ধূপছায়া #নূপুর_ইসলাম #পর্ব_১৯

0
2

#ধূপছায়া
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_১৯

মিঠাপুকুরের নীল আকাশে, কালো মেঘ সারাদিন শিমুলের তুলোর মতো উড়াউড়ি করলেও, কিছু রোদ তখনও ঝলমল করছিল। তবে মেঘ মনের বিষাদ নিয়ে জমাট বাঁধলো সূর্য ডোবার পরে। তাই তো হঠাৎ করেই সন্ধ্যার পরে এক ঝুম বৃষ্টি মিঠাপুকুরের মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। আকাশে তখনো কিছু তারার মেলা, লুকানোর সুযোগ পায়নি। আবহাওয়া আগের মতোই গুমোট, মাটি খরখরে। সেই খরখরে বুকে বড় বড় ফোঁটার এক পসলা বৃষ্টি ঝুম ঝুম করে মাখিয়ে দিয়ে গেলো। আর মাখতেই পুরো মিঠা পুকুর গ্রামটা অন্ধকারে তলিয়ে গেলো।

একটু ছুতো পেলেই বিদ্যুৎ গায়েব। অথচ দেখো মাটিটাও ভিজেনি। আম্বিয়া গজ গজ করতে করতে হারিকেল জ্বালালো। জয়তুন ততক্ষণে মশারির ভেতরে। সেখান থেকেই বললো, — সবার খানাপিনা শেষ?

এরশাদ ভাই, শাহবাজ কেউ ফিরেনি। দুপুরে খেয়ে বেরুলো আর খবর নেই। বাকি সবার শেষ। ছোট চাচা ভাত খায়নি। শুধু একগ্লাস গরম দুধ খেলো।

— ক্যা, শরীর ভালো না ?

— তা আমি কি করে জানবো? সে কি কাওকে কিছু বলে? আগে তো রুম থেকেও বের হতো না। এখন কারণে অকারণে ঘুরাঘুরি।

জয়তুন কিছু বললো না। হিসেব এখনো বাকি। বাকিটা শোধ হোক। তারপরে আবার নতুন করে কথা। সে উঠে বসলো। কোমর বাঁকা হয়েছে পুরোপুরি সোজা হতে পারে না। সেভাবে বসে বললো, — নয়া বউ কই?

— এখনো বীণার রুমে। সই পেয়েছে তোমার নাতনি। গুটুর গুটুর করে এক দিনেই পেটের সব কথা শেষ। এমন ননদ কপাল জুড়ে মেলে। কাপড় টাপড় তো কিছু নেই। বাড়ি ভরা বেরং কাপড়। গেছে বৈশাখে লাল পাড়ের একটা শাড়ি দিলেনা বীণাকে? সেটাই ভাবিকে হাত, মুখ ধুয়ে গুছিয়ে দিয়েছে পরে। মেয়েটাই আসলেই সুন্দর বুঝেছো। গা থেকে যেন আলো বের হচ্ছে।

— এরশাদের বেলায় তো দেখতেই পারোস নাই। তখন ছিল কালমুখি আর আজ আবার এতো গুণ। ভালো! এক মুখে’ই মধু, বিষ। হজম করিস কেমনে?

— যেভাবে তুমি করো। কাল পর্যন্ত তো চোক্ষের বালি ছিল। আজ তাকেই আদর সোহাগে ভরিয়ে দিচ্ছো।

— সেটা তো আমার নাতির জন্য। তোর কিসের ঠেকা?

আম্বিয়া উত্তর দিল না। ছাদ থেকে বিকেলে কাপড় তুলেছে সেগুলো গুছিয়ে আলনায় রাখলো। জয়তুন সেই দিকে তাকিয়ে খিক খিক করে হাসলো। সারেং বাড়ির প্রতিটি ইটের কোণার খোঁজ তার কাছে আছে। তাই হেসেই বললো, — আমার গহনার বাক্সগুলো আন।

