#ধূপছায়া
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব- ১৬
ভোরের কোমল রোদ চোখে পড়তেই আয়না, ধীরে ধীরে চোখ খুলে তাকালো। মাথা, চোখের পাতা ভারি, অসম্ভব ভারি। শাহবাজের চেয়ে তার মাথার আঘাত বেশি, তাই হয়ত দুর্বলতাও বেশি। বেশি হলেও জ্ঞান ফেরার দিকে সে’ই রইল আগে।
আগে হলোও তার গোলগাল মুখটাতে এক রাজ্যের ক্লান্তি, শুকনো, মলিন, বিষাদে ঘেরা। সেই বিষাদ ঘেরা ভারি চোখ দুটো টেনে সামনে তাকাল, আর তাকিয়েই শুকনো ফ্যাকাশে ঠোঁট দু’টো মেলে হালকা হাসল। বিষাদ মাখা মুখে সেই হাসিটা ঠিক যেন ভোরের অন্ধকারে সোনালি সকালের মিষ্টি রোদের মতো আলতো, উজ্জ্বল, কোমল। যেন জানত, চোখ খুলে এই মুখটাই দেখবে।
এই মুখটার মানুষটা তার চেনা না, জানা না। ব্যস, ঘন্টা দু’য়েকের পরিচয়। তবুও কেন জানি দেখলেই ভরসা লাগে। ভেতর নির্ভার লাগে। মনে হয় আশে পাশে থাকলে, কোন ক্ষতি হবে না। মাথায় যখন আলতো করে হাত রাখে, মনে হয় কতো দিনের চেনা। আসলে দূর দূরান্ত পর্যন্ত কোন সম্পর্ক নেই। এখানে না এলে হয়ত এজন্মে দেখাই হতো না। তবে যখন শান্ত ভাবে কিছু বলে, কণ্ঠে কি থাকে কে জানে? অন্য রকম একটা শান্তি, ভরসা আপনা আপনি’ই জেগে উঠে। তাই যখন কাল জ্ঞান হারানোর আগে এই মুখটা দেখলো। তখনি মনে হলো আর ভয় নেই।
সারা রাত কেউ ঘুমায়নি। আম্বিয়া পাশে খালি বেড পেয়েই শরীর এলিয়ে দিয়েছে, তাঁর ঘুমের গভীর নিশ্বাস ধীরে ধীরে ভেসে আসছে। পৃথিলা বসে আছে আয়নার বিছানার পাশে। চোখে মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। তবে আজ আর এদের ছাড়বে না , সারাদিন দেখবে। মাথায় আঘাত, অন্য কোন সমস্যা যদি হয়, তখনি ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। তবে আপাতত কোন ভয় নেই। তাই অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই বাকি সবাই ফিরে যাবে। অপেক্ষাটা ছিল শুধু জ্ঞান ফেরার।
পৃথিলা আয়নার মুখের হাসিটুকু দেখলো শান্ত চোখে। সিধেসাদা সরল প্রকৃতির মেয়ে। ভালো মন্দ বোঝার জ্ঞান এখনো হয়নি বা নেই। অনেকেই বৃদ্ধ বয়সেও ছোট বাচ্চাদের মতো সরল হয়। দিন দুনিয়ার প্যাচ এরা ধরতে পারে না। একটু আদর, কোমল, ভরসা দেখালেই ভুলে যায়। যেমন এই মেয়েটির কাছে সে এখন সবচেয়ে ভরসার একজন। এতো এতো অচেনা মানুষের মাঝে তাকেই হয়ত সবচেয়ে কাছের ভাবছে।
অথচ সে নিজেও ভাগ্যের চাকায় পিষে গুড়োগুড়ো হওয়াদের মধ্যেই একজন। অবশ্য এই মেয়ের মতো এতো সরল না। চাইলেই তাকে কেউ ভাঙতে পারবে না। তবে এই মেয়েকে চাইলেই ভাঙা তো ভালোই ইশারায় পুতুলের মতো নাচাতেও পারবে। তাই শান্ত চোখে দেখেই বললো, — তুমি কিছু কাল বলেছিলে আমায়। আমি বুঝতে পারেনি। কি বলেছিলে?
