#ধূপছায়া
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_৪৩
আয়নার ঘুম ভাঙল প্রচণ্ড গরমে। রাত দিন টানা বৃষ্টি গেছে। গতকাল বৃষ্টি না থাকলেও সূর্য তার তেজ তেমন ভাবে তুলেনি। তবে আজ সারেং বাড়ির বিয়ের আয়োজনের মতো রোদও যেন পাল্লা দিয়ে ঠিক ঝিলমিল করছে। সেই ঝিলমিল আলো জানালা গলিয়ে আয়নার রুমে হুটোপুটি খাচ্ছে । সেই হুটোপুটিতে আলো ছায়ার খেলা রুম জুড়ে বিরাজ করছে নিজ ছন্দে। সেই ছন্দের সাথে রুম জুড়ে চিমটি কাটার মতো উষ্ণ গরমের ছোঁয়া। সেই ছোঁয়া কোমল নরম করতে ফ্যান চলার কথা, চললে সকাল বেলাতেই এতো গরম লাগার তো কথা না।
তাই আয়না হাঁসফাঁস করতে করতে চোখ খুলল। খুলতেই চোখ, মুখ, শরীর সব বরফের মতো জমাট বেঁধে গেলো। গত রাতে এই জমাট বাঁধার সুযোগ না পেলেও এখন ঠিক জমাট বেঁধে সোজা হয়ে গেলো। দৃষ্টি সোজা উপরে, ফ্যানের জায়গায় ফ্যান নেই, না থাক। সেটা বড় কথা না। বড় কথা, শয়তানটা তার পাশে তার মতোই শুয়ে আছে, সোজা স্বাভাবিক ভাবে । দেখতে সতেজ লাগছে, গোসল-টোসল করেছে মনে হয়। গায়ে সাদা গেঞ্জি, প্যান্ট, চুল গুলো আধভেজা। ঠিক করে মনে হয় মুছেও নি। কিছুটা জমাট বেঁধে আছে। অবশ্য কখনো চিরুনি লাগায় কি না সন্দেহ। তবে বিয়েবাড়ি, দুনিয়ার কাজ। হয়ত বেরোবে, তাই সাত সকালে বাবু সেজেছে। তো বেরিয়ে যা। বউ দরকার, বউ পেয়েছিস। আবার কি?
আয়না যেমন ছিল, সেই ভাবেই শুয়ে রইল। তাকে দেখতে লাগছে মৃত মানুষের মতো। গায়ে একটা কাঁথা পেঁচানো। সোজা লম্বা শুয়ে আছে। এই কাঁথা সে গায়ে দেয়নি। এমনকি কাপড়ও না। অথচ এই কাঁথার নিচে দিব্যি এগারো হাত কাপড় ছাড়া বাকি সবই আছে। তবে ব্লাউজের বোতাম মনে হয় উপর নিচ হয়েছে। তাই নিশ্বাস ফেলতে কিছুটা কষ্ট হচ্ছে। তাছাড়া কি হয়েছে, কখন, কিভাবে ঘুমিয়েছে সে ভাবতে পারছে না। মাথায় কেমন যেন জট পাঁকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে সে স্বপ্ন দেখেছে। এই যে দেখেই মাত্র ঘুম ভাঙল। তবে সে জানে কিছুই স্বপ্ন না, সব সত্য, একেবারে সত্য। এই যে তার পাশে শুয়ে আছে এই শয়তানটার মতো সত্য।
আয়না চোখ বন্ধ করে ফেললো। বেলা বেশি হয়নি। তবে বাইরে মানুষের শোরগোল শোনা যাচ্ছে। তার নিজেরও ওঠা দরকার। বীণা কাল কেঁদেছে। অনেক রাত পর্যন্ত ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছে। তার এতো খারাপ লাগলো। এমন একটা রাত তার জীবনেও গেছে। তাই মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছে। কাঁদতে কাঁদতে ক্লান্ত ছিল। তাই ঘুমিয়েছেও গেছে অনায়াসে।
বীণার ঘুমের পরেই সে এসে ঘুমিয়েছে। মাত্রই চোখটা লেগেছিল, তারপর’ই এক ঝাটকা। যেই ঝটকায় আয়না ভেঙেচুড়ে নিস্তেজ। তাই ওঠার কোনো রকম ইচ্ছা বা আগ্রহ আয়নার মাঝে দেখা গেল না। যেমন আছে, সেভাবে শুয়ে রইল। গায়ের উপরে পেঁচানো কাঁথা। সেই কাঁথার নিচে গরমে নেয়ে ঘেমে এক গোসল তার এমনিতেই হয়ে গেলো।
