প্রেম_বর্ণহীন #তোনিমা_খান #পর্বঃ০৭

0
2

#প্রেম_বর্ণহীন
#তোনিমা_খান
#পর্বঃ০৭

–“ভাবি, মেয়ে মানুষের জেদ কখনো সুফল বয়ে আনে না। আপনি মানুন বা না মানুন, আপনার ছেলের এই দশার শতভাগ কারণ আপনি নিজেই। নিজের জেদে আপনি সংসার ছেড়েছেন, ছেলেটা বাবা হারা। বড়ো হওয়ার একটা ভালো পরিবেশ পায়নি! আপনার উচিত এখন অন্তত সব রাগ অভিমান জেদ ভুলে স্বামীর ঘরে যাওয়া। আর ছেলের জন্য দেখেশুনে একটা ভালো মেয়ে বউ করে আনা। ঘরে বউ আর একটা ভরা পরিবার পেলে ছেলে এমনিই ঘরমুখো হবে।”

ছাদের সতেজ দোদুল্যমান গাছগুলোতে পানি দিতে থাকা মধুমিতার হাত থেমে যায়। টলটল চোখ তার! এক সময় এই চোখে সে বহু স্বপ্ন বুনতো যেগুলো একদিন সব ম্লান হয়ে যায়। যার প্রেক্ষিতে সেও জীবন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। এটা কি জেদ? তার নিজস্ব কোন মতামত, ইচ্ছা অনিচ্ছা নেই? যেই মানুষটার সঙ্গে থাকলে তার দম বন্ধ হয়ে আসে ঘৃণায়, সেই মানুষটার সাথে ঘর করা যে আজাব! সে থমথমে মুখে বলল,
–“আপা, যা জানেন না তা বলবেন না। আমার জীবনের গতিবিধি আপনি জানেন না। আমার রুচি আপনার রুচি এক না, কিংবা আমি কোন অবলা নই যে মুখ বুজে এক বিশ্বাসঘাতকের ঘর করবো।”

তহমিনার মুখটা ছোট হয়ে আসলো। তার রুচি খারাপ? সে অবলা? সে থমথমে মুখে বলল,
–“বলছেন অবলা নন, ভাবি। তাই তো এতো অসহায়ত্ব! ছেলে একটা গুন্ডা তৈরি হয়েছে, এই অসুস্থ শরীর নিয়ে এখনো ঐ ধামড়া বেকার ছেলেকে কাজ করে খাওয়াতে হচ্ছে। এগুলো অবলার-ই নিদর্শন!”

মধুমিতা হাতের পানির পাত্রটি রেখে ফিরে তাকায় তহমিনার দিকে। থমথমে মুখে বলল,
–“হ্যাঁ, ভাবি আমি একজন ব্যর্থ মা! যে কি-না তার সন্তানকে ঠিকমতো লালন পালন করতে পারেনি। কিন্তু তাও তো আমি নিজের খেয়ে পড়ে শান্তিতে আছি ভাবি, কারোর কথা শুনতে হয় না। আমার কপালে তো এতো টুকু শান্তি আছে। অথচ দেখুন ইন্দু নিজের বাবার খেয়ে, নিজের ইনকামের অর্ধেক পরিবারের জন্য খরচ করেও সারাদিন কটু কথা, অভিশাপ, তুচ্ছতাচ্ছিল্য এর মধ্যে থাকতে হয়।”

তহমিনার মুখশ্রীতে অন্ধকার ছেয়ে গেল! সরব গলার স্বর বদলে গেল। নম্রতার সাথে বলল,
–“সৎ মা হয়ে দেখবেন ভাবি! এইসব মিথ্যা অপবাদ সারাজীবন মুখ বুজে সহ্য করতে হবে। আপনার প্রাণের সখী তো ইন্দুবালা। তা ওকে একদিন সত্যি কথা জিজ্ঞেস করবেন, ও কয় টাকা ঘরে খরচ করে! না খরচ করেও আমায় এমনি কথা শুনতে হচ্ছে বছরের পর বছর ধরে। ওর পেছনে ইনসুর বাপ যা এখনো খরচ করে তাতে আমাদের মাথার উপর ছাদটা এতোদিনে হয়ে যেত!”, তহমিনা আঁচল দিয়ে মুখ চাপল সহসা। চোখ তার ছলছলে! মধুমিতা বিরক্তি মিশ্রিত নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
–“আমায় কারোর থেকে জানতে হবে না, ভাবি। আমার চোখ আছে!”

–“এগুলো ইন্দুবালা আপনাকে বলে, ঐ আপনার কান ভাঙায়! আর আমি তো সৎ মা তাই আপনি বিশ্বাস ও করে নেন।”

–“আমার বিশ্বাস অবিশ্বাসে কিছু যায় আসে না, ভাবি।”

–“আমি আপনার আর মোত্তাকিনের ভালো চাই ভাবি। ঢাকা শহরে এসেছি থেকে আপনার সাথে পরিচয়! প্রতিবেশী থেকে কখন তে আত্মার সম্পর্ক হয়ে গিয়েছে তা বুঝেই উঠতে পারিনি।”, তহমিনা বিগলিত কণ্ঠে বলল। মধুমিতা কপাল কুঁচকায়! এই নম্রতা সেদিন থেকেই সে দেখছে, যেদিন থেকে তহমিনা তার পরিচয় জেনেছে। সে ভ্রুক্ষেপ করে না। আবার গাছে পানি দিতে দিতে বলল,
–“আমার নিজের ছেলেই যখন আমার ভালো চায় না, তখন আপনাকে আর আমার ভালো চাইতে হবে না ভাবি।”

–“তা বললে হয় না-কি ভাবি? আমি তো চাইবোই। মোত্তাকিনকে শিঘ্রই একটা ভালো মেয়ে দেখে বিয়ে দিয়ে দিন। দেখবেন ও আস্তে আস্তে ঘরমুখো হবে! আপনার আশেপাশে তো ভালো মেয়ের অভাব নেই। একটু ভালো করে চোখ বুলালেই পাবেন।”, তাহমিনার সতর্ক কণ্ঠ। আড়চোখে পর্যবেক্ষণ করছে মধুমিতার গতিবিধি! মধুমিতা পানি দিতে দিতে নিরুদ্বেগ শান্ত স্বরে বলল,
–“চোখে অনেক মেয়েই বাঁধে, ভাবি। কিন্তু জেনেবুঝে কোন মেয়ের জীবন আমি নষ্ট করতে পারব না। ওর বিয়ের কোন প্রয়োজন নেই। আমার জীবন নষ্ট করছে করুক, কিন্তু অন্য কোন মেয়ের না করুক!”

