#প্রেম_বর্ণহীন
#তোনিমা_খান
#পর্বঃ০৬
আবাসিক এলাকার ঠিক প্রবেশদ্বারের গলিটিতে একটি বাইক দেখতেই কালো গাড়িটির গতি শ্লথ হয়ে আসে। কিন্তু বাইকটি ঠিক তার উল্টো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলো। গাড়িটি ঠিক যেই হারে গতি হারালো, বাইকটি ঠিক সেই হারে গতি বাড়ালো। মুহিত ইরতেজা গাড়ির জানালা থেকে মুখ বের করে দ্রুতগামী বাইকটির দিকে তাকায়। নাহ বাইকটি নয়, তার উপর থাকা এলোমেলো, উশৃঙ্খল ছেলেটির দিকে। শেষবার কবে কোলে নিয়েছিল? ছয় বছর বয়সে, আবছা মনে আছে। তখন তাকে দেখলেই হাসতো, কোলে আসতো, আদর করতো, বাবা বলে ডাকতো, তার সাথে থাকার বায়না করতো… কিন্তু তারপর? বুঝ হতেই তাকে ঘৃণা করতে শুরু করলো। কারণ? সে তার বাবা বলে? তার মাকে ভালোবেসেছে বলে? কি অদ্ভুত! এই দুনিয়াতে ভালোবাসা ও যে অপরাধ! সে প্রেমে পড়েছিল এক চঞ্চল, নরম, প্রাণবন্ত মধুর অথচ সেই মধুকে সে নিজেই পাথরে পরিণত করে দিয়েছে। তাই তো এতো গুলো বছর নিজের ছেলেটার ধারেকাছেও ঘেঁষতে পারেনি। আজ ছেলে ঠিক তার সমান সুঠামদেহী হয়ে গিয়েছে। ম্লান হাসলো মুহিত ইরতেজা। মিহি স্বরে বলল,
–“গাড়ি স্টার্ট দাও।”
বাইকটি দালানের গেটে ঢুকিয়ে রেখে মোত্তাকিন আবার বেরিয়ে আসলো। অলস পায়ে ইন্দুবালার বারান্দার সামনে কিছুক্ষণ ঘুরঘুর করলো একটু দেখার প্রয়াসে। আজ এক সপ্তাহ, তার ইন্দুবালার সাথে দেখা হয়নি, কথা হয়নি। তার থেকেও অবাক করা বিষয় হলো, ইন্দুবালা মাকে কিছু বলেনি তার আর ইনসিয়ার ব্যপারে! তার সমস্যাটা ঠিক এখানেই। ইন্দু কেনো বললো না? টাকাও চাইলো না, রাগ করেছে কি? বহুক্ষণ অপেক্ষা করেও ইন্দুবালার দেখা পেলো না সে। অতঃপর ঘরে চলে যায়। সদর দরজা নিঃশব্দে খুলে পা টিপে টিপে ঘরে ঢুকতে নিলে, নাক টানার শব্দে মোস্তাকিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে দাঁড়িয়ে যায়। ডাইনিং টেবিলে থাকা এলাচির কৌটা থেকে একটা এলাচি মুখে দিয়ে মায়ের ঘরের দিকে পা বাড়ায়। তিনটা রুম, একটা ডাইনিং রুম আর রান্নাঘর দুইটা বারান্দার বেশ বড়সড় একটা ফ্লাট। ঢাকা শহরে এসেছে পর থেকে এই বাড়িতেই তারা থাকছে। এই বাড়ির মালিক দুই বৃদ্ধা! খুব স্বল্প টাকায় এই বিশাল বাড়ি কেউ ভাড়া দেবে না। মধুমিতা নিজের বাড়ি মনে করেই এই বাড়িটির পরিচর্যা করে আসছে আজ এতো বছর যাবৎ! দুই বৃদ্ধার চোখের মনি মধুমিতা। বিপদে আপদে সবসময় ঢাল হয়।
শুয়ে শুয়ে গুনগুনিয়ে কাঁদতে থাকা মাকে দেখে মোস্তাকিন দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়ায়। এলাচি চিবুতে চিবুতে চোখমুখ কুঁচকে বলল,
–“রোজ রোজ খারাপ ব্যবহার করো আর রোজ রোজ এমন একা একা কাঁদো! এর কোন মানে আছে মামনি?”
