#প্রেম_বর্ণহীন
#তোনিমা_খান
#পর্বঃ০৪
–“আমায় এক হাজার টাকা দে।”, ইনসিয়ার হঠাৎ আগমনে শাড়ির কুচি করতে মগ্ন ইন্দুবালা চোখ তুলে তাকায়। শুধায়,
–“এক হাজার টাকা? কি করবি এতো টাকা দিয়ে?”
ইনসিয়া থমথমে মুখে বলল,
–“এক হাজার টাকা তোর কাছে এতো টাকা লাগে? এই যুগে একটা জিনিস কিনলেই তো এক হাজার টাকা শেষ হয়ে যায়।”
–“অথচ সেই এক হাজার টাকা ইনকাম করতে আমাদের ঘাম ঝড়ে যায়।”, ইন্দুবালা মৃদু হেসে বলল। মনোযোগী দৃষ্টি তখনো শাড়ির কুচিতে এঁটে আছে।
–“টাকা চেয়েছি বলে খোঁচা দিচ্ছিস?”
–“তুই ও বাস্তবতা বলেছিস, আমিও বাস্তবতা বলেছি। আমারটা খোঁচা হয়ে গেল?”, ইন্দুবালা চোখে চোখ রেখে বলল। ইনসিয়া দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
–“তোর বাস্তবতা শুনতে চেয়েছি? টাকা দিবি কি-না বল। তোর কাছে টাকা চাওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে ছিল না আমার কিন্তু আব্বুর মেজাজ খারাপ বলে চাইতে হচ্ছে। আমার কলেজে আজ এক হাজার টাকা লাগবেই।”
ইন্দুবালা বেঁধে রাখা চুল গুলো খুলতে খুলতে পার্স খোঁজার জন্য চোখ ঘুরায় এদিক ওদিক। তহমিনা ঘরে ঢুকে ইনসিয়ার উদ্দেশ্যে শুধায়,
–“কি হলো তুই এখনো দাঁড়িয়ে আছিস কেন? তাড়াতাড়ি খেয়ে সুন্দর করে রেডি হ।”
ইনসিয়া জবাব দিল না। শক্ত চোয়ালে দাঁড়িয়ে আছে সে। তহমিনা একবার ছোট মেয়ে আর ইন্দুবালার দিকে তাকিয়ে শঙ্কিত কণ্ঠে শুধায়,
–“কি হলো টাকা দেয়নি এখনো?”
ইনসিয়া না বোধক মাথা নাড়লো। মূহুর্তেই তহমিনা ঝাঁঝিয়ে উঠলো,
–“দুই টাকা কামাই করছিস বলে কি দেমাগ দেখাচ্ছিস? ওর বাপ-ই তোকে এই পর্যন্ত খাইয়ে পড়িয়ে বড় করেছে আর তোর কি-না ওদের পেছনেই টাক খরচ করতে কষ্ট হচ্ছে? প্রায় ত্রিশ বছর পর্যন্ত ওর বাপ তোর পেছনে এখনো যা খরচ করছে তাতে এতোদিনে আমরা আরো ভালোভাবে চলতে পারতাম। ঘরে তো কোন খরচ-ই দিতে হয় না ভাই বোনের পেছনে খরচ করতেও এতো গা জ্বলে?”
লম্বা চুলের বেনুনী খুলতে থাকা হাত দুটো থেমে যায়। চোখ দিয়ে ঝলসে দেয়া তথাকথিত মা বোনের দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল,
–“পার্স খুঁজে পাচ্ছি না, মা। তাই দিতে একটু দেরি হচ্ছে।”
তহমিনা ফোঁস ফোঁস করতে করতে বলল,
–“কেন ঘর থেকে পার্স কোথায় যাবে?”
