দুপুরে স্কুল থেকে ফেরার পর থেকেই ইন্দুবালা অস্বাভাবিক ভাবে মিইয়ে আছে। হাসিখুশি প্রাণবন্ত মেয়েটি দখিনা হাওয়ার সাথে মিলিয়ে গিয়েছে যেন।
বাবা ভাইয়ের উপর নিজের দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে মোত্তাকিন ফিরল রাত আটটা নাগাদ। হেলেদুলে ঘরে ঢুকতেই দেখল অনু আর মধু সোফায় বসে বসে ভীষণ মনোযোগ সহকারে স্টার জলসার সিরিয়াল দেখছে। অনু অবশ্য এই বাজে অভ্যাস রপ্ত করেছে শাশুড়ির থেকে।
ছেলেকে দেখতেই মধুমিতা হন্তদন্ত হয়ে বললেন,
– এই বাবু, শোন। ইন্দুবালার কী হয়েছে দেখ তো একটু। স্কুল থেকে আসার পর থেকে একদম চুপচাপ হয়ে গিয়েছে। চোখমুখ ও ফোলা ফোলা ছিল। কেঁদেছে মনে হয়। কিন্তু আমায় কিছু বলেনি।
মোত্তাকিন ভ্রু কুঁচকে নিয়ে বলল,
-ইন্দু কোথায়?
– ঘরে, সন্ধ্যা থেকে ঘুমাচ্ছে। আমার তো ভালো লাগছে না।
– আর বাবু?
– বেয়াইয়ের সাথে হাঁটতে বের হয়েছে।
মোত্তাকিন নির্বাক হয়ে নিজের ঘরে গেল। তবে গতিতে ব্যস্ততা। বিয়ের পর থেকে ওই দুঃখী মেয়েটিকে কোনো দুঃখ ছুঁতে দেয়নি। তবে আজ কেন সে দুঃখী?
সে কোট টাই খুলে সোফায় ছুঁড়ে মেরে বিছানায় শায়িত মেয়েটির মাথার কাছে হাঁটু গেড়ে বসল। গালে চাপড় মেরে ডাকল,
– ইন্দু? এই ইন্দু? ওঠ। কী হয়েছে?
লাগাতার ডাকাডাকিতে ইন্দুবালা ঘুম জড়ানো চোখ খুলে তাকালো। অচল মস্তিষ্কে মোত্তাকিনকে দেখতেই ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল। ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলল,
– তুই এসে পড়েছিস? কয়টা বাজে? আমি কতক্ষণ ঘুমালাম?
মোত্তাকিন তার একটি প্রশ্নের জবাব ও দিল না। ভূমিকাহীন জিজ্ঞেস করল,
– মন খারাপ কেন? কী হয়েছে? কোনো সমস্যা হয়েছে?
তার উদ্বিগ্ন কণ্ঠে ইন্দুবালার মনে পড়েগেল দুপুরের তীক্ত কিছু ঘটনার কথা। বিচলন মিলিয়ে গেল। কালো কুচকুচে মুখটিতে মলিনতার আধিপত্যে বিশ্রী এক সৌন্দর্য ফুটে উঠল। ঠিক এই কারণেই মোত্তাকিন কখনো ইন্দুবালার মলিনতা সহ্য করতে পারে না। কেননা এই মেয়েটির সৌন্দর্য তার গায়ের রঙ নয় বরং তার মুখের হাসি।
সে আদুরে স্পর্শে গালে হাত রাখে। নম্র স্বরে পুনরায় জিজ্ঞেস করে,
– কী হলো এমন মুখ মলিন করে রেখেছিস কেন? কিছু হয়েছে?
ইন্দুবালা বুকভরা একটা নিঃশ্বাস ফেলে তার হাত সরিয়ে দিল। বিছানা থেকে নামতে নামতে বলল,
– নাহ কিছু হয়নি। ফ্রেশ হয়ে নিচে আয়, খাবার দিচ্ছি।
ইন্দুবালা এক প্রকার দুঃখ থেকে পালিয়ে যাওয়ার মতো করে বেরিয়ে গেল কামরা থেকে। মোত্তাকিনের মেজাজ খারাপ হয়ে গেল কথা লুকিয়ে যাওয়ায়। এই মেয়েটা সবসময় সেই কাজ করবে যা তার পছন্দ নয়। ঘাড়ত্যাড়া!
