#প্রেম_বর্ণহীন
#তোনিমা_খান
#সারপ্রাইজ_পর্ব
সেই রাতটি ছিল মোত্তাকিনের জীবনে চিরস্থায়ী দাগ কেটে যাওয়া এক দীর্ঘ ভয়ঙ্কর রাত। উদাসীনতার মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ছেলেটি প্রথমবার টের পেল—তার অন্তরজুড়ে ছড়িয়ে আছে কাউকে হারানোর গভীর, অব্যক্ত ভয়।
রাত দুইটা আটাশ। মৃদু গুঞ্জনে আন্দোলিত হাসপাতাল জুড়ে হঠাৎই প্রতিধ্বনিত হলো এক ক্ষিপ্র হুঙ্কার।
—“তোদের হাসপাতালের এই নিয়ম বানিয়েছে কোন হা”রা”মি? বউ আমার, বাচ্চা আমার—লেবার রুমে থাকবে দু’তিনটা ওয়ার্ড বয়, অথচ হাজব্যান্ড থাকতে পারবে না? আমি কি বলদ নাকি?”
রিসেপশনিস্টের কলার চেপে ধরে হিসহিসিয়ে উঠল মোত্তাকিন। চোখে আগুন, গলায় জমাট রাগ। পুনরায় বলল,
—“একজন ওয়ার্ড বয়ও যদি ওই লেবার রুমে ঢোকে, তোদের এই হাসপাতাল ব্যান করিয়ে ছাড়ব। আমায় এখুনি ঢুকতে দিতে বলবি।”
নাইট ডিউটিতে থাকা ডাক্তার আর নার্সরা রাগান্বিত স্বরে বলল,
—“আপনি হাসপাতালে দাঁড়িয়ে এভাবে চিৎকার–চেঁচামেচি করতে পারেন না। এখানে অনেক মুমূর্ষু রোগী রয়েছে।”
মোত্তাকিন ফিরে তাকাল। রাগ, অসহায়ত্ব আর দুঃখে চোখ দু’টো টলমল করছে। সে কোনোমতে নিজেকে সামলে গলা শক্ত করে বলল,
—“আমাকে আমার স্ত্রীর কাছে যেতে দিন। নইলে এখানে শুধু চিৎকার–চেঁচামেচি না, রক্তারক্তিও হবে।”
—“এটা সম্পূর্ণ রুলসের বাইরে। আমরা আপনাকে এই অনুমতি দিতে পারি না।”—একজন নিউরো স্পেশালিস্ট কঠোর স্বরে বললেন।
সহসা ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল মোত্তাকিনের। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
—“তোদের অনুমতি কে চেয়েছে? আমি লেবার রুমে ঢুকবই। কে আটকায়, আমিও দেখে নেব!”
বলেই সে ক্ষিপ্র গতিতে ছুটে চলল দোতলার দিকে। তবে আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করল—কেউ তাকে আটকাচ্ছে না। মোত্তাকিন থেমে পিছু ফিরে তাকাল। মুহিত ইরতেজা শান্ত, গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। মোত্তাকিন উদগ্রীব হয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে শুধায়,
—“রক্ত পাওয়া গেছে?”
মুহিত ইরতেজা মিহি স্বরে বললেন,
—“মিরসাদ রক্ত জোগাড় করেছে। তুমি যাও, ইন্দুবালার কাছে।”
আর এক মুহূর্তও নষ্ট করল না মোত্তাকিন। দোতলায় পৌঁছে লেবার রুমের কাছাকাছি যেতেই চিরচেনা নারী কণ্ঠের যন্ত্রণাক্লিষ্ট আর্তনাদে তার সারা শরীর ঘামে ভিজে উঠল। ঢুকতে উদ্যত হতেই প্রতিবারের মতোই দু’জন ওয়ার্ড বয় পথ আটকাল।
এইবার আর বাকযুদ্ধে গেল না মোত্তাকিন। মুহূর্তের মধ্যে কলার চেপে ধরা ওয়ার্ড বয়টির মুখে সপাটে দু’টো ঘুষি বসাল। প্রকাণ্ড আঘাতে ছিটকে পড়ল লোকটি। ঠিক তখনই মোত্তাকিনের চোয়াল ছুঁয়ে গেল আরেকটি অপ্রত্যাশিত ঘা। মোত্তাকিন ঘুরে তাকাল দ্বিতীয় ওয়ার্ড বয়ের দিকে। পরের মুহূর্তেই শান্ত হাসপাতাল চত্বর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল অস্থিতিশীলতা। দীর্ঘ দুই ঘণ্টা ধরে প্রসব বেদনায় ছটফট করতে থাকা স্ত্রীর কথা, তাকে হারানোর ভয় আর জমে থাকা রাগ—সব মিলিয়ে মোত্তাকিন যেন বিস্ফোরিত হলো।
মারামারির শব্দে নিচতলা থেকে ছুটে এলো কর্তৃপক্ষ। তন্মধ্যে একজন আদেশের সুরে বলল,
—“ওনাকে ওনার স্ত্রীর কাছে যেতে দাও।”
রক্তাক্ত, আঘাতপ্রাপ্ত দুই ওয়ার্ড বয় তখন মেঝেতে কাতরাচ্ছে। সেদিকে এক ঝলক হিংস্র দৃষ্টি ছুড়ে দিয়ে মোত্তাকিন ছুটে ঢুকে পড়ল লেবার রুমে। মা, ভাবি আর নার্সদের আশ্চর্য দৃষ্টি উপেক্ষা করে সে সোজা ঢুকে গেল সেই আর্তনাদে ভরা কক্ষে। ভেতরে পুরুষ ডাক্তার, নারী ডাক্তার, নার্স আর ওয়ার্ড বয়—সবাই আছে, কিন্তু পরিবারের লোকের প্রবেশ নিষেধ। ফের রাগে দপদপ করে উঠল মস্তিষ্কের শিরা-উপশিরা।
স্ফীত উদর আঁকড়ে যন্ত্রণায় কুঁকড়ে থাকা কৃষ্ণবর্ণা নারীটিকে একবার দেখেই মোত্তাকিন ঘুরে দাঁড়াল। ক্রুব্ধ চোখে চেয়ে গর্জে উঠে বলল,
—“এখানে কোনো ওয়ার্ড বয়ের প্রয়োজন নেই, সবাই বের হন, আমি আছি।”
ডাক্তাররা কিছু বলল না। তারা ইতিমধ্যেই অবগত, সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটা সাবেক সিটি মেয়র মুহিত ইরতেজার গুন্ডা ছেলে।
প্রসব বেদনায় ছটফট করতে থাকা দিকদিশাহীন ইন্দুবালা তখন ব্যথায় হুঁশ হারাবার পথে। তার হুঁশহারা নিঃসঙ্গ বেদনাদায়ক দেহ হঠাৎ শান্ত হয়ে গেল কেউ সবেগে তাকে শক্ত করে জাপ্টে ধরতেই। ভেসে আসে অস্থির কণ্ঠ,
—“এই ইন্দু, খুব কষ্ট হচ্ছে তাই না? আর হবে না, ডাক্তাররা দ্রুত তোকে সুস্থ করে দেবে।”
বলেই মোত্তাকিন টলটলে নেত্রে ফিরে তাকায় ডাক্তার দু’জনের দিকে। চোখেমুখে উপচেপড়া অস্থিরতা নিয়ে চেঁচিয়ে বলে,
—“ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কি আমার মুখ দেখছেন, হ্যাঁ? বাচ্চা বের করছেন না কেন? এতক্ষণ লাগে কেন? দুই ঘণ্টা যাবৎ একটা মানুষ যন্ত্রণায় ছটফট করছে আর আপনারা ডাক্তার হয়ে তা নির্বিকার দেখছেন?”
