ধূপছায়া #নূপুর_ইসলাম #পর্ব_৪৮

0
1

#ধূপছায়া
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_৪৮

পৃথিলা যখন পুরোপুরি হুঁশে এলো, তখন মাত্রই নিঝুম রজনী শুরু হয়েছে। নদীর পাড়ের গৃহস্থ বাড়িগুলোর টিমটিম করা হরিকেনের আলোগুলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। আকাশে আজ থালার মতো চাঁদ হেসে আছে। সেই চাঁদের আলোয় জোছনায় চারদিক মুখরিত হয়ে আছে। সেই মুখরিত নিশ্চুপ নৌকায়, নৌকার বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ গানটা পৃথিলার কানে যেতেই ফট করে চোখ খুলে তাকালো।

নৌকার ছাউনির ভেতরে শুয়ে আছে সে। হাত খোলা, এলোমেলো আধভেজা চুলগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। গায়ে একটা চাদর পেঁচানো। পেঁচানো থাকলেও গায়ের পুরো কাপড় ভেজা। সেই ভেজা কাপড়ে পৃথিলা ধীরে ধীরে উঠে বসলো। সারা শরীরে রাজ্যের ক্লান্তি। সেই ক্লান্তি মাখা চোখে সামনে তাকাতেই দেখলো, একটু দূরে সাদা শুভ্র পাঞ্জাবি গায়ে, পেছনে দু’হাত মুড়ে মহাজন দাঁড়িয়ে আছে।

মহাজনকে দেখে পৃথিলার তেমন ভাবান্তর হলো না। ঐ যে, কে যেন ফিসফিস করে আগেই বললো, ভয় নেই, মহাজন আসছে। কথা সত্য ফলে গেছে। তা নিয়ে বিচলিতও দেখা গেলো না। তার সাথে কি হচ্ছে, না হচ্ছে, কেন হচ্ছে কিছুই তার ভাবতে ইচ্ছে করছে না। সে পা গুটিয়ে বাচ্চাদের মতো দু’হাতে নিজেকে জড়িয়ে বসলো। সে আছে একটা ঘোরের মাঝে। এই নিয়ে দু,দুবার মৃত্যর দুয়ার থেকে ফিরে এলো সে। আসলে উপরওয়ালা উদ্দেশ্য কি? নাকি বাবা, মায়ের মনে কষ্ট দেওয়ার নীবর এক শাস্তি।

তখনই আজিজ ফিরে তাকালো। তাকিয়ে বললো, — তুমি ঠিক আছো?

পৃথিলা উত্তর দিলো না। যে ভাবে বসে ছিল, সেই ভাবেই বসে রইল। নৌকার মধ্যে সেই তিনজনের দু’জনও আছে। এখন অবশ্য দৃষ্টি পৃথিলার দিকে না। বরং লুকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। যেন তাকালেই ধ্বংস হয়ে যাবে। আরেকজন সম্ভবত পেছনের নৌকায়। তাদের নৌকার পাশাপাশি আরেকটা নৌকাও যাচ্ছে। অন্ধকারে অবশ্য স্পষ্ট দেখা যায় না, তবে বোঝা যায়। আর বোঝা যায় বলে পৃথিলা অনায়াসেই বুঝলো কার ইশারায় এরা সব করেছে।

আজিজ এগিয়ে এলো। বসলো পৃথিলার একটু দূরে। বসে বললো, — আর ভয় নেই।

পৃথিলা চোখ তুলে তাকালো! তাকিয়ে তার শান্ত স্বরে বলল, — কেন করেছেন ?

আজিজ মৃদু হাসলো! হেসে বললো, — সব কিছুর পেছনে কোন না কোন যথাযতো কারণ অবশ্যই থাকে?

