#প্রেম_বর্ণহীন
#তোনিমা_খান
#পর্বঃ০৯
তেড়ে আসা মধ্যবয়স্ক লোকটি ক্ষিপ্ত হস্তে মোত্তাকিনের কলার চেপে ধরলো। হিসহিসিয়ে বলে,
–“তুমি কি চাইছো মোত্তাকিন? তপনকে আঘাত করেছ কোন সাহসে? তুমি ভুলে গিয়েছো ও কে? আমার ভাইকে আঘাত করার সাহস হয় কি করে তোমার?”
কংক্রিটের স্তম্ভের ন্যায় শক্ত হয়ে আছে পেটানো সুবিশাল দেহটি। কোনপ্রকার উদ্বেগ ছাড়া শান্ত গলায় বলল,
–“আমার মাকে নিয়ে বাজে মন্তব্য করার দুঃসাহসের ফল ছিল ওটা। প্রথমবার বলে জীবিত বেঁচে গিয়েছে, এই ঘটনা আরেকবার ঘটলে জানে মেরে ফেলব, বশির ভাই!”
চেপে ধরা কলার আরো শক্ত হলো। এক ঝটকায় মোত্তাকিনকে চেপে ধরে পেছনের দেয়ালে। ফিচলে কণ্ঠে বলে,
–“আমার কুত্তা আমায় বলে ঘেউ! তুই ভুলে গিয়েছিস তুই কে? নাকি ভুলে গিয়েছিস আমার পরিচয় ও? তুই আমার হয়ে কাজ করা গোলাম মাত্র। আমার ভাইকে মারার কথা কি করে উচ্চারণ করিস?”
–“যেভাবে আপনাকে বাঁচাচ্ছি সব বিপদ থেকে সেভাবে আপনাকে সব বিপদে ঠেলে দিতেও আমার দু মিনিট লাগবে না, বশির ভাই! আমি আপনার কাজে আসিনি, আপনি অনুরোধ করে এসেছেন। কাজের জায়গায় আমার ব্যক্তিগত বিষয় টানলেই আমার এই প্রফেশনাল রূপ একদম বদলে যাবে। কে গোলাম আর কে মালিক আমি তা দেখব না।”, মোত্তাকিনের নিরুদ্বেগ কণ্ঠ। বশিরের রগরগে মেজাজ এবার আঁছড়ে পড়া ঢেউয়ের ন্যায় শক্তি হারালো। তবুও তেজ ধরে রেখে বলে,
–“তুই আমার কোন কাজে সুফল এখনো আনতে পারিসনি মোত্তাকিন। আমি কি দুধ দিয়ে কালসাপ পুষছি?”
মোত্তাকিন নিঃশব্দে গা দুলিয়ে হাসলো। বাঁকা দৃষ্টি ফেলে স্যারেন্ডার এর ন্যায় হাত জাগিয়ে বলল,
–“তবে পোষা ছেড়ে দিন, বশির ভাই! এই মোত্তাকিন ইরতেজার কোন পিছুটান নেই যে এই সব হুমকি তাকে বিচলিত করতে পারবে। আমার ও ইদানীং হম্বিতম্বি আর ভালো লাগে না। জানেন ই তো মামনির রোজ রোজ জুতার বাড়ি খেতে একঘেয়েমি এসে গিয়েছে। আপনার থেকে ছাড়া পেলে তার বাধ্যগত ছেলে হতে পারতাম।”
বশির এবার আরো শক্ত হাতে চেপে ধরে বলে,
–“পালাতে চাচ্ছিস? তুই কি ভাবনা আটছিস মোত্তাকিন? ইদানীং যুৎসই টেন্ডার ও আনতে পারছিস না। পরিকল্পনা সফল করা তো দূরের কথা। আর এই নতুন ইস্যু! ইরতেজা…কি এই ইরতেজার রহস্য? মুহিত ইরতেজার সাথে তোর কি সম্পর্ক? কেন তোর নামের শেষে এই নাম যুক্ত!”