আয়নার মুখের ঝিলিকটুকু মলিন হলো। হতেই চোখ নামিয়ে নিলো। আসলে ভেবেছিল সে কাল’ই মারা যাবে। ভয়ে কি বললো, না বললো।
পৃথিলা সেই মলিন মুখটা দেখলো, তাই এই বিষয়ে কিছু আর জিজ্ঞেস করলো না। কথা ঘুরিয়ে বললো, — মাথায় যন্ত্রনা আছে?
আয়না আস্তে করে দু পাশে মাথা নাড়ালো। পৃথিলা উঠলো! কাপড়ে রক্ত শুকিয়ে চট হয়ে আছে। সেই কাপড় ভালো করে গায়ে জড়ালো। জড়াতে জড়াতে বললো, — ” আমি একটু পরে চলে যাবো। ” আম্বিয়াকে দেখিয়ে বললো, — উনি হয়ত থাকবেন। কোন সমস্যা হলে তাকে বলো।
আয়না আস্তে করে মাথা কাত করলো। পৃথিলা দরজার কাছে গিয়ে আবার ফিরে এলো। এসে বললো, — আমি জানি বলার মতো কোন সম্পর্ক আমাদের মাঝে নেই। তবুও আমি কি কিছু বলতে পারি?
আয়না আবারো মাথা কাত করলো। করতেই পৃথিলা বললো, — বিয়েটা তুমি করতে চাওনি। এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, চাপে পড়ে করা স্বাভাবিক। তবে মিথ্যা বলে গায়ে আগুন দেওয়ার প্রয়োজন ছিল না। জয়তুন আরা তোমাকে মাফ করেছিল। সেখান থেকে গ্রামে ফিরলেই তুমি হয়ত আগের মতো না হলেও, তবে আস্তে আস্তে কিছুটা হলেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারতে। তবে তুমি নিজে এই রাস্তা ঠিক করেছো। কেন করেছো জানতে চাইবো না। চাওয়ার জন্য যেই অধিকার প্রয়োজন সেটা আমার নেই। তবে তুমি হয়ত খেয়াল করোনি আমার ঘরের জানালা খোলা ছিল। আমি ভেতরে গিয়ে আবার জানালার পাশেই বসে ছিলাম। না আমি সেই ভাবে কিছু দেখনি, অন্ধকারে দেখার কথা না, তবে কিছুটা বোঝা যায়। অবশ্য তখন আমি কিছুই বুঝিনি তাছাড়া সব কিছু এতো তাড়াতাড়ি হলো।
তবে কি জানো? অন্ধকারে চলমান কোন কিছুতে অনুমান করে নির্দিষ্ট জায়গায় বাড়ি মারা যায় না। গেলেও বড়জোর সেটা গায়ে লাগবে। গায়ে কাঠের বাড়ি এমন আর কি? তাই স্থির হওয়ার প্রয়োজন ছিল। আর ঠিক তখনি তুমি হোঁচটা খেয়েছো।
আয়নার চোখে মুখে ভয় স্পষ্ট। পৃথিলা দেখলো, দেখে স্বাভাবিক ভাবেই এগিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ালো। একটু নিচু হয়ে ব্যান্ডেজের সাইড দিয়ে বেরিয়ে আসা চুল গুলো সুন্দর করে গুছিয়ে দিতে দিতে বললো, — আমি জানি না সঠিক কি? ভালো কি? তবে যে যেই পরিস্থিতিতে থাকে, সে’ই একমাত্র ভালো জানে। তাই তোমার’টা তুমিই ভালো বলতে পারবে। তবে আয়না, অন্যায় সব সময় অন্যায়’ই হয়। কারণ যাই থাক, অন্যায়কে সেই কারণ কখনও ন্যায় করতে পারে না।
আয়নার গাল গড়িয়ে চোখের পানি পড়ল। পৃথিলা যত্ন করে সেই চোখের পানি মুছে বললো, — আসি, ভালো থেকো।
বলেই পৃথিলা বেরুনোর জন্য এগুলো। তখনই আজিজ এসে দরজায় দাঁড়ালো। মেয়েটার খবর রাতেই ফাতেমার কাছে পেয়েছে। তবে বুড়ো শরীরে আর কতো সয়। তাই সূর্য উঁকি দিতে না দিতেই ছুঁটে আসলো। কপাল, সবই কপাল। কুফা বাড়ি কি আর গ্রামের মানুষ সাধে বলে। একটার পর একটা লেগেই থাকে। ফকির বাবারে তো কোলে নিয়া বসে আছে। ঝাড় ফুঁক করে দোষ টোষ কাটাবে তা না, বসে বসে মানুষকে খোঁচানো আর খিক খিক করে হাসা।
মনের বিরক্ত মনে চেপে, পৃথিলার দিকে তাকিয়ে বললো, — ও, তা তুমিই সেই মাস্টার। জাফরের মুখে শুনলাম। ভালো আছো?
