প্রেম_বর্ণহীন #তোনিমা_খান #সূচনা_পর্ব

0
4

১. শত শত অট্টালিকা, ইমারত আর জাঞ্ঝটপূর্ণ যানবাহনের ধোঁয়ায় দমবন্ধকর শহুরে বুকে, গাছপালায় আবৃত একটা টিনশেড বিল্ডিং ঠিক যেনো মরুর বুকে হুটহাট আঁছড়ে পড়া বারিধারার মতো চমৎকার প্রশান্তিদায়ক এক দৃশ্য। এমনি এক চমৎকার দৃশ্য সেগুনবাগিচার আবাসিক এলাকায় বসবাসরত মানুষেরা হরহামেশা দেখে অভ্যস্ত। বাড়িটির নাম “চন্দ্রনিভা”। বাড়িটির সামনে দুই ধারে থাকা খোলা দুই বারান্দায় ঝাঁকে ঝাঁকে সেজে আছে রঙ বেরঙের ফুল। চারিপাশ ঘেরা সবুজ গাছের দ্বারা। গাছ যেনো প্রশান্তি, বিশুদ্ধতার আরেক রূপ। তবে এই বিশুদ্ধতা কিংবা দৃষ্টি আকর্ষণীয় ফুলের রঙ যতোটা না মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে; তার চেয়েও বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ করে এই হরেক রকমের রঙের মাঝে সেজে থাকা কৃষ্ণ বর্ণের একটি ফুল—যার নাম ইন্দুবালা।

ইন্দুবালা—যাকে মাত্র ই ফুল বলে সম্বোধন করা হলো, সে আদোতে মানবরূপী এক ফুল। তার বাবার কাছে সে একটি স্নিগ্ধ ফুল! এই ফুলটি আর কেউ নয় বরং এই মনোমুগ্ধকর ঘরটির মালিক মোহাম্মদ সিদ্দিকী এর বড়ো কন্যা। নাম শুনে মনে হবে, নামধারী বোধহয় নামের অর্থের মতোই চাঁদের ন্যায় সুন্দর! কিন্তু বাক্যখানি সম্পূর্ণ বানোয়াট। ইন্দুবালা সম্পূর্ণ তার নামের বিপরীত সৌন্দর্য বহন করে। দেখতে কালো…..নাহ্, অত্যাধিক পরিমাণ কালো, তেলতেলে বরনের এই মেয়েটি পিতৃস্নেহে সমৃদ্ধ এক মলিন সত্ত্বা। এই বিদীর্ণ কালচে বরনের মেয়েটি তার বাবার কাছে ঠিক চাঁদের মতোই সুন্দর!
মূলত এটা নিয়েই পড়শীদের যতো কৌতুহল!
কি ভেবে যে সিদ্দিকী সাহেব তার কালো মেয়েটির নাম ইন্দুবালা রাখলো; তার ব্যাখ্যা আজো খুঁজে পায় না অযাচিত কৌতুহলী মানুষ গুলো। বুঝেই উঠতে পারে না কৃষ্ণ বর্ণের রূপহীন মেয়েটি ঠিক কোনদিক থেকে চাঁদের মতো সুন্দর। অবশ্য সিদ্দিকী মোহাম্মদ কখনো প্রয়োজন বোধ করে না এই মানুষগুলোর কৌতুহল মেটানোর। তার সন্তান! দীর্ঘ নয় মাসের অপেক্ষার পর দুই হাতের আজলায় পেয়েছে। ঐ ছোট্ট আঙুলগুলো ধরে একটু একটু করে বড়ো করেছে, রক্ত পানি করে নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তুলেছে সে, সেখানে কৈফিয়ত কেনো দেবে এই দূরদর্শী কৌতুহলী মানুষগুলোকে?