–“ইমন সকালে টাকা নিয়ে কোথায় রেখে গিয়েছে জানি না।”, ইন্দুবালা পুরো ঘরময় পার্স খুঁজতে খুঁজতে বলল। বয়স যতোই বাড়ছে কষ্টের পরিমাণ কেমন কমে আসছে। এটা ভালো দিক! টলটলে নেত্রে ইন্দুবালা গাল ভরে হাসলো, নিজের সহনশীলতায় সন্তুষ্ট সে।
তাহমিনা এবার নিজের ক্ষুব্ধ অভিব্যক্তি কিছুটা দমিয়ে নিল। ছেলে তবে ওর থেকে টাকা নিয়েই এতো হাসিমুখে স্কুলে গিয়েছে। অন্তঃস্থল শান্তি অনুভব করে। ঘর থেকে যেতে যেতে গমগমে স্বরে আদেশ করে বলল,
–“পার্স খুঁজে ওকে এক হাজার টাকা দিস।”
–“হু।”, ইন্দুবালা বিছানার অপরপ্রান্তে খুঁজতে খুঁজতে জবাব দেয়। সে পার্স খুঁজে পেলো ঠিক বিছানার অপরপ্রান্তের এক চিপায়। তার ছোট ভাইটা খানিক দুষ্টু! কোন জিনিস যেখান থেকে নিবে সেখানে আর রাখবে না। সে এক হাজার টাকা বের করে বোনের দিকে বাড়িয়ে দিল। ইনসিয়া এক প্রকার থাবা মেরে টাকাটা নিয়ে তার দিকে অসন্তোষের দৃষ্টি নিক্ষেপ করে গটগট করে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। ইন্দুবালা সেদিকে তাকিয়ে থাকে এক দৃষ্টিতে। মাঝেমধ্যে সে এই ঘৃণা, লাঞ্ছনার কারণ খোঁজে। খুঁজে পায় কয়টা অক্ষরের বুননে তৈরি কিছু শব্দ। যেগুলো ভীষণ শক্তিশালী! সৎ মেয়ে, কালো, বয়স্ক, বিয়ে হচ্ছে না—এগুলোই তার পাপ।
ধরণীর বুকে বৃষ্টিভেজা যেন শহর ভীষণ মোহনীয় এক দৃশ্য! থাকে না কোন স্যাঁতস্যাঁতে ভাব আর না থাকে বিদ্যুৎ এর অভাব। তবে এই মোহনীয় অনুভূতি ততক্ষণ স্থায়ী হবে যতক্ষণ না বাইরে বের হওয়া যায়।
হালকা লেমন রঙা শাড়ির উপর মাল্টিকালারের ব্লক প্রিন্ট করা এক শাড়ির কুঁচি আঁকড়ে ধরে ইন্দু বেজায় বিরক্তির সাথে রাস্তা পার হয়ে আবাসিক এলাকা থেকে বের হয়। রিকশার জন্য চোখ ঘুরায় এদিক ওদিক! আজ বাবা অনেক আগেই স্কুলে চলে গিয়েছে জরুরি প্রয়োজন থাকায়। নয়তো তার স্কুটারে করেই সে প্রতিদিন যাতায়াত করে। হাত বাড়িয়ে এক রিকশা ওয়ালাকে ডাকলে সে আসলো না। ইন্দু ভ্রু কুঁচকে শুধায়,
–“যাবেন না কেনো?”
–“কারণ আমি তাকে বারন করেছি।”, মোত্তাকিন নিজের বাইকের গতি ঠিক তার পাশেই শ্লথ করল। ইন্দু কপাল কুঁচকে তাকায়। শুধায়,
–“সকাল সকাল এটা আবার কোন ধরণের গুন্ডামি?”
মোত্তাকিন মুখ বিকৃত করে তাকায় তার কঠোর মুখটির দিকে। অসন্তোষের সাথে বলে,
–“তুই আর মামনি ছাড়া কেউ আমায় গুন্ডা বলার সাহস পায় না, ইন্দু। এলাকার ভাই আমি! ভাই ডাকবি নয়তো মুখ ভেঙে দেব বেয়াদব! কেউ শুনলে আমার মান সম্মান থাকবে?”
