#প্রেম_বর্ণহীন
#তোনিমা_খান
#পর্বঃ০৩
–“মুদির দোকানদার খারাপ পেশা কোন দিক থেকে, ইনসিয়ার আব্বু? পৃথিবীতে সব ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেলেও এই একটা ব্যবসা কোনদিন বন্ধ হবে না। তোমার মেয়েকে অন্তত পেটের দ্বায়ে কখনো মরতে হবে না।”, তহমিনার সুদৃঢ় কণ্ঠে সিদ্দিকী সাহেব দাঁতে দাঁত চেপে প্রত্যুত্তর করেন,
–“আমার মেয়েকে এমনিতেও কোনদিন পেটের দ্বায়ে মরতে হবে না, তহমিনা। এতোটুকু স্বাবলম্বী আমি বানিয়েছি আমার মেয়েকে। তোমার তার চিন্তা মোটেও করতে হবে না। আমার মেয়ে কোন অশিক্ষিত মুদির দোকানদারের সামনে দাঁড়াবে না। এটা আমার শেষ কথা! তোমার সাহস কি করে হয় এমন কাউকে বাড়িতে আসার অনুমতি দেয়ার?”
–“সাহস আমায় জোগাতে হয় ইনসিয়া’র আব্বু। আর আমায় চিন্তা করতে হবে না তো কাকে করতে হবে, বলতো? তোমার এই মেয়ের যোগ্য পাত্র খুঁজতে খুঁজতে আমার মেয়ের বিয়ের বয়স হয়ে গিয়েছে। তোমার মেয়েকে পাতে তোলার মতো নামেমাত্র সৌন্দর্যটুকু ও তো নেই—যে কেউ চোখের শান্তি অনুভব করে অন্তত তাকে কোন পুরুষ ঘরে তুলবে। অথচ তোমার ইচ্ছে তোমার
উচ্চশিক্ষিত চাকরিজীবী লোকের সাথে বিয়ে দেয়ার। এই আশা নিয়ে বসে থাকলে তোমার মেয়ের আর এজীবনে বিয়ে দিতে হবে না। ঐ ঘরে খুঁটি পুঁতে আজীবন পঁচে ম”রতে হবে! শেষমেশ তোমার মেয়ের সাথে আমার মেয়েটাকেও গ”লা”য় দ”ড়ি দিয়ে ম”রতে হবে।”
সিদ্দিকী সাহেব কঠোর দৃষ্টিতে তাকালেন স্ত্রীর পানে। শান্ত স্বরে ভয়ানক হুমকির ছোঁয়া নিয়ে বললেন,
–“কোনদিন আমি তোমার জিভ টিনে ছিঁড়ে ফেলি, তহমিনা। আমার মেয়েদের গলায় দড়ি দিয়ে মরার কথা তুমি কোন মুখে বলো আমার-ই সামনে? বিয়ে না করলে মানুষ মরে যায়? যদি মরে, তো মরবে—তবুও আমি আমার মেয়েকে এক অশিক্ষিত মানুষের কাছে অপমানিত হতে দেবো না।”
দিন যতো গড়ায় অনিশ্চিত ভবিষ্যতের চিন্তায় তাহমিনা ইদানিং যারপরনাই নির্ভীক হয়ে উঠছে। আগে স্বামীর প্রথম ঘরের সন্তানের প্রতি তীক্ত অনুভূতি লুকিয়ে রাখলেও এখন আর পারে না। অধৈর্য আর অসহিষ্ণুতায় ত্যাক্ত হয়ে উঠেছে! সে স্বামীর কঠোর দৃষ্টিকে উপেক্ষা করে দাঁত খিচে বলল,
–“মরলে তোমার মেয়ে মরবে, আমার মেয়ে কেনো মরবে?”
–“তহমিনা!”, সিদ্দিকী সাহেব হুঙ্কার ছাড়লো। ক্ষিপ্রতার বশে বশিভূত হয়েই পুরুষালী হাতটি জেগে যায়। কিন্তু সেই জাগ্রত হাত কোনপ্রকার আঘাত করতে পারলো না তহমিনাকে। সিদ্দিকী সাহেব তাকায় তার বাধাপ্রাপ্ত হাতটির দিকে। ইন্দুবালা সন্তপর্ণে বাবার হাতটিকে নিজের দু হাতের মুঠোয় নিয়ে নিলো। দৃষ্টি তুলে চোখ রাখে বাবার লালচে ক্ষিপ্ত মুখপানে। নম্র স্বরে বলল,
–“আমার ভাগ্যে কি আছে তা তুমি জানো না আব্বু! আমার ভাগ্যে যদি একজন অশিক্ষিত, মুদির দোকানদার থেকে থাকে— তবে আমায় অবশ্যই তা মেনে নিতে হবে, তুমি কিছু করতে পারবে না। ভাগ্যের লিখন কেউ খন্ডাতে পারে না। তাহলে এমন একটা বিষয় নিয়ে তুমি কি করে এমন অবুঝের মতো আচরণ করতে পারো? তুমি তো এমন নও আব্বু!”
