ধূপছায়া #নূপুর_ইসলাম #পর্ব-২০

0
2

#ধূপছায়া
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব-২০

ঘড়ির কাটা তখন চারটা ছুঁইছুঁই। ফজরের আযান দেবে দেবে করছে। আর নিস্তব্ধতার চাদরে মোড়ানো সারেং বাড়ি যেন আরো নিস্তব্ধ হয়ে আছে। আর এই নিস্তব্ধতার গোলকধাঁধায় শাহবাজ ঘরের মাঝ বরাবর সোজা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে । রাগ, জেদ না অন্য কিছু বোঝা গেলো না। তবে তার দৃষ্টি খাটে ঝিকিমিকি জড়ির, লাল সবুজ কাগজের ফুলের মাঝে বেঁহুশ হয়ে পড়ে থাকা রমণীর দিকে।

যাকে কিছুক্ষণ আগে বলতে গেলে বড় অবহেলায়’ই খাটে ছুঁড়ে ফেলেছে। আর ফেলতেই কিছু একটা হলো। রাগে জেদে এতোক্ষণ খেয়াল না করলেও। এখন চোখের সামনে ফর্সা গায়ে লাল রঙ ঠিক ভেসে উঠল। আর উঠতেই এই যে রাগী, জেদী, পাষাণ, মানুষকে পিষে ফেলা পুরুষের বুকে কিছু একটা হলো। আর হলো বলেই রাগ যেন আরো তরতর করে বাড়লো।
শালী, বেহুঁশ হয়েও গিড়িংগিরি বন্ধ করার নাম নেই। ঐ ফরহাদ’ই ঠিক। মেয়ে জাত’ই খারাপ। বলেই এগুলো, সাইড থেকে কাঁথা নিয়ে লাটিমের মতো পেঁচালো। তার ইচ্ছে করলো এই মুখও পেঁচিয়ে ফেলতে। পুরুষ মানুষ, মেয়ে দেখছে মাথার তার তো ছিঁড়বেই। এটা আর নতুন কি? তবে এই মুখ টানবে কেন? কালনাগিনীর ঘরের কালনাগিনী। সুযোগ পেলে’ই ছোবল মারতে এতোটুকুও দেরি করে না। বলেই ইচ্ছে মতো কাঁথা পেঁচালো। পেঁচিয়ে অন্ধকারে হনহনিয়ে নিচে নেমে এলো।

এরশাদ রাতে ফিরেনি। আম্বিয়া বসে থাকতে থাকতে কখন চোখ লেগেছে জানে না। আর সেই না জানার মধ্যেই দরজায় দু’টো পড়ল। আম্বিয়া ধড়ফড়িয়ে উঠল। আল্লাহ হইছে কি? হড়বড় করে মশারি তুলে বের হলো। দরজা খুলতে দেরি, তবে এক হেঁচকা টানে হতম্ভব হয়ে গেলো। হতম্ভব কাটতে না কাটতেই গরুর মতো টেনে উপরে নিয়ে এলো।

আম্বিয়ার বুক ধড়ফড় করছে। সেই ধড়ফড়ের মধ্যেই হা করে চোখ বড় বড় করে তাকালো। আর কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে’ই রইল। একটু ধাতস্থ হতেই পটাপট কয়েকটা কিল ঘুসি শাহবাজের বাহুতে দিলো।

শাহবাজের চেয়ে সে দুই বছরের বড়। দুনিয়ায় এতিম হয়েছে এক সাথে, বড়ও হয়েছে এক সাথে। এখন আশ্রিতা কাজের লোক হলেও ছোট বেলায় এই ভেদাভেদ ছিল না। বরং বড় বোনের মতো ঊনিশ থেকে বিশ হলে ঠিক কান মুচড়ে ধরেছে। এখন অবশ্য ধারের কাছেও ঘেষা যায়না। বড় হতে হতে একেকজন অন্য জগৎতের বাসিন্দা হয়ে গেছে। তার সাথে হয়েছে মেজাজ, রক্তে ঢুকেছে বংশের অহম , হয়েছে টাকার পয়সার গরিমা। অথচ ছোট বেলায় একটু কিছু হলেই আম্বিয়াবু, আম্বিয়াবু বলে দৌড়ে গলা ধরে ঝুলে পড়তো।

আম্বিয়া কিল ঘুসি দিতে দিতে দাঁত চিবিয়ে বললো, — মাইরা ফেলেছিস তুই?

