প্রেম_বর্ণহীন #তোনিমা_খান #পর্বঃ১৬

0
2

#প্রেম_বর্ণহীন
#তোনিমা_খান
#পর্বঃ১৬

দীর্ঘ ত্রিশ বছরের লাঞ্ছিত জীবন হঠাৎ করেই দমকা হাওয়ার তালে কেমন বদলে যেতে লাগল। বাতাবরণে হীনমন্যতার রেশ একটু একটু করে কেটে যাচ্ছে কারোর শক্তপোক্ত ঢালে। বাতাবরণে এখন প্রায়শই…না না প্রায়শই নয় হরহামেশাই প্রেমের সুবাস ভেসে বেড়ায়। এখন আর নিজেকে লুকানোর প্রবণতা দেখা যায় না কৃষ্ণময়ীর মাঝে! তার কৃষ্ণ বর্ণের সৌন্দর্য এখন পরিস্ফুটিত অন্য কারোর সৌন্দর্যে। সে শত ভীড়ের মাঝে মাথা তুলে হাঁটে; এখন আর কেউ তার দিকে বাঁকা চোখে তাকায় না, এই মুখ নিয়ে কোথায় ঠাঁই হবে এই কটুক্তি শুনতে হয় না, স্বামীর সংসার কপালে জুটবে কি-না এমন শঙ্কা শোনাযায় না। কারণ এই তকমাগুলো উগ্র ছেলেটা ভীষণ উগ্রতার সাথে মুছে দিয়েছে।

প্রতি প্রভাতে সুপ্রভাতের পরিবর্তে শোনা যায় ভীষণ অপ্রত্যাশিত কিছু লাজবিহীন শব্দের বুনন। আর প্রত্যাহিক লাজমাখা মুখ নিয়েই ইন্দুবালার দিন শুরু হয়। আজ ও ব্যতিক্রম হলো না। কর্নকুহর থেকে অন্তঃস্থল সংকুচিত হয়ে আসে ঘুম জড়ানো কণ্ঠ ভেসে আসতেই।
–“বাহিরটা কয়লা ভেবে ক’টা কাপুরুষ আমার জন্য একটা হিরা রেখে গিয়েছে। ইচ্ছে করছে তাদের গিয়ে একটা করে সিগারেট খাইয়ে আসি।”, দু’হাতে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে গলদেশে মুখ গুঁজে থাকা ছেলেটির জড়ানো কণ্ঠে। সদ্য ঘুম থেকে ওঠা ইন্দু চোখ মেলে তাকায়। লাল হয়ে আছে চোখদুটো। তবে আজ আর লাজ দেখাগেল না মুখশ্রীতে, সকাল সকাল সিগারেটের নাম শুনে! সে দাঁতে দাঁত চেপে নিজের উপর শুয়ে থাকা বিশাল দেহটাকে দু’হাতে সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে ধাক্কা মেরে ফেলে দিল। খাট থেকে ধুম করে মেঝেতে পড়ে যাওয়া মোত্তাকিন ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল। ঘুম পুরোপুরি ছুটে যায়। ইন্দুবালা এলোমেলো বস্ত্র সামলে বিছানা থেকে নামে। ঘুম জড়ানো চোখে মোত্তাকিন তেতে উঠল মেয়েটির উপর। ক্ষিপ্ত স্বরে বলল,
–“তোর মতো পড়শী বউ আল্লাহ কাউকে না দিক, ইন্দু। সারারাত স্বামীর ভালোবাসা নিয়ে সকালে উঠেই তাকে ধাক্কা মেরে খাট থেকে ফেলে দিলি? অকৃতজ্ঞ বেয়াদব নারী!”

রাগান্বিত ইন্দুবালা পাশে থাকা বালিশটা ছুঁড়ে মারল মোত্তাকিনের মুখ বরাবর। দাঁত খিচে বলল,
–“তোর ভালোবাসা চেয়েছে কেউ?”

–“আমি হলাম উদার মনের মানুষ। না চাইতেই সব দিয়ে দেই।” মোত্তাকিন উঠতে উঠতে বলে। ফের ধপ করে শুয়ে পড়ে বিছানায়। ইন্দুবালা তা দেখে কঠিন গলায় বলল,
–“দশটায় অফিস, নয়টার মধ্যে উঠবি। রোজ রোজ তালবাহানা করতে পারবি না। আর যদি কাজ করতে নাই চাস তবে বলে দিবি, আমিও মধুর মতো তোকে বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াব।”

মোত্তাকিন বালিশে ডোবানো মুখ সরব তুলে কঠিন চোখে তাকিয়ে বলে,
–“কয় বেলা খাইয়েছিস, বেয়াদব? না খাইয়েই রোজ সকালে এত কথা শুনতে হয়, তোর ইনকাম খেলে মনে হয় তুই আমায় কথা শোনাতে শোনাতে মেরে ফেলবি।”

–“যেই ছেলে ঐ বুড়ো মায়ের কদর বোঝে না তার কথা শোনাই উচিত।”, ইন্দুবালা ওয়াশরুমে ঢুকতে ঢুকতে বলে। তখন সকাল পাঁচটা। ইন্দুবালা গোসল করে নামাজ পড়ে, অতঃপর রান্নাঘরের দিকে চলল। মস্তিষ্কে আস্তেধীরে কিছু ভার পড়ছে। তন্মধ্যে সবচেয়ে কঠিন ভার বোধহয় স্বামী! যেই মানুষটার অভ্যাস, কাজ, চিন্তাধারা, লক্ষ্য সব যেন কোন অনিশ্চিত অনিষ্টের দিকে ধাবিত করে। কি করে ফেরাবে একটা সুন্দর জীবনের দিকে?

