#ধূপছায়া
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_৪৯
পৃথিলা বসে আছে চুপচাপ। গায়ে মিষ্টি রঙের মোটা পাড়ের একটা কাপড়। খোলা এলোমেলো চুল গুলো ফ্যানের বাতাসে নিজ ছন্দে উড়াউড়ি করছে। করলেও আজ তাদের প্রতি বড় অবহেলা। না চিরুনি পড়েছে, না হাত। সেই যে পানি থেকে উঠেছে। আর গুছানো হয়নি, শুকিয়ে দলা পাকিয়ে আছে। সেই দলা পাকানো চুল নিয়েই পৃথিলা খাটের এক কোণে চুপচাপ বসে আছে। রাত কতো জানেও না। তবে দু’চোখের পাতায় ঘুমের ছিটেফোঁটাও নেই। অবশ্য ঘুমের আর দোষ দিয়ে লাভ কি? অচেনা বাড়ি, অচেনা রুম, অচেনা মানুষের মাঝে কারোই ঘুম আসার কথা না। তার মধ্যে বারো চিন্তায় মাথা ঘোরপাক খাচ্ছে।
চেয়ারম্যান বাড়িটা সদরের কাছাকাছি। তখন মহাজন একেবারে চেয়ারম্যান বাড়ির ঘাটেই নৌকা নিয়ে এসেছে। রাত তখন বেশি না। দশটা এগারোটা হতে পারে। অবশ্য বলতে গেলে গ্রামের দিকে এ’ই অনেক। তবুও চেয়ারম্যান বাড়ি ঝলমল করতেই দেখলো। সেই ঝলমলের মাঝেই পৃথিলা এই বাড়ির বসার ঘরে পা রাখলো। চেয়ারম্যান মোটা খাটো স্বাস্থ্যবান মানুষ। সে সামনে দাঁড়াতেই পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখলো। দেখে বললো,– আচ্ছা, এই হলো এরশাদের পাখি?
আজিজ বিরক্তমাখা সুরে বলল,– আমার জাফরের মেয়ে। এটাই যেন মাথায় থাকে।
চেয়ারম্যান হেসে বলল,– আরে ধুর বন্ধু! অযথা চান্দি গরম করো কি জন্য। তোমার বাড়ির মেয়ে, আমার বাড়ির মেয়ে একই কথা। নিশ্চিন্তে থাকো। তাছাড়া ঘর গৃহস্থ বাড়ি আমার। বাড়িতে বউ, বাচ্চা, নাতি নাতনি নিয়ে থাকি আমি। এতোটাও আবার খারাপ মনে কইরো না।
— কতোটা খারাপ আমার চেয়ে ভালো কে জানে? তাই যে কোন হাবিজাবি চিন্তা মাথায় আনার আগে, এটা মাথায় রাখবা। আমাদের গায়ে কোন কালির দাগ নাই। নাই বলেই পর পর তিনবার তুমি চেয়ারম্যান। সেই তিন বার যদি চারবার করতে চাও, তাহলে বন্ধুকে তো তোমার লাগবেই লাগবে। তাই সাবধান। আমার জাফরের মেয়ের গায়ে কালি লাগলে, তুমিও ধলা থাকবা না। বলেই পৃথিলার দিকে তাকালো। তাকিয়ে কোমল ভাবেই বলল,– আমি কাল আবার আসবো। বলেই নিজের মতো চলে গেলো।
যেতেই চেয়ারম্যান তার স্ত্রীকে ডাকলো। ডেকে খুব আমুদে গলায় বলল, — একে মেহমানদের রুমে নিয়ে যাও। শুকনো কাপড়, রাতের খাবার দেও। কিছুদিন থাকবে এখানে।
যতো আমুদে সে বলল, তার ছিটেফোঁটাও তার স্ত্রীর চোখে মুখে দেখা গেলো না। বরং খুব বিরক্ত নিয়েই তাকে এখানে আনলো। এনে কাপড়, খাবার টাবার দিলো।
