#ধূপছায়া
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_১৭
পূর্ব আকাশে আজ সূর্য উঁকি দিয়েছে আর পাঁচ দশটা দিনের মতোই। মিঠাপুকুর গ্রামের সময়ের ঘড়ি টিক টিক করে চলছে নিজ ছন্দে। সেই ছন্দে ছন্দ পতন হয়েছে একমাত্র সারেং বাড়িতে। সকালে উঠেই খোয়ার থেকে চারটা রাতা মুরগি জবাই হয়েছে, বড় হাড়িতে গরুর দুধের পায়েশ রান্না হচ্ছে। সোনামগুর চালের গন্ধে বাড়ি মো-মো করছে। এলাকার সবচেয়ে নামকরা মিষ্টির দোকান থেকে আনা হয়েছে কাঁচা রসগোল্লা আর নরমপাকের সন্দেশ। আর সবচেয়ে বড় কথা, উঠানে পাতা হয়েছে চন্দন কাঠের কারুকাজ করা পিঁড়ি। এই পিঁড়িতে পা রেখে’ই জয়তুন সারেং বাড়িতে পা রেখেছে, রেখেছে জোছনা, বড় বউ, মরিময়। আর আজ রাখবে সারেং বাড়ির প্রথম নাত বউ।
তাইতো সারেং বাড়ির বাতাসে আজ বলতে গেলে কিছুটা উৎসবের আমেজ। বিশাল বাড়িটার কোণে কোণে যেন ভিন্নতার সুর গলা ছেড়ে গাইছে। শেষবার এমন গেয়েছিল জাফরের বিয়ের পর। তারপর আর এই বাড়িটা সুখের ছন্দ দেখেনি।
তাই সুযোগ যখন ভাগ্য নিতে নিতে আবার ফিরিয়ে দিয়েছে, জয়তুন ফিরিয়ে দেবে কেন? তাছাড়া তার আবার একটাই নীতি। যে তাকে দু’হাত ভরে দেবে, সেও তাকে মন উজার করে দেবে। তাই তো যে আয়নামতিকে ঘরে তুলবে না বলে ঘোষণা দিয়েছিল, আজ তার জন্যই নিজ আদেশে সব আয়োজন করেছে। করবে’ই না কেন? তার নাতির সামনে যে এই মেয়ে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যস, জয়তুনের মনটা তো সেইখানেই গলে গেছে।
তাই বসে বসেই সব আদেশ নির্দেশ দিচ্ছে। আম্বিয়া নেই, কাজের লোক আছে। তবে আম্বিয়া না থাকলে জয়তুনের সব আন্ধার লাগে। অবশ্য সাবিহা সকাল থেকে যতটা পারে সাহায্য করছে। মেয়েটা ভালো। শহরের মেয়ে হয়েও কোনো অহংকার নেই। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত শ্বশুরের বেশ সেবা যত্ন করেছে। আজকাল বউদের তো আবার শ্বশুর শাশুড়ি চোক্ষের বিষ। তবে এই মেয়েটার অনেক গুণ। বাড়ির যে কোনো বিপদে-আপদে দরকারে নিজের মতো ছুটে আসে।
তাই আজও এসেছে, এসে নিজের মতো সব গুছিয়ে নিচ্ছে। আর এদিকে আজ পান ছেচার দায়িত্ব পড়েছে বীণার উপরে। সে খুশি মনেই করছে। বাড়ির এই খুশি খুশি আমেজ তার ভালো লাগে। ভালো লাগে বলেই খুশিতে দু’ডানা মেলে উড়ছে ইচ্ছে করছে।
কিন্তু সেই ইচ্ছেতে ছেদ পড়ল ফরহাদকে দেখে। সব সময়ের মতো চোখ, মুখ অন্ধকার করে এগিয়ে আসছে। বীণার ছোট্ট মাথায় একটা জিনিস’ই আসে না। একটা মানুষ কেমন করে, সব সময় এমন বিরক্ত থাকতে পারে। আজ পর্যন্ত একটু মন থেকে যেই হাসি, সেই হাসির রেশ এই মুখে একবারের জন্যও দেখি নি। কোন দুশমনি এই দুনিয়ার সাথে একমাত্র আল্লাহ’ই জানে।
