ধূপছায়া #নূপুর_ইসলাম #পর্ব_ ১৮

0
2

#ধূপছায়া
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_ ১৮

জাফর হাঁটছিল ধীরে ধীরে, মাটির পথ ধরে। তাদের স্কুলটা পড়েছে প্রায় সদরের কাছাকাছি। কাছাকাছি হওয়ার কারণ অবশ্য একটাই। শুধু মিঠাপুকুর না, যেন আশে পাশে যতো গ্রাম আছে সব জায়গা থেকেই ছেলে মেয়েরা পড়তে পারে।

এই স্কুলটা করেছিল তার বাবা। তিনি চেয়েছিলেন ছেলে মেয়েদের পড়াশোনাটা আরেকটু সহজ হোক। অবশ্য সত্যি বলতে শুধু যে এই একটাই কারণ তা না। তিনি চেয়েছিলেন এমন কিছু হোক যাতে সারেং বাড়ির মানুষ না থাকলেও নামটা যেন থাকে। আর স্কুল এমন একটা ব্যবসা যেখানে টাকা, নাম দুটোই হয়। বাবার চিন্তা বিফলে যায়নি। তাদের গ্রামে হাইস্কুল ছিল না। যেটা ছিল সেটা আরো দূরে। তাই অল্পতেই উঠতে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি।

তার পাশেই পৃথিলা। চুপচাপ, শান্ত আর কি ময়াময় একটা মুখ। জাফরের তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। তবে ভয়ে খুব একটা চোখ ফেরায় না। মেয়েটা খুব বুদ্ধিমতি। বেশি আবেগ দেখালেই দুইয়ে দুইয়ে চার করতে সময় লাগবে না।

তবে বলতেই হবে, মেয়েটা হয়েছে একদম অন্যরকম। ভেতরের কোন আভাস কাউকে বুঝতে দেয় না। নিজের চার পাশে শক্ত একটা খোলস যেন তৈরি করে রেখেছে। সেটা ডিঙিয়ে তাকে পড়া এতো সহজ না।

জাফর চোখ ফিরিয়ে সামনের রাস্তায় নিলো। তার গায়ে ঘিয়ে রঙের পাঞ্জাবি। দু’হাত পেছনে মুড়ে বুক টান টান করে ধীরে ধীরে হাঁটছে। না চাইতেও সারেং বাড়ির একটা অহম ঠিক যেন ফুঁটে উঠে।

পৃথিলা অবশ্য হাঁটছে স্বাভাবিক ভাবে। সে সব সময়’ই এমন । সাধারণ, খুব সাধারণ। গায়ে রুপালি পাড়ের কালো কাপড়। মাথায় সাধারণ হাত খোঁপা। আঁচলটা ঘুরিয়ে চাঁদরের মতে গায়ে খুব গুছিয়ে নেওয়া। যাকে প্রথম দেখায়’ই মনে হয় খুব সাধারণ, তবে যতো কাছে ততো বোঝা যায় আসলে কতোটা অসাধারণ।

আজকে রোদের তেজ নেই, আকাশটা মেঘলা। তাই চারিদিকের আবহাওয়া কিছুটা গুমোট। এই বছরের প্রথম বৃষ্টি মাটির বুকে মিশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই নেওয়ায় কতো আয়োজন। অথচ মিশে’ই নিঃশেষ সে।

জাফর রাস্তার দিকে দৃষ্টি রেখে’ই বললো, — তোমার কি হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে?

