প্রেম_বর্ণহীন #তোনিমা_খান #পর্বঃ১৯

0
2

#প্রেম_বর্ণহীন
#তোনিমা_খান
#পর্বঃ১৯

নয়া অনুভূতির উৎপীড়নে রাতভর ঘুম আসল না ইন্দুবালার। মোত্তাকিনের অপেক্ষা করতে করতে সে বহুক্ষণ হাঁটল ঘরময়। হাঁটতে হাঁটতে এসে আরশির সামনে দাঁড়ায়। মুখে হাসি ফুটে উঠল নিজেকে দেখে। এখন আর এই বিদঘুটে সৌন্দর্য দেখতে তার ঘৃণা লাগে না। হীনমন্যতা অনুভব হয় না। বরং চোখমুখ জুড়ে থাকে কারোর ভালোবাসার স্নিগ্ধ এক অংশের আগমনী উজ্জ্বলতা। প্রকম্পিত হাতটি গিয়ে ঠেকলো উদরের মধ্যভাগে। আলতো ছুঁয়ে বিড়বিড় করে,
–“মা তোমায় চেয়েছি আর তুমি এসে পড়েছ? তুমি মায়ের বাধ্যগত বাচ্চা?”

নিজের প্রশ্নে নিজেই খিলখিলিয়ে হেসে উঠল ইন্দুবালা। নিজেকে ইদানিং অবুঝ লাগে এই অদ্ভুত সুন্দর অনুভুতিগুলোর কাছে! কখনো কি ভেবেছিল আর পাঁচটা মেয়ের মতো তার ও ঘর হবে, বর হবে, সন্তান হবে— যেই ঘরে তার কোন এক কক্ষে মুখ লুকিয়ে থাকতে হবে না। বর —যে তাকে সম্মান দেবে, ভালোবাসবে দৈহিক সৌন্দর্য দেখে নয় বরং মন দেখে? সন্তান হবে যার চোখে তার মায়ের গায়ের রঙ নিয়ে কোন দ্বন্দ্ব থাকবে না। খুব আপন মানুষের মতো মুগ্ধ চোখে মায়ের দিকে তাকাবে! নিজের অবুঝ ভাবনায় নিজেকে বোকা বলে ইন্দুবালা।

ডাক্তারের পরামর্শেই সে কনসিভ করার সিদ্ধান্ত নেয়। ডাক্তার জানায় তার বয়স ত্রিশ পার হয়ে গিয়েছে এখন বাচ্চা নেয়াটা জরুরি। নয়তো দেরি হলে শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। সেও দ্বিমত করেনি, যদি সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে মোত্তাকিন একটু সঠিক পথে আসে।
তবে তার অভিপ্রায় পূরণ হবে কি? না-কি পূরণ হওয়ার আগেই স্মৃতির পাতায় সবটা যন্ত্রণা হয়ে লিপিবদ্ধ হয়ে যাবে?

মোত্তাকিনের জন্য অপেক্ষা করতে করতে অর্ধরাত কেটে গেল, কিন্তু মোত্তাকিন আসে না। সময় কাটাতে সে সুন্দর একটা শাড়ি পড়েছে, একটু সেজেছে, কানে একটা সাদা ফুল গুঁজেছে কিন্তু দেখার মানুষটার আর খোঁজ নেই। সে অপেক্ষা করতে করতে একটাসময় ঘুমিয়ে পড়ল।

মিরসাদ ভাইয়ের বাইকের পেছন থেকে প্রফুল্ল হেসে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল,
–“আজ তো বাইক থেকে নামতে ইচ্ছে করছে না, ইচ্ছে করছে আরো কয় কিলোমিটার ঘুরে আসি। কিন্তু তোমার শরীর মনে হয় ভালো না, বাসায় যাও।”

মোত্তাকিন নাক টানছে। চোখ মুখ খানিক লাল। দুই ভাই গিয়েছিল বহুদূরে এক টং এর দোকানে চা খেতে। চা খেয়েছে, আড্ডা দিয়েছে তারপর ফাঁকা রাস্তায় গন্তব্যহীন বাইক চালিয়েছে। শর্ত সাপেক্ষে বিগত এক সপ্তাহ যাবৎ মোত্তাকিন মিরসাদকে বাইকে করে ঘোরাতে পারেনি তাই আজ বেরিয়েছে। তবে এটা মোটেই শর্তের বেড়াজালে নয়, বরং এই মানুষটার সাথে সময় কাটাতে, দূর্বার গতিতে বাইক চালাতে, আড্ডা দিতে, দূর দূরান্তে গিয়ে চা খেতে তার ও সুপ্ত ভালোলাগা কাজ করে। তাই তো ঠান্ডা, জ্বর একটু কমতেই আজ ছুটে এসেছে।
–“আম্মা আর তোমার বউ কেমন আছে?”

মোত্তাকিন বাইক স্টার্ট দিতে দিতে থমথমে মুখে বলল,
–“ভালো আছে!”

–“এখন বলোতো বিয়েটা কি পছন্দের ছিল নাকি অন্যকিছু? অমি অনেক কিছু শুনেছি কিন্তু!”, মিরসাদ সতর্ক কণ্ঠে শুধায়। কানাঘুষা অনেক শুনেছে ছেলেটা নাকি দয়া দেখিয়ে প্রতিবেশী কালো কুচকুচে এক মেয়েকে বিয়ে করেছে। কিন্তু তার মন মানে না এহেন কথা। মোত্তাকিন নিরুদ্বেগ দৃঢ় গলায় বলল,
–“ছোটবেলার পছন্দ ছিল!”