আম্বিয়া আলমারি খুলে এক এক করে মশারির ভেতরে এগিয়ে দিলো। এই বাড়ির প্রতিটা কোণার খোঁজ যদি জায়তুনের কাছে থাকে তার কাছে আছে প্রতিটা কোণার মায়া, যত্ন, আদর, আগলে রাখা। জ্ঞান হওয়ার পর থেকে এই হাতেই তো সব করেছে। অথচ এই বাড়ির সে কিছু না। এই যে নয়া বউ। পা রেখেছে সবে। তবে যে ক্ষমতা সারেং বাড়িতে এই মেয়ের আছে তার ধূলিকনার সমানও নেই। আশ্রিতা, কাজের লোক সে। তাদের মতো মেয়ের স্বপ্ন দেখতে নেই, ভালোবাসতে নেই। কেউ হাত ধরে কোণায় টেনে নিলে গদগদ করতে করতে চিত হয়ে শুয়ে পড়বে। তার মাকে’ই কত নিজের চোখে দেখেছে। অথচ তার শরীর ভরা দিয়ে রেখেছে ঘেন্না। কাজের মানুষ, কাজ করে যাবে তা না। অবশ্য জয়তুন বিয়ের সময়ে ঠিক পাত্র জোগাড় করেছিল।

যে জয়তুনকে করবে, তাকে তার প্রাপ্য দিতে সে কখনোও কার্পণ্য করে না। আম্বিয়া নিজেই বিয়ে করে নি। এই ঘর, এই সংসারের প্রতিটা ভাঁজে ভাঁজে তার মায়া। না থাক অধিকার। মায়া কি আর এতো কিছু বোঝে?

জয়তুন সব টেনে নিজের কাছে নিলো। কতো গহনা! অথচ পড়ার মানুষ নেই। সে দেখতে দেখতে বললো – নয়া বউর যা যা লাগে সব আনার ব্যবস্থা কর।

— আমি করবো কেন? যার বউ সে করুক। বাসরের ব্যবস্থা করতে পারে। কাপড়, চুড়ি, আলতার করতে পারবে না কেন?

জয়তুন হাসলো! তার নাতি এরা। সে ভালো করেই জানে কি চলছে। সে হেসে কিছু গহনা আলাদা করে বললো, — এগুলো নয়া বউ গায়ে দিয়ে দে। সারেং বাড়ির বউরা কখনো খালি গায়ে থাকে না।

আম্বিয়া বাকি বাক্সগুলো সুন্দর করে আগের মতো তুলে রাখলো। সব সময় সে’ই রাখে। এই বাড়ি সংসারের চাবি সব তার হাতেই। তবুও কখনো লোভ করেনি। অবশ্য সবার লোভ কি শাড়ি গহনা হয়? হয় না। কাজের লোক, আশ্রিতা। থাকবে টাকা, গহনার লোভ। অথচ সে করেছিল বামুন হয়ে চাঁদের। ঝলসে তো যাবেই। সে রেখে বাকি গহনাগুলো হাতে নিতে নিতে বললো, — ও হ্যাঁ বিয়ের সময় যেই গহনা দিয়েছিলে সেগুলো সাবিহা দিয়ে গেছে। সেই দিন রাতে খুলে তাদের কাছে রেখেছিল। কয়েকটার অবস্থা তো বেহাল। বউ সেজে কোন কুস্তিগিরি খেলেছে তোমার নাতির সাথে কে জানে? গ্রাম শুদ্ধ মানুষ বুঝি চোখে ঘোল খাবে?

— কুস্তিগিরি করুক, যাই করুক। তোর কি? সুন্দর করে তুলে রাখ। নতুন করে গড়ানো যাবে। বলেই জয়তুন আবার শুলো। শুতে শুতে বললো, রাত তো মেলা, নয়া বউরে শাহবাজের রুমে দিয়ে আয়।

— অন্ধকারে ভয় পাবে না। পুরো দু’তলা খালি। ছোট চাচা এক কোণে। শাহবাজ আসুক তারপরে না হয় যেত।

— যা বলছি তাই কর। রাত বিরাতে সাত গ্রাম ঘুরছে তখন ভয় করে নাই। এখন যতো ঢং। তাছাড়া যতোই বাসর ঘর সাজিয়ে পাতিয়ে রাখুক। লাথি দিয়ে ঘর থেকে না বের করলেই হলো।

আম্বিয়া আর কিছু বললো না। একহাতে গহনা আরেক হাতে হারিকেন তুলে বীণার রুমের দিকে গেলো। তার আর বীণার রুম পাশাপাশি। ছোট বেলা দাদি সাথে ঘুমাতো। এই কিছুদিন হলো নিজের রুম নিয়েছে। রাত করে পড়ে। দাদিতো সন্ধ্যা হতে না হতেই বিছানায়।