— থাকে, তবে কোনো কারণই মানুষের জীবনের ঊর্ধ্বে নয়।

— তোমার সাথে যা হয়েছে, সেটা বদলাতে পারবো না। তবে তার জন্য আমি দুঃখিত।

— কেন? আমি নিশ্চয়ই এমন কেউ না, যাকে আপনি প্রথম এভাবে হত্যা করার ব্যবস্থা করেছেন।

— না, তবে আমি আমার রক্তের যোগ আছে এমন কাউকে করিনি।

পৃথিলা শান্ত চোখে তাকিয়ে রইল। তার জীবনে আরো কত কত ধাক্কা খাওয়ার বাকি আছে, কে জানে? এই যে, মনে ভেতরে যা উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে, তা সে শুনতে চাইছে না। তবে সে জানে, তাকে শুনতে হবে, শুনে সুন্দর মতো হজমও করতে হবে।

আজিজ সেই শান্ত চোখের দিকে তাকিয়ে বললো, — জাফর ঢাকায় বিয়ে করেছিল শুনেছিলাম। তবে অনেকটা পরে। তাই কিছু করবো তার আগেই আবার শুনি তালাক হয়ে গেছে। তবে সেই ঘরে সন্তান আছে, সেটা জানতাম না। আজই জানলাম।

পৃথিলা বেশ কিছুক্ষণ যেভাবে ছিল সেভাবেই থমকে বসে রইল। তারপর চোখ ফিরিয়ে নদীর পানির দিকে তাকালো। নদীর পানি আর তার চোখে তেমন কোন তফাৎ নেই। দুটোই চাঁদের আলোতে চিকচিক করছে। সেই চিকচিক করা পানি, চোখ থেকে গালে গড়িয়ে পড়তে লাগলো। আহা, কি হতো এই মিঠাপুকুরে না এলে, কি হতো ট্রেনটা তার উপর দিয়ে চলে গেলে। অনেক গুলো কষ্টের টেউ থেকে বেঁচে যেত। এজন্যই বুঝি এতো স্নেহ, এতো নাটক, এতো ভালো মানুষের চেহেরা।

আজিজ নিজেও নদীর পানির দিকে তাকালো। তাকিয়ে নিজের মতোই বলল, — আমার ফুপুর জন্ম আমার বছর চারেক আগে। শেষ বয়সের সন্তান। কালো, খাটো। তার মধ্যে ছিল পায়ের গোঁড়ালি একটু বাঁকা। সোজা হাঁটতে পারতো না। হাঁটতে গেলে বাঁকিয়ে হাঁটতে হতো। এই রকম সন্তান শেষ বয়সে এসে বাবা-মায়ের ঘাড়ে বোঝার মতো। তাও আবার মেয়ে। কারো ঘাড়ে যে সহজে গছাতে পারবে না তাও জানে। তাই যত রকমের অবহেলা আছে, তার মধ্যে তার বেড়ে ওঠা। আর বাড়ির আদরের প্রথম সন্তান আজিজের বিনা বেতনের বান্দি।

আমরা দুজন বড় হই একসাথে। সম্পর্কে ফুপু হলেও, বোন বলো, বন্ধু বলো, খেলার সাথী বলো আমার সব ছিল সে। তার মলিন জামার কোণা ধরে ঘুরে ঘুরে সকাল থেকে সন্ধ্যা হতো আমার। কী সুন্দর নিষ্পাপ একটা মুখ। দিন-দুনিয়া চেনে না, ভালো-মন্দ চেনে না। এই যে মহাজন বাড়ি, সেই বাড়ির বাইরে রাস্তাটাও চেনে না। তার দুনিয়া ছিল বাড়ি, বাড়ির উঠান, রান্নাঘর আর এই যে, এই আজিজ। এই আজিজের সাথেই ছিল সব কথা, তার চোখেই দেখতো মিঠাপুকুর গ্রাম, মিঠাপুকুরের নদী, মিঠাপুকুরের কোণা কোণা। গুটুর গুটুর করে আজিজ সব বলতো, আর সে চোখে মুখে বিস্ময় নিয়ে শুনতো।