শাহবাজ বিরক্ত হলো। বিরক্ত মুখে হাই তুলে বললো, — হ্যাঁ! এখন যা লাশ নিয়ে বিদেয় হ। খবরদার আমার রুমের আশেপাশে এই মেয়েকে যেন না দেখি।

— দেখি না মানে? বউ কার?

— আমি কি জানি? পানিতে চুবিয়ে জ্ঞান ফেরা। তার পর জিজ্ঞেস কর কার বউ।

— জ্ঞান ফেরাবো মানে? অজ্ঞান হয়ছে ক্যা ?

শাহবাজ উত্তর দিলো না। ধপ করে আয়নার পাশে’ই শুয়ে পড়লো। ফুলের সাজানো খাটে আয়না সোজা লাঠির মতো শুয়ে আছে। গায়ে কাঁথা পেঁচানো। মাথাটা অবশ্য হেলে পড়ে আছে। সেই মাথার সাদা ব্যান্ডেস লাল হয়ে আছে। শাহবাজ অবশ্য অন্য পাশে ফিরে শুয়েছে। শুয়ে চোখ বন্ধ করতে করতে বললো, — একে তুলে নিয়ে বিদেয় হ।

— তুলে নিয়ে বিদেয় হ মানে? লাদা বাবু? কোলে তুলে দৌড়ে যাবো। তাছাড়া কি করেছিস তুই?

— কিছুই না। করলে একে খুঁজে পাওয়া যাবে। এখন যা নিয়ে ভাগ।

আম্বিয়ার ইচ্ছে করলো এই শয়তানের মাথায় দুটো দিতে। সে বিরক্ত মুখেই এগিয়ে গেলো। গায়ের কাঁথা টেনে সরালো। দেখতো, এমন ভাবে কেউ পেঁচায়? লাশকে পানিতে ফেলতেও তো এমন শক্ত করে কেউ পেঁচায় না।

কাঁথা সরাতেই দেখলো গায়ে কাপড় নেই। আম্বিয়া রুমের দিকে তাকালো। কাপড় এক কোণে জড়সড় হয়ে পড়ে আছে। চেয়ার উল্টো। তার পাশেই ম্যাচ। ঘর স্যাঁতসেঁতে ভেজা। কিছু একটার দুর্গন্ধ নাকে লাগছে। সেটা কি বুঝতে বাকি রইল না। তবে শয়তানটা করেছে টা কি? সে বিরক্ত মুখে বললো, — তুই উঠবি শাহবাজ। তা না হলে আমি ছোট চাচাকে গিয়ে ডেকে তুলবো।

— ডাক নিষেধ করেছে কে?

আম্বিয়া কপাল চাপড়ালো। ছোট চাচাকে ভুলেও ডাকা যাবে না। তিনি অন্য রকম। তাছাড়া ডাকার মতো অবস্থা এটা? আম্বিয়া কি করবে দিশে পায় না। সে শাহবাজ ধাক্কা দিয়ে বললো, — উঠবি শাহবাজ?

শাহবাজ নড়লো না। আম্বিয়া নিজেই খাটে উঠে গেলো। টেনে সুন্দর করে শোয়ালো। গা গরম হচ্ছে। মনে হয় জ্বর আসবে। মাথার ব্যান্ডেজের কি করবে? আল্লাহ! এই জীবনে একটা রাতও শান্তিতে দু’টো চোখ এক করতে পারলো না।

আম্বিয়া দাঁত চিবিয়ে বললো, — আমার রুম পর্যন্ত দিয়ে আয় হারামজাদা। তার পরে মরার ঘুম ঘুমা।