পৃথিলার হালকা হাসলো! তারা যাচ্ছে স্কুলে। সকাল থেকে সাবিহা সারেং বাড়িতে। বউ আসবে নানান আয়োজন চলছে। সে চুপচাপ বসায় ছিল। তখনি বীণা মেয়েটা দৌড়ে এসে বললো, — সাবিহা ভাবি আপনাকে তৈরি হতে বলেছে, ছোট চাচা স্কুলে নিয়ে যাবে।

পৃথিলা অবাক হয়নি। সাবিহা নিশ্চয়’ই গিয়ে কিছু বলেছে। এই মেয়েটাও না। তারা চাকরি দেবে আবার নিজে নিয়ে পরিচয়ও করিয়ে দেবে। আজকাল এতো দায় কার থাকে। অথচ এই পাগল মেয়েটার সেই ব্যবস্থাও করে ফেলেছে। এই পাগল মেয়েটার ঋণ এই জীবনে শোধ হওয়ার নয়। সে হেসেই বললো, — বলবো না হচ্ছে না। হচ্ছে, হাঁটার অভ্যাস নেই। তবে ভালোও লাগছে।

জাফরও হাসলো! সে ইচ্ছে করেই ভ্যান নেয়নি। মেয়েটার আশে পাশে থাকতে তার ভালো লাগে। শান্ত ভাবে যখন কথা বলে, মন দিয়ে শুনতে ইচ্ছে করে। ভ্যান নিলেতো দু’মিনিটে পৌঁছে দিতো। তবে এই যে সময় এটা পেতো কোথায়। মেয়েটার পাশে আসতেও তো তার বাহানা লাগে। তাই বের হতেই বললো, — তাড়াহুড়োর তো কিছু নেই, যদি ধীরে ধীরে হেঁটে যাই সমস্যা হবে? মেয়েটাও সাথে সাথে হালকা হেসে বলেছে” কোন সমস্যা নেই চলুন “।

সেই চলায় ধীরে ধীরে প্রায়’ই এসে গেছে। জাফর হেসেই বললো, — চলো ঐ গাছটার নিচে একটু দাঁড়াই। পৃথিলা বিনা বাক্য এগিয়ে গেলো। যেতেই একটা ভ্যান প্রায় বাতাসের গতিতে তাদের পেছন সাইড দিয়ে গেলো। পৃথিলা জাফর দু’জনেই হতম্ভব হয়ে ফিরে তাকালো। তারা এতোক্ষণ সেখানেই ছিল। যদি সাইড না হতো। উড়ে ধ্যান ক্ষেতে গিয়ে ঠিক পড়ত।

জাফর হতম্ভব ভাবেই বললো, — ভ্যানে শাহবাজ ছিল না?

পৃথিলার হাসি পেয়ে গেলো। অবশ্য হাসলো না। এখানে এসেছে পর থেকে একেক আজব কিসিমের মানুষ দেখছে সে। একজন বিনা কারণে আগুনের তেজ, রাগ, বিরক্তি চান্দিতে নিয়ে ঘুরছে, আরেকজন পানির মতো শান্ত, নির্বিকার চিত্তে ন্যাড়া মাথা নিয়ে ঘুরে ঘুরে সব কাজ করছে। আর এই জন, এটাকে কোন ক্যাটাগরিতে ফেলবে পৃথিলা জানে না। সে হাসি দমিয়ে বললো, — হুম।

জাফর আগের মতোই বললো, — মেয়েটাতো পড়ে যাবে। তার মধ্যে অসুস্থ। কোন আক্কোলে এমন ভাবে নিচ্ছে। তাছাড়া আর মানুষজন কই। এই পাগলের সাথে এই মেয়েকে একা ছেড়েছে কে? তাড়াতাড়ি আসতো, স্কুলে তোমাকে পরে নিচ্ছি। মেয়েটাকে তো মেরে ফেলবে। বলেই জাফর এগুতে গেলো।

পৃথিলা জাফরের হাতটা আলতো করে টেনে ধরলো! ধরে বললো, — আপনি আমার বাবার বয়সী। তাই সবার মতো ছোট চাচা’ই বলছি। এতো ব্যস্ত হওয়ার কিছু নেই। তাদেরকে তাদের মতো ছাড়ুন। আপনারা ছেড়ে দিলেই, তারা নিজেদের কে আঁকড়ে ধরার, বোঝার চেষ্টা করবে।

জাফর কেঁপে উঠল! কেঁপে হাতের দিকে তাকালো। সাথে সাথেই চোখ ফিরিয়ে ক্ষেতের দিকে তাকালো। তার চোখে পানি চলে এসেছে।

পৃথিলা হাত ছেড়ে বললো, — কোন সমস্যা?

