#প্রেম_বর্ণহীন
#তোনিমা_খান
#পর্বঃ১৮
রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, প্রতিযোগিতা ছাপিয়ে মুহিত ইরতেজাই বছরের সবচেয়ে ব্যয়বহুল, বড় টেন্ডারটি পায়। উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র রাজনৈতিক জীবদ্দশায় অজশ্রবারের মতো আরো একবার হেরে যাওয়ায় বদ্ধ উন্মাদে পরিণত হয়েছে। তাদের ঘৃণ্য ভয়ানক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের এর থেকে যথাযথ সঠিক সময় আর হতেই পারে না।
বশির হিংস্র পশুর ন্যায় আবদার করে বলে,
–“ওটাকে না মারা ছাড়া কোন গতি নেই ভাইজান। চলুন মেরে ফেলি। পরিবারের একটাকেও জ্যান্ত রাখব না—রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব বলে চাপিয়ে দেব। টাকা পেলে দুই পয়সার পুলিশ ও কুত্তার মতো পা চাটবে। আজকাল টাকা থাকলে সব পারা যায়।”
কক্ষে অবস্থানরত মোত্তাকিনের চোখের সামনে ভেসে ওঠে মিরসাদের দুই বছরের ছোট্ট ছেলেটির হাস্যকর মুখটি। ভেসে ওঠে, মিরসাদের স্ত্রীর সরল, প্রাণবন্ত মুখটি। যে তাকে দেখলেই দেবরজি বলে ডাক দেয়! বা হাতের আঙুলগুলো ঈষৎ কেঁপে ওঠে। দড় আওয়াজে বলে ওঠে,
–“কাজটা যদি এর থেকেও স্মুথলি হয় তবে এসব ঝামেলায় জড়ানো ঠিক না ভাই।”
–“কিসের স্মুথলি? তোর এই ফাপড় অন্য জায়গায় দিবি। আজ পর্যন্ত কিছু করতে পেরেছিস তুই?”, বশির গর্জে উঠল।
–“আপনাদের টেন্ডার চাই, আমি টেন্ডার এনে দেব।”, বশির আর উত্তরের মেয়র চমকায়। সাগ্রহী কণ্ঠে শুধায়,
–“সত্যি বলছিস?”
–“তার আগে আমার কিছু শর্ত আছে।”
–“তোর আবার কিসের শর্ত মা***? যা বলার তাড়াতাড়ি বল।”
–“আমার টাকা চাই।”
–“যত টাকা লাগে আমি দেব, তুই শুধু টেন্ডারটা আমাদের হাতে এনে দে।”, উত্তরের মেয়র অধৈর্য্য হয়ে বলল।
মোত্তাকিন উঠে দাঁড়ায়। পকেটে হাত ঢুকিয়ে বলে,
–“কাল সকালের মধ্যে টেন্ডার আপনাদের দায়িত্বে থাকবে।”
বশির সরু নেত্রে চেয়ে বলে,
–“তবে কাল সকালে তোর একাউন্টে যতো টাকা চাস, চলে যাবে।”
মোত্তাকিন স্মিত হেসে বেরিয়ে যায় কক্ষ থেকে। বশির কপালে হাত ঘঁষতে ঘঁষতে সোফায় ধপ করে বসে পড়ে। উত্তরের মেয়র উদ্বিগ্ন কণ্ঠে শুধায়,
–“তোর কি মনে হয় ঐ ছোকরা পারবে?”
ভাইয়ের প্রশ্নে বশির বাঁকা হেসে বলল,
–“পারবে, একশবার পারবে। একবার টেন্ডার আমার হাতে আসুক ভাই! মুহিত ইরতেজার পনেরো বছরের নাম এমনভাবে ডুবাবো, যে জনগন ওকে যেখানে পাবে সেখানে মারার জন্য উদ্বত হবে।”
উত্তরের মেয়রের মুখে আশার আলো ফুটে উঠল।
ইন্দুবালা রেগেমেগে বাইকের কাছে এসে দাঁড়ায়। ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলে,
–“ইনসিয়ার বিয়ে আর আমি ওর বড় বোন হয়ে কিছু দেব না?”
