#প্রেম_বর্ণহীন
#তোনিমা_খান
#পর্বঃ১৭
কাঁচের গ্লাস ভেদ করে ব্যস্ত মুখশ্রী একবার দেখে নিয়ে মোত্তাকিন উদাসীন বদনে নক করে। মিরসাদ ব্যস্ত দৃষ্টি তুলে তাকাতেই স্মিত হাসি উপহার দেয় প্রেক্ষিতে। ভেতরে আসার অনুমতি দেয়। কক্ষে তখন অবস্থানরত কিছু বিশেষ মানুষের অবস্থান।
মোত্তাকিন ঢুকতেই লোকগুলোর মধ্যে একজন বয়স্ক পুরুষ খানিক চাপা স্বরে বললেন,,
–“গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার মাঝে ইমপ্লয়ি না রাখলে ভালো হয়, মিরসাদ।”
মিরসাদ মৃদু হেসে কথাটির জবাব দিল কিন্তু ভঙ্গিমা ছিল বেশ সহজ এবং ভ্রাতৃত্বের স্বীকৃতি দিয়ে বলল,
–“ও কোন ইমপ্লয়ি নয়, আঙ্কেল। ও আমার ভাই, মোত্তাকিন ইরতেজা।”
সোফায় আরামসে গা এলিয়ে বসা মোত্তাকিনের ললাটে বিরোধের ভাঁজ পড়লো। সে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে রাগন্বিত দৃষ্টিতে তাকায় মিরসাদের দিকে। মিরসাদের সম্মুখের লোকগুলো নড়চড়ে বসে। আকস্মিক এহেন কথা হজম করতে পারে না। নজরুল সাহেব খানিক আগ্রহী হয়ে পড়ে।
–“এর আগে আমি কখনো শুনিনি তোমার আরেক ভাই আছে। তোমরা দুই ভাই বোন। মুনিয়া তো তার স্বামীর সাথে বিদেশে থাকে, এটাও জানি কিন্তু ওর কথা তো কোনদিন শুনিনি।”
মিরসাদ বড্ডো সহজভাবেই তাদের জটিল আর বিতর্কিত সম্পর্কটা তুলে ধরে।
–“ও সাদামাটা মানুষ! ওর লোকমুখে কখনো আসার প্রয়োজন হয়নি। পড়াশুনা শেষ করে মাত্রই আমার সাথে যুক্ত হয়েছে। ইনশাআল্লাহ, এখন থেকে প্রায়ই আমাদের সবকিছুতে তাকে দেখতে পাবেন। আমরা কাজের কথায় আসি।”
সম্মুখের লোকগুলো আপাদমস্তক দেখে মোত্তাকিনের। মোত্তাকিন কড়া দৃষ্টিতে তাকায় সেই পর্যবেক্ষণকারী দৃষ্টির দিকে। লোকগুলো মগ্ন হয় নিজেদের আলোচনায়। নজরুল সাহেব বিনম্র কণ্ঠে বললেন,
–“তোমার বাবার সাথে অনেক দিন যাবৎ যোগাযোগ করার চেষ্টা করছি কিন্তু তিনি সময় দিতেই পারছে না। তাই তোমার কাছে আসা।”
–“পাপা, গত একমাস যাবৎ অনেক ব্যস্ততার মধ্যদিয়ে যাচ্ছে, আঙ্কেল। আমার মনে হয় না সে আগামী এক সপ্তাহের আগে কাউকে সময় দিতে পারবে।”, মিরসাদ বিনম্র কণ্ঠে বলল। নজরুল সাহেব মাথা নেড়ে বললেন,
