কথা_দিলো_রোদ্দুর (১) #তুসিকা

0
2

অর্থি তুই যে মো’টা তোকে এই জামা পড়লে মানাতো না,আর বিশেষ কথা আমি আর নিপা তো সারা মার্কেট খুঁজেছি কিন্ত তোর সাইজের ম্যাচিং কোন জামা পায়নি,, সরি অর্থি! তুই বরং অন্য কিছু পরে আয়, আমরা তোকে সাজিয়ে দিবো যা!!

মাহার কথায় অর্থি মুখটা নিচু করলো, চোখ ঘুরিয়ে তাও দেখে নিল রুমে থাকা সবাই কে,, নিপা, মাহা, ফারিন, ফাহা এবংকি ছোট জুন ও সাজ গোছ করতে ব্যস্ত। অথচ তারা বুঝতেই পারলো না মাহার এমন কথা গুলো অর্থির বুকের ভেতর কেমন করে বিঁধে গেছে, ঠোঁটের কোণে জোর পূর্বক হাসি রেখে কিছু বলবে তার আগেই নিপা কড়া মেজাজে বলল;

—” তিশা আপুর এন্ট্রি ডান্স কিছুক্ষণ পরেই শুরু হবে, ফারিশ এসে দুই তিন বার ডেকে ও গেছে, এমনিতেই তুই তো এন্ট্রি তে থাকবি না, কিন্ত তোকে সাজাতে গিয়ে যদি আমাদের দেরী হয়, তখন তিশা আপু আমাদের উপর চিল্লাচিল্লি করবে,, কি হলো ভুতুমের মতো দাঁড়িয়ে আছিস, যা,,,

মাহা পর্যন্ত ঠিকই ছিল, কিন্ত নিপার কথায় চোখ দুটো ছলছল করে উঠলো অর্থির,,,

“আজ অর্থির মেজো খালার মেয়ে তিশা আপুর বিয়ে। অর্থি,মা আর ছোট ভাই এসেছে বিকেলের পর। এসে অনেক টা অবাকই হয়, অর্থি যতদূর জানতো তিশা আপুর বিয়েটা নাকি ছোট করেই হবে, কিন্ত আয়োজন দেখে মোটেও মনে হচ্ছে না, কোনো ছোটখাটো আয়োজন। বিয়ের উপলক্ষে বড় খালারা, বড় মামা, মেজো মামা, ছোট মামারা সবাই আগেই চলে এসেছিল। আর মাহা, নিপা, ফারিন, ফাহা এরা হলো অর্থির খালাতো আর মামাতো বোন,, এরা নাকি দুদিন আগে থেকেই এখানে থেকে কি কি প্রোগ্রাম হবে, কিভাবে কি করবে সব ঠিক করে নিয়েছে। কিন্ত অর্থি এসবের কিছুই জানে না, আর জানবেই কেমন করে ওরা কখনোই অর্থি কে তেমন একটা গুরুত্ব দেয় না। অর্থি ও ইনট্রোভাট, তাই বলা যায় কাজিন মহলে অর্থি.বরাবরই চক্ষুশূল একটা বস্তুর মতো থাকে।

তাই তো বিয়ে উপলক্ষে তিশা আপু নাকি সবার জন্য ম্যাচিং জামা এনেছে, সেটা ও জানে না। জামা গুলো আনার দায়িত্ব মাহা আর নিপার উপর ছিল, তাদের সবার শারীরিক গঠন সমান হওয়ায় সমস্যা হয়নি কিন্ত যত সমস্যা বাধে অর্থির বেলায়,, সে মো’টা এটা তো অজুহাত মাত্র,, নিপা, মাহা, ফারিন এরা নিশ্চয়ই তার গায়ের মাপের কোনো জামা হবে কিনা খুঁজেই দেখেনি।

আর দেহের গঠনের দিকে একটু বেশি হওয়ায় প্রতিদিন এমন কোনো না কোনো কথা তাকে শুনতে হয়,, আর এটা শুধু তিশা আপুর বিয়ে যে এমন নয়, এর আগে ও দুবার অর্থির সাথে এমনটা হয়েছে। কিন্ত এবার নাকি সবার জন্য একই জামা এনেছে, কেউ বাদ যায়নি সে তালিকা থেকে। না চাইতেও এসেছিল জামা চাইতে কিন্ত প্রতিবারের ন্যায় এবারের ও অর্থির ধারনা ভুল হলো।