সে রাগে গজগজ করতে করতে কাউকে ফোন লাগালো। অপরপ্রান্ত থেকে ভেসে আসল রিনরিনে নারী কণ্ঠ।
– আরে মোত্তাকিন যে, কী মনে করে ফোন দিলে?
মোত্তাকিন ঘাড় চুলকাতে চুলকাতে বলল,
– সাবরিনা ম্যাম, কেমন আছেন?
– আলহামদুলিল্লাহ কিন্তু তুমি হঠাৎ ফোন দিলে কেন?
তার কণ্ঠ শঙ্কিত ছিল। কিন্তু আগ্রহীও ছিল। যেন রমরমা কোনো খবরের আশায় উৎসুক হয়ে আছেন। মোত্তাকিন সোজাসাপ্টা বলল,
– আজ কী স্কুলে কিছু হয়েছে ম্যাম?
– কেন ইন্দুবালা তোমায় কিছু বলেনি?
– বললে তো আর আপনার কাছে ফোন দিতাম না।
মিসেস সাবরিনা যেন চমৎকার টপিক পেয়ে গেলেন গসিপের। তিনি ভীষণ উৎসাহের সাথে বলতে লাগলেন,
– আজ তো স্কুলে বেশ ঝামেলা হয়েছে ইন্দুবালাকে নিয়ে। আমাদের স্কুলে তো দু’জন ফিজিক্স টিচার। একজন ইন্দুবালা আর একজন মিরাজ স্যার। তো আজকে চারটা স্কুল মিলিয়ে একটা প্রতিযোগিতা ছিল ফিজিক্সের উপর। হেড টিচার ইন্দুবালাকে আমাদের স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের তত্বাবধায়ক বানিয়েছিলেন। সেই আজকে নির্বাচিত স্টুডেন্টদের সরকারি স্কুলে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত আমাদের স্টুডেন্টরা জিততে পারেনি। এর জন্য মিরাজ স্যার অনেক রেগে গিয়েছিলেন। আর দুর্ব্যবহার করেছেন ইন্দুবালার সাথে। কথা শোনানোর এক পর্যায়ে এটাও বলেছেন যে, ওর গায়ের রঙের মতোই ওর মেধাও কুৎসিত। সমাজে চলার পথে অভিশাপ। এতে ওর কী দোষ বলোতো? মিরাজ স্যার অনর্থক ভাষা খারাপ করেছেন। আমার খুব খারাপ লেগেছে ইন্দুবালার জন্য। রুম ভরতি শিক্ষকদের মাঝে বসে ওকে অপমান করেছেন।
মোত্তাকিন নীরবে শুনল শুধু। মিসেস সাবরিনা ওর কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে ডাকলেন ,
– মোত্তাকিন শুনছ?
– জি ম্যাম। ধন্যবাদ, রাখছি। ভালো থাকবেন।
– আচ্ছা। তুমি ইন্দুবালাকে বলো ও যেন মন খারাপ করে না থাকে। ওর কোনো দোষ নেই।
মোত্তাকিন কোনো জবাব দিল না ফোন কেটে দিয়ে শার্টের হাতা গোটাতে গোটাতে লম্বা লম্বা কদমে ঘর থেকে বের হলো। আঁটসাঁট চোয়ালে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
– কোন মাদারবোর্ড আমার বউয়ের মন খারাপ করার দুঃসাহস দেখিয়েছে তা আমি দেখে নিচ্ছি।
উগ্রগতিতে কেউ দরজা ধাক্কাধাক্কি করতেই মিরাজ স্যার রেগেমেগে দরজা খুললেন।
– এই কে? কে এমন বেয়াদবের মতো দরজা ধাক্কাচ্ছে? এটা একটা ভদ্র লোকের ঘর।
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই ক্ষিপ্র গতিতে একটা ঘুষি চোয়াল নাড়িয়ে দিল। মোত্তাকিন হিসহিসিয়ে বলল,
– তুই ভদ্র ঘরের অভদ্র একটা মাদারবোর্ড। ভদ্র ঘরের পুরুষরা অন্যের বউকে কুৎসিত বলে তাই না? আমার বউ কুৎসিত?