পৃথিলা মাথা নাড়ালো! স্কুলের এখনো টিকিটাও দেখেনি, অথচ মাস্টার মাস্টার নামে পুরো গ্রামে ঢোল পড়ে যাচ্ছে। আশ্চার্য! সে নাড়িয়ে জিজ্ঞাসা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো, — জ্বি ভালো! আপনি?
— আমি এই গ্রামের মহাজন। আরেক পরিচয় যদি জানতে চাও তাহলে জাফরের মামাতো ভাই। আরো আরেকটা যদি জানতে চাও, তাহলে ঐ যে হাসপাতালের বাহিরে হাত পা ছড়িয়ে কুঁচানো গেঞ্জি গায়ে, যেই ছেলে বসে বসে ঝিমোচ্ছে তার জন্মদাতা পিতা।
পৃথিলা হালকা হাসলো! যেমন বাপ তেমন ছেলে। এসেছে পর থেকে তাকে দেখেই এমন ভাব করছে, যেন পৃথিলা কাউকে খুন টুন করে ফেলেছে। শুধু প্রমাণের অভাবে চোখের সামনে এমন ঘুরতে দিচ্ছে। তা না হলে নগদে শুলে চড়াতো। সে হেসে আর কিছুই বললো না। বলার মতো অবশ্য কিছু নেই ও। তাই নিজের মতো বেরিয়ে জাফরের দিকে এগিয়ে গেলো। তারা সবাই এক সাথেই ফিরবে।
আজিজ এগিয়ে গেলো। একবার আম্বিয়ার দিকে তাকালো। তার ঘুমে যে বেশ গাঢ় দেখেই বুঝলো। বুঝে কোমল সুরে বললো,, — ভালো আছিসরে মা।
আয়না মলিন মুখে মাথা হালকা নাড়ালো! আজিজ সেই মলিন মুখের দিকে তাকিয়ে বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো! ফেলে বসতে বসতে বললো, — তোর চাচা মধ্য রাতে গিয়ে পায়ে পড়ে কাঁদলো। বেচারা খবর শুনেই দৌড়ে এসেছিল। জন্ম না দিক, বুকে আগলে তো রেখেছে। দেখা তো দূর, বড় নাতি কান বরাবর এমন একটা দিছে, সেই কানের পর্দা শেষ। দিয়ে একেবারে গলা ধাক্কা। তোর নাম মুখে নিলেই নাকি গর্দান শেষ। জালিম সব জালিম। এরা নিজেদের ছাড়া কাউকে চেনে না। বাপের বয়সী, তারে এমন মাইরডা দিতে পারলো?
চাচার কথা শুনেই আয়না ফুঁপিয়ে উঠল। আজিজ সে ফুঁপিয়ে উঠা দেখে হাসলো। অবশ্য এই হাসি আগের মতোই নিজের। চোখে মুখে এক সাগর দুঃখ। দুঃখ নিয়েই বললো, — কাঁদলে কিছু হয় নারে মা। যদি হতো তোর উপরে বাবার ছায়াটা না হয় গেছে, মায়েরটা ঠিক থাকতো। কই কারো দয়া হয়েছে?
আয়না কাঁদতে কাঁদতেই মাথা নাড়লো! তার চোখ, মুখ লাল। সেই লাল চোখে আজিজের দিকে তাকালো। আজির পরম মমতায় আয়নার মাথায় হাত রাখলো। রেখে বললো, — তাহলে তুই দয়াটা কেন করলি মা। কোন দরকার ছিল বাড়িটা নিজের মাথায় নেওয়ার? আমিতো যা করছি সব তোর জন্য। তাহলে বল কোন জন্মের শত্রুতা আমার?
