#কথা_দিলো_রোদ্দুর (২৯)
#তুসিকা
দুপুর তিনটে বেজে ছাব্বিশ মিনিট…
লাঞ্চ টাইমের শেষ হওয়ায় এই সময় টাতে সাম্য একটু ফ্রি থাকে,, বিয়ে ঠিক হবার দিন থেকে এই চার পাঁচ দিন সাম্য এই সময়ে অর্থির সাথে টুকটাক কথা বলে কিন্ত আজ বেশ কয়েকবার কল দিয়েছে, মেসেজ ও দিয়েছে কিন্ত অর্থি কোনোকিছু তেই সাড়া দিচ্ছে না,,, সাম্য ভাবল কিছুক্ষণ কিন্ত ঝগড়া হওয়ার মতো কিছুই হয়নি,,,
তাই অর্থি কে ফোনে না পেয়ে রেবেকা বেগমের ফোনে কল দিল সাম্য।
দুই একবার রিং হতেই রেবেকা বেগম ফোন তুললেন,, সাম্য সালাম জানিয়ে ভালো মন্দ জিজ্ঞেস করলো,, সাম্য এখন ও রেবেকা বেগম কে আন্টি ই ডাকেন,,তাই সে অর্থির সাথে কথা বলতে চায় লজ্জার কারনে আর বলতে পারলো না,, তাই অর্থ র কথা জিজ্ঞেস করলো,, অর্থের সাথে কথা ও বলতে চাইলো। অর্থ তো সাম্য কে দুলাভাই হিসেবে পেয়ে মহা খুশি,, দুজনের আবার বনিবনা ভালো। তাই সাম্য অর্থ কে বলল;
—” অর্থ তোমার আপুর কি হয়েছে বলো তো! ফোন দিচ্ছি ধরছে না।
—” জানি না, আপু তো রুমেই আছে দাড়া ও দিচ্ছি আপুকে।
এই বলে অর্থ অর্থির রুমে গেল, অর্থি উপুড় হয়ে তখন মোবাইলে সিরিজ দেখছিল। অর্থ গিয়েই ফোনটা অর্থির মুখ বরাবর ধরে যাতে ওর মুখটা পুরোটাই দেখা যায় মোবাইলে।
সাম্য কে দেখেই অর্থি গাল ফুলিয়ে নেয়, যা দেখে সাম্য হাসে,, আর অর্থি কে ফোন টা ঠিক ভাবে ধরতে বলে আর একটু শাসনের সুরে বলে;
—” কি হয়েছে, তোমাকে এতবার করে ফোন দিচ্ছি ধরলে না,, আর এখন ফোন সামনে আছে তবু ও কথা ও বলছো না।
অর্থির তখন ও কিছু বলল না,, মুখটা কালো করে রইল। এতে সাম্য আবারও বলল;
—’ একটা মানুষের এত গোস্বা থাকতে পারে আল্লাহ! তোমাকে না দেখলে জানতাম না,, ভেবেছি কি শান্ত মেয়ে,, কিন্ত….
