#প্রেম_বর্ণহীন
#তোনিমা_খান
#অন্তিম_পর্ব
নিজেকে আজ আরেকবার কোন অভাগী মনে হয় ইন্দুবালার। যার ভাগ্যে সুখ কখনো স্থায়ী হয় না। তার মতো কি তার সন্তানটির কপালেও সুখ জুটবে না? ভীষণ যন্ত্রণাদ্বায়ক ভাবনায় ইন্দুবালার চোখের কার্নিশ ফের ভিজে ওঠে।
ভালোবাসা, সম্মানের জন্য তৃষ্ণার্ত অন্তঃস্থল পেয়েও সবটা হারিয়ে ফেলার ভয়ে গুমড়ে মরছে। একটাসময় মস্তিষ্কের অসহনীয় প্রদাহ আর দমবন্ধকর অনুভূতির তাড়নায় ইন্দুবালা খোলা জানালা দিয়ে মাথা বের করে দেয়। সমীরণের শীতল ঝাপটায় বুকভরা শ্বাস নিয়ে নেত্রদ্বয় বন্ধ করে নেয়। পেটে আলতো হাত বুলাতে বুলাতে ফিসফিসিয়ে বলে,
–“প্লিজ, মোত্তাকিন সুস্থ সবল ফিরে আয়।”
অনু ম্লান চোখে দেখে চলছে ইন্দুবালাকে। মেয়েটির অন্তঃস্থলে যে অচিরেই গড়ে উঠেছে হারিয়ে ফেলার ক্লেশ আর ভয়ের এক বিশাল পাহাড়! যেই দুঃখের পাহাড় ঠিক মেঘের মতো মিলিয়ে যাবে যতক্ষণ পর্যন্ত না সে মোত্তাকিনের মুখ দেখবে!
অনু ইন্দুবালার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে শাশুড়ির দিকে দৃষ্টি রাখে। মায়ানকে বুকে জড়িয়ে তন্দ্রায় বিভোর হয়ে আছে। সে টলটলে নেত্রে ছেলের মুখটি দেখে বিড়বিড় করে,
–“আপনি ছাড়া এই পৃথিবীতে আমার কেউ নেই, মিরসাদ! আমায় মতো আমার ছেলেটাকে এতিম করে দেবেন না।”
তূর্য যত দ্রুত পারছে গাড়ি চালাচ্ছে। পাশেই তার দলের আরেকটা ছেলে বসে আছে। কিন্তু তার মনে হলো দুটো গাড়ি তাকে বহুক্ষণ যাবৎ অনুসরণ করছে। সে মিরর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ব্যপারটাকে ক্ষতিয়ে দেখার চেষ্টা করল। সে পথ ঘুরিয়ে অন্য পথে ঢুকলো। তার সন্দেহ সঠিক হয়। গাড়ি দু’টো ও তাকে অনুসরণ করে ঠিক ঐ পথেই ঢোকে। ঘেমে ওঠে তূর্য! ইন্দুবালার দিকে এক পলক তাকিয়ে সতর্ক কণ্ঠে বলল,
–“ভাবিজান, জানালা থেকে মাথা ঢুকিয়ে বসুন। আর জানালাটা তুলে দিন।”
–“আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে, তূর্য। জানালা বন্ধ করে দিলে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়ে যাবে।”
তূর্য কথা বাড়ায় না। সে গাড়ির গতি আরো বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
–“তবে মাথা ঢুকিয়ে বসেন ভাবিজান। আর সাবধানে বসুন আমি গাড়ির স্পিড বাড়াচ্ছি।”
অনু ফিরে তাকায় তূর্যর দিকে। সন্দিগ্ধ কণ্ঠে শুধায়,
–“কিন্তু তুমি এমন বলছ কেন?”
–“আমার মনে হচ্ছে কেউ আমাদের অনুসরণ করছে বড় ভাবিজান। আমার যেকোন মূল্যে আপনাদের সহিসালামত কোন নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যেতে হবে।”, তূর্য যতোই স্পিড বাড়ায় না কেন ঐ লোকগুলো থেকে পিছু ছোটাতে পারে না। ভয় পেয়ে যায় তূর্য! তারা দু’জন এত মানুষের সাথে মোকাবেলা করে পেরে উঠবে না। অনু ভয়ার্ত দৃষ্টি ফেলে ইন্দুবালাকে আগলে নেয় নিজের সাথে। ইন্দুবালা ফিরে তাকায় তূর্যর দিকে। চিন্তিত কণ্ঠে শুধায়,
–“কিন্তু কেউ কেন আমাদের অনুসরণ করবে তূর্য? আর করলেও কারা তারা?”
–“আমি কিছু জানি না ভাবিজান। ভাই শুধু বলছে আমাদের একটু সাবধান থাকতে হবে কিছু মানুষের থেকে।”
–“সেই মানুষ গুলো কারা তূর্য?”
–“আমি সত্যিই জানি না ভাবিজান।”
–“তুমি মিথ্যা বলছ তূর্য!”, ইন্দুবালার দৃঢ় কণ্ঠে তূর্য মুখ লুকিয়ে ড্রাইভিং এ মনোযোগ দেয়। চলতে চলতেই পুলিশের গাড়ির সাইরেন শুনতে পেল সে। তাদের পাশ ঘেঁষে একটা পুলিশের গাড়ি চলতে দেখে তূর্য ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলল। অন্তত শহর থেকে বের হওয়া পর্যন্ত দূর্গম পথটুকু পাড়ি দিতে পারলে সে নিশ্চিন্ত হবে।
দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমেই অস্থির হয়ে পড়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত ক্ষতি পূরণের চেষ্টা করা হবে বলে আশ্বাস দিলেও সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ। জনমনে ক্ষোভ ও হতাশা।
–“যারা আমাদের শহর চালায়, তারাই যদি চোর হয়, তাহলে আমরা কাকে বিশ্বাস করব?”
সরকারপন্থী কিছু চ্যানেলগুলো একের পর এক একটাই খবর হাইলাইট করে যাচ্ছে।
–“দুর্নীতির কেলেঙ্কারির মধ্যে সিটি মেয়র মুহিত ইরতেজা আর তার পরিবার পালিয়ে গেছেন। এতে পরিষ্কার মুহিত ইরতেজা দুর্নীতিবাজ নেতা।”
বিল্ডারের উপর আর কোনপ্রকার আইনি চাপ থাকে না। প্রতিটা সংবাদ মাধ্যম এটাই আশ্বাস দিচ্ছে পুলিশ মুহিত ইরতেজা আর তার পরিবারকে তারা যেকোন মূল্যে খুঁজে বের করবে। জনসাধারণের এত টাকা তারা যেভাবেই হোক উদ্বার করবে।
ধূলোজমা দেয়ালে এঁটে থাকা টিভির স্ক্রিনের দিকে এক দৃষ্টিতে রইল মুহিত ইরতেজা। চেয়ারে বেঁধে রাখা হাত পা এতক্ষণ মুক্তির জন্য জোর খাটালেও দেহ আর সায় দেয় না। বাঁধা হাত পা নিয়ে বলহীন পড়ে থাকে চেয়ারে। পাশের চেয়ারেই বেঁধে রাখা মিরসাদের নত শির এর কপাল বেয়ে চুঁইয়ে চুঁইয়ে বিন্দু বিন্দু রক্ত মেঝে ছুঁয়ে যাচ্ছে। চোখের সামনে ঝাঁপসা অনুভব হতেই মিরসাদ ব্যর্থ প্রচেষ্টা করা ছেড়ে দেয়।
ডেস্কের দুই প্রান্তে গম্ভীর মুখে বসে থাকা বশির আর উত্তরের মেয়র সিগারেটে সুখটান দিতে দিতে বাঁকা চোখে তাকায় বাপ ছেলেকে হাল ছেড়ে দিতে দেখে। বশির তাচ্ছিল্য হাসল। বিদ্রুপ করে বলল,
–“জোর কাজ করছে না? কাজ করবে না তো মুহিত ভাই, আপনার জোর তো ভেঙেছে আপনার আপন ছেলে।”
বলেই খিক খিক করে হেসে উঠল বশির। পুনরায় ভীষণ উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল,
–“জানেন এই পাঁচ বছর হয়ে যাচ্ছে আপনার ছেলে মোত্তাকিন আপনাকে মারার জন্য আমার সঙ্গ দিচ্ছে। আপনার ছেলেকে লোক দিয়ে মারানো আর নিজে হিরো সেজে বাঁচানো ও ওর পরিকল্পনা ছিল। যেন আপনাদের সহানুভূতি পেতে পারে। দেখুন পেয়েও গিয়েছিল। নয়তো কোন যাচাই বাছাই ছাড়া কেউ এতবড় সরকারি টেন্ডার আমার হাতে ছেড়ে দেয়? যেখানে বিগত চার বছরে আমি আপনার থেকে একটা টেন্ডার নিতে পারিনি। বলতে হবে আপনি আপনার ছেলেকে ভীষণ ভালোবাসেন। আর এই ভালোবাসার প্রতিদান হিসেবে আপনাকে তো কিছু দেয়া উচিৎ বলুন? তাই আমি ঠিক করেছি আপনাকে আপনার ছেলের হাতেই মারাবো! ভীষণ মজা হবে বলুন? ছেলের হাতে মরলে কষ্ট মনে হয় একটু কম লাগবে।”
ফের অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে বশির আর উত্তরের মেয়র। মিরসাদ দূর্বল আঁখি খুলে নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকে ধূলোময় মেঝেতে। শত্রুর থেকে দশটা আঘাত যতটা না ব্যথা দেয়, আপন মানুষের একটা আঘাত তার থেকে দ্বিগুণ যন্ত্রনা দেয়। প্রথমদিন থেকে এই পর্যন্ত সবটা নাটক, ঘৃণা ছিল ভাবতেই মিরসাদ ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সে তো এক মুহুর্ত পূর্বেও ভাইয়ের প্রতি বিশ্বাস ধরে রেখেছিল। মুহিত ইরতেজার হস্তদ্বয় খানিক কেঁপে উঠল। কর্নকুহরে নিদারুণ প্রদাহ সৃষ্টি করে বশিরের এক একটা কথা। অবিলম্বে
বয়সের ছাপে কুঁচকে যাওয়া নেত্রের কার্নিশ বেয়ে কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। বিগত আটাশ বছরের সকল অনুভূতি কেমন ফিকে পড়তে লাগল। সে জীবনের সব পর্যায়ে মা-ছেলের কাছে একটু ক্ষমা আর ভালোবাসা চেয়েছে; অথচ সে ভাবতেই পারেনি তার সন্তান তাকে এতটা ঘৃণা করে—যে তাকে মারার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হতেও কুণ্ঠাবোধ করেনি।
–“আপনি কি কাঁদছেন মুহিত ভাই?”