জামা তো দূর! উল্টো তার শারীরিক গঠন নিয়ে মন্তব্য করতে দুবার ভাবলো না তারা। অর্থি প্রথমেই ভেবে ছিল যখন সবার সাজ শেষ হয়ে যাবে তখন নিজের পছন্দ সহিত একটা জামা পড়ে হলুদের প্রোগ্রামের ওখানে যাবে।

তাই অর্থি এতক্ষণ মা খালাদের রুমেই বসে ছিল চুপটি করে,, এতদিন পর একসাথ হয়ে মা খালারা নিজেদের কথায় এমন মশগুল হলো যে, তারা ছাড়া জলজ্যান্ত একটি মেয়ে তাদের রুমে রয়েছে সে ধ্যান হলো না কারোরই। কিন্ত বিপত্তি ঘটায় ফারিশ নামক ডানপিটে ছেলেটি। বাকি ভাইদের সাথে ফারিশ ও নিজ দায়িত্বে অটল। তাই ছোট খাটো বিষয় গুলো তার চোখে পড়ছে অনায়াসে।

বড় খালা সাজেদা বেগমের ছেলে ফারিশ, অর্থির থেকে বড় জোর তিন বছরের বড়, তবে অর্থি তাকে নাম ধরেই ডাকে, বলতে গেলে কাজিন মহলে ফারিশের সাথেই সেই জড়তা ভেঙে টুকটাক কথা বলে। তাই তো মায়ের কাছে ফোন নিতে আসায় অর্থি কে যখন দেখে সে এখনো তৈরি হয়নি, তখন ধমক দিয়ে বসে।

—” এই তুই এখনো তৈরি হোসনি, আটা ময়দা মাখতেই তোদের একঘন্টা লাগে,মাহাদের এই তিন বার গিয়ে ডেকে আসলাম তারা তৈরি হয়নি, তুই কখন তৈরি হবি। যা মাহা র কাছে তোদের ম্যাচিং জামা আছে, সেটা পড়ে তাগড়া করে ছাদে আয়।

তখন আরকি ফারিশের কথায় সবার চোখ যায় অর্থির উপর। অর্থির মা রেবেকা তো তার উপর বেশ বিরক্ত। ধমক ও দেয় অর্থির এমন কান্ডে, তাই আরকি সবার কথা শুনে যায় মাহা দের কাছে। কিন্ত সেখানে গিয়ে মনটা পুরোই খারাপ হয়ে যায় অর্থির।
সে মানছে বাকিদের তুলনায় শরীরগত দিক থেকে সে একটু বাড়ন্ত। তাই বলে কথায় কথায় মো’টা বলে কটাক্ষ করবে। তার ও তো ইচ্ছে হয় সবার সাথে হইহুল্লোর করতে, সবাই যেমনটা সাজে তেমন করে সাজতে, সবাই যখন গ্রুপ করে নাচে, ছবি তুলে, এক সাথে একই ফ্রেমে ছবি তোলে,, তার ও ইচ্ছে হয়। কিন্ত প্রতিবারই সে মো’টা, দেখতে ওভার সাইজ এটা বলে মনটা বিষিয়ে দেয়, পরে তার আর ইচ্ছে গুলো পূরণ করা হয়না।

তাই তো এখন ও মাহা আর নিপা র কাছ থেকে এমন কথা শুনে দাঁড়ালো না আর তাদের মাঝে, ধীর পায়ে বেরিয়ে এলো ঘর থেকে। অন্য কোথাও না গিয়ে সে যে ঘরে থাকবে সেখানে গেল।

—” নিপা আপু তুমি এমন করে কেন বলেছো, দেখো অর্থি আপু নিশ্চয়ই অভিমান করেছে,,
ফাহা নিপার এমন ব্যবহার দেখে মোটেও খুশি হয়নি, তারা তো অনেকদিন আগে থেকে প্ল্যান করছিল, কিন্ত অর্থি কে কিছু বলেনি, এখন আবার তার শরীর নিয়ে এমনটা বলায় ফাহা র কেমন একটা খারাপ লাগছে, তাই ছোট্ট জুন কে পাঠালো অর্থি কোথায় আছে তা জানতে।

জুন ও ফাহা র কথা মতো অর্থির পেছনে গেল, কিন্ত তাকে দেখতে না পেয়ে গেল ফুফুর ঘরে, সেখানে গিয়ে দেখলো অর্থি নেই, চলে আসতে নিবে তখন সাজেদা বেগম বললেন, অর্থির তো তাদের ঘরে থাকার কথা কিন্ত জুন তাকে এখানে কেন খুঁজছে।
তাই ছোট্ট জুন সবটা বলে;