অর্থি আর টিকতে পারলো না,, তিথি র সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ল সাম্যের উপর,, গলা উচু করলো এই প্রথম,, অর্থি হয়ত তিথি র কথা সাম্য কে জানাতো ও না, কিন্ত রাগ বেরিয়ে আসলো আর সাম্য কে পুরো কথা শেষ না করতে দিয়ে বলল;
—” তো জানতে কে বলেছে,, জানা ও লাগবে না,,, যাদের পেছনে আগে ঘুরতেন তাদের নিয়ে থাকেন। আমার কি প্রয়োজন।
এই বলেই অর্থি ফোনটা কেটে দিল,, নিজের ভেতর দমানো রাগ না কষ্ট বুঝলো না,, তবে বিন্দু বিন্দু কান্না হয়ে বেরিয়ে আসলো চোখ দিয়ে। অর্থিদের মতো চুপচাপ থাকা মেয়েরা নিজেদের সব কিছু নিয়ে বেশি পজেসিভ থাকে,, খুঁটি নাটি সব কিছু নিয়ে তাদের আলাদা একটা যত্ন থাকে,,, তাই হয়ত তিথি বলা কথা গুলো তে সে ভীষণ কষ্ট পেয়েছে।
তাই এই প্রথম,, হ্যাঁ এটাই প্রথম অর্থি এমন ভাবে কথা বলল কারো সাথে। আর সেটা সাম্য যে নাকি দুদিন বাদে তার বর হবে।
তবে ফোনের অপর থাকা সাম্য হতবাক হলো,,
কি হলো বোঝার চেষ্টা ও করলো,,, আর মেসেজ দিল, কল দিল কিন্তু অপর পাশ থেকে কোনো উওর আসলো না।
তাই অর্থির বলা কথা মস্তিষ্কে ঘোরালো কয়েকবার। দুয়ে দুয়ে একদম ছয় মেলালো। আর যা বোঝার বুঝে দাঁতে দাঁত পিসলো।
তাই পুনরায় অর্থিকে ফোন দিল না,, সে জানে ফোন দিলে ও অর্থি কিছুতেই ধরবে না,, উল্টো ওই কারণেই হোক আরো অভিমান করে থাকবে।
তাই এঁকেবারে সন্ধ্যা হওয়ার অপেক্ষা করলো। আর অফিস ছুটির পর মুসাব কে সাথে নিয়েই গেল অর্থিদের বাসায়। যাওয়ার আগে অবশ্য রেবেকা বেগম কে ফোন করে জানিয়ে ই যায়, আর যাওয়ার সময় ফল, মূল, মিষ্টি এসব তো নিয়েই গেল, তার উপর নিজের অনুরাগী র জন্য গোলাপ ফুল সহ আরো কিছু জিনিস নিয়ে গেল অর্থর জন্য ও।
তবে সাম্য যার জন্য এখানে এসেছে তার ই দেখা নেই।
অর্থি তো বাইরে ই আসতে চাইলো না,, মাথা শান্ত হবার পর তার অনুশোচনা হলো, সাম্য তো সব বলেছে তার ব্যাপারে তাহলে ওই শাক’চুন্নি টা নিশ্চয়ই তাদের ভেতর গন্ডগোল বাধাতে এমন বলেছে। তাই জেলাসি আর বোকামি র জন্য সাম্যের সাথে যে ব্যবহার করলো তাতে তার সামনে যেতে তার ইচ্ছে করছে না।
তবে রেবেকা বেগম যখন ধমক দেন তখন মাথায় ওড়না দিয়ে মাথা নিচু করে রুমের দরজা বরাবর দাঁড়ায়। সালাম জানায়। এমনিতেই লজ্জা পাচ্ছিল তার উপর মুসাব তাকে বিয়ে ঠিক হবার দিন থেকেই ভাবী ডাকে যা শুনে অর্থির আরো লজ্জা লাগছিল। তাই দরজার সামনে পর্দার পাশেই দাঁড়িয়ে থেকে সাম্য কে আড়চোখে পরখ করছিল। যে কিনা রেবেকা বেগমের সাথে আর অর্থ র সাথে কুশল বিনিময় করছে।
তবে রেবেকা বেগম রান্নাঘরে যখন সাম্য আর মুসাবের জন্য নাস্তা আনতে যায় , তখন সুযোগ বুঝে সাম্য গিয়ে অর্থি কে গোলাপ ফুল গুলো আর টুকটাক যা জিনিস কিনে তা দেয়। আর বলে;