শাহবাজ ঘাড়ের নিচে দু’হাত দিয়ে একটু নড়েচড়ে আরাম করে শুলো। মিষ্টি আদুরে কথা তার আসে না। তাই তার মতোই বলল,– কাজ আছে আমার, নিচে যাব।
আয়না উত্তর দিল না। রাগ, জেদ কিছুই তার হচ্ছে না। এ তো হওয়ারই ছিল। বরং আরও আগে হলেও সে অবাক হতো না। তবে কোথাও জমাট বাঁধা একটু কষ্ট। সেই কষ্টের ওজন আয়না অনুমান করতে পারে না। তাই নিজের অজান্তেই চোখের কোণা বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
তখনই শাহবাজ আয়নার মুখের দিকে ফিরে তাকালো। তাকিয়ে কাত হয়ে শুলো। পাশাপাশি শুয়ে কাত হতেই একদম কাছাকাছি হয়ে গেল। শাহবাজের দৃষ্টি সেই চোখের কোণা বেয়ে গড়িয়ে পড়া চকচকে পানির দিকে। সেখানে দৃষ্টি রেখেই আয়না যেমন দুনিয়ার অকাজ করে সোজা বলে, “আমি কিছু করিনি”, ঠিক সেই ভাবেই বলল,– আমি কিচ্ছু করিনি।
আয়না সাথে সাথে শাহবাজের দিকে মুখটা ফেরালো। ফেরাতেই দুজনের মুখ একদম মুখোমুখি হলো। শাহবাজ হাসল। হেসে বলল — বশীকরণ চেয়েছো, হয়েছি। এখন এত জ্বলছো কেন? আমি তো ভাই ভালোই ছিলাম। এটা দেখিয়ে, ওটা দেখিয়ে মাথা নষ্ট কে করেছে?
আয়না রাগে ফুঁসলো। ফুঁসে ঠোঁটে ঠোঁট চাপলো। শাহবাজ সেই রাগ দেখে বলল, — কালনাগিনী তো আর এমনি এমনি বলি না। এই যে এতো সুন্দর করে ফুঁসফুঁস করেন। কোনো মানুষের দ্বারা তো আর সম্ভব না। তাই আর যাই করেন, শাহবাজের বউ হয়েই যখন গেছেন, আপনার আর মুক্তি নেই। তাই নিচে যাব আমি। কোনো কাজ-টাজ থাকলে বলেন। যে মরা মানুষের মতো পড়ে আছেন। ভয়ে আমার জান যায় যায় অবস্থা।
আয়না চোখ মুখ কুঁচকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর মুখ ফিরিয়ে নিল। শাহবাজ আগেন মতোই হাসলো। তার সেই চিরচেনা হাসি। হেসে আশীর্বাদের মতো মাথার উপরে হাত রেখে বললো, — বউয়ের মুখ দেখে নাকি কিছু দিতে হয়। আমি তো ভাই না দিয়েই দুনিয়া দেখে ফেললাম। তাই যাও, দুনিয়ার সবচেয়ে মূল্যবাদ জিনিস, দোয়া দিয়ে দিলাম। বিবাহ জীবন সুখের হোক, স্বামীর সোহাগী হও, দশ বাচ্চার মা হও।
শান্ত শিষ্ট আয়না নিজেকে আর দমাতে পারল না।
ঝট করে ঘুরে এক ধাক্কা দিতে গেল। শাহবাজ যেন এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। তাই আয়নার আগে সে’ই ঝট করে ঝাঁপটে ধরে চেপে ধরলো। ভালো করেই ধরল। ধরে বললো, — খুন করতে চেয়েছো, হয়ে গেছি খুন। যাও তুমি সফল।
আয়না ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। শাহবাজ আয়নার গড়িয়ে পড়া চোখের পানিতে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল — এই কান্না তোমার সারা জীবনের হোক।
— শয়তান আপনি।
— জানি তো।
— ঘৃণা করি আমি আপনাদের।
— আমিও করি।
— ঘৃণা করে আবার ঝাঁপটে ধরে আছেন কেন? ছিঃ!