ডাক্তার গুরুগম্ভীর গলায় বললেন,
—“বিহেভ ইয়োর সেল্ফ! রোগীর ডেলিভারির এখনো সময় আছে। নরমাল ডেলিভারির জন্য এখন পর্যন্ত পর্যাপ্ত পরিমাণে সার্ভিক্স খোলেনি।”
—“তো লাগবে না নরমাল ডেলিভারি, আপনারা সি-সেকশন করুন। কিন্তু তবুও ওর ব্যথা কমান।”
ডাক্তার নাকোচ করে বললেন,
—“এখন আর সেটা পসিবল না।”
মোত্তাকিনের অধৈর্যতা এবার অসহায়ত্বে পরিণত হলো। টলটল আঁখিদ্বয় থেকে কখন অশ্রু গড়ালো সে টের পেল না। সে রাগ ভুলে অনুনয় করে বলে,
—“এই ডাক্তার! ও এতক্ষণ ব্যথা সহ্য করতে পারবে না। ও অনেক শক্ত মেয়ে! কিন্তু আজ যখন এত ছটফট করছে, তখন ও ভীষণ কষ্ট পাচ্ছে। কিছু করুন, নয়তো বিপদ হয়ে যাবে।”
ডাক্তার নিজেও অসহায়ত্ব ভরা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন,
—“বিপদ হবে না, আমরা আছি না? তার শারীরিক কন্ডিশন একদম ফিট। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত সার্ভিক্স আট সেন্টিমিটার খুলছে, ততক্ষণে বেবি ডেলিভারি হবে না।”
মোত্তাকিন ফিরে তাকায় ঘামে জবুথবু দুর্বল মেয়েটির পানে। অস্থির চিত্তে চোখেমুখে অজস্র আদর দিয়ে বলে,
—“এই ইন্দু, এমন করছিস কেন? একটু সহ্য করে নে, কিন্তু আমায় ছেড়ে কোথাও যাস না।”
মোত্তাকিন ফের শক্ত করে জড়িয়ে ধরল মেয়েটিকে। পুরো পৃথিবীর তিরস্কারকে তুচ্ছ করে অপয়া মেয়েটিকে আগলে নেয়া এই একটা মানুষ কখনো বলেনি ভালোবাসি। কিন্তু প্রতি মুহূর্তে কাজেকর্মে বোঝায়, তার মতো বিদঘুটে সৌন্দর্যের মেয়েটিকে ছাড়া ওর বাঁচা সম্ভব নয়। ব্যথাতুর চাহনিতে ইন্দুবালা স্মিত হাসল। ব্যথাগুলোও যেন ফিকে লাগছে শক্তিশালী সেই বক্ষবন্ধনীর উষ্ণতায়। ইন্দুবালা ভর ছেড়ে দেয় ছেলেটির দেহে। ক্ষীণ কণ্ঠে বলে,
—“এই কালো মেয়েটির দুনিয়া তুই। যেই দুনিয়ায় কেউ তাকে ঘৃণা করতে পারে না, অসম্মান করতে পারে না, দুঃখ দিতে পারে না। এই দুনিয়া ছেড়ে কোথাও যাচ্ছি না মোত্তাকিন। আমি আরেকটু বাঁচতে চাই এই সুন্দর, পবিত্র, স্নিগ্ধ দুনিয়ায়।”
—“বাঁচবি, তুই অবশ্যই বাঁচবি। আমরা একসাথে বাঁচবো। যেই বাঁদর আসছে তাকে নিয়ে আমরা বাঁচবো। কেউ তোকে কোনোদিন কটু কথা বলতে পারবে না।”
ইন্দুবালা স্মিত হেসে মাথা এলিয়ে দেয় বক্ষমাঝে। লেবার পেইন-এর সেই দুঃসহ ব্যথা সহ্য করার জন্য মোত্তাকিন নামক ওই মানুষটার একটু সঙ্গই যথেষ্ট ছিল। দেড় ঘণ্টার মাঝে সৃষ্টিকর্তা কালো মেয়েটির দুনিয়াটাতে চাঁদের ন্যায় আলো ছড়িয়ে দিয়ে একটা ফুটফুটে সন্তান দান করেন।
রক্তমাখা দেহটি যখন বিকট চিৎকার করে কেঁদে ওঠে, মোত্তাকিন তখন বিশ্বজয়ের ন্যায় চিৎকার করে ওঠে বলে,
—“বাবু এসেছে ইন্দু, বাবু এসেছে। এই যে, এই যে আমার হাতে। আমার বাচ্চাটা সুস্থ-সবলভাবে এসেছে, ইন্দু।”
কক্ষজুড়ে দীর্ঘ পাঁচ মিনিট যাবৎ বোকাসোকা আনন্দমুখর চিৎকার প্রতিধ্বনিত হলো। ইন্দুবালা বাচ্চার চিৎকার শোনার সাথে সাথে জ্ঞান হারিয়েছে। বাচ্চাকে সুস্থ-সবল হাতে পেয়েও মুহূর্তটিকে বিশ্বাস করে উঠতে না পারা মোত্তাকিন সরব হকচকিয়ে গেল ইন্দুবালার অচেতন হওয়ায়। সে বাচ্চা ভুলে চেঁচিয়ে উঠল,
—“আমার ইন্দু! এই ডাক্তার, আমার ইন্দুর কি হলো? ও চোখ বন্ধ করে নিলো কেন? এই ইন্দু চোখ খোল, চোখ খোল! আমরা জিতে গিয়েছি তো দেখ। বাবু এসে গিয়েছে, সব ব্যথা সেরে যাবে এখন, ওঠ।”
ডাক্তার দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাকে শান্ত করে বললেন, সে ঠিক আছে শুধু অচেতন আছে। একটু পরেই ঠিক হয়ে যাবে। আশ্বস্ত মোত্তাকিন ঘাড় নুইয়ে টলমলে দুই হাতের তালুতে থাকা ছেলের দিকে তাকিয়ে ক্ষীণ স্বরে বলে,
—“ছোট্ট একটু ইঁদুর ছানা! এতটুকু দেহ নিয়ে পৃথিবীতে আসতে মাকে এত কষ্ট দিলি কেন? দেখেছিস কি অবস্থা করেছিস আমার বউটার? এইসব মনে থাকে যেন, বড় হলে মাকে অনেক অনেক ভালোবাসতে হবে। সারাজীবন যত কষ্ট পেয়েছে তা সব পূরণ করে দিতে হবে ভালোবেসে।”
ছোট্ট বাচ্চা ছেলেটি ভদ্র ছেলের মতোই বাবার কথা মাথা পেতে নিয়েছিল। সে মাকে ভালোবাসা দিয়েছে, যতটুকু ভালোবাসা দিলে মায়ের পৃথিবী থেকে সকল অভিশপ্ত কটূক্তিগুলো মুছে যায়। আজ ইন্দুবালার সত্যিই কোনো আক্ষেপ নেই জীবন নিয়ে, বরং নিজেকে ভাগ্যবতী মনে হয়।
স্মৃতিচারণ থেকে বেরিয়ে আসে ইন্দুবালা। দোতলার পোর্চ থেকে তাকায় বাগানের গাছের আড়ালে লুকিয়ে আরামসে সিগারেট ফুঁকতে থাকা ছেলেটির দিকে। অতঃপর মৃদু হেসে হাতের এক বালতি পানি সর্বোচ্চ শক্তিতে ছুঁড়ে মারলো। নিজ কর্মে নিমগ্ন মোত্তাকিন হঠাৎ হকচকিয়ে গেল নিজেকে আপাদমস্তক কাকভেজা দেখে। সে চকিতে এদিক-ওদিক তাকায়। কঠোর দৃষ্টি এঁটে যায় দোতলার পোর্চে বালতি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির দিকে।
রাগে খেকিয়ে উঠে বলে,
—“বেয়াদব মেয়ে! থাপড়ে দাঁত ফেলে দেবো। এটা কি করলি? আমি অফিসে যাবো… মেজাজটা খারাপ হয় না? ইচ্ছে করছে তোর হাত-পা ভেঙে দিতে অসভ্য মেয়ে! আহ্লাদ দিতে দিতে কি মাথায় উঠে গিয়েছিস, হ্যাঁ? তুই কোন আক্কেলে এই কাজ করলি?”