শাহবাজ এবার উঠল। আয়না ছোট খাটো মানুষ, এগিয়ে হাত ধরে টেনে ঝট করেই কোলে তুলে নিলো। নিতেই মাথাটা এলিয়ে পড়ল। আর পড়তেই ফর্সা গলা, কাঁধে লালচে আচড়ের দাগ গুলো শাহবাজের নজরে পড়ল। রাগের মাথায় কাপড় টেনে খুলেছে। তখন হয়ত লেগেছে। শাহবাজ চোখ ফিরিয়ে নিলো। নিয়ে সাথে সাথে’ই আবার খাটে শুয়িয়ে দিলো। এবার অবশ্য আগের মতো ছুড়ে মারেনি। বরং আস্তে করেই শোয়ালো। শোয়াতেই তার কানে আয়নার অস্ফুট কথাগুলো বাজতে লাগলো। আর লাগলো বলেই শাহবাজের সাথে সাথে’ই ভ্রু কুঁচকে গেলো। এর বাবা মায়ের আবার কাহিনী কি?

আম্বিয়া বিরক্তগলায় বললো, — আবার কি হলো?

শাহবাজ উত্তর দিলো না। আয়নাকে রেখে সে নিজেই বেরিয়ে এলো। শুধু রুম থেকে না বরং ঘর থেকেই। বেরিয়েই তাদের লম্বা টানা সিঁড়িতে পা ছড়িয়ে মাথা নিচু করে বসলো। তার নিজের মাথায়ও যন্ত্রনাও হচ্ছে। চেয়ার উল্টো পড়েছে। কালনাগিনী এমনি হেবলা সেজে বসে থাকে। থাকতে থাকতে এমন এক কাজ করে বসে। মেজাজ এমনিতেই তুঙ্গে উঠে।

সেই তুঙ্গে মেজাজ নিয়ে যেভাবে ছিল সেভাবেই কিছুক্ষণ ঝিম মেরে বসে রইল। সেই দিনের পর থেকে রাতে জয়তুন আরার লোকদের ঘুমানো নিষেধ। কালাম দেখে এগিয়ে এলো। তাকে দেখে শাহবাজ মাথা তুললো না, তবে বললো, — ভাই কই?

— শহরে গেছে।

শাহবাজ কপালে কয়েকটা ভাঁজ পড়ল। ভাই কখনোও গ্রামের বাইরে যায় না। যা কাজ লোক দিয়ে করায়। অতি দরকার থাকলে চাচা যায়। সে ভ্রু কুঁচকে বললো — হঠাৎ?

— কিছু বলে যায় নাই। শুধু বলেছে সকালে দিকে ফিরে আইবো।

— একা?

— হ।

শাহবাজ সেভাবেই আরো কিছুক্ষণ বসলো, তারপর বললো, — আয়নারমতির চাচার নাম যেন কি?

— বশির।

— ওর বাপের নাম কি?

— বাহার।

— মারা গেছে কবে?

— মেলা দিন, ভাবির বয়স এক দুই হতে পারে।

— মরছে কিভাবে?

— তা তো জানি না। তবে আপনাদের ইটের ভাটার লেবার ছিল। কাজের জন্য বাড়ি থেকে বের হয়েছিল। আর ফেরেনাই।

শাহবাজের কপালের ভাঁজ আরো গাঢ় হলো। আয়নামতির বয়স এক দুই হলে সেই হিসেবে ইটের ভাটার দায়িত্ব ছিল ছোট চাচার। বাবার মৃত্যুর পরে সে’ই সব দেখেছে। অবশ্য বেশি দিন না। বছর পাঁচেকের মতো হতে পারে। তার পর সব কিছুতে ভাই ঢুকে গেছে। অবশ্য ঢোকার আগে কেউ জানে না, জ্বলন্ত চিতার এক তান্ডব সে করেছিল। সেই দিন রাতে ডাকাতেরা পালিয়ে যেতে পেরেছিল মাত্র তিন চারজন। বাকি সবাই ছিল সারেং বাড়িতে। অবশ্য লাশ হয়ে। লাশ হলেও মুখতো না চেনার কিছু নেই। জ্ঞান ফিরতেই এক, এক করে সবার মুখ দেখেছিল সে। একটাও লাশ দাফন করতে দেয়নি । নিজের হাতে ইটের চুলায় জ্বালিয়েছে। শুধু কি তাদের? খুঁজে খুঁজে প্রত্যেকের পরিবারকে বের করেছে। তার এক কথা, এরা তার পুরো পরিবার শেষ করেছে। সেও করবে। এই পাঁচ বছরে এই গ্রাম, ঐ গ্রাম থেকে অনেকেই গায়েব হয়েছে। সবাই সব বুঝে, অনুমান করতে পারে তবে প্রমাণ বা কিছু বলার সাহস ছিটেফোঁটাও নেই। না থাকলেও গ্রামে ইটের চুলা নিয়ে সবার মাঝে আতঙ্ক আছে। শাহবাজ কেন? সারেং বাড়ির প্রতিটা মানুষ’ই জানে। অবশ্য কারো কিছু যায় আসে না।