সকালের নাস্তা থেকে শুরু করে, দুপুরের রান্না শেষ করে ইন্দুবালা পুরো ঘরময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে নিলো। রাতে ঠান্ডার ওষুধ খেয়ে ঘুমানোর ফলে মধুমিতার দেরি হয়ে গেল আজ ঘুম থেকে উঠতে। ঘড়িতে নয়টা! সে হম্বিতম্বি করে যখন উঠল তখন দেখল ঘর একদম টিপটপ, ডাইনিং টেবিল ভরতি খাবার। সে ছুটলো ইন্দুবালার খোঁজে‌। নিজের ঘর পরিষ্কার করে ইন্দুবালা স্কুলে তৈরি হচ্ছিল। মধুমিতা হাঁক ছেড়ে ডাকায় সে ঘর থেকে বের হয়। হেসে বলে,
–“উঠেছ? নাস্তা করে নাও।”

–“উঠতে দেরি হয়ে গেল। তুই ডাকবি না আমায়? সব কাজ একা করেছিস কেন?”

–“আমি কখনোই ডাকতাম না তোমায়। বরং আরেকটু ঘুমানোর সুযোগ করে দিতাম। বারবার বলি, চাকরি ছেড়ে দাও। কথা কেন শোন না? শরীরের অবস্থা দেখেছ? তোমার ছেলে তো এখন কাজ করছে, তবে কেন এমন করছ।”

মধুমিতা ভারী নিঃশ্বাস ফেলে শান্ত দৃষ্টিতে তাকায়। বলল,
–“ওটা ভালো মানুষের জাত না, ইন্দু। তুই চিনিস না ওকে। বাপের আরেক রূপ, এমন কতশত ভালো রূপ দেখিয়ে আমার সাথে ছলনা করেছে! চাকরির ইন্টারভিউ দিতে পাঠাতাম, সে পোশাক আশাক পড়ে গিয়ে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিত। আর আমায় বলত, পরীক্ষায় পাশ করেনি। যে পরীক্ষা দিতো ওটাতেই টিকে যেতো, কিন্তু কোনটার রেজাল্ট আমায় বলত না। প্রচুর মেধা ছিল, সব নষ্ট করেছে। আমি মরার আগ পর্যন্ত ওর ওপর বিশ্বাস করব না, তাতে আমার যত কষ্ট হোক।”

মধুমিতার কথার মাঝে লুকিয়ে ছিল স্বামী সন্তানের প্রতি ক্ষোভ। কেউ যে তার কষ্ট বুঝল না। না বাপ, না ছেলে। ইন্দুবালা দেখে টলমলে সেই লুকানো নেত্রদ্বয়। এগিয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে দু’হাতে শক্ত করে। মধুমিতাও জড়িয়ে ধরে তাকে। এই শত দুঃখের মাঝে এই মেয়েটা তার অনাকাঙ্ক্ষিত পেয়ে যাওয়া এক সুখ। তাদের জীবনসঙ্গীরা তাদের মন না বুঝুক, তারা বুঝবে একে অপরকে। একে অপরের সুখের কারণ হবে।

মধুমিতা আর ইন্দুবালা স্কুলের জন্য পুরোপুরি তৈরি হয়ে ঘর থেকে বের হয়। মধুমিতার রিকশা দাঁড়িয়ে ছিল গেটের সামনে। ইন্দুবালা রোজকার অভ্যাস অনুযায়ী বাবার সাথে একবার দেখা করতে যায়‌।
মধুমিতা রিকশায় উঠে বসতেই সুযোগ সন্ধানী উৎসুক পাশের দুই প্রতিবেশী ডাক দেয়।
–“মধুমিতা ভাবি, ছেলের বিয়ের পর তো আপনার দেখাই মিলছে না।”

–“আমার সখী এখন আমার ঘরে, বাইরে বের হয়ে কি করব আমি? ঘরেই আড্ডা দেই, ভাবি।”

–“ভালোই মিলমিশ ছেলের বউয়ের সাথে তাই না? তা ছেলের সাথেও কি ইন্দুবালার এমনি মিলমিশ আছে? দু’জন তো আকাশ পাতাল।”

পরপরই চাপা স্বরে শুধায়,
–“এই ভাবি মোত্তাকিন বউকে ভালোবাসে টাসে? ওর তো ভীষণ মেজাজ, আর বিগড়ে যাওয়া অভ্যাস। বউয়ের সাথে বনিবনা হয়?”

মধুমিতা কপাল কুঁচকে তীব্র বিরোধিতার সাথে বলল,
–“হবে না কেন? আমি কি জোর করে ওকে বিয়ে করিয়েছি না-কি? ও নিজের ইচ্ছায় বিয়ে করেছে। বনিবনা না হলে ওকে ঝাড়ু দিয়ে দেব না?”