জাফর তাড়াতাড়ি পাঞ্জাবির হাতার চোখ মুছল। মুছে বললো, — চোখে কি জানি পড়ল মা। হয়ত পোকা টোকা হবে। ধানের ক্ষেত থেকে উড়ে এসেছে।

— আল্লাহ! তাই নাকি? কই দেখি।

জাফর অবশ্য ফিরলো না। পানি ফেরাতে পারছে না। তাই সামনের দিকে এগুতে এগুতে বললো, — ঠিক হয়ে গেছে। সমস্যা নেই। তুমি আসো মা। এই মেঘ আসবে না। কেটে গেলে রোদের তাপে হাঁটতে পারবে না।

পৃথিলা অবাক হয়েই কিছুক্ষণ হনহনিয়ে এগিয়ে যাওয়া মানুষটার দিকে তাকিয়ে রইল। বলছে সমস্যা নেই। আবার দু’হাতে ঘষে ঘষে অনবরত চোখ মুছে যাচ্ছে। আশ্চর্য!

মিঠাপুকুর হাই স্কুলটা দু-তলা। মাখন রঙে বড় একটা মাঠের মাঝামাঝি মাথা উঁচু করে স্কুলটা দাঁড়িয়ে আছে। তার পাশেই বিশাল একটা বট গাছ। তার মোটা শিকড় গুলো অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে।

এখনো স্কুলের ঘন্টা পড়েনি। তাই সেই শিকড়, মাঠ, বারান্দা জুড়ে নীল সাদা রঙের স্কুল ড্রেসে ছেলে মেয়েরা হুটোপুঁটি খাচ্ছে।

সেই ছেলে মেয়েদের মাঝে হেডমাস্টারের রুম থেকে পৃথিলা আর জাফর বের হলো। তার মুখটা কিছুটা শুকনো। অবশ্য নিজেকে সে সাথে সাথে’ই সামলে নিয়েছে। তবুও আকাশের বৃষ্টি আর চোখের কান্না। দুটোর একবার হলে রেশ কিছুসময় তো থাকবেই।

পৃথিলা সেই শুকনো মুখটা নিশ্চুপ দেখলো। অবশ্য আর কিছু’ই জিজ্ঞেস করেনি। সারেং বাড়ির গল্প সাবিহার মুখে শুনেছে। হয়ত স্ত্রীর অকাল মৃত্যু, সন্তানাদি নেই। তার হাহাকার হয়তো লোকটার ভেতরে জমাট বেঁধে আছে । তাই হয়ত সবাইকে সমান ভাবে ভালোবাসতে পারে, স্নেহ করতে পারে। যেমন নিজের ভাইয়ের ছেলেমেয়েদের স্নেহ করেন, তেমনি অন্যদেরও করেন। তাই যেমন তাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করছে তেমনি করছে আয়নাকে নিয়ে। কিছু মানুষের ভালোবাসা, স্নেহ হয় সাগরের মতো বিশাল। সেখান থেকে পানি যতোই তুলে নাও, শেষ হবার নয়।

পৃথিলা স্বাভাবিক ভাবেই চোখ ফিরিয়ে হেডমাস্টারের দিকে তাকালো। হেডমাস্টার তাদের সাথেই বের হয়েছে। হাসি খুশি ছোট খাটো মানুষ। সে হেসেই বললো, — আপনার আসার প্রয়োজন ছিল না জাফর ভাই। আপনি বলেছেন সেটাই যথেষ্ট। তাছাড়া একজন মহিলা শিক্ষকের খুব প্রয়োজন ছিল। অজোপাড়া গায়ে পড়াতে আসতে চায় কে? আর গ্রামের মেয়েরা কোন রকম মাধ্যমিক। তার মধ্যেই শেষ। একজন মহিলা শিক্ষক থাকলে মেয়েরা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে।