মিরসাদের মুখে হাসি ফুটে উঠল। পিঠ চাপড়ে বলল,
–“শুনে খুশি হয়েছি। সুখী হও দু’জনে। কাল দেখা হবে অফিসে তাড়াতাড়ি এসো।”

মোত্তাকিন জবাব দেয় না মুখটা অচিরেই কেমন ম্লান হয়ে যায়। সে নিরুত্তর বাইক ছুটিয়ে চলে বাড়ির পথে। ঘরে ঢুকে নিঃশব্দে হেলমেট রেখে তাকায় ঘুমন্ত মেয়েটির দিকে। আপাদমস্তক সুসজ্জিত নারী অবয়বে চোখ বুলালে ঠোঁটের কোনা বেঁকে যায়। ইদানিং মেয়েটাকে একটু বেশি সুন্দর লাগছে! আজ আবার সেজেছে, নিশ্চিত তার মাথা নষ্ট করার প্রয়াস এটি। সে নিঃশব্দে কাপড় বদলে নেয়। অতঃপর ক্লান্তিভরা দেহ টেনে বিছানায় ধপ করে শুয়ে পড়ে। হাত বাড়িয়ে ঘুমন্ত মেয়েটির উদর পেঁচিয়ে এক ঝটকায় বুকের নিচে আসে। উষ্ণতার খোঁজে মুখ গুঁজে দেয় গলদেশে। গভীর ঘুমে থাকা ইন্দুবালা অনুভব করে কারোর হঠকারিতা। নিজের উপর ভার অনুভব হতেই সে হকচকিয়ে চোখ মেলে তাকায়। অতি দ্রুত নিজের উপর থেকে ভারী‌ দেহটা সরিয়ে দিতে দিতে বলল,
–“সর সর আমার উপর ভার দিবি না।”

মোত্তাকিন ভ্রু কুঁচকে বলল,
–“রোজ তো এমনি ঘুমাই।”

–“আর ঘুমাবি না।”, ইন্দুবালা দূরে সরে কাত ফিরে ঘুমায়। মোত্তাকিন কণ্ঠে বিরোধ এনে বলল,
–“পারব না, কাছে আয়।”

পুনরায় টেনে বাহুডোরে আবদ্ধ করে নিতেই ইন্দুবালা কঠোর গলায় বলল,
–“ভার দেওয়া ছাড়া সবভাবে ঘুমাতে পারবি।”

ক্লান্ত মোত্তাকিন মেনে নিলো।
–“আচ্ছা। কিন্তু কেন? আমি কি মোটা হয়ে গিয়েছি?”

–“নাহ, তোকে আগের থেকেও বেশি গাঁজাখোর দেখতে লাগছে। এত রাত অবধি ছিলি কোথায়?”

–“চা খেতে গিয়েছিলাম দূরে।”

–“কেন, তোর ঘরে চা পাতা নেই?”

মোত্তাকিন হাত বাড়িয়ে মেয়েটির মাথায় দিল এক চাটি। তেজি কণ্ঠে বলল,
–“টং এর দোকানের সারাদিনের জ্বাল করা পানি দিয়ে কড়া লিকারের চা খেয়ে দেখেছিস?”

–“নাহ, কখনো তো খাওয়াসনি।”

–“উমম! সেটাও তো ঠিক। তবে চল আগামীকাল তুই আর আমি গভীর রাতে চা খেতে যাই।”, মোত্তাকিনের উৎসুক কণ্ঠ। ইন্দুবালা বিরোধ করে বলল,
–“আজকের পর থেকে আমি আর‌ তোর সাথে কখনো বাইকে উঠব না।”

–“কেন কেন?”, মোত্তাকিন সরব মাথা তুলে তাকায় আবছা আলোয় মেয়েটির মুখপানে। ইন্দুবালা বদ্ধ নেত্রেই বলল,
–“তুই আস্তে বাইক চালাতে পারিস না, উড়াধুরা বাইক চালাস তাই।”

–“তাতে কি হয়েছে? আগে তো বলতি হাইস্পিড তোর ভালোলাগে?”

–“সেটা আগের কথা, এখনকার কথা ভিন্ন। এখন আমি একা নই।”, বিড়বিড় করে বলা কথাটি মোত্তাকিন শোনে। অবুঝ কণ্ঠে বলে,
–“কেন এখন তোর সাথে কে আছে? জিন ভুত? এই এটা কি সত্যি? তোর সাথে এইসব কিছু আছে? তবে আমি এখুনি আয়াতুল কুরসি পড়ব!”

মাঝরাতে এমন আবোলতাবোল কথায় ইন্দুবালা খেপে গেল। রেগে ধাক্কা মেরে দূরে সরিয়ে দিল মোত্তাকিনকে। তেজি কণ্ঠে বলে,
–“একে তো মাঝরাতে ঘরে এসেছে তাও আবার সিগারেট খেয়ে, আবার এসে আবোলতাবোল কথা বলছে। ঘুমাতে দে, শরীর ভালো লাগছে না।”

–“আহ্! চেতিস কেন? আয় আয় কাছে আয়, মজা করছিলাম।”

মোত্তাকিন ফের চার হাত পায়ে জড়িয়ে নিল ইন্দুবালাকে। স্বল্প রাতটুকু কেমন চোখের পলকে কেটে গেল। উঠতে বেশ দেরি হয়ে যায় তার ইন্দুবালার। তবে সকাল হতেই ইন্দুবালা অনুভব করল দেহে রাজ্যের অলসতা, ক্লান্তি দূর্বলতা। বিছানা ছেড়ে নামলেই মাথাটা ঘুরছে! গতকালকের সারাদিনের ক্লান্তি আজ ও রয়ে গিয়েছে। সে ঘরময় নিজেকে একাই পেল! ধীর কদমে ঘর থেকে বেরিয়ে মধুমিতার‌ খোঁজে রান্নাঘরে গিয়ে ঢুকল। আজ তার স্কুল নেই, গতকালের অনুষ্ঠানের কারণে একদিন ছুটি। সে অলস দেহ টেনে মধুমিতাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে। কাঁধে মাথা এলিয়ে দিয়ে অলস কণ্ঠে বলল,
–“মধু, স্যরি উঠতে দেরি হয়ে গিয়েছে। আজ শরীর এত দূর্বল লাগছে, ইচ্ছা করছে সারাদিন ঘুমাই।”

মধুমিতা রান্না করতে করতে ব্যস্ত দৃষ্টি ফেলে বলল,
–“তো ঘুমা! আজ তো স্কুল বন্ধ। যা গিয়ে সারাদিন ঘুমা। আমার রান্না প্রায় শেষ; আমি গোসলটা করেই স্কুলে চলে যাব।”

–“রান্না করতে গেলে কেন? আমি বাসায় আছি আমি করতাম!”