শাহবাজের জ্ঞান ফিরলো একটু দেরিতে। ঘড়ির কাটা তখন সাতটার ঘরে। সদর, তাই সকাল হতে না হতেই কোলাহল শুরু হয়েছে প্রতিদিনের নিয়মে। সেই নিয়ম কানে পৌঁছাতেই ফট করে চোখ মেলে তাকালো । তাকাতে দেরি ঝট করে উঠে বসতে দেরি হলো না এতোটুকুও। আর বসেই দু’মিনিট ঝিম মেরে চোখ বন্ধ করে রইল। এই বসা এমনি না, ঘটে যাওয়া সব ঘটনা এক এক করে মনে করলো।
করতেই একটু হাসলো! মাথায় ব্যান্ডেজ, হাতে ক্যানোলা। এতো বড় আঘাতের কোন রেশ তার চোখে মুখে দেখা গেলো না। বরং চোখ খুলে নিজেই হাতের ক্যানোলা টেনে খুললো। খুলতে খুলতে বললো, — কাহিনী কি?
এরশাদ সাইডেই বসা, ভাইয়ের কর্মকান্ডে তার মধ্যে তেমন ভাবান্তর হলো না। নির্বিকার চিত্তে বললো, — আমি কিভাবে জানবো, কোথায় কোথায় কোন অকাজ করে রেখেছিস কে জানে?
— এই বিয়ে ছাড়া বর্তমানে অন্য কোন অকাজ আমি করিনি।
— না করলে তো ভালোই।
— তা ঠিক! তবে কোন চিন্তা করো না। শাহবাজ ঠিক বের করে ফেলবে। আর একবার হাতে পাই। কথায় আছে না, হাতের বদলে হাত, চোখের বদলে চোখ। আমিও বাড়ির বদলে বাড়ি’ই দেবো। তবে একটু যত্ন করে। সে দিয়েছে কাঠ দিয়ে আর আমি দেবো লোহার রড দিয়ে।
— এটা আমার উপরে ছেড়ে দে।
— কেন? মাথা তেমার ফাঁটছে?
— এটা শুধু মাথার কাহিনী না?
— তো, কোন কাহিনী? যে শাহবাজের মাথা ফাঁটালেই শুভ যাত্রা হবে।
এরশাদ উত্তর দিলো না, শাহবাজ উত্তরের আশাও করলো না। সে নিজের মতো উঠলো! উঠে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য এগুলো।
এরশাদ দেখে বললো, — আজকে থাকতে হবে।
শাহবাজ নিজের মতো বেরুতে বেরুতে বললো, — থাকতে হলো থাকো নিষেধ করেছে কে? বলেই বেরিয়ে এলো। বেরিয়ে অবশ্য বেশিদূর যেতে পারলো না। তার পাশের কেবিনেই আয়না। দরজার সামনে দিয়ে যেতে গিয়েও থামলো। থেমে ঘাড় কাত করে তাকালো।
আয়না অবশ্য বুঝতে পারলো না। এক মাথা ভার চোখ ভার, তার মধ্যে কেঁদেছে। মাথায় যন্ত্রনা হচ্ছে। তাই চোখ মুখ কুঁচকে বন্ধ করে শুয়ে আছে। ফর্সা মুখে হালকা গোলাপি পাতলা ঠোঁট দু’টো তিরতির করে কাঁপছে।
শাহবাজ বেশ কিছুক্ষণ এক ধ্যানেই তাকিয়ে রইল। এরশাদ তার পেছন দিয়ে স্বাভাবিক ভাবে যেতে যেতে বললো, — তোর দুই চেলা, কালাম আর আম্বিয়া রইল। চুপচাপ জায়গা মতো গিয়ে বস । আমরা সবাই এখন ফিরছি, আবার বিকেলে আসবো।