–“আমার তো মনে হয় না। মোত্তাকিন রাগচটা হলেও, মন অনেক ভালো ভাবি। ও নিশ্চয়ই আবেগে পড়ে দয়া দেখিয়ে ইন্দুবালাকে বিয়ে করেছে। আপনার অমন সুন্দর চাঁদের মতো ছেলের সাথে অমন কালো কুচকুচে মেয়েকে আমরাই তো দেখতে পারি না।”

–“আপনাদের দেখার কোন প্রয়োজন নেই তো, আন্টি! আমার বউ আমি দেখলেই হবে। আর বিশ্বাস করেন আমার ওকে দেখতে ভীষণ ভালো লাগে।” মধুমিতা পাল্টা জবাব দেয়ার আগেই কারোর কাটকাট স্পষ্ট কণ্ঠে প্রতিবেশীরা চুপসে গেল। মোত্তাকিন শার্ট জড়াতে জড়াতে দ্রুত কদমে বের হয়। তারা এবার মানে মানে করে কেটে পড়ে। মধুমিতার মুখে হাসি ফুটে উঠল মনের মতো জবাব পেয়ে। অন্তত তার ইন্দুবালার জন্য এমনি একটা সাপোর্ট সে সবসময় আশা করত। সে প্রসন্ন মনে বলল,
–“বাহ্ বাবু! এত দিনে তুই আমার আসল ছেলের মতো একটা জবাব দিলি। আজ মনে হচ্ছে তুই আসলেই আমার ছেলে!”

–“এতদিন কার ছেলে ছিলাম, মামনি?”

–“কোন এক গিরগিটির।”, মধুমিতা শান্ত স্বরে বলল। মোত্তাকিন ডানে বামে মাথা নেড়ে বাইক বের করতে লাগলো। তা দেখে মধুমিতা চেঁচিয়ে উঠল,
–“এই ছেলে কোথায় বের হচ্ছিস? নাস্তা খেয়ে আয়!”

মোত্তাকিন বাইক বের করতে করতে বলল,
–“না, অফিসে করে নেব। তোমাদের দিয়ে এসে অফিসে যাব। এমনিতেও ওখানে ঠেসে ঠেসে খাওয়ায়।”

–“তুই আবার কবে থেকে আমায় দিয়ে আসতে যাচ্ছিস? ওহ্, আমায় না বল বউকে দিয়ে আসতে যাচ্ছিস।”

মায়ের কথায় মোত্তাকিন স্মিত হাসল। ভদ্রমহিলার স্বাভাবিক জীবন বহাল রাখার জন্য সে নিজেকে খুইয়ে বসছে— অথচ ভদ্রমহিলার কোন সহানুভূতি নেই। সেও স্বভাবসুলভ উদাসীনতা রেখেই বলল,
–“এত কথা পেঁচাও কেন? তুমি বাইকে ওঠতে পারো? উঠলে তো তোমার কোমড় ফেটে যায়।”

–“কি দারুণ বাহানা, বাবু। তুই যদি মাকে ভালোবাসতি তবে বাইক বেঁচে মায়ের জন্য একটা রিকশা কিনতি। কিন্তু তা না! তুই তো মাকে ভালোবাসিস না।”, মধুমিতা মুখ ফুলিয়ে বলল। মোত্তাকিনের গতি থেমে যায়। সে চোখমুখ কুঁচকে বলে,
–“পাবলিক ইউনিভার্সিটি থেকে আইটি এর উপর পড়াশুনা করে বের হয়েছি কি রিকশা চালানোর জন্য? তাও আবার তোমার মতো ঘষেটি বেগমের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করার জন্য? জেগে জেগে স্বপ্ন কেন দেখছ, মামনি?”

–“তুই একটা অপদার্থ, বাবু!”, মধুমিতা রেগে যায়।মোত্তাকিন গায়ে মাখে না।
–“এ আর নতুন কি মামনি?”

পরপরই উঁচু কণ্ঠে চেঁচিয়ে ওঠে,
–“এই ইন্দুর বাচ্চা, কোথায় গেলি? তাড়াতাড়ি আয়।”

ইন্দুবালা বাবার সাথে দেখা করে এসেই ছেলেটাকে অমন তড়িঘড়ি করতে দেখে চাপা স্বরে শুধায়,
–“কি হলো? এত তাড়াহুড়ো করছিস কেন? খেয়েছিস?”

–“পরে খেয়ে নেব, বাইকে ওঠ তাড়াতাড়ি।”

–“আমি মধুর সাথে রিকশায় চলে যেতে পারব। তোর যাওয়ার প্রয়োজন নেই।”

–“না না আমার সাথে ওঠার কোন প্রয়োজন নেই। একটা রিকশায় দুজন বসতে আমার অনেক কষ্ট হয়। তুই বাইকে আয়, আমি রিকশায় যাই। এই ভাই, চলেন।”, মধুমিতা তৎক্ষণাৎ ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলল। ইন্দুবালা নির্বাক বাইকে চড়ে বসে। মোত্তাকিন মায়ের রিকশার পাশাপাশি বাইক চালাতে লাগল। মধুমিতা দু’জনকে একসাথে দেখে গাল ভরে হাসল। সে চায় তার সখীর জীবনে স্বামীর সুখ থেকে শুরু করে পৃথিবীর সব সুখ আসুক। যেই সুখ সে পায়নি, তা সব ইন্দুবালা পাক। সেও এমন করে একজন প্রেমময়, বিশ্বস্ত সঙ্গী চেয়েছিল কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! তার চাওয়াটা বোধহয় অন্যায় ছিল! কেউ ভালো তো বাসলো কিন্তু তার পদ্ধতি কতটা নিকৃষ্ট ছিল!