–“কাল থেকে অমন অসুস্থ, আমি তোর উপর সব রান্না রেখে যাব? আমায় কি তোর জালিম মা পেয়েছিস?”

ইন্দুবালা স্মিত হাসল। শুধায়,
–“তোমার ছেলে কোথায়?”

–“ছেলের বউ-ই জানে না ছেলে কোথায়, মা কি করে জানবে?”

ইন্দুবালার মুখশ্রী মলিন হয়। মধুমিতা আশা করেছিল তার সান্নিধ্যে এসে অন্তত মোত্তাকিনের মাঝে একটু পরিবর্তন আসবে কিন্তু না। ইন্দুবালা বেশ খানিকক্ষণ যাবৎ সেভাবেই মধুমিতার সাথে লেগে বসে, সাহস জোগায় তাকে সুসংবাদটি দেয়ার জন্য। একটাসময় সাহস করে ডেকে উঠল,
–“মধু?”

–“কি হয়েছে শরীর বেশি খারাপ লাগছে? ডাক্তারের কাছে যাবি এখন? তবে আজ ছুটি নেই।”, মধুমিতার চিন্তিত কণ্ঠ। ইন্দুবালা না বোধক মাথা নেড়ে মিনমিনে স্বরে বলল,
–“তোমায় আরেকটু বিরক্ত করার জন্য ছোট্ট একটা পুঁচকে আসছে, মধু।”

মধুমিতা থমকালো! চমকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় আনত মুখপানে। বিস্ময় নিয়ে শুধায়,
–“তুই সত্যি বলছিস?”

ইন্দুবালা সেখানে দাঁড়াতে পারে না আর। দ্রুত মুখ লুকিয়ে রান্নাঘর থেকে বের হতে হতে বলে,
–“মিথ্যা কেন বলব?”

বলেই সে এক ছুটে ঘরে ঢুকে গেল। মধুমিতা চেঁচিয়ে উঠল,
–“এই তুই পালাচ্ছিস কোথায়? আমায় আগে বলবি না? কি খুশির কথা, ডাক্তারের কাছে চল। চেকাপ করিয়ে আনি। ও আল্লাহ! এমন খুশির কথা এভাবে কেউ বলে?”

মধুমিতা খুনতি হাতে ছুটে বের হয়। আঁটকে রাখা দরজা চাপড়ে বলে,
–“বের হ, ইন্দু।”

–“ফ্রেশ হয়ে আসছি, মধু।”

–“আমি কি ছুটি নেব? নাকি বিকালে ডাক্তারের কাছে যাবি?”

–“এত চিন্তার কিছু নেই, বিকালে যাব। তুমি এখন স্কুলে যাও।”

মধুমিতার আড়ম্বরহীন দেহে আনন্দের উচ্ছ্বাস নেমে আসে। চোখ টলটল করে ওঠে, অবশেষে তার ও আর পাঁচটা মানুষের মতো একটা সুস্থ স্বাভাবিক ভরা সংসার হবে। একা একা লড়তে লড়তে ভেবেছিল, কোন একদিন এমনি দুঃসহ জীবনের অন্ত ঘটবে কোনপ্রকার সুখ ব্যতীত। অথচ এখন সুখের কমতি নেই। তারা শাশুড়ি পুত্রবধূ মিলে এই ঘরটাকে সাজিয়েছে, এখন ইন্দুবালা তার সংসারটাও সাজিয়ে দিচ্ছে ছোট ছোট কদম দ্বারা।

ইন্দুবালা ফ্রেশ হয়ে বের হতেই মধুমিতা ভাতের প্লেট হাতে ঘরে ঢুকলো। উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল,
–“গতকাল এর জন্যই অসুস্থ ছিলি আমি বুঝতে পারিনি। দেখলি আমি সত্যি সত্যি বুড়ো হয়ে গিয়েছি। কিছু মাথায় থাকে না। আয় আয় লেবু চটকে ভাত মেখে এনেছি খেলে ভালো লাগবে।”

মা মারা যাওয়ার পর থেকে কেউ ইন্দুবালাকে কখনো আদর করে একটু খাইয়ে দেয়নি। কিন্তু বিয়ের পর মধুমিতা বহুবার খাইয়ে দিয়েছে। সে সবসময় আদরটুকু লুফে নেয়। আজ ও আদরটুকু লুফে নিল সাগ্রহে। সে বিছানায় পা গুটিয়ে বসে হা করে। মধুমিতা খাওয়াতে খাওয়াতে কতশত উল্লাস প্রকাশ করে। কথার মাঝেই তার চোখ যায় বিছানার পাশের মিনি কাবার্ডের উপর রাখা একটি ফাইলের দিকে। তার দৃষ্টি আকর্ষণ করে ফাইলের উপরে থাকা মুহিত ইরতেজা নামটি। উল্লাস মিলিয়ে যায়। কৌতুহলী গলায় শুধায়,
–“ইন্দু, এই ফাইল কিসের?”

ইন্দুবালা ফাইলটি এক পলক অনাগ্রহে দেখে বলল,
–“তোমার ছেলের, অফিসের কোন কাজের হয়তো। আমি জানিনা।”

–“ওখানে মুহিত ইরতেজা লেখা কেন, ইন্দু? খোল তো!”

