কাছে_আসার_মৌসুম! #নুসরাত_সুলতানা_সেঁজুতি (২৯-ক)

0
2

#কাছে_আসার_মৌসুম!

#নুসরাত_সুলতানা_সেঁজুতি

(২৯-ক)

সূর্য তখন আকাশের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে। হালকা কমলা আলোয় পরিষ্কার চারিপাশ । নরম রোদের তাপ গিয়ে ঠিকড়েছে বস্তির টিনের চালে। সাতটা বাজতে না বাজতেই নিত্যদিনের মতো কলপাড়ে একটা লম্বা লাইন আজও লেগে গেল। একটু পর বড়ো কলসীটা কোমরে নিয়ে আস্তেধীরে এসে দাঁড়ালেন হাসনা। গত দু-তিন মাসে বেশ শুকিয়েছেন প্রৌঢ়া। চেহারার অবস্থা করুণ। আগের চেয়েও শীর্ণ হয়েছে শরীর। অবসন্ন চোখমুখ দেখে বোঝা যায়, কত রাত যেন ঘুমোননি তিনি। হাসনাকে দেখেই সবাই এক যোগে তাকাল। সিরিয়াল দিতে দিতে বিরক্ত হওয়া মুখগুলোয় বদল এলো অমনি। মাহফুজা বেগম সবার সামনে ছিলেন লাইনের। বালতিটা প্রায় অর্ধেক ভরেছে। অথচ সেটাকে টেনে সরিয়ে দিয়ে বললেন,

“ লন খালা,আপনে আগে পানি লন।”

হাসনা কিছু বলতে গিয়েও পারলেন না। কেশে উঠলেন খুকখুক করে। রীতিমতো মাথা-বুক ধরিয়ে দেয়া কাশি। তিন্নির মা বলল,

“ আপনের জ্বর অহনো কমেনাই চাচি?”

আঁচলে মুখ চেপেই দুপাশে মাথা নাড়লেন হাসনা। উত্তর না!

রহিমা বেগম এগিয়ে এলেন সহসা। হাসনার কপালে হাত পড়তেই আঁতকে উঠলেন। আর্তনাদ করে বললেন,

“ ও আল্লাহ! কী জ্বর। এই শইলে পানি নিতে আইছেন ক্যান?”

হাসনা রুগ্ন, ভাঙা গলায় বললেন,

“ তয় কেডা নিবো? আমার তুশিতো আর নাই এইহানে।”

বাকিদের চোখমুখে পরিবর্তন এলো। থমথমে জায়গা ভরল গম্ভীরতায়। তুশি যাওয়ার পর হাসনার আহাজারি,একাকীত্ব, আর প্রতিটা দিন ওকে হন্য হয়ে খোঁজার চাক্ষুষ প্রমাণ তারা। মেয়েটা ওদের অপছন্দের হলেও,হারিয়ে যাক চায়নি। তারওপর হাসনা ভালো মানুষ। বস্তির কেউ বিপদে পড়েছে,অসুস্থ হয়েছে আর হাসনা পাশে থাকেননি এমন ঘটনা বিরল। বৃদ্ধার এই দুঃখে তাই ওরাও পাশে থাকছে। যে যেভাবে পারছে সাহায্য করছে টুকটাক। কিন্তু নাতনি অন্তঃপ্রাণ মানুষটার শোক একটুও তাতে লাঘব হচ্ছে কী?

প্রত্যেকে চুপ রইলেও তিন্নির মায়ের জিভ তেতে উঠল। খুব রুক্ষ ভাষায় বললেন,

“ নাই, আর আইবোও না। আপনে বেহুদা ওরে খুঁইজ্জা মরতাছেন,আর নিজের শইলডাও খারাপ বানাইতাছেন। আরে বাপ,গেলেন তো টিনটিন গো কতা হুইনা থানায়,লাভ কিছু হইল? তুশির মতো মাইয়ারে কি কোনোদিন থানার বড় বাবু বিয়ে করতে পারে? এইডা কি কোনোদিন সম্ভব?”