উত্তরের মেয়র ধীরস্থির হেঁটে মুহিত ইরতেজার কাছে আসে। চেয়ারের দুই হাতলে হাত রেখে মুখের উপর নুইয়ে যায়। প্রসন্ন কণ্ঠে বলল,
–“কাঁদা উচিৎ! শুনেছি আপনি না-কি কট্টর রাজনীতিবিদের মতো একজন কট্টর প্রেমিক ও। মোত্তাকিনের মাকে পছন্দ হয়েছিল বলে ছল করে বিয়ে করেছেন। আপনাদের ইতিহাস ঘাঁটতে গিয়ে বহু কেলেঙ্কারির শুনেছি। যেই ভালোবাসার জন্য এত ছল, এত বিশ্বাস সেই ভালোবাসাই আজ আটাশ বছর ধরে আপনাকে কষ্ট দিচ্ছে। আজ তো আপনার নিজের সন্তান আপনাকেই নিঃস্ব করে দিয়েছে। একের পর এক টেন্ডার যখন ছিনিয়ে নিতেন তখন আমার নিজেকে কোন অথর্ব মনে হতো! ঠিক এমনি একটা করুণ পরিণতি চেয়েছিলাম আমি। কিন্তু বুঝতে পারিনি সেটা এভাবে পেয়ে যাব! যেদিন জেনেছি মোত্তাকিন আপনার ছেলে বিশ্বাস করুন আমার থেকে খুশি কেউ হয় নি। আপনাকে আপনার ছেলের হাতে মরতে দেখার জন্য আমি তৃষ্ণার্ত! এরপর এই পদ আমার ভাইয়ের হবে। আমরা দুই ভাই হবো দক্ষিণ আর উত্তরের সিটি মেয়র।”
নিজের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কল্পনা করেই উল্লাসে ফেটে পড়ে উত্তরের মেয়র।। মুহিত ইরতেজা ঘাড় কাত করে মিরসাদের আঘাতপ্রাপ্ত রক্তাক্ত অবস্থা দেখে টলটলে নেত্রে বশির আর উত্তরের মেয়রের দিকে তাকায়। অনুনয় করে বলে,
–“তোমাদের শত্রুতা আমার সাথে। আমায় মেরে ফেলো কোন সমস্যা নেই। কিন্তু আমার ছেলেটাকে ছেড়ে দাও। ও আমার কোন কাজের সাথে কখনো জড়িত ছিল না আর না আছে।”
–“আমি আপনার ছেলেকে ছেড়ে দিলেও আপনার ছেলে আমায় ছেড়ে দেবে না, মুহিত ভাই। রিল্যাক্স! জীবনে পিছুটান একদম গোড়া থেকে উপড়ে ফেলতে হয়। শুধু আপনি আর আপনার ছেলে না, আপনাদের গোটা পরিবারকে নিঃশেষ করে দেব আমি। ইরতেজা পরিবারের কোন অস্তিত্বই থাকবে না। সবাই ভাববে মুহিত ইরতেজা আর তার পরিবার পালিয়ে গিয়েছে শাস্তির ভয়ে।”
উত্তরের মেয়রের কথায় বশির ফের খিক খিক করে হেসে উঠল। অতি উত্তেজনায় চেঁচিয়ে বলে,
–“এই মোত্তাকিন আর তার পরিবারকে এখনো আনছে না কেন? পারভেজ? কোথায় তুই?”
মুহিত ইরতেজা আর মিরসাদ চমকায় পরিবারের কথা শুনে। মিরসাদ ছটফট করে ওঠে মধুমিতা মা, অনু, মায়ান আর গর্ভবতী ইন্দুবালা এরা তো নির্দোষ! সে ছটফট করতে করতে অস্থির চিত্তে অনুনয় করে বলে,
–“এই ভাই, আমি তোমার কাছে হাত জোড় করছি ওদের কিছু করো না। তোমরা আমাদের মেরে ফেলো, আমি তোমায় কথা দিচ্ছি ওরা কেউ টু শব্দ করবে না। ওরা দূরে কোথাও চলে যাবে, প্লিজ।”
মিরসাদ কথা শেষ করার সাথে সাথেই প্রকাণ্ড মুষ্ঠিঘাতে ফের নুইয়ে পড়ে তার দেহ। বশির তার চোয়াল চেপে ধরে হিসহিসিয়ে বলে,
–“তোদের একটাকেও ছাড়ব না। তুই আর তোর বাপ তো যা করার করেছিস! কিন্তু তোর ঐ সৎ ভাই! ও আমায় পাঁচটা বছর নাকে দড়ি বেঁধে ঘুরিয়েছে। ও না-কি মুহিত ইরতেজার কিছু হয় না! শালা নিমোকহারাম! ওটাকে আরো বিশ্রী মৃত্যু দেব।”
গোডাউনের বাহিরে পায়চারী করতে থাকা পারভেজ ত্রস্ত পায়ে ঢোকে গোডাউনের ভেতরে। মিরসাদ আর মুহিত ইরতেজার দিকে বাঁকা দৃষ্টি ফেলে বিনম্র কণ্ঠে বলল,
–“ভাই, পথেই আছে। দশ মিনিটের মধ্যে চলে আসবে।”
–“তোকে এত চুপচাপ লাগছে কেন পারভেজ?”, বশির সিগারেটে সুখটান দিতে দিতে এগিয়ে আসে। পারভেজ ফাঁকা ঢোক গিলে জোরপূর্বক হেসে বলে,
–“না না ভাই তেমন কিছু না। এমনিতেই আজ একটু জ্বর জ্বর!”
বশির কুটিল হাসল। পারভেজের কাঁধ চাপড়ে বলল,
–“আমি জানি পারভেজ তোর বুক পুড়ছে বন্ধুর জন্য। সমস্যা নেই তোর বুক পোড়া কমাতে আমি আছি তো।”
পারভেজ ঘেমে উঠল। কৃত্রিম হেসে দ্রুত বেরিয়ে যায় গোডাউন থেকে। মাথা ঘুরছে তার! মোত্তাকিন এতদিন যাবৎ কেন এত শান্ত, নিশ্চিন্ত ছিল সে জানে না। তবে মোত্তাকিনের যদি কোন পরিকল্পনা না থাকে সেও বাজেভাবে মারা পড়বে। রাগে মাথার চুল টেনে ধরে পারভেজ!
–“মোত্তাকিন মোত্তাকিন! শালা তুই কি করলি? কেন নিজের সাথে আমায় ও এত বাজেভাবে জড়ালি?”
গোডাউনের সামনে দ্রুতগতির একটি গাড়ি থামতেই পারভেজ হন্তদন্ত হয়ে ছুটে যায় সেদিকে। মোত্তাকিন আঁটসাঁট চোয়ালে বেরিয়ে আসে দরজা খুলে। পারভেজ তার বাহু চেপে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল,
–“সবটা শেষ মোত্তাকিন! এখন কিছু করার নেই। এই যে দুয়ার দেখছিস এটা দিয়ে ঢুকলে লাশ ছাড়া আর কিছু বের হতে পারবে না।”
মোত্তাকিন প্রত্যুত্তর করে না শুধু শান্ত দৃষ্টি ফেলে তাকিয়ে থাকে। পারভেজ রাগে দুঃখে ফেটে পড়ে বলে,
–“তোর জন্য আজ সবটা শেষ! সারাদিন ঘারামি! আমিও আজ প্রাণ হাতে নিয়ে বের হতে পারব না, বশির ভাই আমাকেও ঘাতকের তালিকায় উঠিয়ে দিয়েছে। আর না তোর পরিবারকে ছাড়বে।”
মোত্তাকিন তার উদ্বিগ্নতার প্রেক্ষিতে বড্ডো শান্ত স্বরে বলল,
–“শেষ থেকেই শুরু হবে এক নতুন সমাপ্তির!”
পারভেজ কপাল কুঁচকে নেয়। শালা মৃত্যুর দুয়ারে বসে জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করছে। সে দাঁত খিচে বলল,
–“নিজেকে ফিনিক্স ভাবিস যে আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে আবার জন্ম নেয়।”
মোত্তাকিন দৃষ্টি চকচক করে উঠল। ধিমি কণ্ঠে বলল,
–“বাঁচতে হলে ফিনিক্স পাখির মতো বাঁচতে হবে। যেখানে শেষ সেখান থেকেই সবটা আবার শুরু। একটা নতুন প্রারাম্ভ!”
তন্মধ্যেই প্রবেশদ্বারে থাকা দু’জন লোক মোত্তাকিনের কাছে এগিয়ে আসে। পারভেজ উদ্বিগ্নতা সামলে একটু দূরে সরে যায়। তারা মোত্তাকিনের আপাদমস্তক চেক করে। হঠাৎ করেই একজন গার্ডের হাত থেমে যায় মোত্তাকিনের কোমড়ের কাছে। গার্ডটি শান্ত তবে ক্রুর দৃষ্টি ফেলল তার দিকে। মোত্তাকিন পারভেজের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে তার দিকে শান্ত চোখে তাকায়। লোকটি এক ঝটকায় কালো অস্ত্রটি বের করে নিয়ে চাপা আক্রোশে ফেটে পড়ে বলে,
–“ভেতরে ছাব্বিশটা পি”স্ত”ল রয়েছে, চারটা রা”ম”দা রয়েছে। তোর এই একটা পিস্তল সেগুলোর সামনে দেখতে বেজায় হাস্যকর লাগবে।”
–“তবে এটা রেখে দে তুই! এমনিতেও এটা আমার লাগছে না।”, মোত্তাকিন গটগট করে ভেতরে চলে যায়। পারভেজ সে পথে চেয়ে অতি দুঃখে গা দুলিয়ে হেসে উঠল। পিস্তলটির দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলে,
–“শালার মাদারবোর্ড! এটা বুঝি ওর পরিকল্পনা?একটা পিস্তল নিয়ে এসেছে নিজের বাপ ভাইকে বাঁচাতে।”
–“তোর পিস্তল তোকে দিতে এনেছি। তোকে কে বলেছে আমি আমার বাপ ভাইকে বাঁচাতে একটা পিস্তল নিয়ে এসেছি?”