মোত্তাকিন এবার মাথা গরম হতে লাগলো। অসন্তোষের সাথে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
–“বারবার বলি ব্যক্তিগত বিষয় টানবেন না তবুও একি কাজ! পৃথিবীতে আমার একার নামের সাথে এই নাম নেই। আরো অনেক আছে। তারা প্রত্যেকে কি মুহিত ইরতেজার সাথে সম্পর্কযুক্ত?”
–“তবে কেন তোর মিরসাদ ইরতেজার জন্য এত দরদ? মরতে দিলি না কেন ওটাকে? ওটাকে মারা মানে মুহিত ইরতেজা একদম নিঃস্ব!”, বশির রাগে হুঁশ হারিয়ে বলে ফেললেও পরমুহূর্তেই থতমত খেয়ে গেল। মোত্তাকিনের আঁখিদ্বয় সূচালো হলো! মস্তিষ্ক দ্রুত কিছু ধরতে চায়। সতর্ক কণ্ঠে শুধায়,
–“মানে? আপনি এর সাথে জড়িত?”
বশির থতমত খেয়ে এলোমেলো দৃষ্টি ফেললো। মোত্তাকিন তীক্ষ্ণ নজর ফেলে বলল,
–“তারমানে এই পরিকল্পনায় আপনি যুক্ত আছেন? আপনি ডাবল গেমিং খেলছেন, তাই তো?”
বশির দাঁত খিচে বলল,
–“তুই কিছুই করতে পেরেছিস এত বছরেও? পারিসনি। শুধু শুধু আমি তোকে পুষছি! তাই আমার সুবিধা আমায় দেখতে হবে। মুহিত ইরতেজা যদি শক্তিশালী হয়ে থাকে তার একমাত্র কারণ ঐ মিরসাদ! মিরসাদ ই ঐ বুড়োকে এখনো শক্তি জোগায়!”
–“মিরসাদের কোন সংযোগ নেই ওর বাপের সাথে। ও একটা সাধারণ কোম্পানি চালিয়ে জীবনযাপন করে। বাপের এক পয়সাও ও হাত দেয় না।”, মোত্তাকিনের চাপা আক্রোশ যুক্ত কণ্ঠে বশির সরু চোখে তাকায়।
–“তোর ঠিক এই আচরণ আমাদের আরো বিভ্রান্ত করে তুলছে মোত্তাকিন। সোজাসাপ্টা বল তুই মুহিত ইরতেজাকে পথ থেকে সরাতে পারবি কিনা নয়তো আমি ওটাকে মেরে দিচ্ছি, মামলা খতম!”
ক্রোধে দগ্ধ মোত্তাকিন এবার খিকখিক করে হেসে উঠল। বাম পাশে থুথু ফেলে দাঁতে দাঁত ঘঁষে বলল,
–“একবার জেলে ঢুকলে পেছনকার ভাই ব্রাদার সব নিজের ঘাঁটি রক্ষা করার জন্য উল্টো পথে দৌড়াবে। আর আপনি বসে বসে জেলে পঁচবেন। রাজনীতি আপনি এখনো বোঝেননি বশির ভাই!”
–“তো তুই বোঝা আমায়। তুই কি করতে চাইছিস। আজ কত বছর? তুই কি পেরেছিস মুহিত ইরতেজাকে পদ থেকে সরাতে? আর না পেরেছিস কোন বড় টেন্ডার হাতাতে।”
–“সরকারি জিনিস বললেই হাতানো যায়? গেলে তো আপনিও এত বছরে পারতেন বশির ভাই? আর এর জন্য শতভাগ দায়ী আপনার ভাই। কাজ করার আগে টাকা খেয়ে দেয়ার ধান্দা থাকে তার। থাকে না আদব কায়দা! কোন বিশ্বাসে আপনাকে টেন্ডারের দায়িত্ব দেবে? অন্তত আমায় আমার কাজ নিজ মোতাবেক করতে দিন। টেন্ডারের অভাব হবে না।”
–“তোর এই এক কথা আর কত শুনব?”, মোত্তাকিন কোমড়ে হাত দিয়ে দৃষ্টিতে দৃষ্টি রাখে। পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে রাখে বশিরের ডেস্কে। বশির কৌতুহলী হয়ে সেটি হাতে তুলে নেয়। মোত্তাকিন আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে বলল,
–“মুহিত ইরতেজার ম্যানেজার! আপনার সাথে দেখা করতে চাইছে।”
বশিরের চোখ চকচক করে উঠল। উৎসুক কণ্ঠে বলল,
–“তারমানে এবারের টেন্ডার আমাদের দায়িত্বে আসছে?”