মধুমিতার সরব বদলে যাওয়া কণ্ঠে ইন্দুবালা সচকিত হয়। মুহিত ইরতেজা? সে খপ করে ফাইলটি নিতে যাওয়ার আগেই মধুমিতা ফাইলটি হাতে তুলে নেয়। ইন্দুবালা দাঁত কামড়ে চুপটি করে বসে রইল। মধুমিতা যদি জানে মোত্তাকিন ওর ভাইয়ের কোম্পানিতে চাকরি করে তবে অনেক কষ্ট পাবে। তবে ফাইলটি খুলতে ইন্দুবালা আর মধুমিতা দু’জন ই অবুঝ হয়ে পড়ল। মধুমিতা ফাইলটা খুলে প্রচুর আগ্রহে পড়তে শুরু করল। ফাইলটিতে কোন চুক্তি নির্দেশ করছে। যেখানে বিশাল অংকের কোন সরকারি টেন্ডার সাবমিশনের কথা লেখা আছে। সে বুঝতে পারল না বিধায় ইন্দুবালাকে দিল।
–“এটা পড়ে দেখত কি বলছে? কিসের টেন্ডারের কথা বলছে? আর এটা মোত্তাকিনের কাছে কি করছে?”

ইন্দুবালা ফাইলটি পুরোটা পড়ে বুঝল এখানে কোন টেন্ডার কোন বিল্ডারের হাতে সাবমিট করা হয়েছে।
সে বলল,
–“মধু, এটা একটা চুক্তির ফাইল। যেখনে বলা হয়েছে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৮-লেন সড়কের প্রকল্প বশির আহমেদ নামক এক বিল্ডারের এর কাছে সাবমিট করা হয়েছে।”

–“এই বশির কি ঐ লোকটা যার পাছে পাছে মোত্তাকিন ঘোরে? এখানে তো অনেক বড় অংকের টাকার হিসাব লেখা। কিন্তু এগুলো মোত্তাকিনের কাছে আসবে কেন?”, মধুমিতার চিন্তিত কণ্ঠ। মোত্তাকিনের কি কোনরকম সংযোগ আছে মুহিত ইরতেজার সাথে? কিন্তু এখানে টেন্ডার আসবে কেন? তার মুখশ্রী চিন্তায় বিবর্ণ হয়ে গেল। ইন্দুবালা মধুমিতার চিন্তিত মুখ দেখে বিষয়টিকে তুচ্ছ ঘটনা হিসেবে তুলে ধরে বলল,
–“সামান্য বিষয় নিয়ে এত চিন্তা করছ কেন, মধু? এটা হয়তো ঐ লোকটার ফাইল যেটা মোত্তাকিনের কাছে রাখতে দিয়েছে। এটা দুদিন আগেই মোত্তাকিন ঘরে এনেছে, হয়তো আবার দিয়ে আসবে। এখানে দেখো এটা পাঁচ মাস আগের কোন চুক্তি! এত চিন্তা করো না এর সাথে মোত্তাকিনের কোন সংযোগ নেই।”

–“না থাকলেই ভালো!”, মধুমিতার নিভন্ত স্বর। তবে তার মাথা থেকে চিন্তা যায় না।
মধুমিতা তাকে খাইয়ে নিজেও খেয়ে নিলো। অতঃপর তৈরি হয়ে বের হতে হতে প্রফুল্ল চিত্তে বলল,
–“আমি তাড়াতাড়ি চলে আসব, এসে ডাক্তারের কাছে যাব। আসার পথে রেস্তোরাঁয় খাবো আর শপিং করে আসব। তোর কি কি লাগবে আর খেতে ইচ্ছে করে আজ সব কিনে অনবো।”
ইন্দুবালা স্মিত হেসে তার আনন্দ দেখে বলল,
–“আমার সব আছে মধু। তুমি সাবধানে যাও, আর সাবধানে ফিরে আসো।”

মধুমিতা খুশিতে আটখানা হয়ে স্কুলে ছুটলো। প্রিয়জন হিসেবে কয়জন কলিগকে জনালো সুখবরটি। হেড টিচারের থেকে একটু আগে ছুটি নিয়ে দ্রুত বাসায় আসার পরিকল্পনা করে। মাত্র দু’টো ক্লাস করিয়ে সে বারোটা নাগাদ স্কুল থেকে বেরিয়ে আসে। অবর্ণনীয় আনন্দে খেই হারিয়ে মধুমিতা রিকশায় বসে কতশত পরিকল্পনা করল। যেই মেয়েটার নিজে মায়ের সুখ পায়নি তাকে মা হওয়ার সম্পূর্ণ সুখ অনুভব করার জন্য যা যা করা লাগবে সে তা করবে। কিন্ত সর্বদা পরিস্থিতি আমাদের হাতের নাগালে থাকে না। তেমনি মধুমিতার সকল উচ্ছ্বাস আর্তনাদে পরিণত হয় রিকশাটি মোড় ঘুরতে গিয়ে দ্রুতগামী একটা প্রাইভেট কারের সাথে ধাক্কা খেতেই।

লাগাতার বমি আর মাথা ঘোরা আর দূর্বলতায় ইন্দুবালার শরীর হঠাৎ করেই খারাপ করে আনে। সে শুয়ে ছিল বিছানায় এমতাবস্থায় অচেনা কারোর ফোন আসে। ফোনটি রিসিভ করতেই সে বাকরুদ্ধ হয়ে যায় মধুমিতার এক্সিডেন্ট এর কথা শুনে। নিজের অসুস্থতাকে উপেক্ষা করে কোনমতে একটা শাড়ি পড়ে ছুটে বের হয়।

হাসপাতালের ঢুকেই ইন্দুবালা হন্য হয়ে খুঁজল ফোনদাতাকে। খুঁজে পেতেই তার দেহ ম্লান হয়ে আসে বিছানায় শায়িত নিস্তেজ দেহের চঞ্চল রমণীটিকে দেখে। হালকা রঙের শাড়ির এখানে ওখানে রক্তের ছিটেফোঁটা দেখে ইন্দুবালা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। মুখের এক পাশ রক্তে ভিজে আছে। ডাক্তাররা তখন তাদের কাজ করছে, সে ছুটে গিয়ে আঁকড়ে ধরে হাত। আর্তনাদের সুরে বলে,
–“মধু? এই মধু, কোথায় ব্যথা পেয়েছ? এই মধু কথা বলো। খুব কষ্ট হচ্ছে তোমার? এভাবে আমায় একা রেখে শুয়ে আছো কেন? ওঠো!”