— ঘৃণার সাথে জড়িয়ে ধরার সম্পর্ক কী?
আয়না উত্তর দিল না, ঠেলে সরাতে চাইলো।
শাহবাজ আরও আঁটসাঁট করে ধরতে ধরতে বলল — ঘৃণা নিয়ে গায়ে আগুন দিয়ে বিয়ে করতে পারে, আমি কিছু করলে’ই দোষ!
— পাগল কুত্তায় কামড়ে ছিল যে, তাই তো গিয়েছিলাম বিয়ে করতে।
— হক কথা।
তখনই দরজায় টোকা পড়ল। শাহবাজ তার তেজ নিয়ে বলল — কি?
— দাদি ডাকে।
— যা, ভাগ।
কাজের লোক ভাগলো কি না কে জানে। তবে আয়না দাঁত চেপে বললো — ভুল হয়েছে আমার, মরণ ভুল। সেইদিন রাতে বাড়িটা ঠিক মাথায় ফেলা দরকার ছিল।
— ভুল করেছো মাশুল তো গুণতে হবেই।
— আমি না, আপনারা গুণবেন।
শাহবাজ বড় একটা শ্বাস ফেলল। ফেলে বলল, — কাজ টাজ গুছিয়ে রাতের ট্রেনে ঢাকা যাব আমি। সকালের মধ্যে ফিরে আসব।
— আমাকে বলছেন কেন? যান, গিয়ে মরেন।
শাহবাজ হাসল। হেসে বললো, — এতো তাড়াতাড়ি মরছি না গো বউ। এখনো অনেক জ্বালানো বাকি। বলে আর সময় নষ্ট করল না, ঝট করে উঠে দাঁড়ালো। দরজার খিল খুলল। খুলে আয়নার দিকে আর তাকালো না। ধস্তাধস্তিতে কাঁথা সরে গেছে। তাকালে আর বেরোনো হবে না। তাই এলোমেলো চুলগুলো হাত দিয়ে পেছনে ঠেলতে ঠেলতে নিজের মতোই বেরিয়ে গেল।
ঢাকায় সে যাবে আসলে আয়নার খালার খোঁজে। প্রমাণ ছাড়া কিছুতেই কিছু করা যাবে না। এটা এক দিনের সম্পর্ক না। অনেক পুরনো সম্পর্ক, তার মধ্যে আছে ফরহাদ আর ভাইয়ের বন্ধুত্ব। আর সবচেয়ে বড় কথা, তাদের একমাত্র বোন। গ্রামগঞ্জে বিয়ে ভাঙা সহজ কথা না। টাকা যতোই থাক, ভালো ঘর থেকে আর সমন্ধ আসবে না। তাই যে করেই হোক, বিয়ের আগে তার সত্য জানতে হবে। সত্য জানলে আঙুল তার বোনের দিকে আর আসবে না।
আয়না নিচে নামলো অনেকটা সময় পরে। সে ভালো করেই জানে, নামতেই জয়তুন আরা এক গাদা কথা শোনাবে। হলোও তাই। তাকে দেখেই বিরক্ত মুখে বলল,
— কাম দেখলেই তোমাগো অসুখ শুরু হয়। শরীর খারাপ বুঝলাম, তা না খেয়ে পড়ে থাকলে হইবো? যাও আগে খাইয়া লও। বীণারে গোসল দিবে। ভাবি ননদের বিয়ায় থাকবো সবার আগে। না, তারে খুঁজেই পাওয়া যায় না। পরের বাড়ি বউ আইয়া সব করতাছে। যাও, তাড়াতাড়ি খেয়ে সাবিহার হাতে হাতে করো। যোহরের আজান পড়ল বলে। আর সময় পাওয়া যাবে না। সেই বাড়ি থেকেও তো মানুষ আইবো। আর শোনো নাইচা নাইচা আবার তুমিও গায়ে হলুদে ও বাড়ি যাইওগা না আবার। আমার এই সব একদম পছন্দ না। বউ মানুষগো কিয়ের এতো ফালাফালি।
আয়না দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুধু শুনলো। তার শরীরটা সত্যিই ভালো লাগছে না। তাই কথা না বাড়িয়ে এগিয়ে খাবার ঘরে গেলো। মন মেজাজ শরীর কিছুই ঠিক নেই। খেলে যদি একটু ভালো লাগে। তাই নিজের হাতেই খাবার নিলো। নিয়ে বসবে, তখনই আম্বিয়াবু এলো, আয়নাকে দেখে বলল,– শরীর নাকি ঠিক নাই?