মোত্তাকিন রাগে একাধারে চেঁচিয়ে যাচ্ছে। ইন্দুবালা নির্বিকার তাকিয়ে বলল,
—“আসিস হাত-পা ভাঙতে আর দাঁত ভাঙতে—তোর মাথা ফাটিয়ে দেবো বেয়াদব, মাওয়ালী! তুই সিগারেট খাচ্ছিস কোন সাহসে? সেদিন কথা দিয়েছিলি না আর সিগারেট ছুবি না?”
—“তোর কথার নিকুচি করি! সবসময় কি খাই? মাসে একটা দুইটা খাই।”
—“যেই পুরুষের নিজের স্ত্রী-সন্তানের প্রতি ভালোবাসা থাকে, সেই পুরুষ কোনোদিন সিগারেট মুখে তুলতে পারে না।”
মোত্তাকিন শার্ট খুলতে খুলতে খেকিয়ে উঠে বলল,
—“তো আমি কখন বলেছি যে তোদের মা-ছেলেকে আমি ভালোবাসি? কখনো বলেছি?”
ইন্দুবালা জবাব দিলো না কিংবা জবাব দেয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব হলো না। দরজার আড়াল থেকে ছোট্ট একটা স্নিগ্ধ মুখ বেরিয়ে আসতেই রাগে ক্ষোভে গজগজ করতে থাকা মোত্তাকিন ফোঁস ফোঁস করে থেমে গেল। আড়চোখে দেখে ছেলের কঠোর দৃষ্টি। মিশাল থমথমে মুখে বাবার পানে তাকায়। গম্ভীর গলায় শুধায়,
—“থ…থুমি কি আমাল মাম্মাকে বকা দিয়েছো? টুই বলেচো? কেন বলেচো? কোন ছাহছে বলেচো? স্যলি বলো।”
উদাম দেহে মোত্তাকিন কোমরে হাত দিয়ে তাকায় ইন্দুবালার হাসি হাসি মুখের পানে। তেরছা চোখে চেয়ে বলে,
—“ভালোই তো! ছেলেটাকে পুরো নিজের নেওটা বানিয়ে নিয়েছিস দেখছি। এখন সে বাপকে ধমকায়! বাহ্ বাহ্! আমার আহ্লাদ আমার উপরেই ভারী পড়ছে।”
ইন্দুবালা মুখ বিকৃত করে বলল,
—“আপনার আহ্লাদ কেউ চেয়েছে জনাব?”
—“কি হলো, মাম্মাকে স্যলি বলো?”—কথার মাঝেই ছেলের পুনরায় চিৎকারে মোত্তাকিন খেকিয়ে উঠে বলল,
—“না বললে কি করবি?”
মিশাল ঠোঁট চেপে চঞ্চল দৃষ্টি ফেললো। কি করবে তা তো খুঁজে পাচ্ছে না। তাই সে হন্তদন্ত হয়ে রেগে বলল,
—“আমি কান্না কলব। জোলে জোলে কান্না কলব।”
—“কর, তাড়াতাড়ি কর।”—মোত্তাকিন মুখ বিকৃত করে বলেই গটগট করে ঘরে ঢুকে গেল। দোতলায় উঠতে উঠতে খুন্তি হাতে মা ছুটে নামছে নিচে।
মধুমিতা ছেলের এহেন রূপ দেখে শুধায়,
—“কিরে, তোর এই অবস্থা কেন?”
—“তোমার আদরের বউমা করেছে। আদরে আদরে বাঁদর বানিয়েছো না? এখন বাঁদরামি করে আমার সাথে। অসহ্য!”—সে ক্ষেপতে ক্ষেপতে ঘরে চলে যায়।
ইন্দুবালা পোর্চ থেকে কাপড়চোপড় নিয়ে ফিরে তাকাতেই দেখলো ছেলেটা আঁচল ধরে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। ওদিকে মায়ানের অজস্র ডাক শোনা যাচ্ছে। এমনি সবার ডাক উপেক্ষা করে সবসময় সে মায়ের আঁচল ধরে ঘুরে বেড়ায়। ইন্দুবালা মৃদু হেসে কোলে তুলে নিলো। আদুরে গলায় বলে,
—“ভাইজান ডাকছে যাবে না?”
মিশাল ততক্ষণে কাঁধে মাথা এলিয়ে দিয়েছে। অলস কণ্ঠে বলে,
—“মা থাকি।”
—“মা থাকবে?”
—“হুঁ।”
—“কেন, খেলবে না?”
—“না, মা থাকি।”
—“আচ্ছা, থাকো। কিছু খাবে?”
ছেলেটি মুখ তুলে তাকালো। উৎসুক নয়নে চেয়ে বলল,
—“কোকু?”
সহসা ইন্দুবালা মুখশ্রী গম্ভীর করে নিলো। কঠিন গলায় বলল,
—“নো বেভারেজ। কোনো কোক নয়, জুস খেতে চাইলে বলতে পারো।”
বাচ্চা ছেলেটি মুখ ভার করে নিলো। ইন্দুবালা চলতে চলতে বলল,
—“চলো জুস খাবে।”
ছেলেটি দ্বিমত করলো না। মা তার কিছু সংখ্যক আবদার পূরণ করে না সে ইতিমধ্যেই বুঝে গিয়েছে। সে ঘরে কাপড়চোপড় রেখে বের হতে গেলেই কারোর হাঁক কানে আসে।
—“এই ইন্দু, এদিকে আয়।”
ইন্দুবালা কপাল কুঁচকে তাকায় ওয়াশরুমের বদ্ধ দরজার দিকে। শুধায়,
—“কি সমস্যা?”
—“এদিকে আয়।”
—“কেন?”
—“আসতে বলেছি আসবি, কেন কি?”
—“বাবু কোলে। কি লাগবে বল।”
ছেলেটির কথার সুর পাল্টালো।
—“ওকে রেখে এসো।”
ইন্দুবালা বিরক্তির নিঃশ্বাস ফেলে নিচে গেল। মধুমিতা আর অনু রান্নার তোড়জোড় করছে। সে মধুমিতাকে বলল,
—“মা, ওকে একটু জুস খাওয়াবে?”
মধুমিতা হাসিমুখে বলল,
—“হ্যাঁ হ্যাঁ দে। এসো দাদুভাই।”
—“আমি একটু পর আসছি।”
—“যা যা, রান্নাঘরে কোনো কাজ নেই তোর।”
—“কেন?”
—“রান্নাঘরে তিনজনের কি কাজ? আমি একাই পারি।”
—“বয়স হয়েছে তোমার, এখন আমি আর ভাবিই তো রান্না করতে পারি।”
—“ইন্দু ঠিক বলেছে মামনি। আগে তো আমি একাই সবার রান্না করতাম, আমি সব পারি।”—অনু হাসিমুখে বলল।
—“শাশুড়ি যতদিন আছে ততদিন শান্তি করে নাও। আমি না থাকলে সব তোমাদেরই করতে হবে।”
মধুমিতার কথায় ইন্দুবালা আর অনুর মুখে বিষণ্ণতা ছেয়ে গেল। যেখানে সকলের কাছে শাশুড়ি এক বিতর্কিত সত্ত্বা, সেখানে তাদের কাছে তাদের শাশুড়ি সকল সুখের মূল। ইন্দুবালা রাগান্বিত দৃষ্টি ফেলে বিনা বাক্যব্যয়ে গটগট করে চলে গেল।
উপরে আসতে আসতে কান পাকিয়ে দিলো মোত্তাকিনের ষাঁড়গরুর মতো চিৎকার। সে নিজের ঘরে এসে বিক্ষিপ্ত কণ্ঠে শুধায়,
—“কি চাই?”