পৃথিলা খেতে পারেনি। না পারাই তার জন্য স্বাভাবিক। মনে অশান্তি নিয়ে সে কখনও গলা দিয়ে খাবার নামাতে পারে না । আজও পারে নি। অথচ খিদেয় শরীর ঝিমিয়ে আসছে। তাই এক গ্লাস পানি কোন রকম গলায় ঢেলে, যেমন যা তেমনি পাঠিয়ে দিয়েছে।
তার পরে এই রুমে কেউ আর আসেনি। এমন না তাকে আটকে বা বন্দি করে রেখেছে। বরং পৃথিলাই দরজা ভেতর থেকে আটকে বসে আছে। চেয়ারম্যানের নজর তার ভালো লাগেনি। তাছাড়া গত কয়েকদিনে মানুষের যে যে রুপ দেখছে। মানুষের উপর থেকে তার বিশ্বাস’ই উঠে গেছে।
তাই একটু সুযোগের অপেক্ষায় আছে। চেয়ারম্যান বাড়িটা কোথায় সে বুঝতে পারছে। ঘাট থেকে যখন উঠান পেরিয়ে বাড়ির ভেতরে এলো, তখনি রাস্তাটা অনুমান করতে পারলো। অবশ্য তার কারণ আছে, বাড়িটা সদরের কাছাকাছি। স্কুলে, সদরে আসা হয়েছে তার বেশ কয়েকবার। সেই হিসেবে কিছুটা পরিচিত হয়েছে। অবশ্য ঝলমল করা বাড়ি না হলে বুঝতে পারতো না। আর বুঝলো বলেই জানে, স্টেশন এখান থেকে খুব একটা দূরে না, না সদর।
সারেং বাড়িতে ফিরে যাওয়ার কোনো মানে হয় না। সেখানে যাওয়া মানেই আটকে যাওয়া। আয়না, বীণা বাঁচবে, তবে সে বাঁচবে না। কেননা, এই কয়দিনে এইটুকু ঠিক বুঝতে পেরেছে, এরশাদ তাকে ছাড়বে না, মরে গেলেও না। তাই এমন কিছু করতে হবে, যেন বীণা আয়নাও বাঁচে, সে নিজেও বাঁচে।
আর এই সব কিছুর জন্য যা করতে হবে, তা হলো, তাকে পালাতে হবে। স্টেশনে ভুলেও যাওয়া যাবে না। মহাজন তো বলল, পুরো গ্রামে এরশাদের লোক আছে। তাই এমন জায়গায় যেতে হবে যেখানে এরশাদের পাওয়ার খাটবে না। সেটা মিঠাপুকুরে এক জায়গায়’ই। থানা! থানায় গেলেই সে বাবার পরিচয় দেবে। প্রত্যেক থানায় ওয়্যালেস আছে। কোন ভাবে মুগদা থানায় খবর পাঠাতে পারলেই হলো। ব্যস! যা করার বাকি বাবাই করবে।
তবে সমস্যা হলো, সে এই বাড়ি থেকে সদরের রাস্থা চিনলেও থানা চিনে না। তাছাড়া এতো রাতে সদরে দোকান পাটও থাকবে বন্ধ। জিজ্ঞেস করবে কাকে? পৃথিলা ভাবে, ভাবতে ভাবতেই ফট করে তার হাসপাতালের কথা মনে পড়ে। যত রাত’ই থাক, হাসপাতালে কেউ না কেউ থাকবে। আর তাদের কাছেই সাহায্য চাওয়া যাবে।
তখনি পৃথিলা ঝট করে উঠে দাঁড়ালো। মহাজনের চাদরটা মাথা থেকে নিয়ে ভালো ভাবে গায়ে পেঁচালো। পেঁচিয়ে আস্তে করে দরজা খুললো। খুলে রুম থেকে বের হতেই দেখল, পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ। সবাই ঘুমে তলিয়ে আছে। সে কিছুটা পা টিপে টিপে সদর দরজার কাছে গেল। গিয়ে দরজায় হাত রাখতেই দেখল তালা মারা। এবার বুঝল, কেন তাকে বন্দি করা হয়নি। পুরো বাড়িতে একটাই দরজা। সেটায় তালা। রুমের দরজা আটকালেই কি, না আটকালেই কি?