মোস্তাকিন ঘাড় কাত করে তাকায়। শান্ত স্বরে বলে,
–“আমি মায়ের কোলে বসে গেম খেলি, মজাই আলাদা। আপনারা জেলে বসে করতে চাইলে আমায় বলে দেবেন, আমি ইস্তফা নিয়ে নেব! ইদানিং মনে অন্যকিছু চায় বুঝলেন, আপনার জন্য পারি না।”
বশিরের এতক্ষণের সব রাগ এবার উধাও হয়ে গেল। প্রসন্নতা চোখেমুখে। বলে,
–“একজন ভেন্ডর আর কন্ট্রাকটর এর কাছে সিটি মেয়র কেন আসবে, অবশ্যই টেন্ডারের জন্য! শালা মনটা খুশি করে দিলি। ইদানিং কি মনে চায় তোর? মেয়ে টেয়ে লাগবে নাকি? লাগলে বল জোগাড় করে দেই রাতের জন্য!”
মোত্তাকিন ঘৃণায় “ছ্যাহ!” করে উঠল। বলল,
–“রুচি আপনার ভালো হবে কবে, বশির ভাই? রুচি ভালো করেন মেয়র কেন, দেখবেন একদিন মিনিস্টার হয়ে যাবেন।”
বলেই শিস বাজাতে বাজাতে মোত্তাকিন বের হয়ে গেল। যেতে যেতে ঘাড় ঘুরিয়ে সাবধানি বার্তা ছুড়ে বলল,
–“তপনকে সাবধান করে দেবেন এর পর থেকে।”
বশির তৎক্ষণাৎ সায় জানিয়ে বলল,
–“ওকে আমি দেখে নেব, তুই চিন্তা করিস না।”
তখন রাত একটা চৌদ্দ! ছেলের অপেক্ষা করতে করতে মধুমিতার জীবন নিঙরে সুখ বিলীন হয়ে যাওয়ার পথে। তবুও ছেলের কোন দয়া হয় না তার উপর। সে ভেবে পায় না, সে কি এমন পাপ করেছে যার জন্য সৃষ্টিকর্তার তাকে এত যন্ত্রনাদ্বায়ক এক জীবন দিল।
দরজা খুলতেই মায়ের সাথে কোনরূপ শব্দ বিনিময় না করেই মোত্তাকিন গটগট করে ঘরে ঢুকে গেল। মধুমিতা কপাল কুঁচকে বিতৃষ্ণা ভরা চোখে ছেলেকে পর্যবেক্ষণ করে। যেতে যেতে সপাটে ঘরের দরজায় একটা লাত্থি মারতেই মধু চেঁচিয়ে উঠল।
–“এই অপদার্থ! তুই দরজায় আঘাত করলি কেন? ওটা তোর বাপ বানিয়ে রেখে গিয়েছিল না-কি তুই বানিয়ে রেখেছিস?”
মোত্তাকিন নিরুত্তর শুধু ফুঁসে যাচ্ছে। উগ্র হাতে গায়ের শার্টটা খুলে ছুঁড়ে মারলো লন্ড্রি বাস্কেট বরাবর। মধুমিতা অবুঝ নেত্রে ছেলের বেহাল দশা দেখছে। নতুন না হলেও অদ্ভুত! সে এগিয়ে যায়,
-“কি হলো, তোকে এমন দেখাচ্ছে কেন? মারপিট করেছিস আবার? চোখমুখ এমন লাল হয়ে আছে কেন? দেখি এদিকে তাকা ঠিকমতো।”
মধুমিতা ছেলেকে ভালোকরে দেখার জন্য হাত ছুঁয়ে দিল। মোত্তাকিন ঝাড়া মেরে মায়ের হাতের থেকে দূরে সরে যায়। ক্রুদ্ধ চোখে চেয়ে বলে,
–“আমার নামের শেষে ঐ লোকটার নাম কেন যোগ করেছো, তুমি? এই নামের জন্য আমি পদে পদে প্রশ্নবিদ্ধ হই!”