গুরুগম্ভীর কণ্ঠে পারভেজ কপাল কুঁচকে পিছু ফিরে তাকায়। পকেটে হাত গুঁজে মোত্তাকিন সটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে রুক্ষ কণ্ঠে খেকিয়ে উঠে বলল,
–“কি এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? নাকি মরতে আমায় ছাড়া যাবি না। চিন্তা করিস না আমায় এমনিতেও বশির ভাই জীবিত ছাড়বে না।”
প্রেক্ষিতে মোত্তাকিন কোনরূপ বাক্য বিনিময় করে না হাত বাড়িয়ে পারভেজের পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে। একটা ফিল্টার বের করে তাতে আগুন জ্বালাতে জ্বালাতে ভেতরে ঢুকে যায়। লম্বা পথ! দারুণ জায়গা বেছে নিয়েছে বশির ভাই! আন্ডার গ্রাউন্ডের ভেতর থাকা একটা গোডাউন। যেতে যেতে লম্বা লম্বা টানে তার সিগারেট শেষ হয়ে গেল। সিগারেট খাওয়া ত্যাগ করেছে কিন্তু ভুলে যায়নি। আজো সেই দারুণ অনুভূতি কাজ করে সিগারেট হাতে নিলে। প্রথম প্রেম বলে কথা!
মোত্তাকিনের নিরুদ্বেগ শান্ত মুখশ্রীতে সরব ক্ষিপ্র লহরীর ন্যায় আঁছড়ে পড়ল বিশ্বাসঘাতকতার করুণ চাহনি। মোত্তাকিন দৃষ্টিতে দৃষ্টি স্থির রাখতে পারে না। দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। উত্তরের মেয়রের চোখেমুখে হিংস্রতা ফুটে উঠল তাকে দেখেই। বশির তাকে দেখেই হড়বড়িয়ে এগিয়ে আসে। কাঁধ চাপড়ে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে শুধায়,
–“কোথায় কোথায় তোর পরিবার কোথায়? মিরসাদ ইরতেজার বউ বাচ্চাকেও তোদের বাড়িতে পাঠিয়েছে তাই না? কোথায় তারা?”
মোত্তাকিনের পিছু পিছু আসা একজন লোক ব্যর্থতার সুরে বলল,
–“ভাই, ঘরে ও ব্যতীত কেউ ছিল না। কিন্তু আপনি চিন্তা করবেন না…”
লোকটি বাক্যটি পূরণ করতে পারে না তার আগেই বশির তাকে সপাটে এক লাথি মেরে দূরে ছিটকে ফেলে। রাগে ফেটে পড়ে বলে,
–“মশকরা করিস আমার সাথে? কোন কাজের না! আমাদের হাতে সময় কম। এই কটাকে মেরে দাফন করতে হবে তাড়াতাড়ি।”
সে পুনরায় ছুটে আসে মোত্তাকিনের কাছে। এক হাতে কাঁধ আঁকড়ে তাড়া দিয়ে বলল,
–“মোত্তাকিন, ভাই সত্যি করে বলতো কোথায় লুকিয়েছিস পরিবারকে? তাড়াতাড়ি বল, ভাইয়ের হাতে সময় কম। তুই তো তোর ভাইয়ের স্বপ্ন পূরণ করার জন্য এতদিন নিরলস কাজ করে গিয়েছিস। আজ আরেকবার কর! তাড়াতাড়ি বল! বলতে বলেছি কু”ত্তা”র বাচ্চা!”
শেষের হিংস্র হুঙ্কারে কেঁপে উঠল গোডাউনের নিস্তব্ধ গুমোট পরিবেশ। মোত্তাকিন ফাঁকা ঢোক গিলে শুধু শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। ভীষণ ঠান্ডা গলায় বলে,
–“পরিবার নিয়ে কথা বলবেন ভাই। তাদের কোন সম্পৃক্ততা ছিল না এসব কিছুর সাথে। তবে কেন আমার পরিবারকে টানছেন?”
বশির হিংস্র হস্তে তার কলার চেপে ধরে কিছু বলার জন্য উদ্বত হলে উত্তরের মেয়র তার কাঁধ আঁকড়ে ধরে থামিয়ে দেয়। ইশারায় শান্ত হতে বলে নিজের ফোনটা তুলে ধরে তার চোখের সামনে। সহসা বশির শান্ত হয়ে গেল। মুখে হাসি ফুটে উঠল। সে তৎক্ষণাৎ ছেড়ে দেয় মোত্তাকিনকে। হাস্যোজ্জ্বল মুখে মোত্তাকিনের চেপে ধরা কুঁচকানো শার্ট ঠিক করে দিতে দিতে বলল,
–“আচ্ছা, টানছি না। যা এবার হাতের কাজটা সেরে ফেল তাড়াতাড়ি। দেরি করিস না। এখান থেকে একটা কিছু তুলে নে। কোনটা দিয়ে তোর মারতে সুবিধা হবে?”
বশির টেবিলের উপর সাজিয়ে রাখা একাধিকবার অস্ত্র দেখিয়ে বলল। মোত্তাকিন সেদিক থেকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে এনে বলল,
–“তাদের মারছেন কেন ভাই? আপনার টেন্ডার চাই আপনি সেটা যেকোন উপায়ে পেয়েছেন! টেন্ডার বাবদ পঞ্চাশ কোটি টাকাও আপনি পেয়েছেন তবে আর কি?”
বশির রাগে ফেটে পড়ে ফের তার কলার চেপে হিসহিসিয়ে বলল,
–“শুধু পঞ্চাশ কোটি টাকা নেয়া আমার লক্ষ্য কোনদিন ছিল না, এটা তুই ভালো করে জানিস। আমার সিটি মেয়রের পদ চাই! এটাকে না সরিয়ে সেটা কোনদিন সম্ভব হবে না। তাই আগে ওকে আর ওর পরিবারকে নিঃশেষ করব তারপর আমি আমার লক্ষ্য পূরণ করব।”
–“এতগুলো খু”ন করার পর আইন আপনাকে ছেড়ে দেবে?”
–“আইন?”, বশির খিক খিক করে হেসে উঠল।
–“আইন এমনিতেই আমাদের দিকে আছে। আর তুই কি ভাবিস আমার ভাইয়ের কোন ক্ষমতা নেই? এমন আইন উপর মহলের নেতারা হাতের ইশারায় ওঠে আর বসে।”
–“কোন উপর মহলের নেতা ভাই?”
সর্বদা কম বলা ভীষণ চতুর ছেলেটির অযৌক্তিক অযৌক্তিক কথায় উত্তরের মেয়ের ভ্রু কুঁচকে গেল। এই ছেলেটিকে তার কোনকালেই সিদেসাধা মনে হয়নি। দাম্ভিকতায় হুঁশ হারা বশির নাম বলতে যাবে তার আগেই উত্তরের মেয়র হুঙ্কার ছাড়ল।
–“এসব কথা বলার সময় নেই, বশির। ওকে সোজাসাপ্টা যা করতে বলছি তা করতে বল। নয়তো আমি অন্য পদ্ধতি অবলম্বন করব। হাতে সময় কম।”
বশিরের হুঁশ ফিরে। সে তড়িঘড়ি করে মাথা নেড়ে বলল,
–“হ্যাঁ, হ্যাঁ এই মোত্তাকিন নে, কোনটা দিয়ে মারবি? এটা নে গ্লক নাইন্টিন! ছোট হলেও মাজল ভেলোসিটি দূর্দান্ত! ট্রিগার প্রেস করতে দেরি আছে সম্মুখের মানুষটার বুক চিরে বের হতে দেরি নেই। এত দ্রুতগামী। পনেরোটা বুলেট দিয়ে বাপ ছেলে কেন পুরো পরিবার কুপোকাত হয়ে যাবে।”
মিরসাদ আর মুহিত ইরতেজা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ভবঘুরে ছেলেটির দিকে। একবারের জন্যও তাদের চোখে চোখ না রাখা ছেলেটিকে এখন মনে হচ্ছে ভীষণ অচেনা, অজানা ভয়ঙ্কর কেউ! কেমন মনোযোগ সহকারে অস্ত্রটাকে ছুঁয়ে দেখছে। নিজের ছেলের হাতে খুন হতে হবে? এই পর্যায়ে এসে মুহিত ইরতেজার ভেতরটা তীব্র প্রদাহ অনুভব করে। ব্যথায় ক্রমশই দেহ খিচে নেয়। স্ত্রী সন্তান ভালোবাসা নাই বা দিল কিন্তু প্রেক্ষিতে এত ঘৃণ্য অনুভূতি কেন দিল?
–“কি হলো কি দেখছিস? নিশানা ঠিক কর মোত্তাকিন।”, বশির তাড়া দেয়। মোত্তাকিন শুকনো ঢোক গিলে চোখ তুলে তাকায়। সুদৃঢ় কণ্ঠে বলে,
–“আমি গান চালাতে পারি না, ভাই।”
বশির ক্রুর হাসল। বিদ্রুপ করে বলল,
–“গান চালাতে পারিস না অথচ পকেটে করে গান নিয়ে এসেছিলি। মশকরা করিস না মোত্তাকিন। আমার হাতে সময় কম। সেট ইয়োর এইম এন্ড জাস্ট শ্যুট!”
মোত্তাকিন তবুও অনঢ় কণ্ঠে বলল,
–“আমি শুধু আপনার দলে কাজ করতাম ভাই, কিন্তু কখনো খু”ন খারাপি করিনি। আমি এটা কোনদিন করব না, ভাই।”
–“তুই করবি, মোত্তাকিন। নয়তো তোর পরিবার আর তুই কেউ রেহাই পাবি না আমার থেকে।”, বশির হিসহিসিয়ে বলল।
পরপরই দ্বিগুণ উত্তেজনা নিয়ে বলল,
–“মুহিত ইরতেজা আমার কিছু হয় না, মুহিত ইরতেজা আমার কিছু হয় না—এটা শুনতে শুনতে আমার কান জ্বালা করছে, মোত্তাকিন। তাই এটা তোর শাস্তি স্বরূপ! তোর যখন কেউ হয় না তখন তোর হাত কাঁপছে কেন তার দিকে গান তাক করতে? আমায় রাগাস না, মোত্তাকিন। তোর বউ গর্ভবতী! কয় মাস চলছে যেন? বাচ্চা নড়ছে? বাপ, দাদার কর্মফলের কারণে তোর অনাগত সন্তানটিকে মারতে আমার সত্যি হাত কাঁপবে! তাই বলছি তাড়াতাড়ি শ্যুট কর।”
নিজের অনাগত সন্তানকে দ্বিতীয়বার কারোর মুখে মারার কথায় মোত্তাকিনের শান্ত নেত্রদ্বয় ধপ করে অগ্নিশিখার ন্যায় জ্বলে ওঠে ক্রোধের অনলে। গান আঁকড়ে ধরা নড়বড়ে হাতটি অবচেতনেই শক্ত করে আঁকড়ে ধরে গানটি। বশিরের হিংস্র নেত্রে নেত্র স্থির রেখে সতর্কতার সাথে বলে,
–“হুঁশ ভাই হুঁশ! আমার বাবুর কথা আপনার এই মুখে নেবেন না। ও আল্লাহর পাঠানো সবচেয়ে পবিত্র সত্তা আমার জন্য। ওকে কোন নোংরা কিছু আমি কোনদিন ছুঁতে দেব না, সেখানে আঘাত দেয়া তো বিলাসীতা! আমায় রাগাবেন না, ভাই। আমার স্ত্রী সন্তানের জিকির আমি কারোর মুখে শুনতে পারি না। অথচ আপনারা তাই বারবার করেন। ভাগ্যিস আল্লাহ ওটা আমার বাচ্চা হিসেবে পাঠাচ্ছেন! তার মায়ের গর্ভ থেকে শুরু করে পৃথিবীর প্রতিটা স্থানে তাকে সুরক্ষা দেয়ার জন্য আমি দুনিয়া উল্টে দিতে পারি।”
পারভেজ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল মৃত্যুর দুয়ারে থেকে ফাপড় নেয়া বন্ধুর দিকে। ভয়, আতঙ্ক ভুলে যায় সে!
রাত গভীর হচ্ছে ক্রমেই! উত্তরের মেয়রের এবার ধৈর্য্য বাঁধ ভাঙা হয় সম্মুখের বাক বিতণ্ডা দেখে। সে ডেস্ক ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। পকেটের ফোনটা বের করে স্ক্রিনটা মোত্তাকিনের দিকে তুলে ধরে ডাকে,
–“মোত্তাকিন।”
মোত্তাকিন দৃষ্টি ঘুরিয়ে তাকায়। দৃষ্টি শকুনের ন্যায় তীক্ষ্ণ শানিত হয়ে যায় ফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা চলন্ত গাড়ির জানালা থেকে মাথা বের করে উদাসীন চিত্তে বসে থাকা ইন্দুবালাকে দেখে। ডান হাতে চেপে ধরা গানটি শক্ত হয়ে এঁটে যায় মুষ্টির মাঝে। মস্তিষ্ক ক্রমেই নিজের ভারসাম্য হারায় অতিরিক্ত রাগ চেপে রাখতে রাখতে। স্ক্রিনে ভেসে থাকা কালচে অতি প্রিয় মুখপানে স্থির দৃষ্টি রেখেই সে বাম হাতে শার্টের চতুর্থ বোতামটা ছিড়তে লাগল মন্থর গতিতে।
উত্তরের মেয়র সোজাসাপ্টা স্পষ্ট কণ্ঠে বলল,
–“তুই মারবি, অবশ্যই মারবি, তোকে মারতেই হবে। নয়তো তোর এই অতিপ্রিয় স্ত্রী সন্তানের-ই কোন অস্তিত্ব থাকবে না, মোত্তাকিন। এটা কে দেখ তো! তোর বউ সহ পরিবার আমাদের হাতের নাগালে। এটা তোর বউ না-কি? অন্ধকারে তো দেখা যাচ্ছে না…কাকের মতো কা…”
আচমকাই উত্তরের মেয়রের হুমকিস্বরূপ অসম্পূর্ণ বাক্য গগনবিদারী আর্তচিৎকারে পরিণত হয়, হাত থেকে ছিটকে পড়ে যায় ফোনটা। ঘটনার আকস্মিকতায় বশির সহ উপস্থিত সকলে চমকে তাকালো মোত্তাকিনের দিকে। শকুনী দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা ছেলেটির হাতের তাক করা গানটি থেকে তখনো ধোঁয়া বের হচ্ছে। মোত্তাকিন উগ্র হাতে গায়ের শার্টটা টেনে খুলে ফেলল। পাগলা ঘোড়ার ন্যায় তেড়ে যায় বাহু চিরে রক্তের ফোয়ারা ঠিকরে বের হওয়া হাত চেপে ধরে চিৎকার করতে থাকা উত্তরের মেয়রের দিকে। উগ্র হাতে কলার চেপে ধরে হাতের গানটা দিয়ে ক্ষিপ্র গতিতে তার মাথায় একের পর এক আঘাত করতে করতে হিসহিসিয়ে বলে,
–“কু”ত্তা”র বা”চ্চা! তোদের কতবার বারণ করেছি আমার বউ বাচ্চা নিয়ে কথা বলবি না? তোর সাহস কি করে হয় আমার বউকে কাক বলার? আজ জনমের জন্য তোদের মুখ বন্ধ করব।”
গানের উল্টোপাশ দিয়ে অনবরত আঘাতে থেঁতলে দেয়া বড় ভাইয়ের বিবর্ণ মুখশ্রী দেখে বশির দ্রুত গান হাতে তুলে নিয়ে সপাটে এক আঘাত বসায় মোত্তাকিনের মাথা বরাবর। মোত্তাকিনের উন্মাদনায় মৃদু বিঘ্ন ঘটলেও কিন্তু তাকে অচল করতে পারেনি। মোত্তাকিন ফের তেড়ে উঠতেই বশির ঠিক তার কপাল বরাবর গানের নল ঠেকায়। সাবধানি কণ্ঠে বলে,
–“একটু নড়লেই পুরো পনেরোটা রাউন্ড তোর মাথায় শেষ করব, মোত্তাকিন। একদম সাবধান!”
মোত্তাকিন স্তম্ভের ন্যায় স্থবির হয়ে গেল। কপাল বেয়ে চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়া রক্তের ফোয়ারা গাল বেয়ে নামছে মন্থর গতিতে। দৃষ্টি ঝাঁপসা হয়ে আসলেও একটুও প্রশ্রয় দেয় না দূর্বলতাকে। দূর্বল হলে চলবে না! বশিরকে অবাক করে দিয়ে সে পাল্টা গান তাক করে ঠিক তার বুকের হৃদযন্ত্র বরাবর। তা দেখে বশির অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। চারিদিকে চোখ বুলিয়ে বলল,
–“একটু নিজের চারপাশে তাকা তো, মোত্তাকিন। এখানে মোট আঠারো জন আছে। প্রত্যেকের হাতে একটা করে গানে যদি পনেরোটা করে রাউন্ড থাকে তবে মোট কয়টা রাউন্ড হয়? একটা গানের রাউন্ড ও লাগবে না তোকে শেষ করতে।”
–“আপনার দুইশো সত্তরটা রাউন্ড আমার চৌদ্দটা রাউন্ডের কাছে ভীষণ ঠুনকো পড়বে, ভাই।”, মোত্তাকিনের সুদৃঢ় কণ্ঠে বশির অবাক হওয়ার ভান করে। অবাক কণ্ঠেই বলে,
–“তাই না-কি? এই ও কি বলল শুনলি তোরা? আঠারোটা গানের মধ্য থেকে ও নাকি আমায় গুলি করবে। আচ্ছা , ঠিক আছে তুই পারলে আমার গায়ে একটা গুলি করে দেখা।”
বশির উৎসুক নয়নে তাকিয়ে বলতে দেরি আছে মোত্তাকিনের শ্যুট করতে দেরি হলো না। বশিরের বাম বাহু চিরে একটা রাউন্ড বিদ্যুৎ এর গতিতে বেরিয়ে গেলে মুহিত, মিরসাদ সহ পারভেজ অবিশ্বাস্য নয়নে তাকায়। এমনকি অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকায় বাহু আঁকড়ে ধরে চিৎকার করতে থাকা বশির নিজেও। কিন্তু তাদের একজনের অবিশ্বাস্য দৃষ্টি মোত্তাকিন কিংবা বশিরের দিকে নয় বরং গোডাউন ঘরে চারিপাশে দাঁড়িয়ে থাকা আঠারো জন গার্ডের দিকে। যারা কিনা গান হাতে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। পারভেজ আকস্মিকতায় বোকা বনে যায়। সে নিজের পাশে থাকা গার্ডটির পেটে কনুই দিয়ে গুঁতা দিয়ে তাড়া দিয়ে বলল,
–“এই শালা মারিস না কেন মোত্তাকিনকে? ও দেখি তোদের বসকে গুলি করেছে।”
গার্ডটি শান্ত দৃষ্টিতে তাকায় পারভেজের দিকে। শান্ত কণ্ঠেই বলে,
–“আমাদের বস ঠিকই আছে, পারভেজ ভাই।”
–“মানে?”, পারভেজের অবুঝ কণ্ঠ।
বশির ব্যথা ভুলে হতভম্ব চিত্তে চেঁচিয়ে উঠল,
–“এই তোরা থাকতে ও আমায় গুলি করল কিভাবে? তোরা ওর খুলি উড়িয়ে দিবি না?”
আঠারো জন গার্ড একদম নিশ্চুপ, নীরব। বশির দিকদিশা হারিয়ে মোত্তাকিনের দিকে তাকায়। মোত্তাকিন নিরুদ্বেগ মাথার রক্ত মুছছে। বশির বুঝে নেয় তার বিপদ অতি সন্নিকটে। সে তড়িৎ গতিতে পাশে পড়ে থাকা গানটা ডান হাতে নেয়। শক্ত হাতে মোত্তাকিনের দিকে তাক করে ট্রিগার প্রেস করে।
এমন পর্যায়ে উপস্থিত সকলে আরেকদফা অবাক হয়। কেননা এবার বশিরের গার্ডদের প্রধাণ গুলি ছুড়েছে বশিরের ডান বাহু বরাবর।
পারভেজের মাথার উপর দিয়ে যায় সব। মুহিত ইরতেজা, মিরসাদ ও কিছু বুঝে উঠতে পারে না। পারভেজ দ্রুত এগিয়ে গিয়ে তাদের দড়ি খুলে দেয়।
ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় তাদের এই গার্ড দলের প্রধানের দিকে। কিছু বলতে যাওয়ার জন্য উদ্বত হলে গোডাউনের বাহির থেকে কিছু গার্ড ছুটে আসে। এবং বশিরের গার্ডরাই তাদের পথরোধ করে দাঁড়ায়।
দুই বাহুতে দু’টো গুলি খেয়ে বশির অচল হয়ে পড়ে। তার থেকেও অচল হয়ে পড়ে তার মস্তিষ্ক! মোত্তাকিন ঝাঁপসা নেত্রে ধীরস্থির এগিয়ে আসে তার কাছে। মেঝেতে বসে ঝুকে যায় বশিরের মুখের দিকে। ওষ্ঠকোনে ক্রুর হাসি!
বশির অতি ক্ষীণ স্বরে উচ্চারণ করে,
–“তুই আমার সাথে কোন খেলা খেললি?”
মোত্তাকিন ঘাড় চুলকাতে চুলকাতে বলল,
–“দাবার একটা জনপ্রিয় কৌশল আছে ভাই, জানেন? “এক্সচেঞ্জ স্যাক্রিফাইস” মাঝে মধ্যে ছোট ছোট স্যাক্রিফাইস বড় কোন কিছু অর্জনের মাধ্যম হয়। আপনি ঠিক এই লোভে পড়েই ভুলটা করেছেন। আমি আপনাকে পঞ্চাশ কোটি টাকার জোগান দিয়েছি, বিনিময়ে আপনাদের দুই ভাইয়ের গোটা সম্রাজ্য এখন আমার হাতে!”
বশির আক্রোশে ফেটে পড়ে। তার মানে শুরু থেকেই সে মোত্তাকিনের গড়া ষড়যন্ত্রের স্বীকার ছিল! সে হিসহিসিয়ে বলল,
–“তুই কি ভাবিস তুই এখান থেকে জীবিত বের হতে পারবি? বাইরে আমার এখন পাঞ্চাশ জন গার্ড আছে। আমাদের মেরে তোরা এখান থেকে কিভাবে বের হবি তা আমিও দেখে নেব।”
মোত্তাকিন খিক খিক করে হেসে উঠল। উদাসীন দেহে বশিরের পাশে মেঝেতে শুয়ে পড়ল। উদাসীন কণ্ঠেই বলল,
–“আমি বের হচ্ছি না কোথাও, ভাই। একটা জিনিস দেখবেন? চলুন আপনাকে আপনার গোটা জীবন বৃত্তান্তের সমাপ্তি দেখাই। এই পারভেজ তোর ফোনটা দে তো!”
হতবিহ্বল পারভেজ নির্বাক ফোনটা এগিয়ে দিলো। মোত্তাকিন সদ্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়া হট নিউজটা বশিরের অচেতনপ্রায় মুখের সামনে তুলে ধরে। যেখানে মোত্তাকিন গুলি করার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত সকল ঘটনা টেলিকাস্ট হচ্ছে। মুহুর্তেই আঁছড়ে পড়া আতঙ্কে বশির চেঁচিয়ে উঠল,
–“এটা হতে পারে না! এটা কি করে সম্ভব?”
মোত্তাকিন স্মিত হেসে বলল,
–“চোরের দশ দিন, গৃহস্থের একদিন—লোকমুখে শোনা কথাটি আপনার মনে আছে? আমার না ভীষণ রাগ হচ্ছে, আপনি আমায় এত নির্বোধ ভাবেন—যে আমি এত বছর যাবৎ আপনার সাথে কাজ করেও আপনার গতিবিধি বুঝতে পারব না? পুলিশ আপনার গোডাউন এতক্ষণে ঘিরে নিয়েছে। শুভকামনা ভাই! মেয়র না হতে পারলেও বোকামিতে আপনি সেরা উপাধি পাবেন।”
পতনের একদম শেষ পর্যায়ে আর চেতনা ধরে রাখতে পারল না বশির। সে পুরোপুরি অচেতন হয়ে পড়ে।
*****
বড় স্ক্রিনের সামনে বসে থাকা পুলিশ সদস্য সহ সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর এর লোকগুলো চাপা উদ্বিগ্নতা নীরব হয়ে গেল সম্মুখের বৃহৎ স্ক্রিনটা হঠাৎ বন্ধ হয়ে যেতেই। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল,
–“কি হলো স্ক্রিন বন্ধ হয়ে গেল কেন? মোত্তাকিন কি ক্যামেরা বন্ধ করে দিয়েছে? না-কি ওরা মোত্তাকিনের উপর হামলা করেছে?”
পুলিশের প্রধান কর্মকর্তা আবুবকর সিদ্দিক মাথা চুলকাচ্ছে। সে নিশ্চিত, হামলাটা মোত্তাকিন করেছে। ঐ ছোকরা ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কোন চর্চা কারোর মুখে শুনতেই পারে না।
–“সিদ্দিক সাহেব, আপনি কিছু বলছেন না কেন? ক্যামেরা নষ্ট হওয়ার তো কোন সুযোগ নেই। তবে কানেকশন হারিয়ে ফেললাম কেন?”
আবুবকর সিদ্দিক কথা ঘুরাতে চায়। সে কপাল কুঁচকে পাল্টা রুক্ষ স্বরে বললেন,
–“আপনি এটা বাদ দিন। আমাদের যতটুকু প্রমাণ প্রয়োজন ছিল তা আমরা পেয়ে গিয়েছি। কিন্তু কি হলো এখন আপনাদের মাঝে এত উদ্বিগ্নতা কেন? কিছুক্ষণ আগেও তো আপনারা আমায় বিশ্বাস করছিলেন না। আমি না-কি বিরোধীদলীয়! মুহিত ইরতেজার আত্মীয়! তা এখন দেখলেন আপনাদের উত্তরের মেয়র আর তার ভাইয়ের ষড়যন্ত্র? এটা কতটুকু সাজানো গোছানো ষড়যন্ত্র ছিল তা নিশ্চয়ই আর বলে বোঝাতে হবে না।”
মহা পরিচালক থতমত খেয়ে মিইয়ে গেলেও গলার স্বর পরিবর্তন হলো না। গুরুগম্ভীর গলায় বললেন,
–“আপনি জানেন আমরা প্রমাণ ব্যতীত কোন তথ্যে বিশ্বাস করি না। আপনি আমাদের মোত্তাকিনের সত্যতা বিশ্বাস করার জন্য কোন প্রমাণ দেখাননি। আমি কি করে বিশ্বাস করব মোত্তাকিন যেটা বলছে সেটা সত্য!”
–“আমি আইনের লোক, স্যার! গাঁজা খেয়ে কোন কথা বলি না। কোন কথা যদি বলি তবে তার পেছনে কোন শক্তপোক্ত কারণ ছিল!”
মহা পরিচালক নত দৃষ্টি রেখে মাথা নেড়ে সায় জানালো। গম্ভীর গলায় বলল,
–“আমাদের এখন ওখানে উপস্থিত হওয়া প্রয়োজন। মোত্তাকিন আর তার পরিবারকে যথাযথ নিরাপত্তা দেয়া উচিৎ। নয়তো উত্তরের মেয়র আর বশিরের আরো হিংস্র হয়ে পড়বে।”
–“মোত্তাকিনের উপর আপনি বিশ্বাস না করলেও আমি বহু আগেই করেছিলাম। তাই ওর আর ওর পরিবারের নিরাপত্তা আমি সবার আগে নিশ্চিত করেছি।”, আবুবকর সিদ্দিক গুরুগম্ভীর গলায় বললেন। অধিদপ্তরের মহা পরিচালক কৌতুহলী হলেন। কৌতুহলী গলায় শুধালেন,
–“কিন্তু আপনি হুট করে অচেনা একটা ছেলের কথা বিশ্বাস করে নিলেন কি করে?”
আবুবকর সিদ্দিক স্মিত হাসলেন। বললেন,
–“হুট করে নয়। আমি মোত্তাকিনকে অনেক আগে থেকে চিনি। আর ওর প্রতি আমার বিশ্বাস ভালোবাসা সম্মান অনেক আগে থেকেই। আপনার মনে পড়ে পুরো সংবাদ মাধ্যম আমায় একবার প্রশংসায় ভাসিয়ে দিয়েছিল নারী পাচারকারীর একটা বিশাল দলকে আইনের আওতায় আনার জন্য?”
–“হ্যা, মনে আছে। নিঃসন্দেহে সেটা প্রশংসনীয় কাজ ছিল।”, মহা পরিচালকের কথায় আবুবকর সিদ্দিক বলেন,
–“জি প্রশংসনীয় ছিল বটে! কিন্তু ঐ প্রশংসা আমার ছিল না বরং মোত্তাকিনের ছিল। আমাকে ঐ নারী পাচারকারী চক্রের সন্ধান আর আটক করার যাবতীয় সহায়তা ও করেছিল। কিন্তু নাম আমার দিয়েছে, কারণ ও জনসম্মুখে নিজেকে প্রকাশ করতে চায়নি শুধুমাত্র ওর একটা পরিবার রয়েছে বলে। আমিও চাইনি ওর ওপর কোন বিপদ আসুক। তাই লুকিয়ে গিয়েছি। তাই সেই কৃতজ্ঞতা আমি আজো ভুলিনি। প্রমাণ ব্যতীত ওর সব কথা বিশ্বাস করি। আর ও প্রত্যেকবার আমায় গর্বিত করে।”
আবুবকর সিদ্দিকির কণ্ঠে গৌরবের ছোঁয়া! মহা পরিচালক স্মিত হেসে বললেন,
–“কিন্তু এবার তো তাকে সামনে আসতেই হবে আর এবার এটাও প্রকাশ হয়ে গিয়েছে যে মুহিত ইরতেজার দ্বিতীয় একটি সংসার রয়েছে, সন্তান রয়েছে।”
আবুবকর সিদ্দিক মাথা নেড়ে বললেন,
–“আমি নিশ্চিত এই বিষয় নিয়ে মুহিত ইরতেজা কিংবা মোত্তাকিনের কোন সংশয় নেই।”
রাত একটা! সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা, পুলিশ, সাংবাদিক সহ বহু মানুষ ঘিরে নিয়েছে আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকা গোডাউনটি। মুহিত ইরতেজা আর মিরসাদ দূর্বল নিস্তেজ দেহে তখনো দাঁড়িয়ে আছে মোত্তাকিনের সামনে। মোত্তাকিন আবুবকর সিদ্দিক এর সাথে কথা বলায় ব্যস্ত।
আবুবকর সিদ্দিক মোত্তাকিনের মাথায় রুমাল চেপে ধরে চাপা সতর্ক কণ্ঠে বলল,
–“তোকে বারণ করেছিলাম না কোনভাবেই আক্রমণাত্মক কিছু করবি না? তুই গুলি করলি কেন?”
মোত্তাকিন বাঁকা চোখে তাকায়। থমথমে মুখে বলল,
–“প্রমাণ আছে আমি গুলি করেছি?”
আবুবকর সিদ্দিক হো হো করে হেসে উঠলেন। দাঁতে দাঁত চেপে বললেন,
–“ল্যাটেন্ট ফিঙ্গারপ্রিন্ট ডেভেলপমেন্ট এর কাছে এই বন্দুক পাঠালে তোর সব ভেলকিবাজি বেরিয়ে যাবে। আমার সাথে ফাজলামি করিস না।”
–“কোন ফাজলামি করছি না। আমার পরিবার নিয়ে কথা বলেছে আমি গুলি করেছি ব্যাস! আমায় বাঁচানোর দায়িত্ব আপনার!”, মোত্তাকিনের গা ছাড়া কণ্ঠে আবুবকর সিদ্দিক তেতে উঠলেন,
–“আমার ঠ্যাকা পড়েছে?”
মোত্তাকিন কপাল কুঁচকে নেয়। প্রসঙ্গ বদলে শুধায়,
–“আমার পরিবার ঠিকভাবে গ্রামে পৌঁছে দিয়েছেন? পথে কোন সমস্যা হয়েছিল?”
–“বশিরের লোকগুলো প্রায় ধরে ফেলেছিল। আমার বাহিনীর সদস্যরা দেরি করে ফেললেও সঠিক সময়ে পৌছে গিয়েছে। এবং সবকটা এখন আমার হেফাজতে আছে। আর তোর পরিবার এতক্ষণে পৌঁছে গিয়েছে বোধহয়।”, আবুবকর সিদ্দিক গম্ভীর গলায় বললেন। মোত্তাকিন নিশ্চিন্তের নিঃশ্বাস ফেলে তার থেকে রুমালটা নিয়ে বলল,
–“আমি তবে যাই এখন।”
আবুবকর সিদ্দিক কপাল কুঁচকে বিরোধী কণ্ঠে বললেন,
–“সবকিছু কি হাতের ময়লা মনে হয়? এখানে সবচেয়ে বেশি এখন তোর প্রয়োজন। অনেক স্টেটমেন্ট দিতে হবে আরোকিছু ফর্মালিটিজ আছে সেগুলো পূরণ করেই যেতে পারবি।”
–“মাফ চাই স্যার! যা ফর্মালিটিজ আর স্টেটমেন্ট আছে তা আমি পড়ে এসে দেব। আপাতত আমায় রেহাই দিন। ওদিকে একটা বেয়াদব চিন্তা করতে করতে আমার বাচ্চার দশা খারাপ করে দেবে। এমনিতেই ওর হাই প্রেশার, আমায় না দেখা অব্দি ও নিজের কোন যত্ন নেবে না। বোঝার চেষ্টা করুন।”
আবুবকর সিদ্দিকির গম্ভীর মুখে আলতো হাসি ফুটে উঠল ছেলেটির রুক্ষ কণ্ঠে ভালোবাসার ছোঁয়ায়। সতর্ক কণ্ঠে বললেন,
–“একটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন করি?”
মোত্তাকিন বাঁকা সরু নেত্রে তাকায়। চোখেমুখে বেশ বিরোধ! তবুও বলল,
–“জবাব হাসিমুখে দিতে পারব এমন প্রশ্ন করবেন। মেজাজ বিগড়ে না যায়!”
–“পুলিশের সামনে মেজাজ দেখাচ্ছিস?”
–“যা বলার তাড়াতাড়ি বলুন, মিঞা! গ্রামে যেতেও চার ঘন্টা লাগবে।”
–“ঐ যে মেয়েটাকে নারী পাচারকারীরা কিডন্যাপ করেছিল ঐ মেয়েটাই তোর বউ, তাই না?”
–“হু।”
–“বেশ ভালো মেয়ে।”, আবুবকর সিদ্দিক প্রসন্ন মনে বললেন। সে জানে সাধারণত এই ধরণের মেয়েগুলো সমাজের দারুণভাবে উপেক্ষিত হয়। সেখানে সে বুঝতে পারছে মোত্তাকিন মেয়েটিকে খুব ভালোবাসে। স্ত্রী গর্ভবতী! সবদিক ভেবে সে মোত্তাকিনের কাঁধ চাপড়ে বললেন,
–“যা, এদিকটা আমি সামলে নেব।”
মোত্তাকিন এক মুহুর্ত সময় নষ্ট করে না লম্বা লম্বা পা ফেলে বের হতে গেলে মুহিত ইরতেজা ছুটে এসে তার হাত টেনে ধরল। মোত্তাকিন ফিরে তাকায় বয়স্ক লোকটির মুখপানে। গুরুগম্ভীর শান্ত স্বরে বলল,
–“এখন আর কোন সমস্যায় পড়তে হবে না আপনাদের। বাড়ি ফিরে যান। আর সাময়িক ভোগান্তির জন্য দুঃখিত!”
সৌজন্য কথায় মুহিত ইরতেজার অন্তঃস্থলে অনুতাপ অনুভব হয়। নম্র স্বরে বলেন,
–“তোমায় ভুল বোঝার জন্য আমি দুঃখিত মোত্তাকিন। বাবাকে আর ফিরিয়ে দিও না। এবার অন্তত একটু বুকে জড়িয়ে নিতে দাও।”
মোত্তাকিন নির্নিমেষ চেয়ে বলল,
–“আপনার প্রতি আমি কোনদিন কোন বিশেষ অনুভূতি অনুভব করিনি, করতে পারিনি আর না করতে পারব। আমার থেকে এর অধিক কিছু আশা করবেন না। আসি! মায়ান আর অনু ভাবি ঠিক আছে। আমার গ্রামের বাড়িতে আছে।”
শেষের কথাগুলো সে মিরসাদের দিকে তাকিয়ে বলেই হাত ছাড়িয়ে চলে যায়। মিরসাদ কিছু বলেনা, ম্লান দেহে বুকভরা অনুতাপে নিয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে দূর্বোধ্য ছেলেটির পানে।
পারভেজ ছুটে বের হয় মোত্তাকিনের পিছু পিছু।
–“এই তুই কি করলি, কিভাবে করলি? আমার তো সব মাথার উপর দিয়ে গিয়েছে। বশিরের ঐ আঠারো জন লোক তোর উপর কোন হামলা করল না কেন?”
মোত্তাকিন সদর দরজা পর্যন্ত এসে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। শান্ত স্বরে বলে,
–“টেন্ডার বাবদ বশির ভাইয়ের থেকে নেয়া পাঁচ কোটি টাকা আমি কি করেছি?”
–“ঐ শালা মাদারবোর্ড! তা আমি জানব কি করে?”
বলতে গিয়েও পারভেজ থামল। পরপরই চমকে তাকায় মোত্তাকিনের দিকে। হড়বড়িয়ে শুধায়,
–“তারমানে তুই তাদের কিনে নিয়েছিলি?”
–“কালো টাকা সৎ পথে ব্যয় করে সাদা টাকা বানানো অপরাধ তো নয়!”, মোত্তাকিন ফিচলে হেসে বলেই বেরিয়ে যায় গেট থেকে। কিন্তু পারভেজ বের হতে পারে না, তাকে পুলিশ আঁটকে দেয় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য।
অতঃপর যতটুকু সম্মান খুইয়েছিল মুহিত ইরতেজা ঠিক তার থেকে দ্বিগুণ সম্মান আর ভালোবাসা ফিরে পায়। দীর্ঘ একটা দুঃসহনীয় দিন কাটিয়ে মুহিত ইরতেজা আর মিরসাদ স্মিত হেসে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে। বাবাকে জড়িয়ে ধরে মিরসাদ অনুতাপের সুরে বলে,
–“তুমি ঐ চমৎকার মানুষ দুটোর সাথে অনেক অন্যায় করেছ পাপা। তারা সুখের হকদার! প্লিজ তাদের কাছে ক্ষমা চেয়ে ফিরিয়ে আনো। আমি খুব করে চাই বাকি জীবনটা ঐ চমৎকার মানুষ দুটোর সান্নিধ্যে কাটাতে।”
*****
রাতের অন্ধকার কেটে গিয়ে আলো ফুটে উঠল মন্থর গতিতে। ঠিক যেমনটা মন্থর গতিতে মোত্তাকিনের অন্ধকার জীবনে আলো ফুটেছে। যেভাবে মুহিত ইরতেজার রাজনৈতিক জীবনের কালো অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে একটা নতুন প্রারাম্ভ ঘটে। সকল অশুভ শক্তির পরাজয়ের পরের মুহুর্তটা বরং অবর্ণনীয়-ই থাকুক।
টানা চার ঘন্টা হাই স্পিডে বাইক চালিয়ে মুন্সিগঞ্জে ঢুকতে ভোরের আলো ফুটে যায়। বিশাল কাঠের ঘরের প্রথম দুয়ার খুলে ঘরের ভেতর প্রথম কদম রাখতেই মোত্তাকিনের দৃষ্টি গিয়ে আটকায় সোফায় মধুমিতার বুকের মাঝে গুটিয়ে শুয়ে থাকা মায়ানের নিষ্পাপ আদল। সে স্মিত হেসে এগিয়ে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে মায়ের সামনে। হাত বাড়িয়ে মায়ানকে কোলে তুলে নিতেই মধুমিতা হকচকিয়ে উঠে চোখ খুলে তাকায়। রাতভর কামনীয় মুখটি ভেসে উঠতেই সে টলটলে নেত্রে ডেকে বলে,
–“বাবু, এসেছিস? তুই ঠিক আছিস?”
মোত্তাকিন মায়ের হাতের উপর হাত রেখে বলল,
–“ঠিক আছি, মামনি।”
–“আর দাদুভাইয়ের বাবা আর দাদু?”, মধুমিতার সতর্ক কণ্ঠে মোত্তাকিন মায়ানকে আদর করতে করতে বলল,
–“তারাও ঠিক আছে। এসে পড়বে হাতের কাজগুলো শেষ করে। ইন্দু কোথায়?”
–“সারারাত কান্নাকাটি করেছে। আমি জোড়করে উপরের ঘরে শুইয়ে দিয়ে এসেছি আধা ঘন্টা আগে। যা তুই, গিয়ে শান্ত কর।”
মোত্তাকিন মাথা নেড়ে মায়ানকে রেখে উপরে চলে যায়। পাটাতনের ঘরের কাঠোর মেঝেতে পেতে রাখা গদিতে প্রভাতের কুয়াশামাখা আবছা আলোয় স্ফিত সুস্বাস্থ্য দেহটিকে এক কাতে শুয়ে থাকতে দেখতেই মোত্তাকিন স্মিত হাসল। অলস, শ্রান্ত দেহে ধীরপায়ে গিয়ে মেয়েটির পাশে শুয়ে পড়ল। এবং বহু মাসের অভ্যাস অনুযায়ী মেয়েটির গালের উপর নিজের গাল রেখে শুয়ে পড়ে।
মসৃণ নরম গালে রুক্ষ দাঁড়িযুক্ত স্পর্শ অনুভব হতেই ইন্দুবালা চোখ খুলে তাকায়। এক মিনিট দু মিনিট নীরবতার সাথে কাটলেও ঠিক তিন মিনিটের মাথায় ইন্দুবালা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে ঘুরে একপ্রকার আঁছড়ে পড়ে প্রশস্ত বক্ষমাঝে। মোত্তাকিন চেঁচিয়ে উঠল সতর্কতার সাথে ভারী দেহটিকে আগলে ধরে।
–“ওয়ে বেকুব, তুই এমনভাবে ঝাঁপ দিলি কোন সাহসে? তুই কি ভুলে গিয়েছিস তুই একা না! এখন যদি কিছু হয়ে যেত?”
ইন্দুবালা জবাব দেয়ার পরিস্থিতিতে থাকে না। সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে আর অস্থিরচিত্তে ছুঁয়ে দিচ্ছে ছেলেটিকে। চোখমুখ ভরিয়ে দিচ্ছে অস্থির স্পর্শে। অনুনয় করে বলে,
–“প্লিজ মোত্তাকিন আমায় কথা দে। আর কোনদিন এভাবে আমায় কারোর ভরসায় একা ফেলে কোথাও যাবি না। আমি তোকে হারাতে ভীষণ ভয় পাই। যদি হারাতে হয় আমায় মেরে তারপর হারিয়ে যাস কিন্তু আমার চোখের সামনে হারিয়ে যাস না প্লিজ!”
মোত্তাকিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেয়েটির মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
–“আর কখনো তোকে রেখে কোথাও যাব না। এবার আমরা একটু সুন্দর, শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন করব। যেখানে আমাদের একটা সুন্দর ঘর থাকবে, একটা সুখের সংসার থাকবে আর সেই ঘর এবং সংসারের ছোট একটা মালিক থাকবে। যাকে আমরা দুজন একসাথে বড় করব পৃথিবীর সব সুখ লুটিয়ে দেব তার পায়ে। তার জীবনের প্রতিটা বিশেষ দিনে আমি আর তুই তার সাথে থাকব, ঠিক আছে?”
–“একদম ঠিক আছে।”, ইন্দুবালা উপচেপড়া কান্না আঁটকে জবাব দিলো। মোত্তাকিন হেসে তার কপালে শব্দ করে একটা চুমু দিয়ে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে নিলো।
ভোর হলো, বেলা গড়ালো ইন্দুবালার মতো অনাথ অনুর পৃথিবীও সুস্থসবল ফিরে আসে তার কাছে। অনু ছেলেকে নিয়ে আঁছড়ে পড়ে মিরসাদের বুকে। মধুমিতা যখন টলটলে নেত্রে সেই দৃশ্য দেখতে মগ্ন ঠিক তখনি কেউ এগিয়ে এসে তার পায়ে কাছে কেউ হাঁটু ভেঙে বসে পড়ে। হকচকালো মধুমিতা। শাড়ির আঁচল আঁকড়ে ধরে পিছিয়ে যেতে নিলে মুহিত ইরতেজা তার দু’হাত ধরে আঁটকে দেয়। অশ্রুসিক্ত নয়নে তুলে অনুনয় করে বলে,
–“তোমার পায়ে পড়ছি মধু, ক্ষমা করে দাও। আমি তোমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অনুভূতি ছলের মাধ্যমে ছিনিয়ে নিয়েছি আমায় ক্ষমা করে দাও। কিন্তু দয়াকরে আমায় ফিরিয়ে দিও না। আমি নয়তো মরেও শান্তি পাব না মধু।”
মধুমিতা টলটলে নেত্রে দৃষ্টি অন্যত্র রেখে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে কিচ্ছুটি বলে না। ইন্দুবালা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাকায় মোত্তাকিনের দিকে। যে কি-না ইশারায় পাত্তা দিতে বারণ করছে। বুড়ো বুড়ি যা করে বেড়াক তা দিয়ে তার কোন মাথাব্যথা নেই।
পরিশিষ্টঃ
প্রভাতের কিরন ফুটেছে বহুক্ষণ। মিঠা রোদ অচিরেই নিজের শীতলতা খুইয়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে মন্থর গতিতে। অথচ মোত্তাকিন তখনো বিছানায় ঝিমাচ্ছে। একটু নড়তেই কোমড় ব্যথায় মড়মড় করে উঠল। সে ব্যথায় দাঁতে দাঁত চেপে বুকের উপর তাকিয়ে বলল,
–“ওরে রাজাকারের দল ওঠ বলছি! সকাল আটটা বাজে। স্কুলে যেতে হবে না? আমার পিঠ কোমড় ব্যথায় চিরবির করছে। সারাদিন উড়ে বেড়ায় আমায় চেনে না, আর রাতে হলে আমার বুকে ঘাপটি মারে।”
লাগাতার তিরস্কারে বুকের বাম পাশে বেঘোরে ঘুমানো ইন্দুবালার ঘুমে বেজায় বিঘ্ন ঘটে। সে বিরক্তি মিশ্রিত শব্দ করে এক গড়াগড়ি দিয়ে বুক থেকে নেমে যায়। মোত্তাকিন সেদিকে বাঁকা চোখে চেয়ে বলে,
–“স্কুলে যাবি না?”
–“আজ শুক্রবার!”, ইন্দুবালার অলস কণ্ঠ।
দেহের উপর একটু ভর কমতেই মোত্তাকিন নড়েচড়ে উঠল। মাথা নুইয়ে দৃষ্টি রাখে ঠিক নিজের বক্ষের ডানপাশে গাল দাবিয়ে শুয়ে থাকা ফর্সা ধবধবে লালচে আভা যুক্ত ছোট্ট আদলের পানে। সে তিরস্কারের সুরে বিদ্রুপ করে বলল,
–“এই ইন্দু’র বাচ্চা ছোট ইঁদুর ওঠ, সকাল হয়েছে। সারাদিন ম্যা ম্যা করে রাতে বাপের বুকে ঘাপটি মেরে ঘুমাও লজ্জা করে না?”
বেশ উচ্চস্বরে বলা কথাটিতে ছোট্ট আদলটি নড়চড়ে উঠল। মোত্তাকিন এবার খেকিয়ে উঠল,
–“কি হলো মশাই, উঠছেন না কেন?”
সহসা ভেসে আসল অস্ফুট বাচ্চা বাচ্চা চিকন বিরক্তি মিশ্রিত কণ্ঠ।
–“ওহ্ পাপা! ইত’স ভেলি ব্যাড। ডুন্ট ডিসটাব!”
আড়াই বছরের ছোট্ট ছেলের বিরক্তি মিশ্রিত কণ্ঠে মোত্তাকিন দাঁত খিচে বলল,
–“ব্রিটিশদের ফেলে যাওয়া আপদ! এই পাপা ডাক তোকে শিখিয়েছে কোন বেকুব? এর জন্যই তোর বাপের প্রতি টান কম। তুই হলি পিওর বাঙ্গালী জাতি। আব্বা ডাকবি, আব্বা! আর যেন না শুনি এই সব পাপা। বল আব্বা!”
বাবার লাগাতার বিরক্তিকর উৎপীড়নে অবশেষে মিশালের না ভাঙতে চাওয়া ঘুম ভাঙতেই হয়। বাবার বুকে গাল দাবিয়ে সে পিটপিট করে তাকায় বাবার মুখপানে। জড়নো কণ্ঠে ডেকে ওঠে,
–“পাপা!”
মোত্তাকিনের অর্ধেক তেজ কমে যায় সেই মিষ্টি ডাকে। তবুও হার না মানা পথিকের ন্যায় গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
–“কোন পাপা টাপা চলবে না। বল আব্বা!”
বাবা কি ত্যাড়া তার থেকে দ্বিগুণ ত্যাড়া মিশাল একই রকম গম্ভীর গলায় বলল,
–“পাপা।”
মোত্তাকিন দাঁত কিড়মিড় করে তাকায় সদ্য বিছানা থেকে নামা ইন্দুবালার দিকে। হ্যাঁ, দীর্ঘ অপেক্ষা, বাচ্চা ও কালো হবে এমন অজস্র কটুক্তি উপেক্ষা করে তার কোলজুড়ে এমন স্বর্গীয় সৌন্দর্য নিয়ে একটা ছেলে সন্তান আসে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো সৌন্দর্যে মোড়ানো বাচ্চা ছেলেটি মা বলতে উন্মাদ। তবে রাতটুকু তার বাবার বুকে কাটাতে হয় এটা সেই জন্মের পর থেকেই অভ্যাস। এই অভ্যাসে কখনো বিঘ্ন ঘটতে পারে না। যদি ঘটে তবে বাড়ির সকলকে সেই রাতের ঘুম বিসর্জন দিতে হবে। তাই এই ঝুঁকি মোত্তাকিন কখনো নেয় না। ছেলের জেদের কাছে হার মেনে রোজ রাতে তাকে বুকে জড়িয়ে ঘুম পাড়াতে হয় এবং বুকেই ঘুমাতে দিতে হয়।
–“এই ত্যাড়া ব্রিটিশের বাচ্চা আসল কোত্থেকে? না আছে বাপের প্রতি টান আর না আছে জাতির প্রতি।”
মোত্তাকিনের কথায় ইন্দুবালা হাত খোপা করতে করতে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। থমথমে মুখে বলল,
–“নিজের বাচ্চাকে এইসব উদ্ভট নামে ডাকিস লজ্জা করে না তোর?”
–“হাহ্! আমার বাচ্চা? কে বলবে এটা আমার বাচ্চা? সারাদিন মায়ের আঁচল ধরে ম্যা ম্যা করে বেড়ানো ইন্দু’র বাচ্চা এটা। যত ভালোবাসা, দরদ সব মায়ের জন্য। সারাদিনে তো বাপকে একবার মনেও পড়ে না। দিনের আলো ফোঁটা পর্যন্ত বাপ আপন এরপর আর বাপকে চেনে না। ও কি জানে ওকে আনতে আমার অবদান কতো?”, মোত্তাকিনের ক্ষোভে ভরা কণ্ঠ। আসলেই ছেলেটার তার প্রতি আগ্রহ কম। তার যত আগ্রহ, কৌতুহল, গল্প সব মা জুড়ে। সে ছেলের আদর পায় ঐ রাতের কিছু প্রহরে। এই ক্ষোভ নিয়েই মা ছেলের পেছনে সর্বদা লেগে থাকে সে।
তবে আজ এই নিয়মে খানিক বিঘ্ন ঘটল। ঘুম থেকে উঠেই মিশাল বাবার বুক থেকে নেমে যায় না বরং ঘাড়ে মাথা গুঁজে শুয়ে থাকে। মোত্তাকিন তাকে বুকে জড়িয়েই বিছানা ছেড়ে নামে।
–“কি হলো জনাব? মায়ের কাছে যাবেন না?”
–“নো পাপা!”
–“আব্বা বল।”
–“ইউ আল ছো নটি, পাপা।”, মিশাল ঘাড় থেকে মাথা তুলে তাকায় বাবার কুঁচকানো মুখপানে। মুখ ধুতে যাবে মোত্তাকিন।
–“বাথরুমে যাব এখন কি সেখানেও নিয়ে যাব?”
–“উখে।”, মিশাল বাধ্যগত ছেলের ন্যায় সায় জানায়। মোত্তাকিন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। ছেলে এত বাধ্যগত হলো কি করে? এ তো আস্ত এক ত্যাড়া!
ইন্দুবালা মৃদু হেসে বেরিয়ে যায় কক্ষ থেকে। অগত্যা মোত্তাকিন ছেলেকে নিয়ে ওয়াশরুমে যায়। নিজেও ফ্রেশ হয় ছেলেকেও ফ্রেশ করায়।
বাথরুম থেকে বের হয়ে ছেলেকে মুছিয়ে পোশাক বদলে দেয় মোত্তাকিন। মিশাল হাসিমুখে তাকিয়ে রইল বাবার দিকে। মোত্তাকিন ভ্রু নাচিয়ে শুধায়,
–“কি হলো জনাব, হাসছেন কেন?”
–“আই লাভ ইউ পাপা।”
অনাকাঙ্ক্ষিত স্বীকারোক্তিতে মোত্তাকিনের কুঁচকানো মুখশ্রী মসৃণ হয়। প্যান্ট পড়াতে পড়াতে মৃদু হেসে বলে,
–“ভালোবাসেন? তো বাবাকে একটু আদর করে দিন তো!”
মোত্তাকিন গাল এগিয়ে দিলো। মিশাল হাসিমুখে বাবার গালে তৎক্ষণাৎ ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলো। তাতে অবাক মোত্তাকিন ছেলেকে কোলে তুলে নিয়ে শুধায়,
–“কি হলো আব্বা, হঠাৎ এত ভালোবাসা কেন দেখাচ্ছেন?”
মিশাল জবাব দেয় না দু’হাতে বাবার গলা জড়িয়ে ধরে বসে থাকে। বিশালাকৃতির অট্টালিকার বিশাল কক্ষ থেকে মোত্তাকিন লম্বা লম্বা পা ফেলে বের হতে হতে মোত্তাকিন হাঁক ছেড়ে ডাকল,
–“এই ইন্দু কোথায় তুই?”
–“আমাল মামনিকে পচা কতা বলবে না।”, মিশাল চেঁচিয়ে উঠল রাগে।
মিশাল তুই তোকারি পছন্দ করে না অথচ মোত্তাকিন সেটাই বেশি করে। তবে মিশাল বড় হওয়ায় মোত্তাকিন আর ইন্দুবালা দু’জন ই চেষ্টা করছে একে অপরকে তুমি করে বলার।
মোত্তাকিন জিভে কামড় দিয়ে দাঁত কেলিয়ে হেসে বলল,
–“ওগো শুনছো, কোথায় তুমি।”
–“হ্যা, গো শুনছি বলুন।”
ঘরের বাইরে থেকে আওয়াজ শোনাযায়। মোত্তাকিন লম্বা লম্বা কদমে কক্ষ থেকে বের হতেই দৃষ্টি শীতল হয়ে আসল। পা দুটো গতি হারায় কড়িডরে বিশালাকৃতির একটা কেক সমেত দাঁড়িয়ে থাকা নিজের ভরা পরিবার দেখে।
এক ভিন্ন প্ররাম্ভের কারণ বুঝে সে ছেলের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। মিশাল গাল ভরে হেসে বলল,
–“হ্যাপি বাদদে, পাপা।”
মোত্তকিন স্মিত হেসে ছেলের গালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে বলল,
–“ধন্যবাদ, আব্বা। তা আপনি কি এর জন্যই আজ বাবাকে এত ভালোবাসছেন?”
মিশাল মাথা নেড়ে সায় জানায়। ফলস্বরূপ মোত্তাকিন ক্ষেপে যায়। সম্মুখে পরিবার রূপে দাঁড়িয়ে থাকা মা, বাবা, ভাই, ভাইয়ের স্ত্রী-সন্তান আর নিজের স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে অভিযোগের সুরে বলল,
–“দেখেছো? কত বড় রাজাকার? আমার খেয়ে পড়ে আমার বুকে ঘুমিয়ে সে মায়ের একনিষ্ঠ ভক্ত।”
মুহিত ইরতেজা আর মিরসাদ হো হো করে হেসে উঠল। সাড়ে চার বছরের মায়ান সেই অনাচার অনুভব করে বলল,
–“চাচু, আমি তোমাকে ভালোবাসি তো।”
–“তুই-ই আমার আসল ভালোবাসা, বাপ! আয় বুকে আয়। আর এই নে ইন্দু, তোর আপদ তুই নে।”, মোত্তাকিন রেগে গিয়ে বলল।
মিশাল এখন মোটেই যাবে না মায়ের কোলে। তাই সে দাঁত খিটমিট করে শক্ত করে বাবার কোলে চেপে বসে। মোত্তাকিন ছাড়ে না ছেলেকে। বুকে জড়িয়েই এগিয়ে যায়। কপাল কুঁচকে বলল,
–“এসব কি বাচ্চাদের মতো কেক এনেছ তোমরা?”
–“কতদিন হলো কোন বিশেষ দিন উদযাপন করি না? এসো কেক কাটো!”, মিরসাদ ছুড়ি এগিয়ে দিয়ে বলল। মোত্তাকিন স্মিত হেসে ছেলের হাতে ছুড়ি ধরিয়ে কেক কাটতে নিলে অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা স্ত্রীর হাসিমাখা মুখের দিকে তাকায়। ইশারা করে বলে,
–“এখানে আয়।”
সরব মধুমিতা ছেলের মাথায় চাটি মেরে বলল,
–“আয় কি? বল আসো।”
মোত্তাকিন চাটি খেয়ে দাঁত কিড়মিড় করে চাপা স্বরে ব্যঙ্গ করে বলল,
–“ওগো, এদিকে এসো। দয়াকরে কেকটা আমার সাথে কাটো।”
অনু ফিক করে হেসে উঠল সেই ব্যঙ্গ শুনে। ইন্দুবালা দীর্ঘশ্বাস ফেলে এগিয়ে যায়। স্বামী সন্তানের সাথে মিলে কেক কাকে। অতঃপর ভরা পরিবার মিলে একটা সুন্দর, হাসিমাখা প্রভাত উপভোগ করে। ভরা পরিবার! যেই পরিবারে এখন মোত্তাকিনের বাবা মা, ভাই, তার স্ত্রী সন্তান থেকে শুরু করে নিজের ছোট্ট পরিবারটাও রয়েছে। ফেলে আসা সেই বিদঘুটে দিনগুলোর পরে তারা সবাই একে অপরকে ক্ষমা করতে শিখেছে, কম্প্রোমাইজ করতে শিখেছে, ভালোবাসতে শিখেছে, রাজনীতি ছেড়ে তিন বাপ ছেলে মিলে নিজেদেরকে পরিশ্রম দ্বারা সফলতার এক অন্য শিখরে দাঁড় করিয়েছে। যেখানে নেই কোন পিছুটান, শত্রু, দূর্নীতির ছোঁয়া, নেই কোন দৈহিক বর্ণের তারতম্য!সেদিন মুহিত ইরতেজাকে আর ফিরিয়ে দেয়নি মধুমিতা। শেষ বয়সে এসে তারা সকলে মিলে একটা পরিপূর্ণ সুখী পরিবার গড়েছে। শেষটা এমনি ছিল—একটু প্রেমময়, একটু বর্ণহীন।
______________________সমাপ্ত___________________