হাসনার চোখ ভিজে যায়। অসহায় কণ্ঠে বলেন,

“ তাইলে আমার নাতিন ডায় কই গেল কও! ও তো আমারে ছাইড়া কোতাও কুনোদিন থাহে না।”

“ ওই দিন কি আর আছে, চাচি? মাইয়া মানুষ বড়ো হইলে পাকনা গজায়৷ তুশিরও গজাইছে। শোনেন, হয় ওই মাইয়া কারোর লগে ভাগছে,আর নাইলে কোনো মাইনষের পকেট কাটতে গিয়া ধরা খাইয়া হাজত খাটতাছে। আপনে ওর আশা ছাইরা দেন তো।”

হাসনার বুক কেঁপে উঠল জেলের কথা শুনে। একবার তো থানায় দিন পার করে এসেছিল মেয়েটা। আবার কী? কিন্তু কোন থানায়! আর কতদিন কোথায় কোথায় খুঁজবেন ওকে! দূর্বলতা আর চিন্তায় বৃদ্ধার মাথা চক্কর কাটে। ঢলে পড়তে গেলেই ধড়ফর ধরে ফেললেন রহিমা।

“ কী হইল খালা,শইল খারাপ লাগে?”

তিন্নির মা দুপাশে মাথা নাড়লেন। হতাশ কণ্ঠে বললেন,

“ আপনেরে দেখলে আমার খারাপ লাগে চাচি। নাতনির লইগা দিন-দুনিয়া চুলায় উঠাইয়া কই কই ঘোরেন! সারাদিন কাম কাইজ ফালাইয়া রাস্তাগাট খোঁজেন। আরে বাপ, ও আইলে এই দুই মাসেই আইতো। আর কিছু না হইলেও মোবাইল করতো। ওর কাছে তো মোবাইল আছে। কিন্তু করে তো নাই। অহন ওর চিন্তা থুইয়া নিজের এট্টু যত্ন লন।”

রহিমা ধমকালেন,

“ আহা,তুমি থামবা? দেখতাছো অসুস্থ মানুষ, তার মইধ্যে এইসব বাইক্কা প্যাচাল। তুমি তোমার বালতি ভইরা যাও এন্তে।”

তিন্নির মা মুক বাঁকালেন।

“ হ যাইতাছি। তোমার আলগা দরদ এট্টু বেশিই। আমার বাপ অত পিরিত নাই!”

কল পাড়ের এক পাশে কেটেকুটে, ছেচে রাখা গাছ ছিল। রহিমা, আছিয়া আরো একজন মিলে হাসনাকে ধরে ধরে বসালেন সেখানে। আছিয়া মাথার তালুতে পানি দিলেন। কাপড় দিয়ে বাতাস করতে করতে বললেন,

“ খালা,হুনতে খারাপ লাগকেও তিন্নির মার কতায় কিন্তু ভুল নাই। একবার ভাইবা দেখেন,তুশিতো হারাই যাওয়ার মাইয়া না। রাস্তাঘাটে ও যেমনে চলে,যেই ব্যাডা মাইনষের মতো চাইল চলন ওর, ওরে কাবু করা সহজ কাম না। আমার মনে হয় ও নিজ থেইকাই পলাইছে।”

রহিমা বললেন,

“ কী যে কও তুমি! ও কার লগে পলাইব? পোলাগো লগে প্রেম কইরা ভাগার মাইয়া কি ওয়? ওয় এসবের আশপাশ দিয়াও যায়? ওরে কিছু কইলে ও উলটা দশটা গালি দিতো। আমার মনে হয় ওর কোনো বিপদ হইছে। নাইলে হইতে পারে তিন্নির মার পরের কতা ঠিক। ও কোনো হাজতে আছে।”

তৃতীয় জন বললেন,

“ তাইলে কি তুশি আর কুনোদিন আইব না?”