মোত্তাকিন কঠিন চোখে তাকায়। কঠোর গলায় বলে,
–“নাহ, ঐ চুন্নির জন্য আমার পয়সায় কিছু কিনতে পারবি না। নিজের কিছু কেনার হলে কেন নয়তো বাইকে ওঠ। এমনিতেই মন মেজাজ ভালো না।”
তখন সন্ধ্যা সাতটা। ইন্দুবালা এসেছে ঘরের জন্য, নিজের জন্য আর ইনসিয়ার জন্য কিছু কেনাকাটা করতে। আগামী সপ্তাহে ইনসিয়ার বিয়ে। শুনেছে পাত্রের পরিবারের বিশাল অবস্থা! মা আর ইনসিয়ার খুশির অন্ত নেই।
ইন্দুবালা রেগে বলল,
–“তোর মন মেজাজ ভালো থাকে কবে? আর তোর টাকা দিয়ে কে কিনছে গর্ধব? আমি নিজের টাকা দিয়ে কিনব।”
মোত্তাকিন দাঁত খিচে বলল,
–“মাইর না খেতে চাইলে বাইকে ওঠ, ইন্দু। টাকা ভাঙার এত শখ থাকলে ঐ পঙ্গু লোকটাকে দুই হাজার টাকা দিয়ে আয় আমি কিছু বলব না। কিন্তু ঐ চুন্নির পেছনে তুই এক টাকাও খরচ করতে পারবি না—না আমার টাকা, আর না নিজের টাকা।”
সম্মুখে ফুটপাতে বসা এক ভিক্ষুককে দেখিয়ে বলল মোত্তাকিন। ইন্দুবালার জীবনসঙ্গী আর পাঁচটা মানুষের থেকে ভীষণ ভিন্ন। ত্যাড়ার সরদার তার স্বামী! সে পেরে ওঠে না। তখন রাগে গজগজ করে বাইকে উঠে বসে। বাড়িতে গিয়ে বাবার হাতে চুপিচুপি দশ হাজার টাকা দিল যেন বিয়েতে খরচ করতে পারে। সিদ্দিকী সাহেব যথেষ্ট পরিমাণে জমিয়ে রেখেছে দুই মেয়ের জন্য। সে নিতে চাইল না কিন্তু ইন্দুবালা জোরপূর্বক দেয়।
মোত্তাকিন সেই রাতের আঁধারে বাইক ছুটিয়ে চলে এক নিষিদ্ধ গন্তব্যে। যেই গন্তব্যে কখনো পা বাড়ানোর কথা কল্পনাও করেনি সে। দীর্ঘ ত্রিশ বছরের জীবনে সজ্ঞানে এই প্রথম মোত্তাকিন বাপের ভিটেতে পা রাখে। তবে গেট পর্যন্তই নিজের গন্তব্য স্থগিত করে।
দারোয়ান পথ রোধ করে দাঁড়ায়। রুক্ষ স্বরে শুধায়,
–“আপনি কে? হুট করে ঢুকে যাচ্ছেন কেন?”
মোত্তাকিন বাইক থামিয়ে বলল,
–“মুহিত ইরতেজাকে বলুন মোত্তাকিন এসেছে।”
–” এমনভাবে বলতাছেন যেন মিনিস্টার আসছে। স্যার বাড়িতে নাই।”, অনাদরে বলল দারোয়ান।
–“বাড়িতে কে আছে?”
–“মিরসাদ বাবায়!”
–“তাকে বলুন মোত্তাকিন এসেছে, সে আমায় চেনে।”
দারোয়ান মিরসাদকে ফোন দেয়। কিয়ৎকাল বাদ ছুটতে ছুটতে এসে মোত্তাকিনের সামনে দাঁড়ায়। বিনম্র কণ্ঠে বলে,
–“দুঃখিত বাবা, আমি আপনারে চিনি নাই। এইখানে নতুন কাজে আসছি।”
মোত্তাকিন কোনরূপ বাক্য বিনিময় করে না এই প্রসঙ্গে সোজা ঢুকে যায়। তিনতলা বিশিষ্ট রাজকীয় ভবনের দিকে এক পলক তাকিয়ে মোত্তাকিন ফোন দেয় মিরসাদকে। মিরসাদ ছেলেকে কোলে করেই বাইরে আসে। নম্র সুরে বলে,
–“ঘরে ঢুকছ না কেন?”
–“আপনার সাথে জরুরী কিছু কথা ছিল।”
–“হ্যাঁ, ভেতরে এসো। বসে কথা বলি।”
–“নাহ, আমি বসতে আসিনি।”
মিরসাদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
–“কি এমন জরুরি কথা, যে এখানে ছুটে এলে?”
–“বশির ভাই, আমার পরিচিত একজন স্বনামধন্য বিল্ডার। আপনার বাবা যেই টেন্ডারটা পেয়েছে সেটা তার দায়িত্বে দিন।”
মিরসাদ বাবার থেকে শুনেছে বশির নামক বিল্ডারের কাজ তেমন ভালো না। আগের কাজটা বাবার মনঃপুত হয়নি। সে নিশ্চয়ই এবার এত বড় টেন্ডার বশিরের দায়িত্বে দেবে না! তবুও সম্মুখের ছেলেটিকে সে ফেরাতে পারে না, মন সায় দেয় না। প্রথমবার যে কোন আবদার নিয়ে তাদের দুয়ারে এসেছে। সে গম্ভীর গলায় বলল,
–“আবদার করছ নাকি আদেশ?”
–“আবদার।”, মোত্তাকিনের সোজাসাপ্টা কথায় মিরসাদের ঠোঁটের কোনে স্মিত হাসি ফুটে উঠল। তবুও গাম্ভীর্যতা ধরে রেখে বলে,
–“তোমার আবদার রাখব কেন?”
মোত্তাকিন কপাল কুঁচকে তাকায়। উগ্র মেজাজ দমিয়ে খানিক নম্র সুরে অনুরোধ করে বলে,
–“সে খুব ভালো কাজ করবে আমি কথা দিচ্ছি। প্লিজ ওনাকে শেষবারের মতো এই দায়িত্বটা দিয়ে দেখুন, নিরাশা হবেন না।”
মিরসাদ মাথা নেড়ে সায় জানায়। বলে,
–“ঠিক আছে, আমি ভেবে দেখব। পাপার সাথে কথা বলব। তুমি যদি চাও পাপাকে আমি জোর ও করব কিন্তু আমার কিছু শর্ত আছে।”
–“কেমন শর্ত?”, মোত্তাকিন আড়চোখে তাকিয়ে শুধায়।
মিরসাদ চার পা এগিয়ে এসে দাঁড়ায় মোত্তাকিনের সামনে। কোলে থাকা ছেলেকে তার কোলে দিয়ে বলল,
–“একে আমার একা লালন পালন করতে অনেক কষ্ট হয়ে যায়। কিছুক্ষণ রাখো আর আদর করে দাও তারপর বলছি।”
মোত্তাকিন চোখমুখ বিকৃত করে তাকায় কোলের ফোলা ফোলা গালের বাচ্চাটির দিকে। যে কি-না ডাগর ডাগর চোখে তাকে পর্যবেক্ষণ করছে। পর্যবেক্ষণ করতে করতেই কিয়ৎকাল বাদ অস্ফুট স্বরে আশ্চর্য জনক এক ডাক দিল।
–“চাচু।”
মোত্তাকিন ভড়কে যায়। মিরসাদ হেসে ফেলল ছেলের কথায়। মোত্তাকিন অবাক হয়ে শুধায়,
–“ও আমায় চেনে?”