তহমিনা হতবাক হয়ে গেল! সে হড়বড়িয়ে বলে,
–“এ কেমন কথা ভাবি? তাই বলে, অতো বড় বিয়ের লায়েক ছেলেকে আপনি বিয়ে করাবেন না?”

–“নাহ, একটা মেয়ে হয়ে আরেকটা মেয়ের জীবন আমি কেন নষ্ট করব বলুন, ভাবি?”

–“জীবন নষ্ট হবে কেন ভাবি? আপনি নিজের সংসারে ফিরুন, ভাইজানের সাথে ফিরে যান, মোত্তাকিনকে আমাদের ইনসুর মতো একটা ভালো মেয়ের সাথে বিয়ে দিন। দেখবেন বাবার সম্মান, স্ত্রীর সম্মান রক্ষা করতে মোত্তাকিনের মাঝে একটু হলেও পরিবর্তন আসবে। সিটি মেয়রের ছেলে বলে কথা!”, তহমিনার উৎকণ্ঠা ভরা কণ্ঠে মধুমিতা স্থির দৃষ্টিতে তাকায়। চোখেমুখে চাপা ক্রোধের আভাস! কিছুটা কঠোরতার সাথেই বলে,
–“এই পরিচয় আমাদের নয় ভাবি! আর কখনো এগুলো আমার সামনে বলবেন না। আমাদের জীবন আমরা বুঝে নেব!”

সে ছাদ থেকে নেমে যায়। তহমিনা নিজ উদ্দেশ্যে অসফল হয়ে পান্তুর মুখশ্রীতে বাড়ি ফিরল। মাকে দেখতেই ইনসিয়া হুড়মুড়িয়ে ছুটে আসে। উৎকণ্ঠা নিয়ে শুধায়,
–“কথা বললে বিয়ের ব্যপারে? কি বলল?”

তহমিনা গমগমে স্বরে ঠেস মেরে বলল,
–“উনি না-কি অবলা নন। সারাজীবন ঐ গুন্ডা বেকার ছেলেকে খেটে খাওয়াবে তবুও স্বামীর ঘরে যাবে না। আমি বললাম স্বামীর ঘরে ফিরে গিয়ে ছেলেকে বিয়ে দিতে বলে, সে কোন মেয়ের জীবন নষ্ট করতে চায় না।”

ইনসিয়া সকল উৎসাহ মিলিয়ে গেল। সোফায় পা গুটিয়ে বসে মিইয়ে যাওয়া গলায় জোর এনে বলল,
–“থাক, মা। তুমি দেখো মুহিত ইরতেজা এতো বছরেও যখন তার পিছু ছাড়েনি, আর কখনো ছাড়বে ও না। একদিন না একদিন তাকে ফিরতেই হবে স্বামীর ঘরে। আমি এদিকে মোত্তাকিনকে বিয়ের জন্য রাজি করানোর চেষ্টা করি।”

তহমিনা আপ্লুত হলো। উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল,
–“হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিক বলেছিস! তুই শুধু ছেলেটাকে হাতে রাখ। মুহিত ইরতেজার ছেলের বউ তুইই হবি। ভাব তো ইনসু, তুই সিটি মেয়রের পুত্রবধূ হয়েছিস! শহরে আমাদের কতো নাম ডাক হবে!”, মুহুর্তেই তহমিনা আর ইনসিয়া এক উজ্জ্বল স্বপ্নে ডুবে গেল!

–“তার আগে তোমার ঐ কালো বাঁদরকে বিদায় করো! ও থাকলে আমার একটা ভালো ভবিষ্যত কখনো হবে না।”, ইনসিয়া দাঁতে দাঁত চেপে বলল। তহমিনা তড়িঘড়ি করে মাথা নেড়ে বলল,
–“হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি তো সেই চেষ্টাই করছি।”
*****
–“চাচা ঐ মোড়ে নামিয়ে দিন।”, ইন্দুবালা রিকশা ওয়ালাকে তাড়া দিয়ে বলল। রিকশাওয়ালা রিকশা থামাতেই ইন্দুবালা নেমে ভাড়া মিটিয়ে দেয়। রিকশা ওয়ালা টাকা পকেটে ঢুকাতে ঢুকাতে শুধালো,
–“ভাড়া নিয়ে ঝামেলা করলেন না, আপা?”

ইন্দুবালা চোখ রাখে বয়স্ক লোকটির মুখপানে। মৃদু হেসে বলল,
–“টাকা ইনকাম করা অনেক কষ্ট, চাচা! আমি বুঝি, আপনাদের তো আরো গায়ে খাটুনি। আসি চাচা।”

রিকশা ওয়ালা মৃদু হাসলো। ইন্দুবালা ছুটে যায় ছোট ছোট পানিপুরি ওয়ালার দিকে। তার বাসা এখান থেকে পাঁচ মিনিটের দূরত্বে। তন্মধ্যেই তার গতিরোধ করে সামনে এসে থামে একটা বাইক। মোত্তাকিন আর তার দলবলদের দেখে ইন্দুবালা দ্রুত পাশ কাটিয়ে যেতে চাইলে মোত্তাকিন তার হাত চেপে ধরলো। ইশারায় তূর্য সহ সাথের সাঙ্গপাঙ্গদের চলে যেতে বলল। তারা গিয়ে ঘাঁটি জমালো টং এর দোকানে কিন্তু সকলের দৃষ্টি এদিকেই। ইন্দুবালা নত চোখে শান্ত স্বরে বলল,
–“হাত ছাড়। রাস্তাঘাটে গুন্ডামি করবি না।”

মোত্তাকিন নরম হয়। ছাড়ে না বরং টেনে বাইকের কাছে আনে। শুধায়,
–“সেদিনের জন্য রাগ করেছিস?”

ইন্দুবালা হাত ছাড়াতে ছাড়াতে বলে,
–“নাহ, আমার কারোর উপর রাগ হয় না। রাগ,অভিমান, কষ্ট, ব্যথা আমার মাঝে এসব কোন অনুভুতি-ই কাজ করে না। আমি রোবট!”