এমন প্রশ্নে সিদ্দিকী সাহেব সবসময়ের মতোই মৃদু হাসেন কখনো জবাব দেয় না। অথচ অন্তরে জবাব বুনতে থাকে আপনাআপনি। দীর্ঘ নয় মাস সন্তান আগমনের অপেক্ষা করতে করতে তার নয়া পিতৃমন যে কতোশত নাম ঠিক করে রেখেছিলেন নিজের সন্তানের জন্য তার ইয়ত্তা নেই। শেষে গিয়ে তার মন আটকায় এই ইন্দুবালা নামক প্রত্নতাত্ত্বিক নামটিতে। ভেবে নিয়েছিল কন্যাসন্তান হলে তার নাম রাখবে “ইন্দুবালা”। সৃষ্টিকর্তা তার অভিপ্রায়ে মত দিলেন। আর তার কোল ভরে গেল ইন্দুবালা নামক কন্যাসন্তানের আগমনে। তবে সিদ্দিকী সাহেব তখনো বুঝতে পারেনি শিক্ষার আলোয় আলোকিত এই পৃথিবীতে এখনো অন্ধকার, ময়লা রয়ে গিয়েছে। ছোট্ট ইন্দুবালা বড়ো হতে হতে কতো ঝড় গেলো তাদের উপর থেকে। ধীরস্থির সমাজ, সিদ্দিকী সাহেবকে এটা উপলব্ধি করতে বাধ্য করায়, কন্যা সন্তানরা হয় বাবার বোঝা। আর সন্তানটি যদি কালো হয় তবে তা গলার কাঁটা হয়!
ইন্দুবালার জীবনটাও সহজ নয়। তার জীবনটা সহজ, সুন্দর, আনন্দদায়ক, মূল্যবান শুধুমাত্র তার বাবার কাছেই। বাকি পুরো দুনিয়ার কাছে সে আর তার জীবনটা কঠিন, কুৎসিত ময়লাচ্ছন্ন, একটা ভারী বোঝা। এক একটা ছটফটে দীর্ঘশ্বাসের সাথে বেরিয়ে আসে চাপা যন্ত্রনা। বাবার বোঝা হওয়ার আগেই ইন্দুবালা কখন যে পুরো সমাজের বোঝা হয়ে গেলো, তা টেরই পেলো না সে।

আজ শুক্রবার। আজ ইন্দুবালাকে ঊনষাট বারের মতো পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে। ষোলকলা পূর্ণ হতে খুব বেশি দেরি নেই। এই তো, দূর্ভাগ্য দুয়ার থেকে বিদায় না হলে, দেখাযাবে আগামী সপ্তাহেই ষাট হয়ে যাবে। চন্দন আর গোলাপজলের মিশ্রণটি বাটিতে মাখতে মাখতে তহমিনা ত্রস্ত পায়ে ঘর পেরিয়ে বারান্দায় ঢুকলো। মুখে তার অবঞ্জাছলে বলা কিছু কটুকাটব্য। হালকা গোলাপী রঙা থ্রিপিস পড়া মেয়েটিকে রোদের মাঝে দেখতেই সেই কটুকাটব্য আরো বৃদ্ধি পেলো।
–“রোদে বসে আছে দেখছি— নিজের মতো আমার মেয়েটাকেও গ”লা”য় দ/ড়ি দেয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চাইছে বুঝি? দেহের কোন জায়গা পোড়ানোর জন্য খুঁজে না পেলে; গিয়ে আগুনে ঝাঁপ দিলেই তো হয়। একেবারে সব ঝামেলা ঘুঁচে যাবে। না থাকবে বাঁশ আর না বাজবে বাঁশি। আমরাও একটু শান্তিতে বাঁচতে পারবো।”