–“চেনে, আমি রোজ ছবি দেখাই আর শেখাই চাচু বলে ডাকতে।”
মোত্তাকিন নীরবে শোনে, আলতো হাতে বুকে জড়িয়ে নেয় বাচ্চাটিকে। বাচ্চাটিও লেপ্টে যায় তার বুক জুড়ে। মাথা এলিয়ে দেয় কাঁধে। মোত্তাকিন অনুভব করে এই উগ্র, উশৃঙ্খল, হিংসা পরায়ন অর্থলোভী জীবন ব্যতীত ও একটা স্নিগ্ধ, আরামদায়ক জীবন রয়েছে। পরপরই অতৃপ্ততা আঁছড়ে পড়ে বুক জুড়ে। সেই অতৃপ্ততার তীব্রতায় আবার চোখমুখ গাম্ভীর্যতায় ছেয়ে যায়। গম্ভীর গলায় বলল,
–“আপনি শর্তগুলো এখনো বলেননি। আমার তাড়া আছে!”
পেছনে হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা মিরসাদ ফিরে তাকায় মোত্তাকিনের পানে।
–“শর্তগুলো খুবই সহজ। সপ্তাহে একদিন আমি মায়ানকে নিয়ে শিশুপার্কে যাই, আমাদের সাথে তোমাকেও যেতে হবে। সপ্তাহে দু’দিন রাত বারোটার পর একটা বাইক রাইড দিতে হবে। আমি বাইক চালাতে পারি না। কিন্তু আমার খুব ইচ্ছা হয় জানো, মাঝরাতে ফাঁকা রাস্তায় ধূলো উড়িয়ে বাইক চালাতে। সেক্ষেত্রে তুমি আমার এই ইচ্ছাটা পূরণ করার ক্ষমতা রাখো। আর…”
মিরসাদ মেকি ভাবুক হওয়ার ভান ধরে। কিয়ৎকাল বাদ বলে,
–“আর আগামী এক বছর আমার অফিসে কাজ করতে হবে।”
মোত্তাকিনের চেহারায় ঘোর বিরোধ ভেসে উঠল এই উদ্ভট শর্তাবলী শুনে। সে পাঁচ মাসের বেশি একদিন ও কাজ করবে না। সে তৎক্ষণাৎ ত্যাড়া কণ্ঠে বলল,
–“পারব না, আপনার এসব সিলি শর্ত আমি মানতে পারব না।”
–“তবে টেন্ডার ও পাপা বশিরকে দেবে না। এমনিতেই তার কাজ পাপার পছন্দ হয়নি।”
বলেই মিরসাদ মায়ানকে নিজের কোলে নিয়ে নেয়। সহসা মায়ান চেঁচিয়ে উঠল রাগে। সে যাবে না মোত্তাকিনের কোল থেকে। মিরসাদ ছেলের রাগান্বিত লালচে মুখ দেখে ধমকে বলল,
–“চাচার মতো রাগি হয়েছে, পিটিয়ে পশ্চাৎদেশ লাল করে দেব। তোমার চাচা তো বড় হয়ে গিয়েছে বেশি, তাই দিতে পারি না। কিন্তু তোমায় ঠিকই দেব! বাপের সাথে তেজ দেখাও কত বড় সাহস!”
মোত্তাকিনের কপাল কুঁচকে গেল বাচ্চাটির সাথে এহেন আচরণে। সে ছিনিয়ে নিলো মায়ানকে। ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলে,
–“এইটুকু বাচ্চাকে মারার কথা বলেন কোন মুখে? ওর গায়ে জায়গা আছে যে মারবেন?”