–” আমি জানি মিরসাদ। এটাও জানি সে কি নিয়ে ব্যস্ত! আমি শতভাগ নিশ্চিত দক্ষিণ সিটির ৮-লেন সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের দায়িত্ব তার উপরেই দেয়া হবে। বিগত পনেরো বছর যাবৎ সে যেভাবে জনগনের বিশ্বাস, ভালোবাসা অর্জন করে আসছে তাতে এই বিষয়ে কোন সন্দেহই নেই। মূলত তাই তোমার কাছে আসা। স্যার, প্রতিবার নিজের কাজের জন্য দক্ষ, বিশ্বস্ত, দূর্নীতি মুক্ত কোন বিল্ডার্স বেছে নেয়। আমি চাইছি এবারের সুযোগটা আমাদের কোম্পানিকে দেয়া হোক। আমাদের কাজের মান, স্বচ্ছতা নিয়ে আজ পর্যন্ত কেউ কখনো আঙুল তুলতে পারেনি। আমরা তার সম্মান আর বিশ্বস্ততা নিজের শেষ নিঃশ্বাস ফেলে হলেও রক্ষা করব।”
মোত্তাকিনের কর্নদ্বয় সচকিত হয়। সে এতক্ষণে বুঝলো এই লোক কোন বিল্ডার। মিরসাদ খানিক বিপাকে পড়ে। বাবার কাজে সে প্রায়শই মতামত কিংবা পরামর্শ দিয়ে থাকলেও, কখনোই কোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে না। সে বলল,
–“এখনো তো পাপা টেন্ডার পায়নি, আঙ্কেল। আপনি জানেন এক্ষেত্রে রাজনীতি দ্বন্দ্ব, প্রতিযোগিতা, প্রতিহিংসার শিকার। আদৌ পাবে কি-না সন্দেহ! আমি বড়জোর আপনাকে আশ্বাস দিতে পারি, পাপা টেন্ডার পেলে আমি আপনার বিষয়ে কথা বলব। পাপার যদি আপনার কাজ পছন্দ হয় তবে অবশ্যই আপনার সাথে কাজ করবে।”
–“আমি এতটুকুই আশা করেছিলাম তোমার কাছে মিরসাদ। আমি নিশ্চিত মুহিত স্যারের আমাদের কাজ ভালো লাগবে। আমাদের পেছনকার রেকর্ড ও একদম নিখুঁত। আমরা না খেয়ে থাকব কিন্তু কোন দূর্নীতির আশ্রয় নেব না।”
–“আপনার সাথে কথা বলে খুব ভালো লাগল, আঙ্কেল। আশাকরি আপনার কথার মতোই আপনার কাজ ও দৃঢ় আর স্বচ্ছ হবে। ভাগ্যে থাকলে আবার দেখা হবে।”
নজরুল সাহেব মিরসাদের থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। মিরসাদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে মোত্তাকিনের দিকে তাকায়। সামনের চেয়ার দেখিয়ে বলে,
–“এখানে এসে বসো।”
মোত্তাকিন অনাগ্রহে গিয়ে সেখানে বসে। চোখেমুখে বিতৃষ্ণা! এক মেয়ের চক্করে সে কোথায় ফেঁসে গেল। এখনো চার মাস তার যে দম বন্ধ হয়ে আসছে। সে রুক্ষ কণ্ঠে বলল,
–“ওয়ার্কিং আওয়ার শেষ, এখনো বসিয়ে রেখেছেন কেন?”
মিরসাদ কাউকে একটা মেসেজ দিয়ে ফোনটা রেখে ছেলেটির বিরক্তিমাখা মুখপানে তাকায়। তার বিরক্তিকে উপেক্ষা করে শান্ত স্বরে বলে,
–“দুই কাপ চা খাই দু’জনে মিলে। একা একা খেতে ভালো লাগছিল না তাই।”
মোত্তাকিন তেড়েফুঁড়ে উঠল এহেন রসিকতা ভরা কণ্ঠে। চাপা আক্রোশে বলে,
–“আমার গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট করে আমায় চা খাওয়ার জন্য বসিয়ে রেখেছেন?”