—” প্রেমিকা নয়,, বৌ হবে আমার তাই তুমি আমার ফাস্ট প্রায়োরিটি। তাই যাবতীয় সকল কিছু নিজের ভেতর চেপে না রেখে কি সমস্যা হচ্ছে বলবে আমাকে,, রাগ হলে আমার সাথে দেখাবে,, অভিমান হলে ও আমার সাথে করবে, ঝগড়া করতে মন চাইলে আমার সাথে করবে কিন্ত কে কি বলেছে সেসব কথায় কান দিয়ে যদি এমন ব্যবহার করো,, কথা বলা বন্ধ করো তাহলে কি করবো জানো…
অর্থি কিছু বলে না,, তখন সাম্য ওর কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলে;
—” বেশি কিছু না,, আদর করে তিন চার টা টুকুস টাকুস করে চুমু খাবো রাগ ভাঙতে,, আই থিংঙ্ক এটাই যথেষ্ট আমার ভীতুরানীর রাগ গলাতে।
কথাটা শুনে অর্থির শুভ্র গাল গুলো যেন রাঙা হয়ে উঠল। লোকটা এসব বলবে সে কল্পনায় ও আনে নি,, কি লজ্জা কি লজ্জা। তাই তো অর্থি সেখানে আর দাঁড়ালো না,, সোজা পেছন ফিরে রুমে চলে গেল। বুকে হাত দিয়ে রইল,, মনে হলো বুকের ভেতর ধড়াম ধড়াম শব্দ তুলছে।
লোকটাকে আগেই তার সুবিধের মনে হয় নি, এখন মনে হচ্ছে সত্যিই লোকটা সুবিধার নয়।
সাম্য অর্থির এমন লজ্জা পাওয়া দেখে মনে মনে হাসলো,, আর জাবের সাহেব অফিস থেকে ফেরা পর্যন্ত অপেক্ষা করলো,, জাবের সাহেবের সাথে টুকটাক কথা বলল। কিন্ত শত বলার পরেও রাতের খাবার পর্যন্ত সাম্য মুসাব অপেক্ষা করলো না,, বেরিয়ে পড়ল বাসা থেকে। তখনও অর্থি সামনে আসে নি,, তবে দেখা মিলল বারান্দা দিয়ে। সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল অর্থি । কিন্ত সাম্যের কাছে হাতে নাতে ধরা পড়ে যায়,, অগত্যা মুখ লুকাতে অর্থি এক প্রকার পালিয়ে রুমে চলে আসে। তবে যতই লুকাক অর্থি যে এখন সাম্যের কাছে ধরা পড়ে গেছে,, তাই হাজার লুকালে ও অর্থির যে সাম্যের হাত থেকে হাত রেহাই নেই। তাই সাম্যের দেওয়া গোলাপ গুলো হাতে নিল।
প্রেমের নয় এই ফুলে যেন সাম্যের ভালোবাসার আচ্ছাদন লেগে আছে,, তাই অর্থি ছুঁয়ে গেল। আর প্রাণ ভরে পরশ নিল সেই ভালোবাসাময় আচ্ছাদনের।
____________
সাম্য আর মুসাব তখন অর্থিদের বাসা থেকে বের হয়ে হেঁটে হেঁটে সামনের দিকে আসে। মুসাব তাকে রীতিমত ক্ষেপাচ্ছে,,
—”যে ছেলে এত লুকোচুরি করেছে অথচ সেই ছেলে কিনা প্রকাশ্যে শশুর বাড়ি গিয়ে হবু বউয়ের রাগ ভাঙায়ে আসে।
মুসাবের কথায় সাম্য ফিচেল হাসে আর মুসাবের কাঁধে হাত রেখে বলে;
—” এই জন্যই প্রেম করিনি,, প্রেম করা ঝামেলা,, ওই চোরের মতো প্রেমিকা কে দেখতে যাবো, পরে মেয়ের বাপ দেখতে পেলে উদম কেলানি দিবে,, তখন আবার মান সম্মান জোড়াতালি দেওয়া লুঙ্গির মতো রাস্তায় গড়াগড়ি খাবে। এসব রিক্স একদম নেওয়া যায় না যায়,, তাই একেবারে বৌ বানিয়ে নিলাম,,, যখন ইচ্ছা যাবো বৌ কে ও দেখবো আর শশুর বাড়ির থেকে রাজার মতো ট্রিটমেন্ট ও পাবো বুঝেছো!