ওয়াশরুমের দরজাটি খুলে গেল অলসগতিতে। ভেসে ওঠে এক মিচকে শয়তানের চেহারা। দরজায় ঠেস দিয়ে দাঁড়ানো অর্ধনগ্ন সুবিশাল দেহটি দেখে ইন্দুবালা চোখমুখ কুঁচকে বলল,
—“এতক্ষণ ভেজা শরীরে কি ফ্যাশন করছিস?”
মোত্তাকিন হাতে সাবান ঘষতে ঘষতে আড়চোখে চেয়ে আদেশের সুরে বলল,
—“কাপড়চোপড় আন।”
—“এইটুকুর জন্য এতক্ষণ যাবৎ এমন করছিলি?”
—“মেয়েমানুষ কত কথা বলে! তোকে যেটা বলছি সেটা কর না ভাই!”
—“আমি ভাই?”
—“ওরে ইন্দুরে, হাতে সময় নেই তাড়াতাড়ি আন।”
—“কেন, এটা আগে নিয়ে নিতে পারলি না?”—ইন্দুবালা বলতে বলতে কাপড়চোপড় বের করে এনে দেয়। মোত্তাকিন দরজা থেকে সরে দাঁড়িয়ে বলল,
—“ওখানে ঝুলিয়ে রাখ, আমার হাতে সাবান।”
ইন্দুবালা নির্বিকার কাপড় ঝুলিয়ে রেখে বের হতে নিলে বুঝলো তার মাথা ইদানিং কম কাজ করছে। বাথরুমের দরজাটি স্বশব্দে বন্ধ হয়ে যেতেই ইন্দুবালা দাঁতে দাঁত চাপলো। সে কেন এতক্ষণ বুঝতে পারলো না এই ধুরন্ধর ছেলে তাকে শাস্তি না দিয়ে বাড়ি থেকে বের হবে না। সে ঘাড় ঘুরিয়ে করুণ চোখে তাকায়। দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে ছেলেটি গা দুলিয়ে হাসছে। সে রাগান্বিত স্বরে বলল,
—“দেখ আমায় এখন রান্না করতে হবে, বাবুকে গোসল করাতে হবে, অনেক কাজ আছে।”
—“সেটা আমার সাথে লাগতে আসার আগে মনে করা উচিত ছিল।”—মোত্তাকিন সাবান ঘষতে ঘষতে এগিয়ে আসে। ইন্দুবালা কাঁদো কাঁদো চোখে রাগ ঝেড়ে বলল,
—“আমি কি ইচ্ছে করে করেছি? তুই সিগারেট কেন খেলি? তাই তো আমার রাগ হয়েছিল। যেতে দে।”
ততক্ষণে নৈকট্য সীমান্ত অতিক্রম করে নেয়। মেয়েটির পিঠ ঠেকে দেয়ালে, দৃষ্টি আরো করুণ হয়। রাগে টলটলে সেই আঁখিদ্বয়ে চোখ রেখে মোত্তাকিনের মনে হলো যা হয় ভালোর জন্যই হয়। সে চোখে হেসে শুধায়,
—“এখন রাগের মাশুল দে। মাসে দু’টো সিগারেট খেলে কি হয়?”
—“মাসে দু’টো, আমার চোখের আড়ালে চারটা। একমাসে মোট ছয়টা। বারো মাসে বাহাত্তরটা সিগারেট যথেষ্ট আমাদের সুখ ছিনিয়ে নেয়ার জন্য।”—মেয়েটির চোখে নিজেকে হারিয়ে ফেলার অদ্ভুত ভয়। মোত্তাকিন স্মিত হেসে সাবানযুক্ত হাতটি রাখে মেয়েটির গালে। ক্ষীণ স্বরে বলে,
—“সিগারেট খেতে ভালোলাগে। দারুণ মাইন্ড ফ্রেশ করে।”
—“এটা ব্যতীত অন্যকিছু তো খাওয়া যায় যাতে মাইন্ড ফ্রেশ হয়।”
—“যায়, কিন্তু তা কি সবসময় পাওয়া যায়?”
—“কি সেটা? কেন পাওয়া যায় না?”
অবুঝ প্রশ্নে অলস গতিতে মেয়েটির ললাটে ললাট ঠেকলো। ভেজা চুল বেয়ে টুপটাপ গড়িয়ে পড়া পানির ফোঁটাগুলো অনাদরে ছুঁয়ে যাচ্ছে কালচে মুখটি। শাড়ি ছাপিয়ে পিচ্ছিল এক হাত অলসতার সাথে ছুঁয়ে যাচ্ছে উন্মুক্ত উদর। অন্যহাতটি মেয়েটির ওষ্ঠাদ্বয়ে আলতো ছুঁয়ে যাচ্ছে। প্রশ্নের জবাব পেতেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেয়েটি চোখ বন্ধ করে নেয়। ক্ষীণ স্বরে বলে,
—“আমার অনেক কাজ আছে। বাবুকে গোসল করাতে গেলে আবার ভিজিয়ে দেবে।”
—“রাজাকার এসেছে পর থেকে তুই আমায় যাচ্ছেতাইভাবে উপেক্ষা করছিস ইন্দু, দিস ইজ নট ফেয়ার। ওটাকে আমিই এনেছি, অথচ ওটা আমার বিরুদ্ধেই সারাদিন পরিশ্রমী সৈনিকের মতো কাজ করে যাচ্ছে।”
সরব একটা ব্যথাহীন আঘাত ছুঁয়ে গেল কাঠের ন্যায় পুরুষালী শক্ত উদর। ইন্দুবালা রেগে বলল,
—“ওটা ওটা করবি না, তোর ওটা আমার জলজ্যান্ত সোনা বাচ্চা।”
মোত্তাকিন হেসে ওঠে। একটুও ইচ্ছা হলো না এই মুহূর্তে ছেলেকে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে দিতে। তর্ক-বিতর্কগুলো সেখানেই থমকালো। ওষ্ঠদ্বয়ে হঠাৎ ছুঁয়ে যাওয়া গভীর স্পর্শগুলো কিয়ৎকালের জন্য একে অপরকে তীব্রভাবে সন্নিকটে টেনে নিলো। পুরুষালী সুগন্ধিগুলো ততক্ষণে নারীদেহ আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নিলো। মেয়েটিকে বাধ্য হয়ে ভুলতে হয় সকল বিরক্তি, সকল কাজের চাপ। থাকুক না কিছু অবহেলিত সময় সকল দায়িত্ব-কাজ ছাপিয়ে।
অবহেলিত সময়গুলো একটু বেশিই দীর্ঘায়িত হলো। দীর্ঘ ত্রিশ মিনিট বাদ মোত্তাকিন হেলেদুলে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে। এক মিনিট বাদ পুনশ্চ গিয়ে দাঁড়ায় ওয়াশরুমের দরজার সামনে। ফিচলে হেসে কাকভেজা রাগান্বিত মেয়েটির দিকে শাড়ি আর প্রয়োজনীয় সবকিছু ছুঁড়ে মেরে বলল,
—“তোর ছেলে ম্যা ম্যা করছে, তাড়াতাড়ি বের হ নয়তো একটু পরেই কেঁদে ভাসাবে। বান্দা মাকে ছাড়া দশ মিনিট খেলে না—অথচ ঘরভর্তি খেলনা। আর যদি খেলনা কিনেছি তবে আমার নাম মোত্তাকিন না।”
সিক্ত বদনে ইন্দুবালা উষ্ণ নিঃশ্বাস ফেলে মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দিলো। মোত্তাকিন হেসে পোশাক পরিবর্তন করে অফিসের উদ্দেশ্যে বের হয়। বের হতেই ছুটন্ত ছোট্ট ছেলেটির পথ আটকে দাঁড়ালো। চোখ টলটল করছে। সে হাঁটু গেড়ে বসে চোখে পানি দেখে হাত বাড়িয়ে কোলে তুলে নিলো। আফসোসে জর্জরিত কণ্ঠে বলতে লাগলো,
—“মায়ের থেকে দুই মিনিট দূরে থাকলে চোখে পানি এসে যায়। আর আমি এক সপ্তাহ বাড়িতে না থাকলেও একটু জিজ্ঞাসা করা হয় না বাপ কোথায়? বাহ্ রাজাকার! তোকে নিজের হাতে দুনিয়ায় এনেছি আর তুই কি রূপটাই না দেখাচ্ছিস। তোর মাকে খেয়ে ফেলেছি।”
—“এগুলো না বলে, একটু সুন্দর করে বোঝাতেও তো পারতি যে মা আসছে।”—ইন্দুবালা মাথায় কাপড় টেনে করিডর পেরিয়ে এগিয়ে আসে। মোত্তাকিন কপাল কুঁচকে তাকায় তার পানে। বলে,
—“তোদের মা-ছেলেকে আহ্লাদ না দিলে একটাও ভালো ব্যবহার করিস না। তোরা দুটোই সুবিধাবাদী লোক! সারাক্ষণ মুখে মধু নিয়ে ঘুরতে হবে নাকি?”