মোত্তাকিন একাধারে দেখছে একবারো চোখ তুলে না দেখা ইন্দুবালাকে। তার সাথে মেয়েটা কখনো এমন আচরণ করেনি। সে গর্জে উঠলে ইন্দু আরো দ্বিগুন আওয়াজে গর্জে উঠত, মুখের ওপর কথা বলতো, তর্ক করত। সে নম্র স্বরে বলল,
–“রাগ করিস না। আমার সেদিন টাকার অনেক প্রয়োজন ছিল। বাদ দে, তুই টাকার জন্য এমন করছিস তো। এই নে তোর টাকা।”

মোত্তাকিন পকেট থেকে তিন হাজার টাকা বের করে তার হাতের মুঠোর গুঁজে দিলো। ইন্দুবালা থেমে যায়। হাতের মুঠোয় থাকা টাকাগুলো দেখে। দৃষ্টি বড়োই উদাসীন! দিনশেষে সবাই এই টাকা দিয়েই তাকে বিবেচনা করে। তার যে একটা মন আছে, তাতে হুটহাট মানুষের দেয়া ঘাত গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে। সে উদাসীনতা বাড়ায় না। এটা তো নতুন নয়। বরং সেই সবার থেকে প্রত্যাশা রাখে যেনো কেউ তাকে বোঝে!
সে থমথমে মুখে টাকাগুলো ফিরিয়ে দিয়ে বলল,
–“চাই না আমার টাকা। এটাও তো মধুর থেকে আনা টাকা। যেদিন তুই নিজে ইনকাম করে দিতে পারবি সেদিন ফিরিয়ে দিস।”

সে চলে যেতে নেয়। মোত্তাকিন ততক্ষণে বাইক থেকে নেমে ফের তার হাত টেনে ধরে।
–“টাকা না নিলে না নিস, কিন্তু রাগ করে থাকিস না। আমার দিকে তাকা, বারান্দায় আসছিস না কেনো? ফেসবুক থেকে ব্লক করেছিস কেনো? ব্লক খোল!”

–“দেখ মোত্তাকিন, তুই রাস্তাঘাটে বেয়াদবি করছিস। মানুষ খারাপ ভাবে দেখছে। আমার সাথে তোর কোন জরুরী কাজ নেই যে সব জায়গায় যোগাযোগ রাখতে হবে। আমার তোর সাথে কোন লেনাদেনা নেই, হাত ছাড়!”

–“আমি সত্যিই বলছি সেদিন ইনসিয়ার সাথে রেস্টুরেন্টে দেখা হয়ে যায়। তোর থেকে টাকা আমি অন্য প্রয়োজনে নিয়েছিলাম।”

ইন্দুবালা ফিরে তাকায়। বলে,
–“বিশ্বাস কর, তুই আর ইনসিয়া সম্পর্কে আছিস এটা আমায় একটুও বিচলিত করে না, একটু খারাপ লাগে না। কিন্তু তুই যে এই কথায় কথায় মুখের উপর মিথ্যা বলিস এটা আমায় আঘাত দেয়। আমি এমন কোন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ নই যে আমায় কৈফিয়ত দিতে হবে। পারলে দায়িত্ব নিতে শেখ, আর ইনসিয়াকে ভালো রাখিস। ও তোকে অনেক ভালোবাসে।”

মোত্তাকিন আহত চোখে তাকিয়ে বলে,
–“কিন্তু ও সবসময় তোর নামে খারাপ কথা বলে।”

ইন্দুবালা নত মস্তকে বলে,
–“ও ছোট, অবুঝ!”

–“ও একটা কুটনী সেটা বল। ও তোর ভালোই চায় না। আমার কোন সম্পর্ক নেই ওর সাথে। শুধু টাইম পাস করছিলাম!”

–“খবরদার মোস্তাকিন ওর সাথে মিথ্যা নাটক করবি না। ও তোর বউ হওয়ার স্বপ্ন দেখে।”, ইন্দুবালা কঠোর গলায় বলল। মোত্তাকিন অনুভূতি হীন উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল,
–“কিন্তু আমি ওকে ভালোটালো বাসি না। এমনিই কদিন কথা বলেছিলাম, আর তাতেই ও এতোকিছু ভেবে নিয়েছে। তুই ওকে বুঝিয়ে বলিস, আর এখন আমার সাথে ঠিক করে কথা বল। ফেসবুক থেকে ব্লক ছাড়া।”

–“বলেছি না তোর সাথে আমার আর কোন লেনাদেনা নেই!”

–“কিন্তু আমার আ…” মোত্তাকিন বাক্যটি সম্পূর্ণ করতে পারল না তার আগেই একটা হকিস্টিকের ক্ষিপ্র আঘাত তার বাহু ছুঁয়ে গেল! মোত্তাকিন মুখ থুবড়ে পড়লো বাইকের উপর। ইন্দুবালা আচমকা আক্রমণে আর্তনাদ করে উঠলো। কয়েকজন ততক্ষণে ঘিরে ফেলেছে তাদের! হকিস্টিক হাতে লোকটা মোত্তাকিনকে আরেকটা আঘাত করার আগেই এক প্রকাণ্ড মুষ্ঠি লোকটির মুখ থেঁতলে দিল। ততক্ষণে তূর্য আর তার দলবল ক্ষিপ্র বেগে ছুটে আসে।
ইন্দুবালা মোত্তাকিনকে আগলে ধরে শুধায়,
–“ঠিক আছিস? এরা কারা তোকে মারছে কেন?”

মোত্তাকিন নিজের ব্যথা সামলে চোয়াল শক্ত করে বলে,
–“তুই এখান থেকে যা ইন্দু! তাড়াতাড়ি সর এখান থেকে।”

–“কিন্তু ওরা তোকে মারছে কেনো?”

–“ওটা কে? প্রেমিকা নাকি? এ তো কালির পাতিল! এক পা ও যেনো নড়ে না এখান থেকে। আজ বোঝাপড়া হবে তোর সাথে।” , কেউ বলতে বলতে এগিয়ে আসলেই মোত্তাকিন উন্মত্ত ষাঁড়ের ন্যায় ছুটে গিয়ে তার গলা চেপে ধরে হিসহিসিয়ে বলে,
–“কে তুই? তুই গায়ে হাত তুললি কেন? তোর আমার সাথে সমস্যা আমার সাথে কথা বল! ওর দিকে চোখ দিলে চোখ খুচে উঠিয়ে ফেলবো। এই ইন্দু এখান থেকে যেতে বলছি না তোকে।”

শেষের কথাটা মোত্তাকিন চেঁচিয়ে বলল। ইন্দুবালা গেলো না। সে চারপাশে চোখ বুলায় সবগুলো এমনভাবে ওঁত পেতে আছে যেন সুযোগ পেলেই মোত্তাকিনকে টুকরো টুকরো করে ফেলবে। সে কাঁধের ব্যাগটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো। বলল,
–“আমি কোথাও যাবো না। তারা তোকে মারছে কেন? আমি পুলিশকে ফোন দেই।”

উপস্থিত দুস্কৃতিকারীরা খিক খিক করে হেসে উঠল। বলল,
–“দাও বাবু দাও, আমরা তোমায় পুলিশকে ফোন দিতে দেয়ার জন্য ই দাঁড়িয়ে আছি।”