–“তোর মান সম্মান আছে? কই আমি তো একটা ছ্যাঁচড়া আর গুন্ডা ছাড়া কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।”, মোত্তাকিন ঠোঁটে ঠোঁট চাপল তার কথায়। রাগ উঠলেও দেখাতে পারল না। অদ্ভুত ভাবে সে এই ধরণীতে এই দুই নারীর কাছে দূর্বল। কারণ? কারণ এই দুই নারী তাকে সর্বদা বিপদ থেকে উদ্ধার করার ক্ষমতা রাখে। তাই তাদের সাথে ঘাড়ামি করা মানে নিজের কাল ডেকে আনা। সে কৃত্রিম হেসে বলল,
–“সকাল সকাল তোর সাথে ঝগড়া করার মুড নেই। আয় বাইকে ওঠ, স্কুলে পৌঁছে দিচ্ছি।”
–“একটা গুন্ডার বাইকের পেছনে উঠে আমি আমার মান সম্মান ক্ষুন্ন করতে চাই না। দূর হ এখান থেকে।”
–“তুই এমন করিস কেন? তুই আমায় শত্রু ভাবতে পারিস কিন্তু আমি তোকে বন্ধু ভাবি ইন্দু, ওঠ। দেরি হয়ে যাচ্ছে না? দশটায় ক্লাস তোর! আমি হেলমেট পড়া আছি কেউ দেখবে না আমায়।”, ভীষণ নম্র কণ্ঠে ইন্দুবালা মুখ বিকৃত করে নেয়। এ আবার কোন নাটক! সে বাইকে বসতে বসতে শুধায়,
–“এটা কোন নাটকের স্ক্রিপ্ট, যা তুই আমার সামনে চর্চা করছিস?”
–“লয়াল প্রেমিকের!”, মোত্তাকিন ফিচলে হেসে বলল। ইন্দুবালা বিরক্তি মিশ্রিত নিঃশ্বাস ফেলে, ছেলেটা নিশ্চিত আরেকটা জুগিয়ে নিয়েছে। আজ তিনদিন পর তাদের দেখা। সেই রাতে ইন্দুবালা নিজেকে ঝঞ্ছাটমুক্ত করে মধুর বিনীত অনুরোধ করে। অতঃপর মাঝরাতে মধু রাজি হয় মোত্তাকিনকে ঘরে তুলতে। তবে ঘরে তুললেও মোত্তাকিনের জীবনের শোচনীয় অবস্থা করে রেখেছে মধু। এক বেলাও খাবারে মাছ, মাংস থাকে না, থাকে শুধু কচুর লতি, পানি ডাল আর এক ধরণের সবজি। এগুলো দিয়ে নবাবপুত্রের খাবার গিলতে বেজায় কষ্ট হলেও হাসিমুখে গলাধঃকরণ করে। আবার পকেটের অবস্থাও করুন! একটা টাকাও মায়ের থেকে বের করা যাচ্ছে না। মূলত এর জন্যই ইন্দুবালা এখন তার সখী। বন্ধুমহলে বলে সে নাকি দারুণ অভিনয় করে। সেই অভিজ্ঞতার কাজে লাগিয়েই সে আদুরে গলায় ডেকে ওঠে,
–“সখী শোন!”
–“নিন্দুক পড়শী শুনতে ভালো শোনায়।”, ইন্দুবালা মুখ বিকৃত করে বলল। মোত্তাকিন ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে। ক্রমেই নম্রতা ধরে রাখা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ছে তার জন্য! কতো বড় বেয়াদব মেয়েটা! কেউ ভালো আচরণ করলে তার বিপরীতে বিদ্রুপ করে? তবুও দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
–“তুই আমার শত্রু, বন্ধু সব বুঝলি! পরিস্থিতি ভেদে যখন যেটা উপযোগী সেটাই ডাকবো। এখন পরিস্থিতি ভালো, তাই তুই এখন সখী। আমায় এখন একটু সাহায্য কর অনেক বড় বিপদে পড়েছি।”
ইন্দুবালা সদ্য ব্যস্ততায় জমে ওঠা শহর দেখতে দেখতে শুধায়,
–“কি বিপদ?”
–“আমার একটা ছোট ভাই আছে না তূর্য?”