ইন্দুবালা হতাশার দৃষ্টি ফেলে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে নিলো। অসন্তোষের সাথে বলল,
—“একটু জেন্টেলম্যান হ।”
—“তুই বিয়ে করেছিস একটা গুন্ডাকে আর আশা করিস একজন জেন্টেলম্যান-এর মতো ব্যবহার? বেকুব নারী!”—পরপরই ছেলের কুচকানো মুখটির দিকে গাল এগিয়ে দিয়ে বলল,
—“এই ইঁদুর ছানা, একটা চুমু দে।”
মিশাল দিলো না বরং থমথমে মুখে মায়ের কাছে বিচার দিয়ে বলল,
—“বাবা পঁচা কতা বলে।”
ইন্দুবালা তৎক্ষণাৎ নাকোচ করে বলল,
—“না বাবা এমনি, বাবা পঁচা কথা বলে না। দাও বাবাকে আদর করে দাও।”
মোত্তাকিন দাঁত খিচে বলল,
—“কি ছেলে! মা না বললে বাপকে আদর দেয় না। আমার রক্তে নিশ্চিত কোনো ভেজাল আছে, ইন্দু।”
—“তোর রক্তে না, তুই পুরোটাই ভেজালযুক্ত।”—ইন্দুবালা চাপা স্বরে বলল। মোত্তাকিন রেগে দিলো এক চাটি তার মাথায়। পরপরই ছেলেকে বলে,
—“সোজাসুজি আদর দে বলছি, তাহলে একটা বউ এনে দেবো।”
মিশাল পিটপিট করে চাইলো। সাগ্রহে শুধালো,
—“বউ কি?”
—“এই যে আমার বউ, যা নিয়ে তুই টানাটানি করিস। বেতমিজ! অন্যের বউ নিয়া টানাটানি করতে লজ্জা করে না? ওকে তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে দেবো ইন্দু, তবে আর তোর আমার মাঝে আসবে না।”
মিশাল অবুঝ নয়নে মায়ের পানে তাকায়। ইন্দুবালা অতিষ্ঠ হয়ে ডানে-বামে মাথা নাড়লো। ছেলেকে বুঝিয়ে বলল,
—“বাবা বাইরে যাচ্ছে, বাবাকে আদর করে দাও।”
মোত্তাকিন গাল বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
—“তাড়াতাড়ি দে, একটা সুন্দর বউ এনে দেবো।”
মিশাল মায়ের কথামতো চুমু দিলেও মোত্তাকিন হৈ হৈ করে বলল,
—“দেখলি? বউয়ের কথা বলেছি পর চুমু দিয়েছে। ছেলেকে এত ভালোবাসিস না ইন্দু। তোর ছেলে একদিন তোর সাথেও গাদ্দারি করবে দেখিস, তাও আবার পরের মেয়ের জন্য।”
মধুমিতা তখন উপরেই উঠছিল। পথিমধ্যে ছেলের এমন কথা শুনে পা থামিয়ে বললেন,
—“গাদ্দারি করাটা তো অস্বাভাবিক না আব্বা, রক্ত কথা বলে। ওর বাপও তো একটা পরের মেয়ের জন্যই একরাতের মধ্যে চাকরি জোগাড় করে এনেছিল, শপিং করে এনেছিল—বিয়ে করার জন্য। অথচ মাকে সারাজীবনেও একটা লাল সুতাও কিনে দেয়নি, বরং তার টাকা নিয়ে বিলাসিতা করে বেরিয়েছে।”
মায়ের খোঁচায় মোত্তাকিন ত্যাক্ত নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
—“বিরোধী দলে আরেকজন যুক্ত হয়েছে। হয়েছে হয়েছে আমিই দোষী, খুশি?”—বলেই সে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। ইন্দুবালা খিলখিলিয়ে হেসে উঠল শাশুড়ির দিকে তাকিয়ে। মেকি বিষণ্ণ মুখে শুধালো,
—“মধু, তুমি কি আমার সাথে রেগে আছো নাকি?”
মধুমিতা কোমরে হাত দিয়ে বললেন,
—“আরে তোর জামাইকে একটু শায়েস্তা করলাম। তোর সাথে রেগে থাকব কেন? তোর সুখ দেখলে এই মধু ছাড়া আর কারো চোখ জুড়ায় না, এটা মনে রাখিস।”
—“আমি জানি তো!”—ইন্দুবালা গাল ভরে হেসে বলল।
তখন প্রায় দুপুর বারোটা। মোত্তাকিন অফিসে ঢুকতেই সকলে এক পলক ফিরে তাকায়। বাপের অফিসে জমিদারি স্বাভাবিক হলেও ভাইয়ের অফিসে জমিদারি কিছুটা আশ্চর্য লাগে তাদের কাছে। তন্মধ্যে যদি সম্পর্কটা হয় সৎ ভাইয়ের। মোত্তাকিন নিজের রুমে ঢুকতেই মিরসাদের তলব আসে। সে অলস কদমে ভাইয়ের কক্ষে গিয়ে হাজির হলো।
—“আসতে পারি?”
—“আরে আসুন স্যার! অনুমতি নেয়ার কি প্রয়োজন?”—মিরসাদ দাঁতে দাঁত চেপে বলল। মোত্তাকিন ভ্রু নাচালো। ঘাড় চুলকাতে চুলকাতে কক্ষে ঢুকতেই শানিত দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলে যায়।
—“ঘুম ভেঙেছে স্যার? এত তাড়াতাড়ি ভাঙলো কি করে?”
মোত্তাকিন পা দোলাতে দোলাতে আড়চোখে তাকালো। মিনমিনে স্বরে সাফাই দিয়ে বলল,
—“একটু ঝামেলা হয়ে গিয়েছিল তাই আসতে দেরি হয়ে গিয়েছে।”
—“সেটা নয়টার সময় মিটিং সেট করার আগে ভাবা উচিত ছিল না—যে আপনার ঝামেলা হতে পারে? নয়টার সময় আমায় ছুটতে ছুটতে আসতে হয়েছে আর আপনার মিটিং অ্যাটেন্ড করতে হয়েছে। যার কোথায় কি, আগামাথা সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না।”
মোত্তাকিন এদিক-ওদিক দৃষ্টি ফেললো। মিরসাদ রেগে গেল,
—“সোজা হও আর এদিকে তাকাও! এরপর থেকে ভেবেচিন্তে মিটিং সেট করবে যখন নিজে সময় দিতে পারবে।”
—“আচ্ছা আচ্ছা।”
মুহিত ইরতেজা ছেলের কক্ষে ঢুকতেই পথিমধ্যে ছোট ছেলের পাণ্ডুর মুখটি দৃষ্টি কাড়লো। সে পথ আটকে দাঁড়ায়, হাত বাড়িয়ে আঁকড়ে ধরে ছেলের হাত।
—“শরীর ঠিক আছে? মুখ এমন করে রেখেছো কেন?”