সেই দুনিয়া ভেঙে গেল সারেং বাড়ির প্রস্তাবে। জানা কথা, অমত করবে কে? ঘাড় থেকে বোঝা নামছে এই তো কত! ব্যস, নেমে গেল।

একই গ্রাম, তাছাড়া আমার ফুপুকে ছাড়া আমার চলবে নাকি? আমিও বলতে গেলে চলে এলাম তার সাথে। সারেং বাড়ি হয়ে গেল আমার দ্বিতীয় বাড়ি। যখন তখন আসি, নিজের ইচ্ছে মতো ঘুরে ফিরে চলি। ফুপুর সাথে গুটুর গুটুর করে গল্প করি।

এই বাড়িতে ফুপুর গায়ে মলিন জামা থাকে না, থাকে ভাঁজভাঙা নতুন শাড়ি, গলায়, হাতে, নাকে গহনা। কোনো কাজের কৌটাটাও নাড়তে হয় না। নিজের রুমে থাকে। তবে সেই থাকার মাঝেও মুখটা হাসে না। মলিন চোখে জানালা ঘেঁষে সকাল থেকে সন্ধ্যা দূর আকাশে তাকিয়ে থাকে।

ওই বয়সে এই মলিনতা আমি বুঝি না। আমি বুঝি, আমার ফুপু ভালো আছে। এখন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাঁকা পা নিয়ে দৌড়ে দৌড়ে কাজ করতে হয় না, খাবারের সময় তার খাবারের ভাগ কম পড়ে না। গায়ে নতুন কাপড়, গহনা। তার জন্য এক কাজের লোক সব সময় থাকে। সে’ই খাবার থেকে সব কিছু প্রয়োজনের আগে রুমে নিয়ে আসে।

সেই কৈশোরের অবুঝ মাথা বুঝে নি। আমার ফুপুর যেমন বাপের বাড়ি ছিল না, তেমনি স্বামীর বাড়িও ছিল না। বাপের বাড়িতে সে কাজের বিনিময়ে দু’মুঠো ভাত খেতো, আর সারেং বাড়িতে এই যে এত আরাম আয়েশ, গহনা সব একটা বাচ্চার জন্য। এখানে আমার ফুপু কিছুই ছিল না।

আমার ফুপুর যেমন কিছুই ছিল না, তেমনি সংসারও হয়নি, স্বামীও হয়নি। এই সংসার ছিল জয়তুনের। এই বিশাল রুমটুকু ছাড়া তার আর কিছু নেই। আলতাফ উদ্দিন খারাপ লোক ছিল না। তবে সে ছিল তার চাঁদের মতো প্রথম বউতে দেওয়ানা। বাবা-মায়ের কথায় বংশরক্ষায় বিয়ে তো করেছে। তবে দায়িত্ব ছাড়া আর কোনো কিছুর জন্যই আমার ফুপুর দিকে ফিরে তাকায়নি। তার ধ্যান, জ্ঞান, দুনিয়া ছিল জয়তুন আরা। জয়তুন আরার কথাতেই সব শুরু, তার কথাতেই সব শেষ।

আর এই কিছুই না হওয়ার দুনিয়ায় আল্লাহ তাকে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় নেয়ামত দিলেন, তার সন্তান। প্রথমবার আমি ফুপুকে হাসতে দেখলাম। খিলখিল হাসি, চোখে-মুখে বাঁধভাঙা খুশির জোয়ার। সেই খুশির জোয়ারে ভেসে প্রায়ই তিনি আমাকে বলতেন, — ও আজিজ, বলতো কন্যা হবে না পুত্র?

আমি কিছু বলতে পারতাম না। আমি চেয়ে ফুপুর খুশি দেখতাম। সেই দেখার মাঝেই আবার বলতো, — আমার সন্তান হলে প্রথম কোলে নিবি তুই, নিবি না?