–“কান্না এমনিই এসে যায় আমি কি করব? আমি ইচ্ছে করে কাঁদি?”,মধুমিতার অনুযোগ ভরা কণ্ঠ। সে সত্যিই কাঁদতে চায় না। কিন্তু নিজ অপরাগতায় সে বিরক্ত! মোত্তাকিন মুখ বিকৃত করে নেয় মায়ের জবাবে। ডানে বামে মাথা নেড়ে অতিষ্ট হয়ে বলল,
–“তাহলে এরপর থেকে একদিন গলা জড়িয়ে ধরে চুমু দেবে, দেখবে সারারাত হাসি আসছে।”
–“এই অজাতের বাচ্চা যা এখান থেকে!”
সহসা একটা জুতা উড়ে আসলো মোত্তাকিনের মুখ বরাবর। মোত্তাকিন হড়বড়িয়ে দূরে সরে যায়। ক্ষেপে যাওয়া মাকে দেখে আলাভোলা হেসে এগিয়ে যেতেই মধুমিতা তেড়ে আসে। মোত্তাকিন ছুটে গিয়ে তাকে জাপ্টে ধরে। হেসে এক পাক শূন্যে ঘুরিয়ে বলে,
–“আরে আমার সুইট মামনি, এতো রাগতে নেই।”
–“ছাড় অভদ্র ছেলে! রাত বিরাতে ঘরে এসে তুই আহ্লাদ করছিস আমার সাথে? সারাদিন যে আমি খেটে মরি তার কোন খেয়াল আছে? আর তুই এলাচি খাচ্ছিস কেনো? সিগারেট খেয়েছিস?”
মধুমিতা চেঁচাচ্ছে। ক্ষিপ্ত মাকে নিয়ে মোত্তাকিন বিছানায় শুয়ে পড়েছে। পেছন থেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আহ্লাদী সুরে বলল,
–“ও মামনি তুমি একজনের রাগ আরেকজনের উপর দেখাচ্ছো কেনো? তুমিই তো বলো, এলাচি খাওয়া ভালো! ঘরে আসলে এমন করো তাইতো ঘরে আসতে ভালো লাগে না।”
মধুমিতা ছেলের শক্ত বাঁধন থেকে ছুটতে ছুটতে বলে,
–“অপদার্থ ছেলে, ঘরে ভালো লাগবে কি করে? ঘরে কি সিগারেট, মেয়েমানুষ আর তোর ঐ ছাগলের ছানাপোনারা আছে? এতো যন্ত্রনা আমি আর নিতে পারছি না বাবু, তার চেয়ে তোরা আমায় একবারে মেরে ফেল। সবাই আমায় শুধু ব্যবহার করে! একজনের জন্য আজ আমি নিজের সাথে চোখ মেলাতে পারি না, আর তোর জন্য আমি পাড়ার মানুষের সাথে চোখ মেলাতে পারি না। সবাই বলে আমি একজন ব্যর্থ মা! একটা নেশাখোর, গুন্ডার মা! এগুলোই কি আমার প্রাপ্য? আমার পাপটা কোথায় বল?”
মধুমিতা পুনরায় কাঁদছে। মোত্তাকিনের চোখমুখ থেকে গাছাড়া ভাব সরে যায়। মায়ের মাথায় চুমু দিয়ে বলে,
–“তোমার কোন পাপ নেই, সবসময় মানুষের কথা, দুনিয়ার পরোয়া কেনো করো?”
মধুমিতা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় ছেলের দিকে। বয়স পঞ্চাশের দোরগোড়ায় হওয়ায় চোখেমুখে বেশ ছাপ পড়েছে , জীবনের বিরূপ গতিবিধি তো আছেই! সে অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকিয়ে বলে,
–“তবুও তুই সঠিক পথে আসবি না?”