হাসনার নিঃশ্বাস থেমে আসে এ কথায়। সবেগে হাতটা চেপে ধরে বললেন,

“ ও কতা কইও না। আমার বুরে আমি চিনি। ও আমারে থুইয়া যাইবে না। আমার মন বলতাছে ও আইব। আবার আইব আমার কাছে।”

বলতে বলতে চোখের জল ছেড়ে দিলেন বৃদ্ধা। ভেতরটা ব্যথায় মুচড়াচ্ছে। আজ তুশির জন্মদিন। পুরোপুরি বিশের কোঠায় পা রাখতো মেয়েটা। ইস,কোথায় গেল ও? বাপ মা ছাড়া বড়ো হওয়া মেয়েটা,যার পাতে কোনোদিন হাসনা নিজের যোগ্যতায় একটু মাংসও দিতে পারেননি! না কখনো ওকে একটা ভালো জামা পরাতে পেরেছেন। যখন যা দিয়েছেন,মেয়েটা সোনামুখ করে নিয়েছে। কখনো বলেনি,দাদি আমার এটা চাই, ওটা চাই। হায় রে,

আজকের এই দিনে মেয়েটা ভালো কিছু কি পাচ্ছে? ওর মুখে একটু পায়েস দেয়ার মতো কেউ আছে তো?

****

সকালে তুশির যখন ঘুম ভাঙল বাড়িময় তখন বিরিয়ানির কড়া ঘ্রাণ ম ম করে ঘুরছে। ও তড়াক করে উঠে বসল। নাক টেনে বড়ো শ্বাস নিয়ে ভাবল,

“ বিরিয়ানি! হু কুক? কী গন্ধ মাইরি! খিদে একেবারে হেড অবধি কাম করে যাচ্ছে।”

“ আবার উল্টোপাল্টা ইংরেজি শুরু করলে তুশি!”

তুশি চট করে পাশ ফিরল। ইউশা এ কাত থেকে ও কাত ফিরে শুয়েছে। অমনি সতর্ক চোখে গোটা ঘর দেখল সে। এ বাবা,ও কি রাতে ইউশার ঘরেই ঘুমিয়ে পড়েছিল? হায় রে সর্বনাশ! ওই খচ্চুরে মহিলা দেখলে তো বাড়ি মাথায় তুলবে। শুধু শুধু বকা খাবে ইউশা। তুশি তাড়াহুড়ো করে বিছানা থেকে নামল। এক পা বাড়ানোর আগেই ঘরে ঢুকলেন রেহনূমা,

“ ইউশা উঠে…”

তুশি সামনে পড়তেই থমকালেন তিনি। কথাটুকু অসম্পূর্ণ রইল। মসৃণ কপালে ভাঁজ ফেলে বললেন,

“ এ কী, তুমি এ ঘরে কী কোরছো?”

ইউশার ঘুম শেষ। মায়ের কণ্ঠ শুনে ধড়ফড় করে উঠে বসল অমনি।

রেহনূমা ওকেই শুধালেন,

“ ও কি কাল এখানে ঘুমিয়েছিল?”

ইউশা মাথা নাড়ল। রেহনূমা কিছু বলবেন, পূর্বেই দাপুটে গলায় জবাব দিলো তুশি,

“ হ্যাঁ, ঘুমিয়েছি। কেন, কী হয়েছে তাতে?”

বিস্ফোরিত চোখে তাকালেন তিনি।

“ তোমাকে আমি জিজ্ঞেস করিনি। বেয়াদব মেয়ে! এক ফোঁটা আদব কায়দা নেই।”

“ ওসব আদব কায়দা বড়োলোকদের জিনিস। আমি দিয়ে কী করব?”

ইউশা মিনমিন করে বলল,

“ মা,ওকে কাল আমিই বলেছিলাম এখানে থেকে যেতে। অনেক রা…”

মাঝপথেই ধমকালেন রেহনূমা,

“ তুই চুপ কর। তোকে আমি বারণ করেছিলাম না ওর সাথে এত না মিশতে? পড়াচ্ছিস, পড়াবি ব্যস ওইটুকু। বিছানায় তুলবি কেন? এই মেয়ে বিছানায় ওঠার যোগ্য নাকি!”

“ মা!”

ইউশার চ্যাঁচানোটা রেহণুমা গায়ে নিলেন না। সামান্যতম বদলাল না মুখচোখ। কিন্তু আজকে হয়ত তুশির ভ্রুক্ষেপ এলো না এসবে। ঠোঁটটা একদিকে নিয়ে কেমন বিদ্রুপ করে হাসল একটু। তেজি পায়ে বেরিয়ে গেল তারপর। রেহনূমার মাথা জ্বলে উঠল রাগে। খেকিয়ে বললেন,

“ দেখলি, ওর হাঁটার অবস্থা দেখলি! যেন আমার রাগ ওর পায়ের ওপর ঝাড়ল। অসভ্য!”