জাফর হালকা হাসলো! হেসে বললো, — তাই তো ধরে বেঁধে নিয়ে আসলাম। যদি আবার মন উলটে যায়।

পৃথিলাও হাসলো! সব কিছু এতো সহজ হবে সে ভাবেনি। অথচ দু’দিন আগেও নিজেকে নিঃস্ব ছাড়া কিছু মনে হয়নি।

হেডমাস্টার পৃথিলার দিকে তাকিয়ে বললো, — তাহলে ম্যাডাম পৃথিলা। দেখা হচ্ছে তাহলে। আশা করি আমাদের স্কুলটা খারাপ লাগবে না।

— অবশ্যই স্যার। এতো সুন্দর স্কুল খারাপ লাগার প্রশ্ন’ই আসে না।

হেডমাস্টার বিদায় নিয়ে নিজের জায়গায় গেলেন। স্কুলের ঘন্টা পড়ছে। সব ছেলে মেয়েরা দৌড়ে নিজের ক্লাসরুমে যাচ্ছে। পৃথিলা সেই দিকে তাকিয়ে বললো, –বীণা এই স্কুলেই পড়ে?

— হ্যাঁ! এবার সে মাধ্যমিক দেবে। বিয়ের ঝামেলায় স্কুল পড়া সব লাটে উঠে আছে। আমাদের ফরহাদও তো এখানে। বীণাকে বাড়িতেও পড়াচ্ছে।

পৃথিলা অবাক হলো! অবাক হয়ে বললো, — উনি শিক্ষকতার পেশায় আছেন নাকি?

জাফর এবার হেসে ফেললো! প্রাণ খোলা হাসি। পৃথিলা কেন অবাক হয়েছে না বোঝার কিছু নেই। তাই হেসে বললো, — ও খুব ভালো ছেলে। এমনি উপরে যাই থাক। মানুষ হিসেবে যদি বলো, আমি ওকে একশোতে নব্বই দেবো। বাকি দশ কাটবো ওর রাগ আর বিরক্তির জন্য।

পৃথিলাও হাসলো! এমন একজন এমন পেশায়, বিস্ময়ের’ই বিষয়। তারা স্কুল থেকে বেরুতেই এরশাদকে দেখলো। এখানে না অবশ্য, একটু দূরে রাস্তার ওপারে। কিছুলোকের সাথে দাঁড়িয়ে। হাতে সিগারেট। লোকগুলো কিছু বলছে, সে শান্ত ভাবে শুধু শুনছে। দৃষ্টি মাটির দিকে। তারা এগিয়ে গেলো।

এগিয়ে যেতেই সেই মাটিতে এরশাদের ছায়ার পাশে একটা নারীর ছায়া পড়ল। পড়তেই এরশাদ চোখ তুলে তাকালো। আর তাকাতেই তার চোখ আটকে গেলো। কালো কাপড়ের মাঝে রোদে গরমে ঘেমে লালচে একটা মুখ। সেই মুখের মাঝে অসম্ভব সুন্দর দুটো চোখ। এই মেয়েকে কেউ কি বলেছে, তার চোখ দেখে যে কেউ প্রেমে পড়বে। আর পড়বে বলেই ভুল মানুষের হাত টা অতি সহজেই ধরে ফেলেছে।

আর ধরেছে বলে এরশাদ সবার চোখের আড়ালে তার হাতের জ্বলন্ত সিগারেট হাতেই মুঠো করে ফেললো। হাত জ্বললো, তার সাথে এরশাদের অনেক কিছু’ই যেন জ্বলে পুড়ে শেষ হলো। অবশ্য মুখ তার আগের মতোই শান্ত। শান্ত ভাবেই সব সময়ের মতো সুন্দর করে তাদের দিকে তাকিয়ে হাসলো! সেই হাসি সুন্দর, মার্জিত, কিছুই না বোঝার সরলতার হাসি।