তহমিনা ভয়ার্ত দৃষ্টি সামলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। ভেবেছিল এযাত্রায় ঘরভর্তি মেহমানের মাঝে তাকে অসম্মানিত হতে হবে। সে ইন্দুবালার দিকে আড়চোখে বিতৃষ্ণা ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে মুখ বাঁকালেন। স্বামী শুধু তার এই মেয়ের কথাতেই ওঠে-বসে। এই আদিক্ষেতা দেখলে তার গা জ্বলে যায়! সংসারে আগের ঘরের সন্তান থাকার চেয়ে অভিশপ্ত আর কিছু হতে পারে? তাও যদি হয় ইন্দুবালার মতো কালো কুচকুচে চোখে অশান্তি সৃষ্টি করা এক অবয়ব।
সিদ্দিকী সাহেব বিমর্ষ মুখে অস্থির নিঃশ্বাস ফেললেন। সুদৃঢ় কণ্ঠে বললেন,
–“ভাগ্যে যা-ই থাকুক না কেনো ইন্দু, কিন্তু এই মুহূর্তে আমি তোমায় ঐ মানুষগুলোর সামনে একদমই দাঁড়াতে দেবো না। ঘরে যাও আর এই শাড়ি চুড়ি খোল।”
–“ঘরে যাবে মানে? অতিথিরা বসে আছে, তাদের অসম্মান হবে। এমনিতেই অভিশপ্ত, আবার অতিথিদের এভাবে তাড়িয়ে দিলে তোমার এই মেয়ের আর কোনদিন বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হবে না। মানুষের অভিশাপ তাড়া করে বেড়াবে!”, তহমিনা প্রগলভ কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠলো। সিদ্দিকী সাহেব ফের কড়া চোখে তাকিয়ে কিছু বলতে যাবে তার আগেই ইন্দুবালা বাবাকে থামিয়ে মায়ের উদ্দেশ্যে গম্ভীর গলায় বলল,
–“তুমি যাও, আমি আসছি।”
–“তুমি কোথাও যাবে না, ইন্দু!”, বাবার কঠোর গলায় ইন্দুবালা মলিন হেসে তার হাতটি আরো জোড়ালোভাবে আঁকড়ে ধরলো। তহমিনা বাবা মেয়ের পানে ক্রুব্ধ দৃষ্টি ফেলে গটগট করে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। ইন্দুবালা মিহি স্বরে বলল,
–“তুমিই তো বলো, দেখলেই বিয়ে হয়ে যায় না।”
–“তবুও…”, ইন্দুবালা বাবার কথা সম্পূর্ণ করতে দেয় না, ব্যগ্র কণ্ঠে বলে,
–“রোজ রোজ ঘরে আমার কারণে অশান্তি আর ভালো লাগে না, আব্বু। আমি চেষ্টা করছি অশান্তি একটু এড়িয়ে চলতে, তুমি অন্তত ঝামেলা করো না ঘরে। তুমি গোসল করে এসো, আমি যাচ্ছি।”
বলেই ইন্দুবালা বেরিয়ে যায় বাবার ঘর থেকে। রিটায়ারমেন্ট নিকটে হওয়ায় কিছু কাগজপত্রের ঝামেলা মেটাতে আজ সারাদিন বাবা বাইরে ছিল। এসেছে মাত্র কিছুক্ষণ! মেয়ে চলে যেতেই সিদ্দিকী সাহেব রাগ সামলাতে না পেরে বিছানায় ধপ করে বসে পড়লো। সে জানতো না এই সম্বন্ধের কথা! তহমিনা তাকে না জানিয়েই এদের দেখতে আসার অনুমতি দিয়েছে। নয়তো সে কখনো এমন মানুষদের ঘরে আসার অনুমতি দিতো না।
মাথার অর্ধভাগ ঢেকে আছে ঘোমটার আড়ালে। পৌঢ় ভদ্রমহিলা অনুমতিবিহীন সেই ঘোমটা টেনে খুলে ফেললো। বড্ডো রুক্ষ হাতেই টেনেটুনে এক গোছা রেশম চুলের বিশাল খোঁপাটি খুলে ফেললো। সহসা গড়িয়ে পড়লো ঢেউ খোলানো কালো কুচকুচে রেশমের ন্যায় চুলগুলো। ইন্দুবালা হকচকিয়ে চোখ তুললো। এই পর্যায়ে পৌঢ় মহিলার মুখ চকচক করে উঠলেও তা তিনি সন্তপর্ণে লুকিয়ে নিলেন। চুলগুলো নেড়েচেড়ে দেখতে দেখতে মুখ বিকৃত করে বললেন,
–“চুল তো মেলা আছে, কিন্তু এগুলোর পেছনে খরচ ও তো কম না। এই চুলের পেছনে তেল শ্যাম্পু তো কম যায় না, তাই না? তা একটু হেঁটে দেখাও তো!”
পৌঢ় মহিলার কথায় তহমিনা হড়বড়িয়ে মেয়েকে বললেন,
–“হেঁটে দেখা তো! ওর হাঁটার ধরণ খুবই সুন্দর আর মার্জিত, আপা।”
মায়ের কথামতো ইন্দুবালা নিরুত্তর হেঁটে দেখালো। অদূরে দুই হাত সামনেই বসে থাকা শ্যাম কালো এক পুরুষ সেই হাঁটা এক পলক বিতৃষ্ণা ভরা দৃষ্টিতে দেখে আবার চোখ ঘুরিয়ে নিল। পৌঢ় ভদ্রমহিলার ইন্দুবালার হাঁটা ও মার্জিত লাগলো। সে রসিয়ে রসিয়ে বলল,
–“হাঁটা তো সুন্দর ই আছে। তা তোমার মাসিক বেতন কতো?”
–“আঠারো হাজার টাকা।”, ইন্দুবালা নত মস্তকে জবাব দিলো। ভদ্রমহিলার চোখেমুখে এবার আর ইন্দুবালার বাহ্যিক সৌন্দর্য নিয়ে কোন অসন্তোষ ই স্থায়ী হলো না। আনন্দে চকচক করছে তার মুখ। আঠারো হাজার যে মাঝেমধ্যে তার ছেলেও ঘরে আনতে পারে না। খুব বেশি বড়ো মুদির দোকান নয় যে! গড়ে পড়তে চলে যায় আরকি!
সে ছেলেকে কনুই দিয়ে ধাক্কা দিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
–“কি হলো ওদিকে তাকিয়ে আছিস কেনো? দেখ মেয়েটাকে।”
ছেলেটি মায়ের দিকে ক্রুব্ধ দৃষ্টিতে তাকালো। বলল,
–“আম্মা, ঐ মেয়ের মাঝে দেখার মতো কিছু আছে?”
–“আছে না, কতো লম্বা চুল দেখ। হাঁটা ও সুন্দর!
–“লম্বা চুল, হাঁটা দিয়ে কি করবো আম্মা যদি রাতের অন্ধকারে পুরো অবয়বটাই মিলিয়ে যায়। তুমি বলেছিলে, মেয়ে একটু কালো কিন্তু এ তো কাকের মতো দেখতে।”,
কথাটি ফিসফিসিয়ে বললেও রাগের তোপে তা আর ফিসফিস রইলো না। বসার ঘরে সবাই দেখলো আর শুনলো পাত্রের রাগ আর কথা। তহমিনার মুখ কালো হয়ে গেলো ছেলের কথা শুনতেই। এবারো বুঝি বিয়েটা হলো না! ইন্দুবালার গুটিয়ে রাখা হস্তদ্বয় কেঁপে উঠলো নিজের সৌন্দর্যের প্রতীকি রূপ শুনতেই।
পৌঢ় মহিলা বড়ো বড়ো নেত্রে ছেলের হাত চেপে ধরলো। চোখে শাসিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
–“চুপ! সব কথা বাদ দে, সবচেয়ে বড়ো কথা হলো মেয়ে সরকারি চাকরিজীবী। তোর ব্যবসা, সংসারের অর্ধেক ভার ও একাই বহন করতে পারবে। আমাদের আর কোন পিছুটান থাকবে না। মাস শেষে গোনা টাকা ঘরে আসবে।”
–“আমার কোনকিছু চাই না আম্মা। শুধু চোখে প্রশান্তি দেয়ার মতো একটা সুন্দর বউ চাই। ঘরে এসে যেনো বউয়ের এক ঝলক দেখলেই অন্তত মনটা ভালো হয়ে যায়। এই মুখ দেখে সকালে ঘুম থেকে উঠলে তো আমার বেঁচে থাকা ব্যবসাটুকুও লসে যাবে। টাকা পয়সা কিছু না আম্মা, মনের শান্তি আগে। তুমি এখান থেকে চলো!”, ছেলেটি ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলল। পৌঢ় মহিলা ছেলেকে টেনে নিয়ে গেলেন বারান্দায়। অনেক বোঝানোর চেষ্টা করলেন কিন্তু শেষমেশ ব্যর্থ হলেন। পারলেন না ছেলেকে অর্থের গুরুত্ব বোঝাতে! সে রেগে গেল ছেলের উপর। রেগে বলল,
–“ব্যাটা মানুষ শুধু সুন্দরী বউ চাই তাদের! তা ছাড়া মাথায় অন্যকিছু আর কাজ করে না। যখন না খেয়ে থাকবি না তখন সুন্দরী বউ এর সৌন্দর্য ধুয়ে ধুয়ে খাস!”