এরশাদের কণ্ঠ শুনেই আয়না চোখ খুললো। খুলতেই চোখের সামনে শাহবাজের মুখটা দেখলো। দেখে’ই একটা ঢোক গিললো। গিলে আস্তে করে অন্য পাশে মুখ ফিরিয়ে নিলো।
শাহবাজ তখনই ট্রেনে সেই রাতের মতো দু’আঙুলে একটা চুটকি বাজালো। আয়না সাথে সাথে আবার তাকালো। এবার অবশ্য চোখ ফেরানোর আর সাহস হলো না। তবে চোখে মুখের করুন দশা স্পষ্ট ফুটে রইল। আর শাহবাজ তা দেখেই ঠোঁট টিপে হাসলো। হেসে এরশাদের উদ্দেশ্যে গলা চড়িয়ে বললো, — কোন দরকার নেই আসার। শাহবাজের সব কাজের জন্য শাহবাজ একাই যথেষ্ট।
সদর পেরিয়ে ভ্যান গুলো যখন মেঠো পথ গলিয়ে ধান ক্ষেতের পাশ ঘেঁষে আঁকা বাঁকা পথে নিজ ছন্দে এগিয়ে যাচ্ছে, তখনও সকালে রোদটা কোমল, নরম। সূর্য তার তেজ এখনোও পুরোপুরি তুলেনি। তার সাথে গাছগাছালির ছায়া, বাতাসে ধানের গন্ধের সাথে অচেনা একটা নীরব সুর ।
সেই সুরের ছন্দে গা ভাসিয়ে পৃথিলা বসেছে সাইডে পা ঝুলিয়ে। কোন কারণে মনটা আজ ফুরফুরে লাগছে। অনেক অনেক দিন পরেই লাগছে। অবশ্য হওয়ার তেমন কোন কারণ নেই। নাকি এই যে স্নিগ্ধ কোমল প্রকৃতির রুপ, এই রুপের প্রভাবে। হয়তো! প্রকৃতির একটা প্রভাব না চাইতেও মানুষের উপরে থাকে। তাইতো ঝুম বৃষ্টি দেখলেই ময়ূরের মতো পেখম মেলতে ইচ্ছে করে, চাঁদের জোছনা দেখলে গুনগুন করে গাইতে ইচ্ছে করে। বিষন্ন বিকেলে কোন কারণ ছাড়াই মন উদাস হয়ে বসে।
তখনই এক ঝাঁকি লাগলো। পৃথিলা কিছুটা আঁতকে উঠলো। তার চেয়েও আঁতকে উঠল জাফর। পৃথিলার কেন জানি হাসি পেয়ে গেলো। এই মানুষটা বসেছে তার পাশে’ই, প্রথমে অবশ্য কথা ছিল না। কথা ছিল ইমরান ভাইয়ের সাথে এক ভ্যানে যাবে।
তবে যখন এই ভাবে পা ঝুলিয়ে বসলো, এই মানুষটা সাথে সাথে এগিয়ে চিন্তিত সুরে বললো, ” তাল সামলাতে পারবে না মা, পা তুলে বসো।
এই মানুষটা কোন কারণে তাকে নিয়ে খুব চিন্তিত। মা ডাকটা ডাকেও যেন কেমন করে। পৃথিলার অস্বস্তি হয়। অবশ্য কোন কারণ নেই। তার এই ছোট্ট জীবনে অসংখ্য মানুষের কাছ থেকে এমন সম্বন্ধ পেয়েছে। তবুও, এই মানুষটার ডাকে কিছু একটা আছে। তবে ধরতে পারে না। অবশ্য সেটা বুঝতে দেয় না, তাই তখনও দেয়নি। বরং হালকা হেসে বলেছে, — সমস্যা নেই।
মানুষটা তাও নিশ্চিন্ত হতে পারেনি। তাই পৃথিলার ভ্যানে’ই উঠে বসেছে। এমন ভাব, পড়ার আগেই যেন ধরতে পারে।
সে নিজের হাসি দমিয়ে বলল,– আপনার ছেলে মেয়ে নেই?