বীণা পানের পাতা জয়তুনের সাইডে রেখে উঠে দাঁড়ালো। পড়ালেখায় ফাঁকি দেওয়া তার ধাতে নেই। বরং নিজের ইচ্ছায়, নিজের খুশিতেই পড়ে। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই হাসপাতাল থেকে আয়না বুবুরা আসবে। ভাইয়ের বউদের নিয়ে তার খুব শখ, আহ্লাদ। এতো বড় বাড়িতে বলতে গেলে একা একা থাকে। আম্বিয়া বুবু, দাদি অবশ্য আছে, তবে তারা বেশিভাগ সময়’ই নিজেদের কাজ নিয়ে থাকে। মাঝে মাঝে তো তার দম বন্ধ হয়ে আসে। তাই সাবিহা ভাবির সাথে তার আবার খুব ভাব। তার কাছ থেকে সে কতকিছু শেখে। কেননা গ্রামের মেয়েদের জীবন খুব’ই ছোট। একটু জ্ঞান হওয়ার সাথে সাথে শ্বশুর বাড়ি। আর শ্বশুর বাড়ি সেটা রসুই ঘর আর উঠান পর্যন্ত’ই।
তাই তার আজকে পড়ার একদম ইচ্ছে নেই। তবে এই গরমে মহারাজা বাড়ি পর্যন্ত এসেছে, এখন যদি নিষেধ করে, তবে দাদির সামনেই না দু’টো লাগিয়ে দেয়। এই লোক কাউকে গোনায় ধরে না। আর তাদের বাড়ির মানুষের এমন ভাব থাকবে, আরে এটাই তো আসল স্যারের গুণ, তার মধ্যে বড় ভাই। এই মাইর কোন ব্যাপার’ই না।
তাই কিছুটা বিষন্ন মুখেই বীণা নিজের রুমের দিকে এগিয়ে গেলো। আর যেতেই ঝমঝম শব্দ যেন পুরো রুমে সুরের মতো বাজলো।
আর বাজতেই ফরহাদের অন্ধকার মুখ আরো একধাপ কালো হলো। এ গু-গোবর পায়ে দেওয়ার কোন মানে আছে। নিজে হাঁটবে আবার গ্রামসুদ্ধ জানিয়ে জানিয়ে, যত্তোসব ফালতু কারবার।
জয়তুন আরা ফরহাদের কালো মুখ দেখে খিক খিক করে হাসল। এই রকম মুখভঙ্গি’ই ভালো। মাস্টার মানুষ দেখে যদি মাস্টার’ই মনে না হয়, তো কিসের মাস্টার। মাস্টার এমন হবে দেখেই পুলাপনের হাগা মুতা লেগে যাবে। তবে আগেরটা ছিল মিনমিনা শয়তান। এসেই মিচকা এক হাসি দিয়ে গলে গলে পড়ত। যেন পড়াতে আসে না, জামাই শ্বশুর বাড়ি বেড়াতে এসেছে। হারামজাদার, হারামজাদা। জয়তুনের নাতনির দিকে কু- নজর, পা দিয়ে ঠুকাঠুকি। দিছে জন্মের মতো পা ভেঙে। এখন যা, যতো খুশি ঠুকাঠুকি কর। বলেই হাত ইশারায় ফরহাদকে ডাকল। তার মুখ ভর্তি পান।
ফরহাদ ইশারা দেখলো, তবে এই সাত সকালে বুড়ির কথা শুনতে ইচ্ছে করছে না। এখান থেকে যাবে আবার স্কুলে। সেখানেও আবার কু কু করতে থাকা ছেলে মেয়ে। ধুর! তাই দেখেও না দেখার ভান করে স্বাভাবিক ভাবে রুমে দিকে যেতে গেলো।
জয়তুন তার স্বভার মতো থু করে ঘরের মধ্যেই পিক ফেললো! ফেলে বললো, — ঐ ফরহাইদা! চোখের মাথা খাইছোস। ডাকি দেখোস না?