মধুমিতা নিরব হয়ে যায়। নরম সুরে বলে,
–“কেন কি হয়েছে?”
–“আমার জীবনের যে অর্ধেক ঝামেলা সেটা এই নামের কারণে।”, মোত্তাকিন তপ্ত মেজাজে বলল। মধুমিতা আগামাথা বোঝে না। আর জানে ছেলে সোজাসাপ্টা বলবেও না। ছেলে বাথরুম থেকে বের হতেই সে ভাত নিয়ে ঘরে ঢোকে। মাখতে মাখতে নরম সুরে বলে,
–“তোর জন্ম নিবন্ধনের কার্ড তো আগেই বানানো ছিল। আর পরিবর্তন করার সুযোগ হয়নি।”
মোত্তাকিনের মুখে ভাতের লোকমা তুলে দিয়ে বলল মধুমিতা।
–“ভালো করেছ, কখনো যদি এই নামের জোরে ছেলে হারা হও তবে সে দোষ নিজের ঘাড়ে তুলে নিও। আমার কোন দোষ নেই।”
–“এই জীবন আমি তোকে দিয়েছি নাকি তুই বেছে নিয়েছিস?”
–“আমি যেই জীবন বেছে নিয়েছি তাতে আমায় কেউ আঘাত করার সুযোগ পায় না। কিন্তু ঐ নামের কারণে সবাই সুযোগ পেয়ে যায়।”
মধুমিতা শোনে নিরবে। খাওয়া শেষে মোত্তাকিন ধপ করে বিছানায় শুয়ে পড়ে। মধুমিতা সেদিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে অজশ্রবারের মত আবদার করে বলে,
–“বাবু, মায়ের কষ্ট কবে বুঝবি? একটু সুন্দর, শান্ত নিরাপদ জীবন যাপনে ফিরে আয় না! মায়ের ও তো তুই ছাড়া কেউ নেই। একটা কাজ কর, দায়িত্ব নিতে শেখ, আমিও একটা বউ নিয়ে আসি তোর জন্য তারপর আমরা একসাথে আনন্দের সাথে থাকব। মায়ের জীবনটা কিভাবে গিয়েছে তা তো তোর অজানা নয়! একটু সুখ তো এই বয়সে এসে আমার প্রাপ্য বল!”
–“তোমার সুখের জন্যই আমার যত দুঃখ!”, মোত্তাকিন বদ্ধনেত্রে বিড়বিড় করে। মধু শোনে সেই বিড়বিড় কণ্ঠ। কিন্তু গভীরতা বোঝে না। অভিমান জন্মে মায়ের কোন আর্তনাদ ছেলের নিকট পৌঁছাতে না পেরে।
*****
শুক্রবার! সপ্তাহের জমা কাজগুলো একাহাতে আজ মধুকে শেষ করতে হবে। পুরো সপ্তাহের আধোয়া জামাকাপড় ধুয়ে বালতি ভরে ছাদের উদ্দেশ্যে রওনা হলো। কোমড় ব্যথায় তখনো অস্পষ্ট কঁকিয়ে যাচ্ছে বয়স্ক নারীটি। যা বেতন পায় তাতে সংসার, ছেলে, প্রয়োজনীয়তা মিটিয়ে একটা কাজের লোক রাখার সামর্থ্য হয় না।
বালতি হাতে নিয়ে সদর দরজা খুলতেই মধুমিতা আচমকা হকচকিয়ে গেল সম্মুখে একটি অপ্রত্যাশিত মুখ ভেসে উঠতেই। হাস্যোজ্জ্বল মায়াভরা চেহারায় নারীটি গাল ভরে হাসলো। চঞ্চল কণ্ঠে বলল,
–“আসসালামুয়ালাইকুম আম্মু!”