“ তোমারই বা কী দরকার ছিল ওকে এসব বলার? সব সময় ওর সাথে এমন করো কেন তুমি?”

“ তোকে এত কথা বলতে হবে না। চুপচাপ তৈরি হয়ে নিচে আয়। সবাই অপেক্ষা করছে।”

ইউশা ঠোঁট টিপে বসে রইল। মেয়ের ফোলাফোলা মুখটা দেখে এতক্ষণে হাসলেন রেহণুমা। কাছে এসে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,

“ আজ আমার মেয়ের জন্মদিন। দেখতে দেখতে কত বড়ো হয়ে গেলি রে, মা। এইত সেদিন ওটি রুমে একটা তোয়ালে মোড়ানো বাবু নার্স আমার চোখের সামনে ধরে বললেন,

‘ আপনার মেয়ে।’

দিন কত তাড়াতাড়ি যায়।”

পরপরই মেয়ের মাথায় চুমু খেয়ে বুকে টেনে নিলেন রেহনূমা। ইউশা চুপটি করে মিশে রইল সেখানে। ও জানে, মা এখন কাঁদবে। এই যে শেষ দিকে মায়ের গলা ধরে এসেছে,ওইটুকু লুকোতেই মা ওকে বুকে জড়িয়ে নিলেন। ইউশার ভেতরটা ককিয়ে উঠল নীরব এক বেদনায়। দুহাত দিয়ে মায়ের কোমর জড়িয়ে রাখল। কারো মুখে কথা নেই,শুধু চোখের কোণে নিস্তব্ধ এক ব্যথা। যা চাইলেও কাউকে দেখানো যায় না।

ঘরের ভেতরে মা-মেয়ের মমতাভরা ওই দৃশ্যটা, পর্দার ফাঁক গলে চেয়ে চেয়ে দেখল তুশি। ইউশা কী সুন্দর মায়ের আদর খাচ্ছে। ওকে বুকে নিয়ে নিরন্তর মাথায়, পিঠে হাত বোলাচ্ছেন রেহনূমা। বিমর্ষ চিত্তে ঢোক গিলল তুশি। নিজের হাতটা তুলে মাথায় রাখল। নিজেই চুলে বোলাল দুবার। বিড়বিড় করে বলল,

“ শুভ জন্মদিন, তুশি। দেখতে দেখতে কত বড়ো হয়ে গেলি তুই। এই তো সেদিন জন্মালি, দুনিয়ায় এলি। কিন্তু আমাকে পেলি না। আজ আমি থাকলে তোর জীবনটা তো অন্যরকম হতো বল! কপালটা এত পোড়া কেন তোর?”

***

তুশির নীরস মন নিচে এসে ভালো হয়ে গেল। গোটা বাড়ি ফুল দিয়ে সাজানো হচ্ছে দেখে। বসার ঘরে একটাও ফার্নিচার নেই। সব সরিয়ে বিশাল এক জায়গা বের করা হয়েছে। সদর গেটটাও ইউ শেইপ করে ফুল দিয়ে সাজাচ্ছে কয়েকজন। সাইফুল আজ অফিসে যাননি। শওকতও বসে থাকলেন না ঘরে। দু ভাই মিলে এটা-ওটা নিয়ে ছোটাছুটি করছেন। রান্নাঘর থেকে শব্দ আসছে অনেক! ওখানেও নিশ্চয়ই আয়োজনের কমতি নেই। তুশি নিজে থেকেই এসবের কারণ বুঝে নিলো। আজ ইউশার জন্মদিন তো,তাই। কিন্তু বেহায়া চোখজোড়া ঘুরিয়ে ভিন্ন কাউকে খুঁজল সে। খুব ফরসা,শক্ত একটা মুখ। যেখানে মিষ্টি কথা নেই। এক ফোঁটা নম্রতা নেই। তাও তুশি খুঁজল। বুকের কোষগুলোও ছটফট করে উঠল তাকে দেখার আশায়। অথচ ওর তো একটু হলেও রাগ করার কথা। কাল যেভাবে নিষ্ঠুরের মতো বিটকেলটা ওকে ঘর থেকে বার করে দিলো, তুশির তো এসবই করা উচিত! কিন্তু পারছে না কেন? প্রেমে পড়লে বুঝি মানুষ নির্লজ্জও হয়? তার ভাবনার মাঝেই কোত্থেকে ছুটে এলো মিন্তু। একটা শক্ত কাগজ বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

“ ভা.. সরি সরি!”