দোতলার মাঝামাঝিতে শাহবাজের ঘর। দু’তলায় তিন তিনটা মানুষের বসবাস হলেও তিনজনে তিন প্রান্তের বাসিন্দা। এককোণে জাফরের, আরেক কোণে এরশাদের। এরশাদের রুমটা একেবারে শেষ মাথায়। তেমন বড় না, বরং বাড়ির সবচেয়ে ছোট’ই। পুরো রুমে একটা জানালা, তার মধ্যে একেবারে শেষের। আলো বাতাসও কম, দেখতেও সাধারণ। সেই সাধারণ রুমটা সে নিজের ইচ্ছায় নিয়েছে, নিজের মতো থাকে।

শাহবাজের অবশ্য সেই রকম কোন ধাত নেই। তার এসে পটাং করে শুয়ে রাতটুকু কাটালেই হলো। দরজা – তো ভালোই আম্বিয়া, বীণা মনে করে যদি জালানা না লাগায় বা না খোলে। সেই জানালা দু’তিন দিনেও সে আর না লাগাবে না খুলবে। এমনিই এসে পড়ে পড়ে ঘুমাবে।

একসময় এই ঘরটা ছিল এদের বাবা, মায়ের। তাই চওড়া দরজা, কাঠের সিলিং, দেয়ালের গা বেয়ে পুরনো কাঠের আলমারি। জানালার ফাঁকে ফাঁকে ঘন পর্দা। চারিদিকে কি সুন্দর কারুকাজ। এখন অবশ্য আগের মতো ওতো গোছানো নেই। তবুও সবচেয়ে সুন্দর রুমটা যেন এটাই। আর এই ঘরেই আয়না পা রাখলো মনে মনে এক সাগর আতঙ্ক নিয়ে। এই যে এতো সুন্দর রুম, এতো সুন্দর সুন্দর আসবারপত্র। সে তো কখনো দেখেনি। তাদের বাড়িতে ছিল কাঠের একটা চৌকি তাতে বিছানো থাকতো চটের বস্তার উপরে কয়েকটা ছেঁড়া কাঁথা। আসবার বলতে তাদের কিছু ছিল না। ছিলো ঝং ধরা কয়েকটা ট্রাঙ্ক আর বাঁশের তৈরি আলনা। আর এই যে এতো কিছু, গায়ে নতুন শাড়ি, গা ভর্তি গহনা। এগুলো তাকে বিমোহিত করলো না। বরং গায়ে জোঁক পেঁচানো দেখলে যেই অনুভূতি হয়, আয়নারও ঠিক সেই রকম হলো।

আম্বিয়া হারিকেনটা জানালার পাশে রেখে পেছন ফিরে তাকালো। আয়না জড়সড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে খাটের পাশে। চোখে মুখে ভয় স্পষ্ট। এটা অবশ্য নতুন কিছু না। বিয়ের পরে প্রথম প্রথম এমন ভয় সব মেয়েদের চোখে মুখেই থাকে। আম্বিয়ার বিয়ে না হোক, বয়সতো কম না। এমন কত দেখলো। দু’দিন যেতে না যেতেই এই ভয় মুচকি হাসিতে পরিণিত হয়। অবশ্য বলতেই হবে কালাম বাসর ঘরটা সাজিয়েছে সুন্দর করে। লাল, সবুজ কাগজের ফুল তার মধ্যে চিকচিক জড়ি। পালঙ্ক টা দেখতে ভালো লাগছে। আর সেই কাগজের লাল, সবুজ ফুলের পাশে লাল শাড়ি, হাতে, নাকে, গলায় গহনা পরা মেয়েটার মাথায় ব্যান্ডেস, কোন সাজসজ্জা না থাকলেও যেন চোখ ফেরানো দায়।

আম্বিয়া তাকিয়েই নির্বিকার গলায় বললো — শুয়ে পড়ো। এই বাড়ির নাতিরা কখন ফিরে তার কোন হদিস নাই।

আয়না একটু এগিয়ে খাটের কোণা ঘেঁষে আস্তে করে বসলো। এতো বড় বাড়ি। ভেতরে বসবাস হাতে গোনা মাত্র কয়েকজন মানুষের। বিদ্যুৎ যেতেই কেমন গা ছমছম করছে। অথচ তাদের বাড়ির ছোট্ট টিনের ঘরে ফিসফিস করে কথা বললেও এই রুম থেকে ঐ রুমে সব শোনা যায়। আর এখানে গলা চেপে ধরলেও কেউ বোঝার নেই। সে আস্তে কোমল করে বললো, — আমি একা থাকব?