বলেই মোত্তাকিন মায়ানকে বুকে লুকিয়ে নিলো। মিরসাদ তব্দা খেয়ে গেল। চোখমুখ কুঁচকে বলল,
–“বাহ্, দল ভারী হয়ে গিয়েছে দেখছি। কিন্তু আমিও কম না। বেশি বাড় বাড়লে চাচা ভাতিজা দুটোর ই পশ্চাৎদেশ লাল করে দেব।”
মিরসাদ ছেলেকে রেখেই ঘরে চলে গেল। মোত্তাকিন দ্বিধাদ্বন্দ্বে সেখানেই ভাতিজাকে নিয়ে বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইল। মায়ান গাল ভরে হাসে চাচার গাল ধরে। সারাদিন চার দেয়ালের মধ্যে থাকায় সে নতুন মানুষ দেখলেই এমন লেপ্টে থাকে, যেতে চায় না। মোত্তাকিন দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে দ্রুত বাচ্চাটির গালে দু’টো চুমু দিয়ে নিলো। পকেট থেকে পাঁচশ টাকা বের করে মায়ানের প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে দিল। এই প্রথমবার কোলে নিয়েছে যে! অতঃপর সে ফের ফোন দেয় মিরসাদকে।
–“বাইরে আসুন, বাবুকে নিয়ে যান। আমি আপনার শর্তে রাজি।”
অপরপ্রান্ত থেকে ভেসে আসে মিরসাদের গুরুগম্ভীর কণ্ঠ।
–“তোমার ভাতিজা তুমি দিয়ে যাও। আমি আর বের হতে পারব না।”
বলেই সে ফোন কেটে দেয়। মোত্তাকিন দাঁতে দাঁত চেপে নিরুপায় ঘরে ঢোকে। মিরসাদ চাপা হাসি দমিয়ে স্ত্রীকে ইশারা করে। অনু ছুটে আসে রান্নাঘর থেকে হাত ভরতি খাবারের ট্রে নিয়ে। মিরসাদ অনু, মায়ান এক প্রকার চেপে ধরে তাকে আটকে রাখে। মোত্তাকিন কিছু মুখে না দিয়ে বের হতে পারল না।
ভাইকে কিছু খাওয়াতে পেরে মিরসাদ প্রশান্তির এক নিঃশ্বাস ফেলল। দু’জনে নিজেদের কথায় সম্মতি দিয়ে মোত্তাকিন সেখান থেকে বিদায় নেয়। মিরসাদ তাকে এগিয়ে দিতে আসে গেট পর্যন্ত। একবারো পিছু ফিরে নম্র দৃষ্টি না ফেলা ছেলেটিকে পিছু ডাকল মিরসাদ।
–“মোত্তাকিন?”
মোত্তাকিন নির্বাক ফিরে তাকায়। মিরসাদ নম্র কণ্ঠে বলল,
–“আমি কিন্তু বশিরের উপর বিশ্বাস রেখে পাপার সাথে কথা বলব না, তোমার উপর বিশ্বাস রেখে বলব। আশাকরি তুমি আমায় নিরাশা করবে না। এটা সবচেয়ে ব্যয়বহুল সরকারি একটা টেন্ডার। এদিক সেদিক হলে পাপাকে রাজনৈতিক হুমকির মুখে পড়তে হবে।”
মোত্তাকিনের ব্যস্ততা মিলিয়ে যায়, দেহের উদ্দামতা হারিয়ে যায়। উদাসীন দৃষ্টি ফেলে আলতো মাথা নাড়লো, কিন্তু কোন জবাব দেয় না। দ্রুতগামী বাইক ছুটিয়ে চলে যায় দৃষ্টি সীমার বাইরে যেন পালানোর খুব তাড়া! মিরসাদ ভাইয়ের সঙ্গ পাওয়ার এক বুক আনন্দ নিয়ে ঘরে ফিরে যায়।
এরপর…..? এরপর কেটে যায় পাঁচটি মাস। মুহিত ইরতেজা ছেলের কথা অমান্য করার কথা চিন্তাও করেনি। চোখ বন্ধ করে টেন্ডারটা বশিরের দায়িত্বে দিয়ে দেয়।
পরিস্থিতি তখন বদলেছে আশ্চর্যজনক সুখের আলতো ছোঁয়ার সাথে। ইন্দুবালার অভিশপ্ত জীবনে অচিরেই আশীর্বাদ হয়ে আগমন ঘটা ঔদ্ধত্য, উগ্র, গুন্ডা ছেলেটি কেমন নীরবতার সাথে বদলে যেতে থাকে। ইন্দুবালা ছেলেটির আকাঙ্ক্ষিত রূপ পেয়ে যাওয়ার আনন্দে দিন দুনিয়া ভুলে গেল, মত্ত হয় সুখে ভরপুর সংসারে। যেখানে একটু একটু করে পূর্ণতা, প্রাপ্তি, সফলতা, স্বচ্ছলতার আনাগোনা বাড়ছে। বাড়ছে ইন্দুবালার চাওয়ারাও। যেই মেয়েটি কখনো কল্পনাতেও কারোর ভালোবাসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা রাখতে ভয় পেত সে এখন মুখিয়ে থাকে কারোর ভালোবাসার জন্য। একটা মানুষ! শুধুমাত্র নিজের জীবনে একটা মানুষের শক্তপোক্ত অবস্থানের জন্য ইন্দুবালার জগতটা আজ কটুক্তি মুক্ত। সে ধরণীর বুকে ছুটে বেড়ায় এক মুক্ত পাখির ন্যায়। যেখানে মানুষের ঘৃণ্য কটুক্তি গুলো তার ডানা কাটার সাহস পায় না।