—” জানো ফুফু,অর্থি আপুর জন্য জামা ম্যাচিং হয়নি, তাই আপু মন খারাপ করে চলে এসেছে। ফাহা আপু তো ডাকতে বলেছে, কিন্ত আপু তো নেই, এখন আমি তাকে কোথায় পাবো বলো তো।

জুনের কথা শুনে অর্থির মায়ের বুঝতে অসুবিধে হলো না কি হয়েছে,, তার গায়ের মাপের জামা পায়নি বোধ হয়,, এই নিয়ে অর্থির মা নিজেই বিরক্ত। তিনি গিয়ে দেখবেন ভাবলো, কিন্ত তিনি গেলে মেয়েটাকে আরো বকাঝকা করবেন এই নিয়ে, তাই সাজেদা বেগম বোন বসতে বলে নিজেই গেল অর্থি কে দেখতে।

______

“কি হলো অর্থি তুই সাজলি না কেন, প্রোগ্রামে যাবি না,,

অর্থির ফুফুতো বোন যুথি ফোন করেছে, যেখানে মানুষের মায়ের দিকে কাজিনদের সাথে ভাব বেশি থাকে, সেখানে অর্থির বাবার দিকে কাজিন দের সাথে ভাব বেশি,, সবাই নয়! কিছু কিছু মানুষ, যেমন যুথির সাথে তার অনেক ভাব। অর্থি ও মন খুলে যুথিকে নিজের সব কথা বলতে পারে। তাই তো মন খারাপ থাকায় অর্থি যুথি কে ফোন দেয়।
নিজের দুঃখ প্রকাশ করে তার কাছে। যুথির রাগ হয় তাদের উপর। তারা মানুষের ব’ডি সে’মিং করে কি মজা পায় কে জানে। তবু ও অর্থি কে বোঝায়।

—” পড়িস না ওই জামা, আমার বোনটা কে যে কোনো জামায় এমনিতেই সুন্দর লাগবে। তারপর উৎসুক হয়ে বলে, “” তুই অলিভ কালারের জামা টা পড়, ওটায় তোকে বেশ মানায়,,,

এরপর নিজেকে হালকা করে,যুথির কথায় ওই জামাটা পড়তে নেয়, কিন্ত দরজায় শব্দ হলে, খুলতে গিয়ে দেখে সাজেদা বেগম দাড়িয়ে আছে। হাতে একটি প্যাকেট!

অর্থি কে দেখে তিনি এগিয়ে এলেন আর বললেন;
—” কি হয়েছে আমার আম্মাটার,, এখনো তৈরি হয়নি কেন!

সাজেদা বেগমের কথায় অর্থি কিছু বলল না, চুপ করে মাথা নত করে রাখলো। অর্থি র আবার একটা স্বভাব আছে, অভিমান করে থাকা অবস্থায় কেউ যদি তার সাথে আদুরে ভাবে কথা বলে তখন তার ভীষণ কান্না পায়। একদম নাক ফুলিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদবে।
তাই সাজেদা বেগমের এমন আদুরে ডাকে ঠোঁট চেপে রাখলো,, তবে সাজেদা বেগম বুঝলেন অর্থির অবস্থা, তাই বেশি কিছু না বলে প্যাকেট থেকে একটি শাড়ি অর্থির সামনে মেলে ধরলেন। আর বললেন এখন এটি পড়তে।

অর্থির শাড়ি পছন্দের কিন্ত ওই যে মানুষ কাউকে বাজে মন্তব্য করতে দুবার ভাবে না, তাই সেভাবে কোনো অনুষ্ঠানে সে শাড়ি পড়ে নি,, তাই সাজেদা বেগম কে অজুহাত দিয়ে বলল;

—” খালামনি শাড়ির সাথে তো ম্যাচিং ব্লাউজ নেই, আর মাহা আপু রা তো জামা পড়ছে, দেখো আমি এই জামা পড়বো, এটায় আমাকে ভালো লাগবে,,

সাজেদা বেগম মিষ্টি হেসে বললেন;
–” ওরা জামা পড়ুক সমস্যা কি, তুমি এই শাড়ি পড়বে, আর ব্লাউজ ও আমি নিয়ে এসেছি, যা ও এখন এগুলো পড়ে আসো, পরে আমি তোমাকে শাড়ি পরিয়ে দেব।