মোত্তাকিন মাকে ছেড়ে দেয়। এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে বলে,
–“সবটা ছেঁড়ে দেও বললেই ছেড়ে দেয়া যায় না মামনি। এতোটা সহজ না। খিদে পেয়েছে খাবার দাও।”
মধুমিতা আজো ব্যর্থ মায়ের মতো চেয়ে রইলো। মায়ের কোন দুঃখ এই ছেলের গায়ে লাগে না। আর সে কি-না এই ছেলের জন্য প্রতিনিয়ত বেঁচে থাকার স্বপ্ন বোনে। সে ব্যর্থতা আগলে ভাত দিলো ছেলেকে। ভাত খেতে খেতে মোত্তাকিন নরম সুরে বলে,
–“সেদিন একটু বিপদে পড়েছিলাম মামনি, কিছু টাকার খুব প্রয়োজন ছিল। তাই ইন্দুর থেকে তিন হাজার টাকা নিয়েছিলাম। অনেক দিন হয়েছে, ফেরত দিতে হবে। টাকা দেবে কিছু?”
মধুমিতা শান্ত চোখ তুলে তাকায়। ছেলের আদ্যোপান্ত জানায়, বলল,
–“কোন প্রয়োজন ছিল না, বাবু! আমি টাকা দেইনি বলে তুই ঐ মেয়েটাকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করেছিস, তাই না? আমার না ঠিক এখানটাতে এসেই কষ্টটা আরো বেশি হয়, আমি একটা অমানুষ জন্ম দিয়েছি। ঐ মেয়েটার মাথা তুলে বেঁচে থাকার মতো এই চাকরিটুকুই সম্বল! সারাদিন ঘরের লোকের কটু কথা শোনা তারপর পুরোটাদিন স্টুডেন্টদের পেছনে চেঁচিয়ে টাকা ইনকাম করে। আর তুই ওর থেকে টাকা নিয়েছিস বিলাসীতা করার জন্য! আল্লাহ তোকে হেদায়েত দান করুক!”
মধুমিতা দাঁতে দাঁত চেপে বলেই উঠে যায় চেয়ার থেকে। মোত্তাকিন মায়ের এমন কথা শুনে শুনে অভ্যস্ত হওয়ায় আজো সেগুলো কানে তুললো না। মধুমিতা তিন হাজার টাকা ছেলের সামনে রেখে আবার ঘরে চলে যায়। মোত্তাকিন টাকা পেয়ে খুশি হয়ে গেল। ভাবলো টাকা ফিরিয়ে দিলেই ইন্দুবালার রাগ ভেঙে যাবে।
সে ঘরে গিয়ে বারান্দা থেকে উঁকি দিলো। অবাক হলো এতো রাতেও ইন্দুবালাকে এখানে না দেখে। প্রতিদিন প্রায় গভীর রাতে ইন্দুবালাকে এখানে দেখা যায় একা একা চন্দ্র বিলাস করতে। একা একা জেগে থেকে কি শান্তি পায় ও জানে! সে বিচলিত মন নিয়ে ফোন হাতে নিলো। নাম্বারে ফোন দিল কিন্তু পেলোনা। সে ফেসবুকে গেলো, অবাক হলো ইন্দুবালা সব জায়গা থেকে তাকে ব্লক করে দিয়েছে। হতভম্ব হয়ে গেল সে! যেনো এমনটা হতেই পারে না। খোটাখুটির এই সম্পর্কে এতো বছরে ইন্দুবালা কখনো তাকে ব্লক করেনি আর না সে করেছে। একে অপরকে স্টক করতেও তাদের পৈশাচিক মন আনন্দ পায়!