–“হু।”, ইন্দুবালা অনাগ্রহে জবাব দিল।
–“ওর এক পায়ের হাঁটুর লিগামেন্ট ছুটে গিয়েছে।”
–“লাগিয়ে দিলেই পারিস।”, ইন্দুবালার উদাসীন কণ্ঠে মোত্তাকিন সরব গরম চোখে তাকায়। মেজাজ ধরে রাখতে না পেরে খেকিয়ে উঠে বলে,
–“এটা কি লাঠি পেয়েছিস যে সুপার গ্লু দিয়ে লাগিয়ে দেব গর্ধব মেয়ে! টাকা তোর আব্বা দেবে?”
ইন্দুবালা শান্ত চোখে তাকায়। বলে,
–“তোর কোন ছোট ভাই, আমি চিনবো কেন? আর আমাকে এসব বলছিস-ই বা কেন?”
–“আমি তোকে শুধু শুধু পাষাণ বলি না। তুই কোথায় একটু কষ্ট পাবি তা না।”
মোত্তাকিন মেজাজ দমন করে। আবার নম্র কণ্ঠে বলল,
–“ওর বাবা ভীষণ আর্থিক টানাপোড়েনে দিন কাটায়।তাই ওর চিকিৎসার জন্য আমরা বড়ো ভাইরা মিলে কিছু টাকা জোগাড় করছি। কিন্তু তুই তো মামনির কান ভাঙিয়ে আমার টাকা পয়সা আসার সব ধরণের রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছিস। ছেলেটা হাসপাতালে ব্যথায় কাতরাচ্ছে। শিঘ্রই চিকিৎসা না করাতে পারলে বিপদ হয়ে যাবে রে! তুই এখন আমায় একটু সাহায্য কর।”
দীর্ঘ অনুনয় বিনয় শেষে মোত্তাকিন বিশাল এক শ্বাস ফেলল। মনে হলো, কোন কাজ ই ছোট নয়। অভিনয় করাও কঠিন! সে শুধু শুধু সাকিব খানকে গালি দেয়! অনুতপ্ত হলো মনে মনে। ভাবলো এরপর থেকে কষ্ট হলেও সাকিব খানের সবকটা মুভি দেখবে।
–“আমি কি সাহায্য করব?”, ইন্দুবালা নরম কণ্ঠে শুধালো। সে আবার দয়ালু প্রজাতির মানুষ! নিজের দুঃখের কুলকিনারা না থাকলেও অন্যের দুঃখ দেখতে পারে না।
–“তুই আমায় এমার্জেন্সিতে তিন হাজার টাকা দিবি।”
ইন্দুবালা নিরব রইল, সে সাথে করে পাঁচ হাজার টাকা এনেছে কিন্তু প্রয়োজনে। কারেন্ট বিল দেয়া সহ আরো কিছু কেনাকাটা রয়েছে।
–“কি হলো দিবি না? মামনি টাকা দিলেই আমি তোকে ফিরিয়ে দেব। কিন্তু অসুস্থ মানুষটার আগে চিকিৎসা তো করা প্রয়োজন বল!”