ফরহাদ ঠোঁটে ঠোঁট চেপে বিরক্ত দমালো। খাটাইশা বুড়ি! বলেই ঘুরে বললো, — না দেখলে তো বেঁচেই যেতাম। জানি সেটাতো সম্ভব না। তাই দেখেও না দেখান ভান করে সময় নষ্ট করার কারণ তো দেখি না।
— এদিকে আয়।
ফরহাদ ভ্রু কুঁচকে বললো, — কেন?
— এদিকে আইলে কি আমি তরে খাইয়া ফালামু নি ?
— দাঁতের যে হাল, হারিকেন দিয়ে খুঁজলেও তো দুই একটা মারি ছাড়া কিছু’ই পাওয়া যাবে না। ভাত খায় গিলে গিলে আবার ফরহাদ। এতো সোজা?
— তুই আইবি ? না হলে আমার নাত বউ বন্ধুর লগে জুট্টি ধইরা ভাগাইছোস। চুল যে এখনো মাথায় আছে, সেটা তোর ভাগ্য।
জয়তুনের হুমকিতে ফরহাদের তেমন ভাবান্তর হলো না। তবে বিরক্তমুখেই এগিয়ে এলো। জয়তুন হেসে বললো, — বয়।
ফরহাদ বসলো! বসতেই জয়তুন বললো, — তোদের আগে ছোট ভাই বউ নিয়া আইতেছে। চোখে মুখে আগুন নিয়ে ঘুরোস। এতো আগুন আসে কোথা থেকে, লজ্জার তো ছিটেফোঁটাও দেখি না ।
ফরহাদ মনে মনে বিরক্তের শ্বাস ফেললো। শুরু হয়ে গেছে জয়তুনের জয়তুন গিরি। সে শ্বাস ফেলেই বললো, — যেটা নাই সেটা না দেখার’ই কথা ?
— তা ঠিক! সেটা যে নাই আমি ভালো করেই জানি। বড় হইলি তো আমার সামনে’ই। কতো আমার সামনেই লুঙ্গি খুলে নদীতে ঝাঁপায়ে পড়ছিস। লাজের বয়সেই লাজ ছিল না, এখন আইবো কোথা থেকে।
ফরহাদ কিছুক্ষণ বিরক্ত মুখে তাকিয়ে রইল। তারপর বললো, — এটাও একদম ঠিক! তো? এখনো ঝাঁপিয়ে পড়তে পারি। পড়বো?
— আমার সামনে পইড়া লাভ কি? বিয়ে কইরা বউয়ের সামনে পড়। দুই বন্ধুর তো সেই মুরোদ নাই। তোর বাপ মায়ে করে ডা কি? খালি জমি, জমি, জমি। এতো জমি খাইবো ডা ক্যারা। বড় পোলা শহরে ফুরুৎ, ছোট ডার কোন দোষ কে জানে? মাইয়া মানুষ দেখলেই ছ্যাত কইরা উঠে। তোর মায় করে ডা কি? আলাউদ্দিনের কাছে একটু আইতে পারে না। আমার মন কয় তোর ঘাড়ে বদমাইশ পরী বসে আছে।
— বসে থাক, দাঁড়ায়ে থাক, আপনার সমস্যা কি?
— বাপের তো ভদ্রতা ডানবাম দিয়া বাইয়া ছাইয়া পড়ে। তুই এমন বেয়াদব হইছোস ক্যা?
— সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে।
— কি কইবার চাস?
— আমিতো কিছুই চাই না, কেন ডাকছেন সেটা বলেন?
— তোর বাপ নাকি হাসপাতালে গেছিল।এরশাদ রে বললো আমার সাথে নাকি জরুরি আলাপ আছে। বাড়িত আসবার চায়। কাহিনী ডা কি? ফুপুরে মাটি দিয়া তো জীবনেও আর সারেং বাড়ি পা রাখে নাই। এখন কোন দরকার পড়ল।
— আমি জানি না।
— তা জানবি ক্যা। শুধু আছে আদার লাহান তেজ। তবে আমি আগেই কইতাছি। জমি জমার ব্যাপার হইলে আমি কিছু করতে পারবো না।
— কিসের জমি?
— ওমা তুই জানোস না?
