেখা করতে, কিন্তু নোবারার জগৎ এখন কেবল জাইনা আর জেনিনের ফেলে যাওয়া কাজগুলোকে ঘিরে। সে পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া নুরশাদ ভিলার উপর দ্বিতীয়বার ভিলা তৈরি করছে। এখানেই তার ভালোবাসার শুরু, এখানেই মাফিয়া জেড এর সাথে তার প্রণয় হয়, তার সংসার সবটা এখানে। সেই স্মৃতি ফেলে সে অন্য কোথাও থাকতো কি করে! পুনরায় নুরশাদ ভিলা তৈরি করতে তাকে নুরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজ এর প্রতিটি কর্মচারী সাহায্য করছে, ভিলার মাটিটুকু ফিরে পেতে কতবার আদালত এ দৌড়াদৌড়ি করতে হয়েছে তার। যদিও এই ভিলা তার তৈরি করা, জেনিনের আন্ডারগ্ৰাউন্ড মেডিকেল চেম্বার, অস্ত্র রাখার ঘর কিছুই নেই, এই বাড়ি কেবল শিল্পপতি জেনিন নুরশাদ এর, মাফিয়া জেড এর কোন অস্তিত্বই আর নেই এখানে। সবকিছু নোবারা আর ইউজি মিলে সুন্দর করে সাজিয়েছে কেবলমাত্র তাদের জাইনা মামুনির জন্য! সেইসব দিন নোবারা কখনো ভুলে নি। ব্যস, জেনিন যদি ফিরে আসতো! তবে তার আর হয়তো কোন দীর্ঘশ্বাস পড়তো না!
নিচে তাকিয়ে নোবারা দেখল ইউজি জাইনাকে ধরতে না পেরে ঘাসের ওপর শুয়ে পড়ার নাটক করছে। অমনি জাইনা সব দুষ্টুমি ভুলে দৌড়ে ইউজির কাছে চলে গেল।
“মিনিপাপা! কি হয়েছে? ব্যাথা পেয়েছো?” জাইনার গলায় টলটলে উদ্বেগ।
ইউজি খপ করে জাইনার হাত ধরে ফেলল।
“ধরে ফেলেছি! এবার দুধটা খেতে হবে।”
জাইনা ঠোঁট ফুলিয়ে তাকিয়ে রইল। তারপর মুচকি হেসে বলল,
“তুমি তো চিটিং করেছো মিনিপাপা। ইউ ব্যড বয়!”
বারান্দা থেকে নোবারা মৃদু হাসল। এই ছোট্ট হাসিটাই তার বেঁচে থাকার রসদ। জাইনা নুরশাদ, নামটা রাখার সময় নোবারা অনেক ভেবেছিল। জেনিন চেয়েছিল তার সন্তান যেন জেনিন নুরশাদের পরিচয় নিয়ে বড় হয়। আর জাইনা? সে কেবল জেনিনের মেয়ে নয়, সে এই ধ্বংসস্তূপ থেকে জেগে ওঠা এক নতুন আশার নাম।
রোদের তেজ একটু বাড়তেই বাগানের খুনশুটি এবার ড্রয়িংরুমের ভেতর আছড়ে পড়ল। নোবারা ওপর থেকে নিচে নেমে আসতেই দেখল ড্রয়িংরুমের কার্পেটের ওপর এক এলাহি কাণ্ড। ইউজি মেঝেতে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে, আর তার পিঠের ওপর সওয়ার হয়ে আছে জাইনা। সে ইউজির কান ধরে ঘোড়ার মতো লাগাম টানার ভঙ্গি করছে।
“মিনিপাপা! জোরে চলো! মাম্মাম নিচে চলে এসেছে, আমাদের এখনই পালাতে হবে!” জাইনার খিলখিল হাসিতে পুরো ঘর গমগম করছে।
জাইনা ইউজিকে মিনিপাপা বলে ডাকে। জেনিনের আকাশছোঁয়া শূন্যতা পূরণ করতে না পারলেও, ইউজি তার জীবনে ছায়ার মতো লেগে থাকা একজন মানুষ, যাকে সে বাবার ছোট সংস্করণ মনে করে। ইউজি ও এখন নোবারাকে আর ম্যাম বলে ডাকে না, নোবারাই মানা করছে এই পেশাদারি সম্বোধন ছাড়তে। যে ইউজি কে স্বয়ং জেনিন নুরশাদ নিজের ভাই বলে পরিচয় দিয়েছেন, তাকে কি করে সে ম্যাম ডাকতে দেয়। যদিও ড্রামাকুইন ডাকতে দেওয়া যায় না, কারণ নোবারা এখন সেই চঞ্চল হরিণী নেই যে কথায় কথায় ইউজির সাথে ঝগড়া লাগাতো। বরং সে এখন বড্ড পরিণত হয়েছে, বড় ভাইয়ের বউয়ের মতোই লাগে তাকে। তাই ইউজি ভাবী বলেই সম্বোধন করে নোবারাকে।
নোবারা সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে হাত ভাঁজ করে গম্ভীর হওয়ার ভান করল।
“জাইনা! ইউজির ওপর থেকে এখনই নামো। ও ঘোড়া নয়, ও মানুষ।”
জাইনা ঝটপট ইউজির পিঠ থেকে নেমে দৌড়ে এসে নোবারার শাড়ি জড়িয়ে ধরল। মুখটা কাঁচুমাচু করে বলল,
“মাম্মাম, মিনিপাপা নিজেই ঘোড়া হতে চেয়েছিল। আমি তো শুধু রাইড দিচ্ছিলাম। তাই না মিনিপাপা?”