মিরসাদ মাথা নেড়ে বলল,
–“এটাও তোমার ডিউটির আওতায় পড়ে। ত্যাড়ামো করলে বেতন কাটা যাবে, আর তোমায় বেশিদিন চাকরি করতে হবে।”
–“করব না আপনার চাকরি।”
–“না করলে টাকা ফেরত দেবে এই মুহূর্তে নয়তো আমি পুলিশে ফোন দিচ্ছি। আর এবার আমার পাপা তোমায় মোটেই বের করতে পারবে না।”
মোত্তাকিন দাঁতে দাঁত চেপে কঠিন চোখে তাকায় মিরসাদের নিরুদ্বেগ মুখপানে। অতঃপর দাঁত কামড়ে চুপটি করে বসে রইলো। মিরসাদ মিটিমিটি হেসে চা আনায়, সাথে নান রুটি আর চিকেন চাপ। দুই ভাই ভাগাভাগি করে খেলো। মোত্তাকিন পুরোটা সময় চুপ করে থালকেও মিরসাদ তাকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে কথা বলায়। তার ভালোলাগে ছেলেটির সঙ্গ। এমন এক ভাই তার সঙ্গে থাকত, তার বাড়িতে থাকত—তবে কতোই না মজা হতো! মাঝরাতে দুই ভাই বাইক নিয়ে খালি রাস্তায় উড়ে বেড়াত, আড্ডা দিত। মিরসাদ অনুভব করে এই ছেলেটা তার বন্ধু হলে খুব ভালো হতো! কাজ শেষে হ্যাঙআউট করার মতো এক দারুণ সঙ্গী পেত।
বশির ইদানিং মোত্তাকিনকে কোনপ্রকার চাপ দেয় না মুহিত ইরতেজাকে পথ থেকে সরানোর জন্য। সে হঠাৎ একদম শান্ত, নীরব হয়ে গিয়েছে। কিন্তু কেন? ঠিক এই চিন্তাই মোত্তাকিনকে তাড়া করে বেড়ায়।
তখন রাত দশটা বিশ। টং এর দোকানে নিজের দলবলের সাথে আড্ডা দিচ্ছিল মোত্তাকিন। তন্মধ্যেই একটা প্রকাণ্ড মুষ্ঠিঘাতে মোত্তাকিন সরব মুখ থুবড়ে পড়লো পাশের বেঞ্চিতে। তূর্য হকচকিয়ে উঠে দাঁড়ালে অবাক হয় পারভেজকে দেখে। রাগে তার মুখশ্রী লালচে বরণ ধারণ করেছে। মোত্তাকিন সামলে ওঠার আগেই পারভেজ তাকে টেনেহিঁচড়ে টং এর দোকানের পাশে মানবশূন্য ফুটপাতে নিয়ে আসে। হিসহিসিয়ে শুধায়,
–“মুহিত ইরতেজার সাথে তোর কি সম্পর্ক?”
তূর্য ছুটে আসতে চাইলেও মোত্তাকিন ঠোঁটের কোনে রক্ত মুছতে মুছতে হাত জাগিয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। তূর্য থেমে যায়।
মোত্তাকিন চোখ তুলে তাকায় স্কুল জীবন থেকে আজ পর্যন্ত নিজের পাশে থাকা প্রিয় বন্ধুর পানে। বরাবরের মতোই একই স্বীকারোক্তির সাথে জবাব দেয়,
–“কিছুনা।”
সহসা আরেকটা ঘুষি ক্ষিপ্র বেগে ছুঁয়ে গেল মোত্তাকিনের বাম চোয়াল। পারভেজ আরো শক্ত করে কলার চেপে ধরে বলে,
–“একদম মিথ্যা বলবি না! ঐ মুহিত ইরতেজা তোর কিছু না হলে, প্রতি শনি সোম বুধ তোর বাড়ির সামনে কি করে? কেন সে নিজেকে লুকিয়ে তোর বাড়ির সামনে যায়? সে ঐ দালানের কারোর জন্য যায় না বরং তোর মায়ের জন্য যায়, কুত্তার বাচ্চা! তুই এখনো অস্বীকার করবি তুই ঐ মুহিত ইরতেজার ছেলে না?”
মোত্তাকিন কোন জবাব দেয় না। সে স্থির শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে বন্ধুর মুখপানে। পারভেজ রাগে ক্ষোভে ফেটে পড়ে শান্ত ভঙ্গিমায় ফের বলল,
–“আমার সাথে লুকোচুরি করবি না মোত্তাকিন। বশির ভাইয়ের তোর ওপর সন্দেহ হয়েছে। সে আমায় তোর ওপর নজর রাখার নির্দেশ দিয়েছে। সব খুঁটিনাটি তথ্য দিতে বলেছে। তুই যদি আমায় মিথ্যা বলিস তবে আমি একদম সব সত্যি বলে দেব।”
–“জানিস-ই তো তবে আর বলব কি?”, মোত্তাকিনের উদাসীন কণ্ঠ। পারভেজ সপাটে আরেকটা লাগালো।
–“তবে এতদিন মিথ্যা বললি কেন কু”ত্তা”র বা”চ্চা? আমার সাথেও তুই মিথ্যা বলেছিস? নিজের ছোটবেলার বন্ধুর কাছে? এই সত্যি যদি বশির ভাই জানে তোকে সহ ইরতেজা পরিবারের সবাইকে জানে মেরে ফেলবে।”
–“নিরপরাধ মানুষগুলোকে তারা কেন মারবে? ঐ লোক আমার বাপ বলে আমি কোনদিন তাকে দুই পয়সার সহানুভূতি দেখাইনি আর না আজ দেখাব। কিন্তু ঐ লোকের জীবদ্দশায় এমন কোন অপরাধ নেই যার কারণে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে। সে যদি অপরাধ করে থাকে তবে ব্যক্তিজীবনে করেছে। যা ধর্তব্যের বাইরে।”
পারভেজ চিন্তা, রাগে অধৈর্য্য হয়ে বলল,
–” তুই জানিস না, বশির উত্তরের মেয়রের চাচাতো ভাই। উত্তরের মেয়র হিংস্র হয়ে পড়ছে একের পর এক টেন্ডার হারিয়ে। এবছরের সবচেয়ে বড় টেন্ডারটাও যদি সে হারিয়ে ফেলে তবে ইরতেজা পরিবারের সবাইকে কু/পি/য়ে মে/রে ফেলবে। একজনকে ও ছাড়বে না। তোকে আর তোর পরিবারকেও না!”