বলেই পৌঢ় মহিলা চলে গেলেন সোনার ডিম পাড়া হাঁস হারানোর একবুক হাহাকার নিয়ে। মনে মনে বিলাপ তার, নারী নির্বাচনের ক্ষেত্রে ছেলে মানুষ আসলেই বোকা! নারী মানেই কেনো আগে সৌন্দর্য বিবেচনায় আসে?
বসার ঘরে গিয়ে সে আফসোসের সাথে তহমিনাকে জানালেন,
–“আপা, বোঝেন-ই তো সব ছেলেই চায় তার বউটা একটু সুন্দরী হবে। কিন্তু আপনাদের মেয়ের কথা তো আর বলে বোঝাতে হবে না, আপনি বোঝেন। আপনার মেয়ে যদি শ্যামলাও হতো তাও আমার ছেলে কিছু একটা ভাবতো তাকে নিয়ে। কিন্তু…আসলে আমি অনেক বুঝিয়েছি আমার ছেলেকে। সুন্দর তো আসল নয়, আসল হলো মন আর আদব-কায়দা। যেখানে আপনার মেয়ে এগিয়ে। কিন্তু আমি আমার ছেলের সাথে পারলাম না।”
তহমিনা নিরুত্তর থমথমে মুখ কালো করে চুপ করে বসে রইল। নিজের ঘর থেকে সদ্য বের হওয়া ইনসিয়া কারোর এমন কথায় বসার ঘরের দিকে এগিয়ে গেল, কি হচ্ছে তা দেখার জন্য। দু মিনিট বসতেই সে সব ঘটনা বুঝেগেলো। পাত্রর বেশে থাকা ছেলেটি মাকে টেনেটুনে ঘর থেকে বের করার প্রয়াসে মগ্ন ছিল। কিন্তু তন্মধ্যেই ভরা মজলিশে একটা সুন্দর মুখশ্রী ভেসে উঠতেই সে থমকালো। মাকে তাড়া দেয়া বন্ধ করে সে ইনসিয়ার আপাদমস্তক দেখলো। ফর্সা গড়ন, খাঁড়া নাক, টানা টানা চোখ, লম্বা, কোমড় সমান চুল— সৌন্দর্যের কোন ঘাটতি নেই। পাত্র চকচকে দৃষ্টিতে তাকালো এবার মায়ের দিকে। পরপরই তহমিনার দিকে অসন্তোষের দৃষ্টি ফেলল। এতো সুন্দর মেয়ে লুকিয়ে রেখে এমন কালো মেয়ে দাঁড় করিয়ে দেয়ায়। সে মাকে কনুই দিয়ে ঠেলে ইনসিয়াকে দেখালো। জানালো তার খুব পছন্দ হয়েছে মেয়েটিকে। জোর করলো ইনসিয়ার জন্য প্রস্তাব রাখার জন্য। পৌঢ় মহিলা বেশ সাবলীল ভাবেই নির্লজ্জের মত হাস্যোজ্জ্বল মুখে সকলের কাছে ইনসিয়ার জন্য প্রস্তাব রাখলো। আচমকা এহেন কথায় তহমিনা তার বৃদ্ধ মা ভড়কালো। ইনসিয়া নিজেও ভড়কালো। দাঁত কিড়মিড় করে তাকায় পাত্রের দিকে। একগাল হেসে বসে থাকা ছেলেটিকে দৃষ্টিতে ঝলসে দেয়ার ব্যর্থ প্রচেষ্টা করে সে গটগট করে ঘরে চলে গেল। ইন্দুবালা অনঢ় অনুভূতিহীন নত মস্তকে তখনো সেখানে বসে। কারণ এহেন অপমানজনক অনুভূতিতে সে অভ্যস্ত। বহুবার এমন অনুভূতির সামনা করেছে বড্ডো দক্ষতার আর নির্লিপ্ততার সাথে। কেউ বোঝেই না, তার ভেতরটা দম বন্ধকর অনুভূতিতে ধীরে ধীরে মরে যাচ্ছে।
তহমিনা এতক্ষণ নিরব থাকলেও এখন আর থাকতে পারলেন না তেতে উঠলো।
–“আপনার সাহস কি করে হয় নিজের এই অশিক্ষিত, মুদির দোকানদার ছেলের জন্য আমার অমন সুন্দর মেয়ের প্রস্তাব দেয়ার? যান বের হন এখান থেকে। আমার মেয়ের দিকে একটুও বদ নজর দেবেন না। আপনার এই ছেলে আমার মেয়ের যোগ্য নয়। সে কোন বড়ো ঘরের শিক্ষিত ছেলের বউ হওয়ার যোগ্যতা রাখে।”
পৌঢ় মহিলা আর তার ছেলে চমকালো তহমিনার কথায়। পৌঢ় মহিলা বিস্ময় নিয়ে বললেন,
–“আপনি আমার ছেলেকে অশিক্ষিত বললেন কোন সাহসে? বাড়িতে অতিথি ডেকে এভাবে অপমান! আপনাকে কে বলেছে আমার ছেলে অশিক্ষিত? আমার ছেলে ক্লাস টেন পর্যন্ত পড়ালেখা করেছে, পরীক্ষাটাই শুধু দেয়নি। আপনি তো দেখছি আপনার মেয়ের সৌন্দর্য নিয়ে বেশ অহংকার দেখাচ্ছেন। আমিও বলে রাখছি, আমি আমার ছেলের জন্য আপনার মেয়ের থেকেও সুন্দরী বউ আনবো।”
পৌঢ় মহিলা চেঁচাতে চেঁচাতে ছেলেকে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। তহমিনাও চেঁচাচ্ছে। তার একটাই কথা, তার অমন সুন্দর , শিক্ষিত মেয়ের জন্য কোন সাহসে ঐ অশিক্ষিত মুদির দোকানদারের জন্য প্রস্তাব রাখে?