মোত্তাকিনের ঘাড়ের রগ দপদপ করে উঠলো। সে লোকটার গলা ছেঁড়ে রুক্ষ হাতে ইন্দুবালার বাহু চেপে তূর্যর হাতে তুলে দিয়ে বলে,
–“মা**বা** তুই চেয়ে চেয়ে দেখিস কি? এটাকে নিয়ে এখান থেকে যা। আস্ত একটা ঘাড় ত্যাড়া বেয়াদব মেয়ে! যা সর এখান থেকে।”

মোত্তাকিন নিজ দায়িত্বে জোরপূর্বক ঐ ভীড় থেকে ইন্দুবালাকে বের করলো। তূর্য ইন্দুবালাকে সরিয়ে দিতেই মোত্তাকিন পড়ে থাকা একটা হকিস্টিক তুলে নেয়। চোখেমুখে অদ্ভুত হিংস্রতা ফুটে উঠল। সে দূর্বার গতিতে এগিয়ে গিয়ে অধৈর্য্যতার সাথে সমানের একটার গায়ে আঘাত করতে লাগলো।
–“কু**বা** তোরা গায়ে হাত তুললি কেন? তোরা কে? আমি তোদের চিনি?”

বিপরীত পক্ষ ও চুপ নেই। পাল্টাপাল্টি আঘাত চললো ঠিক দশ মিনিট। তবুও মোত্তাকিন জবাব পেলো না তাকে আঘাত করার কারণ কি? শেষে রাগের মাত্রা বেড়ে গেলেই তার মানবিক সত্তা মিলিয়ে যেতে লাগল। হিংস্র পশুর ন্যায় একটার মুখের ভেতর হকিস্টিক ঢুকিয়ে চেপে দিতেই মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করে উঠলো লোকটি। মোত্তাকিন হিসহিসিয়ে বলে,
–“এখনো বলছি, তোদের পরিচয় বল। আমার তোদের সাথে কোন দ্বন্দ্ব নেই।”

তন্মধ্যেই পেছন থেকে ঘাড় বারবার একটা আঘাতে মোত্তাকিনের দেহ হেলে গেল। একটা লোক এসে তার গলা চেপে ধরে বলল,
–“তোর সাথে আমাদের কোন ঝামেলা নেই। কিন্তু তুই ঝামেলা তৈরি করছিস! মিরসাদ ইরতেজাকে মারতে যাওয়া আমাদের লোকদের তুই পিটিয়েছিস। কেন? কি সম্পর্ক তোর তার সাথে? আমরা শুনেছি তোর নামের সাথেও ইরতেজা আছে? তোদের কোন আত্মীক সম্পর্ক রয়েছে?”

মোত্তাকিন এতক্ষণে বুঝলো আসল কারণ। এই প্রশ্ন সে কখনোই পছন্দ করে না। এখনো পছন্দ করল না আর জবাব দেয়ার প্রয়োজনীয়তা বোধ করল। মোত্তাকিনের নিরুত্তর আচরণ আবারো দ্বন্দের প্রারাম্ভের জন্য যথেষ্ট ছিল।

বিকাল চারটা নাগাদ মুহিত ইরতেজার ম্যানেজার ছুটতে ছুটতে তার অফিসে ঢুকলো। গুরুত্বপূর্ণ মিটিংরত মুহিত ইরতেজা রেগে গেলেন এহেন বিশৃঙ্খলাতায়। সে চোয়াল শক্ত করে বললেন
–“এটা কেমন আচরণ, কামাল? আমি মিটিং এ আছি।”

কামাল ইতস্ততা করল না। সে তড়িঘড়ি করে বলল,
–“স্যার, মোত্তাকিন বাবারে পুলিশে ধরে নিয়ে গিয়েছে।”

মুহিত ইরতেজার হাতে থাকা কলমটা নড়ে উঠল। আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করে,
–“কেন?”

–“স্যার, মারপিট করেছে। একটাকে আই সি ইউতে পাঠিয়ে দিয়েছে। মৃত্যুর সাথে লড়ছে। ঐ যে উত্তরের সিটি মেয়রের লোক ওটা।”

মুহিত ইরতেজার গুরুত্বপূর্ণ মিটিং সবচেয়ে অবহেলিত হয়ে গেছে ততক্ষনে। সে চেয়ার ছেড়ে তড়িঘড়ি করে উঠতে উঠতে বলে,
–“থানায় ফোন না দিয়ে আমার কাছে কি করছ গর্ধব?”

–“মামলা হয়ে গিয়েছে, স্যার। ছাড়াতে বেগ পেতে হবে।”

–“যেকোন মূল্যে ছাড়াতে হবে, কালাম। মধুর ও ছাড়া আর কেউ নেই। ও না থাকলে মধু শেষ হয়ে যাবে। তাড়াতাড়ি চলো!”, মুহিত ইরতেজা ছুটে বের হয় অফিস থেকে।

থানায় ঢুকতেই চেয়ারে বসা ছেলেকে এক পলক দেখে মুহিত ইরতেজা সোজা আফিসারের রুমে ঢুকে গেল! মোত্তাকিন বিরক্তিতে “চ” বর্গীয় শব্দ করলো। মিনিট বাদেই অফিস থেকে চেঁচামেচির আওয়াজ আসলো। মোত্তাকিন চোখ বুঝে বেঞ্চে ঘাড় এলিয়ে দেয়। তার সাথে তার দলের সবকটা এখন থানায়। কিছুক্ষণ বাদ আরো দু’জন নেতা ব্যস্ত পায়ে অফিসে ঢুকলো। ঠিক রাত সাড়ে এগারোটা নাগাদ মুহিত ইরতেজা সফল হয়। মোত্তাকিনকে পুলিশ ছেড়ে দিল। মুহিত ইরতেজা এতক্ষণ পর অফিস থেকে বের হলেন। ঘামে জবুথবু অবস্থা! মোত্তাকিনের সামনে এসে দাঁড়ায়! ছেলের কপালের চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়া রক্ত গুলোর দিকে হাত বাড়িয়ে দিলে মোত্তাকিন মাথা সরিয়ে নিল। মুহিত ইরতেজা হাত গুটিয়ে নেয়। শুধায়,
–“মারপিট করেছো কেনো?”

মোত্তাকিন জবাব দেয় না। শান্ত চোখে তাকিয়ে বলে,
–“ছাড়ানোর জন্য ধন্যবাদ!”