মোত্তাকিনের দৃষ্টি ক্রমশই ম্লান হয়ে আসে অনিশ্চিত ভবিতব্যের অনিষ্ট ভেবে। তার পথটুকু এখন আর দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভরপুর নেই। তার সামনে এখন একটাই পথ খোলা। আর কোন উপায় নেই, সে একজনের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জন্য এতগুলো জীবন শেষ হতে দিতে পারে না। সে ফাঁকা এক ঢোক গিলে ক্ষীণ স্বরে বলল
–“এমনটা হবে না। মুহিত ইরতেজা যদি টেন্ডার পেয়েও যায় এই কাজের দায়িত্ব যেকোন মূল্যে বশির ভাইয়ের হাতে যাবে। আমি এটা সুনিশ্চিত করব। মারামারির কোন প্রশ্ন ই ওঠে না।”
–“কি করে আনবি?”
–“সেটা আমার ব্যপার! আগে টেন্ডার কার হাতে যায় সেটা দেখতে হবে।”, মোত্তাকিন পারভেজের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে উঠতে উঠতে বলল।
–“আর আমি? আমি বশির ভাইকে এখন কি জবাব দেব? কি তোর পরিচয়?”, পারভেজ বিভ্রান্তিত কণ্ঠে শুধায়।
–“এই খেলার অন্ত না হওয়া পর্যন্ত আমি তার একনিষ্ঠ ভক্ত —এটা বলে দিস।”
–“এই খেলার অন্ত কি?”
–“মৃত্যু!”, মোত্তাকিন ক্ষীণ স্বরে জবাব দেয়।
–“কার?”
মোত্তাকিন জবাব দেয় না। ঠোঁটের কোনে অনবরত গড়িয়ে পড়া রক্ত কনিকা গুলো বাম হাতে মুছতে মুছতে চলে যায় সেখান থেকে।
তখন মধুমিতা মনোযোগ সহকারে সিরিয়াল দেখছে। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা থেকে সাড়ে সাতটা পর্যন্ত মধুমিতার কিছু সিরিয়াল থাকে আর দশটা থেক এগারোটা পর্যন্ত। ইন্দুবালা নিজের ঘরের বারান্দায় বসে নীরবে নিভৃতে বই পড়ছে। বারান্দার আবছা আলোয় তার অনুভূতি বেশ প্রখরভাবে কাজ করে চরিত্র অনুধাবন করতে।
ইন্দুবালা যখন কোনো কাল্পনিক চরিত্রে ডুবে ছিল কেউ সবিনয়ে তার কোলজুড়ে নিজের আশ্রয় করে নিলো। ইন্দুবালা এক পলক ব্যস্ত দৃষ্টি আবছা আলোয় অতি পরিচিত মুখটি দেখে আবার নিজের বইয়ে মুখ গুঁজলো। এক গলিয়ে দেয় সাজারু কাঁটার ন্যায় চুলের ভাঁজে। আলতো হাত বুলাতে বুলাতে নিজ চরিত্রে ডুবে থাকে। মোত্তাকিন বদ্ধ নেত্রে স্মিত হাসল সেই আলতো আরামদায়ক স্পর্শে। আবছা আলোয় চোখ খুলে দৃষ্টি রাখে অতি কালচে মুখপানে। মিহি স্বরে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে আবদার করে বলে,
–“একটা চুমু খাই?
–“খবরদার বইয়ের একটা থ্রিলিং মোমেন্টে আছি।”, ইন্দুবালা বইয়ে দৃষ্টি রেখেই শানিত কণ্ঠে বলল।
–“তবে এইটুকু পড়ার পর?”
–“হু!”