— তো? আমি কি বসে বসে এখন পাহারা দেবো? সূর্য উঠতেই তো আবার দুনিয়ার কাজ! তার মধ্যে যে আসুক দরজা খুলতে হয় তার। সন্ধ্যার পরে সে ছাড়া দরজার কপাটে কারো হাত রাখা নিষেধ। এরশাদ ভাইয়ের নিষেদ। কড়া করে নিষেধ।যদি কেউ ঢোকে সেটা আম্বিয়া নেবে, যদি কেউ বের হয় আম্বিয়া দরজা দেবে। আর এর মধ্যে যদি কারো কিছু হয়, এরশাদ ভাই হেসে হেসে তার গলায় ছুরি চালিয়ে দেবে।

আয়না আর টু শব্দ করলো না। করে কোন লাভ। এখানে সে কেউ না। আম্বিয়াও বললো না, দরজা টেনে চলে গেল। যেতেই আয়নার বুক ধক করে উঠল। হারিকেনের হলুদ আলোয় ঘরটা আরও বেশি অচেনা আর বিশাল মনে হলো। তবে সে না নড়লো, না খাটে উঠে শুলো। যেভাবে বসে ছিল, সেই ভাবেই বসে রইল। বসে থাকতে থাকতে কখন যে চোখ লেগে গেলো বুঝতেই পারলো না। সেই ঘুমের মাঝে আয়না স্বপ্ন দেখলো, — একটা ছোট্ট নৌকায় বসে আছে। গায়ে সেই দিনের বিয়ের বেনারসি, সেই সাজ, সেই গহনা। নৌকায় কোন মাঝি নেই। সে ভয়ে আশে পাশে তাকালো। পানি আর পানি। কোন কূল- কিনারা নেই। তখনি এক বাতাসে ছোট্ট নৌকাটা উলটে ফেললো। আর ফেলতেই আয়না ঝট করে চোখ খুলে সোজা হয়ে গেলো।

খুলে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলার অবশ্য সময় পেলো না। দরজায় হেলান দিয়ে শাহবাজ দাঁড়িয়ে আছে। হাতে সাদা ঘোলা একটা কাচের বোতল। সেখান থেকেই এক ঢোক গলায় ঢাললো।

আয়না ঘুম, স্বপ্ন, আকস্মিক ঘটনায় কোন হালচাল দেখাতে পারলো না। শুধু হা করে ড্যাবড্যাব চোখে তাকিয়ে রইল।

শাহবাজ হাসলো! অবশ্য হাসির চেয়ে দু’ঠোঁট ভেঁটকানো বললে বেশি ভালো হবে। সেই ভয়ংকর ভেঁটকানো ঠোঁট দু’টো আরো ভেঁটকিয়ে বললো, — মাথার যন্ত্রনা কমেছে বউ?

আয়না উত্তর দিলো না। আগের মতোই তাকিয়ে রইল। তবে হাঁটুর উপরে রাখা হাত দু’টো ঠিক শাড়ি মুঠো করে ধরলো। সেই মুঠো করা হাত দু’টো হালকা বাতাসে ফুলের পাপড়ি গুলো যেমন কেঁপে কেঁপে উঠে ঠিক সেই ভাবে তিরতির করে কাঁপতে লাগলো।

শাহবাজ ভেতরে এলো স্বাভাবিক ভাবে। স্বাভাবিক ভাবেই দরজায় খিল দিলো। না নেশা হয়নি তার। খেলোই মাত্র এক ঢোক। এই এক ঢোক শাহবাজের কাছে এক বিন্দু সমান। আর এই বিন্দু পরিমাণ সে ইচ্ছে করেই খেয়েছে। সে নিজেও চায় না তার নেশা হোক।

তাই খিল দিয়ে চেয়ার টেনে আয়নার ঠিক সামনে বসলো। বোতলটা রাখলো সাইডে। রেখে বললো, — যখনি দেখি গোল গোল চোখে তাকিয়ে আছো। লাজ, লজ্জা বলে কিছু আছে?