মায়ের তীব্র অবজ্ঞামিশ্রিত কথায় বারান্দায় বসে বই পড়তে থাকা ইন্দুবালা চোখ তুলে তাকায়। ভেসে ওঠে মা নামের ভিন্ন এক অবয়ব। অন্তঃস্থলে বলে ওঠে, মায়েরা এমন হয় না এবং সব নারী মা হতে পারে না। রণমূর্তী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা তহমিনা রুক্ষ হাতে চন্দনের প্রলেপ লেপ্টে দিতে লাগলো। ইন্দুবালা নিরবে চোখ বন্ধ করে নিলো। তহমিনা চন্দনের প্রলেপ লাগিয়ে দিয়ে রাগত স্বরে বলল,
–“এখান থেকে উঠে ঘরে‌ গিয়ে বসুন আর আমার গলার কাঁটা টা একটু ছাড়াতে সাহায্য করুন। বাপের বাড়িতে থেকে বাপের অন্ন ধ্বংস করে আরামে দিন কাটাতে বেশ সুখ, আমি জানি। কিন্তু তাই বলে অন্যের পেটে লাথি মেরে নিজে সুখ করবে সে তো হবার নয়। তোমার নাহয় ঘর সংসারে আগ্রহ নেই, তাই বলে কি আর কারোর নেই? আমার মেয়েটার একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ, সুন্দর জীবনসঙ্গী একটা সুখের সংসার দেখে মরার ইচ্ছা আমার। অন্তত এতোটুকু পূরণ করতে সাহায্য করুন আমায়। সারাজীবন আপনাদের পেছনে যেই কামলার মতো খেটেছি, তার পরিবর্তে এতোটুকু দয়া তো করতেই পারেন তাই না?”

ইন্দু বদ্ধ নেত্র খুলে নিরবে বাধ্য মেয়ের মতো বারান্দার মেঝে থেকে উঠে ঘরে চলে গেলো। তহমিনা দেখলো কোনপ্রকার প্রত্যুত্তর না করা নির্লিপ্ত মেয়েটাকে। বিড়বিড় করে বলল,
–“আল্লাহর দুনিয়া ধ্বংস হয়ে গেলেও এই মেয়ের মুখ থেকে কিছু বের হবে না। তেজ দেখায় আমায়!”

ইন্দুবালা হাত খোঁপা করতে করতে নিরবে শুনলো মায়ের বিদ্রুপটুকু। শুনে মৃদু হাসলো। আল্লাহর দুনিয়ায় যদি বলার মতো কেউ থাকতো—তবে আজ সবাই ইন্দুবালাকে তোতাপাখি বলতো! কতো কতো কথা জানে ইন্দুবালা এগুলো সবার অজানা। সৌন্দর্য হীন কালো মেয়েটির কথা মুগ্ধ চিত্তে, ফুরসৎ নিয়ে শোনার মতো কোন মানুষ নেই, একজন ব্যতীত। যাকে আবার মনের গহীনে থাকা সবকথা বলাও যায় না।

তহমিনা ঘর থেকে বের হতে হতে আদেশের সুরে বলল,
–“ওগুলো বিশ মিনিট রেখে তারপর ভালো করে গোসল করে নিবি। বেশি বেশি সাবান মাখবি আর ঘঁষে ঘঁষে মুখ ধুবি। পাত্রপক্ষ কিন্তু চারটা নাগাদ এসে পড়বে। সুন্দর করে মেকাপ করে সাজগোজ করবি। এক কথা যেন বারবার বলা না লাগে।”