ইন্দুবালা মলিন হেসে মায়ের আহাজারি শুনলো। মাথার ঘোমটাটা খুলে উঠে দাঁড়ায়। শুকনো ঢোক গিলে বারবার পলক ঝাপটে কিছু একটা লুকালো। খোলা চুলটিতে হাত খোঁপা করতে করতে লম্বা লম্বা পায়ে দ্রুত বসার ঘর পেরিয়ে সদর দরজার দিকে চলে যায়। নিজ বিলাপে মগ্ন তহমিনা ইন্দুবালাকে ঘর থেকে বের হতে দেখে চেঁচিয়ে উঠলো,
–“আরে এই অলক্ষুনে, অপয়া মেয়ে কোথাকার—ওদিকে কোথায় যাচ্ছিস? বাছতে বাছতে আজ মুদির দোকানদার প্রস্তাব রাখে তবুও তোর বাপের দর্প ভাঙে না। এখনো এতো বাছাবাছির সময় আর বয়স আছে। যাকে তাকে একটা ধরে কোনমতে বিদায় করবে তা মোটে বোঝাতে পারি না, মাগো। মাগো তুমি একটু তোমার জামাইকে বোঝাও কিছু। একটা মেয়ের জন্য সে কি আরেকটা মেয়েকে পানিতে ভাসিয়ে দেবে? সব ভালোবাসা শুধু ঐ মেয়ের জন্য?”
তহমিনা ফের আহাজারি করতে লাগলো। ইন্দুবালা তো কখন বেরিয়ে গিয়েছে ঘর থেকে।
লাগাতার কলিং বেলের কর্কশ আওয়াজে মধুমিতা সোফায় বসে চেঁচিয়ে উঠলো,
–“কলিং বেল দেয়া বন্ধ কর বাবু! আমি দরজা কোনমতেই খুলছি না। আর যদি খুলি তো তোর চার হাত পা ভেঙে দেবো পিটিয়ে। তাই ভালোয় ভালোয় বলছি আমার চারপাশ থেকে তুই দূরে সর। তোর মতো অপদার্থ, কু”লা”ঙ্গা”রকে আমি আর ঘরে তুলছি না। সহ্যের একটা সীমা থাকে। তুই কোন সাহসে আমার কষ্টের টাকায় ফূর্তি করিস? শেষ পর্যন্ত মেয়ে বাজি পর্যন্ত চলে গিয়েছিস!”
–“মধু, আমি।”, কারোর ভাঙা কণ্ঠ আবছা ঠিকরে আসতেই মধুমিতা হকচকালো। হাতের পাঁপড় ভাঁজাগুলো কোল থেকে পাশে রেখে উঠে দাঁড়ায়। ছুটে যায় দরজার কাছে। ব্যস্ত হাতে দরজা খুলতেই কেউ ক্ষিপ্র গতিতে জাপ্টে ধরলো তাকে। মধুমিতা চমকালো না বরং আগলে নিল দু’হাতে। ইন্দুবালা সবচেয়ে প্রশান্তিদ্বায়ক বুকটিতে স্থান পেয়ে চোখ বুজলো। ধিমি কণ্ঠে বলে,
–“দম বন্ধ হয়ে আসছে, মধু। কোথাও পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেবে?”
মধুমিতার মুখটি মলিন হয়ে গেল। দরজা আঁটকে মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে শুধায়,
–“আজ পাত্রপক্ষ কি বলল?”
–“কাক!”
চমকালো মধুমিতা। মানুষের জিহ্বার ধার দেখে ঘৃণায় বিষিয়ে আসলো অন্তঃস্থল। পছন্দ না হোক তাই বলে এভাবে ভেঙে দিতে হবে মেয়েটাকে? সে কথা ঘুরানোর চেষ্টা করলো,
–“এগুলো বাদ দে ইন্দু, এগুলো শুধু আল্লাহর কিছু ধৈর্য্যের পরীক্ষা! তোর জন্য যেই মানুষটা আল্লাহ তায়ালা ঠিক করে রেখেছে সে এখনো হয়তো তোর যোগ্য হয়ে ওঠেনি, তাই আসছে না। যতোদিন না আসছে, ততোদিন তো তোকে এই পরীক্ষা গুলোয় হাসিমুখে, ধৈর্য্য সহকারে পার করতে হবে।”
ইন্দুবালা মলিন হাসে মধুমিতার মন ভুলানো কথায়। আক্ষেপ ভরা কণ্ঠে শুধায়,
–“বিয়ে কেনো এতো গুরুত্বপূর্ণ, মধু? বিয়ে ছাড়া মানুষ কেনো একা বাঁচতে পারে না? এই সমাজ কেনো বাঁচতে দেয় না?”
মধুমিতা জবাব দিতে সময় নিল। বিয়ে নিয়ে বিদঘুটে অভিজ্ঞতায় অভিজ্ঞ হওয়ায় তার এই বিষয় নিয়ে কথা বলতে তার ঘৃণা লাগে। সে বলল,
–“সারাজীবন একা একা কি থাকা যায় সোনা? যখন বুড়ো হবি তখন পাশে থাকার, সাহায্য করার জন্য কেউ একজন তো চাই। যখন খুব মন খারাপ হবে তখন কেউ একজন আগলে নেবে, মনের দুঃখ গুলোকে ভাগাভাগি করে নেবে।”
–“আমার দুঃখ কেউ ভাগাভাগি করবে না মধু। আমি বিয়ে করতে চাই না। আমি কোন এক নিস্তব্ধ প্রকৃতিতে হারিয়ে যেতে চাই, যেখানে অন্তত মুক্তভাবে শ্বাস নেয়া যাবে। এই বিকৃত সমাজ আর তার চিন্তাভাবনা আমার পিছু নেবে না।”
–“তবে বাবাকে ঐ কথা দিলি কেনো? চলে যেতি দূরে কোথাও।”
ইন্দুবালা ঘাড় থেকে মুখ তুললো। লালচে আভায় ছেয়ে যাওয়া দৃষ্টি রাখে মধুমিতার নরম আদলে। ক্ষোভ নিয়ে বলে,
–“তোমার ছেলের জন্য!”
মধুমিতা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এই ঘটনা সে জানে। সে বলল,
–“আচ্ছা, এখন আমরা আলোচনার বিষয় বদলাই। বিয়ে আর আমার ছেলে দু’টোই আলোচনার বিষয় হিসেবে বিশ্রী।”
মধু মুখ বিকৃত করে বলল। ইন্দুবালা অশ্রুসিক্ত নয়নে খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো। মধুও হাসলো। ইন্দুবালাকে আগলে নিয়ে সোফায় বসলো। পাঁপড় ভাঁজাগুলো রাখা যেই ঝুড়িতে সেই ঝুড়িটি এগিয়ে দিয়ে বলল,
–“নে তোর পছন্দের পাঁপড়। সন্ধ্যার পর দিয়ে আসতাম। তুই যখন এসেছিস খেয়ে যা।”
ইন্দুবালা নিরবে খেতে লাগলো। কিয়ৎকাল বাদ শুধায়,
–“আজ এতো রেগে গিয়েছিলে কেনো? আমি তো সরল মনে তোমায় তোমার ছেলের কীর্তি রোজকার মতন বলেছিলাম। বুঝিনি তুমি এতোটা রেগে যাবে। আমার কাজে কি তুমি কষ্ট পেয়েছো? যদি কষ্ট পেয়ে থাকো তবে দুঃখিত!”