মধুমিতা ভড়কে যায় সম্বোধনে। অনু বাঁকহারা মধুমিতাকে দেখে চমৎকার হাসলো। কোলে থাকা দুই বছরের ছেলের মাথায় আলতো চুমু দিয়ে তাকে মধুমিতার কোলে জোরপূর্বক চাপিয়ে দিল, আর নিজে মধুমিতার হাত থেকে বড় বালতিটা নিয়ে নেয়। অতঃপর গাল ভরে হেসে বলল,
–“এই বয়সে এসে এই কাজ আপনার একার পক্ষে করা সম্ভব নয়, আম্মু। তেমনি আমার পক্ষেও সম্ভব না আপনার নাতিকে একা হাতে বড় করা। আমাদের একে অপরকে খুব প্রয়োজন, এটা কবে বুঝবেন? ছাদ কোনদিকে? বাম দিকে? হ্যাঁ ঐদিকেই তো সিঁড়ি দেখা যাচ্ছে।”
একা একা কথা বলেই অনু সিঁড়ির দিকে হাঁটা ধরলো। মধুমিতা তখনো হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়ে কোলে থাকা ছোট বাচ্চা ছেলেটির দিকে তাকিয়ে। নিজেকে দ্রুত সামলে নিয়ে সে গম্ভীর গলায় ডেকে ওঠে,
–“অনু! আমার কথা শোন। ওগুলো এখানে রাখো।”
অনু শোনে না এগিয়ে যায়। ততক্ষণে গাড়ি পার্ক করে সিঁড়ি বেয়ে ওঠা মিরসাদ এগিয়ে আসলো। স্ত্রীর হাত থেকে বালতিটা নিজ হাতে নিয়ে বলল,
–“আমি ছাদে দিয়ে আসছি তুমি থাক।”
–“আমি করছি!”, অনু বিরোধ করল। মিরসাদ তাকে চোখে শাসিয়ে নিজেই বালতি নিয়ে ছাদে চলে গেল। অনু ছুটে এসে মধুমিতার হাত আঁকড়ে ধরলো। ঠিক আদুরে কন্যার ন্যায় আবদার করে বলল,
–“আম্মু, পানি দিন। গরম লাগছে।”
মধুমিতা নির্বাক ঘরে ঢুকে তাকে পানি দিল। অনু পানি খেয়ে পা গুটিয়ে বসলো সোফায়। মধুমিতা এক পলক নরম দৃষ্টি ফেলে বুকের সাথে নিরবে লেগে থাকা বাচ্চাটির দিকে। ছলছল নেত্র অচিরেই লুকাতে চায়। থমথমে মুখে বলে,
–“কেন এসেছো এখানে?”
–“আপনার নাতির তার দাদুমনিকে খুব প্রয়োজন।”,
মিরসাদ ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল। মধুমিতার কোনোরূপ পরিবর্তন ঘটে না। বলে,
–“আমার দোয়া সবসময় তোমাদের সাথে আছে। কিন্তু এখন চলে যাও, এখানে অনেক গরম ওরা থাকতে পারছে না।”
–“আপনি থাকতে পারলে আমরাও থাকতে পারব, আম্মু।”, অনু হাস্যোজ্জ্বল মুখে বলল। মিরসাদ এগিয়ে যায় মধুমিতার কাছে। মধুমিতা দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। মিরসাদ মৃদু হেসে আবদারের সুরে বলে,
–“বাড়ি চলুন, আম্মু। রাগ অভিমান ধরেই যদি পুরোটা জীবন কাটিয়ে দেই তবে উপভোগ কখন করব, বলুন তো? জীবন তো একটাই! কার কতক্ষণ সময় হাতে আছে আমরা কেউ জানি না। এই সময়টুকু অন্তত আমাদের দিন।”
–“তোমাদের মুখ দেখানোর মত পরিস্থিতি টুকুও আমার নেই। আমি কোনদিন যাব না তোমার সাথে মিরসাদ। ফিরে যাও!”, মধুমিতার শক্ত কণ্ঠে মিরসাদ প্রশ্ন করেই বসে,
–“কেন? ঐ বাড়ি আপনার। ঐ বাড়ির সবকিছুর উপর আপনার অধিকার আছে। তবে কেন যাবেন না?”