—“কিছু হয়নি, ঠিক আছি।”—মোত্তাকিন অনাগ্রহে বলেই হাতটা ছাড়িয়ে নেয়। মুহিত ইরতেজা ক্ষীণ নিঃশ্বাস ফেললেন। এত বছরের দূরত্বগুলো আড়াই বছরে না মিটলেও কিছুটা মসৃণ হয়েছে। সে জানে না, মৃত্যুর আগে তাদের মধ্যে বাবা-ছেলের সেই মধুর অন্তরঙ্গ, জড়তাহীন সম্পর্কটা হবে কি না!
তারা তিন বাপ-ছেলেই এখন ইরতেজা কোম্পানির পেছনে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে আরো দৃঢ়ভাবে দাঁড় করাচ্ছে। এই কোম্পানির পেছনে বড় ছেলের সর্বোচ্চ এফোর্টস থাকলেও এর পেছনের অর্থের মূল জোগানদাতা মুহিত ইরতেজা নিজেই। চেয়েছিলেন, রাজনীতি ব্যতীত তাদের নিজস্ব একটা পরিচয় থাকুক। আজ সেটাই তাদের একমাত্র সম্বল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
*****
কৃষ্ণবর্ণা ইন্দুবালার ছোট্ট দুনিয়াটা এমনি গোছালো, প্রেমময়, খুনসুটিতে ভরপুর। যেই দুনিয়ায় কোনো প্রকার ক্লেশ ছুঁতে দেয় না মোত্তাকিন আর মিশাল। আগলে রাখার মতো এমন স্বামী আর সন্তান তার মতো প্রত্যেক ইন্দুবালার জীবনে আসুক।
সন্ধ্যা নাগাদ সিদ্দিকী সাহেব নাতিকে নিয়ে হাজির হন। প্রতি অপরাহ্নে নানাভাইয়ের সাথে ঘোরাঘুরি করা মিশালের অভ্যাস। ইন্দুবালা মৃদু হেসে এগিয়ে যায় বাবার কাছে। আলতো স্বরে ডেকে ওঠে,
—“বাবা, ভেতরে এসো।”
সিদ্দিকী সাহেব মৃদু হেসে বললেন,
—“আজ কাজ আছে রে মা। ওকে নে, খিদে পেয়েছে মনে হয়। যাই দিচ্ছিলাম খেয়ে নিচ্ছিল।”
—“দুপুরে দু’টো খেয়েছে বাবা। বাপের মতো জমিদার হয়েছে, বাইরের খাবার বেশি পছন্দ।”
—“এমন কথা বলে না আম্মা।”
—“বলবো না তো কি বলবো বলো? ছেলেটাকে এইগুলোতে অভ্যস্ত করে তুলছে তোমার জামাই।”
—“ছোট মানুষ তাই এগুলো খেতে পছন্দ করছে, বড় হলে ভালো-মন্দ যখন বুঝবে তখন ঠিক হয়ে যাবে।”
—“ঘেমে আছো, একটু শরবত খেয়ে যাও অন্তত।”
—“বললাম না তাড়া আছে? আজ আসি।”—বলেই সিদ্দিকী সাহেব পা বাড়ান, তবে তার পথ আটকে দিলো অনুর চঞ্চল কণ্ঠ।
—“কোনো আসি নেই আঙ্কেল। নাতিকে নিয়ে ঘুরেছেন কষ্ট হয়ে গিয়েছে না? একটু শরবত না খেয়ে যেতে পারবেন না। আসুন ভেতরে।”
—“এই যে সিদ্দিকী সাহেব, আপনি আমার বেয়াই হওয়ার আগে আমার প্রতিবেশী। আমার বিপদ-আপদের সঙ্গী ছিলেন। তাই কখনো এখানে এসে না বসে যেতে পারবেন না। তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকুন।”—মধুমিতার গুরুগম্ভীর কণ্ঠে সিদ্দিকী সাহেব মৃদু হাসলেন। অগত্যা তাকে ঢুকতেই হলো। মিশাল দাদুকে ঢুকতে দেখে হাসিমুখে বলল,
—“নানুভাই যাবে না।”
—“না, নানুভাই তোমার কাছে থাকবে।”—ইন্দুবালা মৃদু হেসে বলল।
মোত্তাকিনের ফিরতে প্রতিদিনের মতো রাত বারোটা বেজে গেল। ঘরে ঢুকতেই বরাবরের মতো পিনপতন নীরবতায় কারোর মন খারাপের সুর কর্ণকুহরে আন্দোলিত হয়। মোত্তাকিন পায়ের গতি বাড়ায়। কিছুটা হাওয়ার গতিতে নিজের ঘরে পৌঁছালে অপেক্ষারত কেউ ঝাঁপিয়ে পড়লো তার বুকে। ওষ্ঠকোনা আলতো বেঁকে গেল ছেলে হেঁচকি তুলে কেঁদে উঠতেই।
—“দেলি দেলি কলেচো কেন? কেন বাইলে যাও?”
ইন্দুবালা ডানে-বামে মাথা নেড়ে বিছানা করতে নিলো। মোত্তাকিন মৃদু হেসে কান্নারত মুখশ্রী মুছতে মুছতে বলল,
—“রাত হলে বাপের প্রতি আপনার এত ভালোবাসা আসে কোত্থেকে আমি বুঝিনা বাপ! নাকি ঘুমে মাথা এলোমেলো হয়ে যায়?”
মিশালের জবাব আসে না। সে ইতিমধ্যেই শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কাঁধ-মাথা এলিয়ে দিয়েছে। রাতটুকুতে এই ছেলেটাকে কেউ সামলাতে পারে না যতক্ষণ পর্যন্ত না নাসারন্ধ্রে বাবার গন্ধ প্রবেশ করে। দিনশেষে এই বুকটিই যে মা-ছেলের সবচেয়ে সুরক্ষিত জায়গা। মোত্তাকিন সব ছেড়ে ঘরের আলো নিভিয়ে ঘরময় হাঁটতে লাগলো।
ক্লান্ত ইন্দুবালা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। বিগত দুই বছর যাবৎ ফরমাল শার্ট আর ইন করা প্যান্ট পরা এই ফরমাল বেশভূষার ছেলেটিকে দেখে চক্ষু শীতল হয় তার। শুধায়,
—“খাবার নিয়ে আসি এখানে?”
মোত্তাকিন নাকোচ করে বলল,
—“উহু, খেয়ে এসেছি।”
ইন্দুবালার স্বস্তি হলো। সে ধপ করে শুয়ে পড়লো। তা দেখে মোত্তাকিন কপাল কুঁচকে নিলো কিন্তু কিছু বলল না। মোত্তাকিনের মতো তার ছেলেও ভীষণ দুরন্ত ও জেদি, তাকে সামলাতে মাঝেমধ্যেই বেগ পেতে হয় ইন্দুবালাকে। আজ ও তেমনি একটা দিন ছিল। ভীষণ ক্লান্ত থাকায় ইন্দুবালা বিছানায় পড়ার সাথে সাথে ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু তার ক্ষণিকের ঘুমে যারপরনাই বিরক্তি সৃষ্টি করে কেউ বিকৃত কণ্ঠে ডেকে উঠল।
—“এই ইন্দুর বাচ্চা ওঠ! তোর রাজাকার ছেলে ঘুমিয়ে পড়েছে, চল একটা বাইক রাইড দিয়ে আসি।”
রাত দেড়টার সময় এহেন প্রস্তাবে তন্দ্রাচ্ছন্ন ইন্দুবালা হরহামেশা খুশি হলেও আজ খুশি হলো না। বরং তেতে ওঠে ছেলেটার উপর। সারাদিন এসব বিকৃত কথা শুনতে কার ভালো লাগে! সে সরব চোখ খুলে ক্ষিপ্ত হস্তে ছেলেটির কলার চেপে ধরে হিসহিসিয়ে বলে,
—“সবসময় আমার ছেলেকে নিয়ে উল্টাপাল্টা কথা বলবি না মোত্তাকিন। আমার অতটুকু ছেলেকে নিয়ে তুই সবসময় এমন করিস কেন?”