সিদ্দিকী সাহেব বারান্দা থেকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখে সেই দৃশ্য। অন্তরালে নিশ্চিন্তের এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। তার মেয়েটাকে আগলে রাখবে মধুমিতা ভাবি আর মোত্তাকিন।
*****
–“ভাই কি হইছে?”

ফর্মাল পোশাক খুলে নিজের পোশাক পড়া মোত্তাকিন গভীর ভাবনায় ডুবে যায় তূর্যর সেই প্রশ্নে। কণ্ঠ খাদে এনে বলে,
–“পাশা কেমন যেন উল্টে যাচ্ছে, তূর্য। সবটা মনে হয় ঘেঁটে যাচ্ছে। এক পা আগালেও মারা খাব, এক পিছালেও মারা খাব এমন পরিস্থিতিতে আঁটকে যাচ্ছি মনে হচ্ছে।”

–“কি ঘেঁটে যাচ্ছে ভাই? আপনি কিসের কথা বলছেন?”

–“এই বশির ভাইয়ের শান্ত রূপ তো আমার ভালো লাগছে না।”, ধিমি কণ্ঠে বলেই মোত্তাকিন নীরব হয়ে যায়। চোখেমুখে এক অপ্রীতিকর পরিস্থিতির পূর্বাভাস ভেসে ওঠে। ঘেমে ওঠে মোত্তাকিন। তার জীবনটা সহজ হলেও কিছু কিছু মানুষ ক্ষুদ্র অসংগতির দ্বারা সেটা কঠিন করে রেখেছে।

–“ভাই, আমারো মনে হয় উত্তরের সিটি মেয়র আর বশির ভাই কোন বড়সড় ষড়যন্ত্র করছে। সারাদিন যাওয়া আসা লেগেই থাকে। কিন্তু তাতে আপনার সমস্যাটা কোথায়? দুই মেয়র লড়বে আপনি আমি মাঝখানে বসে মজা নেব।”, তূর্যর ফিচলে কণ্ঠে মোত্তাকিন ঢোক গিললো। ধিমি কণ্ঠে বলে,
–“সমস্যাটাই ওখানে! মধ্যস্থতাকারী আমি! আমি না থাকলে কোন সমস্যা ছিল না। দু’টো মারামারি করে মরলেও ডোন্ট কেয়ার! কিন্তু মধ্যস্থতায় আমি আছি, আর আমায়…”

থেমে যায় মোত্তাকিন। উত্তরের মেয়র আর দক্ষিণের মেয়রের দ্বন্দ্বে সে যদি মধ্যস্থতাকারী হয় তবে সেটা হবে সবচেয়ে অপ্রিতিকর! জীবন তাকে গুছিয়ে নেয়ার যেটুকু সুযোগ দিয়েছে তা হাতছাড়া হয়ে যাবে। বিরক্তি, রাগে অস্থির হয়ে পড়ে মোত্তাকিন। পকেট থেকে দ্রুত হাতে সিগারেট বের করে ঠোঁটে চাপে। টং এর দোকানের লক্করঝক্কর বেঞ্চিতে পিঠ এলিয়ে সুখটান দিতে দিতে বলে,
–“বিয়েটা এখন করা ঠিক হয়নি, তূর্য। টাকা লাগবে, অনেক টাকা লাগবে, টাকার খেলায় নয়তো বাজেভাবে হেরে যাব। আর তার মাশুল গুনতে হবে মামনি আর ইন্দুকে।”

তূর্য কৌতুহলী হয় কথার আগামাথা না বুঝে।
–“এখন? ভাই আপনি কি অনেক আগে থেকে ঠিক করে রেখেছিলেন কখন বিয়ে করবেন?”

–“কথা বলিস না, তূর্য। মেজাজটা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। বাড়ি যাই, তুই থাক।”

–“বাজে কয়টা? সবে দশটা ভাই! এত অস্থির ক্যান?”

–“বাড়ি গেলেই অস্থিরতা কমবে।”, মোত্তাকিনের চাপা স্বরে তূর্য তীর্যক মন্তব্যে বলল,
–“বাড়ি বউ আছে দেখে?”

–“তুই দিনদিন চালাক হয়ে যাচ্ছিস, তূর্য। আসি, কাল দেখা হবে।”

–“আর বাইর হবেন না ভাই? এত তাড়াতাড়ি ঘরে যাইয়া কি করবেন? আমি তো জীবনে বারোটার আগে ঘরে যাইনি, আজ যদি যাই সবাই হাসবে।”, তূর্য অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল। মোত্তাকিন ফিরে তাকায় ছেলেটির দিকে। বলে,
–“আমার উপর ও হাসবে আমার মা, কতগুলো কথা শোনাবে, টিটকারী কাটবে তারপর গিয়ে আমায় ঘরে ঢুকতে দেবে। কিন্তু তারপরেও শান্তি আছে।”

–“কি শান্তি ভাই?”

–“তুই বুঝবি না, বিয়ে কর আগে।”, মোত্তাকিন টং এর দোকান থেকে বেরিয়ে যায়। তূর্য চেঁচিয়ে বলে,
–“বুঝছি ভাই, বুঝছি।”

দশটা দশ নাগাদ কলিং বেল বেজে উঠল। ইন্দুবালা আর মধুমিতা তখন রান্নাঘরে ব্যস্ত। স্কুলে যাওয়ার আগে দু’জন সকাল আর দুপুরের রান্না করে গেলেও, রাতের রান্না এসেই করে। সেই রান্নাই করছিল। ইন্দুবালা যেতে চাইলে মধুমিতা তাকে আঁটকে দিল।
–“তুই যাস না, আমি যাই। কে না কে এসেছে!”