— কে বলল?
— শাহবাজ ।
— ওহ। বলেই খাওয়ায় মনোযোগ দিল।
আম্বিয়া কাজ করতে করতে আড়চোখে তাকালো। চোখ মুখ ফুলে আছে। মাথায় ঘোমটা। তবুও বুঝল চুল ভেজা। সে চোখ ফিরিয়ে নিতে নিতে বলল, — শরীর বেশি খারাপ থাকলে শুয়ে থাকো। আমি, তো আছিই।
আয়না মলিন হাসলো! হেসে বলল,– মন ঠিক নাই গো আম্বিয়াবু। সেটার জন্য কি করবো?
আম্বিয়ার হাত থেমে গেলো। থেমে শূন্য দৃষ্টিতে তাকালো। আয়না আগের মতোই খেতে খেতে বলল– এই বাড়িতে আমরা কেউ ভালো নেই আম্বিয়াবু। আমি আমার নসিব মেনে নিয়েছি। তুমিও নিয়েছো। তবে আমরা চাইলে একজনকে বাঁচাতে পারি।
আম্বিয়ার কিছুই বুঝে আসে না। সে ভ্রু কুঁচকে তাকায়। আয়না দেখে আবার মলিনভাবে হাসলো।
মহাজন বাড়ি থেকে গায়ে হলুদের মানুষ এলো বিকেলে। ততক্ষণে সারেং বাড়িও বিয়ের রঙে রাঙা হয়ে গেছে। আত্মীয়-স্বজন না থাক, আশে পাশের গ্রামের মানুষ আছে। বিয়ে বাড়িতে আর যাই হোক মানুষজন আসবে যাবেই। তাই আজ সদর দরজা হাট করেই খুলে দেওয়া হয়েছে। বসার ঘরে বসেছে জয়তুনের সাথে মুরব্বিদের পানের আড্ডা। উঠানে জাফরের সাথে পুরুষের জমজমাট আলাপ। বাচ্চা কাচ্চা, মহিলাদের গীতে বাড়ি মুখরিত হয়ে আছে। আর এত কিছুর মাঝে বীণা বসে আছে মুখ কালো করে। গায়ে তার পাকা হলুদ রংয়ের হলুদের শাড়ি, কাঁচা ফুলের গয়না। হাতে মেহেদী। বিয়েতে যে মেয়েদের রূপ খোলে, বীণা হচ্ছে তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। দেখতে লাগছে ভারী মিষ্টি !
সাবিহা কাজল দানি থেকে আঙুলের ডগায় কাজল নিয়ে কানের পেছনে দিয়ে দিলো। দিতে দিতে বলল,
— নজর না লাগুক, আমাদের বীণার গায়ে।
বীণা কিছুই বলল না। সে যেভাবে বসে ছিল, সে ভাবেই বসে রইল। তার ভালো লাগছে না। কেমন যেন দমবন্ধ করা একটা অস্থিরতা। সেই অস্থিরতার মাঝেই ফরহাদের ভাবি এলো। তার হাতে ক্যামেরা। এই ক্যামেরা অত্র গ্রামে কারো কাছে নেই। শহরের বাজারে নতুন এসেছে। কী সুন্দর ছবি উঠে। উঠার সাথে সাথেই নিচ দিয়ে প্রিন্ট হয়ে বের হয়। ফরহাদের ভাবি শহরের সৌখিন মেয়ে। তাই শখ করেই একটা কিনে ফেলেছে।
গ্রামের মানুষের কাছে এটা খুবই চমকপ্রদ। তাই তার পিছু পিছু বিয়েবাড়ির অর্ধেক মানুষও চলে এসেছে। সেই ভিড় বাট্টা কমিয়ে সে খুব সুন্দর করে অনেকগুলো বীণার ছবি তুললো। টলমলে চোখের কী সুন্দর ছবি!