সে দীর্ঘশ্বাস ফেলেই ঘুরে দাঁড়ালো। দাঁড়াতেই দেখল, চেয়ারম্যান গিন্নি দাঁড়িয়ে আছে। চোখ মুখ সব সময়ের মতোই শান্ত, নির্বিকার।
——-
শাহবাজ যখন চোখ খুলল তখন শেষ রাত। ফজরের আযান দেবে দেবে করছে। রুমজুড়ে আধো আলো, আধো অন্ধকার। এক কোণে এক নার্স হা করে বসে বসে ঘুমাচ্ছে। সে সম্ভবত জরুরি বিভাগে আছে। তাই বাইরের কেউ নেই। পাশেই দুই রোগী মরার মতো পড়ে আছে।
শাহবাজ নড়ল না, কোনো শব্দও করল না। কিছুক্ষণ উপরের সিলিংয়ের দিকে চুপচাপ তাকিয়ে রইল। নিজের সাথে যুদ্ধ তার। এই যুদ্ধের রাজা সে, হাতিয়ারও সে, সেনাপতিও সে, শত্রুও সে, আবার বন্ধুও সে। আর এতো কিছুর রানী একজন, তার আয়নামতি। যাকে মন দিয়েছে সে, পেয়েছে সে, তবে নিজের করে শক্ত করে ধরে রাখায় যত দ্বিধা।
এই দ্বিধাদ্বন্দ্বের মাঝেই হাতের ক্যানোলা নিজেই টেনে খুলল। মাথায় কোথাও যন্ত্রণা। সেই যন্ত্রণার চেয়েও বড় যন্ত্রণা বুকে। সেই যন্ত্রণা নিয়েই উঠে বসল। বসতে বসতে বুকের রাবারের ইলেকট্রোড গুলো টেনে খুলল। খুলতেই মেশিনে টু-টু করে বেজে উঠল।
নার্স ধড়ফড়িয়ে উঠল। উঠেই হতভম্ব! হতভম্ব হয়েই দৌড়ে আসতে গেল। শাহবাজ এক চড় লাগাল। লাগিয়ে দাঁত চেপে বলল, — দূরে। দশ হাত দূরে। এমনিই মন মেজাজ খারাপ। বেশি ঢং হজম হবে না।
কাঁচা ঘুম, হতভম্ব, তার মধ্যে চড়। নার্স গালে হাত দিয়েই কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর এক দৌড় দিল। সে ভাবল, মাথায় আঘাতের কারণে হয়ত এই রোগীর মাথায় কোনো সমস্যা হয়েছে। তবে সে তো জানে না, এর মাথা জন্মগতই খারাপ।
তার দৌড়ে যেতে দেরি, ওয়ার্ডবয় আর ডাক্তারদের দৌড়ে আসতে সময় লাগেনি। শাহবাজ ততক্ষণে রুম থেকে বেরিয়ে করিডোরে। তাদের দেখেই বলল, — ঠিক আছি আমি, একদম ঠিক। এখন জোর টোর করে রাখতে গেলে আরেক সমস্যা। এইসব আবার একদম পছন্দ না। পরে ঊনিশ বিশ করলে দোষ দিতে পারবেন না।
ওয়ার্ড বয়রা দৌড়ে আসতে গেল। ডাক্তার থামাল। থামিয়ে একজনকে বলল, — এই পেশেন্টের সঙ্গে কে আছে, তাদের ডাকো। তারপর শাহবাজের দিকে তাকিয়ে বলল, — শান্ত হন। আমরা বসে কথা বলি। মাথায় আঘাত পেয়েছেন আপনি। সেলাই কয়টা পড়েছে, আপনি জানেন? কোনো রকম স্ট্রেস আপনার জন্য ভালো না।
শাহবাজ হাসল! হেসে কথা বাড়ালো না। আসুক তার চেলাবেলা। তাই করিডোরের দেয়াল ঘেঁষে রাখা কয়েকটা চেয়ারে মধ্যে একটায় শান্তভাবে বসল। বসতে বসতে বলল, — শালার মাথা! এক বিয়ে করে কতবার ফাটবে, কে জানে?