বলেই সে গটগট করে চলে যায়। মুহিত ইরতেজা পিছু ডাকে কিন্তু সে ফিরে তাকায় না। সেদিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সে।

বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত বারোটা বাজলো মোত্তাকিনের। মধু অভ্যস্ত এমন ব্যপারে! ছেলে কতোদিন মাঝরাতেও এসেছে। মোত্তাকিন নিজের দালানে না ঢুকে সোজা ইন্দুবালাদের হাফ দেয়াল পেরিয়ে তার বারান্দায় চলে গেল। বারান্দায় গিয়ে বিছিয়ে রাখা পাটিতে ব্যথাতুর ক্লান্ত দেহ এলিয়ে দেয়। বলহীন হাতে বদ্ধ বারান্দা চাপড়ে ডাকে ইন্দুকে,
–“এই ঘাড় ত্যাড়া বেয়াদব মেয়ে কোথায় গেলি? দরজা খোল!”

ইন্দুবালা পুরোটা সন্ধ্যা ছটফট করেছে এই আওয়াজটা সহিসালামত ভাবে শোনার জন্য। মধুর যে এই অপদার্থ ছেলেটা ছাড়া আর কেউ নেই। সে আওয়াজ পেতেই হকচকায়। বিছানা থেকে বই ছেড়ে নেমে ছুটে এসে বারান্দার দরজা খুলে শুয়ে থাকা ছেলেটিকে দেখে বুকভরা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। আঁটকে রাখা দম ফেলে শুধায়,
–“বেঁচে আছিস?”

মোত্তাকিন তৎক্ষণাৎ চোখ খুলে তাকায়। দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
–“না মরে গেছি!”

ইন্দুবালা নিরুদ্বেগ বলে,
–“আমার মনে হয় এই বিষয়টা তোর জন্য খুব কঠিন না। এতো বাজে জীবন আমি কারোর দেখিনি বিশ্বাস কর! এমন জীবনযাপন কেন করব যে এমন মার খেতে হবে!”

মোস্তাকিন চোখ বুজল। শান্ত স্বরে বলল,
–“মার খাইনি, মেরে আসছি একটাকে।”

–“এই শরীর নিয়ে হাসপাতালে যাসনি কেনো?”
ইন্দুবালা হাঁটু গেঁড়ে বসে রক্তাক্ত কপাল ঘাড় খুঁটে খুঁটে দেখতে দেখতে বলল।

–“টাকা নেই।”

–“ঐ তিন হাজার টাকা?”

–“মারপিটের সময় পড়ে গিয়েছে কোথাও।”

–“তোর সাঙ্গপাঙ্গদের টাকা নেই? তারা ডাক্তার দেখাতে পারল না?”

–“এত কথা বলিস না কিছু করতে পারলে কর! নয়তো মামনি এগুলো দেখলে আরেকদফা দিয়ে উপরে পাঠিয়ে দেবে।”

ইন্দুবালার রাগ হয়। তার মাথায় একটা জোরে টোকা দিয়ে বলে,
–“আমি ডাক্তার?”

–“যা পারিস তাই কিছু কর, অসভ্য মেয়ে! তুই মারলি কেন? সুস্থ হই, তারপর তোর ঐ আঙুল যদি না ভেঙেছি!”, মোত্তাকিন দাঁতে খিচে বলল।

–“আসিস, মুখ ফাটিয়ে দেব তোর!”, ইন্দুবালা রুক্ষ স্বরে বলল। তার কাছে প্রাথমিক চিকিৎসা আর ব্যথা কমানোর যা ছিল সব এনে হাতুড়ি ডাক্তারি করলো। চিকিৎসা সেবা নিতে নিতে রোগী ততক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের মতো ব্যথাগুলো উপশম করার চেষ্টা করলো। সব জায়গায় মলম লাগানো শেষ হতেই সে মধুমিতাকে ডাকলো। মধুমিতা ছেলের বারান্দায় এসে দাঁড়াতেই চোখ মলিন হয়ে গেল। ফোন কানে ঠেকিয়ে শুধায়,
–“মারপিট করে এসেছে?”

ইন্দুবালা তার মলিন মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,
–“এখানে বোধহয় ওর দোষ ছিল না মধু। আমি ছিলাম তখন। ঘরে নিয়ে যাও। বকাঝকা দিও না। অনেক আঘাত পেয়েছে!”

মধুমিতা টলটলে নেত্রে তাকিয়ে থাকে। এক ব্যর্থ মায়ের ন্যায়!
******
সপ্তাহ পেরিয়ে গেল! ষোলকলা পূর্ণ হলো বুঝি! আজ ইন্দুবালাকে আবার দেখতে আসবে। পাত্র বেসরকারি কোম্পানীর একজন কর্মকর্তা! সবার মুখে একটাই কথা অন্তত পাত্রীর সরকারি চাকরি দেখে সম্বন্ধটা টিকে যাক! মধুমিতা এই কথা শুনে পাড়ার কয়জনকে মুখের ওপর ঝামটা মেরে বলেছে,
–“ইন্দুর মত একটা মেয়ে যে কারোর ভাগ্যে জুটতে পারে না। ও যেমন মেয়ে সৃষ্টিকর্তা নিশ্চয়ই ওর জন্য আরো ভালো কিছু ভেবে রেখেছে, তাই এতো দূর্দশা! সমাজের তৈরি এই পরীক্ষা গুলোয় পাশ করে যেতে পারলেই তার ভাগ্য সুপ্রসন্ন হবে। জোরপূর্বক কারোর ঘাড়ে তুলে দিতে হবে না। যে নেয়ার সে রানী করেই নেবে।”
এহেন কথায় হাসির রোল পড়ে যায় পাড়ায়! মধুমিতা এর জন্যই পাড়ার এইসব মানুষদের এড়িয়ে চলে।

–“যে কোন রাস্তার মানুষ এসে আমার ইন্দুবালার জীবনসঙ্গী হতে পারে না। শুনেছি আজকের পাত্র নাকি বেশ সুদর্শন, সুপুরুষ, উচ্চশিক্ষিত তার চেয়েও বড় কথা সে ইন্দুবালার সম্পর্কে সব জেনেই নাকি সম্বন্ধ পাঠিয়েছে। ছেলেটার পরিবার নেই, এতিম! নিজে কষ্ট করে বড় হয়েছে। ইন্দুবালার কষ্ট বুঝবে ছেলেটা। আমার মনে হয় এইখানেই কিছু একটা হয়ে যাবে।”
ডাইনিং টেবিল পরিষ্কার করতে করতে মধুমিতা বিলাপ করছে। খাবার শেষে বেসিনে হাত ধুতে থাকা মোত্তাকিন বিগত দশ বছরের অভিজ্ঞতা স্মরণ করে দৃঢ়তার সাথে মায়ের কথাকে নাকোচ করে বলল,
–“এই সম্বন্ধ ও হবে না। এমন জানাশুনা কম সম্বন্ধ আসেনি আজ পর্যন্ত! তুমি নিশ্চিন্তে থাকো, মামনি।”