মধু নির্বিকার চিল মুডে বলল,
–“আরে ইন্দু, তুই আবার ঐ বিরক্তিকর বিষয় তুলছিস কেনো আলোচনার মাঝে? ওটার কথা আমার ইদানিং শুনতে ইচ্ছে হয় না। ধৈর্য্য সহ্যের একটা সীমা আছে। এতদিন চোখের পানি ফেলে ও যখন আনতে সঠিক পথে আনতে পারিনি, তখন রাগারাগী করেও পারবো না। তাই ওর চিন্তা করা আমি ছেড়ে দিয়েছি। তুই বলেছিস একদম ঠিক করেছিস, সামনেও বলবি। এরপর ওর ঘরের আলমারিটা সহ ওকে ঘর থেকে বের করে দেবো। ওর ঘরের সাথে লেনাদেনা-ই তো ঐ আলমারি আর খাবারের জন্য। এই মায়ের টানে তো ও ঘরে আসে না। আসে পাড়া চড়িয়ে বেড়ানোর জন্য মিনিটে মিনিটে পোশাক বদলাতে!” , মধুমিতা রাগ ঝেড়ে বলল।
ইন্দুবালা মলিন হাসে। বাবার পরে এই একটা মানুষ আছে যে তার মনকে প্রশান্তি দেয়। তার সই! যাকে সে ভালোবেসে মধু বলে ডাকে। তার সকল সুখে দুঃখের ভাগীদার। গল্পের মাঝেই মধুমিতা ইন্দুবালার মলিন মুখটি একবার দেখে নেয়। মাঝেমধ্যে যখন মতিভ্রষ্ট হয় তখন খুব ইচ্ছে হয় সিদ্দিকী সাহেবের কাছে ছুটে যেতে আর বলতে, এই মেয়েটাকে তাকে দিয়ে দিক। কি পরিচয়ে দেবে? তার ঐ অপদার্থ, গুন্ডা, মাওয়ালী ছেলের বউয়ের পরিচয়ে? ভাবলে মধুমিতার নিজের-ই ঘৃণা হয়। অমন ভালো মেয়েটির জীবন নষ্ট করার কথা সে কোনভবেই চিন্তা করতে পারে না। যতোই নিজের ছেলে হোক না কেনো! সবার আগে সে একজন মেয়ে!
মেয়ে হয়ে একটা মেয়ের জীবন নষ্ট করার কথা সে মনের ভুলেও ভাবতে পারে না।
*****
আবাসিক এলাকা পেরিয়ে শপিং মল এড়িয়াতে ব্যস্ত জনজীবনের এক কোনায় থাকা চায়ের দোকানে ক্যারাম বোর্ডের চারিপাশে বিশাল মজলিশ। যতো প্রকার অপকর্ম আছে তা বিদ্যমান ঐ ছোট্ট চায়ের দোকানটিতে। সেখানকার ছেলেপুলের মুখে জনপ্রিয় একটি নাম মোত্তাকিন ইরতেজা। উগ্র ছেলেটিকে অর্ধেক বিগড়ে দেয় “ভাই” নামক সম্বোধনটি। মোত্তাকিনের ভাষ্যমতে এই ডাকে অদ্ভুত পিনিক রয়েছে। আর এই নামডাক ধরে রাখাই মোত্তাকিনের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। সিগারেটে সুখটান দিতে দিতে ফোন স্ক্রল করতে থাকা মোত্তাকিনের হাতটি থামলো একটি আইডিতে এসেছে। সদ্যই আপলোড করা ছবিটাতে ইতিমধ্যেই পঁচাশি টি লভ রিয়্যাক্ট উঠে গিয়েছে। সে ছবির মালিককে এতোদিন অদেখা করলেও আজ নিখুঁতভাবে দেখলো। ইনসিয়ার শাড়ি পড়া হাস্যোজ্জ্বল মুখ সাথে স্পষ্ট আকর্ষণীয় দেহের লতানো বাঁক! দাঁতে দাঁত কেটে কিছু একটা ভাবতে ভাবতে মোত্তাকিন ছবিটাকে দেখছে। কিয়ৎকাল বাদ বিতৃষ্ণা ছেয়ে গেল ইনসিয়ার মাঝেও ইন্দুবালার অবয়ব ভেসে উঠতেই। সে বিকৃত কণ্ঠে গালি দিয়ে উঠল। বিড়বিড় করে বলল,
–“জাত শত্রু একটা পেয়েছি, নিন্দুক পড়শী! পিছুই ছাড়ে না।”
ইন্দুবালার ভাষ্যমতে, শয়তানের রাজা মোত্তাকিন ইনসিয়াকে পর্যবেক্ষণ করতে করতেই জীবনে প্রথমবার তার ছবিতে লাভ রিয়্যাক্ট দিল। অতি দয়া দেখে একটা কমেন্ট ও করল “সুন্দরী”। কমেন্টটি করেই সে একগাল হাসলো। ছবিটা মজলিশে দেখিয়ে বলল,
–“ওকে কেমন দেখায় দেখ তো!”
আবদুল্লাহ নিজের বত্রিশ পাটি বের করে বলল,
–“নায়িকা ভাই নায়িকা!”
–“আমার সাথে মানাবে?”
সকলের চোখ এবার বৃহৎ আকারের ধারণ করলো। শুধায়,
–“ভাই, এটা ইন্দুবালা আপার বোন।”
–“হু, এর জন্যই তো দেখতে বলছি। ঐ নিন্দুক পড়শী আমায় কারোর সাথে প্রেম করতে দেবে না আর একটা গার্লফ্রেন্ড না থাকা আমার সম্মানের জন্য হানিকর।”, মোত্তাকিন পা দোলাতে দোলাতে বলল। সকলে বিস্ময় নিয়ে বলল,
–“তার মানে কি আপনি এখন ইন্দু আপার বোনরে ডেট করবেন?”