সেই ছবি ফরহাদের ভাবি বাসায় গিয়ে ফরহাদের হাতে দিলো। ফরহাদের ভাবি ভেবেছিল, ছিঁড়ে ফুঁড়ে উড়িয়ে ফেলে দেবে। বিয়ের কোন আমেজ এই ছেলের মাঝে নেই। তার মধ্যে বান্দার মেজাজ আছে চড়ে। হলুদের দিন, সবাই তো হলুদের ছোঁয়া দিতে চাইবেই। আর ছোঁয়াতে মেজাজ মহাজন বাড়ির ছাদ ফুটো হয়ে বেরিয়ে গেছে।
কিন্তু তাকে অবাক স্বাভাবিক স্বরে বলল, — কতগুলো তুলেছো?
ফরহাদের ভাবি সবগুলো দেখালো। ফরহাদ স্বাভাবিক ভাবে দেখলো। দেখে স্বাভাবিক ভাবেই বলল, — নাও, আমার ক’টা তোলো। তুলে পাঠিয়ে দাও। কে বেশি সুন্দর দেখুক। তোমার দেবর কে নাকি তার পছন্দ না। ভাবা যায়?
ফরহাদের ভাবি খিলখিল করে হাসলো। এই বাড়ির কেউই তাকে দেখতে পারে না। ফরহাদ তো আরও না। তাই ভাবি হিসেবে দুষ্টুমি করবে দূরের কথা, সাধারণ কথাবার্তাও বলে না। তাই আজকে সহজভাবে বলায় খুব মজা পেল। পেয়ে ফরহাদেরও সুন্দর করে অনেকগুলো ছবি তুলল। ফরহাদের গায়ে নতুন ভাঁজ ভাঙা লুঙ্গি আর সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি। কপালে হালকা করে একটু হলুদের ছোঁয়া। সেটাও শুধু তার বাবা, মায়ের। আর একজনকেও ছোঁয়াতে দেয়নি। তবুও দেখতে একেবারে সত্য ফোটা জামাইয়ের মতোই লাগছে। আর ছবিও তুললো খুব ডাট বাট নিয়ে।
সেই ডাট বাটের ছবিই পাঠানো হলো বীণার কাছে। বীণা হাতে নিয়ে অবাক চোখে দেখলো। পছন্দ টছন্দ দূরের কথা, বীণার মাথায় এটাই এলো না, এই ছবি তাকে পাঠানো হলো কেন ? সে কি ফরহাদ ভাইকে নতুন করে দেখছে?
তার অবস্থা দেখে আয়না মন খারাপের মাঝেও একটু হাসলো। হাসলো সাবিহাও। কী পাগল-টাগল যে নিয়ে সে পড়েছে!
পৃথিলা সাবিহার খাবার ঘরে বসে স্টোভ ধরালো। ধরিয়ে চা বসালো। সন্ধ্যা নেমেছে অনেক আগে। আজকে অবশ্য সন্ধ্যাকে সন্ধ্যা মনে হচ্ছে না। বিয়ে বাড়ির ঝিলমিল আলো, গীত সঙ্গীতে আশপাশ সব মুখরিত হয়ে আছে। তবে এই সাইডটা নীরব। একেবারেই নীরব। সাবিহার গেটও আজকে সন্ধ্যার আগে তালা ঝুলানো হয়েছে। ঐ যে সারেং বাড়ি থেকে আসার গলির মাথা, সেখানে বসানো হয়েছে দুই জনকে। বিয়েবাড়ি থেকে না কোনো মানুষ এই সাইডে আসবে, না যাবে।
সাবিহা অবশ্য একবার জিজ্ঞেস করেছে, যাবে কি না? পৃথিলার মরে গেলেও যাওয়া সম্ভব না। এমনকি এই যে ঐ বাড়ি থেকে খাবার এসেছে, পৃথিলা ছুঁয়েও দেখেনি। সারাদিন অবশ্য সমস্যা হয়নি। একা একা ভালোই ছিল। তবে আসরের পরে চোখ লেগে গিয়েছিল। তখনই একটা বাজে স্বপ্ন দেখলো।
সে একটা অন্ধকার ঘরে বসে আছে। চারিদিকে অন্ধকার। কোনো আলো নেই, বাতাস নেই। মাথার উপরে ছোট্ট একটা বাল্ব, টিমটিম করে জ্বলছে। সেই জ্বলার মাঝেই ফট করে কেউ দরজা খুলে ভেতরে এলো। অন্ধকারে মুখ দেখেনি। তবে তখনই কেউ কানের পাশে ফিসফিস করে বলল — পালাও পৃথিলা, পালাও।