মধুমিতা পিপ হোলে চোখ রেখে ভড়কে গেল। তড়িৎ গতিতে দরজা খুলেই ব্যঙ্গাত্মক সুরে বলে ওঠে,
–“আমাবস্যার চাঁদ আকাশ থেকে নেমে সোজা আমার ঘরে ল্যান্ড করল কিভাবে, বাবু? মাথায় বাড়ি খেয়েছিস না-কি স্মৃতিশক্তি ভুলে দশটার সময় বাড়ি ফিরে এলি যে? আজ তো সূর্য ও পূর্ব দিক থেকেই উঠেছে।”

প্যান্টের পকেটে হাত গুঁজে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মোত্তাকিন থমথমে মুখে বলল,
–“আমার স্মৃতিশক্তি ঠিকই আছে মামনি। কিন্তু তোমার স্মৃতিশক্তি মনে হয় দূর্বল হয়ে গিয়েছে‌। আজ যে বুধবার। তুমি কি জানো না আমার বারান্দার সামনে কেউ তোমার অপেক্ষা করতে করতে বুড়ো হয়ে যাচ্ছে?”

সহসা মধুমিতার মুখ থেকে রসিকতা উবে গেল। মায়ের চুপসে যাওয়া মুখ দেখে মোত্তাকিন তা দেখে গা দুলিয়ে হাসতে হাসতে ভেতরে ঢুকে গেল। আজ ভদ্রমহিলাকে বেশ শায়েস্তা করা গিয়েছে। যেতে যেতে বলে,
–“তাড়াতাড়ি যাও, মামনি। কতক্ষণ দাঁড় করিয়ে রাখবে, পায়ে ব্যথা করবে না? কি প্রেম! এমন প্রেম তো আমিও জীবনে করার সুযোগ পাই নি। পাবোই বা কিভাবে!”

বলতে বলতেই মোত্তাকিন রান্নাঘরে ঢুকে গেল। রুটি বানাতে মগ্ন মেয়েটির মাথায় চাটি মেরে বলল,
–“এই বেয়াদবের জন্য পারিনি।”

ইন্দুবালা চাটি খেয়ে বেলন হাতে তেড়ে গেল ছেলেটিকে প্রহার করতে। মোত্তাকিন পা দিয়ে রান্নাঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে তেড়ে আসা মেয়েটিকে আঁটকে নেয় বাহুডোরে। দাঁত কেলিয়ে হাসতে হাসতে বেলনটা হাত থেকে নিয়ে নিজ লক্ষ্য পূরণে মরিয়া হয়ে উঠল। অকস্মাৎ ওষ্ঠপ্রান্তে উত্তপ্ত এক ওষ্ঠের নীরব চুম্বনে ছটফট করে উঠল ইন্দুবালা। তবে এই ছটফটানি মোটেও অনুভূতির তালবাহানা নয় বরং অসহনীয় ঝাঁঝালো বিষাক্ত গন্ধের তীব্রতায়। ইন্দুবালা সহ্য করতে পারল না সেই ঝাঁঝালো গন্ধ। উন্মত্ত ছেলেটিকে দু’হাতে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে গলগল করে বমি করে দিল। আকস্মিক এহেন কান্ডে মোত্তাকিন তব্দা খেয়ে গেল। বিস্মিত কণ্ঠে বলল,
–“এখন এটা বলিস না, রোজ রোজ এই বমি থেকে বাঁচতে, আমায় সিগারেট ছাড়তে হবে।”

–“আর একবার যদি সিগারেট খেয়ে আমার সামনে এসেছিস তবে তোর মুখ ভেঙে দেব!”, ইন্দুবালা রক্তচক্ষু নিয়ে বলল। রাগে তার কালচে মুখটি আরো কালচে বর্ণের ধারণ করেছে। কত সুন্দর রান্না করছিল! কেমন বিশ্রী পরিবেশ সৃষ্টি করল ছেলেটা! মোত্তাকিন অসহায় দৃষ্টিতে তাকায়।
–“আয়হায়, এটা বলিস না ইন্দু! চুমু আর সিগারেট দুটোই আমার জীবন। সিগারেট খেলে তোকে চুমু খেতে পারব না?”

–“ধারেকাছেও ঘেঁষতে পারবি না।”, ইন্দুবালা বেসিনে ঘঁষে ঘঁষে মুখ ধুচ্ছে।

–“কিন্তু সিগারেট আমার খুব প্রিয়! এটা ছাড়া আমি থাকব কি করে?”

–“ওটাই খা! চুমু খাওয়ার কোন প্রয়োজন নেই।”

–“কি আশ্চর্য! ওটা তো আরো প্রিয়। দুটোর একটা ছাড়াও আমি বাঁচব না রে, ইন্দু!”

–“ন্যাকামো করবি না আমার সাথে! সর এখান থেকে।”, ইন্দুবালা গর্জে উঠল।

–“আমার জীবন মরনের প্রশ্ন এটা! তুই ন্যাকামো বলতে পারিস না। বিকল্প উপায় বল!”