—” হুম বুঝেছি… আপনি আমাদের থেকে দুকাঠি এগিয়ে…
___________
এভাবে মাঝের দিন কেটে যায় অবলীলায়,, আর এগিয়ে আসে সাম্য আর অর্থির বিয়ের দিন,, সাম্যের চাচা চেয়েছিল দুই দিন করে হলুদের প্রোগ্রাম, বিয়ে, বৌভাতের অনুষ্ঠান পালন করা হোক। এতে হয়ত বিয়ের দিন আরো দিন দুয়েক পেছানো হতো,, আর সাম্যের চাচা কথা গুলো সবার সামনেই বলেন,, তখন সাম্যের বাড়িতে সবাই বিয়ের ডালা সাজাচ্ছিল, সাম্যের চাচাতো ভাই বোন, খালা র বাড়ি থেকে খালাতো ভাই,, কিন্ত সাম্য এটা শুনে কোনো ভনিতা না করেই বলে;
—” চাচা যে বিয়েতে খরচ কম সে বিয়েতে বরকত বেশি,, তাই এসব ভুং জুং প্যাচাল না বাড়িয়ে যেভাবে বিয়েটা হচ্ছে এতেই সন্তুষ্ট থাকুন,,, খামাখা এত অনুষ্ঠান করে বিয়ে পিছিয়ে লাভ আছে বলুন।
সাম্যের এমন কথায় সবাই মুখ টিপে হাসলো,, সাম্য যে বিয়ে নিয়ে কতটা সিরিয়াস সেটা তার আচরনে সবাই অবগত। তাই সাম্য যেভাবে চাইছে সবাই সেভাবেই মেনে নিচ্ছে।
তবে মেয়ে র বিয়েতে কোনো কমতি রাখছে না জাবের সাহেব। নিজের যতটুকু সামর্থ্য আছে তাই দিয়ে ই বিয়ের সকল আয়োজন করছেন। আর সবাই কে ভালো করে দাওয়াত ও করেন যেন কোনো খামতি না থাকে মেয়ের বিয়ের জন্য। আর বিশেষ করে নিজের মেয়ের বিয়ের শাড়িটা তিনি নিজেই কেনার সিদ্ধান্ত নেন।
মেয়েকে যে জাবের সাহেব অনেক ভালোবাসেন,, মেয়ে ই তার সব,, যে মেয়েকে পেয়ে তিনি বাবা হবার প্রথম স্বাদ গ্রহন করেছেন,, যাকে তিনি কোলে পিঠে মানুষ করেছেন,, তার এই বিশেষ দিনের ওই টুকু খরচা তিনি নিজেই করতে পারবেন বলে জানান। তাই সাম্যের বাড়ি থেকে এই নিয়ে কেউ আপত্তি করেনি।
তাই তো বিয়ের কেনা কাটা করার সময় জাবের সাহেব নিজে পছন্দ করে অর্থির জন্য শাড়ি কিনেন। আর শাড়িটি ভারী সুন্দর হয়,, তাই তো শাড়ি, গহনা, এসব কিনে এনে জাবের সাহেব কিছুক্ষণ পর পর রুমে এসে সেগুলো দেখতে থাকেন। আর কল্পনা করেন এই জিনিস গুলো গায়ে জড়িয়ে মেয়ে তার বাবার কোল খালি করে অন্যের ঘর ভরা করতে যাবে।
এসব ভেবে জাবের সাহেবের চোখে পানি এলো আর টেবিলের উপর রাখা অর্থির ছোটবেলার ছবিটি হাত বাড়িয়ে তুলে নিলেন বুকে, ছবিটাতে ছোট অর্থি , মাথায় দুই ঝুটি করা, মুখ ভরা হাসি, আর পেছন থেকে জাবের সাহেবের গলা জড়িয়ে আছে। সেই মুহূর্তের কথা মনে পড়তেই ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। কিন্ত চোখ দুটো ভিজে উঠতে সময় লাগলো না।
—” কখন যে বড় হয়ে গেলি আম্মা,,
নিজের কাছেই ফিসফিস করে উঠলেন তিনি, বুকভরা একটা দীর্ঘশ্বাস নিলেন, তবে দরজা খোলার শব্দে চোখের পানি মুছে ছবিটা আগের জায়গায় রেখে দিলেন।