মোত্তাকিন কপাল কুঁচকে আধশোয়া মেয়েটির উপর থেকে খানিক সরে আসে। আঁধারে রাগান্বিত মুখটির চোয়াল চেপে ধরে গনগনে কণ্ঠে বলল,
—“তোর ওই তিন ফুটের লিলিপুট ছেলে আমার বউকে আমার থেকে বেশি ভালোবাসে ইন্দু। মেজাজটা ঠিক এখান থেকেই খারাপ হয়! আমার বউকে আমার থেকে বেশি ও ভালোবাসবে কেন? আমি আছি কি করতে?”
ক্রুদ্ধ ইন্দুবালা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল ছেলেটির দিকে। বউটাও ওর, বাচ্চাটাও ওর, অথচ চোখেমুখে কি বিদ্বেষ! সে চোখমুখ কুঁচকে বলল,
—“পাগল তুই? তোর লজ্জা করে না নিজের ছেলেকে হিংসা করতে?”
—“ওটা আমার ছেলে? আমার ছেলে হলে তো বাপের প্রতি একটু টান থাকতো। সারাদিন করে ম্যা ম্যা!”—মোত্তাকিন রাগ ঝেড়ে বলল। ইন্দুবালা হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে কলার ছেড়ে দিয়ে বলল,
—“তোর যেখানে ইচ্ছে হয় তুই যা। আমি যাব না কোথাও, আমার ক্লান্ত লাগছে।”
—“চুপচাপ আসবি না-কি তুলে নিয়ে যাব? দুই মিনিট সময় তোর কাছে। এমনিতেই ওই রাজাকারের জন্য তোকে ভাগে পাই না। এখন যদি ঢং করিস মা-ছেলের খবর আছে!”
ইন্দুবালা বদ্ধ নেত্রে হেসে উঠল দামড়া ছেলেটার হিংসায় ভরপুর কণ্ঠে। তবুও পড়ে রইলো বিছানায়। অধৈর্য মোত্তাকিন এবার ঝট করে মেয়েটিকে কোলে তুলে নিলো। ঘর থেকে বের হয়ে মায়ের ঘরের সামনে গিয়ে হাঁক ছেড়ে বলল,
—“মামনি, আমি আর ইন্দু একটু ঘুরে আসি, তোমার নাতিকে দেখো। ঘরে একা!”
সদ্য তন্দ্রাচ্ছন্ন মধুমিতা ধড়ফড়িয়ে উঠলেন তার চিৎকারে। নাতি একা সেই চিন্তায় ছুটে বের হন ঘর থেকে। সদ্য হাত-মুখ ধুয়ে বের হওয়া মুহিত ইরতেজা মৃদু হাসলেন আজও মধুমিতাকে চঞ্চল-প্রাণবন্ত দেখে। ঠিক এমনি এক সত্তার কারণেই নিষিদ্ধ সত্ত্বেও সে এই নারীটির প্রেমে পড়েছিল। সে জানে সে অপরাধী, সবটা ভুল, শাস্তিযোগ্য, শাস্তিও পেয়েছে—তবুও শেষ সময়টাতে চঞ্চল রমণীটি তার। গোটা জীবন নিয়ে তার আর কোনো আক্ষেপ নেই।
মধুমিতা ঘুমন্ত নাতিকে নিয়ে নিজের ঘরে চলে আসেন। নাতিকে বুকে জড়িয়ে বিছানার এক কিনারায় শুতেই রোজকার মতো বিরক্তি সৃষ্টি করে তাকেও দু’টো হাত জড়িয়ে নিলো। দুই বছরে এই এতটুকু বিরক্তি গলধঃকরণ করতে করতে তার রাত কেটে যায়। কখনো শান্তির ঘুম ঘুমাতে পারেনি, আজও অপরাধবোধ ও ঘৃণা তাকে তাড়া করে বেড়ায়। সে কারো ঘর ভেঙেছে, কাউকে কষ্ট দিয়েছে। এই এক কথা তার মস্তিষ্ক দাপিয়ে বেড়ায়। আজও ঘুমাতে পারে না মধুমিতা, ছটফট করে। একটা সময় অনুনয় করে বলে,
—“দয়া করে আমার গা থেকে নিজের হাত সরান, আমার শরীরটা খারাপ লাগছে ঘুমাবো।”
মুহিত ইরতেজা ম্লান হেসে বললেন,
—“আমি কি ঘুমাতে বারণ করেছি?”
—“আপনার ঘৃণ্য ছোঁয়া যথেষ্ট আমার আরামের ঘুম কেড়ে নেয়ার জন্য।”
—“মধু, আজও এত ঘৃণা?”
মধুমিতা টলটলে নেত্রে চেয়ে বলল,
—“নারী হলে বুঝতেন, সমাজের জাঁতাকলে আমাদের অনুভূতিগুলো আজ কতটা বিতর্কিত। আর এই বিতর্কিত অনুভূতিগুলো কীভাবে আমাদের ঘুম কেড়ে নিতে পারে। দুনিয়ার মানুষগুলো শুধু যা ইচ্ছা তাই চাপিয়ে দিতে জানে, সইতে যে কত কষ্ট হয় তা কেউ বোঝে না। আমি শুধু ছেলে-মেয়েগুলোর সুখের জন্য একসাথে আছি এর বেশি কিছু না। আপনার সাথে সংসার করার ইচ্ছা আমি ত্রিশ বছর আগেই ত্যাগ করেছি। এ জীবনে আর সেই ইচ্ছা জোগাতে পারব না।”
মুহিত ইরতেজার হাত দুটো ঢিলা হয়ে গেল। আর শক্তি হলো না নারীটিকে আঁকড়ে ধরে একটু শান্তির ঘুম ঘুমানোর। হাজার মাইল দূরত্ব সহিত যদি পাশে থাকে তবে থাকুক। অন্তত শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার সময় প্রিয় নারী পাশে থাকবে। হয়তো কখনো আফসোস হবে, কিন্তু তা দেখার জন্য বোধহয় সে থাকবে না। কিংবা ঘৃণাগুলো আফসোসের থেকে তীব্রতর!
পুরো রাইডটাতে মোত্তাকিনের পিঠে গাল দাবিয়ে শুয়ে থাকা ইন্দুবালার তন্দ্রাচ্ছেদ ঘটলো যখন বাইকটা থামলো।
—“নাম।”
ইন্দুবালা ঝাপসা চোখে চারিপাশে তাকালে ঘুম ছুটে গেল। হাইওয়ের পাশে বিশাল খালি মাঠের মাঝে একটা টং-এর দোকান দেখে। তার চেয়েও বেশি অবাক হলো মাঠের মাঝে একটা ক্যান্ডেল লাইট ডিনারের ন্যায় টেবিল সাজিয়ে রাখা দেখে। সে কপাল কুঁচকে তাকায় ছেলেটির পানে।
—“এখানে কেন এনেছিস?”
—“চা খেতে।”
—“ওখানে অমন করে ফুল, গিফট দিয়ে সাজানো কেন?”
—“তোর জন্য অন্তত অত সুন্দর জিনিসপত্র না। আয় চুপচাপ।”—মোত্তাকিন নির্বিকার এগিয়ে যায়। টং-এর দোকানে বসে রেডিওতে গান শুনতে থাকা বয়স্ক লোকটি মৃদু হেসে বললেন,
—“মোত্তাকিন আব্বা, আসছো?”
—“জি চাচা, দু’টো কড়া লিকারের চা দেবেন। একটা দুধ চা।”
মোত্তাকিন গিয়ে সাজিয়ে রাখা টেবিলের একটা চেয়ারেই বসে পড়লো। ইন্দুবালা তড়িঘড়ি করে বলল,
—“এই ছেলে ওঠ ওখান থেকে! কারোর বিশেষ মানুষের জন্য সাজিয়ে রেখেছে হয়তো। ওঠ ওঠ, দেখলে কি ভাববে?”