মোত্তাকিন শান্ত ছেলের মতো মেনে নিলো। হাত বাড়িয়ে আঁকড়ে ধরে সরু কোমড়, মুখ গুঁজে দেয় মেদহীন উদরে। শুয়ে শুয়ে অপেক্ষা করে কখন তার প্রিয় লহমা আসবে। মৃদুমন্দ মিষ্টি উৎপীড়নে ইন্দুবালা বাঁকা চোখ তাক করে অতি শান্ত ছেলেটির পানে। ভ্রু কুঁচকে যায় অতি শান্ত রূপ দেখে। তবুও বই থেকে মনোযোগ সরায় না। সে পড়তে পড়তে বইয়ের কাঙ্খিত মাইলফলক ছুঁয়ে ফেলল। তখন বই রেখে লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে আড়মোড়া ভাঙতে গেলে খোয়াল করে কোলের মাঝে থাকা ছেলেটি বেঘোরে ঘুমাচ্ছে।
সে ঘড়ির পানে তাকায়। সাড়ে এগারোটা বেজে গিয়েছে। অনেক সময় হয়ে গিয়েছে। সে তড়িঘড়ি করে ছেলেটিকে আলতো হাতে কোল থেকে নামিয়ে ছুটলো শাশুড়ির কাছে।
মধুমিতা খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। সে দ্রুত খাবার গরম করে নিজের ঘরে আসে। মোত্তাকিন আড়মোড়া ভেঙে অলসপায়ে বারান্দা থেকে ঘরে ঢুকলো। ইন্দুবালা আঁচলে হাত মুছতে মুছতে ঘরে ঢুকতেই অবাক হয় আলোয় ছেলেটির বিধ্বস্ত মুখ দেখে। শুধায়,
–“কি হয়েছে এমন দেখাচ্ছে কেন? শরীর খারাপ করছে? খেতে আয়।”
মোত্তাকিন অতি শান্ত স্বরে বলল,
–“কিছু হয়নি, খিদে নেই।”
বলেই সে ধপ করে বিছানায় শুয়ে পড়ে। ইন্দুবালা লক্ষ্য করে ছেলেটির বদলে যাওয়া আচরণ। সে এই মুহূর্তে মাথা না ঘামিয়ে ভাত নিয়ে ঘরে আসে। পা গুটিয়ে বসে ছেলেটির পাশে। ভাত মেখে মোত্তাকিনের মুখের সামনে তুলে ধরতেই মোত্তাকিন চোখ মেলে তাকায়। শান্ত দৃষ্টি ফেলে কোনোরূপ বাকবিতন্ডা ছাড়া মুখে তুলে নেয়। ইন্দুবালা ইলিশ মাছের কাঁটা বাছতে বাছতে শুধায়,
–“কি হলো এত চুপচাপ কেন?”
–“তুই চুমু খেতে দিসনি।”, ভীষণ উদাসীন কণ্ঠে বলা কথাটি যে তার প্রশ্নের সঠিক উত্তর না, তা ইন্দুবালা জানে। তাকে বলতে চায় না, সে বুঝে নেয়। আর জিজ্ঞাসা করে না। কথা ঘুরিয়ে শুধায়,
–“ঠোঁট কেটেছে কি করে?”
–“মেরেছে!”
সহজ-সরল স্বীকারোক্তি! ইন্দুবালার হাত থেমে যায়। শান্ত চোখে তাকায় ফোটে থাকা ঠোঁটের পানে। থমথমে মুখে বলে,
–“তোর শরীরে ব্যথা নেই?”
–“ইদানিং ব্যথা গায়ে লাগে না।”, মোত্তাকিনের পুনশ্চঃ উদাসীন কণ্ঠে ইন্দুবালা শুধায়,
–“কেন? ইদানিং ব্যথা গায়ে লাগে না কেন?”
–“তুই চুমু দিয়ে ব্যথা কমিয়ে দিস, তাই।”, বলেই উদাসীন ছেলেটি গা দুলিয়ে হাসতে লাগল। ইন্দুবালা নীরবে এক চাপা নিঃশ্বাস ফেলল। তার কেন মনে হচ্ছে ছেলেটা কথা ঘুরাচ্ছে?