ইন্দুবালা হাউমাউ করে কাঁদছে। কয়েকজন পথচারী মধুমিতাকে হাসপাতালে এনেছে। ডাক্তার ইন্দুবালাকে শান্ত করে বলল,
–“মারাত্মক কোন আঘাত পায়নি, চিন্তা করবেন না। ফুটপাতের উপর রাখা বালির উপর পড়েছিল তাই মারাত্মক আঘাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। কিন্তু বয়স হয়েছে তো, শরীর নাজুক। ছোট আঘাত একটুতেই শরীর কাবু করে নেয়। তবে আমরা ধারণা করছি তার বা হাতে একটু সমস্যা হবে। আপনি আপাতত বাইরে গিয়ে অপেক্ষা করুন, তার‌ দ্রুত চিকিৎসার প্রয়োজন।”

ইন্দুবালা ঘন ঘন মাতা নেড়ে বাইরে চলে আসে। কিন্তু আঁখিদ্বয় থামে না, অবিরত অশ্রু প্রকাশ করে মানুষটি ব্যতীত সে কতটা দূর্বল। বাবার পরে এই একটামাত্র মানুষ আছে যে মা, অভিভাবক তার একমাত্র সুখ দুঃখের ভাগীদার। তার কিছু হলে যে সে আরেকবার মা হারা হয়ে যাবে।
কাঁদতে কাঁদতে চোখের সামনে হঠাৎ করেই ধোঁয়াশা হয়ে আসে। ধপ করে বসে পড়ে স্টিলের বেঞ্চিতে। লম্বা লম্বা শ্বাস ফেলে ইন্দুবালা নিজেকে সামলায়। কম্পিত হাতে ফোনটা তুলে নেয়, আসার সময় তাড়াহুড়া করে বাবাকেও বলে আসতে পারেনি সে বাবাকে ফোন দিয়ে দ্রুত আসতে বলল।
তন্মধ্যেই একজন নার্স এসে জানালো প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস আনতে হবে ফার্মেসি থেকে আর রিসিপশনে টাকা জমা দিতে হবে। সে দূর্বল দেহ টেনে টাকা জমা করে ফার্মেসির উদ্দেশ্যে পা বাড়ায়। ঠোঁট ভেঙে কান্না আসে লাগাতার মোত্তাকিনকে ফোন দিলেও তাকে ফোনে না পেয়ে।

কাঠ পোড়ানো গরমে সে ফার্মেসি থেকে ডাক্তারের বলা ওষুধপথ্য আনলো।
নার্সের হাতে দিয়ে কোনমতে কেবিনের সামনে মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়ায় সে। হাসপাতালের বাতাসেও যেন বিষণ্ণতার গন্ধ। রোগী শয্যাশায়ী, নিঃশ্বাসে কষ্ট; আর তার সঙ্গে আসা মানুষটিও যেন নিজের ব্যথা লুকিয়ে সবল থাকার চেষ্টা করছে। ঘেমে নেয়ে একাকার দেহ, শরীর ভেঙে আসছে ইন্দুবালার দেহ। পুনশ্চঃ চোখের সামনে ধোঁয়াশা হয়ে আসল। তবে এবার আর নিজেকে সামলাতে পারে না সে। দেহ ভার ছেড়ে দেয়। সদ্য হাসপাতালের ঐ কড়িডোরে ঢোকা মুহিত ইরতেজা হতবিহ্বল ছুটে গিয়ে ধরে ফেলল বলহীন পড়ে যাওয়া দেহটিকে। গাল চাপড়ে ডাকলো,
–“ইন্দুবালা? আম্মা, কি হয়েছে ওঠো?”

মিরসাদ আর অনু রিসিপশন থেকে কেবিন নাম্বার জেনে দ্রুতকদমে এদিকেই আসছিল। মুহিত ইরতেজা কারোর ভরসায় বসতে পারেনি নিজেই খুঁজতে ছিল মধুমিতাকে। মিরসাদ আজ প্রথম দেখল ছোট ভাইয়ের স্ত্রীকে। তাও এমন বিধ্বস্ত অবস্থায়! মেয়েটির চোখ মুখের বেহাল দশা দেখে অনু ব্যস্ত কণ্ঠে বলল,
–“মিরসাদ ডাক্তার ডাকো। ওকে দেখে তো সুস্থ মনে হচ্ছে না।”

মিরসাদ বাবার থেকে ইন্দুবালাকে নিয়ে একটা স্ট্রেচারে রাখলো একজন নার্সের সাহায্যে। ঘন্টা খানেকের মধ্যে পরিস্থিতি বিদঘুটে মোড় নেয়। মুহিত ইরতেজার দেহ ম্লান হয়ে আসে রক্তের ছিটেফোঁটা মাখা স্ত্রীর নিস্তেজ দেহ দেখে। মিরসাদ আর অনু আছে ইন্দুবালার কাছে। কিয়ৎকাল বাদ অনু ছুটতে ছুটতে আসে শশুরের কাছে। মুহিত ইরতেজা টলটলে নেত্র লুকিয়ে নেয়। বিমর্ষ কণ্ঠে শুধায়,
–“ইন্দুবালার কি অবস্থা অনু? ও কি দূর্বল হয়ে পড়েছিল? হঠাৎ করেই বোধহয় এই ঘটনা নিতে পারেনি, ওর যে মধুমিতাই সব। দু’জন সখী জানো?”

মুহিত ইরতেজার কণ্ঠে বিলাপের করুন সুর! অনু ম্লান মুখে বলল,
–“পাপা, ডাক্তার কি বলেছে শোনেনি? দু’জন ই সুস্থ হয়ে যাবে তাড়াতাড়ি। আর সবচেয়ে বড় সুখবরটি কি শুনবেন?”