রেবেকা বেগম এসেছেন, আর রুমে ডুকতেই চোখ এক নিমিষেই গিয়ে থামলো জাবের সাহেবের উপর। ক্লান্ত আর কান্না মাখা মুখ দেখেই বুঝলেন স্বামীর মনের অবস্থা।
—” কি হলো, এভাবে একা বসে আছেন যে! বাইরে কত কাজ,, মেহেরাজ আপনাকে খুঁজছে। সাজানোর লোকেদের নাকি টাকা দিতে হবে।
রেবেকা বেগমের কথা শুনে জাবের সাহেবের গলাটা ভার হয়ে এলো, কিছুক্ষণ চুপ থেকে ধীরে বললেন;
—” আচ্ছা রেবেকা মেয়েরা এত তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যায় কেন বলতো! এই তো মনে হলো এই দিনই মেয়েটা হলো আর আমি কাঁপা কাঁপা হাতে মেয়েটাকে কোলে নিলাম। বুকে জড়িয়ে আদর করলাম। কিন্ত দেখ চোখের পলকে কেমন দিন চলে যায় তাই না। এখন মেয়েকে অন্যের হাতে তুলে দেবার সময় ও চলে আসলো।
রেবেকা বেগম জাবের সাহেবের পাশে বসলেন, কাঁধে হাত রেখে বললেন;
—” মেয়েটা এমনিতেই নরম,, বাবা ছাড়া কিছুই বোঝে না,,, এখন এই মুহূর্তে আপনিই যদি এমন আচরণ করেন মেয়ের তো আরো খারাপ লাগবে,, তাই হাসি খুশি থাকেন মেয়ের সামনে। দেখেন আমি ও তো মা,, খারাপ কি আমার কম লাগছে বলুন,, কিন্তু আমাদের তো মেয়ের সামনে ভালো থাকতে হবে বলুন। তাই দেখি চোখের পানি মুছুন,, আর চলুন।
রেবেকা বেগমের কথায় জাবের সাহেব নিজেকে ধাতস্থ হয়ে বাইরে গেলেন,, আজ তো হলুদের অনুষ্ঠান আর কাল বিয়ে। তাই বাকি যে কাজ গুলো করতে তিনি চলে গেলেন।
বিয়ে উপলক্ষে তো অর্থির ফুফুরা, মামারা, খালারা সবাই এসেছে,, শুধু নাশিদা বেগম রা কাল বিয়েতে আসবে বলে জানান। তারা সাম্যদের বাড়িতে ই গেছে। তবে ফাহা, ফারিন, জুন, আরশিয়া, মাহিয়া, এরা অর্থি কে নিয়েই মেতে আছে,, অর্থি পার্লার এ যাবে না,, সেটা হলুদ হোক বা বিয়ের দিন হোক। তাই ওরা মিলে অর্থি কে সাজিয়ে দেয় সুন্দর করে। অর্থির অবশ্য কেমন অদ্ভুত অদ্ভুত লাগছে। বিয়ে নামক পবিত্র একটা জিনিসে সে আবদ্ধ হতে যাচ্ছে। মনের ভেতর অদ্ভুত মিশ্রণ অনুভব হচ্ছে। তার থেকেও বেশি খারাপ লাগছে মা বাবা ভাই কে ছেড়ে থাকবে সেই জন্য। আর অর্থ ও বোনের সামনে তেমন পড়ছে না,, তার একটু মন খারাপ,, বোন তার শশুর বাড়ি চলে গেলে তো সে বাসায় একা,, কার সাথে ঝগড়া করবে,, আর কার সাথেই বা হাসি মজা করবে সেই ভেবে যতবার অর্থ র চোখ পানিতে ভিজেছে তত সে সবার আড়ালে গিয়ে চোখ মুছেছে।
কিন্ত বাকি সবাই বেশ মজা করছে,, একদমই ঘরোয়া অনুষ্ঠান সব আত্নীয়স্বজন রা শুধু আছে। আরশিয়া আর মাহিয়া মিলে অর্থি কে মেহেদী পরিয়ে দিচ্ছে,,, অর্থির ফুফাতো বোন যুথি ফারিন কে মেহেদী দিয়ে এখন জুনের হাতে মেহেদী দিয়ে দিচ্ছে। কিন্ত এত সব মেয়ের মাঝে ফারিশ আবার একা পড়ে গেছে। বেচারা অর্থির পাশে বসে বসে তাদের মেহেদী পড়ানো দেখছে।