তারপর সতর্ক চোখে আশপাশটা দেখল মিন্তু। ভুল করে মুখ থেকে ভাবি বেরিয়ে যাচ্ছিল। না, মেজো ভাইয়া নেই৷ হাঁপ ছাড়ল সে। বলল,

“ বাঁচলাম। এই তুশিপু, দেখো তো কার্ডটা কেমন হয়েছে! ইউশার জন্যে বানিয়েছি।”

তুশি সাগ্রহে হাতে নেয়। কার্ডের ভেতরে একটা কার্টুন আঁকা। মেয়েটার মাথায় ছ-সাতটা চুল। কুড়ালের মতো দাঁতকপাটি ঠোঁট থেকে বেরিয়ে এসেছে। নিচে লেখা – হ্যাপি বার্থডে রাক্ষসী!

তুশি হেসে ফেলল। জিজ্ঞেস করল,

“ এটা কি ইউশা?”

উচ্ছ্বসিত চোখে মাথা নাড়ল মিন্তু। বলল,

“ ওকে আমার চোখে এমনই দেখতে। কেমন হয়েছে বলো!”

তুশি ঠোঁট চেপে হাসছে। বলল তাও,

“ সুন্দর। ইউ আর টোলেন বয়!”

“ আরে ওটা ট্যালেন্ট। আর কথাটা ট্যালেন্টেড।”

“ এত শক্ত কথা আমার মুখে আসে না।”

“ আচ্ছা যাক গে। আমি এখন যাই। লুকিয়ে রাখি। ও যখন গিফট চেয়ে চেয়ে পাগল হয়ে যাবে তখন দেবো। তারপর যা একটা লুক দেবে না আমাকে। তাড়াও করতে পারে। মজা হবে না?”

উত্তরের অপেক্ষাও ছেলেটা করল না। দুরন্ত পায়ে চলে গেল দৌড়ে। ছোটোখাটো ছেলেটার দিকে চেয়ে চেয়ে তুশির হাসিটা মুছে গেল হঠাৎ। বিদীর্ণ দীর্ঘশ্বাসের ঝুলি ঠিকড়ে এলো বুক হতে। ইস,আজ যদি ওরও একটা ভাই থাকতো! ভাই তো দূর,ওর জন্যে সৃষ্টিকর্তা কাউকেই রাখলেন না। কিন্তু আজকাল তুশির মন একদিকে খেই হারিয়ে ফেলছে। ভুল করে স্বপ্নের রাজ্যে এনে বসিয়েছে একজনকে। সার্থ! কিন্তু মেয়েটা জানে সার্থের মনের কোথাও ও নেই। সার্থ ভাবেও না ওকে নিয়ে। ভাববেই বা কেন? কোথায় সে আকাশের চাঁদ,আর তুশি মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা সামান্য বামুন। ওদিকে হাত বাড়ানোর সাধ্য ওর আছে? মন কীভাবে চলে গেল ও জানে না। তুশি চেয়েও মনের রাশ টানতে পারেনি। কিন্তু সে বোঝে,একটা বস্তির মেয়ে যে কিনা এর-ওর পকেট থেকে টাকা চুরি করতো তার সার্থকে চাওয়ার যোগ্যতা নেই। তুশি তো পেতেও চাইছে না। সার্থ ভালোবাসুক, না বাসুক ও বাসবে। এইভাবে নীরবে,চুপিচুপি সারাজীবন ভালোবাসবে। মেয়েটার ধ্যানের সুতো ছিঁড়ল অয়নের ডাকে।

“ এই তুশি,এদিকে এসো।”

নড়েচড়ে, চপল পায়ে এগোলো সে। অয়ন একটা টুলের ওপর দাঁড়িয়ে। পায়ের কাছে কতগুলো ফুল। সেসব দেখিয়ে বলল,

“ এখন থেকে একটা একটা করে ফুল দাও আমাকে। মিন্তুটা এত ফাঁকিবাজ না! কাজের কথা বলতেই পালিয়েছে।”

“ আচ্ছা, আমি দিচ্ছি।”

ফুলগুলো ভীষণ সতেজ। টসটসে লাল গোলাপগুলো দেখেই তুশির মন ভালো হয়ে গেল। এক থোকা হাতে নিয়ে বলল,

“ এগুলো কি আপনাদের বাগান থেকে আনা?”