ইন্দুবালা নিজের সব প্রয়োজন সাময়িক তুলে রাখলো আগামী দিনের জন্য। মিহি স্বরে বলল,
–“ঠিক আছে, দেবো।”
মোত্তাকিন স্কুল গেটের সামনে পৌঁছালে ইন্দুবালা ব্যাগ থেকে তিন হাজার টাকা বের করে দিল। মোত্তাকিন নিজ উদ্দেশ্যে সফল হয়ে প্রগাঢ় হেসে বলল,
–“যাই, দেখা হবে পরে।”
ইন্দুবালা কপাল কুঁচকে বলল,
–“দেখা হওয়ার কোন প্রয়োজন নেই, আমার টাকা যেন ঠিক সময়ে পাই।”
–“ঠিক সময়টা এ জীবনে জলদি আসুক। দোয়া করে দিচ্ছি আমি, তুই চিন্তা করিস না। “, এক গাল হেসে বলেই সে বাইক ছুটিয়ে উধাও হয়ে গেল। ইন্দুবালা সে পথে তাকিয়ে থাকল। বুঝেগেল এই টাকা পেতে তার কষ্ট হবে। সে গেট পেরিয়ে ঢুকতে ঢুকতে টাকার প্রতি দাবিদয়া ছেড়ে দিল। সে তো আর ছেলেটাকে গুন্ডামি করতে টাকা দেয়নি, একটা অসুস্থ মানুষের কাজে লাগবে—এই ভেবে অন্তঃস্থল প্রশান্তি অনুভব করে।
তূর্য আর তার ছেলেপুলেরা বেজায় বিরক্ত হয়ে ভাইয়ের জন্য অপেক্ষা করছে। আজ তাদের ভাই সহস্র বারের মতো ডেটে যাবে। ধারণা করা যায় এবার ভাইয়ের ডেট সফল হবে যদি ইন্দুবালা নামক গ্রহন না লাগে। ভাইয়ের জীবনের সুন্দর দিন, ভাইয়ের পকেট শূন্য দেখে আজ তারা প্রত্যেকে চাঁদা উঠিয়ে টাকা জমিয়েছে— যেন ভাই ঠিকঠাক ভাবে ডেট করতে পারে। মোত্তাকিনের বাইক টং এর দোকানের সামনে থামতেই তূর্য হুড়মুড়িয়ে সেদিকে ছুটলো। গলা উঁচিয়ে শুধায়,
–“ভাই, ইনসিয়ার সাথে আজ দেখা করতে যাবেন না?”
মোত্তাকিন বাইক থেকে নামতে নামতে বলল,
–“যাবো, বারোটার দিকে। ওর কলেজ শেষ হলে তারপর ঘোরাঘুরি করবো হাতে সময় নিয়ে।”
হ্যাঁ, মোত্তাকিন আর ইনসিয়ার কথোপকথনের মাঝে ক্ষীণ সময়ের মধ্যেই মিষ্টতা বেড়ে গিয়েছে। অবশ্য এতে ইনসিয়ার প্রচেষ্টা বেশি ছিল। অন্যদিকে মোত্তাকিন সুযোগ সন্ধানী। দুইদিক থেকেই প্রশ্রয় থাকায় আজ তিনদিনের মধ্যে তারা একে অপরের সাথে দেখা করা, ঘোরাঘুরি করার মানসিকতা তৈরি করে নিয়েছে।
তূর্য বেজায় খুশি হয়ে বলল,
–“তিনদিনে ডেটে চলে আসছেন ভাই, একদিনের ডেটে নিশ্চিত বিয়ের আসরে চলে যাবেন? আহ্, এর জন্যই আমার আপনাকে এতো ভালোলাগে। সবকিছুতে ফাইভ জি স্পিড!”
একটু থেমে ফের বলল,
–“ভাই, আন্টি আপনাকে টাইট দিচ্ছে তাই বলে তো আমরা একদম থেমে থাকব না। এই দেখুন, আমরা সবাই মিলে আপনার জন্য টাকা উঠিয়েছি।”
সিগারেটের ফিল্টার ঠোঁটে চেপে মোত্তাকিন গা দুলিয়ে হাসলো তার কথায়। পুরোদস্তুর দর্প নিয়ে বলল,
–“সাকিব খানের জীবনে অপু বিশ্বাস আসা যেমন অসম্ভব, এই মোত্তাকিনের জীবনেও টাকার অভাব দেখা দেওয়া তেমনি অসম্ভব!”
তূর্য চোখ পিটপিট করে তাকায়। শুধায়,
–“ভাই আন্টির রাগ কমে গিয়েছে কি? টাকা দিয়েছে?”
–“মামনি ক্যান দেবে? যে বাঁশ দিয়েছে সে দিয়েছে।”, মোত্তাকিন কপাল কুঁচকে বলল।
–“ইন্দু আপা? সে কি ক্ষমা চাইছে ভাই?”