— না।
— আমাগো ইটের ভাটার সাথে এক দাগের জায়গা চেয়ারম্যানের। সেখানে তোর বাপেরও তো আছে। চেয়ারম্যান এখন চায়। আমি ভাই কোন জায়গা টায়গা বেচবো না। জায়গা জমি বেচে পুড়া কপাইলারা। আমি পুড়া কপাইলা নি?
— না বেচলে নাই। সমস্যা কি?
— চেয়ারম্যান আর তোর বাপেতো আবার এক পেট। তাই ভাই আগেই কইলাম ইষ্টি ইষ্টির জায়গায়, জমি জমির জায়গায়।
ফরহাদ মাথা ঘামালো না। জমি টমি নিয়ে তার মাথা ব্যথা নেই। সে ভাবলেশহীন ভাবে বললো, — আর কিছু?
— কি আর কিছু?
ফরহাদ উত্তর দিলো না। সে উঠলো! তার উঠা দেখে জয়তুন বললো, — দুপুরে কিন্তু এখানে খেয়ে যাবি।
ফরহাদ তারও উত্তর দিলো। সোজা এলো বীণার রুমে। এই রুমে পা রাখার সাথে সাথে তার মেজাজ গরম হয়। চারিদিকে শুধু রং আর রং, ঝকঝকে, চকমকে। এমনকি দেয়াল ভরা রং বেরংয়ের এটা ঐটা। মাথা ধরে যায় টাস করে। আর আজতো আগে থেকেই গরম, তাই বসতে বসতে মাথায় এক থাপ্পড় লাগালো। লাগিয়ে বললো, — বিজ্ঞান বই বের করেছিস কেন? আজ বৃহস্পতিবার। বলেছিনা এই দিনে ইলেকটিভ ইংলিশ আর জ্যামিতি করবি।
আজ বৃহস্পতিবার না, বুধবার। তবুও বীণা টু শব্দ করলো না। করলেও ওটা ধরে আরো কয়েকটা পড়বে। তাই চুপচাপ গণিত বই টেনে নিলো।
ফরহাদ বসলো, বসতে বসতে স্বাভাবিক ভাবে বললো, — পরীক্ষা যদি সত্যিই দিতে চাস, ছোট চাচারে জাপটে ধর গিয়া। এই বুড়ির উপরে এরশাদ, শাহবাজ কেউ যাবে না। আমার বাপ যদি একবার পা রাখে, ঠিক জয়তুনের মাথায় ঘন্টা বাজিয়ে’ই বাড়িতে ফিরবে । তাই পড়ার লেখার জন্য কেউ যদি জয়তুনের বিরুদ্ধে যায় সেটা ছোট চাচা।
বীণা আগা মাথা কিছুই বুঝলো না। মাথার থাপ্পড় এখনো হজম হয়নি। গত এক বছরে মাথায় যে পরিমাণ থাপ্পড়, খাতার বাড়ি খেয়েছে, তার ধারণা যে কোন সময় তার সব স্মৃতি টৃতি সব মুছে শেষ। তাই মাথায় হাত বুলিয়ে’ই হা করে তাকালো। বলছে টা কি? পরীক্ষা, ঘন্টা? আবার জিজ্ঞেস করাও যাবে না। করলেই শুরু করবে বাড়ি। ধুর!