ইউজি মেঝ থেকে উঠে ধুলো ঝাড়ল। তার কপালে ঘাম, কিন্তু মুখে এক তৃপ্তির হাসি। সে জাইনাকে এক ঝটকায় কোলে তুলে নিল। জাইনা ইউজির গলা জড়িয়ে ধরে নোবারার দিকে তাকিয়ে জিভ ভ্যাঙাল।
“ভাবী, অযথা ওকে বকছেন” ইউজি জাইনার গাল টিপে দিয়ে বলল। “আমাদের বন্ডিংটা তো আপনি বুঝবেন না। ও আমার সবচাইতে প্রিয় বন্ধু।”
ইউজি হঠাৎ জাইনাকে একটু উঁচুতে তুলে ধরে নোবারার দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত আবদার করে বসল। তার গলায় ঠাট্টা থাকলেও চোখে ছিল এক ধরণের গভীর মায়া।
“বলছিলাম ভাবী, এই একটা বাচ্চা সামলাতে সামলাতে আমার অভ্যাস হয়ে গেছে। আমি কিন্তু এখন আরেকটা বাচ্চা নেওয়ার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত।”
নোবারা কফি মগটা হাতে নিতে গিয়েও থমকে গেল। সে অবাক হয়ে ইউজির দিকে তাকাল।
“কী আবোলতাবোল বলছো? তোমার তো বিয়েই হয়নি, বাচ্চা নেবে কোথা থেকে?”
ইউজি শব্দ করে হাসল। সে জাইনার নাকে নিজের নাক ঘষল।
“এই যে জাইনা, ও তো আমারই বাচ্চা। আমার জীবনের সবটুকু সময় ওর জন্য বরাদ্দ। এখন ওর সাথে খেলার জন্য আরেকটা পিচ্চি জেনিন বা নোবারা তাড়াতাড়ি আনুন। জাইনা একা একা বোর হয়ে যাচ্ছে।”
নোবারার ফর্সা গাল দুটো মুহূর্তের জন্য হালকা লাল হয়ে উঠল। জেনিনের কথা মনে পড়ে গেল তার। জেনিনও ঠিক এভাবেই মাঝেমধ্যে তাকে অপ্রস্তুত করে দিত। কিন্তু নোবারা এখন আর সেই আগের মতো কাঁচা মেয়েটি নয়। সে নিজের ভেতরের সেই লজ্জাটুকুকে এক ঝটকায় কঠোরতার চাদরে ঢেকে ফেলল। সে গলার স্বর কিছুটা নিচু করে চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করল।
“ইউজি, ফালতু কথা অনেক হয়েছে। তোমার এই মিনিপাপা ইমেজটা এখন আলমারিতে তুলে রাখো। আর জাইনা, মাম্মাম কী বলেছে? দশটার ভেতর রেডি হতে হবে। আজ নুরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজের অ্যানুয়াল মিটিং, তুমি আর ইউজি দুজনেই আমার সাথে অফিসে যাচ্ছো।”
জাইনা উল্লাসে হাততালি দিয়ে উঠল।
“ইয়েই! আমি আজ মাম্মামের বড় চেয়ারে বসব!”