ইন্দুবালার চোখে চোখ রেখে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
–“চুমু না খেলে কেউ মরে যায় না। আর, সিগারেট না খেলেও মানুষ মরে যায় না। এরপর থেকে সিগারেট খেয়ে ঘরে আসলে আমি মধুর ঘরে ঘুমাব। এটাই বিকল্প পদ্ধতি!”

ইন্দুবালা বেরিয়ে যায় রান্নাঘর থেকে। এখন এগুলো পরিষ্কার করো! মেজাজ তার বিগড়ে গিয়েছে।
অন্যদিকে মোত্তাকিন চুমু আর সিগারেটের মাঝে যেকোন একটা বেছে নিতে ব্যস্ত। চোখেমুখে তার দুশ্চিন্তা! কি করে বাঁচবে সিগারেট ছাড়া? কিন্তু চুমু ও যে ইদানিং পছন্দের শীর্ষে রয়েছে।

অনবরত বাজতে থাকা ফোনটি রাগে সোফায় ছুঁড়ে মারে মধুমিতা। রোজ রোজ ঐ মানুষটাকে নিজের দুয়ারে দেখতে তার অস্থির লাগে, বিতৃষ্ণা অনুভব হয়। সে অস্থিরতা নিয়ে নিজের ঘরে গিয়ে দরজা আঁটকে দিল। লাগাতার ফোন বাজতে দেখে ইন্দুবালা ব্যস্ত কদমে এসে সেটি হাতে তুলে নেয়। চেঁচিয়ে বলে,
–“মধু তোমার ফোন এসেছে। দেখো কতগুলো ফোন আসছে।”

মধুমিতা কোন জবাব দেয় না। কানে বালিশ চেপে শুয়ে থাকে। নিজেকে দূর্বল লাগে ঐ মানুষটার সামনে যেতে। আজ এত বছর যাবৎ যেই মানুষটাকে দৃঢ়তার সাথে উপেক্ষা করে বাঁচছে শেষ বয়সে এসে তার কাছে দূর্বল হয়ে পড়বে না। বয়স হওয়ার পর থেকে দেহ মন কেমন দূর্বল হয়ে পড়েছে। কখন কি হয়ে যায় এই শঙ্কায় অন্তঃস্থলে আর দৃঢ়তার দেখা মিলে না। তাই মুখ লুকানোই শ্রেয় মনে করে।

আননোন নাম্বার থেকে এতবার ফোন দেখে ইন্দুবালা রিসিভ করে।
–“হ্যালো, কে বলছেন?”

অপরিচিত কণ্ঠে মুহিত ইরতেজা কিছুটা আন্দাজা নিয়েই শুধায়,
–“মোত্তাকিনের স্ত্রী?”

–“জি।”, ইন্দুবালা কপাল কুঁচকে বলল। মুহিত ইরতেজার মুখে হাসি ফুটে উঠল। স্নেহের কণ্ঠে শুধায়,
–“আসসালামুয়ালাইকুম আম্মা, আমি তোমার শশুর। কেমন আছো?”

ইন্দুবালা কিছুটা অবাক হয়। নিজেকে সামলে যথাসম্ভব শ্রদ্ধার সাথেই জবাব দেয়।
–“ওয়ালাইকুমুস সালাম! জি, ভালো আছি। মধু একটু বিশ্রাম করছে।”

–“মধুকে দরকার নেই, আমার তোমাকেই প্রয়োজন ছিল। একটু নিচে আসবে আম্মা?”

ইন্দুবালা বিপাকে পড়ে। এই মা ছেলেকে কিছু না বলে যাবে? একজন বাথরুমে আরেকজন তো দরজা আঁটকে বসে আছে। ইন্দুবালা সময় নিলো। মোত্তাকিন বাথরুম থেকে গোসল করে বের হতেই সে তাকে জানায়। মোত্তাকিনের মুখশ্রী গম্ভীর হয়ে আসে। লোকটা অনেকক্ষণ যাবৎ অপেক্ষা করছে। ইন্দুবালা বলে,
–“আমি যাই?”

–“কোথাও যাবি না। চুপচাপ নিজের কাজ কর।”

–“মুরুব্বি মানুষ কতক্ষণ যাবৎ অপেক্ষা করছে। তার ঝামেলা তোদের সাথে আমার সাথে তো না।”

–“তুই এখানে আছিস কেন? আমার জন্য না? আমার সাথে তুই জড়িয়ে নেই?, মোত্তাকিনের রাগান্বিত স্বরে ইন্দুবালা কপাল কুঁচকে বলল,
–“এক জীবনে এত রাগ, অভিমান, ঘৃণা ধরে বসে থাকলে দুঃখ ব্যতীত কিছুই থাকবে না জীবনে। লোকটা তো নিজের কাজে অনুতপ্ত তাই না? রোজ রোজ ক্ষমা প্রার্থনা করে তোদের দুয়ারে দাঁড়ায়। এতবার তো উপর ওয়ালার দুয়ারেও দাঁড়াতে হয় না। সেখানে আমরা মানুষ এত কঠোর কেন?”