তখন রাত নয়টা। স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বিচারকের আসনে বসা টিচারদের সাথে ইন্দুবালা অন্যতম একজন। ব্যক্তিগত জীবনে ইন্দুবালা একজন নরম সত্ত্বার হলেও, পেশাগত জীবনে একজন কঠোর শিক্ষিকা। ছাত্র, ছাত্রীরা তার জ্ঞানের প্রখরতা, ব্যবহারের কঠোরতায় সর্বদা মাথা নুইয়ে এড়িয়ে চলে। রঙ বেরঙের আলো আর কাপড়ে সজ্জিত স্টেজের সম্মুখে বসা ইন্দুবালা অন্তঃস্থলের অধৈর্য্যতা, অস্থিরতা, অসুস্থতা অচিরেই লুকিয়ে নিচ্ছে গাম্ভীর্যতার আড়ালে। পেট খিদেয় গুড়গুড় করছে। আরো আধা ঘন্টা অনুষ্ঠান চলবে। তার বাড়ি যেতে এখনো প্রায় দেড় ঘন্টার মতো লেগে যাবে। এদিকে শরীর ভেঙে আসছে, মাথা ঘুরাচ্ছে। সে চেয়ারের হাতলে হাত রেখে তাতে মাথা ঠেকিয়ে সম্মুখের অনুষ্ঠান দেখতে লাগল, মাঝেমধ্যে কলিগদের সাথে আলোচনা করছে কোন পার্ফর্ম্যান্স অধিক সুন্দর হয়েছে। ঝিমুনি দিয়ে দেখতে দেখতেই আচমকা ইন্দুবালার অলসতায় খানিক বিঘ্ন ঘটলো হঠাৎ পরিবেশ অন্ধকার হয়ে যাওয়ায়। এক প্রতিযোগীর পার্ফর্ম্যান্স শেষ হলে আরেক প্রতিযোগী ওঠার কালে হঠাৎ করেই স্টেজ সহ সব লাইট নিভে গেল। টিচার সহ কর্মচারীবৃন্দ আওয়াজ তুললো ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের উদ্দেশ্যে। কিন্তু তার আগেই একে একে আলো জ্বলে উঠল। ইন্দুবালা স্টেজের দিকে তাকাতেই কপাল কুঁচকে গেল স্টেজ ভরতি স্টুডেন্ট দেখে। তার কুঁচকানো মুখে বিস্ময় ছুঁয়ে গেল যখন সকল স্টুডেন্ট একসাথে হাস্যোজ্জ্বল মুখে সমস্বরে সুরে সুর মিলিয়ে বলল,
–“হ্যাপি বার্থডে টু ইউ;
হ্যাপি বার্থডে টু ইউ;
হ্যাপি বার্থডে টু ইন্দুবালা ম্যাম।”
ইন্দুবালা চমকালো। আড়ষ্টতা ভেঙে সে মৃদু নড়চড়ে উঠল সকল বাচ্চাদের মাঝে হাঁটু গেড়ে বসা মোত্তাকিন মাথা তুলে তাকাতেই। উপস্থিত, অভিভাবক, টিচাররা উৎসুক জনতার ন্যায় তাকিয়ে অবলোকন করছে সবটা। মোত্তাকিন হাঁটু গেড়ে বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। বাচ্চাদের মধ্য থেকে অলস পায়ে সামনে রাখা মাইকের স্ট্যান্ডের কাছে হেঁটে আসে। স্মিত হেসে মাইকের স্ট্যান্ড ধরে আলতো মাথা নুইয়ে জ্বর, ঠান্ডার প্রকোপে ভাঙা গলা নিয়েই মিহি স্বরে বলল,
–“হ্যাপি বার্থডে, ইন্দুবালা ম্যাম। বাচ্চাদের মতো আজ আমিও অভিযোগ করছি, ঘরে-বাইরে সারাদিন এত ধমকাধমকি করবেন না। মাঝেমধ্যে একটু হেসে নরম সুরেও কথা বলবেন, আমরা ভীষণ খুশি হবো।”
উপস্থিত সকলে হো হো করে হেসে উঠল। ইন্দুবালার বিস্ময় ভাঙে চারপাশ থেকে ঠিকরে আসা উচ্চস্বরের হাসির শব্দে। লজ্জায় কালচে মুখটা কেমন গরম হয়ে উঠল। সে অস্থির দৃষ্টি ফেলে এদিক ওদিক। বয়স্ক হেডটিচার ইন্দুবালার লজ্জা, সংকোচ বুঝতে পেরে অভয় দিয়ে বলল,
–“ইন্দুবালা, আমিই পারমিশন দিয়েছি তোমার হাজব্যান্ডকে। ইতস্ততা করো না, যাও স্টেজে যাও। তোমার হাজব্যান্ড এত অনুরোধ করল আমিও হাতছাড়া করতে চাইনি, উপভোগ করতে চেয়েছিলাম এমন সুন্দর কিছু মুহুর্ত।”
হেড টিচারের কথায় ইন্দুবালা থমকানো বদনে স্টেজের দিকে তাকায়। মাঠ ভরতি অতিথি, টিচার, স্টুডেন্টরা সবাই উৎসুক নয়নে দেখছিল বর্ণহীন এক ভালোবাসার কিছু সুন্দর মুহুর্ত। সকলের মুখে স্মিত হাসি! কপালে ভালোবাসা থাকলে কালো, ফর্সা বলে কোন ভেদাভেদ থাকে না। থাকে শুধু দু’টো মনের গুরুত্ব, দু’টো সত্ত্বার গুরুত্ব। ভালোবাসা তো এমনি জাতি, ধর্ম, বর্ণ ভেদের উর্ধ্বে হওয়া উচিত।
তৃতীয় শ্রেণীর এক কর্মচারী স্টেজে একটা টেবিল রাখে তার উপর রাখে বিশালাকৃতির একটা কেক। তবে পুরো মাঠ ভরতি মানুষের কাছে কেক পৌঁছাতে না পারলেও মোত্তাকিন মিষ্টি পৌঁছে দিল। মাইক হাতে মোত্তাকিন ভীষণ লজ্জিত কণ্ঠে বলল,
–“এতবড় কেক এনেও আমি সবার কাছে কেক পৌছাতে ব্যর্থ হবো বোধহয়। কেকটা আমি আমার ইন্দুবালা ম্যামের এই দুষ্টুমিষ্টি স্টুডেন্টদের হাতে পৌঁছে দিতে পারলে অন্তত স্বার্থক হবো। বাকি সবাই মিষ্টি মুখ করুন সৃষ্টিকর্তা এইদিনে আমার ঘরের চাঁদকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছিল দেখেই আজ আমার পৃথিবী এতটা আলোকিত। আমাদের জন্য দোয়া করবেন!”