জাফর পৃথিলার দিকে নিশ্চুপ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল, তারপর শান্ত ভাবে বললো, — না নেই।
— আমি দুঃখিত! আমি অনুমতি না নিয়েই ব্যক্তিগত প্রশ্ন করে ফেলেছি।
জাফর হাসলো! হেসে একটু আরাম করে বসলো। মেয়েটা এমন ভাবে বসেছে, তার ভয় করছে। ভ্যানওয়ালাকে অবশ্য বলেছে সময় লাগুক, তবে আস্তে আস্তে যা। তবুও রাস্তা তো ভালো না। তাও ভালো এখনোও মেঘ বৃষ্টি শুরু হয়নি। তখন অবস্থা যা হয় বলার মতো না। চেয়ারম্যান, মেম্বাররা ধীরে ধীরে ইটের ব্যবস্থা করছে, তবুও গ্রামের রাস্তা তো গ্রামের’ই।
সে বসেই বললো, — দুঃখিত হওয়ার কিছু নেই। এটা সামান্য কৌতূহল। একটা জায়গায় তুমি এসেছো, থাকছো, আশে পাশে মানুষের ব্যাপারে কৌতূহল হবে এটাই তো স্বাভাবিক।
জাফরের সহজ ভাবে কথা বলায় পৃথিলার ভালো লাগলো। তাই হালকা হেসে বললো, — আরেকটা কথা জিজ্ঞেস করতে পারি?
— অবশ্যই পারো! একটা কেন? তোমার যা যা কৌতূহল আছে সব জিজ্ঞেস করে ফেলো তো । এমনিতেই দুটো মানুষ চুপচাপ বসে যাচ্ছিলাম ভালো লাগছিল না। তার আগে তুমি আরেকটু পিছিয়ে বসো তো মা। আমার ভয় করছে।
পৃথিলা এবার হেসেই ফেললো! না খিলখিল হাসি না, মার্জিত মাপা হাসি। তবুও সেই হাসি যেন এই কোমল আলোতে আলাদা আলো ছড়াল তার চোখে মুখে। আর এই আলোতেই ঠিক তাদের সামনের ভ্যান থেকে এরশাদের যেন নিশ্বাস বন্ধ হয়ে এলো।
ফরহাদ হাত পা ছড়িয়ে ভ্যানে শুয়ে আছে। লম্বা মানুষ পা দুটো ঝুলছে। সেও পৃথিলার হাসি দেখলো। অবশ্য তার চোখে মুগ্ধতা নেই। সে চোখ মুখ কুঁচকে বললো, — এই আবার হাসতেও জানে?
এরশাদের দৃষ্টি পৃথিলার উপরেই। কেন জানি তাকালে চোখ সরাতে পারে না । কিছু একটা অদৃশ্য টান তাকে আটকে রাখে। তাই চোখ রেখে বললো, — সেটা তুইও জানিস না।
ফরহাদ গাল চুলকে আবার সোজা হয়ে শুলো। শুতে শুতে বললো, — তোর অতি গুণধর, বিদ্যাধর বোনের জন্য একে রেখে ফেল। দেখেই বুঝা যায় বিদ্যার জাহাজ। দুই জাহাজের বনিবনা খুব ভালো হবে। আমার দ্বারা আর হচ্ছে না।
— মাত্রই তো এলো। দেখা যাক কি হয়।
— তোর কি হবে জানি না। তবে এই কচুরমুখি সাথের আমার প্রতিদিন দেখা হবে। এটা ভেবে’ই তো আমার চুলকানি হচ্ছে।
এরশাদ বিস্ময় চোখে ফরহাদের দিকে তাকালো! তাকিয়ে বললো, — কচুরমুখি?
— হ্যাঁ!
এরশাদ হেসে ফেললো ! তখনই পৃথিলাদের ভ্যান এক ঝাঁকুনি খেলো। এবড়ো থেবড়ো রাস্তা, তারমধ্যে ভ্যানওয়ালাও দিয়েছে এক টান। পৃথিলা জাফর তো ভালোই, এরশাদের নিজেই আঁতকে উঠলো। উঠতে’ই হাসি হাসি মুখটা চোখের পলকে অন্ধকার হলো। আর হতেই ভ্যানওয়ালাকে এক ধমক দিলো।
শুনশান রাস্তায় এই ধমকটা বজ্রপাতের মতো সবার কানে বাজলো। আর বাজতেই শুধু ভ্যানওয়ালা তো ভালোই, বাকি সবাইও চমকে উঠল।
চলবে…..