তবে কি আয়নার বাবা, মা সেই পরিবারের মধ্যে থেকে কেউ। না হওয়ার চান্স’ই অবশ্য বেশি। কেননা যদি হতো আয়না তো ভালোই তার চাচা,চাচি, দাদি কাওকেই ভাই এখনো আস্ত রাখতো না। ইটের চুলায় ছাই ঠিক হয়ে যেত। তাহলে? সামান্য ইটের ভাটার লেবার। তাকে মেরে গুম করে কার কি লাভ?

শাহবাজ ভাবতে ভাবতে’ই উঠল! উঠতেই কালাম বললো, — কোথায় যান?

— তোকে বলতে হবে?

— রাতে এরশাদ ভাই বেরুতে মানা করছে।

— মানা করলে থাক। আমি কি তোকে ঘাড়ে করে বাইরে নিয়ে যাচ্ছি নাকি?

কালাম সেই কথায় আর গেলো না। অবশ্য বলে লাভও নেই। এই নাক বরাবর হাঁটা মানুষ। তাই অন্য ভাবে বললো, — আজ না আপনার বাসর রাত? বাসর রাত হলো কাল রাত। আযানের আগে বের হতে নাই। ভেতরে যান।

বাসরের কথা মনে হতেই আয়নার মুখ সামনে ভাসলো। ভাসলো তার সাথে অন্য কিছুও। আর ভাসতে’ই শাহবাজের ঝিমিয়ে যাওয়া রাগ তরতর করে আবার বাড়তে লাগলো। সেই রাগ নিয়েই নদীর ঘাটের দিকে যেতে যেতে বললো, — সকালে সদর থেকে ডাক্তার আনবি। সেলাইতে ঘষা লেখেছে। ব্যান্ডেজ বদলাতে হবে।

— কার?

শাহবাজ হেসে ফেললো। কার মানে? বাড়িতে মানুষ কয়জন, মাথা ফাটছে কতোজনের? সে রাগে, এতো এতো চিন্তা ভাবনায় খেয়াল করলো না, তার নিজের মাথাও ফাটা। তো কার উদ্দেশ্য বলছে কালাম বুঝবে কিভাবে?

তার কি আর এতো কিছু ভাবার সময় আছে? রাগ উঠলে সে চোখে দেখে না। তাই আবার ফিরে এলো। এসে স্বাভাবিক ভাবেই ধুম করে নাক বরাবর মারলো এক ঘুসি। মেরে বললো, — তোর! এই যে দেখ ফাটা। এখন এই নাকে ব্যান্ডেজ করবি। করে আবার সদর থেকে ডাক্তার এনে বদলাবি। বলেই আবার আগের মতোই নদীর ঘাটের দিকে এগিয়ে গেলো।

কালাম নাকে হাত দিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। নাকে থেকে রক্ত বের হচ্ছে। আম্বিয়া দেখে বললো, — সঙের মতো দাঁড়িয়ে আছিস কেন? শাহবাজ কই?

— চলে গেছে।

— চলে গেছে মানে?