বলেই মোত্তাকিন এগিয়ে গিয়ে মেঝেতে আঁছড়ে পড়া দেহটি চেপে ধরে বেধড়ক ঘুষি মারতে লাগল।
– আমার বউয়ের ভুল থাকলে তুই ভুল ধরিয়ে দিবি। তুই ওর গায়ের রঙ নিয়ে কথা বললি কেন?
মুহুর্তেই মিরাজ স্যার রক্তাক্ত হয়ে উঠলেন। পরিবারের লোকজন এসে আর্তনাদ করতেই মোত্তাকিন ফুঁসতে ফুঁসতে তাকে ছেড়ে দিল। আঙুল তাক করে হুমকির সুরে বলল,
– এরপর থেকে আমার বউয়ের সাথে কোনোরকম উল্টাপাল্টা করলে তোর ঘাড় থেকে মাথা নামিয়ে দেব। ওকে সম্মান দিয়ে চলবি। আমি গুন্ডামি ছেড়ে দিয়েছি, ভুলে যাইনি মাইন্ড ইট!
মোত্তাকিন নিজের উগ্রতা মেজাজকে দমাতে না পারার কারণেই ঘটে গেল আরেক লঙ্কাকাণ্ড! পরদিন সকাল দশটার সময় হেড টিচারের ক্রুদ্ধ তলবে ইন্দুবালা মোত্তাকিন সমেত উপস্থিত হয় স্কুলে। স্কুলে গিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল মিরাজ স্যারের করুণ পরিণতি দেখে।
ইন্দুবালা ক্ষুব্ধ দৃষ্টি ফেলল মোত্তাকিনের দিকে। ঠিক এই করণেই সে জানাতে চায়নি। কিন্তু মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত! সে জেনেই যায় তার খুঁটিনাটি নাড়ি নক্ষত্র।
মিটিং রুমে আয়োজিত শালিস বৈঠকে হেড টিচার রাগান্বিত স্বরে বললেন,
– একজন শিক্ষকের গায়ে হাত তোলার অপরাধে তোমার হাজব্যান্ডকে আমি জেলে দিতে পারি, ইন্দুবালা। কিন্তু এটা তোমার জন্য মোটেও ভালো হবে না। তুমি চাইলে আমরা এই বৈঠকেই বিষয়টা সমাধান করতে পারি।
– জি স্যার।
ইন্ধুবালা আনত মুখে বলল। মোত্তাকিন দাঁতে দাঁত চেপে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে ইন্দুবালার নত মুখপানে। সে এই মাথা নত করা দেখতে পারে না। তাও আবার এমন জায়গায় যেখানে তার কোনো অপরাধ ই নেই।
হেড টিচার বললেন,
– তোমার হাজব্যান্ডকে বলো মিরাজ স্যারের কাছে ক্ষমা চাইতে।
– দুঃখিত পারব না।
হেড টিচারের কথা শেষ হতে না হতেই মোত্তাকিন দারাজ কণ্ঠে বলে উঠল। হেড টিচার সহ মিরাজ স্যার ক্রুদ্ধ চোখে তাকালেন তার দিকে।
মোত্তাকিন দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
– আমি এখানে কোনো ভুল করিনি যে ওই অভদ্র শিক্ষকের কাছে ক্ষমা চাইব, যার শিক্ষক হওয়ার কোনো যোগ্যতাই নেই। ও শিক্ষক হলে একটা মেয়ের গায়ের রং নিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে কোন জ্ঞানে? ওকে তো আমি আরো কয়টা দেব এখন। তুই শালিস বৈঠক বসিয়েছিস কোন সাহসে?