আগের বারে তো মুসাব, নাঈম, সাম্য, মেহেদী, তানভীর, ইমরান সহ তারা একসাথে ছিল,, কিন্ত এখন সাম্যের বিয়ের জন্য বাকি ছেলে গুলো সাম্য দের বাড়িতে আছে। তাই ফারিশ মন মরা হয়ে বলল;
—” অর্থি তোদের হলুদ টা একসাথে করলেই ভালো হতো,, সবাই এক সাথে থাকতো, কত মজা করতে পারতাম।
এই কথা শুনে মাহিয়া ভাবী বলল;
—” তাহলে আগে বলতে, সাম্য কে বলতাম এখানে চলে আসতো, তখন অর্থির আর সাম্যের একসাথে হলুদ পড়াতাম।
ফাহা তখন উৎসুক,, সে তো এতক্ষণ সাম্য কে অর্থির বিভিন্ন ছবিই পাঠিয়েছে, তাই সে খুশিতে গদগদ হয়ে বলল;
–” এখন বলো সাম্য ভাই কে,, দেখবে ভাইয়া আপুর জন্য এখুনি চলে আসবে। দাঁড়াও আমি ভাইয়া কে ফোন দিচ্ছি।
এই বলে ফাহা সাম্য কে ফোন দিতে নেয়,, কিন্ত অর্থি মানা করে,, সাম্যের ঘাসফড়িং এর মতো যে তিরিংবিড়িং এর স্বভাব এতে দেখা গেল সত্যিই সত্যিই চলে আসবে।
তাই সাম্য কে আর ফাহা ফোন দিল না ,, তবে ফাহা বিবিসি নিউজের মতো নানা খবরাখবর ই দিল সাম্য কে। আর ফারিশ বোরিং ভাব কাটাতে আরশিয়ার পাশে বসে আর নিজেই আদর সোহাগ দিয়ে নিজের বউকে মেহেদী দিয়ে দেয়,,
আরশিয়ার বেশ লজ্জা লাগছিল সবাই আছে, বড়রা ও দেখছে ফারিশ এভাবে তাকে মেহেদী দিয়ে দিচ্ছে,, কিন্ত ওমা কিছুক্ষণ পর দেখে ফারিশের বড় ভাই লাবীব এসে ও মাহিয়া ভাবীকে মেহেদী পরিয়ে দেয়। বলতে গেলে তারা নিজেরাই হাসি মজা করে কাটায় হলুদের সময় টা। আর এইভাবেই রাতটা পর হয় আর সূর্যোদয়ের মধ্যে শুরু হয় নতুন এক সকাল।
______________
বিয়ের বাড়ির সব বন্দোবস্ত করতেই বেলা এগারো টা বাজে,,,
ফারিশ রা মিলে ছোট একটি রং খেলার আয়োজন ও করলো ,, আর এসব করে অর্থির গোসল সেড়ে আসলো,, তখন কালকের মতো মাহিয়া ভাবী আর আরশিয়া মিলে তাকে শাড়ি পরিয়ে তৈরি করে দিতে লাগলো। অর্থির তো বিয়ের শাড়ি গায়ে জড়ানো মাত্র ফুপিয়ে ফুপিয়ে কান্না করতে লাগলো,, আর কান্নার মাত্রা ধীর ধীরে বাড়তে ই থাকলো,, কমার নাম আর নিল না।
তখন সাজেদা বেগম, নাহিদা বেগম, সহ অর্থির ফুফু সুমনা বেগম,, ফাহা, যুথি, ফারিন এরা সকলেই উপস্থিত হয়। অর্থির চোখের পানি দেখে সবার যেন অক্ষি টইটুম্বর পানিতে। রেবেকা বেগম আসলে অর্থি মাকে আঁকড়ে ধরেন,,, এই বাঁধন কি আর ছাড়ানো যায়,, শেষে সাজেদা বেগম অনেক বুঝিয়ে শান্ত করে আর দাঁড়িয়ে থেকে অর্থির সাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত।
আর যখন বরের আসার খবর শুনেন তখন বড়রা সবাই মিলে সেখানেই যান,, ফাহা, যুথি আরশিয়া অর্থির কাছেই থাকে,, আর বারান্দা দিয়ে দেখতে থাকে বর এর গাড়ি কে কে কিভাবে এসেছে।