*****
ধরণীতে আজ বারিধারার ছিটেফোঁটাও দেখা যায়নি। তবুও শহুরে দূষণ, ম্যানহোলের ঢাকনা উপড়ে বেরিয়ে আসা ময়লা পানিতে শহুরে পথঘাটের বেহাল দশা! ব্লক প্রিন্টের শাড়ির কুচি চেপে ইন্দুবালা দ্রুতপায়ে রিকশা থেকে নেমে কনফেকশনারি প্লাস রেস্তোরাঁয় ঢুকলো। বাড়ির পরিবেশ খুব একটা ভালো না। তার মতো শান্তিপ্রিয় মানুষের জন্য এই পরিবেশ জেলের সমান। তাই ভেবেছে আজ অনেক খাবার কানে নিয়ে যাবে সবার জন্য, এগুলো পেলে কেউ আর মুখ ভার করে থাকতে পারবে না। সে রেস্তোরাঁর অংশ পেরিয়ে রিসিপশনে গিয়ে দাঁড়ায়। ভাবনা মোতাবেক সব কিনলো, আর কিছু ফাস্টফুড ও কিনলো। ওয়েটার প্যাক করছিল তখন, ইন্দুবালা এই পর্যায়ে অলস দৃষ্টি ফেললো নিজের পাশের ক্রেতাদের দিকে। দৃষ্টি গিয়ে আটকায় একজোড়া মুগ্ধ দৃষ্টিতে। নড়েচড়ে ওঠে ইন্দুবালা নিজের থেকে এক হাত দূরত্বে থাকা ফর্মাল বেশভূষায় আবৃত পুরুষটিকে দেখে। স্মৃতির পাতা ঘাঁটলে ঐ স্নিগ্ধ সিক্ত কদম ফুলদুটি ভেসে উঠলো। সে এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে তৎক্ষণাৎ মুখ ঘুরিয়ে নিল। পুরুষটি শব্দ করে হেসে উঠলো এবার। ইন্দুবালা বাঁকা চোখে সেই হাসি দেখে মুখ গম্ভীর করে নেয়। ওয়েটারের থেকে খাবারগুলো নিয়ে বিল পেমেন্ট করে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে আসতে চায় রেস্তোরাঁ থেকে। কিন্তু নিঃসঙ্গ এই জীবনযাত্রায় কারোর সঙ্গ অনুভব হতেই সে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। ক্রুব্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে অজ্ঞাত পুরুষটির দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়,
–“কি সমস্যা আপনার, আমার পিছু পিছু আসছেন কেনো?”
পুরুষটি স্মিত হাসলো। গলায় ঝুলছে অফিস কার্ড, চেহারায় কসরতের রেশ! সেই হাসিমাখা মুখটি নিয়ে সে বিচলন ছাড়াই মিহি স্বরে বলল,
–“এই অ-ভালোবাসার দুনিয়ায় কেউ যদি আমায় নিজের আঁচলে বেঁধে রাখতে চায়— তবে আমি আজন্ম থাকতে রাজি।”
–“কি অদ্ভুত! আপনি পাগল? আমি কখন আপনাকে..
মুখের কথা মুখেই থেকে গেল ভদ্রলোক নিজের বা হাতটি ইন্দুবালার মুখের সামনে তুলে ধরতেই। চোখ থেকে ক্রোধ মিলিয়ে যায় ঘড়ির সাথে আঁটকে থাকা নিজের শাড়ির টারসেল দেখে। অপ্রস্তুত বিব্রত চাহনি ফেলে সে দ্রুত নিজের শাড়ির আঁচলটা ছাড়ানোর চেষ্টা করে। পুরুষটি নিজেই ছাড়াতে সাহায্য করলো। তবে ছাড়ানো শেষ হলেও আঁচল ছাড়লো না। শুধায়,
–“আপনার নাম জানতে পারি মিস?”
ইন্দুবালা নিজের আঁচল জোরপূর্বক টেনে নিয়ে রুক্ষ স্বরে বলল,
–“কোন প্রয়োজন নেই জানার।”
–“প্রয়োজন থাকতেও পারে মিস!”