তখনই ফরহাদ এলো। সে এখানে পৌঁছেছে ঘণ্টা খানেক হয়ে গেছে। এই রাতে জরুরি বিভাগের রোগী তারা দেখতে দেবে না। যা করার সকালে। তাই সবাই বাইরেই ছিল।
আর সে আসতেই শাহবাজ চোখ তুলে তাকালো। তাকাতেই শান্ত চোখে মুহূর্তেই আগুন লেগে গেল। এত ভালো মানুষি, এত এত মধুর বন্ধুত্ব, সব বুঝি বাপের মতো সারেং বাড়ির ধ্বংসের জন্য? আর তার বোন? এই জায়গায় হাত দেওয়া ঠিক হয়নিরে ফরহাইদা।
তাই চোখের পলকে এক ঝটকায় উঠল। উঠেই নাক বরাবর মারতে গেলো। ওয়ার্ড বয়রা তৈরি হয়েই ছিল। নার্সের গায়ে যে হাত তুলতে পারে, বাকি মানুষ আবার কি? তাই উঠতেই সাথে সাথে ঝাপটে ধরল।
ফরহাদ আগা মাথা কিছুই বুঝতে পারল না। তবে শাহবাজ তার দিকে যে তেড়ে আসতে যাচ্ছিল, ঠিক বুঝল। বুঝে কিছুটা বিরক্ত চোখেই তাকালো। যেখানে কিছুই ঠিক নেই, সেখানে নতুন ঝামেলার মানে হয় না। তাই কিছু বলবে তার আগেই ডাক্তার এগিয়ে এসে শাহবাজকে বলল,– শান্ত হন, শান্ত হন। কী সমস্যা আপনার?
শাহবাজ শান্ত হলো না, বরং ওয়ার্ড বয়কে ছুঁড়ে ফেলল। ফেলে ফরহাদের দিকে আবার এগোলো। ফরহাদ দাঁড়িয়ে আছে আগের জায়গায়, নির্বিকার ভাবে। শাহবাজ এগুতেই বলল, — তোর আয়নামতি বিপদে। বাঁচাতে চাইলে সময় আর এনার্জি নষ্ট কম কর।
শাহবাজ থামল! থেমে হাসল। হেসে সাথে সাথেই ভদ্র ভাবে দাঁড়ালো। দাঁড়িয়ে বলল, — শাহবাজের বউ সে। শাহবাজ ছাড়া কার সাধ্য তার গায়ে টোকা দেওয়ার?
— তোর প্রাণ প্রিয় বড় ভাই। যার পাখির খাঁচার দরজা তোর বউ খুলে দিয়েছে। সেই পাখি গায়েব। বুঝতে পারছিস?
শাহবাজের এবারও তেমন ভাবান্তর হলো না। বোকা বউ তার, সে তো বোকামিই করবেই। এই বোকামি দেখে দেখেই তো প্রেমে পড়েছে সে। বরং ঐ পৃথিলার মতো জ্ঞানের জাহাজ হলেই হতো সমস্যা। এতদিনে খুন টুন ঠিক হয়ে যেত।
তাই দাঁতে দাঁত চেপে বলল, — তোর ভাবতে হবে না। আমার বউ, আমার ভাই, আমার বোন, সব কিছু থেকে তোরা দূরে, একদম দূরে। তা না হলে খুন করে ফেলব।
ফরহাদ ভ্রু কুঁচকে তাকাল। আসলে তার মাথায় এবারো কিছুই এলো না। কোন কারণে আবার এর তার ছিঁড়েছে কে জানে। তাই তাকে পুরো উপেক্ষা করে, এগিয়ে ডাক্তারের সাথে কথা বলতে গেল। তাদের ঝামেলা পরে দেখা যাবে। আগে এখানকার ঝামেলা শেষ করা যাক। শাহবাজকে নিয়ে ফেরা দরকার।
ঠিক তখনই মান্নাও এলো। এত মানুষ এখানে ঢুকতে দেয় না। তবুও ঝামেলার কথা বলে বুঝিয়ে শুনিয়ে এলো। এসেই শাহবাজের কাছে দৌড়ে এলো। এসে বাড়ির সব কিছু বলল। শাহবাজ শান্তভাবে সব শুনল। তার নিজেরই মাথা গরম, আর এদিকে সবার মাথায় আগুন লেগে বসে আছে। কোন দিকে যাবে? ধুর!