“ না তো, কেনা। কেন?”

“ খুব সুন্দর! এখনো গায়ে শিশির লেগে আছে। আমার গোলাপ যে কী ভালো লাগে!

ফুলের ওই স্নিগ্ধ পাপড়িতে তুশির মুগ্ধ নজরজোড়া অয়ন মন দিয়ে দেখল৷ পরপরই তাড়া দিয়ে বলল,

“ আচ্ছা, এখন তাড়াতাড়ি দাও। আ’ম অলরেডি গেটিং লেইট।”

তুশি তৎপর থোকা ভরতি গোলাপ বাড়িয়ে দেয়। ঠিক তক্ষুনি চৌকাঠ মাড়িয়ে বাড়ি ঢুকল সার্থ। একদম নাক বরাবরের ওই চিত্রটায় চোখ যেতেই পা জোড়া আপনা আপনি থামল তার। স্বভাবসুলভ ভাঁজ বসল ভ্রুতে। মাথায় এলো গতকাল সকালের কথা। বাগানে অয়ন তুশিকে ফুল দিচ্ছিল,আর আজ তুশি। সার্থ নিচের ঠোঁট দাঁতে পিষে চেয়ে রইল কিছু পল। পরপরই মাথা নাড়ল দুপাশে। যেন উড়িয়ে দিলো এসব। বরাবরের মতো ভারি স্বরে ডাকল,

“ অয়ন!”

ঘাড় ঘুরিয়ে চাইল সে। ফিরল তুশিও। সাথে সাথে শিরদাঁড়া সোজা করে ফেলল। সার্থ এগিয়ে এলো। অয়ন বলল,

“ এনেছো? চাচ্চু কতবার যে তোমার কথা জিজ্ঞেস করলেন!”

“ হ্যাঁ৷ লিস্ট মিলিয়ে দ্যাখ।”

অর্কিড সহ সাজগোজের কিছু জিনিসপত্র কম পড়েছিল। সেসবই আনতে গেছিল সার্থ। সব কিছু টেবিলে নামিয়ে রাখার পরেও,আরও একটা প্যাকেট দেখা গেল হাতে। অয়ন কৌতূহলে শুধাল,

“ ওটাতে কী?”

সার্থ হাতের দিকে দেখল৷ তারপর ঠান্ডা, আড়চোখে একপল তুশির পানে চাইল। মেয়েটার বিমোহিত চাউনী তটস্থ হলো সহসা। থতমত খেয়ে সরে গেল আরেকদিক।

দু শব্দে জবাব দিল সার্থ,

“ কেক।”

“ কেক? বাইরে থেকে আনা কেক? ছোটো মা তো ইউশার জন্যে নিজের হাতে কেক বানায়, ভাইয়া। তুমি আবার আনলে যে!”

“ এমনি। তুই তোর কাজ কর।”

সার্থ চলে গেল। একদম সোজা গিয়ে ঢুকল রান্নাঘরে। পুরোটা পথ চেয়ে রইল তুশি। অয়ন ফের ডাকল,

“ তুশি?”

নড়ে উঠল ও,

“ হু?”

“ দাও। থোকা না, একটা একটা করে দাও। লাগাতে সুবিধে হবে।”

ইউশা হাজির হলো কিছু সময় পর। গায়ে টুকটুকে লাল জামা। সাজগোজ শূন্য। তুশি-অয়নকে দেখে সোজা এখানে এসে দাঁড়াল ও। অয়ন ওকে দেখেনি। ইউশা ফিসফিস করে বলল,

“ আমি দিই?”

তুশি মুচকি হেসে মাথা নাড়ল। ফুলগুলো ওর হাতে দিয়ে বিদেয় নিল আস্তে করে।

অয়ন কাজে ব্যস্ত। ওভাবেই বলল,

“ বাড়িতে তো আজ অনুষ্ঠান। তুমি এখনো তৈরি হওনি যে!”