–“ওর হম্বিতম্বি আমার সাথে চলে নাকি? আমার সাথে লাগতে আসলে শুধে আসলে শোধ নেবো। আর তার নমুনা এই চকচকে তিন হাজার টাকার নোট আর গার্লফ্রেন্ড হিসেবে ওর ই নিজের বোন।”, মোত্তাকিন তিন হাজার টাকার নোট দেখিয়ে খিক খিক করে হাসলো। তূর্য প্রসন্ন মনে হাসলো, বলল,
–“ভাই আপনার জবাব নাই। শত্রুপক্ষকে কিভাবে হাতের মুঠোয় আনতে হয় তা আপনার থেকে শিখুক! এর জন্যই তো কেউ ঝামেলায় পরলেই আপনাকে স্মরণ করে।”
মোত্তাকিন জবাব দেয় না। এ কথা সত্য! সে যার পেছনে লাগে তাকে সর্বহারা না করে ছাড়ে না। এর জন্যই রাজনৈতিক দলের নেতাদের কাছে সে বড্ডো প্রিয়।
*****
সকাল থেকেই বৃষ্টি। স্কুল শেষ করে রিকশার জন্য কয় পা হেঁটে, স্কুলের গলি পেরিয়ে একটু সামনে যেতেই ঝুপঝপিয়ে বৃষ্টি নামলো। বেজায় বিরক্ত ইন্দুবালা ব্যাগ মাথায় দিয়ে ছুটলো বদ্ধ পুরাতন চায়ের দোকানের ভিটের উপর। উপরে শুধু ছাউনীটুকু আছে নিচে চার পাঁচটা খুঁটি আর কিচ্ছুটি নেই। সুবিশাল অম্বর অমানিশায় ঢেকে গেল। বৃষ্টিভেজা শুনশান গলিতে অদূরে আধভেজা কিছু ছোকরা টাইপের লোকজন বাইকের উপর বসে আছে অলস দেহে। এক দুবার উদাসীন দৃষ্টি ফেলেছে তার পানে। ইন্দুবালার বুকটা খচ করে ওঠে। আঁচলটা পুরো দেহে পেঁচিয়ে কিয়ৎকাল রিকশার খোঁজে এদিক ওদিক তাকিয়ে গুটিয়ে রইলো। কোন রিকশা নেই। বাবার আরো দেরি হবে বাড়ি ফিরতে। শঙ্কিত মন নিয়ে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তন্মধ্যেই তার শঙ্কা, ভয় দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়ে এক ফর্মাল বেশভূষায় থাকা পরিপাটি অবয়ব ছুটে এসে দাঁড়ায় তার পাশে ছাউনীর নিচে। ইন্দুবালা দেহ ছেড়ে এবার মুক্ত শ্বাস নেয়। অপেক্ষা করে ঝড়ো হাওয়া আর বৃষ্টি কমার। কিন্তু সে তো কমছেই না বরং বাড়ছে ক্ষিপ্ত গতিতে। সেই ক্ষিপ্র হাওয়ার বেগের সাথে না পেরেই ছাউনীর উপর থাকা কদম ফুল গাছটার একটা ডাল মরমরিয়ে উঠল। চমকায় ইন্দুবালা! তার ঘন পল্লবদ্বয় কেঁপে উঠলো ধপ করে ছাউনীর উপর ডাল ভেঙে পড়তেই। মেয়েটি আর্তনাদ করে উঠল,
–“আল্লাহ!”