আয়না ভ্যান থেকে একেবারে পা রাখলো চন্দন কাঠের পিঁড়িতে। জড়োসড়ো হয়ে। জড়োসড়ো হওয়ার কারণ জয়তুন আরা তার ঠিক সামনে। শেষ বার দেখেছিল অনেকটা আগে। কতো বয়স মনে নেই। তখন দেখেই ভয়ংকর চাঁদের বুড়ি মনে হয়েছিল আর এখন এক কথায় রাক্ষুসী ডাইনি বুড়ি।

তার বড় মা বলতো, — মানুষের ভেতর যেমন, বাহিরও ধীরে ধীরে তেমন হয়ে যায়। সেটা যেমন’ই থাক। কালা কি আর ধলা। অনেক সময় দেখবা কালো মানুষরেও লাগে পদ্ম ফুলের সুন্দর, মনে হয় নূরের একটা আলো বাইর হচ্ছে। দেখলেই মনে প্রশান্তির বাতাস বইয়া যায়। আসলে তার ভেতর পবিত্র। আর পবিত্র বলেই তার চেহেরায়ও পবিত্রা বিরাজ করে। আবার অনেককে দেখবা দেখতে খুব সুন্দর, গোছানো, পরিপার্টি। তবে চেহেরায় মায়া নাই। দেখলেই গা ছমছম করে, ভেতরে অন্য রকম আতঙ্ক লাগে। আসলে তার ভেতর ময়লা, পাপ। আমরা চোখের দেখায় বুঝি না, তবে এই যে ভেতরের আত্মা তা ঠিক অনুমান করতে পারে। আর পারে বলেই এমন লাগে।

আয়নার মনে হয় এই জয়তুন আরার ক্ষেত্রেও তা ঠিক। গায়ের রং তার ধপধবে ফর্সা, বয়স হয়েছে চমড়ার ভাঁজতো থাকবেই। তবে চুল পরিপার্টি করে তেল দিয়ে গোছানো। ফর্সা মুখে সাদা – সোনালি মিশেলের চুলগুলো রোদে চিকচিক করছে। গায়ে সাদা গরদের কাপড়। সেই কাপড়ও যে যত্নের তা দেখেই স্পষ্ট। হাত, পা, শরীর বয়সে দূর্বল হলেও কোথাও তাদের দাদির মতো রুক্ষতা নেই। দেখেই বোঝা যায় নরম, কোমল। মাটির স্পর্শ পায় না বললেই চলে।

তবুও দেখে আয়নার গলা শুকিয়ে এলো। ভেতর রিতিমতো কাঁপছে। অথচ ঐ যে শহুরে আপাটা। কোন পরিচয় নেই, চোখের দেখা নেই। তবুও এক ঝলক দেখলেই মনে কি শান্তি। আয়নার মনে হয় এই আপার ভেতর টা পবিত্র। আর পবিত্র বলেই এমন।

বলেই আয়না আড়চোখে আশে পাশে একবার তাকালো। বউয়ের কথা শুনে আশ পাশ থেকে মেয়ে বউরা দৌড়ে এসেছে। সেই দিন জয়তুন আরা ধমকে তাড়িয়ে দিলেও আজ হাসি মুখেই সবার সাথে কথা বলছে। পানের বাটা এগিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর এতো মানুষের মাঝে আয়না সেই স্বস্তির মুখটা খুঁজে পেলো না। তাই তার ভয়ের সাথে মনটাও খারাপ হলো। অবশ্য এই খারাপ লাগা কারো চোখে পড়ল না। সবার চোখে পড়ল আয়নার চোখ ধাঁধানো রুপ। সেইদিন ছিল ক্লান্ত বিধ্বস্ত, আজ চেহেরায় চাঁদের কলঙ্কের মতো রক্ত জমাট বাঁধা নেই। যেটুকু আছে সেটা অস্পষ্ট। মাথায় ব্যান্ডেজ, চোখ মুখ কিছুটা শুকনো থাকলেও তাতে রুপের ঝিলিকে কমতি নেই।