তখনই ঘুমটা ছুটে গেল। আর ছুটতেই ধড়ফড়িয়ে উঠেছে। তখন থেকেই মাথাটা এতো ধরা ধরেছে। তাই বসেছে একটু চা করতে। খেলে যদি হালকা হয়।
পৃথিলা চা নিয়ে টুলে বসলো। বসার আগে বারান্দার লাইটটা নিভিয়ে দিল। আজকে আকাশে সুন্দর একটা চাঁদ উঠেছে। দেখতে ভালো লাগছে। আর বসতেই ঐ যে গলির মাঝামাঝি গাছটা, ওখানে সিগারেটের আলোটা জ্বলজ্বল করে উঠল।
পৃথিলার কোনো ভাবান্তর হলো না। সে স্বাভাবিক ভাবে চায়ে চুমুক দিল। এতক্ষণ দেখা গেলেও, সে জানে এখন আর দেখা যাবে না। তাই হয়তো চলে যাবে। তবে তার ধারণাকে ভুল করে আলোটা ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। পৃথিলা মনে মনে বড় একটা শ্বাস ফেললো। সিগারেটের গন্ধে মাথা আরও যাবে।
— কোনো সমস্যা পৃথিলা?
পৃথিলা একটু চমকালো। লোকটা মুখ দেখেই কেন জানি তার না বলা অনেক কথাই বুঝে যায়। তাই সাথে সাথে নিজেকে সামলে বলল,– আমার সব সমস্যা আপনি। আপনার কাছ থেকে এই প্রশ্নটা আমার কাছে হাস্যকর।
এরশাদ হাসলো! পৃথিলা টুলে বসলেও এরশাদ বসলো খোলা বারান্দায় নিচে। ঠিক তার সামনে। বসে বলল, — আমি তো আপনাকে কোন বিরক্ত করছি না।
— খোলা আকাশের পাখিকে খাঁচায় বন্দি করাই শাস্তি। সেই খাঁচাটা সোনার হোক রুপার বা তাকে যতোই খাবার দিন, পানি দিন। তাতে তার কষ্ট বিন্দু পরিমাণও কমবে না।
— কষ্ট কমানোর সুযোগ তো দিচ্ছেন না।
পৃথিলা চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। কথা বলাই বৃথা। এরশাদ অবশ্য পৃথিলার কঠিন মুখটা অন্ধকারে দেখলো না। তবে ঠিক বুঝল। তাই কথা ঘুরিয়ে বললো, — খেয়েছেন পৃথিলা?
পৃথিলা এবারও উত্তর দিল না। এরশাদ নিজের মতোই বললো, — আমি নিজেও খাইনি।
পৃথিলা উঠে চলে যেতে নিল। এরশাদ দেখে বলল,– বসুন পৃথিলা, আমি বেশিক্ষণ বসব না। কাজ আছে।
পৃথিলা তাও দাঁড়ালো না। ভেতরে যাবে, তখনই এরশাদ বলল, — আমি যতক্ষণ বসব, আপনার আশেপাশেই বসব। এখন আপনার ইচ্ছা, সেটা ভেতরে না বাহিরে। একদিন আপনার মুখটা না দেখলে আমার অস্থির লাগে।
পৃথিলা এরশাদের কথা শুনলও না। বরং ধরাম করে দরজা লাগিয়ে দিল। এরশাদ আগের মতোই হাসলো। এই মেয়েটার কলিজা কোনো কিছুতেই কাঁপে না। এরশাদের হুমকি ধমকিতে তো আরো না। তাই উঠে গিয়ে জানালার পাশে পা ছড়িয়ে বসলো। সে ভালো করেই জানে পৃথিলা এখানেই বসবে। তাই বসে বলল, — আপনি সেইদিন জানতে চাইলেন না, আপনার প্রতি আমার এতো এই দয়া কেন? কেন জানেন? আজ পর্যন্ত কোনো মেয়ে আমাকে টানতে পারে নি। তবে পৃথিলা নামের মায়াবি, শান্ত, ভয়ংঙ্কর কঠিন মনের একটা মেয়ে টেনেছে। কারণ কী জানেন? একমাত্র এই মেয়েটা প্রথম দেখার