ভেজা স্যাঁতস্যাঁতে ভাবের সাথে বোঝাপড়ায় ব্যস্ত অবয়ব সরব ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় আর্তনাদ কারীর দিকে। অতঃপর ছাউনীর দিকে এক পলক তাকিয়ে সৌজন্যমূলক কণ্ঠে বলল,
–“ছাউনী অনেক মজবুত, ভেঙে পড়বে না। ভয় নেই, মিস।”
ইন্দুবালা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় এক পলক। নিরুত্তর পুনরায় দৃষ্টি নিজ জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল। চোখেমুখ অপেক্ষার তৃষ্ণায় হাহাকার করছে। এ কেমন ঝামেলা! তার ঝামেলায় অদ্ভুত মোহনীয় অনুভূতি সৃষ্টি করল ছাউনী টপকে একটা কদম ফুলের ডাল ঝুঁকে পড়তেই।
কদম ফুল চুইয়ে চুইয়ে বৃষ্টির পানি ঝড়ার সেই মোহনীয় দৃশ্যে ইন্দুবালার ঠোঁটের কোনে স্মিত হাসি ফুটে উঠল।
সে লোভাতুর দৃষ্টি ফেলে হাত বাড়িয়ে দিল কদম ফুলগুলোর দিকে। একটা ছিড়বেই চোখেমুখে এমন দৃঢ়তা। কিন্তু হায়! পাঁচ ফুট চার ইঞ্চি ইন্দুবালা লিলিপুট বনে গেল কদম ফুলগুলোর উচ্চতার কাছে। সে কি আফসোস! ইন্দুবালা ব্যথিত নয়নে তাকিয়ে রইল ছিঁড়তে না পারা স্নিগ্ধ সিক্ত ফুলগুলোর দিকে। সরব তার আফসোসে ভরা দৃষ্টিতে একছটা উজ্জ্বল আলোর রশ্মির ন্যায় প্রভা ছড়ায় একটি লম্বা হাত। হাতটি তাকে টপকে বড্ডো অনায়াসে দু’টো কদম ফুল ছিঁড়ে আনলো। ইন্দুবালা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় অতি নিকটে থাকা পরিপাটি অবয়বের দিকে। শ্যামরাঙা বরনের অধিকারী লোকটির চোখেমুখে স্নিগ্ধ হাসির রেখা। ইন্দুবালার দিকে বাঁকা চোখে চেয়ে আছে। সেভাবেই হাতের কদম ফুল দুটো বাড়িয়ে দিয়ে অদ্ভুত কণ্ঠে শুধায়,
–“একটা ফুলের জন্য এতো আফসোস?”
অযাচিত কৌতুহল ভালো লাগলো না ইন্দুবালার। তাই পুরোদস্তুর উপেক্ষা করে দুই পা দূরে গিয়ে চুপটি করে দাঁড়িয়ে গেল। কি আশ্চর্য লোকটিও তার মতো দুই পা এগিয়ে আসে। ইন্দুবালা কপাল কুঁচকে তাকায় তার পানে। লোকটি সেই রাগান্বিত মুখটির দিকে বাঁকা চোখে তাকায়। রাগলে কালো বরনটিও কেমন অদ্ভুত দেখতে লাগে। সে কদম ফুল দুটো পুনরায় বাড়িয়ে দিয়ে স্মিত হেসে বলল,
–“ভয় নেই মিস, নিন। একটা ফুলের বিনিময়ে আমি আপনাকে চাইবো না বিশ্বাস করুন!”
কি আশ্চর্য! ইন্দুবালা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল মনগড়া সেই কথায়। রাগ, বিরক্তি, ফুলের প্রতি লোভের সংমিশ্রণে ক্ষয়াটে আভা ছড়িয়ে গেল তার চোখেমুখে। সে নিলো না, একটি রিকশা তন্মধ্যেই হাজির হয়। সে ঘন ঘন হাত নেড়ে ষাট টাকার ভাড়া একশো টাকা দিয়ে উঠে গেল। অচেনা অদ্ভুত লোকটি তখনো তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে।
রিকশায় নিজ গতিতে চলতে শুরু করলে ইন্দুবালা ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে নিজের ব্যাগ কোলে রাখলে অবাক হয়। ব্যাগের স্বল্প খোলা চেইনের ভেতর ঢুকানো কদম ফুলের ডালটি। তার ব্যাগের সৌন্দর্য কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়ে নত শির দুলছে দুটি কদম ফুল। সে চমকে রিকশা থেকে পিছু ফিরে তাকায়। ছাউনীর নিচে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি হাসছে। লোকটা কখন তার ব্যাগে ফুলদুটো রাখলো?