ইন্দুবালা মাথা নেড়ে সায় জানালো। তহমিনা চলে যেতেই ইন্দুবালা বড্ডো বদ অভ্যাসের জোরেই আবার পা চালিয়ে বারান্দায় চলে গেলো। ঘরটির এই একটা জায়গায় তার ছটফটে প্রাণটা একটু স্বস্তি বোধ করে। বারান্দায় গিয়ে আবার সেই ফুলের সমারোহে মুখ লুকায় ইন্দুবালা। ঘ্রাণে নেশাতুর তার আঁখিদ্বয় বুজে আসে। কল্পনায় ভেসে ওঠে তার নিজস্ব কল্পলোক! এমন এক কল্পলোক যেখানে মানুষকে তার গায়ের রঙ দিয়ে বিচার করা হয় না। এমন এক কল্পলোক যেখানে সব বরনের মানুষগুলো মাথা উঁচু করে, স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস করতে পারে। পড়শীরা হবে পরিষ্কার স্বচ্ছ মনের। যারা তার এই কালচে বরনের ভেতর লুকিয়ে থাকা মনের গুরুত্ব দেবে। তার খুঁত নয় বরং খুঁতের আড়ালে থাকা তার সৌন্দর্য গুলোকে খুঁটে খুঁটে বের করবে আর প্রশংসা করবে। তার যোগ্যতাগুলোকে প্রাধান্য দেবে। বদ্ধ নেত্রে মলিন হাসে ইন্দুবালা। খুঁতে খুঁতে ভরপুর এই দেহটার মাঝে কোন সৌন্দর্য ই যে নেই। থাকলে এই ঊনত্রিশ বছরের জীবনে কেউ না কেউ তো বলতো!
বাবা তো বাবা! তার কাছে তার মেয়ে সবসময়ই সুন্দর হয়! কিন্তু………. কিন্তু এই পৃথিবীতে কেউ কি নেই যে ইন্দুবালাকে সুন্দর বলবে? যে তাকে তার গায়ের রঙ নয় মন দিয়ে বিচার করবে। তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা মনটার যে কষ্ট হয় এটা বুঝবে? শুনেছে সবার জীবনে নাকি স্বপ্নের রাজপুত্র আসে। কই আজ অর্ধজীবন পার করে দিলো সে লাঞ্ছনা, কটুক্তি শুনতে শুনতে তবুও তো তার জীবনে আসলো না কোন রাজপুত্র। এগুলো কি তবে শুধুই গল্প?

হ্যাঁ, কালচে বরন নামক অভিশাপ নিয়ে আজ ঊনত্রিশ বছর পার করে দিলো ইন্দুবালা। এটা অভিশাপ ছিল না তার জন্য, মানুষ তৈরি করে দিয়েছে। তিন বছর বয়সে মা মারা যায় ইন্দুবালার। সমাজের অদ্ভুত নিয়মানুযায়ী সিদ্দিকী সাহেবকে দ্বিতীয় জীবন সাদরে গ্রহণ করতে হয়। প্রথম ঘরের কালো মেয়েটি কখনোই দ্বিতীয় স্ত্রী রূপী তহমিনার পছন্দ ছিল না। উটকো ঝামেলা! কঠোর সিদ্দিকী সাহেবকে টপকে সৎ মা ইন্দুবালার জীবন খুব একটা দুঃসহনীয় করে তুলতে পারতো না। স্বামী যে আস্ত এক দূর্ভেদ্য দেয়াল। মেয়ের উপর কোন বিরূপ আঁচ কখনো পড়তে দিত না। দিনগুলো সেভাবেই চলতে থাকে। আঠারো বছরে পদার্পণ করতেই সমাজের মানুষের মাথাব্যথার কারণ হয়ে ওঠে ইন্দুবালা। একে বিয়ে দেবে কি করে? কেউ কি ঘরে তুলবে এই কালো মেয়েকে? কালো হলে মানা যায় কিন্তু এ তো যেনোতেনো কালো নয়, কুচকুচে কালো। গ্রামের রাস্তাঘাটে যুবক যুবতীরা সহ বয়স্করা প্রচুর রসিকতার সাথেই তাকে “কালামানিক” বলে সম্বোধন করতো। মেয়েটি তখন সবার সামনে হাসিমুখে সেই ডাক গ্রহণ করলেও, ঘরে এসে বালিশে মুখ লুকিয়ে গগনবিদারী চিৎকার দিয়ে কাঁদতো। কাউকে কখনো মুখ ফুটে বলতো না, তার খুব কষ্ট হয় এই সমাজে নিত্যদিন এই কালো মুখ নিয়ে বের হতে। একদিন সিদ্দিকী সাহেব দেখলেন মেয়ের সেই আর্তনাদ। গ্রামের মানুষের সংকীর্ণ মনোভাব থেকে মেয়েকে নিয়ে চলে আসে শহরে। গ্রামের নিজস্ব ভাগের সম্পত্তি বিক্রি করে, দুই মেয়ে এক ছেলে নিয়ে বসতি গড়ে তোলে শান্তিনগরের সেগুনবাগিচায়। ইন্দুবালার জীবনটা একটু সহজ হলো। তুখোড় মেধাবী, যোগ্যতাসম্পন্ন মেয়েটাকে ঝড়ে পড়তে দেয়নি সিদ্দিকী সাহেব। মেয়ের ঢাল হতে হতে আজ মেয়েই সিদ্দিকী সাহেবের ঢাল হয়ে উঠেছে। পড়াশুনা শেষ করে বাবার পথেই হাঁটে ইন্দুবালা। যেখানে বাবা সেখানে সে—এতোটুকুই ইন্দুবালার স্বস্তির কারণ। বাবা মেয়ে একই স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকা। মেয়ে ফিজিক্সের টিচার আর সিদ্দিকী সাহেব ম্যাথের। এই তো বছরের শেষে তার রিটায়ারম্যান্ট। তবে সন্তানকে সমাজে যোগ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করলেও সিদ্দিকী সাহেব ভুলেই বসলেন সমাজের সব মানুষ তার মতো মুক্ত চিন্তার অধিকারী নয়। মেয়ের বিয়ের চিন্তা কখনো করেনি সিদ্দিকী সাহেব! কিন্তু এটা তো সমাজের নিয়ম! সবাইকে বাধ্যতামূলক মানতেই হয়। ইন্দুবালাকেও মানতে হবে। সেই নিয়মানুযায়ী, বিগত কয়েক বছর যাবৎ গরুর মতো ইন্দুবালাকে হাঁটে তুলছে তার সৎ মা। শুধু সৎ মা? যে পেরেছে সেই তুলছে! কখনো শিক্ষিত মানুষের সামনে তো কখনো অশিক্ষিত মানুষের সামনে। কিন্তু প্রতিবার যোগ্যতাসম্পন্ন এই মেয়েটা হেরে যায় রূপের কাছে।সবার একটাই কথা,
–“টাকা দিয়ে কি যায় আসে! ঘরের জন্য দেখেশুনে একটা সুন্দরী বউ নেবো, যেনো ছেলে সহ সমাজ দেখে মুগ্ধ হয়। এমন বউ নিয়ে কি করবো যা জনসম্মুখে দেখাতেই লজ্জা লাগবে? ছেলে কি বউয়ের টাকার সাথে সংসার করবে, না-কি বউয়ের সাথে?