মোত্তাকিন আবারো তেড়ে যেতেই নিলো অমনি ইন্দুবালা তার হাত চেপে ধরে কঠিন দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। হেড টিচার গর্জে উঠে বলল,
– ইন্দুবালা, তোমার হাজব্যান্ডের কত দুঃসাহস সে আমার সামনে আমার স্কুলের টিচারকে তুই তোকারি করছে, মারার হুমকি দিচ্ছে! আমি তোমায় চাকরি থেকে বরখাস্ত করতে পারি।
মোত্তাকিন পাল্টা গর্জে উঠে বলল,
– এইসব চাকরির হুমকি আমায় দেবেন না স্যার। আমার স্ত্রীকে রানীর মতো রাখার সামর্থ্য আমার আছে। ও চাকরি করে শখে। ওর বসে থাকতে ভালো লাগে না তাই ও চাকরি করে। একটা গেলে আরো চারটা চাকরি জোগাড় করে দেয়ার ক্ষমতা আছে। কিন্তু ওকে আমি এমন জায়গায় চাকরি করতে দেব না যেখানে ওকে গায়ের রং নিয়ে অপমান করা হয়। আমি নিজে ওর হয়ে এই চাকরি থেকে ইস্তফা নিচ্ছি। ও আর এখানে চাকরি করবে না।
পরপরই মিরাজ স্যারের দিকে আঙুল তাক করে বলল,
– আর তুই, কাজটা ঠিক করিসনি। দোষ তোর ছিল আবার উল্টো ফাপড় ও তুই নিয়েছিস। ইন ফিউচার আমার সামনে পড়লে আমি তোর অর্ধেক হায়াত কমিয়ে দেব।
বলেই মোত্তাকিন ইন্দুবালার হাত চেপে ধরে টানতে টানতে বেরিয়ে এলো টিচার্স রুম থেকে।
নিজের ঘরে ঢুকতেই ইন্দুবালা ক্রোধিত দৃষ্টি ফেলল রাগে লাল হয়ে যাওয়া অতি ফর্সা মুখের উগ্র পুরুষটির দিকে। রাগত কণ্ঠে বলল,
– এটা কী করলি তুই? সামান্য বিষয়ের জন্য তুই একজন শিক্ষককে কী করে মেরে রক্তাক্ত করতে পারিস?
– ঘুষি মেরে রক্তাক্ত করেছি।
মোত্তাকিনের ত্যাড়া কণ্ঠে বলতে বলতেই এগিয়ে আসল। বিক্ষিপ্ত মেজাজে বলল,
– এখন মেজাজ খারাপ। উল্টাপাল্টা কথা বলবি না। একটা চুমু দে তো।
মোত্তাকিন ঠোঁট এগিয়ে দিয়ে বলল। সহসা ইন্দুবালা ফুঁসে উঠে বলল,
– দূরে সর এখান থেকে। ফাজলামো করছিস? তোর কারণে আমার চাকরিটা হাতছাড়া হয়ে গেল মোত্তাকিন। আমি এই চাকরিটা করতে পছন্দ করি।
নিদারুণ প্রত্যাখ্যানে মোত্তাকিনের মেজাজ আরো খারাপ হয়ে গেল। তবুও সংবরণ করে ঘড়ি খুলতে খুলতে গনগনে স্বরে বলল,
– নতুন চাকরি খুঁজে দেব।
– কিন্তু আমি শিক্ষাগতা করতে পছন্দ করি।
– হ্যাঁ হ্যাঁ শিক্ষকই হবি। তারই ব্যবস্থা করে দেব।
– এই স্কুলের সাথে আমার অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে।
– যেখানে সম্মান নেই সেখানে এক মুহুর্ত ও থাকতে পারবি না। ওসব স্মৃতি ভুলে যা। ওই মাদারবোর্ডের সাহস কী করে হয় আমার বউকে কুৎসিত বলার? ওটাকে জানে মারিনি সেটাই ওর সাত কপাল।
রাগ করতে গিয়েও ইন্দুবালা রাগ করতে পারে না বরং ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে রাগান্বিত মুখপানে। এই ছেলেটি অদ্ভুত উগ্র। তার স্ত্রীকে কেউ কটু কথা বলতে পারবে না। ইন্দুবালা রাগ ভুলে ছলছল নেত্রে তাকায়। মাঝেমধ্যে মনে হয় সে এত ভালোবাসা সম্মান নিতে পারছে না।
মোত্তাকিন তখনো ফুঁসে যাচ্ছে আর নিজ মনে বিড়বিড় করে যাচ্ছে কিছু। ইন্দুবালা দীর্ঘশ্বাস ফেলে এগিয়ে গিয়ে ওর সামনে দাঁড়ায়।
মোত্তাকিন রক্তিম চোখে চেয়ে খেকিয়ে উঠে বলল,
– কী চাই? বলেছি না নতুন চাকরি খুঁজে দেব? তোর স্বামী তো ল্যাংড়া, অন্ধ তোকে কামাই করে খাওয়াতে পারে না। তাই তোর মানুষের অপমান সহ্য করেও চাকরি করতে হবে তাই না? আসলে ওই মিরাজ মাদারবোর্ড না, তুই মাদারবোর্ড।
তার রাগান্বিত কথার প্রেক্ষিতে ইন্দুবালা এবার আর একটুও রাগ দেখালো না বরং হুট করেই লেপ্টে গেল পুরুষালী বক্ষে। দু’হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল পুরুষালী পৃষ্ঠদেশ। মোত্তাকিন আবারো খেকিয়ে উঠল,
– দূরে সর আমার থেকে।
ইন্দুবালা দূরে সরে না আরো শক্ত করে আঁকড়ে ধরল তাকে। অনুযোগ ভরা কণ্ঠে বলল,
– তুই এমন কেন?