–“মেজাজ খারাপ করবি না ইন্দু। তোর যা ইচ্ছা কর।”

ইন্দুবালা মাথায় কাপড় টেনে বের হয়। মুহিত ইরতেজা গাড়ির জানালা থেকে ইন্দুবালকে বের হতে দেখে খানিক অবাক হয়। সে চিনত মেয়েটিকে। মধু জড়িত সবকিছু সে জানে এবং চেনে। এটাও জানত এই মেয়েটি তার মধুর সখী! প্রসন্ন হয় অন্তঃস্থল ! মধু এখন আর একা নয়, তাকে দেখার মতো কেউ একজন আছে। সে বের হয়ে পড়নের মাস্কটা খোলে। গাল ভরে হাসলো ইন্দুবালা গাড়ির কাছে আসতেই।
ইন্দুবালা আনত কণ্ঠে সালাম জানায়। সৌজন্য হেসে বলে,
–“বাড়িতে আসুন।”

মুহিত ইরতেজা স্মিত হাসলো। বলল,
–“তোমার বর আর শাশুড়ি পছন্দ করবে না। আমি ঠিক আছি, আমি তোমার সাথেই দেখা করতে এসেছি।”

–“কেন?”, ইন্দুবালার অবুঝ কণ্ঠ। পরমুহূর্তেই মনে হলো প্রশ্নটা অযৌক্তিক। ছেলের বউকে দেখতে আসবে না?

মুহিত ইরতেজা গাড়ির ভেতর থেকে একটা ছোট শপিং ব্যাগ বের করে। অতঃপর সেটি এগিয়ে দিয়ে বলল,
–“তোমার বর শাশুড়ি আমায় সবসময় দায়িত্ব থেকে দূরে ঠেলে দিলেও আমি কখনো দূরে যেতে চাইনি। এখনো চাই না। আমার উপর তোমার ও সমপরিমাণ হক আছে। আমার এক ছেলের বউ রানীর হালে থাকবে আরেকজন সাদাসিধে এটা আমি দেখতে পারব না। এই কদিন একটু ব্যস্ত ছিলাম, আসার সুযোগ হয়নি। শশুরের পক্ষ থেকে এটা তোমার জন্য ছোট একটু ভালোবাসা। আশাকরি বর আর শাশুড়ির মতো ফিরিয়ে দেবে না।”

ইন্দুবালা জড়তায় কাঠ হয়ে রইল। এই মুহূর্তে মনে হলো মোত্তাকিনের কথা শোনা উচিত ছিল। এটা নিতেও পারবে না আর ফেরাতেও পারবে না। সে অসহায় দৃষ্টিতে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় খালি বারান্দার দিকে। অতঃপর ফিরে তাকিয়ে মিনমিনে স্বরে বলল,
–“এটা নিলে ওরা রাগ করবে।”

–“তুমিও আমায় শাস্তি দিচ্ছো?”

–“এমন কিছু না।”, ইন্দুবালা তড়িঘড়ি করে জবা দেয়।

–“একবার বাবা বলে ডাকলে না। আমি অপরাধ করেছি। আমার দ্বিতীয়বার কাউকে ভালোবাসা ভুল ছিল তার থেকেও ভুল ছিল তাকে নিজের করতে চাওয়ার পদ্ধতি। আজ সাতাশ বছর আমি তার‌ শাস্তি ভোগ করছি। নিজের স্ত্রী সন্তানের থেকে দূরত্বে ছটফট করছি। আমি জানি না এই শাস্তির সময় কবে শেষ হবে, কিন্তু অন্তত আমায় শশুরের দায়িত্ব থেকে বরখাস্ত করো না। এইটুকু গ্রহণ করলে আমার ভেতরটা একটু শান্তি পাবে।”

ইন্দুবালা নাকোচ করার উপায় পায় না, গ্রহণ করে। মুহিত ইরতেজা বুকভরা নিঃশ্বাস ফেলে মৃদু হেসে শুধায়,
–“মধুর, শরীর ঠিক আছে?”

–“ঠান্ডা, কোমড়ে ব্যথা। উঠতে বসতে, চলতে একটু কষ্ট হয়।”

মুহিত ইরতেজার মুখ মলিন হয় সে জানে এগুলো আগে থেকেই। কিন্তু নিরাময়ের কোন উপায় বা সুযোগ তাকে দেয়া হয় না। সে সুস্থ সবল সেই চঞ্চল মধুকে জীবনে পেয়েছিল মাত্র সাড়ে তিন বছর। এরপর আর মধু ধারেকাছেও ঘেঁষতে দেয়নি। প্রত্যাহিক তার চাওয়া থাকে তালাক, অথচ এ জীবনে সে এটা কখনোই দিতে পারবে না। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে পকেট থেকে একটা অয়েনমেন্ট বের করে। সেটি বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
–“এটা আমি বিদেশ থেকে এনেছি। ব্যথা জায়গায় লাগালে আরাম পাওয়া যায়। তুমি একটু ওর ব্যথা জায়গায় এটা মালিশ করে দিও, ও আরাম পাবে। ওর তো সঠিক চিকিৎসা প্রয়োজন, কিন্তু তার করানোর সুযোগ আমায় দেবে না। আমার সাধ্যের মধ্যে এতটুকুই আছে।”

ইন্দুবালা অনুধাবন করে মানুষটার গভীর ভালোবাসা। কিন্তু সেই ভালোবাসা ভুল হলেও একটা নাম পেয়েছিল, কিন্তু পদ্ধতি ভুল ছিল যার জন্য তিনটা মানুষের জীবন কিভাবে এলোমেলো হয়ে গেল। ইন্দুবালা ঘরে চলে যায়। মুহিত ইরতেজাও চলে যায়। নিজেদের বারান্দা থেকে এহেন দৃশ্য দেখে তহমিনা বুক চাপড়াতে লাগলো। ইনসিয়া থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে।
–“ওরে ইনসু, ঐ মেয়ে তো লটারি পেয়ে গিয়েছে। দেখ কি সুন্দর হেসে হেসে কথা বলল দু’জন। ইন্দুবালাকে আর পিছু ফিরে তাকাতে হবে না। দেখ গিয়ে ঐ বাক্সে সোনার জিনিস আছে।”