কালাম নির্বিকার চিত্তেই বললো, — নাক ফাটিয়ে, ডাক্তার আনতে বলছে।

আম্বিয়া বিরক্তমুখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর ধরাম করে দরজা লাগিয়ে দিল। জ্বালা যন্ত্রনা আর ভালো লাগে না। সবাই সব কিছু তার ঘাড়ে ফেলে আরামছে নিরুদ্দেশ হয়।

আজ পৃথিলার জীবনের এক নতুন সকাল। অবশ্য এই নতুন শুধু শিক্ষকতার জন্য নয়, বলা যায় জীবনে নিজের মতো করে প্রথম কিছু করার।

বিয়েটা করেছিল লেখাপড়ার মাঝামাঝি। তবে তারেক লেখাপড়াটা বন্ধ করতে দেয়নি বরং হাসিমুখে বলেছিল, – “নতুন চাকরি, অনেক খাটতে হবে। ওতো সময় হয়তো তোমাকে দিতে পারবো না। একা থাকতে থাকতে এক ঘেয়ে লেগে যাবে। তার চেয়ে ভালো পড়ালেখাটা চালিয়ে যাও। সময়ও কেটে যাবে, লেখাপড়াটাও শেষ হবে।

পৃথিলাও অমত করেনি। কথা সত্য! সারা দিন একা একা ফ্ল্যাটে করবে টা কি? ভাগ্যিস করেছিল। তা না হলে এখন কি করতো?

তবে দিন গুলো ছিল রঙিন। সকালবেলা দু’জনে একসাথে নাস্তা করত। তারপর যার যার পথে বেরিয়ে যেত। দুপুরে পৃথিলা ফিরতো, সন্ধ্যায় তারেক। তার ফেরার আগেই সব গুছিয়ে রাখতো। নিজ হাতে রান্না করতো, ঘর গোছাতো। তারেক ফিরলে বারান্দায় চায়ের কাপ নিয়ে দু’জনে বসতো। সময়গুলো বলতে গেলে একরকম স্বপ্নের মতো কেটেছিল। কে জানতো, সেই স্বপ্নই একদিন হয়ে উঠবে ফেলে আসা দিনের দুঃস্বপ্ন। যেই দুঃস্বপ্ন গুলো তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায়। খায় বলেই মুছে ফেলার কতো তাড়া।

পৃথিলা তার প্রথম ক্লাস নিলো খুব যত্ন, আদর মেখে। গুছিয়ে বলা, কোমল স্বরে বোঝানো সব মিলিয়ে প্রথম দিনেই সে ছাত্র – ছাত্রীদের মনে নিজের একটা সুন্দর জায়গা করে নিলো।

নেওয়ার অবশ্য কারণ আছে। স্কুলে সে একমাত্র নারী শিক্ষিকা। ছেলেরা প্রথমে একটু লজ্জায় পড়লেও, মেয়েরা একদিনেই আপন করে নিলো। আসলে পৃথিলার কথা বলার ভঙ্গিই এমন। ধীর, মায়া, যত্ন,আদর মাখানো। যেন ভয় পাওয়ার কিছু নেই। যেন সে নিজেদের কেউ।

পৃথিলার বেড়ে ওঠা শহরে শহরে হলেও, শহরের মেয়েদের মতো হাবভাব তার মধ্যে নেই। অবশ্য এর পুরো কৃত্বিত্ব তার মাকে দেওয়া যায়। তিনি পৃথিলাকে বড় করেছেন একটা খোলসের ভেতরে। আর করেছেন বলেই হয়ত পৃথিলা এমন। আবার হয়ত তার স্বভাব’ই এমন।

তা না হলেও এই যে মাটির গন্ধ, সবুজ ধানক্ষেত, এই যে স্কুলের কোণে বিশাল বট বৃক্ষ। এগুলো তাকে এতো টানে কেন? এই যে বাতাসে মাতাল করা ঘ্রাণ তাতে নেশা হয় কেন? পৃথিলা জানে না! শুধু জানে হৃদয়ের এই যে এতো কিছুু, এতো ক্ষত। এই সবকিছুতেই এই গ্রামের মন মাতানো প্রকৃতি যত্ন করে ধীরে ধীরে প্রলেপ এঁকে দিচ্ছে।