আয়না তাও চোখ ফেরালো না। আসলে সে থমকে আছে। সেই থমকে যাওয়া চোখের দিকে তাকিয়ে শাহবাজ আবার বোতল হাতে নিলো। নিয়ে আরেক ঢোক খেলো। খেতে খেতে বললো, — চিন্তা করোনা। নেশা আমার হয়নি, তাই ভুলেও ভাববে না যা বলছি, যা করছি নেশার ঘোরে করছি। আমি স্বজ্ঞানে, স্বেচ্ছায় সব করছি। বলেই বোতল তুলে পুরোটা আয়নার মাথায় ঢকঢক করে ঢাললো।

আয়নার তিরতির করে কাঁপা এখন থরথরে রুপ নিলো। আর মদের গন্ধে নাড়িভুড়ি সব উল্টে এলো। সাথে সাথে’ই হাত দিতেই নাক, মুখ চেপে ধরলো। কোন জিনিসের এমন বিশ্রী দুর্গন্ধ হতে পারে তার জানা ছিল না।

শাহবাজ যেন সেই কাঁপুনি ঠিক উপভোগ করলো। করে বুক প্যান্টের পকেট হাতিয়ে ম্যাচ বের করতে করতে বললো, — বাসর ঘর পছন্দ হয়েছে বউ?

আয়না চোখে মুখে আতঙ্ক নিয়ে একবার ম্যাচ, একবার শাহবাজের দিকে তাকালো। শাহবাজ নির্বিকার! নির্বিকার ভাবে ঘঁষে আগুন জ্বালিয়ে খুব খুব স্বাভাবিক ভাবে বললো, — কাপড় খোলো।

আয়নার মনে হলো সে ভয়, আতঙ্কে ভুল কিছু শুনেছে। তাই ভ্রু কুঁচকে তাকালো। শাহবাজ হেসে আগের মতোই বললো, — ভুল শুনোনি বউ! আমি কাপড় খুলতেই বলেছি। তাছাড়া এই রুমে খোলার মতো আপতত আর কিছু নেই।

আয়নার যেন বিস্ময় হওয়ার ক্ষমতাও শেষ হলো। সে চোখ বন্ধ করে ফেললো। আর চোখের কোণা থেকে গাল গড়িয়ে মুক্ত দানার মতো পানিরা ঝড়ে পড়তে লাগলো।

শাহবাজ দেখে অবাক হওয়ার ভান করে বললো, — ওমা কাঁদার কি হলো? স্বামীর সামনেই তো খুলছো। তাছাড়া বাসর ঘরে মানুষ আর কি করে ভাই আমার জানা নেই।

আয়না আগের মতোই বসে রইল। কান্না গলায় আটকে হেচকির মতো আসছে। শাহবাজের জ্বলন্ত ম্যাচের কাঠি হাতেই নিভলো। শাহবাজ সেটা ফেলে আরেকটু এগিয়ে বসলো। বসতেই আয়না চোখ মুখ খিঁচে ফুঁপিয়ে উঠল। পায়ের উপরে শাহবাজ পা রেখেছে। ভালো ভাবেই রেখেছে। রেখে বললো, — আমি সব কিছু একবার’ই বলি বিবিজান। তবে আপনি আবার আমার পিরিতের বউ। তাই আরেকবার বলবো। যদি শুনেন ভালো, না শুনলে তার পরে যা হবে, সেটার সব দায়ভার আপনার। বলেই আবার ম্যাচের কাঠি জ্বালালো। জ্বালিয়ে আগের মতোই স্বাভাবিক ভাবে বললো, — কাপড় খোলো।

এবার অবশ্য আয়না চুপচাপ বসলো না। শাহবাজের বলতে দেরি এক ধাক্কা মারতে দেরি হয়নি। ধাক্কা মেরেছেও শরীরের সব শক্ত দিয়ে। শাহবাজ চেয়ারে বসা ছিল সাথে সাথে উলটে পড়ল। আর পড়তেই আয়না দৌড়ে দরজার কাছে গেলো। গিয়ে অবশ্য লাভ হলো না। বিশাল কাঠের দরজা। যেমন পাশে, তেমনি উঁচু। শয়তানটা লাগিয়েছে উপরেরটা। আয়নার হাতও পৌঁছালো না। আর পৌঁছালো না বলেই ভয়ে ঝরঝরিয়ে কেঁদে ফেললো।