–“হু। ইন্দু দেখবে, জ্বলবে আর লুচির মতো ফুলবে।”, মোত্তাকিন চমৎকার পরিকল্পনা করে একগাল হাসলো।
সন্ধ্যার নাস্তা করে ইনসিয়া মাত্র ফেসবুকে ঢুকেছিল। ঢুকতেই নোটিফিকেশন আর নোটিফিকেশন। কিন্তু তার দৃষ্টি হকচকালো তন্মধ্যে মোত্তাকিন ইরতেজা নামটি দেখতেই। অতি বিস্ময়ে আর আনন্দে সে চিৎকার করে উঠলো আম্মা বলে। তহমিনা আর ইন্দুবালা তার চিৎকারে ছুটে আসলো। ইনসিয়া প্রফুল্ল চিত্তে মাকে কিছু বলতে গিয়েও বলল না ইন্দুবালাকে দেখে। নিজের বিস্ময় চেপে মেকি গাম্ভীর্যের সাথে খেকিয়ে উঠলো,
–“তুই এখানে কি করছিস?”
–“তোর চিৎকার শুনে এসেছি। এমনভাবে চিৎকার করলি কেনো? কি হয়েছে?”
–“কিছু হয়নি। আমার ইচ্ছে হয়েছে আমি চিৎকার করেছি। এখন যা।”, ইনসিয়া কপাল কুঁচকে বলল। ইন্দুবালা নিরুদ্বেগ মা আর বোনের দিকে শান্ত দৃষ্টি ফেলে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। এখন ভাইকে পড়াতে বসবে। ইন্দুবালা চলে যেতেই তহমিনা চেঁচিয়ে উঠলো,
–“এই ফাজিল অমন চিৎকার দিলি কেনো?”
ইনসিয়া এবার উৎফুল্লতা প্রকাশ করলো। হড়বড়িয়ে বিছানা থেকে নেমে ফোন দেখিয়ে বলল,
–“আম্মা, দেখো দেখো এটা কি!”
তহমিনা সরু চোখে ফোনটি দেখে শুধায়,
–“কি? আমি দেখতে পাচ্ছি না অমন ছোট ছোট লেখা।”
–“আম্মা, মোত্তাকিন ভাই আমার ছবিতে লাভ রিয়্যাক্ট দিয়েছে, কমেন্ট ও করেছে।”
তহমিনার চোখ চড়ক গাছ। সে বিস্মিত কণ্ঠে শুধায়,
–“সত্যিই? কি করেছে? এই বুঝি আল্লাহ মুখ তুলে তাকালো রে ইনসু!”
ইনসিয়া প্রফুল্ল হেসে বলল,
–“সুন্দরী বলেছে আম্মা।”
তহমিনা লাজুক হেসে বলল,
–“যাক এতো দিনে আমার মেয়েটার সৌন্দর্য ওর চোখে বাঁধল। তুই কথা বাড়া জলদি। একবার ভাব ইনসু, তোর আর মোত্তাকিনের যদি কিছু হয় তবে তুই হবি এই দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়রের ছেলের বউ। ওরে ইনসু ভাবতেই আমার কি যে আনন্দ লাগছে!”
মায়ের বোনা স্বপ্নের বীজ এখন ইনসিয়ার মনে গভীর শিকড় গেঁড়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। এটাই এখন ইনসিয়ার ধ্যানজ্ঞান। নিজেকে মোত্তাকিন ইরতেজার বউ হিসেবে দেখা। স্বভাবতই সে ঔদ্ধত্যপূর্ণ এই ছেলের মাঝে দারুণ আগ্রহ খুঁজে পায়। সবাই দেখলেই কেমন ভাই ভাই করে, সবাই সম্মান করে চলে। এলাকায় সবাই একনামে চেনে। সে মায়ের কথামতো কথা বাড়াতে চাইলো। তৎক্ষণাৎ তার কাজে দারুণ গতিবিধি যুক্ত করে ইনবক্সে মোত্তাকিনের একাউন্ট থেকে একটা মেসেজ আসলো,
–“তুই দেখি দিনদিনই নায়িকা হয়ে যাচ্ছিস ইনসু!”
মেসেজটি দেখে ইনসিয়া আর তহমিনার আনন্দের শেষ রইলো না। ইনসিয়া নাওয়া খাওয়া ভুলে তার প্রবল আগ্রহে কথা বাড়াতে মগ্ন হলো।
ছোট ভাই ইমনকে পড়াতে পড়াতে ইন্দুবালা ফোনটি হাতে নিলো। ভাই বর্তমানে ক্লাস এইটে পড়ছে। তার স্কুলেই পড়ছে। তার পড়াশুনার বিষয়াদি দেখাশোনা সে-ই করে। সে ফেসবুকে ঢুকতেই সর্বপ্রথম নিউজফিডে আসলো বোনের ছবিটি। ছবিটির নিচে জ্বল জ্বল করছে মোত্তাকিনের আইডি থেকে করা কমেন্টগুলো। তার ভ্রু উঁচিয়ে যায় সুন্দরী লেখা দেখে। সে অনাগ্রহের সাথেই বেকার জনগনের মতো ইনসিয়া আর মোত্তাকিন কমেন্ট বক্সে একে অপরকে করা একের পর এক রিপ্লাই পড়লো। মিষ্টি মিষ্টি আলাপনের সেই কমেন্ট গুলো পড়ে ইন্দুবালা চোখমুখ কুঁচকে ফোনটা রেখে দেয়। এসব দেখে মেজাজ খারাপ করার কোন কারণ ই নেই। বোনের উপর রাগ হলেও কিছু বলল না। কারণ বোধ তার কোন কথাই শুনবে না। নয়তো একটা গুন্ডার কমেন্টের রিপ্লাই দেওয়ার মতো অপ্রয়োজনীয় কাজের জন্য দুটো কথা বলতো বোনকে।
রাত বাড়লো, বাড়লো মোত্তাকিনের চিন্তাও। ঘুমাবে কোথায়? ইন্দুবালা তো তার শান্তির ঘুম আর খাওয়ার বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। দলের ছেলেপুলেরা অনেকবার বলেছে তাদের কোন একজনের বাসায় ঘুমাতে। কিন্তু তাতে তার নারাজি কারোর বাড়িতে ঘুমানো, কারোর জামা পড়া এসবে মোত্তাকিনের কাছে বেশ বিরক্তিকর ব্যাপার। অনেক ভেবে সে ঘরের পথ ই ধরলো। যেহেতু আজ ঘরের পরিবেশ গরম সেহেতু আজ মোত্তাকিন ভদ্র ছেলে। এগারোটা নাগাদ বাসায় এসে হাজির। কিন্তু ভাগ্য অপ্রসন্ন থাকায় কোনমতেই আজ বদ্ধ দরজা খুললো না তার জন্য। এক ঘন্টা যাবৎ দরজা ধাক্কা দিয়ে, কলিং বের বাজিয়ে ক্লান্ত মোত্তাকিন ক্লান্ত স্বরে অনুনয় করে বলল,
–“ও মামনি, আজকের মতো ক্ষমা করে দাও। ঐ ইনায়ার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই মামনি। দু একদিন ফেসবুকে কথা হয়েছে। তাই বলে আমি মেয়েবাজ হয়ে গেলাম? ইন্দুর কথা শোন তুমি? ও আস্ত এক নিন্দুক! যা হয় তার থেকে দ্বিগুণ বাড়িয়ে বলে। দরজাটা খোল না, খুব খিদে পেয়েছে!”