অর্থি অনেক করে মানা করলো, কিন্ত সাজেদা বেগম শুনলো না। চোখ রাঙিয়ে তার হাতে ব্লাউজ পেটিকোট ধরিয়ে দিলেন,, অগত্যা অর্থি ওয়াশরুম থেকে ব্লাউজ পরে বেরিয়ে এলো, তার ভীষণ লজ্জা লাগছে, কাচুমাচু হয়ে গায়ে ওড়না টি যেন পুরো গায়ে ছড়িয়ে দিতে চাইছে।

অর্থির এমন অবস্থা দেখে হাসলেন সাজেদা বেগম, পরে সাজেদা বেগম ভালো করে তাকে শাড়ি টি পড়িয়ে দিলেন,, ভালো করে পিন দিয়ে আটকে ও দিলেন যেন খুলে না যায়।
অর্থির থুতনিতে হাত দিয়ে তিনি বললেন;
—” মাশাল্লাহ আম্মাটাকে অনেক সুন্দর লাগছে, যাও আর দেরী করো না সেজে ছাদে যাও, না হলে ফারিশ আবার বকাঝকা শুরু করবে।

সাজেদা বেগম ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। অর্থি তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো,, মানুষ বলে না মায়ের থেকে মাসির ধরদ বেশি। সাজেদা বেগমের ক্ষেত্রেও তাই। তিনি বড্ড ভালোবাসেন অর্থি কে। অর্থির মা যা প্রশয় দেন না, সাজেদা বেগম তা আরও বেশি করে করতে বলেন। সাজেদা বেগমের দুই ছেলে, তবে বাকি ভাই, বোনের ছেলে মেয়েদের থেকে অর্থির প্রতি তার ভালোবাসা টা যেন আলাদা ভাবে নজরে পড়ে।

সাজেদা বেগম রুম থেকে গেলে অর্থি আয়নার সামনে দাঁড়ালো,, সামুদ্রিক সবুজ রং বা ফিরোজা সবুজ রংয়ের শাড়িটিতে ভালো লাগছে, অর্থির সাদা সুন্দর গায়ে রং টি ফুটে উঠেছে,, তবু অর্থির নিজের কাছে খাপ ছাড়া লাগছে। তাই আঁচল সরিয়ে নিজের মেদ যুক্ত পেটের দিকে তাকালো। ছুঁয়ে দেখলো সেখানে।

ওজন এখন প্রায় আটাত্তর! সে চেষ্টা করছে, তবে প্রতিবারই মানুষের কথায় সাহস হারাচ্ছে বারবার। এসব ভেবে ভারী নিঃশ্বাস নিল। সাজ বলতে পাউডার, লিপটিন্ট, আর লাইনার। এতেই তৈরি হলো, কোমড় সমান চুল বেঁধে রাখবে না ভাবলে ও ছেড়ে দিল।
আর শেষ আয়নায় আরেকবার তাকিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে পড়ল।

সবাই তো জামা পড়েছে, এখন সেই শুধু শাড়ি পড়েছে, কে কি বলবে তা ভেবে একটু ভয় হতে লাগলো, নিপা, মাহা এরা নিশ্চয়ই হাসবে। নিশ্চয়ই তাকে মো’টা বলে সবার সামনে হাসির পাত্র বানাবে। কেন যে খালামনির কথায় শাড়ি খানা পড়েছে কে জানে।
এসব ভেবেই শাড়ির কুচি ধরে এগিয়ে যেতে লাগলো সামনে, নিজের ভাবনায় এতটাই মত্ত ছিল যে, সামনে থেকে মানুষ আসছে সেটা ও খেয়াল হলো না। তাই অবলীলায় বেখালে ধাক্কা খেল সামনে আসা ব্যাক্তিটির সাথে। সামনে ব্যাক্তিটি বোধ হয় ভীষণ ব্যস্ততার সাথে হাটছিল, তাই তো ধাক্কা খেয়ে দুজন দু পাশে ছিটকে পড়ে। অর্থি রেলিং এর পাশ ঘেঁসে পড়ে যার কারনে ব্যাথাতুর শব্দ করে ওঠে, আর নজর দেয় ধাক্কা খাওয়া ব্যাক্তিটির দিকে।

(চলবে)
#কথা_দিলো_রোদ্দুর (১)
#তুসিকা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here