– আমি এমনি খারাপ, গুন্ডা।
ইন্দুবালা বিতৃষ্ণা ভরা চাহনিতে মুখ তুলল। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে রাগ সংবরণ করা পুরুষটির চোখে চোখ পড়তেই সে মুখ বাড়িয়ে একটা চুমু দিতে গেল। কিন্তু মোত্তাকিন তাকে ঠেলে দূরে সরিয়ে দিল। ফুঁসতে ফুঁসতে গিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকলো। বের হলো দীর্ঘ পনেরো মিনিট বাদ। শীতল পানির ছোঁয়ায় ততক্ষণে রাগের প্রকোপ নিস্তেজ। মন বেশ ফুরফুরে।
তোয়ালে পেঁচিয়ে বের হতেই দেখল ইন্দুবালা সেই এক কাপড়েই বিছানায় পা গুটিয়ে বসে আছে। সে হেলেদুলে এগিয়ে গেল। ঝিমিয়ে বসে থাকা মেয়েটির মুখের উপর ঝুঁকে গিয়ে ভেজা চুলের পানির ঝাপটা দিয়ে বলল,
– কী হলো ঝিমাচ্ছিস কেন? চুমু খেতে চাইছিলি না? নে খা।
ইন্দুবালা কপাল কুঁচকে বিরক্তির সাথে বলল
– যখন খেতে চেয়েছলিম তখন নিতে চাসনি। এখন আমার দিতে ইচ্ছে করছে না।
– তুই দিবি তোর বাপ দেবে।
বলেই মেয়েটিকে এক ধাক্কায় বিছানায় ফেলে দিল মোত্তাকিন। ইন্দুবালা তৎক্ষণাৎ তেড়েফুঁড়ে উঠতে উঠতে বলল,
– আমার বাপের কাছে গিয়ে চুমু খা বেয়াদ…
মুখের কথা মুখেই থেকে গেল। এক গভীর উষ্ণ চুম্বনের জাঁতাকলে পিষ্ট হতে হতে মেমোরি ফোমের নরম গদিতে দেবে গেল ইন্দুবালার ভারী দেহটি। ইন্দুবালার সকল তেজ নিস্তেজ হয়ে পড়ল একটু একটু করে। গভীর স্পর্শে ভুলতে লাগল জাগতিক সব মোহ।
সময়টা যখন ওই একটা চুম্বনেই থমকে গিয়েছিল ঠিক তখুনি দরজায় ধুপধাপ লাথির শব্দ আলোড়ন তুলল নিস্তব্ধ ঘরটিতে। দরজার ওপারে থাকা মিশাল চেঁচিয়ে ডাকল বাবা মাকে,
– মাম্মা? পাপা? দরজা খোলো। আমি এসেছি।
একের পর এক বিকট শব্দের ধাক্কাধাক্কিতে প্রেমময় আবেশ কেটে গেল। না না কাটতে বাধ্য হলো। মোহগ্রস্ত দুই অবয়ব জাগতিক মোহে ফিরতেই অনুধাবন করল তারা একটা ছোট্ট প্রাণের বাবা মা।
মোত্তাকিন রাগে গজগজ করতে করতে সরে আসে ইন্দুবালার থেকে। খেঁকিয়ে উঠে বলল,
– হ্যাঁ হ্যাঁ দরজাটা ভেঙে ফেল রাজাকারের বাচ্চা। যেদিন থেকে বাপ হয়েছি সেদিন থেকে চুমু আমার জন্য হারাম হয়ে গিয়েছে। শালা!