মুহিত ইরতেজা চোখ তুলে তাকায়।
–“সুখবর?”

–“হ্যাঁ, আপনি আবার দাদা হচ্ছেন!”, অনু স্মিত হেসে বলল। মুহিত ইরতেজার মুখে আলতো হাসি ফুটে উঠল। পরপরই বিষন্ন কণ্ঠে বলল,
–“এতকিছু হয়ে যাচ্ছে অথচ তোমার দেবরের কোন খোঁজ খবর নেই এখন পর্যন্ত! এই অবস্থায় ঐ মেয়েটার উপর কতটা চাপ গিয়েছে ভাবো তো?”

–“আপনার বড় ছেলে ফোন দিয়েছিল তার ফোন লাগছে না, পাপা।”, অনুর চিন্তিত কণ্ঠ।

মুহিত ইরতেজার এবার চিন্তা হয়। সে নিজের ম্যানেজারকে ফোন দেয় যেকোন মূল্যে মোত্তাকিনকে খুঁজে হাসপাতালে নিয়ে আসার আদেশ দেয়।

ঘন্টার চার পেরিয়ে গেল। অপেক্ষা অস্থিরতার পর তখন বিদঘুটে পরিস্থিতি একটু নিয়ন্ত্রণে আসে। ইন্দুবালার জ্ঞান ফেরে এক ঘন্টার মাঝেই। পাঁচ সপ্তাহের গর্ভবতী সে। হঠাৎ অতিরিক্ত চিন্তা আর প্রেশার নিতে পারেনি। এমনিতেও তার শরীর দূর্বল। অনু সর্বাবস্থায় তার খেয়াল রাখছে। ইন্দুবালা নতুন মানুষগুলো দেখে জড়তায় নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু অনু নিজের প্রাণবন্ত আচরণে তাকে আপন করে নেয়। মিরসাদ মৃদু হেসে তার মাথায় হাত রেখে বলল,
–“আমরা তোমার বড় ভাই বোনের মতো, তোমার বর আর শাশুড়ির মতো আমাদের দূরে ঠেলে দিওনা।”

ইন্দুবালা দূরে ঠেলে দেয়ার কথা ভাবনায় কখনো আনতেই পারে না। সে তো সবাইকে নিয়ে একসাথে বাঁচতে চায়।
মধুমিতার জ্ঞান ফেরে সন্ধ্যা নাগাদ। সিদ্দিকী সাহেব, তহমিনা ও তখন উপস্থিত। সিদ্দিকী সাহেবের চোখেমুখে প্রশান্তির ছোঁয়া নানা হওয়ার সুসংবাদে।
মধুমিতার বাম হাতের কব্জি ভেঙেছে আর মাথায় হালকা একটু আঘাত লেগেছে যার কারণে রক্তক্ষরণ হয়। তবে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা আর নেই। ডাক্তার পুরোপুরি চিকিৎসা সেবা দিয়েই রিলিজ নেয়ার পারমিশন দিয়েছে।

চোখ খুলতেই সর্বপ্রথম মধুমিতা ইন্দুবালার খোঁজ করে। অনু আর মিরসাদ এগিয়ে আসে তার কাছে। মধুমিতা তাদের দেখে দূর্বল কণ্ঠে বলল,
–“আমার ইন্দু কোথায়? ও কি এখানে আছে? ওকে ডাক্তার দেখাতে হবে, ও অসুস্থ !”

অনু ম্লান হেসে বলল,
–“ইন্দুবালা ঠিক আছে, আম্মা। আর আপনার নাতি নাতনিও ঠিক আছে। ডাক্তার তাকে একটা স্যালাইন দিয়েছে। আর এক ঘন্টা লাগবে স্যালাইনটা শেষ হতেই তারপরেই আমরা বাসায় ফিরতে পারব।”

মধুমিতা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ব্যথাতুর নিঃশ্বাস ফেলল। শরীর ব্যথায় অসাড়! হাসপাতালের এই ঝঞ্ঝাটময় কোলাহল আর ওষুধের গন্ধে গা গুলিয়ে আসছে। মিরসাদ তার মাথায় হাত রাখে। নরম সুরে শুধায়,
–“খারাপ লাগছে আম্মা? ডাক্তার ডাকবো?”

মধুমিতা নাকোচ করল। চিন্তিত কণ্ঠে শুধায়,
–“মোত্তাকিন এসেছে?”

মিরসাদ হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে না বোধক মাথা নাড়লো। দরজার ওপাশে দাঁড়ানো মুহিত ইরতেজা ছেলেকে ইশারা করলেন। ঢুকবে কি না এই দ্বন্দ্ব তার মনে। যদি মধুমিতা রেগে যায়! মিরসাদ তাকে চোখে আশ্বাস দেয় আর অনুকে ইশারা করে বের হতে। তারা বের হতেই মুহিত ইরতেজা ধীর কদমে ঢুকে মধুমিতার পাশে টুলে বসে। স্বভাবসুলভ মিহি স্বরে ডেকে ওঠে,
–“মধু? বেশি শরীর খারাপ করছে?”