শাহবাজ মাথায় ব্যথা পেয়েছে। আঘাত ছিল, তার মধ্যে ব্যান্ডেস করা নেই। তবুও চোখ, মুখ কুঁচকে গড়াগড়ি করে হাসল। হেসে অবশ্য উঠল না। আরেকটু আরাম করে শুলো। শুয়ে বললো, — আপনার কলিজার তারিফ না করে পারি না বিবিজান। সেইদিন স্টেশনে চাপা খোলার হুমকিতেও চুপচাপ বসেন নি। আজও চুপচাপ করলেন না। সব কিছুতে এতো মাতব্বরি ভালো বয়ে আনে না। সেইদিনও আনে নি, আজও আনবে না।

বলেই ঝট করে উঠল। উঠেই এক ধাক্কায় আয়নাকে দরজার সাথে মিশিয়ে ফেললো। মেশাতে দেরি কাপড় টেনে খুলতে দেরি হয়নি।

আয়না ব্যথায়, লজ্জায় কুকড়ে গেলো। লাল ব্লাউজ, পেটিকোটে ফর্সা নিখুঁত শরীরের দিকে শাহবাজ ফিরেও তাকালো না। তার চোখ টকটকে লাল। সেই লাল লাল চোখে তাকালো টলমলে পানি ভরা আয়নার চোখের দিকে। সেই চোখের দিকে তাকিয়ে চিবিয়ে বললো, — সেই দিন ভরা মজলিসে যখন আমার নামে মিথ্যা বলেছিলি। আমারো ঠিক এমন লেগেছিল। মেয়েদের গায়ের কাপড় আর ছেলেদের চরিত্র দুটোই এক। কি সুন্দর টেনে খুলেছিস। কি ভেবেছিস আমার মাথার বাড়ি ঢং করে নিজের মাথায় নিলেই বেঁচে যাবি? শাহবাজ এতো সোজা! দু’জনে’ই পরিস্থিতির শিকার ছিলাম। যদি গ্রামের মানুষ বিয়ে পড়াতো আফসোস থাকতো না। তবে মিথ্যা দাগ লাগালি কেন?

আয়না শাহবাজের চাপায় নড়তে পারছে না। তবুও কোন রকম হাত উঁচু করে মাথায় হাত রাখলো। রাখতেই হাত ভিজে গেলো। দরজায় বাড়ি খেয়েছে। কাঁচা সেলাই, বাড়িতে রক্ত বেরিয়ে এসেছে।

শাহবাজ সেই হাতও মুঁচড়ে ধরলো। আয়না এবার কোন শব্দ করলো না, না কাঁদলো। তবে মুখ ফিরিয়ে নিলো। শাহবাজ চাপা ধরে তার দিকে ফিরিয়ে আবারো চিবিয়ে বললো, — বড় ভাইয়ের হবু বউ। তাকে নিয়ে কাদা ছুঁড়লে কেমন ঘিনঘিন লাগে জানিস। জানিস না। জানলে করার আগে দশবার ভাবতি। শুধু সারেং বাড়ির সম্মানের সাথে জড়িয়ে গেছিসরে। তা না হলে এই শাড়ি আমি মিঠাপুকুর গ্রামের বাজারের মধ্যে খুলতাম। তোর ভাগ্য ভালো সারেং বাড়ির বউ তুই।

— না। বলেই আয়না ঢলে পড়ে যেতে নিলো। মাথার যন্ত্রনায় সে দাঁড়াতে পারছে না।

শাহবাজ খুব তাচ্ছিল্যের সাথে কব্জি আঁকড়ে ধরে ফেরালো। পড়লে আয়নার মাথা আজ শেষ। এতো সহজে শেষ হতে দেবে সে। বলেই ঝট করে কোলে তুলে নিলো। আয়না শরীর ছেড়ে দিয়েছে। সেই দেওয়া আর নিভু নিভু চোখে বিরবির করে অস্ফুটভাবে বললো, — আপনিও জানেন না, বাবা মায়ের খুনিদের ভাত গলায় নামাতে কেমন লাগে, কেমন লাগে তাদের কাপড় গায়ে জড়াতে, কেমন লাগে তাদের বাড়ির বউ হতে, কেমন লাগে তাদের পাপের হাতের স্পর্শ গায়ে লাগলে।

চলবে……

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here