পর থেকে একবারও আমার মুখের এই বাম পাশে তাকায়নি। তাকিয়েছে চোখে। আর চোখে চোখ রেখে কথা বলেছে। না ভয়, না ঘৃণা। বাকি সবাই আগে আমার এই ভয়ংকর মুখটা দেখে। ভয় আতঙ্কে গলা শুকায়, তার পরে কথা বলে। একমাত্র আপনি আমার ভয়ংকর মুখটাকে কখনো ঘৃণার চোখে দেখেননি। এই যে এত কিছু করছি, এখনো দেখছেন না। রাগ, ঘৃণা যা করার এরশাদকে করছেন। তবে একবারও এই ভয়ংকর মুখটাকে করেননি।
পৃথিলা জানালার পাশ থেকে সবই শুনলো। সাধারণ কাঠের দু’পাল্লা। কাছ ঘেঁষে বললে রুম থেকে সবই শোনা যায়। তাই সেও শান্তভাবে বলল, — আপনি কি জানেন, আপনি মানসিক ভাবে অসুস্থ একটা মানুষ। অবশ্য এতে আপনার দোষ নেই। পুরো পরিবারকে চোখের সামনে নির্মমভাবে মরতে দেখা সহজ কথা না। তার মধ্যে নিজের মুখের সৌন্দর্য হারানো। একদিকে পরিবারের মানুষদের হারানোর ক্ষত, আরেকদিকে নিজের জন্য মানুষের চোখে ভয়, আতঙ্ক। এই অবস্থায় অনেকে বেঁচে থাকতে পারে না। আপনি আছেন, ভালোভাবেই আছেন। এমনকি এই ভয় আপনি উপভোগ করেন। এটা কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের কাজ না। আর এমন মানুষদের সমস্যা কী জানেন? তারা যে কোনো এক জিনিসের প্রতি আকৃষ্ট হয়। ব্যস, সেখানেই আটকে যায়। যেমন আপনি গেছেন। এখন ডান বাম আশপাশ কিছুই দেখছেন না। তাই প্লিজ! টাকা-পয়সার অভাব আপনাদের নেই। ঢাকায় ভালো একটা ডাক্তার দেখান। আর আমাকে আমার মতো থাকতে দিন। অনুরোধ করে বলছি, আমাকে যেতে দিন।
এরশাদ এই অনুরোধের উত্তর দিল না। আগের মতোই কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। তারপর আবার আগের মতোই বলল, — আমাকে বিয়ে করবেন পৃথিলা? কথা দিচ্ছি, রাগাবো না, বিরক্ত করবো না, কষ্টও দেবোনা। এমনকি আপনার অনুমতি ছাড়া আপনাকে স্পর্শ ও করবো না। আপনার যা খুশি তাই করবেন। শুধু আমার হয়ে এক ছাদের নিচে থাকবেন। আমার পাশাপাশি শোবেন। যখন বসে বসে জোছনা দেখবেন, রাস্তায় হাঁটবেন, বৃষ্টিতে ভিজবেন। শুধু একটু পাশে রাখবেন। রাখবেন পৃথিলা?
পৃথিলা কোন শব্দ করলো না। স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। অবশ্য স্তব্ধ হওয়ার’ই কথা। তার জায়গায় অন্য কোনো মেয়ে থাকলেও হতো। তবে সমস্যা হলো, তার বলা একটা শব্দও এই লোকটা কানে নেয়নি। সে শুধুই তার নিজের মনের কথা শুনছে। সামনের জনের না কিছু দেখছে, না কিছু বুঝতে চাইছে। তাই তার মন আবার বলল,– এই মানুষটা অসুস্থ, ভয়ংঙ্কর ভাবে অসুস্থ। কোনো সুস্থ মানুষের চিন্তা এমন হতে পারে না। না এমন এক জায়গায় আটকে যেতে পারে।
চলবে…
অপেক্ষায় রাখার জন্য দুঃখিত আমার প্রিয় মানুষেরা। একটু ব্যস্ত ছিলাম। তাই সময় মতো লিখে শেষ করতে পারিনি।