ম্লান হেসে উঠলো ইন্দুবালা। এযাবৎ যতো সম্বন্ধ ঘর পর্যন্ত এসেছে, সবাই তার চাকরির জন্য এসেছে। কিন্তু এসে যখন দেখে এই কালচে চামড়া, বিদীর্ণ সৌন্দর্য—তখন টাকার লোভ ও ফিকে পড়ে। ভাবনার মাঝেই কারোর এমন ক্ষিপ্ত কণ্ঠে চিৎকার চেঁচামেচি শুনে ইন্দুবালা চমকে উঠলো।

–“অমানুষের বাচ্চা অমানুষ! মেয়ে নিয়ে ফষ্টিনষ্টি করে বেড়াতে লজ্জা করে না। গুন্ডামি, স্মোকিং, মারপিট আর কি বাদ রেখেছিস আমার জীবনটা নষ্ট করার জন্য? আজ তোকে আমি জুতোপেটা করে ঘর ছাড়া করেই দম নেবো। তোর মতো অমানুষ আমার চাই না। বের হ!”

একের পর এক এহেন রাগান্বিত স্বর ভেসে আসতেই, একঝাঁক ফুলের আড়াল থেকে মাথা তুলে বাইরে তাকায় ইন্দুবালা। ঠিক পাশের প্লটের দিকে গিয়ে তার দৃষ্টি আটকায়। হাজার মলিনতাকে ছাপিয়ে এক টুকরো স্মিত হাসি ফুটে উঠলো তার ওষ্ঠকোনে, পাশের প্লটের মধু আন্টি তার দামড়া ছেলেকে জুতো পেটা করছে। দু’হাতে নিজের মুখ ঢেকে মায়ের জুতোর বারি দিয়ে নিজেকে রক্ষা করছে মোত্তাকিন। ইন্দুবালা পরিপূর্ণ আনন্দ উপভোগ করার জন্য উঠে দাঁড়ায়। বুকে হাত গুঁজে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে উপভোগ করে মোত্তাকিনের করুণ সেই দশা। ওষ্ঠকোনে গাম্ভীর্যের হাসি। সে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে,
–“আরো জোরে মধু আন্টি! দু চারটে আরো দাও।”