মধুর বদ্ধ নেত্র কেঁপে ওঠে, চোখের কার্নিশ ভরে ওঠে। সেভাবেই দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
–“সবসময় আমার পিছু পিছু ঘুরবেন না। আপনার জন্য আমার ছেলে মেয়ের জীবনে সমস্যা তৈরি হয়।”

মুহিত ইরতেজা ম্লান হাসলেন। বড্ডো সাহস করে বহু বছর আগে ছুটে যাওয়া হাতটিকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে। লহু স্বরে বলে,
–“পরিবার ছেড়ে কোথায় যাবো, মধু? অনেক তো শাস্তি দিলে, চলোনা এবার একসাথে সমস্যা গুলোর সমাধান করি? নিজের অবস্থা দেখেছো? তোমায় এমনভাবে দেখার জন্য আমি কখনো প্রস্তুত না, মধু। আমি পাপ করেছি কিন্তু ভালোও তো বেসেছি। তুমি শুধু পাপটুকু দেখলে এর পেছনে লুকিয়ে থাকা কারণটুকু নয়।”

–“পাপ—পাপই হয়। এর পেছনে কোন কারণ যৌক্তিক হতে পারে না। আপনার কারণে দুইটা মেয়ের স্বপ্ন,সংসার ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছে। একজন তো মরে গিয়ে বেঁচে গিয়েছে আর আমি আজও তরপাচ্ছি একটা সুন্দর জীবনের অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষায়। আমার আপনার মুখ দেখলেও ঘৃণা হয় বিশ্বাস করুন, আমার হাত ছাড়ুন আর তালাক দিন।”

মুহিত ইরতেজার নেত্রদ্বয় টলটল করছে। আজ একটা দুটো বছর নয় যে সে এই ঘৃণা সহ্য করে আসছে। আর কত? সে অনুযোগ ভরা কণ্ঠে বলল,
–“শায়লার ব্লাড ক্যান্সার ছিল মধু। আমি তাকে বিদেশে নিয়ে সর্বোচ্চ চিকিৎসা সেবা দিয়েছি। ডাক্তার জানায় সে তিন বছরের বেশি বাঁচবে না। কোন কমতি রাখিনি বরং ঐ বছরগুলোতে আমি গ্রামেও কম ছিলাম তুমি জানো। মাসে একবার তোমার কাছে যেতাম। এখানে তোমার কোন দোষ নেই আর না আমার আছে! আমি তো আর মৃতপ্রায় একটা মানুষকে ধরে রাখতে পারব না! তবুও আমি তোমার কাছে পাপী, আমি মেনে নিচ্ছি। এর শাস্তি ও তো পেয়েছি। বিগত সাতাশ বছর যাবৎ নিজের স্ত্রী সন্তান থেকে দূরে থেকেছি। অধিকার থাকতেও আমি কখনো তোমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাইনি, আশা রেখেছি একদিন তুমি আমায় ক্ষমা করে দেবে। কিন্তু তুমি কঠোর! খু”নী ও তো জীবনে একটা সুযোগ পায়, আমায় একটা সুযোগ দাও না, মধু। কি করলে ক্ষমা করবে? আমি কি তোমার পায়ে পড়ব? নাকি আমি ম”রলেই তুমি শান্তি পাবে। যদি এটাই তোমার সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে তবে তুমি নিজের মুখে বলো আমি নিজেই নিজের জান নিয়ে নেব। কিন্তু এত ঘৃণা নিয়ে বাঁচা যায় না মধু।”

মুহিত ইরতেজা নীরব আকুতি। মধুমিতার চোখ বেয়ে অঝোরে অশ্রু গড়ায়। কঠোর গলায় বলে,
–“এখান থেকে সরুন, আমার খারাপ লাগছে। আমি বাড়ি যাব। ইন্দু কোথায়? ইন্দু….ইন্দু…কোথায় তুই?

মধুমিতা চেঁচিয়ে ডাকতে লাগল। মিরসাদ আর অনু তড়িৎ কেবিনে ঢোকে। মুহিত ইরতেজা অনুভূতি শূন্য স্ত্রীর পানে তাকিয়ে রইল। মাথা কাজ করে না কি করলে মধু একটু তার সাথে সুন্দর ব্যবহার করবে!
ইন্দুবালার স্যালাইন শেষ হয়ে যেতেই সে ছুটে আসে মধুমিতার কাছে। মধুমিতা জেদ ধরে তৎক্ষণাৎ বাড়ি যাওয়ার জন্য। মুহিত ইরতেজা প্রকাশ্যে খুব কম মধুমিতার কাছে আসে। মিরসাদ বাবাকে বোঝালো সে দেখে নেবে তাদের সুবিধা অসুবিধা। এখন যেন পুরোনো ক্ষত তাজা না করে। মুহিত ইরতেজা মানতে না চাইলেও তাকে মানতে হয়। সে মোত্তাকিনের খোঁজে বের হয়। চিন্তার ভাঁজ কপালে ছেলেটা গেল কোথায়? মিরসাদ আর অনু তাদের বাড়িতে নিয়ে আসে। তখন রাত এগারোটা বেজে যায়। মধুমিতা ঘরে এসে তাদের পানে চেয়ে বলল,
–“তোমরা অনেক কষ্ট করেছ এখন বাড়ি ফিরে যাও।”

মিরসাদ অনুর দিকে তাকায়, কোলে তার ছেলে। অনু তাকানোর মানে বুঝে শাশুড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,
–“অমি আজ একদিন এখানে থাকতে চাইলে আমায় বের করে দেবেন আম্মা?”

মধুমিতা হতবাক হয়ে যায়। ব্যস্ত কণ্ঠে বলল,
–“এ কেমন কথা! বের করে দেব কেন?”

–“তবে আমি আর আপনার নাতি আজ এখানে থাকি? ইন্দুবালার শরীর ভালো না, আপনার শরীর ও ভালো না।”, অনু অনুরোধ করে বলল। মধুমিতা নাকোচ করার কোন উপায় খুঁজে পায় না, ইন্দুবালা যেমন তার কাছে ভালোবাসার তেমনি অনুও তার কাছে ভালোবাসার একটি অংশ। সে সায় জানায়। মিরসাদ বুক ভরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্ত্রী সন্তানকে রেখে বাড়ি যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়।
পুরোটা দিন কতকিছু গেল স্ত্রী আর মায়ের উপর থেকে—অথচ মোত্তাকিন? না বলে বেরিয়ে গিয়েছে সকালে একটাবার ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করেনি তাদের কি অবস্থা? অভিমান, অস্থিরতায় ঝিমিয়ে বসে থাকা ইন্দুবালা মিরসাদের পিছু পিছু বের হয়। আনত সুরে ডেকে ওঠে,
–“ভাইয়া?”