ইউশার নিভু স্বর,

“ কী পরব?”

অয়ন বলল,

“ শাড়ি পরবে। শাড়ির মতো সুন্দর পোশাক আর আছে?”

তারপর ওপাশ ফিরেই মাথা নুইয়ে হাসল অয়ন। চোখের পর্দায় ভেসে উঠল সেদিনের সেই মূহুর্ত। প্রথম বার তুশির শাড়ি পরে ওর সামনে এসে থামা।

কিন্তু অধৈর্য চিত্তে প্রশ্ন করল ইউশা,

“ তোমার শাড়ি অনেক পছন্দ অয়ন ভাই?”

চমকে পিছু ফিরল ছেলেটা। হোচট খেল ইউশাকে দেখে। তাড়াহুড়ো করে তাকাল চারিদিক। ইউশা বলল,

“ কাকে খুঁজছো?”

অয়ন নিজেকে সামলায়। হেসে মাথা নাড়ে দুপাশে। ইউশার অত-শত ভাবার ইচ্ছে নেই। অয়ন কাছে থাকলে বিশ্ব ভুলে যায় সে। হেসে ফুল বাড়িয়ে দিলো মেয়েটা। অয়ন নিষ্প্রভ চিত্তে নিলো, টানেলে লাগাতে লাগাতে আরেকবার দেখল আশপাশ। দু মিনিটেই কোথায় গেল তুশি?

তুশি রান্নাঘরের দরজার এক কোণে এসে দাঁড়িয়েছে। মাথাটা নুইয়ে উঁকি দিয়ে দেখছে ভেতরে। এ বাসায় নতুন বুয়া রাখা হয়েছে একজন। রেশমীর মতোই কম বয়সি মেয়ে,নাম আসমা। রেশমীর মা অসুস্থ! মাস কয়েকেও তার ফেরার সম্ভাবনা নেই। আসমার সাথেই কথা বলছিল সার্থ। ভীষণ গুরুতর ভঙ্গিতে বোঝাচ্ছে কিছু। তুশি শুনতে না পেলেও,ওর মনোযোগ তাতে নেই। উঁকিঝুঁকি দিয়ে মেয়েটা কেবল সার্থ কেই দেখছে। পরনে সাদা শার্ট! খোচা খোচা দাঁড়িগুলো নতুন করে ট্রিম করিয়েছে বোধ হয়। উফ! তারওপর জিম করা শরীর। একেবারে তুশির স্বপ্নের সালমান খান। মেয়েটা দুহাত বাড়িয়ে বিড়বিড় করল,

“ সারকি যো সারসে বো ধীরে-ধীরে,

পাগাল হুয়া রে ম্যায় ধীরেধীরে…

আচমকা দেখল সার্থ আসছে। সঙ্গে সঙ্গে সোজা হয়ে রোবটের মতো দাঁড়াল মেয়েটা। যেন ও কিছু জানেই না। পৃথিবীতে ওর মতো ভদ্র দুটো নেই। সার্থের মুখভঙ্গি একই। তুশিকে দেখেছে,কিন্তু চেহারায় প্রভাব পড়েনি। পাশ কাটাতে গিয়েও, থামল হঠাৎ। ফিরে চেয়ে বলল,

“ শোনো?”

তুশির কাছে এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ডাক। তড়িৎ চোখ তুলল মেয়েটা। সার্থ পকেটে দু হাত গুঁযে দাঁড়াল। একটু হলেও মুগ্ধতার তোড়ে অন্তঃপটে ধাক্কা লাগল তুশির। অথচ সার্থ বলল,

“ তোমার মুক্তির দিন আসছে। লেট স্টার্ট দ্য কাউন্টডাউন।”

তারপর চলে গেল সে। তুশি আগামাথা কিছুই বোঝেনি। হতবুদ্ধি বনে চেয়ে চেয়ে ভাবল, কীসের মুক্তি? কোনোভাবে কি সার্থ ওকে তালাক দেয়ার কথা বোঝাল?

চলবে..

লেখা শেষ করতে পারিনি। বেশি বড়ো হয়ে যাচ্ছিল। পর্ব খ শীঘ্রই পাবেন❤️

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here