ইন্দুবালার মুখশ্রী এমন—যেনো পারলে সেই দু’টো জুতোর বাড়ি দিয়ে আসে ছেলেটাকে।

জুতোপেটা করে গেট থেকে ছেলেকে বের করতে করতেই মধুমিতার শ্বাস উঠে গেলো। সে ক্ষিপ্ত হাতে জুতোটা ছুঁড়ে মেরে অগ্নি দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো ছেলের দিকে। আঙুল তুলে বলল,
–“আর যদি তোকে আমি আমার ঘরের দরজায় দেখেছি—তবে আমি এই ঘর ছেড়ে কোথাও চলে যাবো। তোর মতো কু”লা”ঙ্গা”র ছেলে থাকার চেয়ে না থাকা ভালো। তুই থাকলেও আমায় একা কষ্ট করে বাঁচতে হবে না থাকলেও একাই বাঁচতে হবে। বরং এটা আরো শান্তির! যা দূর হ এখান থেকে।”

বলেই মধুমিতা বুকে হাত চেপে ঘরে চলে গেল। মোত্তাকিন কিয়ৎকাল একদৃষ্টিতে মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকলো। অতঃপর লাল হওয়া মুখশ্রী নিয়ে পা বাড়ায় যেই পথ ধরে এসেছিল সেই পথে। এসেছিল দুপুরের খাবার খেতে। পা বাড়াতে নিলেই পাশের প্লটের বারান্দায় চোখ যায় তার। চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। ক্ষিপ্র গতিতে এগিয়ে যায় সেদিকে। ঠিক গিয়ে দাঁড়ায় ইন্দুবালার বারান্দা বরাবর। ইন্দুবালার ঠোঁটের কোনে হাসি প্রগাঢ় হয়। কোমড় সমান দেয়ালের বাউন্ডারির সামনে দাঁড়িয়ে মোত্তাকিন দাঁত খিচে শুধায়,
–“আমার পেটে লাথি মেরে খুব আনন্দ হচ্ছে, তাই না?”

ইন্দুবালা গম্ভীর মুখে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
–“হওয়াটা অস্বাভাবিক বুঝি? তোর মতো অথর্বকে জুতো পেটা খেতে দেখা পৃথিবীর সবচেয়ে শান্তিদ্বায়ক দৃশ্য।”

মোত্তাকিন রাগে ফেটে পড়লো। ফের শুধায়,
–“তুই আম্মাকে ইনায়া’র ছবি পাঠিয়েছিস তাই না?”

ইন্দুবালা বৃহৎ নয়নে তাকালো। মেকি আশ্চর্যের রেশ ধরে বলে,
–“ওহ্, মেয়েটার নাম ইনায়া বুঝি? সুন্দর নাম, সুন্দর মেয়ে! ভাগ্যিস তোর মতো অপদার্থের সাথে জুড়ে যায়নি। নয়তো মধু আন্টির মতো তার দশাও হতো। করুণ, বেহাল। দামড়া ছেলে এখনো নিজের বুড়ো মায়ের ইনকামে মেয়েমানুষ নিয়ে ঘোরাফেরা করে কোন আক্কেলে? পকেটে দু টাকা আছে? ঐ বুড়ো মা সারাদিন অসুস্থ শরীর নিয়ে খেটে ইনকাম করে আনে আর তুই এক অপদার্থ ঐ টাকা মেয়েদের পেছনে উড়িয়ে বেড়াস, লজ্জা করে না?”

মোত্তাকিনের রাগ তখন বাঁধভাঙা। সে একটা বড়ো ইটের টুকরা ছুঁড়ে মারলো ইন্দুবালার বারান্দা বরাবর। চেঁচিয়ে বলল,
–“না, করে না। আমি আমার মায়ের টাকা যা ইচ্ছা তাই করি তাতে তোর কি? তুই ইনায়া’র ছবি পাঠাবি কেনো?”