এক এক করে সবাই নতুন বউয়ের মুখে মিষ্টি ছোঁয়ালো। বরণ করলো। করতেই জয়তুন হাঁক ছেড়ে বললো, — ঐ, শাহবাজ কই রে। বউ কি হাঁইটা ঘরে যাইবো নি?

শাহবাজের টিকিও কেউ খুঁজে পেলো। আয়না মনে মনে হাফ ছাড়লো। তার হাফ অবশ্য বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। এই বড় জোড় ঘন্টা খানেক। ততক্ষণে আয়না বসার ঘরে আরাম করে বসেছে। মাথায় ঘোমটা। অনেকেই আসছে যাচ্ছে।

তখনি তার আরামকে বেরাম করে সারেং বাড়ির বসার ঘরে দুই বস্তা কাগজের ফুল নিয়ে কালাম এলো। জয়তুন ভ্রু কুঁচকে বললো, — এগুলো কি রে কালাইমা?

তখনি শাহবাজ ভেতরে এলো। আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে একগাল হেসে বললো, — বুবুজান রাতা মুরগি জবাই, সবচেয়ে বড় দোকানের মিষ্টি আনলে শুধু হবে। আসল কাজ’ই তো করো নাই। পিরিতের বউ আমার, আমাকে বিয়ে ছাড়া উপায় নাই। সে কি শাহবাজের বুকে সাদামাটা ঘরে আইবো নি? তাইতো এই আয়োজন। তার জন্য এইটুকু’ই যদি না করতে পারি, তো বুবু করলাম টা কি?

জয়তুন যেন খুব মজা পেল। খিক খিক করে হেসে বললো, — দূর হ হারাজাদা। লাজ লজ্জায় বালায় নাই।

— ওতো বালায় টালাই নিয়ে ভাবার সময় নাই। বলেই কালামের দিকে তাকিয়ে বললো, — যা ভাই সুন্দর করে বাসর টাসর সাজা। জীবনের প্রথ্ম বিয়া, প্রথ্ম বউ, প্রথ্ম বাসর ঘর। কোন কমতি যেন না থাকে।

কালাম সব সময়ের মতো নির্বিকার চিত্তে উপরে গেলো। শাহবাজ হাত পা ছড়িয়ে ঠিক আয়নার সামনে বসলো। বসে বললো, — মাথার যন্ত্রনা কমেছে বিবিজান? কমলে বলবেন। আমি নিজ দায়িত্বে আবার বাড়ানোর চেষ্টা করবো। শাহবাজকে বিয়ে ছাড়া তো আপনার উপায় ছিল না। সেই উপায়ের ঝালতো একটু সহ্য করতেই হবে, তাইনা?

আয়না উত্তর দিলো না। তার গোল গোল চোখে তাকিয়ে রইল। আর একটা জিনিস ঠিক বুঝলো, — মিথ্যা বলে বিয়ের জন্য, এ তাকে জানে মারবে না তবে তিলতিলে শাস্তি ঠিক দেবে।

আর এই আতঙ্কেই সে ঢোক গিললো। আয়না অবশ্য জানে না। তার ভেতরের সব আতঙ্ক চোখে মুখে স্পষ্ট বিরাজমান। আর সেই বিরাজমান দেখেই শাহবাজ হাসলো। দু’ঠোঁট ছাড়িয়ে হাসা। আর হেসে’ই আয়নার চোখে চোখ রেখেই, চোখ মারলো।

চলবে…..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here