ভাবতে ভাবতেই শাহবাজ আবার চেয়ারে বসলো। শরীর আসলেই ঠিক নেই। তাই মহাজন আর মহাজনের পুতের খবর পরে নেওয়া যাবে। তার আগে এই আগুন নেভানো দরকার। আর সেই আগুনের একমাত্র পানি, তাদের নতুন নতুন পৃথিলা আপা। অবশ্য আপা, না মহামান্য বড় ভাবি বুঝতে পারছে না। তবে এইটুকু ঠিক জানে, এই সবের সব কিছুতে একজনেরই বা হাত আছে। আবদুল আজিজ।
তোকে তো আমি কুটিকুটি করে কুত্তাকে খাওয়াবো শালা। বলেই ফরহাদের দিকে তাকাল। তাকিয়ে মান্নাকে বলল, — আজ্ঞান-টজ্ঞান করে কী দিয়ে যেন?
— জানি না তো ভাই।
— না জানলে খবর নে। হাসপাতালেই তো আছিস।
মান্না দৌড়ে গেল। শাহবাজ ফরহাদের দিকে শান্ত চোখে তাকিয়ে রইল। বিয়ে টিয়ে মানে না সে। দরকার পড়লে, বোনকে সারাজীবন ঘরে খুঁটি দিয়ে দেবে। তবুও মহাজন বাড়িতে পা মাড়াতে দেবে না সে। মরে গেলেও না।
ঠিক তখনই ফরহাদ শাহবাজের দিকে তাকাল। শাহবাজ তার চেনা ভঙিতে ঠোঁট ছাড়িয়ে হাসল। যা করার সে করবে। আজিজ, আয়নার বাপের খবর ভাইয়ের কান পর্যন্ত যেতেই দেবে না সে।
ফরহাদ শাহবাজের সেই হাসির দিকে তাকিয়ে রইল।সে তো আর বোকা না। এই শয়তানের মাথায় যে কিছু চলছে, ভালো করেই জানে। তবে কী, ধরতে পারছে না। আর এই কথা বলল কেন? সবার কাছ থেকে একদম দূরে। দূরের কথা মনে পড়তেই তার বীণার মুখটা ভাসল। ঐ যে ফুলের গহনা নিয়ে হলুদ শাড়ি গায়ে। টলমলো চোখ, মায়াবি একটা মুখ। আর এই মুখের মানুষটাই এখন বউ।
ফজরের আযান পড়তেই তারা বেরোলো। ডাক্তার শাহবাজকে ছাড়বে না, তবে ফরহাদ বুঝালো। সেখানে ডাক্তার আছে, ঔষুধপত্র যা লাগে দিয়ে দিন। তাছাড়া রোগী নিজেও থাকতে চাইছে না। দেখলেন তো, জোর করতে গিয়ে কী হলো।
ডাক্তার, হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ মেনেছে। তবে সহজে না। পকেট গরম করতে হয়েছে। তাছাড়া রোগীর লোকজন না রাখলে তাদের কিছু করার নেই। রোগীও আধা পাগল। একে জোর করে রাখা মানেই ঝামেলা। তাই শাহবাজকে ছেড়েই যেন বাঁচলো, তবে মিঠাপুকুর পর্যন্ত গাড়ি যায় না। যেই পর্যন্ত যায়, সেই পর্যন্ত যাওয়ার জন্যই শাহবাজের চেলাপেলারা গাড়ি ভাড়া করল। তারপর ট্রেন বা অন্য কোনো উপায়ে যাওয়া যাবে। এভাবে যেমন শাহবাজের জন্য ভালো হবে, তেমনি সময়ও কম লাগবে।
সেই হিসেবেই গাড়িতে উঠে বসলো। ফরহাদ আর শাহবাজ পাশাপাশি। বসতেই ফরহাদ বলল, — শাহবাজ, এত ঝামেলায়.. বাড়তি কোনো ঝামেলায় যেতে চাই না। তবে হাড়ে হাড়ে চিনি তো, তাই সোজা বল, কাহিনি কী?
— যদি না বলি?
— না বললে নেই। তবে শুনে রাখ, যতই পালোয়ানগিরি দেখাও, আমি পুরো সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ, আর তুই আধমরা। তোর চেলাপেলারা যদি অজ্ঞান করতে আসে, তারা আসতে আসতে আমি আগে তোর মাথায় হাত দেব। জায়গামতোই দেব। বাকি তোর ইচ্ছা।
শাহবাজ হাসল। হেসে মান্নার দিকে তাকিয়ে বলল,
— শালার বেজাত, একটা কাজ তো ঠিকমতো কর!