ইন্দুবালার কাঁধের ঠিক এক ইঞ্চি দূর থেকে যাওয়া ইটের টুকরাটি দেয়ালে লেগে ভেঙে দুইভাগ হয়ে গেলো। ইন্দুবালা চোয়াল শক্ত করে সেদিকে তাকায়। পরপরই মোত্তাকিনের দিকে তাকিয়ে রাগান্বিত স্বরে বলল,
–“ওহ্, গুন্ডামির সাথে সাথে এখন হাত ও চলছে দেখছি। কাউকে মে”রে ফেলতেও মনে হয় এখন আর দ্বিধা বোধ হয় না, তাই না?”

মোত্তাকিন তার পানে এক ঝলক ক্রুব্ধ দৃষ্টি ফেলে দেয়ালে লাথি মেরে গটগট করে চলে গেলো। ইন্দুবালা ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেললো। সমবয়সী এই পড়শীর হঠাৎ বিগড়ে যাওয়া রূপ সে কোনমতেই মানতে পারে না। আগে এমন ছিল না। তারা দুই বছর একসাথে পড়াশুনা করেছে। ঊনত্রিশ বছরের তাগড়া জোয়ান ছেলে। মেধাবী ছেলেটা নামকরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশুনা করে বেরিয়েছে। মূলত ভার্সিটি জীবনেই খারাপ সঙ্গের পাল্লায় পড়ে ছেলেটা এমন খারাপ হয়ে গিয়েছে। পড়াশুনা শেষ করে আড্ডাবাজি, মারামারি, গুন্ডামি এগুলো করে বেড়ায়।

সে তাকায় পাশের দালানটির দিকে। দালানের দোতালায় থাকে মোত্তাকিন আর তার মা— মধুমিতা। সে যেই হাই স্কুলে চাকরি করে তার পাশেই আরেকটা হাই স্কুলে চাকরি করে মধুমিতা আন্টি। এই দিয়েই তাদের সংসার চলে। সুপ্ত আরো একটা পরিচয় রয়েছে মধুমিতা আন্টি আর মোত্তাকিন এর। যেটা কখনো মা ছেলে স্বীকার ও করে না, আর না সেই পরিচয় বয়ে চলে। মোত্তাকিন এর পুরো নাম মোত্তাকিন ইরতেজা। দক্ষিন সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মুহিত ইরতেজার ছেলে। কিন্তু মা ছেলে সবসময় এড়িয়ে চলে এই পরিচয়কে।
এলার্ম ঘড়িটি স্বশব্দে বেজে উঠতেই ইন্দুবালার স্থবিরতা ভাঙলো। বিশ মিনিট হয়ে গিয়েছে। ঘরে গিয়ে কাবার্ড থেকে মায়ের বেছে রাখা শাড়ি আর প্রয়োজনীয় সবকিছু নিয়ে বাথরুমে চলে গেল। ঠিক বিশ মিনিটের ব্যবধানে গোসল থেকে বের হলো সে। বাথরুমের দরজা লাগিয়ে পিছু ফিরে তাকাতেই সে দৈবাৎ চেঁচিয়ে উঠলো। চোখেমুখে অপ্রস্তুত ভয়ের আভাস নিয়েই সে তাকায় নিজের বিছানার দিকে। অবাক হয়, পায়ের উপর পা তুলে মোত্তাকিন’কে শুয়ে থাকতে দেখে। পড়নের শাড়ির আঁচল সামলে সে একপ্রকার তেতে উঠলো। মৃদু উঁচু স্বরে শুধায়,
–“তুই এখানে কি করছিস, মোত্তাকিন? এটা কোন ধরণের বেয়াদবি?”

মোত্তাকিন নিরুদ্বেগ সিলিং এর দিকে তাকিয়ে আছে। পা দোলাতে দোলাতে গম্ভীর গলায় আদেশের সুরে বললো,
–“ভাত দে, খিদে পেয়েছে।”

~চলবে~

#প্রেম_বর্ণহীন
#তোনিমা_খান
#সূচনা_পর্ব

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here