তহমিনার কথা শতভাগ মিলে যায়। ইন্দুবালা ঘরে এসে বক্সটা খুলতেই বিশাল এক জরোয়া হার ভেসে উঠল। ইন্দুবালা হতভম্ব হয়ে তাকায় সম্মুখের মোত্তাকিনের দিকে। যে কি-না রাগে গজগজ করছে। মোত্তাকিন দাঁত খিচে বলল,
–“এখন এগুলো পড়ে সঙ সেজে বসে থাক, বেয়াদব। তোর স্বামী তোকে কিছু দেয়নি যে ঐ লোকের দেয়া উপহার নিতে হবে? জুতো মেরে গরু দান!”

–“না নিলে তার অসম্মান হতো।”

–“তার সম্মান আছে?”, মোত্তাকিনের তীর্যক কণ্ঠে ইন্দুবালা ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
–“সম্মান নেই বলছিস কারণ সে তোর মায়ের সাথে অন্যায় করেছে তাই না?”

–“তো তুই কি বলছিস সে করেনি?”, মোত্তাকিন সরু নেত্রে তাকিয়ে শুধায়। ইন্দুবালা হ্যা বোধক মাথা নেড়ে বলল,
–“হ্যাঁ, করেছে। কিন্তু তুই কি করছিস? তুই তো তার থেকেও খারাপ যে জেনেশুনে নিজের দুঃখি মাকে কষ্ট দিচ্ছে। তোরা দু’জন ই ঐ মানুষটাকে কষ্ট দিয়ে তিলে তিলে মারছিস মোত্তাকিন। মধু, সবার সামনে হাসিখুশি থাকলেও তার ভেতরটা কতটা ভঙ্গুর তা আমি দেখেছি। তার একটু ভালোবাসার প্রয়োজন।”

–“কার ঐ লোকের?”

–“ঐ লোক মধুকে অনেক ভালোবাসে—তবে তার পদ্ধতি ভুল ছিল। কিন্তু আমি তার কথা বলিনি, তোর কথা বলেছি। মাকে একটু স্বস্তি দে। একটা সুন্দর জীবনযাপন করতে শেখ, তুই ছাড়া তার আর কে আছে?”

–“আছে আছে তার ভালোবাসার অনেক মানুষ আছে। তার প্রেমিক আছে। তুই জানিস না তোর মধু আজো ঐ লোকটাকে ভালোবাসে। শুধু মাঝখান থেকে আত্মসম্মানবোধ বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় দেখে আজ তার এই দশা, আর আমারো এই দশা। না নিজেরা একটা সুন্দর জীবনযাপন করেছে আর না আমায় করতে দিয়েছে। এখন এমন পর্যায়ে এনে দাঁড় করিয়েছে আমি কোন একদিক বেছে নিতে পারি না।”

ইন্দুবালা বুঝতে পারে না এই কথাগুলো। সে অবুঝ কণ্ঠে শুধায়,
–“কি বেছে নেয়ার কথা বলছিস?”

মোত্তাকিন লালচে নেত্র তুলে তাকায়। বলে,
–“হয় মরো নয়তো মারো—কোন একটা বেছে নিতে হবে আমায়। আর দুটোতেই আমার লোকসান।”

–“কে মরবে, কে কাকে মারবে? আমি কিছু বুঝতে পারছি না মোত্তাকিন।”

–“কিছু বোঝা লাগবে না।”, মোত্তাকিন বেরিয়ে যায় কক্ষ থেকে। ঘর থেকে বেরিয়ে ফাঁকা রাস্তায় গন্তব্যহীন পথে হাঁটতে লাগল। মস্তিষ্কে ঘুরপাক খাচ্ছে কিভাবে দুই প্রতিপক্ষের মাঝখান থেকে নিজেকে বের করা যায়। মস্তিষ্ক ছক আঁকতে আঁকতেই দাবার এক প্রসিদ্ধ কৌশলের কথা মনে পড়ে গেল। মোত্তাকিনের ওষ্ঠকোনা বেঁকে যায়। হাতে থাকা একটা কয়েন শূন্যে উল্টে বিড়বিড় করে বলে,
–“এক্সচেঞ্জ স্যাক্রিফাইস” আত্মত্যাগ ছাড়া জয় ছিনিয়ে আনা অসম্ভব! আমি আপনাকে রক দেব, আপনি আমায় নাইট দেবেন বশির ভাই। মাঝেমধ্যে ছোট্ট আত্মত্যাগই পরবর্তীতে জয় এনে দেয়।”

মোত্তাকিনের চোখমুখ ক্রুরতা ফুটে ওঠে, দুশ্চিন্তা সরে যায়। পকেটে হাত ঢুকিয়ে উদাসীন পায়ে হাঁটতে হাঁটতে বিড়বিড় করে,
–“তুমি আসলেই এক অপদার্থ জন্ম দিয়েছ, মামনি‌। নয়তো কেন এতকিছুর পরেও আমি তোমার চোখের পানির কাছে হেরে যাই?”

~চলবে~

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here