নোবারা মৃদু হেসে জাইনার কপালে একটা চুমু খেল। “হ্যাঁ, তুমি বড় চেয়ারে বসবে আর ইউজি তোমার সিকিউরিটি গার্ড হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। এবার যাও, চটপট তৈরি হয়ে নাও।”
ইউজি জাইনাকে নিয়ে সিঁড়ির দিকে এগোতে এগোতে হাসিমুখে বিড়বিড় করল,
“ভাবী যতই রেগে যাওয়ার ভান করুক, বসের জিনের দাপট কিন্তু ওনার রক্তেও মিশে গেছে।”
নোবারা ড্রয়িংরুমের জানালার দিকে তাকাল। বাইরে বাগানের এক কোণে জেনিনের পছন্দের কৃষ্ণচূড়া গাছটা ফুলে লাল হয়ে আছে। তার মনে হলো, জেনিন থাকলে হয়তো আজ ইউজির সাথে সুর মিলিয়ে বলত, “নূরা, ইউজি ঠিকই বলছে। আমাদের সাম্রাজ্য বড় হচ্ছে, এবার উত্তরাধিকারীও বাড়াতে হবে।”
নোবারা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বিরহ তার নিত্যসঙ্গী, কিন্তু এই ছোট ছোট খুনশুটিগুলোই তাকে প্রতিদিন নতুন করে বাঁচার শক্তি দেয়। সে মগটা নামিয়ে রেখে নিজের ব্যাগটা হাতে নিল। আজ অনেক কাজ। জেনিন যে শিখর তৈরি করে দিয়ে গেছে, নোবারাকে সেই শিখর ধরে রাখতে হবে।
<><><><><><><><><>
নুরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজের প্রধান ফটক দিয়ে যখন নোবারার কালো মার্সিডিজটি প্রবেশ করল, তখন ঘড়ির কাঁটায় ঠিক দশটা। বিশ তলা এই বিশাল কাঁচের ভবনের সামনে দুই সারিতে কর্মকর্তারা দাঁড়িয়ে আছেন। পাঁচ বছর আগে জেনিন নূরশাদের মৃত্যুর পর এই প্রতিষ্ঠানটি যখন প্রায় ধ্বংসের মুখে ছিল, তখন এই কর্মকর্তাদের চোখে ছিল অবিশ্বাস। কেউ ভাবেনি একজন সিআইডি অফিসার, যার হাতে কখনো কেবল ফাইল আর পিস্তল থাকত, সে জেনিনের গড়ে তোলা এই বিশাল ও জটিল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের হাল ধরতে পারবে।
গাড়ি থেকে প্রথমে নামল ইউজি। তার পরনে এখন ইতালিয়ান স্যুট, কানে ছোট একটি ব্লুটুথ হেডসেট। এক সময়ের দুর্ধর্ষ ফাইটার আর হ্যাকার আজ নূরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজের চিফ অপারেটিং অফিসার (COO)। সে গাড়ি থেকে নেমেই পেছনের দরজা খুলে ধরল। নোবারা যখন বেরিয়ে এল, পুরো চত্বরে এক পিনপতন নীরবতা নেমে এল। নোবারার পরনে আজ গাঢ় নেভি ব্লু রঙের একট শাড়ি, চোখে জেনিনের মতোই সোনালী ফ্রেমের চশমা।
গাড়ি থেকে সবশেষে লাফিয়ে নামল জাইনা। তার হাতে একটা ছোট আইপ্যাড, আর পরনে নোবারার শাড়ির সাথে মিলিয়ে করা ছোট একটা ফ্রক।
লিফটে করে বিশ তলার সিইও রুমের দিকে যাওয়ার সময় নোবারার চোখের সামনে ভেসে উঠল গত পাঁচ বছরের হাড়ভাঙা খাটুনির দিনগুলো। জেনিন চলে যাওয়ার প্রথম ছয় মাস ছিল নরকের মতো। শেয়ার বাজারে দরপতন, জেনিনের অপরাধ জগতের শত্রুদের ক্রমাগত হুমকি, আর কোম্পানির ভেতরের কিছু বিশ্বাসঘাতক, সব মিলিয়ে নোবারা যখন প্রায় ভেঙে পড়েছিল, তখন ইউজি এসে পাশে দাঁড়িয়েছিল।