ফরহাদও তার মতো বলল,– ওদের দোষ কী? আমি তো বোকা না। তাছাড়া হাসপাতালে যা করেছিস। তাই তারা নিজেরাই ডেকে জানিয়ে দিলো।
— একদম সত্য! তোরা বোকা হবি কেন? আজিজের রক্ত! বোকা তো আমরা, তাই তো এতদিনে তিল পরিমাণও বুঝতে পারি নাই রে। ঐ তো আমার সোনা কপালি আয়নামতি। সে যদি না আসতো, তাহলে তলে তলে তল কেটে ফ্যালা ফ্যালা করে ফেলরেও ধরতে পারতাম না।
— বাপ বাদে যা খুশি তাই বল, শাহবাজ। তা না হলে এই যে মেজাজ শান্ত রাখার চেষ্টা করছি, সেটা আর করব না।
— না করলে কী করবি? আধমরা আমি হতে পারি, আমার সঙ্গী-সাথীরা তো না। একবার ইশারা দেই, তখন দেখা যাবে কে কত পালোয়ান!
ফরহাদ শ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত করল। সে সত্যিই ঝামেলা চাইছে না। মন, মেজাজ, শরীর কিছুই ঠিক নেই। তাই শান্ত ভাবেই বলল, — আমাকে আটকে তোর লাভ কী?
শাহবাজ ফরহাদের দিকে ঘুরলো! ঘুরে বলল, — কান টানলে মাথা আসে, সেটা তো জানিস। তুই হচ্ছিস আজিজ কুত্তার কান। তাই তোকে টানব। সেই কুত্তা লেজ নাড়াতে নাড়াতে দৌড়ে আসবে।
ব্যস! ফরহাদের ধৈর্য শেষ। সে ঝট করে উঠে শাহবাজের গলা চেপে ধরল। শাহবাজের চেলাপেলারা টেনে সরাতে চাইলো। আর ড্রাইভার সাথে সাথে গাড়ির ব্রেক কষল। সে তো আতঙ্কে শেষ। কোন পাগলদের গাড়িতে তুলেছে সে।
সেই আতঙ্কের মাঝেই গাড়ির ভেতরেই হুলস্থুল লেগে গেল। ফরহাদ তাও ছাড়ল না, বরং আরও চেপে ধরে বলল, — বলেছি না, বাপে যাবি না!
শাহবাজ আগের মতো এবার আর হাসল না। না চেষ্টা করলো ফরহাদকে ধাক্কা দিয়ে সরাতে। চোখ তার টকটকে লাল। সেই লাল চোখ নিয়েই শান্তভাবে বলল,
— সামান্য বাপের নামেই আগুন লেগে গেছে। অথচ আমার বাপ-মাকে খুন করেছিস তোরা। তাহলে ভাব, আমাদের অবস্থা কী!
ফরহাদ থমকালো না, অবাকও হলো না। বরং হেসে বলল,– পাগলের প্রলাপ অন্য কোথায়ও গিয়ে কর।
— আচ্ছা, তাহলে তোর বাপ পৃথিলাকে আটকে রেখেছে কেন?
— আটকে রাখে নি, শুধু তোর বউকে সাহায্য করেছে।
— কেন করেছে?
— আমার বাপ তোদের মতো না, সে সবাইকে সাহায্য করে।
শাহবাজ হো হো করে হাসল। হেসে বলল, তাহলে চল, হাতে নাতে প্রমাণ হয়ে যাক!
— দুনিয়ার কারো কথাই আমি বিশ্বাস করবো না।
— আর যদি তোর বাপের নিজে মুখের হয়?
ফরহাদ উত্তর দিলো না। কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর গলা ছেড়ে সোজা হয়ে বসলো। তার চোখে মুখে স্পষ্ট আগুন।
শাহবাজ সেই আগুন দেখে হো হো করে হাসলো। হেসে মান্নার উদ্দেশ্য বলল,– গাড়ি ঘোড়া মান্না, খালাশাশুড়ি মিঠাপুকুরে অনেকদিন পা রাখেন না। এতো বড় গাড়ি যাচ্ছে। চল সাথে করেই নিয়ে যাই।
চলবে……