সহসা মোত্তাকিনের মাথা বরাবর একটা কুশন ছুঁড়ে মারল ইন্দুবালা। শাসিয়ে বলল,
– মুখ সামলে কথা বলবি মোত্তাকিন।
বিক্ষিপ্ত মেজাজে দরজা খুলতেই মোত্তাকিনের রাগকে ধূলোয় মিশিয়ে দিয়ে মিশাল দু’হাত বাড়িয়ে দিল। গাল ভরে হেসে বলল,
– পাপা কোনে।
মোত্তাকিন দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
– ইন্দুর বাচ্চার উপর একটু রাগ দেখাব তার উপায় আছে? কেমন আহ্লাদ করে কথা বলে দেখ!
বলতে বলতেই ছেলেকে কোলে তুলে নিলো মোত্তাকিন। পুনরায় খেঁকিয়ে উঠে বলল,
– এই ছাগল ছানা আল্লাহ তোকে দুটো পা দিয়েছে কেন? বাপের কোলে চড়ে বেড়ানোর জন্য?
মিশাল বাবার মুখপানে চেয়ে গম্ভীর মুখে বলল,
– আমি ছাগন ছানা না।
– তবে কী?
– আমি তোমাল আল মাম্মাল ছানা।
সহসা মোত্তাকিন খিল খিল করে হেসে উঠল। ছেলের গালে শব্দ করে একটা চুমু দিয়ে বলল,
– আপনি বড় শেয়ানা হচ্ছেন, আব্বা। এই ইন্দু দেখ, তোর ছেলে কী বলে! সে নাকি তোর আর আমার ছানা। এসব শিখেছে কোত্থেকে?
ইন্দুবালা ভ্রু কুঁচকে বলল,
– যার তোর মতো বাপ আছে তার এসব শেখার কোনো বাড়তি জায়গা লাগে না।
– হুম যত দোষ, মোত্তাকিন ঘোষ!
মোত্তাকিন ঠোঁটে ঠোঁট চেপে বলল। মিশাল বাবার বুকে মিশে রইল। ছেলেকে বাবার সাথে খাতির জমাতে দেখে ইন্দুবালা এগিয়ে আসল। হাত বাড়িয়ে বাবা ছেলেকে জড়িয়ে ধরে বলল,
– আব্বা, আপনি পাপার বুকে শুয়েছেন?
মিশাল গাল ভরে হেসে মাথা নাড়ল। বাবার বুকে হাত চাপড়ে আদুরে গলায় বলল,
– এথানে অনেক আলাম।
সহসা মোত্তাকিন আর ইন্দুবালা খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। ইন্দুবালা বিমুগ্ধ চিত্তে বলল,
– আসলেই আব্বা। এখানে পৃথিবীর সব আরাম লুকিয়ে রেখেছেন আল্লাহ। আপনার মায়ের ও খুব প্রিয় জায়গা।
মোত্তাকিন বাঁকা চোখে চাইল। ভ্রু নাচিয়ে বলল,
– তাই না কি? কখনো বলিস নি তো।
– বললে যদি অহংকার বেড়ে যায়, তাই বলিনি।
– ওরে অসভ্য! রাতে আসিস এখানে ঘুমাতে তখন দেখাব।
ইন্দুবালা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
– একশবার আসব। যা দেখানোর দেখাস।
– যা দেখার তা তুই আগেই দেখে ফেলেছিস। আর কিছু দেখার বাকি নেই।
মোত্তাকিন ফিচলে হেসে বলল। সহসা লাজে লাল হয়ে ওঠা ইন্দুবালা পায়ের কাছে পড়ে থাকা কুশনটা উঠিয়ে ঝপাং ঝপাং দুটো বারি দিল তার মাথা বরাবর। ব্যথাহীন সেই আঘাতে মোত্তাকিন হেসে উঠল খিক খিক করে।
~একটুখানি লেখা ছিল~
#প্রেম_বর্ণহীন