সকলে চিৎকার করে শুভেচ্ছা জানালো। সকলের মধ্যে ইন্দুবালার থেকেও দ্বিগুণ আনন্দ ছিল এত সুন্দর দৃশ্যের সাক্ষী হতে পেরে। ইন্দুবালা ভেঙে আসা শরীর নিয়ে টলমলে ধীর কদমে এগিয়ে যায়। মোত্তাকিন প্যান্টের এক পকেটে হাত ঢুকিয়ে অলস দেহে দাঁড়িয়ে। তার ও শরীর ভালো না, দুদিন যাবৎ ভীষণ জ্বর, ঠান্ডা লেগেছে। ইন্দুবালা আসতেই সে পকেট থেকে ছোট ছুড়িটা বের করে এগিয়ে দেয়। ইন্দুবালা টলটলে নেত্রে ছুড়িটা হাতে নেয়, বাচ্চারা ঘিরে ধরেছে। জীবনে কারোর থেকে আশাতীত মূল্য পাওয়া মেয়েটি উপচে পড়া নোনাজল আঁটকে কেক কাটতে হাত বাড়ায় কিন্তু সঙ্গ দেয়ার জন্য সঙ্গীর হাত সাথে না থাকায় সে মাথা তুলে তাকায়। ইশারায় বলে হাতে হাত রাখতে। মোত্তাকিন জ্বর গ্রস্থ জড়ানো নেত্রে তাকিয়ে স্মিত হেসে হাতে হাত রাখে। তারা একসাথে কেক কাটে আর বাচ্চাদের খাইয়ে দেয়। সর্বশেষে মোত্তাকিন ছোট্ট একটু টুকরো ইন্দুবালার মুখে তুলে দেয়। সহসা ইন্দুবালার চোখের কার্নিশ বেয়ে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। ধরে আসা গলায় ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“মূল্যহীন মানুষটাকে এতটুকু মূল্য দেয়ার জন্য ধন্যবাদ, গুন্ডা পড়শী!”
জ্বরগ্রস্থ মোত্তাকিন গা দুলিয়ে হেসে উঠল সেই সম্বোধনে। স্টেজ ছেড়ে নামতে নামতে বলে,
–“একদিন দেখব, তোর বাচ্চাকাচ্চাও এসে আমায় গুন্ডা বাপ বলে ডাকছে। সেদিন তোকে থাপড়ে দাঁত ফেলে দেব, বেয়াদব মেয়ে।”
আজ আর রাগলো না ইন্দুবালা বরং সেও হেসে উঠল। ইন্দুবালার ভীষণ ক্লান্তিভরা দিনটা এভাবেই অবর্ণনীয় সুখের সাথে শেষ হয়। শারীরিক দূর্বলতাও মিলিয়ে যায় সেই সুখের কাছে। সব কাজ শেষে মোত্তাকিন তখন বাইকে বসে অপেক্ষা করছিল মেয়েটির জন্য। ইন্দুবালা দায়িত্ব শেষে এগিয়ে আসে বাইকের কাছে। পিঠে আলতো স্পর্শে একটি মাথা ঠেকতেই মোত্তাকিন বাইক স্টার্ট দেয়। শুধায়,
–“কি হলো শরীর খারাপ লাগছে? কিছু খাবি?”
ইন্দুবালা আরামের খোঁজে দু’হাতে আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরে পৃষ্ঠদেশ। বদ্ধ নেত্রে বলে,
–“নাহ, বাড়ি চল; ক্লান্ত লাগছে।”
মোত্তাকিন বাইক ছুটিয়ে চলে। রাতের শীতল সমীরণের ঝাপটায় আর প্রিয় মানুষের চমৎকার উপস্থিতিতে অচিরেই ইন্দুবালার ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। সতেজ ফুলের মতো সৌন্দর্য ছড়ায়। ছেলেটির কাঁধে থুতনি রেখে শুধায়,
–“তুই জানতি আজ আমার জন্মদিন?”
–“না জানার কি আছে?”, মোত্তাকিনের নিরুদ্বেগ কণ্ঠ। অথচ ইন্দুবালার মন মস্তিষ্কে উড়ে চলেছে হাজারো রঙ বেরঙের প্রজাপতি। সে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে শুনতে চায় ছেলেটির থেকে স্ত্রী জুড়ে তার সকল ভাবনা।
–“এতকিছু করলি কখন?”
–“কিছুই তো করিনি। যা করার তোর হেড টিচার করেছে। সে অনুমতি না দিলে করতে পারতাম ন।”
–“টাকা পেলি কোথায়?”
–“চুরি করে এনেছি।”
ত্যাড়া জবাবে ইন্দুবালা ছেলেটির পেটে সরব এক চিমটি কাটল। মোত্তাকিন চেঁচিয়ে উঠল,
–“বেয়াদব, ফেলে দেব কিন্তু!”
–“তোর বাপের ও সাধ্য নেই।”, ইন্দুবালার দৃঢ় কণ্ঠ। সে ফের হাসিমুখে মাথা এলিয়ে দেয় পিঠ জুড়ে। মোত্তাকিন ঘাড় বাঁকিয়ে বলে,
–“জন্মদিনের ট্রিট দিবি না?”
–“কি চাস?”
–“যা দিবি!”