আয়নার আজ শরীরটা ভালো। মাথায় যন্ত্রনা নেই। তবে মাথাটা হালকা ভার। তাই ধীরে ধীরে নিজেই উঠে দাঁড়ালো। বাড়ির ফেরার তোড়জোড় চলছে। এখুনি বেরুবে সবাই।
আম্বিয়া পাশেই, তবে এগিয়ে ধরলো না। সে বলতে গেলে আছে নামের। টুকটাক এগিয়ে দেওয়া ছাড়া তেমন কোন হাবভাবও নেই। আয়না অবশ্য এদের কাছ থেকে কিছুই আশা করে না। বরং কিছু করলেই ভয় করে।
আজকে সকালটা একটু অন্যরকম। আয়নার কেন জানি মনে হলো। কেন, কে জানে? তবে পাশের কেবিনে শাহবাজের কণ্ঠ বা পায়ের আওয়াজ এখন পাওয়া যাচ্ছে না। হয়ত আশে পাশেই আছে। কোন কারণে হাসপাতালে আছে কে জানে? দিব্যি এ মাথা থেকে ঐ মাথা সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের মতো ঘুরতে দেখেছে। ক্যানোলাতো কালকেই খুলে শেষ। তাই নার্স গেছে হাতে সুই দিতে। কি কারণে কে জানে, সেই নার্সকে দিয়েছে এক ধকম। নার্স গেলো বকতে বকতে। ঔষুধও মনে হয় না একটাও ঠিক মতো নিয়েছে। দুইটা চেলা আছে। সম্ভবতো তাদের নাম, একটার মান্না, আরেকটার হাবির। কিছুক্ষণ পর পর এটা ঐইটা দৌড়ে আনছে। আম্বিয়া ইনি একবার গিয়েছিল। তাকেও দিয়েছে এক ধমক। সেই যে ধমক খেয়ে এসে মুখ ফুলিয়েছে আর ওমুখো হয়নি। তার সাথেও আর খুব একটা কথা বলেনি।
তখনি এরশাদ এসে দরজায় টোকা দিলো। দিয়ে আয়নার দিকে তাকিয়ে বললো, — আর কোন সমস্যা আছে?
আয়না চোখ তুলে তাকালো না। সারেং বাড়ির প্রতিটা মানুষ খারাপ। নিজ নিজ জায়গায় থেকে খারাপ। সে শুধু দু’পাশে মাথা নাড়লো।
এরশাদ দেখলো, দেখে আম্বিয়ার দিকে তাঁকালো। সে বা আম্বিয়া কেউ কারো সাথে অতি দরকার ছাড়া কথা বলে না। না বলার কারণ আছে। তাই এরশাদ ফিরেও তাকায় না। তবে আজ তাকিয়ে বললো — জিনিসপত্র সব ভ্যানে নিয়ে যা।
আম্বিয়া আর দাঁড়ালো না। একবার আয়না, একবার এরশাদের দিকে তাকিয়ে বেরিয়ে গেলো। এরশাদ অবশ্য এগুলো না। নিজের জায়গায় দাঁড়িয়েই বললো, — মিথ্যা বলেছো কেন?
আয়না আঁচল মুঠো করে ধরলো। তার চোখে মুখে ভয় স্পষ্ট।
— যা জিজ্ঞেস করছি সুন্দর মতো উত্তর দাও। তা না হলে সন্দেহের উপরে যেই থাপ্পড় তোমার চাচার কানে মেরেছি। সেটা যদি সত্যি মনে হয়, এর ফল কারো জন্যই ভালো হবে না।
— আজিজ চাচার কথায়।
এরশাদ ভ্রু কুঁচকে তাকালো! তাকিয়ে বললো, — মানে?
— তিনি বলেছিলেন মিথ্যা না বললে বিয়ে হবে না। আর বিয়ে না হলে আমি আর সমাজে মুখ দেখাতে পারবো না। আমি তো ভালোই বড় বাবাও পারবে না।
এরশাদ কিছুক্ষণ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল। তারপর বললো, — বিয়েটা তুমি নিজের ইচ্ছায় করেছো?
— হ্যাঁ।
— এর আগে বা পরে আর কিছু নেই তো?
— না।
— মন থেকে এই বিয়েটা মানতে পারবে?
— হ্যাঁ।
— বেশ, তবে একটা কথা মাথায় রেখো। সারেং বাড়ি ততক্ষণ’ই তোমার যতোক্ষণ তুমি সারেং বাড়ির।
আয়না আর কিছু বললো না। এরশাদও আর কিছু বললো না। সে বেরিয়ে এলো, বেরুতে বেরুতে দরজার পাশে হেলান দিয়ে দাঁড়ানো শাহবাজের দিকে একবার তাকালো। তাকিয়ে যেতে যেতে বললো, — আমার কাজ আছে, চেয়ারম্যান মনে হয় কোন ঝামেলা পাকাবে। বউ নিয়ে সোজা বাড়ি যা।
শাহবাজ সোজা হয়ে দাঁড়ালো, দাঁড়িয়ে কেবিনের দিকে তাকালো। আয়নাকে শুনিয়ে’ই বললো, — একবার যে গুছিয়ে মিথ্যা বলতে পারে, সে হাজার বারও পারে ভাই।
এরশাদ যেতে যেতেই শুনলো। তবে আর কিছু বললো না। আয়নাও বললো না। সে ধীরে ধীরে বেরুলো। শাহবাজ এক গাল হেসে বললো, — যেতে পারবেন পিরিতের বউ, নাকি কোলে করে নিতে হবে?