রিকশা আবাসিক এলাকার ঠিক একটু আগে একটা জমজমাট নামকরা রেস্তোরাঁর সামনে থামায় ইন্দুবালা। ভাই আবদার করেছে বাসায় ফেরার পথে হানি চিকেন উইংস আর বার্গার নিতে। সে সেগুলো নিতে রেস্তোরাঁয় ঢুকলো। রিসিপশনে গিয়ে অর্ডার করতে নিলে তার ভ্রু কুঁচকে গেল রেস্তোরাঁয় এক কোনার টেবিলে মোত্তাকিনকে দেখে। তার চেয়েও বেশি অবাক হলো মোত্তাকিনের সাথে ইনসিয়াকে দেখে। দু’জনে পাশাপাশি বসে মিটিমিটি হাসছে আর কথা বলছে। সম্মুখে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বাহারি রকমের খাবার।
মোত্তাকিন ফ্রেঞ্চ ফ্রাইতে কামড় দিতে গিয়ে আঙুলেই কামড় বসিয়ে দিল রিসিপশনে ইন্দুবালাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। ছেলেটা আর্তনাদ করে উঠল নিজের হাত নিজে কামড়ে। দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করল,
–“ঘরে জায়গা পেয়েছি মাত্র তিনদিন এর মধ্যেই আবার ঘর ছাড়া হলে কোথায় থাকবো? একটা বিয়ে করা অতিব জরুরী হয়ে গিয়েছে দেখছি। মা বের করে দিলেও শশুর শাশুড়ি আগলে নেবে।”
ইনসিয়া আঁতকে উঠল তার আর্তনাদে। ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আঁকড়ে ধরলো মোত্তাকিনের হাতটি।
–“এ কি নিজের হাতে নিজে কামড়ালে কেনো? খাবারের কি অভাব পড়েছে? আর কি খাবে বল, আমি অর্ডার করছি।”
–“ভাই, আয়মান ভাই আপনার সাথে জরুরী ভিত্তিতে দেখা করতে চাইছে। আপনার কি হইছে?”, তূর্য গলা ফাটিয়ে চেঁচাতে চেঁচাতে ইন্দুবালাকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেল মোত্তাকিনের কাছে। ইনসিয়াকে দেখে গাল ভরে হেসে লম্বা সালাম দিয়ে বলল,
–“আসসালামুয়ালাইকুম ভাবিজানননন! আমার ভাইয়ের খেয়াল রাখছেন তো?”
মোত্তাকিন এবার ডানে বামে মাথা নেড়ে অসহায় দৃষ্টিতে তাকায় ইন্দুবালার দিকে। ইন্দুবালা শান্ত চোখে তূর্যর পায়ের দিকে তাকিয়ে আছে। ও আগে থেকেই চিনত তূর্যকে মোত্তাকিনের করুনা আসলো নিজের দশায়। বিশ্রী ভাষায় গালি দিল তূর্যকে। বিড়বিড় করে বলল,
–“শালা তোর এখনি আসতে হয়েছে? বলেছি না প্রাইভেট টাইমে যেন তোদের আশেপাশে না দেখি?”
–“ভাই, আমি আসতে চাইনি। আয়মান ভাই জোর করে পাঠাইছে। বলছে আপনাকে লাগবেই।”, তূর্য কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল।
–“ম্যাম, আপনার অর্ডার।”, ইন্দুবালা নড়েচড়ে উঠল রিসিপশনিস্টের কথায়। অর্ডার নিয়ে বিল পে করে সে অতি দ্রুত বেরিয়ে গেল সেখান থেকে। মেয়েটার চোখেমুখে কেমন অভিমান যুক্ত ক্লেশ! নিজেকে উপকারী কোন ঘৃণ্য বস্তু মনে হলো। সবাই তার থেকে উপকার ও চাইবে আবার প্রেক্ষিতে ঘৃণা, মিথ্যা, অবহেলাও দেবে।
~চলবে~
এরপরের পর্ব কবে দেব ঠিক নেই। পরীক্ষা দরজার সম্মুখে, দোয়া করবেন সবাই। সুযোগ পেলে অবশ্যই পর্ব পাবেন। ভুলত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন

