ধূপছায়া #নূপুর_ইসলাম #পর্ব_ ১৩

0
2

#ধূপছায়া
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_ ১৩

সারেং বাড়ির অবস্থা থমথমে। এতো বড় বাড়ি, এতো মানুষজন তবুও পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ। এই নিস্তব্ধতাকে ঘিরে শুধু আম্বিয়ার পানের পাতায় পান ছেঁচার শব্দ বিরাজ করছে। এই বিরাজের মাঝে বীণা চোখ মুখ কালো করে চুপচাপ দাদির পাশে বসে আছে। চুপচাপ বসলেও ফরহাদের ভাষায় ওড়না আঙুলের ঘূর্ণিঝড় ঠিক চলছে। মেয়েটা আসলেই একদম চুপচাপ বসতে পারে না। সেই ঘূর্ণিঝড়ের সাথে আছে মনের অস্থিরতা। ছোট ভাই বিয়ে করেছে আয়না বুবুকে, সে আছে ইমরান ভাইয়ের ঘরে। তার ধ্যান, জ্ঞান এখন সব ওখানে। যাওয়ার জন্য মন আঁকুপাঁকুও করছে।

তখনই এরশাদ ভেতরে এলো। এতো কিছুর মাঝে সে একদম স্বাভাবিক। এতোক্ষণ কোথায় ছিল কে জানে? ছোট ভাইয়ের বিয়ে নিয়ে তাকে তেমন বিচলিত মনে হলো না। তাই তখন প্রিয় চাচাকে চলে যেতে দেখে সব সময়ের মতো হাসলো! সরলতার হাসি। হেসে বললো, — মাথার উপরে বাপ না থাক, চাচা তো আছে। একটু শক্তও তো হতে পারো। বুড়ি বলেছে, দৌড়ে বেরিয়ে যাচ্ছো। বাহানা খুঁজো শুধু না, সারেং বাড়ি থেকে পালানোর?

জাফরও তার মতো শান্ত ভাবে বললো, — তোর প্রিয় দাদি, কিছু বললে তো আবার গায়ে ফোসকা পড়ে। তাই দূরেই থাকি। যান আপনারা, দাদি নাতিরা মিলে গলাগলি ধরে সারেং বাড়িতে বসে থাকেন। আমাকে কি দরকার?

— তোমাকে না থাক, সম্পতির আছে। যাবে যখন পাকাপোক্ত ভাবে লিখে দিয়ে যাও। বলতে বলতেই পৃথিলার দিকে একবার তাকালো! সে আয়নার কাছে এগিয়ে গেছে। চোখ, মুখ থমথমে। সেই থমথমে মুখটাও এরশাদের কাছে যেন অন্যরকম লাগলো।

তাই সাথে সাথেই চোখ ফিরিয়ে আগের মতোই বললো, — পরে দেখা যাবে কোথাকার কোন বাড়ির ছেলে এসে নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরাচ্ছে । তাই ঝামেলা আজ’ই দফারফা হোক।

জাফর এরশাদের কথা বুঝলো! বুঝলো বলেই হালকা হাসলো। এরশাদ সেই হাসির দিকে তাকিয়ে বললো, — সারেং বাড়ির গেট যেন মাড়াতে না দেখি । নানির বাড়ি পরে বেড়ালেও চলবে ।

— আমি আয়নাকে ছাড়া ভেতরে যাবো না। সে আমার দায়িত্ব।

— যাওয়ার দরকার নেই। এতো সুন্দর পূর্ণিমা রাত। বারান্দায় বসে বসে চাঁদ দেখো। বলেই ফরহাদের দিকে তাকালো।

আর ফরহাদ, সে তো ফরহাদ ‘ই। মেজাজ উঠে আছে তুঙ্গে। চোখ, মুখ কুঁচানো। এরশাদ তাকাতেই গাড়ি থেকে নেমে যেতে যেতে বললো, — আর একটা কিছু যদি আমাকে বলেছিন। ঘুসি মেরে তোর থুবড়ানো চেহেরা আরো থুবড়ে দেবো। শালার, ঘরের শালা। দুই ভাই মিলে জীবনটা তেজপাতা করে দিচ্ছে।

— বয়স মানিস না, সম্পর্ক মানিস না। মাস্টারি করিস সেটার তো একটু লেহাজ কর। তোর কাছ থেকে ছেলে মেয়েরা শিখবে কি?

— তোর বেল মাথা, বলেই ফরহাদ অন্ধকারে মিশে গেলো। এরশাদ আবারো হাসলো! হেসে পৃথিলার দিকে আবার তাকালো! তাকিয়ে তার স্বভাব মতো শান্ত মার্জিত ভাবে বলেছে, — সাবিহা কে নিয়ে একটু কষ্ট করে আয়নাকে ওখানে নিয়ে যান। বাকিটুকু আমি দেখছি।

পৃথিলার থমথমে চোখ মুখ ততক্ষণে শক্ত, শান্ত । অতিরিক্ত কষ্ট বা অতিরিক্ত আবেগের কোন কিছু দেখে সব মেয়েদের মতো তার চোখে পানি আসে না, চিৎকার চেঁচামেচিও করতে পারে না। ব্যস, বরফের মতো শক্ত, শান্ত হয়ে যায়। আর এই যে চোখের সামনে ফুলের মতো মেয়েটা, বয়স কতো হবে সে জানে না, হয়তো তার ছোট বোনের মতোই। যার ফর্সা গালে পাঁচ আঙুলের দাগে রক্ত জমাট বেঁধে আছে। আর এই জমাট বাঁধা রক্ত যেন তার ভেতর ছুঁয়ে গেলো।

তবুও পৃথিলা এরশাদের কথার বিপরীতে একটা শব্দও উচ্চারণ করলো না। সে ভালো করেই জানে, এই সময় ঠিক না। কেননা, এই সময়’ই ঠিক করবে এই মেয়েটার ভবিষ্যৎ। অথচ একটি বারও এই মেয়েটাকে কিচ্ছু জিজ্ঞেস করা হবে না। অথচ ভালো হোক মন্দ সব ভুগতে হবে মেয়েটাকেই।

এই হলো জীবন! এই জীবনে নিজে থেকে কিছুই করতে নেই। মন মতো করতে যাবে, ভাগ্য তার নিজের মতো নিজ দায়িত্বে গালে পাঁচ আঙুল বসিয়ে দেবে। আর না হলে এই যে অসম্ভব সুন্দর নিষ্পাপ মেয়েটার, এর মতো সমাজের মানুষগুলো দেবে, ভালো ভাবেই দেবে। আর সর্বশেষে সব দোষ, কলঙ্ক তাদের’ই। সেটা নিজের ইচ্ছায় হোক অন্যের।

মনের উষ্ম মনে রেখেই পৃথিলা শান্ত চোখে এরশাদের দিকে একবার তাকালো। শুধু একবার! তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে আয়নার গায়ে হাত রাখলো।

আর এই শান্ত চোখের এক পলক। এই এক পলকে এরশাদ মাত হলো। কেননা এই এক পলকেই দেখলো, ঐ শান্ত চোখে জ্বলন্ত আগুন, দেখল তাদের প্রতি ঘৃণা। দেখলো পরিচয় না জানা বাবার জন্য ঘৃণা, ভালোবেসে আগলে রেখে, সেই ভালোবাসা দিয়েই গলা চেপে ধরা মায়ের জন্য ঘৃণা, বিশ্বাস হত্যা করা এক ভালোবাসার মানুষের জন্য ঘৃণা। আর এই যে মান – সম্মান, পাপের দোহাই দিয়ে একের পর এক অন্যায় করে যাওয়া, এই সমাজের উপর ঘৃণা।

আর দেখলো বলেই এরশাদ এবার চোখ ফিরিয়ে নিলো না। তার জ্বলজ্বল করা চোখে এক ধ্যানে তাকিয়ে রইল। মন বললো, — ” আর একবার তাকাক, একবার।” তবে মনের এই ডাক ঐ যে ক্ষত বিক্ষত হওয়া হৃদয়। সেই হৃদয় পর্যন্ত পৌঁছায় না। পৌঁছায় না বলেই দুটো চোখ আর এই পূর্ণিমা সন্ধ্যায় এক হয় না।

জয়তুন সব সময়ের মতো আঙুলের ডগায় পান নিয়ে মুখে পুরলো। বীণা ভেবেছিল এরশাদ ভাই ভেতরে এসে দাদির পাশে বসবে, তাকে বোঝাবে। তবে সেই রকম কিছু’ই দেখা গেলো না। সে তার ন্যাড়া মাথা ঘষতে ঘষতে উপরে নিজের রুমের দিকে গেলো।

যেতেই বীনা আশা নিয়ে দরজার দিকে তাকালো। ছোট ভাইয়ের খবর নেই। সেটা সমস্যা না । তার এমনিতেও খোঁজ খবর থাকে না। তবে ছোট চাচা আসছে না কেন? কোথায় গেলো? সত্যিই চলে যাই নি তো? তার গলা শুকিয়ে এলো। শুকনো মুখেই বললো, — আম্বিয়াবু ছোট চাচা ভেতরে আসছে না কেন?

আম্বিয়া পা ছড়িয়ে বসলো! জ্বালা যন্ত্রনা আর ভালো লাগে না। ভালো না লাগলেও মেজাজ অবশ্য ফুরফুরে। সেই ফুরফুরে মেজাজে’ই বললো, — বাড়ির বউ ঘরে না ঢোকা পর্যন্ত সে ঢুকবে না। বারান্দায় ঘাঁটি গেড়েছে। যার বউ তার খবর নাই, পাড়া পড়শির ঘুম নাই।

বীণা অসহায় চোখে দাদির দিকে তাকালো! জয়তুনের হাবভাবও এরশাদের মতো। স্বাভাবিক!

বীণা ঝট করে উঠে বাইরের দিকে গেলো। তার চোখে পানি চলে এসেছে। বাবা- মাকে চোখের দেখা, আদর তো দূর, দুনিয়ায় আগমনের কিছুদিনের মাথায়’ই সব হারিয়েছে। মা বলতে বুঝে দাদি, বাবা বলতে বুঝে এই ছোট চাচাকে। আর এদের মাঝের ঝামেলায় তার বুক পুড়ে ছারখার।

জাফর কাঠের ইজিচেয়ারে আধশোয়া। সারেং বাড়ির বাহিরের খোলা লম্বা টানা বারান্দার এক সাইডে। আকাশে থালার মতো মস্ত বড় একটা চাঁদ। সেই চাঁদের আলোয় সারেং বাড়ির উঠান ঝিলমিল করছে। তার দৃষ্টি অবশ্য সেই ঝিলমিল করা উঠানে না। তার দৃষ্টি ও যে বাড়ির দক্ষিন কোণে হাফ বিল্ডিং সেখানে। গাছ গাছালির জন্য অবশ্য কিছুই দেখা যায় না। তবুও, দেখতে ভালো লাগে। যেখানে তার হৃদয়ের এক টুকরো গত দুদিন ধরে আছে। ইমরান কে বলে কিছু কিছু জিনিস ঠিক করতে হবে। শহরে বেড়ে উঠা মেয়ে। বাথরুম, গোসলখানা তো সব দূরে। রাত, বিরাতে নিশ্চয়’ই কষ্ট হয়।

তখনি বীণা এসে মোড়া পেতে বসলো। পাশ ঘেঁষে! সে ঠিক করেছে ছোট চাচা যতক্ষণ বাহিরে, সেও ততক্ষণ থাকবে।

জাফর হাসলো! হেসে বীণার দিকে তাকিয়ে বললো, — কেঁদেছিলি নাকি?

— উঁহুম!

— তাহলে নাক টানছিন কেন?

— ঠান্ডা লাগবে।

— মেয়েদের এতো অল্পকে কাঁদতে হয় না।

— অল্পতে মেয়েরাই কাঁদে। ছেলে মানুষ কাঁদে নাকি?

— সব মেয়েরা অল্পতে কাঁদে না।

— বলছে তোমাকে।

জাফর আবারো হাসলো! হেসে বললো — তোদের স্কুলের নতুন মেডাম, ঐ যে যার নাম পৃথিলা! লেখাপড়া শিখে বড় হয়ে তার মতো হবি।

— কেন?

— কিছুদিন যাক, তাহলেই বুঝতে পারবি।

— তুমি তাকে কতোদিন ধরে চেনো?

জাফর উত্তর দিলো না। সে তাকালো আকাশের থালার মতে চাঁদের দিকে। তখনি সারেং বাড়ির দরজা খোলার শব্দ হলো। জাফর ভ্রু কুঁচকেই তাকালো। তাকালো বীণাও! তাদের তাকানোর মাঝেই সাদা আলখেল্লা পরনে থলথলে শরীর নিয়ে আলাউদ্দিন ফকির এসে দাঁড়ালো। তার হাতে মোটা একটা লাঠি। এই লাঠি তার হাতে সব সময়’ই থাকে। লম্বা চুলগুলো ঘাড় ছুঁয়েছে। জাফর মনে মনে হাসলো। জয়তুন চলে ডালে ডালে তার নাতিরা চলে পাতায় পাতায়। বলেই চোখ বন্ধ করলো। করতে করতে বললো, — ভেতরে যা, মশা ধরবে তো।

বীণা ইজিচেয়ারের হাতলে মাথা রাখলো! রেখে বললো, — তোমার সাথে যাবো।

জাফর চোখ বন্ধ করে আগের মতোই হাসলো। হেসে মমতা মাখা স্নেহের একটা হাত বীণার মাথায় রাখলো। রাখতেই চোখের কোণ ঘেঁষে এক ফোঁটা পানি নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়লো। এই গড়িয়ে পড়া বাবা নামক এক সত্তার। যেই সত্তা ভালো করেই জানে, তার ঔরসজাত সন্তানের মাথায় এই হাত কখনোও রাখা হবে না। আহা ! এই চেয়ে বড় শাস্তি দুনিয়ার কোথাও কি আর আছে?

আলাউদ্দিন ফকির সারেং বাড়িতে এলো অনেক দিন পরে। তিন চার গ্রামে তার খুব নাম ডাক। তাই এখানে ওখানে থাকতে হয় দৌড়ের উপরে । বয়স হয়েছে তার মধ্যে ধরেছে বাতে। এই বাত নিয়ে এতো দৌড়ঝাঁপ শরীরে আর হজম হয় না।

তবুও যেতে হয়, মানুষ এসে হাতে পায়ে ধরে। নিষেধও করতে পারে না। এই যে গত এক সপ্তাহ সে গায়েই ছিল না। এক ছেলেকে সাপে কেটছে, তাই গেলো। সেখান থেকে গেলো আরেক গ্রামে। এমন তার দিন, সপ্তাহ ঘুরতেই থাকে।

সে তার বাড়িতে ফিরেছে কাল রাতে। রাতে ফিরে’ই সব খবর তার কানে এলো। অবাক অবশ্য খুব একটা হয় নি। এটা ভাগ্যের লিখন ছিল। সে সাধারণ মানুষ হয়ে ভাগ্য বাদলাতে চেয়েছিল। তাই তো অতি তাড়াতাড়ি আয়না আর এরশাদের তিথি এক করতে চেয়েছিল। যদি এক হতো সব কিছু ঠিক হতো, সুন্দর হতো। সারেং বাড়ি উপর থেকে বালা মুসিবতের কালো ছায়া ঠিক কেটে যেতো।

তবে ভাগ্য লিখে স্বয়ং আল্লাহ। তার লেখা খন্ডানোর ক্ষমতা কি আর তার আছে? তাই দীর্ঘশ্বাস ফেলেই বসার ঘরে পা রাখলো। রেখে সব সময়ের অমায়িক হাসি হেসে তার মিষ্টি সুরে বললো, — আমার সখীর মেজাজ কেমন, আসবো না চলে যাবো?

জয়তুন নির্বিকার, নির্বিকার ভাবে বললো, — সখীর কাছে আইলো আহো, জিজ্ঞেস করার তো কিছু নাই। তবে অন্য কোন কারণে আইলে আগেই ভাগো।

আলাউদ্দিন হাসলো! হেসে এগিয়ে জয়তুনের সামনের চেয়ারে বসলো। বসতেই জয়তুন হাঁক ছেড়ে বললো,– এই কে আছিস? আলাউদ্দিনের জন্য কাগজি লেবুর শরবত আন।

— শরবত! কথা তো মিষ্টি মুখের। বাড়িতে প্রথম নাত বউ আইলো।

— কোথায় আইলো?

— বাড়ির চৌকাঠ পেরুলেই বাড়িতে আসা হয় না রে সখী। আসা যাওয়া হয় সম্পর্কে। এই মেয়ে পৃথিবীর যেই প্রান্তেই এখন যাক। সে সারেং বাড়ির ছোট নাত বউ।

জয়তুন ভ্রু কুঁচকে তাকালো! তারপর থু করে পানের পিক ঘরের ভেতরেই ফেললো। আলাউদ্দিন হাসলো! হেসে আম্বিয়ার দিকে তাকিয়ে বললো, — আম্বিয়া, আমি লেবুর শরবত খাইবো না। যাও আখের গুড়ের তৈরি করতে বলো।

আম্বিয়া আঁচল ঝাড়তে ঝাড়তে বিরক্ত মুখে উঠে দাঁড়ালো। যেতে বলেছে এর জন্য বিরক্ত না। বিরক্ত এই দুই বুইড়া, বুইড়ি কি গুটুরগু করে কে জানে। তখন কাউকেই রাখে না। সে অবশ্য চাইলেই কান পাততে পারে। তবে ফকির মানুষ! একবার বুঝে গিয়ে কি না কি করে ফেলে। তাই খুব করে নিজেকে দমায়। অবশ্য দমানের আরেক কারণ আছে। যাই করুক তাকে ছাড়া তো জয়তুনের উপায় নাই। তাই আগে পরে সব জানবেই।

আম্বিয়া যেতেই আলাউদ্দিন বললো, — এই মেয়ে কিন্তু সত্যিই সোনা কপালি। তাই তার সোনা কপালের রংয়ে এরশাদের দোষ কাটাতে চেয়েছিলাম। তবে ভাগ্য তো ভাগ্যই।

— আমার এরশাদের আবার কোন দোষ?
— তার দোষ হবে সে নিজে।

— তোর ফকিরগিরি গ্রামের মানুষের জন্য রাখ। আমি ওসব মানি টানি না। এই মেয়ে সারেং বাড়ির বউ হইবো, বউ হইবো। হইলো বউ। তোর কালমুখে বের হইছে বলেই, মুখপুড়ি নিজের মুখও পুড়ছে সাথে আমার শাহবাজেরও পুড়ছে।

— সেটা তোর আর তোর নাতির জেদের জন্য পুড়ছে।

— হ এখন সব দোষ আমার। কে জানি এই কালমুখির খবর আনছিলো।

— আমি’ই এনেছি। তবে কি বলেছিলাম? সেই রাত এরশাদের জন্য কাল রাত। সেই রাতেই তার মুসিবতের ছায়া তার উপরে পড়বে। তাই রাতের আগে বিয়ে সম্পূর্ণ হওয়া চাই। সূর্য ডোববার আগে চাই। তাই বললাম দুজন গিয়ে আগে বিয়েটা পড়াও। তা না বর যাত্রী, হামবাম ছাড়া সারেং বাড়ির নাতির বিয়ে হবে নাকি? এখন যেতে যেতে মেয়েই ফুরুৎ। তা হয়েছে, হয়েছে। সূর্য ডুবে গেছে কাহিনী খতম। তা না আরেক নাতিরে দিছে আঠার মতো লাগিয়ে। তখন এক মুসিবত ছিল, এখন শনি তার সব গুষ্টি নিয়ে সারেং বাড়ির মাথার উপরে ঝুলছে।

— ঝুলুক জয়তুন কারোরে গোনায় ধরে না।

— না ধরলে নাত বউ পরের বাড়ি কি করে?

— ও কোন দিনও সারেং বাড়ির বউ হবে না, হবে বান্দি।

— সারেং বাড়ির বউরা কখনোও বান্দি হয় না। হয় স্বামীর সোহাগী, কপাল হয় রাজকপাল।

— হ এতোই সোহাগী, চোখের সামনে সতীন নিয়া ঘর করতে হয়।

— সংসার, সমাজ, সম্মান, দুনিয়া এগুলোর পাল্লায় ভালোবাসা মাপতে হয় না রে সখী। দুনিয়ায় বাঁচতে হলে কতকিছু করতে হয়। ভালোবাসা হলো দুনিয়ার যাঁতাকলে হাজার বার পিষেও মনের কোণে একজনের নামেই দীপ জ্বালানো। যেমন জ্বেলেছে আলতাফ! কেননা ভাগ্য তাকে জোছনার সাথে বাঁধছে তবে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দীপ জ্বলছে জয়তুনের নামে। ভাগ্য জাফরকে মরিয়মের সাথে বাঁধছে তবে তার মনে দীপ কার নামে জ্বলে সেটা তুমিও যেমন জানো তেমন আমিও জানি সখী। ভালোবাসা সব কিছুর উর্ধ্বে।

জয়তুন কিছু বললো না। আম্বিয়া পানের পাতা রেখে গেছে, সেখান থেকে আঙুলের ডগা দিয়ে আবার পান মুখে পুরলো।

আলাউদ্দিন তার মতোই বললো, — বাড়ির বউ বাড়িতে নিয়ে আসো সখী। ঘরের জিনিস বেশিক্ষণ বাইরে রাখতে নেই। শকুনের নজর পড়ে।

— আর এরশাদ?

আলাউদ্দিন তার অমায়িক হাসি হাসলো! তবে কিছু বললো না। জয়তুন নিজের মতোই বললো, — বড় ভাই থাকতে ছোট ভাইয়ের বিয়া ছ্যাহ্! তাও আবার একই মাইয়া। এরশাদের কিছু না আসুক, আমার বুক জ্বলে। জ্বলে কেন তুই জানোস না আলাউদ্দিন? আমার মুখের আগুন এই ছেলে নিছে। নিয়ে নিজের মুখের সাথে নিজের কপাল পুড়ছে। সেই পুড়া আমি জোড়া লাগাইতে চাই। ভাগ্য দেয় না কেন?

আলাউদ্দিন এবারো কিছু বললো না। জয়তুন আগের মতোই বললো, — এখন আর কোন বাছাবাছি নাই। আমি আমার এরশাদরে বিয়া দিমু। নিজের হাতে দিমু।

আলাউদ্দিন বড় একটা শ্বাস ফেললো! ফেলে বললো, — এরশাদের বিয়ে তখনই হবে, যখন এরশাদ চাইবে। চেষ্টা করে দেখতে পারো। তবে একটা কথা মনে রাইখো সখী। এখন যা’ই করবা হিতে বিপরীত হইবো। সেই বিপরীত সারেং বাড়ি ধ্বংশের দিকেই যাইবো।

জয়তুনও তার তেজ নিয়ে বললো, — তোর ফকিরগিরি তোর কাছে রাখ। আমার নাতি সে।

আলাউদ্দিন আবারো হাসলো! তার অমায়িক হাসি। হেসে তার মিষ্টি সুরে বললো, — এজ্যনই তো ভয় সখী। সে তোমার নাতি।

চলবে…..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here