ইন্দুবালা এহেন অপ্রস্তুত পরিচয় পর্বে অনাগ্রহী। সে পুরোদস্তুর অজ্ঞাত লোকটিকে উপেক্ষা করে দ্রুত কদমে বেরিয়ে গেল। লোকটি কেমন অদ্ভুত! পুরুষটি চেয়ে থাকে তার যাওয়ার পথের দিকে। ইন্দুবালা সন্দিগ্ধ মনে আবার পিছু ফিরে তাকালে লোকটি গা দুলিয়ে হাসলো। নিজেও বেরিয়ে গেল রেস্তোরাঁ থেকে।
রেস্তোরাঁর গেট পানে চেয়ে থাকা প্রত্যক্ষদর্শী মোত্তাকিনের আঙুলের ভাঁজে অবহেলায় থাকা সিগারেটের ফিল্টারটা ততক্ষণে শেষপর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে। সূক্ষ্ম ছ্যাঁকা খেয়েই মোত্তাকিনের ধ্যান ভাঙল। হাত ঝাড়তে ঝাড়তে মোত্তাকিন নতুন ফিল্টারে আগুন জ্বালায়। চিন্তিত কণ্ঠে শুধায়,
–“কি হলো? এই মাদারবোর্ড কে? ওটা ইচ্ছে করে ইন্দুর শাড়ির আঁচল নিজের ঘড়িতে আঁটকে এমন নাটক করলো কেনো?”
রেস্তোরাঁর এক কোনায় বসে থাকা তূর্য আর সাথের ছেলেপুলেরা ও একিভাবে তাকিয়ে আছে গেটের দিকে। তূর্য কপাল কুঁচকে বলল,
–“আমিও তো এটাই ভাবছি ভাই। নিশ্চিত ইন্দুবালা আপার সাথে ইটিস পিটিস করছে?”
–“সর, ইন্দু অমন মেয়ে না। দেখলি না কেমন রাগ দেখালো? সমস্যা ঐ মাদারবোর্ডের মাঝে! এরপর আর কোনদিন এই এলাকায় কিংবা ইন্দুর আশেপাশে দেখলে আমায় জানাবি।”
–“আচ্ছা ভাই। কিন্তু আপনি ইন্দু আপাকে নিয়ে এতো ভাবছেন কেনো? তার বিয়েটা হয়ে গেলেই তো আপনার জীবন সেট! ইনসিয়া, আপনি… বাহ্ বাহ্ জমে যাবে ভাই। কদিন পরে একটা লেদু নিয়ে আসবেন , আমাদের ছোট সঙ্গী হয়ে যাবে।”, তূর্যর উচ্ছাসে ভরা কণ্ঠ শেষ হতে না হতেই তার কান ঝলসে গেল শক্তপোক্ত এক হাত। তূর্য বা কান চেপে ধরে সরব। মোত্তাকিন দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
–“জেগে জেগে স্বপ্ন দেখছিস? ইনসিয়া আর আমি? পাগল হয়েছিস?”
–“ভাই আপনারা তো প্রেম করছেন।”
–“কচু!”
মোত্তাকিন ঠোঁটে সিগারেট চাপলো। সে এইসব মেয়েলি ঝামেলা কখনোই পছন্দ করতো না। তার বন্ধুমহলের সকলের গার্লফ্রেন্ড রয়েছে, বউ রয়েছে শুধু সে ব্যতীত। একদিন বন্ধুমহলে এই নিয়ে ভীষণ লেগপুল করা হয় তাকে। এরপর থেকে সে চেষ্টা করছে নামেমাত্র একজন সঙ্গী জোগাড় করার। কিন্তু ইন্দুর জন্য সেটুকুও করা দায়! তাই তো ইন্দুকে শায়েস্তা করার জন্য ইনসিয়াকে নিয়ে ফাজলামো করছে। আর এই ছেলে কি-না বউ বাচ্চা অব্দি চলে গিয়েছে। সে মুখ বিকৃত করে বলল,
–“মাথা খারাপ হয়েছে? বিয়ে আর ইনসিয়াকে। সারাদিন শুধু ন্যাকা ন্যাকা কথা বলবে আর বাবু বাবু করে। দুদিন আগেও ভাই বলে চোখ তুলে তাকাতে সাহস পায় না আর এখন ও আমার গায়ে পড়ে আহ্লাদ করে। কোনদিন কানের নিচে একটা দিয়ে বসব সেটা ভাবছি।”
–“তাহলে এগুলো করছেন কেনো ভাই?”
–“একটা গার্লফ্রেন্ড না থাকলে বন্ধুমহলে মানসম্মান থাকে না।”
–“তাই বলে আপনি ব্যবহার করছেন ওকে?”