তখনি টিফিনের ঘন্টা পড়ল। সাদা- আকাশি নীল সুতির শাড়িতে, চোখে-মুখে প্রশান্তি নিয়ে পৃথিলা স্কুলের চত্বরে পা রাখলো। ছেলে মেয়েদের হুটোপুঁটি, মাঠে দৌড়ে কানামাছি খেলা, ঝালমুড়ির, আচারের দোকানে লাইন দেওয়া। পৃথিলার অজান্তেই তার ঠোঁটের কোণে হাসিরা ছড়িয়ে গেলো। সেই ছড়িয়ে যাওয়া সুন্দর স্নিগ্ধ হাসির রেশ নিয়ে ধীরে ধীরে ঘুরতে লাগলো। ঘুরতে ঘুরতে তার চোখ পড়ল বীণার উপরে।

বীণা বসে আছে বটগাছের শিকড়ে। সাথে তার দুই বান্ধবী। হাতে ঝালমুড়ি আর আচার। তখনি বেণীতে টান পড়লো। বীণা চোখ, মুখ কুঁচকে পেছন ফিরে তাকালো।

তাকাতেই রাজিব এক মুঠো বকুল ফুল ছুড়ে মারলো। তাদের ঝালমুড়ি, আচার তাতে মাখামাখি হয়ে গেলো। রাজিব তাদের সহপাঠী। সব সময়’ই এমন জ্বালিয়ে খায়। তাই বীণা রাগ নিয়ে বললো, — তোর নামে সত্যিই বিচার দেবো।

— দে, দিলে আমিও বলে দেবো। টিফিনে ছুটি নিয়ে কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়াস। পাশের গ্রামের ভাঙা মন্দিরেও কে যেন গিয়েছিল। তোদের বাড়ির কেউ জানে?

বীণার রাগ হলো। তোকে তো আমি বলেই ঝালমুড়ি আর আচার মুড়িয়ে রাজিবের দিকে ছুঁড়ে মারলো। রাজিব ফুরুৎ করে সাইড হয়ে গেলো। সে তো গেলো, তবে সাদা শার্ট পরনে ফরহাদের গায়ে ঠিক লেগে গেলো। আর লাগতেই থমকে দাঁড়ালো। সে মাত্রই বাসার উদ্দেশ্য যাচ্ছিলো। জ্বরে নেই তবে রেশ কিছুটা আছে তাই হাফ করে ছুটি নিয়ে নিয়েছে।

আর নিয়ে যেতেই এই দশা। সে দাঁড়িয়ে একবার নিজের শার্ট আরেক বার বীণার দিকে তাকালো।

বীণা তো শেষ। ভয়ে চোখ, মুখ শুকিয়ে এতোটুকু হয়ে গেলো। তখনি পৃথিলা এগিয়ে বীণার পাশে দাঁড়ালো! দাঁড়িয়ে নম্রভাবে বললো, — মজার বয়স! মজা করতে গিয়ে লেগে গেছে। ক্ষমা করে দিন। বলেই বীণা, রাজিবের দিকে তাকিয়ে বললো, — তাড়াতাড়ি স্যারের কাছে ক্ষমা চাও।

বীণার সাহস হলো না, হাড়ে হাড়ে চিনে তো। রাজিবের আবার নতুন ম্যাডাম খুব পছন্দ হয়েছে। তাই পৃথিলা বলতেই নেচে নেচে এগিয়ে গেলো। গিয়ে কিছু বলবে তার আগেই এক চটকানা তার গালে পড়ল।

পড়তে দেরি, গালে হাত রেখে দৌড় দিতে দেরি হয়নি। যমের গুরু এটা। বীণা যদি মুখ খুলে রেহাই থাকবে না। পৃথিলা বড় একটা শ্বাস ফেললো! ফেলে আগের মতোই বললো, — আপনার নিজের’ই এখনো অনেক কিছু শেখা বাকি। ছাত্র- ছাত্রীদের আর কি শেখাবেন। বলেই বীণার হাত ধরলো। ধরে বললো, — এসো, ভয় নেই।

বীণা কি করবে দিশা পেলো না। তবে পৃথিলার সাথে ঠিক গেলো। যেতে যেতেও একবার আড়চোখে ফরহাদের দিকে তাকালো। সে এখনো আগের জায়গায়ই দাঁড়িয়ে আছে। আল্লাহ গো, কালকে যে সকালে কি আছে একমাত্র সে’ই জানে।

চলবে……

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here