–“অলুক্ষণে কথা বলবি না, বাবু! সেদিন কারা মেরেছে তোকে? অতো আঘাত পেলি কি করে, এখনো বলিস নি। কোথায় গুন্ডামি করেছিস আবার?”, মধুমিতা শাসিয়ে বলল। মোত্তাকিন নিরুত্তর পাত্তা না দিয়ে নিজের ঘরে চলে যায়। দুপুরের সময়! একটু বিশ্রাম নিয়ে বাইরে বের হবে।

আজ আর জাঁকজমকপূর্ণ করে সাজগোজ করলো না ইন্দুবালা। ইচ্ছে হলো না! গতবার সেজেছিল তখন কাক উপাধি দিল এবার সাজলে নিশ্চিত কালোমুখো বানর বলবে। সে তো জানে সে এই সমাজের সবচেয়ে নিকৃষ্ট জীব। তবে কি প্রয়োজন যেচে আরো খারাপ উপাধি পাওয়ার? তাই সে আজ বেছে বেছে মায়ের সেই পুরোনো আদিকালের একটা সাদামাটা তাঁতের শাড়ি পড়লো। মায়ের সবকিছু সে যত্নের সাথে গুছিয়ে রেখেছে। তবে এতোটুকু মন মর্জির কারণে তাকে শুনতে হলো তহমিনার রাজ্যের তীক্ত কটুক্তি! সে কি তাদের সকলকে গলায় দড়ি দিয়ে ম”রার জন্য এই বেশভূষায় সেজেছে? দেখতে লাগছে ঠিক স্বামী মরা এক বিধবা, অবলার মতো। ইন্দুবালার সহনশীলতাও এখন নিজেদের ক্ষমতা দেখলে বিস্মিত হয়। এহেন কথাবার্তা তার এখন গায়েই লাগে না
সে সাজ পরিবর্তন করলো না। পাত্রপক্ষ আসলো বিকাল চারটা নাগাদ! শুধু পাত্র দেখতে এসেছে, সাথে কেউ আসেনি। এসেই আবদার করেছে সে পাত্রীকে একান্তে একটু দেখতে চায়। তহমিনা নয় ছয় বোঝে না, সে সোজা ইন্দুবালার ঘরে ঢুকিয়ে দিয়েছে পাত্রকে। বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ইন্দুবালা কাঠ হয়ে বসে রইল বিছানার এক কিনারায়। এই সম্বন্ধে যে বাবার ও সম্মতি রয়েছে। সম্মুখের কাঠের চেয়ারটিতে কেউ এসে বসলেও চোখ তুললো না সে। কৃত্রিম সুগন্ধি ফুরফুরিয়ে নাসারন্ধ্রে এসে বাড়ি খেল। কেউ গলা খাঁকারি দিল! বেশ কিছুক্ষণ নিরবে কেটে যায়। ইন্দুবালাকে মুখ তুলতে না দেখে ব্যক্তিটি আলতো স্বরে বলে,
–“আজ কি নাম বলা যাবে, মিস?”

ইন্দুবালার আড়ষ্টতা ভেঙে যায়। চকিতে চোখ তুললে বিস্মিত হয় সেই ক্ষণ পরিচিত হাসিমাখা মুখটি দেখে। ঠিক ঐ স্নিগ্ধ সিক্ত কদম ফুল দুটোর মতোই সতেজ মুখশ্রী। লেপ্টে আছে চিরচেনা সেই মৃদু হাসি। অস্ফুট স্বরে বলে ওঠে,
–“আপনি?”

–“আপনি সেদিন প্রয়োজন ব্যতীত নাম বলতে চাইলেন না, তাই আজ প্রয়োজন সমেত হাজির হয়েছি আপনার নাম শুনতে। বলা যাবে কি?”, পুরুষটি দারুণ শান্ত ভঙ্গিমায় কথা বলতে জানে। এতো শান্ত ভঙ্গিমায় দেখা যাচ্ছে ইন্দুবালাও কথা বলে না। ইন্দুবালা আড়ষ্ট কণ্ঠে জবাব দেয়,
–“ইন্দুবালা!”

–“ইন্দুবালা….যেমন নাম তেমন মানুষ!”, পুরুষটি স্মিত হেসে বলল।

পরপরই বলে,
–“আমি সমীর, পেশায় একজন বেসরকারি কোম্পানীর কর্মকর্তা।”

ইন্দুবালা চুপ করে শুনলো। সমীর থামে, গাঢ় নেত্রে মেয়েটির আপাদমস্তক দেখ বড্ডো ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“আপনাকে ঠিক আমার মায়ের মতো দেখতে লাগছে, ইন্দুবালা! তাকেও এমন সাদামাটা শাড়িতে ঠিক সদ্য ফোঁটা দোলনচাঁপাদের মতো স্নিগ্ধ দেখতে লাগতো।”

ইন্দুবালা দৃষ্টি হকচকায় স্নিগ্ধ শব্দটি শুনে। এহেন শব্দ তো এ জীবনে তার জন্য কেউ ব্যবহার করেনি! হয়তো পাশের নিন্দুক পড়শী মাঝেমধ্যে করেছে কিন্তু সেটাও হয়তো বক্তব্যের খাতিরে! সে অবুঝ কণ্ঠে শুধায়,
–“আমি স্নিগ্ধ?”

–“আমার চোখে।”

অপ্রত্যাশিত প্রশংসায় ইন্দুবালা অপ্রস্তুত হয়, জড়তা ছেয়ে যায়। সে আভার স্নিগ্ধ? এটা নেহাৎ ই প্রহসন! সে কি রসিকতার পাত্রী? সে কপাল কুঁচকে চোখে চোখ রেখে বলল,
–“কি চাই আপনার? এভাবে আমার পিছে পড়ে আছেন কেনো?”

সমীর স্মিত হাসলো কড়া কণ্ঠে। প্রেক্ষিতে সে স্বভাবসুলভ শান্ত স্বরেই বলল,
–“দু’টো ফুলের বিনিময়ে এতো মূল্যবান সত্ত্বাকে চাওয়া অবিচার হয়ে যেতো! তাই আজ অন্য কিছুর বিনিময়ে আপনাকে চাইতে এসেছি, ইন্দুবালা।”

সমীর থামে। ফাঁকা নিঃশ্বাস ফেলে মিহি স্বরে আবদার করে বলে,
–“এই গোটা আমিটার বিনিময়ে আজ আপনাকে চাইতে এসেছি ইন্দুবালা। আমার হবেন?”