মোত্তাকিন জবাব দেয় না। চিন্তিত কণ্ঠে বলল,
–“ইন্দুবালা কদিন যাবৎ আমাকে এড়িয়ে চলছে। কথা বলছে না, ওকে দেখাও যায় না, টাকাও চায় না সবচেয়ে বড়ো কথা ও আমায় ফেসবুক থেকে ব্লক করে দিয়েছে।”
–“তাতে কি হয়েছে? আপনার ই তো ভালো! ইনসিয়াকে নিয়ে কাপল ফটো পোস্ট করতে পারবেন।”
–“ইনসিয়া ইনসিয়া ইনসিয়া! তুই শুধু ওকে নিয়ে পড়েছিস কেনো? ওটা আস্ত এক কুটনী বুড়ি! যতক্ষণ কথা বলবে ততক্ষণ শুধু বিয়ে আর ইন্দুবালার দোষ! অথচ তুই তো জানিস ইন্দু কতো নরম মেয়ে!”
–“কিন্তু আপনি তো বলেন ইন্দুবালা আপা প্রচুর খারাপ!”
–“সেটা শুধু আমার সাথে, আর কারোর সাথে না।”, মোত্তাকিন সুখটান দিতে দিতে বলল। ওষ্ঠকোনে মৃদু হাসি। পরক্ষনেই হাসি নিভে গেল ফের ইন্দুবালার উপেক্ষা স্মরণ করে।
তন্মধ্যেই চারজন যুবক এসে মোত্তাকিনের সামনের সোফায় গা এলিয়ে দেয়। যার জন্য এতক্ষণ অপেক্ষায় ছিল তারা আসতেই মোত্তাকিন বিরক্তি মিশ্রিত কণ্ঠে বলল,
–“এতক্ষণ লাগে আসতে?”
পারভেজ ঘাড় কত করে শুধায়,
–“এক সপ্তাহ যাবৎ ক্লাবে যাচ্ছিস না, কাহিনী কি?”
ছাত্র জীবন থেকে এক প্রভাবশালী সংসদ সদস্যের ছত্রছায়ায় থাকায়, স্থানীয় রাজনৈতিক দলের হয়ে মাঝেমধ্যে কাজ করা হয় তার। প্রভাবশালী দলটিকে নিজের ছাতা হিসেবে ব্যবহার করে আসছে তারা। তার বন্ধুরা তার থেকে আরো জোরালোভাবে জড়িত এগুলোর সাথে। মায়ের কারণে সে পুরোদস্তুর এতে যুক্ত হতে পারে না। সে অনাগ্রহে বলল,
–“কোন কাহিনী নেই তাই ইচ্ছে হয়নি যেতে।”
–“তোর সবসময় চমৎকার কারণ চাই মারামারির তাই না?”
–“তবে কি আমি ওখানে প্রেম করতে যাব? আমার যতোটুকু কাজ ততটুকু করলেই হলো!”
পারভেজ চুপ রইলো। কিয়ৎকাল বাদ ফিচলে চাপা কণ্ঠে বলল,
–“আজ একটা বড়সড় খু/নাখু/নি হবে বুঝলি!”
মোত্তাকিন সরু চোখে তাকায়। সিগারেট ঠোঁট থেকে সরিয়ে শুধায়
–“এই এলাকায়?”
পারভেজ মাথা নেড়ে সায় জানায়। মোত্তাকিন কপাল কুঁচকে পুনরায় শুধায়,
–“কে— কাকে খু/ন করবে?”
–“সিটি মেয়রের ছেলেকে!”
–“কোন, উত্তর নাকি দক্ষিণ?”