–“ঐ বাড়ির সৌন্দর্য কেড়ে নেয়ার কারণটাও আমি, সেটাও বলো।”
–“আপনি সেই কারণ নন, আম্মু।”
–“সেই কারণ আমিই। আমার কারণেই তোমার ছেলে আজ তার দাদু মনি ছাড়া বড় হচ্ছে! তোমরা মা হারা!”,বলতে বলতেই মধুমিতার চোখ বেঁয়ে জল ঝরতে লাগলো। মিরসাদ নাকোচ করে বলে,
–“আপনি ভুল জানেন, মা অনেক আগে থেকেই ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিল, আম্মু।”
–“সে আরো কিছুদিন বাঁচতো কিন্তু আমার কারণেই সে দিনদিন মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েছে আর মারা গিয়েছে।”, মধুমিতার জেদি কণ্ঠে মিরসাদ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
–“এগুলো পুরনো কথা, আম্মু। আমরা যত পুরনো কথা টানব ততোই জীবন কঠিন হয়ে যাবে। বাড়ি ফিরে চলুন, প্লিজ। মোত্তাকিনের এই ছন্নছাড়া জীবনের একটা গতিবিধি প্রয়োজন। আমরা সবাই একসাথে হলে ও সঠিক পথে আসতে বাধ্য হবে। আর পাপা, পাপার আপনাকে খুব প্রয়োজন! সে শারীরিক ভাবে ইদানিং অনেক ভেঙে পড়েছে। অন্তত এই সময়টায় তার আপনার সঙ্গ প্রয়োজন।”
মধুমিতা লালচে নেত্র তুলে তাকায়। কোনক্রমেই নিজের অনুভূতির সাথে পেরে না ওঠে ক্রন্দনরত গলায় বলে,
–“আমি ঐ লোকের সান্নিধ্যে আর কখনো থাকতে পারব না মিরসাদ। ঐ লোক আমায় একেবারে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। ছল করে আমায় সমাজে দ্বিতীয় নারী বানিয়েছে, চরিত্রহীন বানিয়েছে এক মায়ের খুনী বানিয়েছে। আমি ঐ লোকের সাথে থাকলে গুমড়ে গুমড়ে মরে যাব তার থেকে এই জীবন অনেক ভালো তোমরা চলে যাও এখান থেকে। আর কখনো এখানে আসবে না, চলে যাও।”
মধুমিতা অনুনয় করে বলল। মিরসাদ অনু ব্যর্থতার নিঃশ্বাস ফেলে একে অপরের দিকে তাকায়।
সেবার সদ্য যৌবনের পা দেয়া এক আঠারো বছরের মেয়ের জীবনে বসন্ত হয়ে এসেছিল শহুরে এক সুদর্শন ছেলে। স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে সদ্য কলেজে ওঠা মেয়েটিকে দারুণ দৃষ্টি নন্দনীয় লাগলে কোনরূপ বিলম্ব না করে প্রস্তাব দিয়ে বসে। গ্রামে বেড়ে ওঠা মধুমিতা তখন সদ্য প্রেম বুঝতে পারা এক রঙিন স্বপ্ন বোনা উঠতি বয়সের মেয়ে। সেই রঙিন স্বপ্ন গভীর হওয়ার আগেই তার অনুভূতিদের একটা পরিচয় দিয়ে দিল বাবা-মা। শহুরে প্রতিষ্ঠিত পাত্র পেয়ে বিনা বিলম্বে রাজী হয়ে গেল বিয়ের জন্য। বিয়ে হলো খুব সাদামাটা, পাত্র জানায় স্ত্রীকে বুড়ো বাবা-মায়ের সাথে গ্রামেই রাখবে। শহরে ব্যস্ত জীবনে স্ত্রীকে একা রাখতে চায় না। মধুমিতার পরিবারের কোন সমস্যা ছিল না। সে পড়াশুনার সাথে সাথে দারুণ একটা বৈবাহিক জীবনযাপন করতে লাগলো। বছর