ইন্দুবালা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। নিরুত্তর, নির্বাক! সমীর পুনরায় বলতে লাগলো,
–“এই গোটা চারকুলে আমার— আমি ব্যতীত কেউ নেই, ইন্দুবালা। মাকে দেখিনা আজ ত্রিশ বছর! বিধবা মা, অভাবের টানাপড়েনে একদিন তার পাঁচ বছরের ছেলেটাকে রাস্তায় ফেলে দিয়ে কোথায় যেন চলে গেল। মায়ের অপেক্ষা করতে করতে আর অপেক্ষা ফুরালো না। বহুকষ্টে খেয়ে না খেয়ে, রাস্তায় ঘুমিয়ে নিজেকে নিজে মানুষ করেছি। পড়াশুনা করে একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি পেয়েছি। তাতে যেটুকু আসে আমি আপনাকে সম্মানের সাথে রাখতে পারব, ইন্দুবালা। মাস্টার্স কমপ্লিট, আজ পর্যন্ত সিগারেট কখনো খাইনি, নেশা দ্রব্য দুঃস্বপ্নের কথা! বাজে অভ্যাস বলতে, একটা আপন মানুষের খোঁজে চারিধারে হন্য হয়ে ঘুরছি। কিন্তু এই শহুরে, ব্যস্ত জীবনে সাদামাটা কাউকে পাইনা— যে আমার দিকে এক পলক শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করবে আমার ভালোবাসার ভীষণ প্রয়োজন! আপনি যদি আমার অর্ধাঙ্গিনী হতে রাজি হন তবে আমার চারকুলে কেউ একজন হবে। আমার গোটা পৃথিবী হবেন, ইন্দুবালা?”

দু’হাতে গুটিয়ে বসা ইন্দুবালা তখনো স্তম্ভিত চিত্তে তাকিয়ে। দৃষ্টি কেমন আঘাতপ্রাপ্ত সৈনিকের মতো কঁকিয়ে যাচ্ছে। যার নিজের দুঃখের অভাব নেই সেই বোধহয় অন্যের দুঃখের ভার অনুভব করতে পারে! সমীর হাসে টলটলে সেই দৃষ্টি দেখে। যেন ওই চোখের দৃষ্টি-ই তার জবাব!
*****
আজ ক্লাবে গিয়েছে মোত্তাকিন। এখানে রাজনীতির সাথে জড়িত সব মুখগুলোর দেখামিলে। এখানে মোত্তাকিনের উপর হামলার বিষয়টি ছিল মূল আলোচনা। কাজ শেষে আড্ডার আসর ছেড়ে বের হলে একটি অপ্রত্যাশিত মানুষ এসে হাজির হয় মোত্তাকিনের সামনে। মিরসাদ গাড়ি থেকে বের হয়ে এগিয়ে আসে।
–“তোমার সাথে কিছু কথা ছিল।”

সদ্য বাইকে বসা মোত্তাকিন এতক্ষণ চাবি না ঘোরালেও এবার ঘোরালো। হেলমেট পড়তে পড়তে শান্ত তবে রুক্ষ স্বরে জবাব দেয়,
–“আপনার সাথে কথা বলার মতো কোন টপিক আমার নেই। আমার থেকে দূরে থাকুন!”

বলেই সে গাড়ি স্টার্ট দেয়। মিরসাদ গলায় জোর দিলো এবার। উঁচু গলায় শুধায়,
–“তবে কেনো বাঁচালে আমায়? আমার তোমার সাথে কথা আছে মোত্তাকিন। গাড়ি থামাও!”

মোত্তাকিন নিরুত্তর দ্রুততার সাথে দৃষ্টি সীমানায় মিলিয়ে গেল। এ যেন প্রশ্ন থেকে পালানোর তুচ্ছ প্রচেষ্টা! মিরসাদ ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেললো। জীবনে কিছু কিছু ক্ষুদ্র ভুল মারাত্মক প্রভাব ফেলে। যার জন্য হয়তো বিনষ্ট হয়ে যায় স্বাভাবিক কিছু জীবন।

সাড়ে এগারোটা নাগাদ বাইক রেখে ঘরে ঢুকতেই মোত্তাকিনের চোখমুখ কুঁচকে গেল। স্টার জলসায় ন্যাকামো হচ্ছে, বজ্রপাতের শব্দে কেঁপে উঠছে টিভিখানাও। আর তার সামনে তার নিরীহ মা ঘুরছে, দুলছে, নাচছে। সে নিঃশব্দে টেবিল থেকে এলাচির কোটা থেকে একটা এলাচি মুখে নিয়ে চিবুতে চিবুতে শুধায়,
–“কি হলো মামনি, এতো খুশি কেন? আজ কি চুমু খেয়েছো নাকি?”

আজ আর জুতো ছুঁড়ে এলো না। অদ্ভুত! মধুমিতা নাচ থামিয়ে কোমড়ে হাত দিয়ে সরু চোখে তাকায় ছেলের দিকে। মোত্তাকিন বোকাসোকা হেসে শুধায়,
–“কোমড়ে ব্যথা সেরে গিয়েছে?”

মধুমিতা থমথমে মুখে না বোধক মাথা নাড়লো। মোত্তাকিন মায়ের অদ্ভুত আচরণে ভ্রু নাচালো। পুনরায় শুধায়,
–“তবে তোমার সিরিয়ালের নায়ক নায়িকার বিয়ে হয়েছে?”

মধুমিতা এবারেও না বোধক মাথা নাড়লো। মোত্তাকিন এবার কপাল কুঁচকে নেয়। আড়চোখে তাকিয়ে সতর্ক কণ্ঠে শুধায়,
–“তবে কি প্রেমে পড়েছো? কাউকে পছন্দ হয়েছে? হলে বলো আমি কোন বিবাদ ছাড়া মেনে নিয়ে তোমায় তার হাতে তুলে দেব। অন্তত রোজ রাতে ঐ একজনের মুখ দেখে আমার ভালো দিনটা খারাপে পরিণত হবে না।”

বলার সাথে সাথেই সহসা একটা জুতা এসে ছুঁয়ে গেলো মোত্তাকিনকে। মোত্তাকিন ক্যাঁচ ধরা জুতাটাকে মুখের উপর তুলে ধরে বোকাসোকা হাসলো। ঝাড়ু হাতে তেড়ে আসা মাকে দেখে এক লাফে সোফার অপরপাশে চলে যায়। আলাভোলা কণ্ঠে বলে,
–“কুল মামনি, কুল! এতো ক্ষেপে যাওয়ার কিছু হয়নি।”

–“অজাতের বাচ্চা! আজ তোকে আমি পিটিয়ে সোজা বানিয়ে দেব।”, ফুল ঝাড়ুর উল্টোপাশ দিয়ে ধুপ করে এক বাড়ি পড়লো মোত্তাকিনের পায়ের থাই বরাবর। ব্যথাহীন আঘাতে মেকি কঁকিয়ে উঠল মোত্তাকিন। আহত সুরে বলে,
–“মামনি ব্যথা পাই, মেরো না। আমি তো শুধু শুনতে চাইছি তুমি কেন এতো খুশি?”