–“আচ্ছা দেব।”
কথোপকথনের সাথেই তারা বাড়ি পৌঁছে গেল। ঘরে ঢুকতে আরেকদফা হাসি ফুটে উঠল ইন্দুবালার মুখে। মধুমিতা একা একা ঘরে বসে এলাহী খাবারের আয়োজন করেছে। ইন্দুবালা টলটলে নেত্রে হাস্যোজ্জ্বল মুখে বলে,
–“তোমরা মা ছেলে শুরু করেছ কি? আজ আমায় বারবার কাঁদাচ্ছ কেন? আমার এগুলো খেতে ইচ্ছে করছিল অনেক, মধু। ধন্যবাদ!”
ইন্দুবালা জড়িয়ে ধরে শাশুড়িকে। মধুমিতার চক্ষু শীতল হয় বিয়ের এত মাসেও ইন্দুবালার মুখে হাসি দেখে। তাকে একটু সুখে দেখে। তার ছেলে যেমনি হোক না কেন অন্তত এই দুঃখি মেয়েটিকে কষ্ট দেয়নি। সে মেয়েটির পিঠে হাত বুলিয়ে বলল,
–“কাপড় বদলে খেতে আয়।”
–“গোসল করতে হবে, মধু। গা ঘামে ভিজে আছে।”
–“তবে আমি দুই লোকমা খাইয়ে দেই, খিদে পেয়েছে না?”
মধুমিতা দ্রুত এক প্লেটে একটু খাবার নিয়ে ইন্দুবালার মুখে তুলে দিল। ইন্দুবালা সাগ্রহে মুখে তুলে নেয় গরুর মাংস আর পোলাও ভাত। কিন্তু মিনিট এক যেতেই তার পেট উগড়ে সব বেরিয়ে আসে। ইন্দুবালা গলগল করে বমি করে দিতেই মধুমিতার মুখ বিবর্ণ হয়ে গেল। মোত্তাকিন সেই আওয়াজে ত্রস্ত পায়ে বের হয় ঘর থেকে।
–“কি হলো বমি করছে কে?”
–“ইন্দু, ভাত মুখে দেয়ার সাথে সাথেই বমি করে দিয়েছে।”, মধুমিতার আশ্চর্য কণ্ঠ। মোত্তাকিনের মুখশ্রীতে চিন্তা ছুঁয়ে যায় ইন্দুবালার নেতিয়ে পড়া দেহ দেখে। এগিয়ে গিয়ে জড়িয়ে নেয় বাহুডোরে। গাল চাপড়ে বলে,
–“তোর শরীর খারাপ ছিল আগে থেকেই। তোকে যে তখন জিজ্ঞাসা করলাম তুই বলবি না?”
–“এখন ছাড় এসব, ওকে ঘরে নে তাড়াতাড়ি।”
ইন্দুবালা নিজেকে সামলায়। দূর্বল কণ্ঠে বলে,
–“এগুলো খাবো না মধু। আমি একটু গোসল করে আসি তাহলে ভালো লাগবে।”
–“যা যা।”
ইন্দুবালা ঘরে এসে কোনরকম বাথরুমে ঢুকলো। লম্বা গোসল শেষে ভেজা কাপড় চোপড় নিয়ে বারান্দায় গেলে সে তৃতীয়বারের মতো চমকালো। তার পা থেমে যায় পুরো বারান্দার রেলিং এর উপর গোল করে সাজিয়ে রাখা ফুলের টব দেখে। ঠিক যেন তাদের ঘরের মতো একটা ফুলে ফুলে সজ্জিত বারান্দা। তার ফুল ভীষণ পছন্দের, কিন্তু এই বাড়িতে আজ পর্যন্ত কোনো ফুল ছিল না।
–“ফুলের রাজ্যে আরেক ফুলের স্বাগতম।”
মোত্তাকিনের ধিমি কণ্ঠে ইন্দুবালা ফিরে তাকায়। নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকে সর্বদা অনুভূতি লুকানো উদাসীন মুখপানে। এখনো উদাসীন, চঞ্চল দৃষ্টি তার। চুইঙ্গাম চিবুচ্ছে আর এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। যেন চোখে চোখ মেলালেই সে এক চোর ধরে ফেলবে। সে আজ বড্ডো সাহস করে একটা প্রশ্ন করে।
–“ভালোবাসিস?”
আগে ইন্দুবালা কাউকে এই প্রশ্নটি করার অযোগ্য ভাবত নিজেকে। কিন্তু আজ মনে হয় কেউ তাকে ভালোবাসার যোগ্য মনে করে।
মোত্তাকিনের চঞ্চল দৃষ্টি খানিক স্থির হলো। ঘাড় কাত করে তাকায় আবছা আলোয় দাঁড়ানো নারী অবয়বের দিকে। ধিমি কণ্ঠে বলে,
–“নিন্দুক পড়শীর বিয়ে ঠিক হয়ে যাওয়ায় আমি অজানা অস্থিরতায় ভুগছিলাম। আমি মানতেই পারছিলাম না। তখন তার ডায়রিটা আমায় সাহস জোগায়, প্রশ্রয় দেয়!”