মধুমিতা অপরপাশ থেকে চেঁচিয়ে উঠলো,
–“ওরে হতচ্ছাড়া, আমার ইন্দুকে নিয়ে তুই একটাও বাজে কথা বলবি না। তোর মুখে ওর নাম ই শুনতে বাজে লাগে। তোকে আমি পেটে ধরেও তোর একটু সহানুভূতি পাইনি আজীবন। আর ঐ মেয়েটাকে আমি পেটে না ধরেও ও আমার আগাগোড়া বোঝে। আমি ওর আগাগোড়া চিনি। তুই এখন দূরে সর আমার দরজা থেকে। এই ঘরে তোর আর কোন জায়গা হবে না, বাবু। আমি ঘুমাতে যাচ্ছি, দালানের অন্য মানুষের সমস্যা হচ্ছে, বিশৃঙ্খলা করবি না। যেখানে এতক্ষণ ছিলি সেখানে গিয়ে ঘুমা আর খা, তোর মা নেই।”
–“এমন করে বলো না মামনি।”, মোত্তাকিন ন্যাকা সুর টেনে বলল। কিন্তু অপরপ্রান্ত থেকে আর কোন সাড়াশব্দ এলো না। মোত্তাকিন কলিং বেল চাপতে চাপতে ক্লান্ত হয়ে বেরিয়ে এলো। গেটে একটা লাথি দিয়ে দালানটির দিকে তাকালো। ভেবেছিল একটা গতি হবে তাই না খেয়েই চলে এসেছে। তার সরল সোজা নরম মামনিটা হঠাৎ করেই বুদ্ধিমতি, চতুর আর কঠোর হয়ে গিয়েছে। নয়তো এতো হাতে পায়ে ধরা কোনদিন লাগেনি। বড়ো অপরাধ করলেও, খিদে পেয়েছে বললেই বুকে টেনে নিত—অথচ আজ! এর পেছনে সব কারসাজি ঐ নিন্দুক পড়শীর। সে রাগে মাথার চুল খামচে ধরে বিড়বিড় করে,
–“ওরে ইন্দুরে তোকে আমি খেয়ে ফেলবো!”
সে কিয়ৎকাল এদিক ওদিক তাকিয়ে সোজা দৃষ্টি তাক করে ইন্দুবালাদের গ্রিল বিহীন বারান্দাতে। চাঁদের আবছা আলোয় ঘরটির সামনে থাকা একঝাঁক ফুল আলোকিত হয়ে আছে। সে নির্ভীকচিত্তে বাড়ির দেয়াল টপকে বারান্দায় চলে গেলো। এদিক ওদিক ঘাড় ঘুরিয়ে অবলোকন করতে করতে ইন্দুবালার শখের দু’টো ফুল গাছ দেখতে পেলো। এগুলো আগে ছুঁতে গেলেও ইন্দুবালা তেড়েফুঁড়ে আসতো। সে আগে সেই দু’টো সিমেন্টের দেয়ালের উপর থেকে টোকা মেরে ফেলে নিলো। টব দু’টো ভেঙে ইন্দুবালার ঘরের জানালা নাড়াচাড়া করলো। হাত বাড়িয়ে ধরতেই চাপিয়ে রাখা জানালাগুলো খুলে গেলো। সে গ্রিলের ফাঁক দিয়ে চোখ ফেলতেই বিছানায় উবু হয়ে শুয়ে থাকা এলোমেলো নারীটির দিকে চোখ পড়ে। ক্রুব্ধ দৃষ্টিতে নম্রতা বোঁচকাবুঁচকি নিয়ে হাজির হলেও সে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিল। পড়নে মেয়েটির তখনো একটা শাড়ি। দেবে যাওয়া শিরদাঁড়া উন্মুক্ত। সে চোখ সরিয়ে নিল। বিড়বিড় করে বলে,
–“বিয়ে করার জন্য একদম নেচেকুদে বসে আছে। এখন থেকেই শাড়ি পড়ে থাকার অভ্যাস শুরু করেছে। সামলাতে পারিস অভদ্র মেয়ে? পিঠ পেট বের করে শুয়ে আছে, অশ্লীল! আবার আমায় বলে গুন্ডা, মাওয়ালী!”
সে ক্ষেপে গিয়ে দরজায় ধুপধাপ দু’টো লাত্থি মারলো। ইন্দুবালার কোন সাড়াশব্দ আসলো না। সে ফের সজোরে দরজা বরাবর লাত্থি দিয়ে খেকিয়ে উঠলো উচ্চস্বরে,
–“এই অভদ্র মেয়ে দরজা খোল! সারাদিন এতো পাপ করে রাতে তুই এতো আরামে ঘুমাস কি করে? পাপের বোঝা তোকে তাড়া করে বেড়ায় না? ওঠ ইন্দুর বাচ্চা!”
ঘুমন্ত ইন্দুবালা ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলো। ফের বারান্দার দরজায় কেউ লাথি দিতেই সে দ্রুত বিছানা থেকে নামলো। মোত্তাকিন চেঁচাচ্ছে,
–“এই ইন্দুর বাচ্চা মরে গিয়েছিস? দরজা খোল!”
ইন্দুবালা কপাল কুঁচকে দরজা খুললো। দরজায় বাহু ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মোত্তাকিন। সে ঘুম জড়ানো চোখে চেয়ে শুধায়,
–“তুই? এখানে কি করছিস এতো রাতে? আর এটা কোন ধরণের গুন্ডামি? এতো রাতে এভাবে চিৎকার করছিস কেনো এখানে?”
–“ভাত দে!”, মোত্তাকিন নিরুদ্বেগ তার প্রশ্নগুলো উপেক্ষা করে বলল।
–“কেনো তোর জন্য তিনবেলা ভাত রেঁধে বসে আছি আমি—যে রাত বিরাতে এসে শুধু ভাত চাস?” , ইন্দুবালা খেকিয়ে উঠলো।
মোত্তাকিন দাঁতে দাঁত চেপে হাসিমুখে বলল,
–“এটা পাপ করার আগে মনে করা উচিৎ ছিল। না তুই আমার পেটে লাথি মারতি আর না আমি রাত বিরাতে তোর কাছে খাবার চাইতাম। আমি না ঘুমিয়ে রাস্তাঘাটে ঘুরবো আর তুই আরামে বিছানায় ঘুমাবি এটা কি করে হতে পারে? যা খাবার আন, খিদে পেয়েছে।”
–“পারবো না।”, ইন্দুবালা দাঁত খিচে বলেই দরজা আটকাতে উদ্বত হলো। আঁচলে সজোরে টান পড়তেই ইন্দুবালা কপাল কুঁচকে পিছু ফিরে তাকায়। মোত্তাকিন হাতে আঁচলের এক কোনা পেঁচাতে পেঁচাতে গাঢ় কণ্ঠে আলতো হুমকির ছোঁয়া নিয়ে বলল,
–“চুপচাপ ভাত আন নয়তো এখন চিৎকার করে এলাকার সবাইকে জাগাবো!”