মিরসাদ ফিরে তাকায়। মৃদু হেসে বলে,
–“কিছু বলবে? শরীর খারাপ করছে? কিছু লাগবে?”

ইন্দুবালা না বোধক মাথা নাড়লো। উদগ্রীব হয়ে বলল,
–“ভাইয়া, মোত্তাকিনের কোন খোঁজ কি আপনার কাছে আছে? ও সকালে না বলে বের হয়ে গিয়েছে এখন পর্যন্ত ওর কোন খোঁজ নেই। ও এমন কখনো করে না, অন্তত একবার ঘরে আসে।”

মিরসাদের মাথায় ও এই একই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। সে আশ্বাস দিয়ে বলল,
–“আমি ওর খোঁজেই যাচ্ছি, চিন্তা করো না। ওর খোঁজ নিয়েই ফিরব!”

ইন্দুবালা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে মাথা নাড়লো। মিরসাদ বেরিয়ে যায়। অনু তাদের দু’জনের খেয়াল রাখল যথাসাধ্য। রান্না আগে থেকেই করা ছিল। মধুমিতাকে খাইয়ে শুইয়ে দেয় ইন্দুবালা আর অনু। ইন্দুবালা তখন অনুর কোল থেকে মায়ানকে নিজের কোলে নেয়। মৃদু হেসে শুধায়,
–“ভাবি, একে কি খাওয়াবেন? ওর খাবার তো নেই আমাদের ঘরে।”

–“ওকে আবার ঘটা করে কি খাওয়াব! আমরা যাই খাই তাই খাবে! সব খেতে পারে। ঝাল, টক যা দেবে গপগপ করে খেয়ে নেবে।”, অনুর চটপটে কণ্ঠে ইন্দুবালা হেসে উঠল। তারা দুই জা মিলে ভাত খেয়ে মায়ানকে খাওয়ানোর চেষ্টা করল। বাচ্চাটা পেটুক। যা দেয়া হয় খেয়ে নেয় সানন্দে। অনুর একটুও কষ্ট হয় না। ইন্দুবালা তাকে চোখ ভরে দেখে, অনুভব করে এমনি একজন তার ভেতরেও বেড়ে উঠছে—অথচ তার বাবাকেই এখনো জানাতে পারল না। অস্থিরতায় ইন্দুবালা ছটফট করতে লাগল। অনু বাচ্চাকে ঘুম পাড়াতে গিয়ে নিজেও একটু চোখ বুজলো। কিন্তু ইন্দুবালার চোখ লাগে না বরং চিন্তায় অসাড় হয়ে আসে দেহ! কেন মোত্তাকিনের কোন খোঁজ নেই? কাজ থাকলেও তো এতক্ষণে এসে যাওয়ার কথা!

তখন মাঝরাত! ঘড়ির কাঁটায় আড়াইটা। চাতক পাখির মতো মেলে থাকা চোখ দিয়ে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো ইন্দুবালার। চিন্তা অচিরেই ভয়ে পরিণত হয়েছে। তিরতির করে কাঁপছে ঠোঁট, মিরসাদ এখনো কিছু জানায়নি। তার কিছুক্ষণ বাদেই তাদের ঘরের কলিং বেল বেজে উঠল। ইন্দুবালা ছুটে যায় দরজার কাছে। কিন্তু দরজার ওপারে কেউ নেই। সে বারান্দায় গিয়ে হাঁক ছাড়ল।
–“কে?”

–“ভাবিজান, ভাই আসছে নিয়া যান।”, কেমন হাসিমাখা কণ্ঠে ইন্দুবালা কপাল কুঁচকে নিলো। সে তড়িৎ গতিতে বের হতে নিলে সদ্য ঘুম থেকে ওঠা অনু পিছু ডাকে।
–“একা যেও না ইন্দু, আমি আসছি।”

–“আসুন ভাবি। লোকটা কে? মোত্তাকিন আসলে তো ঘরেই আসবে!”, ইন্দুবালা সন্দিগ্ধ কণ্ঠে বলল। যেতে যেতে একটা ছুড়ি আঁচলের আড়ালে নিয়ে নিলো। দু’জন নিচে নেমে বদ্ধ গেটের সামনে এসে দাঁড়ায়। ইন্দুবালা হাত বাড়িয়ে সিঁড়ি ঘরের লাইট অন করে। লাইট অন করতেই সেই আলোতে দৃশ্যমান হয় একটি অতি পরিচিত রক্তাক্ত দেহ‌। ইন্দুবালার উৎসুক বদন হঠাৎ করেই সর্বশান্ত হয়ে যায় মোত্তাকিনের রক্তমাখা নিস্তেজ দেহ দেখে। অনুও হতভম্ব হয়ে যায়। সম্মুখের মাস্ক পড়া ছেলেটি নিরুদ্বেগ বলল,
–“ভাই, মদ খেয়ে মারামারি করছে ভাবিজান, আসি।”

অনু গেট খুলে ছুটে বের হয়ে আসে মাটিতে পড়ে থাকা মোত্তাকিনের কাছে। কিন্তু ইন্দুবালা! সে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে। কর্নকুহর বাজছে সদ্য বলা কথাটি। ছেলেটা মদ খেয়ে মারামারি করেছে—এদিকে মা, স্ত্রী মরল কি বাঁচল সেদিকে কোন চিন্তা নেই তার। আজ আর ছেলেটিকে সঠিক পথে আনতে চাওয়ার বাসনা দেখাগেল না তার মাঝে। সে শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ঐ নিস্তেজ দেহটির পানে। আজ বড্ডো ক্লান্তি অনুভব হচ্ছে, নিজেকে ব্যর্থ এক স্ত্রী মনে হয়। সারাদিনের বিদঘুটে অভিজ্ঞতায় ছেলেটির প্রতি আশা ভরসার আর লেশমাত্র রইল না তার মনে।

~চলবে~

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here