—“সেটাই, কারোর বিশেষ মানুষের জন্যই! এখন চুপচাপ বসে পড়।”
ইন্দুবালা সতর্ক দৃষ্টি ফেলে বলল,
—“আমরা এখানে কেন বসবো? দেখেছিস তাজা ফুল, গিফট, কেক রাখা—কেউ এখুনি এসে পড়বে।”
মোত্তাকিন এবার হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে সম্মুখের মেয়েটির দিকে তাকায়। আফসোসের সুরে বলে ওঠে,
—“তোর কি নিজেকে কখনো কারো বিশেষ মানুষ মনে হয় না? মনে হয় না কেউ তোকে তার জীবনের সবচেয়ে স্নিগ্ধ উপহার হিসেবে গণ্য করে?”
ইন্দুবালা ঠোঁট উল্টে নির্বিকার বলল,
—“নাহ।”
সহসা মোত্তাকিনের রাগ মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। সে সপাটে এক চড় বসায় মেয়েটির গাল বরাবর। রাগে গজগজ করতে করতে বলল,
—“তা মনে হবে কেন বেয়াদব? মাথায় তো ঘোরে মানুষের সব খারাপ কথাগুলো। ভালো কথা তো ঘোরে না। আমি এত ভালোবাসি, বিশেষ অনুভব করানোর জন্য এতকিছু করি তা চোখে বাঁধে না, তাই না? কেক দেখেছিস কিন্তু কেকের উপর কার নাম সেটা দেখিসনি, আন্ধা? মুডটাই নষ্ট করে দেয়।”
ইন্দুবালা হতবাক হয়ে গেল হঠাৎ আঘাতে। কিন্তু ব্যথা অনুভব করতে ভুলে গেল যখন কেকের উপর নিজের নাম দেখলো।
“হ্যাপি অ্যানিভার্সারি ইন্দু”
ইন্দুবালা অবাক হলো আজ তাদের বিবাহবার্ষিকী মনে করে। তাজা গোলাপের তোড়া, গিফট, কেক—সে কত বিশেষ আর নিখুঁত আয়োজন! ইন্দুবালা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল সবকিছুর দিকে। মোত্তাকিন রাগ দমিয়ে বলল,
—“কেক কাট।”
ইন্দুবালা টলটলে নেত্রে চেয়ে বলল,
—“তা এভাবে বলছিস কেন? সুন্দর করে বলা যায় না? হ্যাপি অ্যানিভার্সারিও বলিস নি।”
—“তুই মিষ্টি ভাষার যোগ্য না। আর ওখানে লিখে দিয়েছি না হ্যাপি অ্যানিভার্সারি? আবার বলা লাগবে কেন?”
—“বলা আর লেখা কি এক কথা?”
—“বলতে পারব না দেখেই লিখে দিয়েছি।”
—“এসব করলি তো আমার ছেলেটাকে রেখে আসলি কেন? ও কেক কত পছন্দ করে!”
মোত্তাকিন এবার কাঁদো কাঁদো চোখে তাকায়।
—“ওরে ইন্দু থাম! একটু সুন্দর করে কেকটা কাট। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ওই রাজাকারকে এনে কি করব? বলদ তুই? ঘরে কেক পড়ে আছে, দরকার পড়লে ওকে কাল কেক কিনে দেবো। তুই এখন একটু ভদ্র মেয়ের মতো সময়টাকে উপভোগ কর।”
ইন্দুবালা মৃদু হেসে ভদ্র মেয়ের মতো মাথা নেড়ে কেক কাটতে নিলো।
—“হাত ধর, অ্যানিভার্সারি কি আমার একার?”
মোত্তাকিন হাত ধরে। ইন্দুবালা কেক কেটে ছেলেটির মুখের সামনে ধরতেই সে নাক-মুখ কুঁচকে বলল,
—“এসব আমি খাই না।”
—“তাহলে আনলি কেন?”
—“তোর জন্য।”
ইন্দুবালা স্মিত হেসে বলল,
—“তবে তুই তোর পছন্দের জিনিস খা।”
মোত্তাকিন ফিরে তাকায় মেয়েটির পানে। ভ্রু নাচিয়ে শুধায়,
—“কি খাবো?”
ইন্দুবালা সতর্ক দৃষ্টি ফেললো চা বানাতে ব্যস্ত চা-ওয়ালার দিকে। অতঃপর ঝট করে মাথা নুইয়ে ছেলেটির ওষ্ঠদ্বয়ে শব্দ করে চুমু দিয়ে সরে আসে। মোত্তাকিন হতচকিত বড় বড় নেত্রে তাকায়। মেয়েটি লাজ লুকাতে দ্রুত হাতে গিফট খুলছে।
মোত্তাকিন সরব হেসে উঠল। ইন্দুবালা গিফট বক্স খুলতেই এক ঝাঁক বাহারি রঙের শাড়ি দেখে মৃদু হাসলো। সাথে ছোট্ট একটা চিরকুট।
“আর কি করে তোকে বোঝাবো তুই আমার সবচেয়ে বিশেষ, আমার প্রিয় মানুষ?”
মোত্তাকিন চা আনতে গিয়েছে। ইন্দুবালা মুগ্ধ চিত্তে তাকিয়ে রইল সে পথে।
চায়ের আড্ডাটুকু নীরব আড্ডা হয়ে রয়ে গেল। কিন্তু মোত্তাকিন মোটেই লাজে জর্জরিত নারীটির অনুভূতিতে কোনো প্রকার বিঘ্ন ঘটালো না। বরং লাজটুকুই ছিল নতুন আরেক বছরের সূচনার রাতটুকু সবচেয়ে সুন্দর করে তোলার একমাত্র মাধ্যম।
অনুভুতি আর কণ্ঠরা দলাপাকালো ঠিক শয়নকক্ষের প্রিয় জায়গাটিতে। আলসেমাখা নিশিথে দুটি দেহ-মন অনুভূতিতে গা ভাসালো। ভীষণ আলসে স্পর্শে ললাট ঠেকলো। অনুভূতির তীব্রতায় মেয়েটি আঁকড়ে ধরে গলদেশ। ক্ষীণ স্বরে বলে,
—“ভালোবাসি। ইদানিং কারো কটূ কথা গায়ে লাগে না, বরং নিজেকে আরো আত্মবিশ্বাসী লাগে কারো বিশেষ মানুষ যে!”
পুরুষালী নাসারন্ধ্র থেকে দীর্ঘ এক নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসলো। ক্ষীণ স্বরে বলল,
—“অবশেষে!”
ইন্দুবালা স্মিত হাসলো। কালচে মুখে অদ্ভুত এক সৌন্দর্য ভর করে যখন মেয়েটি হাসে। মোত্তাকিন চোখ মুদে নিলো সৌন্দর্যটুকু। আরো দৃঢ় প্রত্যয়ী হয়ে ওঠে, এই সৌন্দর্যটুকু লুফে নেয়ার জন্য হলেও তাকে সর্বদা এই মুখে হাসি ধরে রাখতে হবে। আজ প্রথমবারের মতো রগত্যাড়া ছেলেটিও স্বীকার করে নিলো অনুভূতিগুলোকে। অনুভূতির নাম দিলো ওই চিরচেনা বহুল প্রচলিত ‘ভালোবাসি’ শব্দটিকে।
—“ভালোবাসি।”
ইন্দুবালা চমকে চোখ মেলে তাকায়। ইচ্ছে করছে শৈশবের ন্যায় সবাইকে ছুটে ছুটে বলতে,
—“দেখো দেখো, কাকের মতো কালো মেয়েটিকে কেউ কত ভালোবাসে!”
______________________সমাপ্ত___________________
রিচেক ছাড়া পর্ব। পরে রিচেক করব।