দুই ঘুরতেই কোল আলো করে এক ছেলে সন্তান আসলে স্বামী রুপে থাকা মুহিত ইরতেজার উল্লাসের শেষ ছিল না। স্বামীর উল্লাস আর পরিবারের সকলের আনন্দ দেখে মধুমিতা পড়াশুনার ঘাটতি আর গায়ে মাখল না। ছেলে সামলে পড়াশুনা চালিয়ে যেতে লাগলো। সে সময় জীবনে বেশ অভিজ্ঞ আর শক্তপোক্ত হয়ে ওঠে মধুমিতা। শুনেছে স্বামী শহরে বিশাল পদে নিয়োগ পেয়েছে। তার খ্যাতির কমতি নেই, বেশ সাহসী একজন মানুষ ছিল যে! স্বামীর প্রতি অগাধ অনুভূতি ছিল তার। তখন কলেজের গন্ডি পেরিয়ে স্নাতকে পড়ে। একদিন স্বামীকে চমকে দেয়ার উদ্দেশ্যে কোনমতে স্বামীর ঠিকানা খুঁজে ছেলেকে নিয়ে একা একাই শহরে চলে গেল। কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত স্বামীকে চমকাতে গিয়ে নিজেই চমকে গেল মধুমিতা। শহরে স্বামীর ভরা সংসার আলিশান বাড়ি দেখে। দুই সন্তান আর স্ত্রী নিয়ে সেখানে মুহিত ইরতেজা সফল আর একজন সুখী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। স্ত্রীর আগমন ঠিক প্রলয়ের মত ছারখাড় করে দিল মুহিত ইরতেজার সাজানো গোছানো ছল, প্রতারণার জীবন। বিবাহ নিয়ে যুবতী মনের রঙিন স্বপ্ন, অনুভূতি, সদ্য মা হওয়ার বিশেষ অনুভূতি সকল অনুভূতি একদম সেদিন পায়ে পিষে দিয়েছিল মুহিত ইরতেজা। লোকটা তার নাম দিয়েছিল ভালোবাসা! সে লোভ সামলাতে পারেনি মধুমিতাকে নিজের করে রাখার। সেই ঘৃণ্য ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশে মধুমিতা নিজেকে ঘৃণা করতে শুরু করল। সেই মুহুর্তে সব সম্পর্ক ত্যাগ করে ঐ সদ্য জন্মানো ছেলেকে নিয়ে দূরে সরে যায় চিরদিনের জন্য। ঐ ছল, নাটকীয়তা সহ্য করতে পারেনি মধুমিতা। যেই মানুষটা তার জীবনটাকে ছেলেখেলা বানিয়ে দিয়েছিল তার মুখ দ্বিতীয় বার দেখবে না বলে পন করে। শহরেই থেকে যায়। গার্মেন্টসে কাজ করে নিজেকে নিজে প্রতিষ্ঠিত করে, ছেলেকে একা হাতে বড় করে, একটাসময় একটা মানসম্মত স্কুলের চাকরি পায়। জীবনটা সেই পর্যায়ে একটু সহজ হলেও, ছেলে বড় হতেই জীবনটা আবার কঠিন হতে লাগলো। চরম কঠিন! বাবার আরেক রূপ ছেলে মোত্তাকিন ও বোঝে না দুমড়েমুচড়ে ভেঙে পড়া মধুর কষ্ট!
দীর্ঘদিন ক্যান্সারে আক্রান্ত মুহিত ইরতেজার প্রথম স্ত্রী ও বোধহয় স্বামীর প্রতারণার শোক সইতে পারেনি। তিন বছর বাচার কথা থাকলেও ছয় মাসের মাথায় সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। আর এই মৃত্যুর ও সকল দ্বায় ভার মধুমিতা নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। প্রায়শ্চিত্ত করে যাচ্ছে, সংসার ত্যাগী এবং নিজেকে বিধবা বলে পরিচয় দিয়ে।
~চলবে~