শুক্রবার থাকায় সবাই মিলে প্রথমে জুম্মা র নামাজ আদায় করবে একসাথে সেই জন্য সাম্য রা একটু তাড়াতাড়ি ই আসে। কিন্ত বরের গাড়ি এসেছে ঠিকই কিন্ত বর সাম্য বাবাজি ওই গাড়ি করে আসেনি,, সাম্য রা বন্ধু রা সবাই মিলে এসেছে বাইকে করে। তবে এতে ও কারো আপত্তি ছিল না,,, কিন্ত যখন দেখেন সাম্য সহ মুসাব, নাঈম, ইমরান, মেহেদী, সাম্যের ফুফাতো ভাই নাদিম, এবং কি শেষে ফারিশ ও তাদের সাথে যোগ দিয়ে লুঙ্গি পড়ে এসেছে, এতে সবাই বেকুব বনে গেলেন। ততক্ষণে বিয়ে বাড়িতে হইচই পড়ে গেল বর নাকি লুঙ্গি পড়ে বিয়ে করতে এসেছে।
ব্যাপারটা বারান্দা থেকে ফাহা আর আরশিয়া ও দেখে আর অর্থি কে ও এনে দেখায়। আসলেই সাম্য লুঙ্গি পড়ে ই এসেছে।
এটা অবশ্য ফাহা র কাজ,, ফাহা কাল সাম্য কে ফোন দেয়,, মানা করার পর ও দেয়,, তখন কথার ছলে ফাহা তাকে বলে সাম্য যদি লুঙ্গি পড়ে বিয়ে করতে আসে তাহলে তারা বিয়ের গেইটে কোনো টাকা নেবে না,, আর কোনো দুষ্টুমি ও করবে না। তবে সাম্য যে আসলেই এমনটা করবে কেউ চিন্তা ও করেনি।
তবে সাম্যের চাচা তো ভীষণ ক্ষেপে গেছে,, তিনি সাম্যের কাছে গিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল;
–’ এই তুই না বিয়ে করতে এসেছিস,, ইশ মান সম্মান কোথায় থাকলো ভাবতে পারছিস! কি ভাববে সবাই।
সাম্য তখন ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বলল;
—” আমার দাদা ও তো লুঙ্গি পড়ে বিয়ে করেছে,, আমি পড়লে দোষ কি! দাদার ঐতিহ্য বজায় রাখছি বুঝেছো চাচা।
তখন জাবের সাহেব, হাশেম সাহেব সহ অর্থির মামারা সেখানেই ছিল। হাশেম সাহেব তো ফারিশ কে কান মলে দিলেন,, তার মতে ফারিশের মাথায় এসব বুদ্ধি আসে, তাই তিনি তো ফারিশ কে উদম মাইর দিতে যান,,
তবে জাবের সাহেব এগিয়ে এসে সাম্য কে বলল;
—” বাবা আমি তোমাকে অনেক শান্ত ভেবেছি,,, আচ্ছা থাক যা ও এখন ভেতরে গিয়ে পাঞ্জাবি আর পায়জামা পড়ে আসো,,
সাম্য রা এমনটা মজা করেই করে, তবে তারা সবাই ই ভালো জামা কাপড় সাথে নিয়ে এসেছিল,, সেগুলো পড়ে তারা সবাই নামাজে যায়,, আর নামাজ থেকে আসার পর শুরু হয় বিয়ের কার্যক্রম।
চলবে।
গল্প তো প্রায় শেষের দিকে,,, আপনাদের কাছে কেমন লেগেছে এই গল্প। যদি ভালো লাগে একটু খানি সাম্যের মতো টুকুস টাকুস করে একটা রিভিউ দিয়ে যাবেন। দেখলে খুশি লাগবে,,, কমেন্ট করে যাবেন সাথে। আপনাদের কমেন্ট দেখলে আমার কাছে ভালো লাগে।
আর শুরুতে যে অর্থির রাগ করা অংশ টুকু লিখেছি এটা নিয়ে অভিযোগ থাকতে পারে,, তবে আমি সম্পর্ক টা দেখিয়েছি একটু মিশ্রণ। প্রেয়সি রাগ করবে আর প্রেমিক পুরুষ তার রাগ ভাঙাবে।
🙃