নোবারাকে তার সিআইডির তীক্ষ্ণ বুদ্ধি কাজে লাগাতে হয়েছিল প্রতি মুহূর্তে। সে তার ইনভেস্টিগেটিভ মাইন্ড ব্যবহার করে বের করেছিল কোম্পানির কোন স্তরে দুর্নীতি হচ্ছে। যে হাত একসময় ফাইল নাড়ত, সেই হাত এখন ব্যালেন্স শিট আর গ্লোবাল টেন্ডার নাড়াচাড়া করে। সে জেনিনের সেই ডার্ক মানি বা অপরাধের টাকাগুলোকে সম্পূর্ণ আলাদা করে ফেলেছিল। সে চেয়েছিল জেনিনের ইন্ডাস্ট্রি যেন কেবল জেনিনের হালাল উপার্জনেই টিকে থাকে। একসময় যে নোবারা বিসনেস মিটিংয়ে ঘাবড়ে যেত, আজ সে লনডন বা দুবাইয়ের নামী সব সিইও-দের সাথে চোখে চোখ রেখে দরদাম করে।
অন্যদিকে ইউজি নিজেকে পুরোপুরি বদলে ফেলেছে। তার হ্যাকিং স্কিল এখন ব্যবহার হয় কোম্পানির সাইবার সিকিউরিটিতে। তার সেই ক্ষিপ্রতা আর লড়াই করার ক্ষমতা এখন ব্যবহার হয় কর্পোরেট যুদ্ধ সামলাতে। সে আজ আর জেনিনের বডিগার্ড নয়, সে এই সাম্রাজ্যের সুরক্ষা প্রাচীর।
সিইও রুমের দরজা খুলতেই জাইনা দৌড়ে গিয়ে জেনিনের বিশাল বড় চামড়ার চেয়ারটায় গিয়ে বসল। চেয়ারটা তার তুলনায় এত বড় যে তাকে মাঝখানে বসা অবস্থায় ছোট একটা পুতুলের মতো লাগছে।
“মাম্মাম! আজ আমি এখান থেকেই সব অর্ডার দেব!” জাইনা গম্ভীর গলায় জেনিনকে নকল করার চেষ্টা করল।
নোবারা তার ডেস্কের সামনে দাঁড়িয়ে এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। ওই চেয়ারটা… ওটা জেনিনের পছন্দের ছিল। আজও মনে হয় জেনিন ওখানেই বসে ভ্রু কুঁচকে ফাইল দেখছে, নয়তো কড়া একটা কফি খেতে খেতে রোলিং চেয়ারটায় ঘুরছে! কত শত বার এই অফিসে পিএ অথবা সিইওর স্ত্রী হয়ে ঠিক এই চেয়ারে জেনিনের কোলে বসে ছিল সে! কত আবেগ স্মৃতি লুকিয়ে আছে এই কেবিনকে ঘিরে! নোবারার বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল। সে দীর্ঘশ্বাস চেপে ইউজির দিকে তাকাল।
“ইউজি, আজকের জাপানি ক্লায়েন্টদের সাথে মিটিংটা আধা ঘণ্টা পিছিয়ে দাও। ওদের প্রেজেন্টেশনে কিছু টেকনিক্যাল ভুল আছে, ওটা আগে কারেক্ট করো।”
ইউজি ফাইলটা চেক করে মাথা নাড়ল।
“ঠিক আছে। কিন্তু জাইনাকে কে সামলাবে? ও তো আপনার ফাইলে ড্রয়িং শুরু করেছে।”
নোবারা তাকিয়ে দেখল জাইনা অত্যন্ত মন দিয়ে একটা ইমপোর্ট লাইসেন্সের পেছনের পাতায় জেনিন, নোবারা আর ইউজির একটা ছবি আঁকছে। জেনিনের ছবিটা সে সবার বড় করে এঁকেছে, যার মাথায় একটা মুকুট।
“জাইনা, মাম্মামকে একটু কাজ করতে দাও তো সোনা” নোবারা জাইনার পাশে গিয়ে আলতো করে তাকে জড়িয়ে ধরল। জেনিনের গায়ের পরিচিত ঘ্রাণটা যেন আজ জাইনার ছোট ছোট চুলে লেগে আছে।
জাইনা মুখ তুলে তাকাল।
“মাম্মাম, পাপা কেন অফিসে আসে না? পাপা কি ফাঁকিবাজ?”