মোত্তাকিন থামে। শ্বাস ফেলে আবার বলতে শুরু করে,
–“ডায়রির বাষট্টি পৃষ্ঠার পর তেষট্টি পৃষ্ঠা মিসিং ছিল। আমি হন্য হয়ে খুঁজছিলাম পরের পৃষ্ঠা কিন্তু কোথাও খুঁজে পাচ্ছিলাম না। পৃষ্ঠাটি ছেড়ার ও কোন অবশিষ্ট অংশ বা দাগ ছিল না। হঠাৎ করে খেয়াল হলো এক পৃষ্ঠার সাথেই দু’টো পৃষ্ঠা আঠা দিয়ে জোড়া লাগানো। সারারাত বসে সেই আঠা দিয়ে জোড়া লাগানো পৃষ্ঠাদুটো আলাদা করলাম। ভেসে উঠল কারোর লুকানো ভালোবাসার কিছু পংক্তি মালা। আমায় কেউ আড়ালে ভালোবেসে গিয়েছে, কিন্তু গায়ের রঙের হীনমন্যতার কারণে কখনো বলার সাহস করেনি। তখন মনে হয়েছিল জীবনে চলার পথে এমন একটু ভালোবাসার ভীষণ প্রয়োজন, ব্যস!”
মোত্তাকিন নীরবতায় আচ্ছন্ন হয়। ইন্দুবালা আজ লাজলজ্জা ভুলে নীরবতা ভঙ্গ করে। ফের শুধায়,
–“এটা আমার প্রশ্নের উত্তর ছিল না।”
বারান্দার দরজায় হেলান দিয়ে বুকে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে থাকা মোত্তাকিন স্মিত হাসলো। মিহি স্বরে বলে,
–“আমার বাড়ির পাশে একটা বেয়াদব নিন্দুক পড়শী ছিল। যে কথায় কথায় মামনির কাছে আমার নামে কানপড়া দিত। ভীষণ মেজাজ খারাপ হতো। তার পেছনে লাগতে, জ্বালাতে, কষ্ট দিতে ভালো লাগত। কিন্তু একটা সময় দেখলাম তার কষ্টে আমার অনুতাপ অনুভব হয়। একটাসময় অনুভব হলো নিন্দুক পড়শীর উপস্থিতি আমায় ভীষণ প্রশান্তি দেয়। তখন আমি আমার জীবনের সবচেয়ে বিপর্যস্ত পর্যায়ে ঢুকে পড়েছি। আমি জানতাম এই পরিস্থিতি থেকে আমার সহজে মুক্তি নেই। অথচ আমার পড়শী ছিল দারুণ নম্র সভ্য এক মেয়ে। একটা ভালো জীবনসঙ্গী ডিজার্ভ করে। আমাকে সারাদিন গুন্ডা, মাওয়ালী বলে দূরছাই করত। আমি তার ভাগ্যে কাল হয়ে আসতে চাইনি। সবসময় নিজের মধ্যে লুকানো চাওয়াকে দমিয়ে রেখেছি। এরপর একদিন অপরপক্ষের প্রশ্রয় পেলাম। সেদিন আর কোন বাঁধা মানিনি। কে কত ভালো খারাপ জীবনসঙ্গী ডিজার্ভ করে, তা না ভেবে তাকে নিজের করে নেই।”
ইন্দুবালার গাল বেয়ে নীরবে টপ টপ করে ঝরছে কিছু নোনাজল। নাক টেনে বলে,
–“ভালোবাসিস?”
–“তোর মতো বেয়াদবকে ভালোবাসব ঠ্যাকা পড়েছে?”, শান্ত স্বরে বলেই মোত্তাকিন চলে যায় সেখান থেকে। এক প্রকার ছুটে বেরিয়ে যায় কক্ষ থেকে।
আর বারান্দায় আবছা আলোয় স্থবির দাঁড়িয়ে থাকা ইন্দুবালা একটাসময় ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। অনুভব করে জীবন স্বপ্নের থেকেও সুন্দর!
তার কান্নারা গতি হারায় মোত্তাকিনের চিৎকারে।
–”এই বেয়াদব! এদিকে শোন।”
ইন্দুবালা চোখ মুছে রেলিং ধরে মাথা নুইয়ে তাকায়। গেটের বাইরে বাইকে বসা ছেলেটিকে দেখে শুধায়,
–“কি?”
–“কিসের ওষুধ আনব? বমির?”
ইন্দুবালা না বোধক মাথা নেড়ে বলল,
–“কিছু লাগবে না।”
–“চুপচাপ বল কি ওষুধ আনব। তোর শরীর ভালো না।”
–“বললাম না অসুস্থতা ঠিক হয়ে যাবে! কোন ওষুধ লাগবে না।”
–“আরেকবার আমার সামনে বমি করিস, তখন থাপড়ে তোর দাঁত ফেলে দেব।”
–“আসিস থাপ্পড় দিতে।”, ইন্দুবালা মুখ ঝামটা মেরে বলল।
মোত্তাকিন চলে যায়। ইন্দুবালা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। মা পারেনি এত বছরে ছেলেকে ফেরাতে, সে দুইদিনের বউ কি করে পারবে? সেও পারেনি ছেলেটিকে ফেরাতে। তবে আগের থেকে উগ্রতা বেশ কমেছে।
সে কাপড় মেলে ধীরপায়ে ঘরে ঢোকে। বাথরুম থেকে কাঙ্খিত জিনিসটা এনে চোখের সামনে ধরতেই চোখমুখ ঠিকরে স্নেহের হাসি ফুটে উঠল প্রেগনেন্সি কিটে লাল দু’টো দাগ দেখে। বিড়বিড় করে বলে,
–“কাল তুমি আর আমি বাবাকে ট্রিট দেব। মা আর দাদু মনি তো ব্যর্থ হয়েছি পাপাকে সঠিক পথে আনতে। তুমি সফল হবে কিন্তু! মা তোমার অপেক্ষায় আছি। সুস্থ সবল মায়ের কোলে আসবে, কেমন?”
~চলবে~