নেহাৎ ই ভিত্তিহীন হুমকি তবুও ইন্দুবালা শুনলো তার কথা। ঘরে গিয়ে ভাত আনলো। মোত্তাকিন বারান্দায় চাঁদের আলোর মাঝে পা গুটিয়ে বসলো। ইন্দুবালা ভাত, পানি, গামছা নিয়ে আসলো। মোত্তাকিন নির্লিপ্ততার সাথে ভাত নিয়ে ভাত খেতে শুরু করলো। খেতে খেতে আদেশের সুরে দাঁড়িয়ে থাকা ইন্দুবালাকে বলল,
–“এখানে বস!”
–“কেনো ঠ্যাকা পড়েছে?”, ইন্দুবালার ত্যাড়া কণ্ঠ।
–“ঠ্যাকা পড়েনি, একটা চিৎকার দিলেই ঠ্যাকা পড়বে।”, মোত্তাকিন চমৎকার হেসে বলল। পরপরই চেঁচিয়ে উঠলো,
–“কি হলো বসতে বলেছি না?”
ইন্দুবালা রাগ চেপে বসতে বসতে বলল,
–“আমার ঘুম পেয়েছে ঘুমাতে যাবো, তুই খাবার খেয়ে চলে যা।”
–“ফকিন্নি পেয়েছিস? যতক্ষণ এখানে বসবো তুই ও এখানে বসবি। আমার ঘুম কেড়ে নিয়ে তুই আরামে ঘুমাবি এটা তো হতে পারে না, ইন্দু। আমি একা রাত কেনো জাগবো? আজ তুই ও আমার সাথে রাত জাগবি। আর এরপর থেকে আমার সাথে লাগার আগে যেনো তুই শতবার ভাবিস!”
ইন্দুবালা চুপ রইলো। বিছিয়ে রাখা মদুরের উপর হাঁটু ভেঙে মোত্তাকিনের থেকে এক হাত দূরত্বে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসলো, থালার ন্যায় উজ্জ্বল চাঁদের দিকে তাকিয়ে। খাওয়া শেষে মোত্তাকিন আড়মোড়া ভেঙে বলল,
–“যা একটা বালিশ আন।”
–“পারবো না, খাওয়া শেষ এখন বিদায় হ।”
মোত্তাকিন ত্যাড়া প্রত্যুত্তরের প্রেক্ষিতে পা সোজা টানটান করে ইন্দুবালার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়লো। ইন্দুবালা হকচকিয়ে গেল পায়ের উপর মোত্তাকিন শুতেই। চাপা আ’ত’ঙ্ক ভরা কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠলো,
–“অভদ্র, গুন্ডা ওঠ আমার পায়ের উপর থেকে আমি বালিশ আনছি।”
বলেই ইন্দুবালা মোত্তাকিনকে জোরপূর্বক নামিয়ে দিয়ে ঘরে দৌঁড়ে গিয়ে বালিশ আনলো। মোত্তাকিন বালিশ হাতে আড়চোখে ইন্দুবালাকে দেখতে দেখতে তিরস্কারের সুরে বলল,
–“কথায় আছে, লাথোকি ভূত বাতোছে নেহি মানতে। তুই হচ্ছিস এই বাক্যের উৎকৃষ্ট প্রমাণ স্বরূপ এক বনমানুষ। ভালোভাবে বালিশ আনতে বলেছিলাম শুনিসনি।”
সে মাদুরে বালিশ রাখলো। বালিশে মাথা এলিয়ে দিয়ে ফের বলতে শুরু করলো,
–“ফুলের রাজ্যে থাকতে থাকতে তুই আস্ত এক ত্যাড়া ফুলে পরিণত হয়েছিস, ইন্দু। তোর গা থেকে এমন ফুলের গন্ধ আসছে কেনো?”
ইন্দুবালা হাঁটু আঁকড়ে আড়চোখে তাকায় ছেলেটির পানে। চাঁদের আলোয় দৃষ্টি মেলে। মোত্তাকিন চাঁদের আলোয় মেয়েটিকে দেখতে দেখতে বলে,
–“কালো ফুল!”
ইন্দুবালা কপাল কুঁচকে শুধায়,
–“প্রশংসা করছিস নাকি বিদ্রুপ?”
–“কোনটাই না। মনে হলো তুই একটা কালো ফুল। তবে এটা কিন্তু খারাপ না। কালো ফুল হয় রেয়ার, দামী। হাজারের মধ্যে একটা যেমন তুই। হাজারের মধ্যে একটা।”
–“মানে?”, ইন্দুবালা অনাগ্রহে শুধায়।
–“এই যে হাজারটা ছাপড়ির মাঝে তুই একটা স্নিগ্ধ, পবিত্র ফুল। এই যুগে তোর মতো মেয়ে আমি কোথাও দেখিনি। মেধাবী, ভদ্র, কর্মঠ, চরিত্রবান, শালীন—মানে হাজারে একটা।”, বড্ডো সাবলীল অনুভূতিহীন কণ্ঠ মোত্তাকিনের। ইন্দুবালা চুপটি করে শুনলো বর্ণনা টুকু। হয়তো কয়েকবার অগোচরে আওড়ালো ক্ষুদ্র বর্ণনাটুকু।
–“পাত্রপক্ষ দেখতে এসেছিল?”
–“হু।”
–“দেখে কি বলল?”
–“কাক!”, বলেই ইন্দুবালা হাসলো ছেলেটির পানে চেয়ে। মোত্তাকিনের দৃষ্টি মলিন হয়। নাকোচ করে বলে,
–“তারা ভুল বলে, তুই হলি কোকিল।”
প্রেক্ষিতে ইন্দুবালা হাসে, খিলখিলিয়ে হাসে। একটা গোপন কথা হলো তার এই গুন্ডা ছেলেটির সঙ্গ ভালো লাগে। কেননা এই ছেলেটার কাছে তার সৌন্দর্যরা কখনো তুচ্ছতাচ্ছিল্য হয় না বরং ভিন্ন ভিন্ন কিছু মাত্রা পায়, অপার্থিব সৌন্দর্যের কিছু প্রতীকি রূপ পায়। যেগুলো শুনতে তার ভালো লাগে, হোক না স্বান্তনা!
~চলবে~