নোবারার চোখের কোণটা চিকচিক করে উঠল। সে জাইনার কপালে চুমু খেয়ে ফিসফিস করে বলল, “পাপা আমাদের সব কাজ দেখছে সোনা। তুমি যদি শান্ত হয়ে থাকো, পাপা খুব খুশি হবে।”
জাইনা মাথা নাড়ল এবং তার আইপ্যাড নিয়ে সোফায় গিয়ে বসল। ইউজি একপাশে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখছিল। তার মনে পড়ল জেনিনের শেষ বিকেলের কথা। জেনিন তাকে বলেছিল নোবারাকে আগলে রাখতে। আজ এই পাঁচ বছর পর ইউজি অনুভব করছে, সে আসলে কেবল নোবারাকে নয়, সে জেনিনের অমর স্বপ্নটাকে আগলে রেখেছে।
দুপুর গড়াতেই মিটিং শুরু হলো। নোবারা যখন বড় কনফারেন্স টেবিলের মাথায় বসে জাপানি প্রতিনিধিদের সাথে দক্ষ ইংরেজি আর জাপানিজ ভাষায় কথা বলছিল, তখন পাশের গ্লাসের দেয়ালের ওপাশ থেকে ইউজি দেখছিল, একজন সিআইডি অফিসার কীভাবে আজ একজন গ্লোবাল বিসনেস আইকন হয়ে উঠেছে। নোবারা প্রতিটি শব্দ খুব মেপে বলে, তার যুক্তির কাছে বড় বড় এক্সপার্টরা মাথা নত করে। জেনিন যেমন ঠান্ডা মাথায় দাবা খেলত, নোবারা আজ কর্পোরেট জগতে ঠিক সেই দাবার চালটাই চেলে যাচ্ছে।
মিটিং শেষ হওয়ার পর নোবারা যখন তার রুমে ফিরল, তখন সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিল না। সে জেনিনের সেই চেয়ারটায় হেলান দিয়ে চোখ বুজল। এসি-র ঠান্ডা বাতাসেও তার কপাল ঘামছে। জেনিন নেই, কিন্তু তার রেখে যাওয়া এই বিশাল দায়িত্বের বোঝা নোবারাকে প্রতিদিন তিলে তিলে পোড়ায়। বিরহের আগুন নোবারাকে ছাই করেনি, বরং তাকে ইস্পাত করে তুলেছে।
ইউজি এক কাপ কফি নিয়ে ভেতরে এল। সে কফিটা টেবিলের ওপর রেখে শান্ত গলায় বলল,
“ভাইয়ের ওপর অভিমান করবেন না। তিনি জানতেন আপনি এটা পারবেন। এই যে জেনিন নুরশাদকে মানুষ আজও ভোলেনি, তার কারণ আপনি। আপনি ওনার নামটাকে অপবিত্র হতে দেননি।”
নোবারা কফির মগটা হাতে নিয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে শহরের উঁচু দালানগুলো দেখল। আজ থেকে পাঁচ বছর আগে এই শহরের এক উঁচু তলা থেকে জেনিন শূন্যে ঝাঁপ দিয়েছিল। নোবারার মনে হলো, জেনিন মরে গিয়েও আসলে মরে যায়নি। সে বেঁচে আছে এই নুরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজের প্রতিটি লাভে, ইউজির বিশ্বস্ততায় আর জাইনার নিষ্পাপ হাসিতে।
“ইউজি,” নোবারা খুব নিচু স্বরে বলল,
“আজ কেন জানি মনে হচ্ছে জেনিন খুব কাছে আছে। মনে হচ্ছে ও আমার ঘাড়ের ওপর ওর ভারী হাতটা রেখেছে।”
ইউজি জানালার বাইরে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
“ভাই সবসময়ই আমাদের সাথে আছে। শুধু আমাদের দেখার চোখ থাকতে হয়।”
জাইনা তখন সোফায় ঘুমিয়ে পড়েছে। তার ছোট হাত থেকে আইপ্যাডটা খসে পড়েছে মেঝের ওপর। নোবারা এগিয়ে গিয়ে জাইনাকে কোলে তুলে নিল। তার রাজকীয় উত্তরাধিকার আজ তার কোলে ঘুমিয়ে আছে। বিরহ, সংগ্রাম আর সাহসের এই যে পাঁচ বছরের দীর্ঘ পথ, তা আজ এক নতুন সার্থকতা খুঁজে পেল। জেনিন নূরশাদ হয়তো আজ মৃত, কিন্তু তার সাম্রাজ্য নোবারার নেতৃত্বে আজও এই পৃথিবীর বুকে দর্পের সাথে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
চলবে ইংশাআল্লাহ।।।।।।।।।।।।।
(বুদ্ধিমানের জন্য ইশারায়ই যথেষ্ট। হিহিহি!🌚)