–“দক্ষিণ! মিরসাদ ইরতেজা আছে না, ওকে?”, পারভেজ নিরুদ্বেগ কণ্ঠে বলল। মোত্তাকিনের মধ্যে সরব আড়ম্বরতা এসে হানা দেয়। ভীষণ সাগ্রহে শুধায়,
–“কেনো? সে কি করেছে? সে তো রাজনীতির সাথে জড়িত না।”
পারভেজ গাছাড়া ছেলেটির হঠাৎ আগ্রহে ভ্রু কুঁচকে নিলো। এই ছেলে হঠাৎ এতো আগ্রহ কেনো দেখাচ্ছে বুঝলো না। বন্ধুমহলের কেউ জানে না এই ছেলেটার আসল পরিচয়! বলল,
–“ক্ষমতার খেলায় ছেলেটা কেবল বাবার ছায়া হওয়ায়-ই খু/নের টার্গেট, ব্যক্তিগত দোষ নেই। উড়োভাসা শুনেছি, উত্তরের সিটি মেয়রের সাথে বেশ আগে থেকেই দ্বন্দ্ব মুহিত ইরতেজার। মুহিত ইরতেজার কারণে বেশ বড়সড় কয়েকটা টেন্ডার হারিয়েছে সে। সেই শত্রুতার জের ধরেই বোধহয় এই পরিকল্পনা! ভেতরে আরোকিছু থাকতে পারে, আমি জানি না।”
মোত্তাকিনের মাঝে বিচলন ছেয়ে গেল। জীবনের এই পর্যায়ে এসে মায়ের সঙ্গ, মায়ের দুঃখের ভাগিদার হতে হতে সে যতোই অস্বীকার করুক যে মুহিত ইরতেজা তার কিছু হয় না। আদোতে সে ঐ মানুষটার ই অংশ! পারভেজ তার বিচলন দেখে হেসে বলল,
–“কি হলো তোর মুখ এমন হয়ে গেল কেনো? তোর নামের সাথে তাদের নামের মিল আছে বলে কি ভয় পাচ্ছিস? আমারো ভাই মনে হয়, কোনদিন না মুহিত ইরতেজার শত্রুরা এসে তোকে মে”রে দেয়। তোদের নামে এতো মিল কি করে আমি আজো বুঝিনা! সত্যিই কি তোদের কোন আত্মীয় স্বজন নেই ঐ পরিবারে?”
–“নাহ, আমাদের কোন সম্পর্ক নেই।”, মোত্তাকিন থমথমে দৃঢ় কণ্ঠে বলল। সে বিচলন সামলাতে না পেরে উঠে দাঁড়ায়। ব্যস্ত কণ্ঠে বলে,
–“আমার একটু জরুরী কাজ আছে, যেতে হবে। তোরা থাক, পরে দেখা হবে।”
–“আরে এতো তাড়াহুড়ো করে কোথায় যাচ্ছিস?”,
পারভেজের কথা শুনলো না মোত্তাকিন। জোর কদমে বেরিয়ে যায় রেস্তোরাঁ থেকে। তখন দুপুর আড়াইটা। সে ফোন বের করে কাঙ্খিত নাম্বারটি খুঁজে বের করলো।
কতশত বছর পর যে মুহিত ইরতেজার ফোনে প্রিয় নামটি ভেসে উঠলো তা বোধহয় অজানা। মুহিত ইরতেজার চোখ চকচক করে উঠলো মোত্তাকিন নামটি দেখে। ছেলে স্ত্রী কোন যোগাযোগ না রাখলেও সে সব তথ্য, খোঁজ নিজের কাছে রাখে। ভীষণ আগ্রহে ফোনটি রিসিভ করেই সে মিহি স্বরে শুধায়,
–“কেমন আছো?”
মোত্তাকিন এদিক সেদিক কোন কথা না বলে সোজাসাপ্টা শুধায়,
–“আপনার ছেলে কোথায়?”
মুহিত ইরতেজার কপাল কুঁচকে নেয়। অবুঝ কণ্ঠে শুধায়,
–“মানে?”
–“আপনার বড়ো ছেলে কোথায় সেটা জিজ্ঞাসা করছি।”
–“মিরসাদ? কেনো ওকে দিয়ে কি করবে?”
–“প্রয়োজন আছে, সে কোথায় বলুন।”
–“আমি অফিসে, মিরসাদ তো মনে হয় বাড়িতে নেই। ওর এক জায়গায় যাওয়ার কথা এখন।”
–“তাকে বলুন, অতিসত্বর কোন সেইফ জায়গায় চলে যেতে।”
–“কিন্তু কেনো?”