শাহবাজ ভেবেছিল আয়না কিছু বলবে না। তবে তাকে অবাক করে দিয়ে আস্তে করে নরম সুরে বললো, — পারবো।
সামান্য ছোট্ট একটা শব্দ, তবুও শুনে শাহবাজের শরীরে আগুন জ্বলে উঠল। এমন ঢং, যেন দুধ ও চেনে না, ঘোল চেনে না। এইসব ঢংয়ে শাহবাজ ভুলে না। তাই হনহনিয়ে বেরিয়ে গেলো। আয়না সেই বেরিয়ে যাওয়া দেখলো। দেখে ধীরে ধীরে এগিয়ে বাইরে এলো। এসে অবাক হলো। কেউ নেই! আম্বিয়া উনিও নেই। একটা ভ্যানে, ভ্যান চালকের জায়গায় শাহবাজ বসে আছে। তাকে দেখে হেসে বললো, — আসেন পিরিতের বউ। শ্বশুর বাড়ি পিরিতের স্বামী আপনাকে উড়িয়ে নিয়ে যাবে।
আয়না ঢোক গিললো। তার চোখে মুখে আবারো ভয় স্পষ্ট দেখা গেলো। না ভ্যানে উঠার জন্য না, গ্রামের মেয়ে, ছোট থেকে বড় হলো এই ভ্যানে চড়ে চড়ে । তবে ঐ যে সারেং বাড়ির নাতি বসা। যতো ভয় তো তাকে।
তবুও ধীরে ধীরে এগিয়ে উঠে বসলো। বসে একেবারে মাঝে চলে এলো। ভালো ভাবে যে তাকে নেবে না ঠিক জানে।
হলোও তাই! তার বসতে দেরি প্যাডেল দিতে দেরি হয়নি। আয়না খিঁচে বসে রইল। সদরের রাস্তা পাকা, সেখানে সমস্যা না হলেও গ্রামের রাস্তায় এসে আয়নার অবস্থা খারাপ হয়ে গেলো। এবড়ো থেবড়ো রাস্থা, তার মধ্যে মাথায় ঝাঁকুনি। তার মনে হলো সে সত্যিই উড়ে পড়ে যাবে। তাই বাঁচতেই ফট করে পেছন থেকে শাহবাজের গেঞ্জি মুঠো করে ধরলো। ধরতেই ভ্যান ফট করে থেমে গেল। আয়না চোখ, মুখ খিঁচে বললো, — আমি যেতে পারবো না। একদম না! মাথায় যন্ত্রনা হচ্ছে।
শাহাবাজ না ফিরলো, না কিছু বললো। তবে ঝাড়া মেরে গেঞ্জি থেকে হাত ঠিক ছাড়ালো। ছাড়িয়ে ভ্যান থেকে নেমে সোজা হেঁটে চলে গেলো।
আয়না অবাক নয়নে তাকিয়ে তাকিয়ে সেই যাওয়া দেখলো। এই রাস্তা ঘাট তার সবই পরিচিত। ইচ্ছে করলে সেও নেমে যেতে পারে। তবে নামলো না। ভ্যানে শুয়ে চোখ বন্ধ করল । মাথায় সত্যিই যন্ত্রনা হচ্ছে।
কতোক্ষণ রইল কে জানে, তার তন্দ্রা ছুটলো হালকা দুলুনিতে। সে টেনে চোখ খুলে দেখলো, শাহবাজের দুই চেলা দুই পাশে। একটা হেঁটে হেঁটে আস্তে করে পেছন থেকে ভ্যান ঠেলছে, আরেকটা সামনে দিকে হেঁটে হেঁটে’ই ধীরে ধীরে ভ্যানটা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
চলবে…..