দু’জনের খাওয়া শেষ করে। ইন্দুবালা সব কাজ শেষ করে মোত্তাকিনের ঠোঁটে মলম লাগিয়ে দিয়ে থমথমে মুখে পিঠ এলিয়ে দেয় বিছানায়। কেউ কারোর সাথে কোনরূপ বাক্য বিনিময় করে না। সারাদিনের কর্মব্যস্ততা, ক্লান্তির সমাপ্তি ঘটিয়ে চোখ বুঝতে গেলে পাশে শুয়ে থাকা মানবটি খানিক বিঘ্ন ঘটায়। সে চোখ খুলে তাকায় মাথায় বালিশ চেপে উবু হয়ে শুয়ে থাকা ছেলেটির পানে। কপাল কুঁচকে যায় লাগাতার এপাশ ওপাশ করতে থাকা ছেলেটির মাঝে চাপা অস্থিরতা দেখে। সে এগিয়ে যায়, হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দেয় কাঁধ। মিহি স্বরে শুধায়,
–“কি হলো এমন অস্থির হয়ে আছিস কেন?”
ইন্দুবালা জবাবের প্রেক্ষিতে তাকিয়ে রইলেও সে জবাব পেল না বরং বিলম্বহীন কেউ লেপ্টে গেল তার বুক জুড়ে। মোত্তাকিন বালিশ ছুঁড়ে ফেলে তড়িৎ গতিতে আঁছড়ে পড়ে মেয়েটির বক্ষমাঝে। শক্ত করে জড়িয়ে ধরে দু’হাতে। চাপা আহাজারির সাথে বলে,
–“তুই আমায় কখনো ভুল বুঝবি না, ইন্দু।”
ইন্দুবালা থমকায়। নিজেকে দ্রুত সামলে জড়িয়ে ধরে, অনবরত মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলে,
–“ভুল বুঝব কেন?”
–“কখনো যদি আমার কারণে এমন পরিস্থিতি আসে, তুই আমায় ভুল বুঝবি?”
–“তুই সঠিক হলে কখনো ভুল বুঝব না। তাই আগে বল তুই যা করিস তার মধ্যে কি কোন ভালো লুকিয়ে আছে? থাকলে আমি কখনো তোকে ভুল বুঝব না।”
–“কিছু নিরপরাধ মানুষ বেঁচে যাবে।”
ইন্দুবালার মুখে হাসি ফুটে উঠল। সে গভীরে কিছু ভাবে না। নিশ্চিন্তে বলে,
–“তবে এত চিন্তা কিসের? তুই নিশ্চিন্তে থাক, যতদিন তুই সঠিক পথে থাকবি আমি তোর পাশে থাকব।”
ছোটবেলা থেকে একসাথে বড় হওয়ায় মোত্তাকিন ইন্দুবালার মাঝে আজ ও স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কের আগে বন্ধু সুলভ মারকুটে সম্পর্ক বেশি প্রাধান্য পায়। কিন্তু মারকুটে এই সম্পর্ক ছাপিয়েও দু’জনের মাঝে বোঝাপড়ার এক দারুণ মেলবন্ধন রয়েছে। যেটা একে অপরের ভঙ্গুর মুহুর্তে ভীষণ কাজে আসে। ঠিক যেমন আজ মোত্তাকিনের অস্থিরতা কমিয়ে দিল!
মোত্তাকিন চোখ তুলে তাকায়। ভীষণ ভঙ্গুর দেখতে লাগে সেই মুখটি। ইন্দুবালা আবছা আলোয় ছুঁয়ে দেয় ভঙ্গুর মুখটি। তার ভালোলাগে না সর্বদা হম্বিতম্বি প্রিয় ছেলেটিকে এতোটা ভঙ্গুর দেখতে। সে তৎক্ষণাৎ নিজেদের বন্ধুসুলভ মারকুটে সম্পর্ককে দূরে সরিয়ে দেয়। মুখ নামিয়ে আলতো ছুঁয়ে দেয় রুক্ষ ওষ্ঠদ্বয়! বড্ডো ক্ষীণ স্পর্শে মোত্তাকিন অনুভব করে মেয়েটি কাঁপছে। শত অস্থিরতা মিলিয়ে গিয়ে ওষ্ঠকোনা আলতো বেঁকে যায়। মেয়েটি নিশ্চিত মনে মনে এক বুক সাহস জুগিয়ে এই কাজ করেছে। সে আগলে নেয় কাঁপতে থাকা অবয়বকে বাহুডোরে। সযত্নে ক্ষীণ স্পর্শটি গ্রহণ করে সম্পর্কের জড়তা আর ভয়টুকু নিজ দায়িত্বে মিটিয়ে দিল। তার উপর যে মেয়েটির সর্বোচ্চ অধিকারটুকু নিজ দায়িত্বে বুঝিয়ে দিল।
~চলবে~