–“যা বলছি সেটা করুন।”
মুহিত ইরতেজার ললাটে চিন্তার ভাঁজ দৃঢ় হয়। সে আরেক ফোনে বাড়িতে ফোন দিয়ে শুনলো মিরসাদ কোথায়! জেন বলল,
–“মিরসাদ তো ওর স্ত্রী আর সন্তানকে নিয়ে বাইরে গিয়েছে। খাওয়া দাওয়া করে শপিং করে বাড়ি ফিরবে। কোন ঝামেলা হয়েছে কি?”
–“তার উপর আক্রমণ হওয়ার সম্ভাবনা আছে, সে কোথায় আছে ঠিকনাটা আমায় জলদি দিন।”, মোত্তাকিনের কথায় মুহিত ইরতেজার মুখ বিবর্ণ হয়ে গেল। সে ছেলের ঠিকানা জানিয়ে নিজেও দ্রুত তার সুরক্ষা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নিলো। কিন্তু ততক্ষণে বোধহয় দেরি হয়ে যায়।
শপিং সেন্টারের সামনে গাড়ি থামলে মিরসাদ আর তার স্ত্রী দুই বছরের ছেলেকে নিয়ে গাড়ি থেকে নামে। তার স্ত্রীকে আগে আগে উঠে যায় আর মিরসাদ ধীরস্থির ছেলেকে নিয়ে উঠছে। কিন্তু হঠাৎ ই তার চারপাশ অজানা ভীড়ে জমজমাট হয়ে গেল। মিরসাদ ভ্রু কুঁচকে চারিপাশ অবলোকন করে, এটা স্বাভাবিক ভীড় নাকি অস্বাভাবিক বুঝে ওঠার আগেই ধারালো অস্ত্রের একে অপরের সাথে ঘষার তীক্ষ্ম শব্দ আলোড়ন তুললো। একটা ধাতব পাত নিজের দিকে ধেয়ে আসতেই নিরস্ত্র মিরসাদ ছেলেকে বুকে চেপে ধরে লুকিয়ে নিলো। এযাত্রায় ছেলেকে রক্ষা করা ব্যতীত কোন চিন্তা মাথায় আসলো না। সে খালি হাতেই পাল্টা আঘাত করে সম্মুখের ধেয়ে আসা শত্রুকে প্রতিহত করতে চাইলো। কিন্তু ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলো! কোন আঘাত ই যখন তার গায়ে লাগলো না তখন মিরসাদ চোখ তুলে তাকায়। হকিস্টিকের সপাটে আঘাতে অজ্ঞাত শত্রুপক্ষের মুখ বিকৃত হয়ে গেল। মিরসাদ বুকভরা নিঃশ্বাস ফেলে শুধু ছেলেকে আঁকড়ে ধরে তাকিয়ে রইল। একাধারে সাত আটজন ছেলে হকিস্টিক দিয়ে দুস্কৃতিকারীদের বেদম পেটাচ্ছে। কিন্তু মিরসাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এক ভীড়ের ঠিক শেষ প্রান্তে রক্তাক্ত মাথায় হাত চেপে ধরা মোত্তাকিন। সে ত্রস্ত পায়ে এগিয়ে যায় সেদিকে। আলতো স্বরে ডেকে ওঠে,
–“মোত্তাকিন, বেশি আঘাত পেয়েছো?”
মোত্তাকিন চোখ তুলে তাকায় চিন্তিত মুখটির দিকে। অতঃপর নিরুত্তর প্রশ্ন আর প্রশ্নের মালিককে উপেক্ষা করে গটগট করে চলে যায় সেখান থেকে। মিরসাদ পিছু ডাকলো,
–“মোত্তাকিন আমার কথা শোন! তোমার চিকিৎসার প্রয়োজন!”
মোত্তাকিন শুনলো না আর না পিছু ফিরে তাকালো। মিরসাদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভয়াল দেহে ছুটে আসা স্ত্রীর পানে তাকায়। মৃদু হাসলো তার চোখে পানি দেখে। চোখে আশ্বাস দিয়ে বলে সে ঠিক আছে।
~চলবে~