মধুমিতা ঝাড়ু ফেলে ফোঁস ফোঁস করে বলে।
–“আমার খুশি তোর সহ্য হয় না, তাই না?”

মোত্তাকিন মিনমিন করতে করতে মায়ের পাশ ঘেঁষে দাঁড়ায়। মাকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে বলে,
–“এ কেমন কথা। তুমি খুশি হলে আমি আরো দ্বিগুন খুশি হই মামনি।”

মধুমিতা থমথমে মুখে বলল,
–“তাহলে এখন আমার খুশিতে আমার সাথে নাচ।”

মোত্তাকিন গাল ভরে হেসে রাজি হয়ে গেল। এই নারীদের সাথে বিবাদে জড়িয়ে কোন পুরুষ জিততে পেরেছে? পারেনি! সে প্রফুল্ল হেসে বলল,
–“হ্যাঁ হ্যাঁ আসো আসো কাপল ডান্স করি।”

মায়ের হাত ধরে বসার ঘরে খোলা জায়গায় নিয়ে আসলো মোত্তাকিন। টিভিতে রবীন্দ্র সঙ্গীত ছেড়ে দু’জনে হাত ধরে নাচলো। মধুমিতা বেজায় খুশি হয়ে গেল ছেলের এতোটুকু সহানুভূতিতে। গদগদ হয়ে বলে,
–“জানিস বাবু আমি এতো খুশি কেন?”মোত্তাকিন মায়ের শাহাদাত আঙুল ধরে ঘোরাতে ঘোরাতে বলল,
–“তা শোনার জন্য ই তো এমন গাধার মতো নাচছি। বলো বলো!”

মধুমিতা গায়ে মাখে না ছেলের রসিকতা। বরং দ্বিগুণ উল্লাসে মেতে উঠে বলে,
–“আমার ইন্দু সখীর বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছেএএএএ!”
বলেই মধুমিতা চিৎকার দিল আনন্দে! মোত্তাকিনের নাচ চমৎকারভাবে থেমে গেল। গোল গোল নেত্রে তাকিয়ে শুধায়,
–“হ্যাঁ? ইন্দুর বিয়ে ঠিক হয়েছে মানে?”

–“তোকে আমি বলেছিলাম না, আমার মন বলছিল আজকের পাত্র প্রকৃত মানুষ! এতো দিন যা আসতো তা মানুষের বেশে এক একটা অমানুষ! পাত্র ইন্দুকে আগে থেকে চিনতো। রাস্তায় অনেকবার দেখা হয়েছে, পছন্দ হয়েছে বলেই সম্বন্ধ পাঠিয়েছে। ছেলেটার চারকুলে কেউ নেই। একটা নিজের মানুষ চায় আর কিছু চায় না। ইন্দুর কষ্ট বুঝবে ও। দেখেছিস আল্লাহ যা করে ভালোর জন্যই করে।”

দীর্ঘ সংলাপ শেষে মধুমিতা প্রান খুলে হাসলো। মোত্তাকিন এহেন অপ্রত্যাশিত কথা হজম ই করতে পারলো না। সে কঠিন গুরুগম্ভীর গলায় বলল,
–“এক দেখায় বিয়ে ঠিক হয়েছে মানে কি মামনি? পাত্রের পছন্দ হয়েছে বলেই বিয়ে ঠিক? পাত্র কেমন, কি করে? চরিত্র কেমন তা না জেনেই?”

মধুমিতা ছেলের জন্য খাবার গরম করতে লাগলো। নিরুদ্বেগ বলল,
–“না জেনেশুনে কি কিছু হয় নাকি? সিদ্দিকী ভাই সব জেনেশুনেই মত দিয়েছে। খেতে আয় বাবু! ইন্দুর বিয়েতে আমি ওর জন্য কি করব সেটা বল।”

মোত্তাকিন হাত মুখ ধুয়ে পোশাক বদলে খেতে বসে। মধুমিতা তার কান পাকিয়ে দিলো ইন্দুর বিয়ে, কি করবে? কি পড়বে? কি দেবে? ইন্দুর সংসার কেমন হবে? দূরে চলে গেলে সে কষ্ট পাবে! যত যা ছিল! অন্যদিকে নিরবে ভাত খেতে থাকা ছেলেটা তখনো হজম করতে ব্যস্ত সুসংবাদটি! না না সুসংবাদ নয়! যেই সংবাদ মলিনতা নিয়ে আসে তা কখনোই সুসংবাদ হতেই পারে না। অথচ ছেলেটি ধরতেই পারলো না তার মলিনতার কারণ। সে তার মেজাজ খারাপের কারণ বের করল। মাকে বলল,
–“মামনি বিগত দশ বছরে যেখানে কেউ পছন্দ করেনি, সেখানে আজ কেউ কি করে এতো সহজে পছন্দ করে নিলো? এখানে ঝামেলা আছে নিশ্চিত! ছেলের খুঁত রয়েছে তাই এতো সহজে রাজি হয়ে গিয়েছে।”

মধুমিতা কপাল কুঁচকে বলল,
–“ঐ যে উপর ওয়ালা আছে না? সে এমনি সব হুটহাট করে। আর চমৎকার সব জিনিস এমন হুটহাট ই হয়। তুই কুচিন্তা ছাড়া মাথায় কিছু আনতে পারিস না, তাই না?”

মোত্তাকিন কথা বলল না। খেয়ে বারান্দায় গিয়ে উঁকি ঝুঁকি দিলো, কেউ নেই। বিয়ে হওয়ার খুশিতে নিশ্চিত কুপোকাত হয়ে গিয়েছে অসভ্য মেয়েটা! সে দাঁতে দাঁত চেপে সিগারেট ধরালো। রোজ রাতে বারান্দায় আসে অপেক্ষা করতে করতে মেজাজ ধরে রাখতে না পেরে চেঁচিয়ে ডাকতে লাগল,
–“এই ইন্দুবালার বাচ্চা, বারান্দায় আয়!”

~চলবে~

[রিচেক ছাড়া পর্ব]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here