আমি সাথে সাথেই মাথা নাড়াতাম। সে লাগার মাঝেই ফিসফিস করে বলতো, — এই সন্তান আমার, শুধু আমার। আমি এর ভাগ কাউকে দেবো না।

যার কিছুই থাকে না, সে জীবনে হঠাৎ কিছু পেলে দিন-দুনিয়া ফেলে আকড়ে ধরে। আমার ফুপুও ধরলেন। সেই ধরায় সে কাউকে দেখতে পারে না। বাড়ির বড় ছেলে তখন জসিম। বাচ্চা ছেলে। পুরো বাড়ি হুটোপুটি করে খেলতো। সেই খেলার মাঝেই একদিন ধাক্কা লাগলো।

ফুপু পা এমনিতেই বাঁকা, পেটে বাচ্চা। ফুপু পড়তে পড়তে বাঁচলো। আর বেঁচেই জসিমকে এক থাপ্পড় লাগালো।

আমার নাদান ফুপুতো আর জানে না, কার জিনিসে হাত লাগিয়েছে সে। জয়তুন, জয়তুন আরা। জয়তুন আরার কলিজা জসিম। সে জয়তুন আরার গর্ভে না জন্মালেও, তার দুনিয়া সে।

আর তখন থেকেই জয়তুনের চোখের বালি হয়ে গেল সে। তার মধ্যে আলতাফের আচরণ। স্বাভাবিক, এত সাধনার পর প্রথম সন্তান দুনিয়ায় আসছে। মনোযোগ সন্তান, সন্তানের মায়ের প্রতি আসবেই। আর এটাকেই পাগল ফুপু তার শক্তি ভেবে বসলো।

জয়তুনের চোখের বালি যেমন সে, তেমনি তার চোখের বালি জয়তুন, জয়তুনের ছেলে জসিম। সে তার চোখের বালিদের ঘৃণা করে। তবে সে তো জানে না, জয়তুন চোখের বালিদের এই সামান্য ঘৃণায় তার পুষে না। বরং নিঃশেষ করে ফেলে। করলোও তাই।

আমার ফুপু জন্মের পরে ছেলের মুখটাও দেখেনি। তাকে দুনিয়ায় আনতে গিয়ে বেহুঁশ হয়েছিল। সেই হুঁশ জয়তুন আর ফিরতে দেয়নি। দাইয়ের মুখ বন্ধ করেছিল বিশাল টাকায়। সংসার তার, স্বামী তার, সারেং বাড়ির রক্ত তার, ক্ষমতা তার। এক চোখের বালি নিঃশেষে সব তার।

কেউ জানলো না, কেউ বুঝলো না। ঐ যে সারেং বাড়ির দক্ষিণ কোণের রুম, সেই বিশাল রুমে তার ফুপু নিজের অজান্তে এই দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন। সবাই জানলেন, সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা গেছে। এই আর কি? গ্রামে অহরহ মেয়ে এভাবে সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মরছে। তাছাড়া তার ফুপুর এই আজিজ ছাড়া ছিলই বা কে? বংশ রক্ষায় এনেছিল, বংশ রক্ষা হয়েছে, কাহিনী শেষ।

এই সারেং বাড়ির ইট, দেয়াল শুধু ঐ যে ভয়ংকর রাত, সেই রাতের সাক্ষী না, সাক্ষী তারো আগে তার ফুপুর মৃত্যর। ইট, দেয়ালের তো মুখ নাই, তাই কেউ জানতেও পারে নাই। আমি তখনো সারেং বাড়িতে ঘুরি ফিরি। ফুপুর গায়ের গন্ধ খুঁজি। জাফরের সাথে লেপ্টে থাকি। তার গায়ে যে তার ফুপুর সুবাস।

আসলে কি জানো? সত্য কখনো চাপা থাকে না। বের হবেই। হলোও তাই। সেই দাইয়ের মুখ বন্ধ রাখার জন্য আরো টাকা চাই। তাই জয়তুনকে হুমকি ধমকি দিতে লাগলো। জয়তুন আরা যে কী চিজ, সে তো জানে না। ব্যস, জন্মের মতো মুখ বন্ধ করে দিলো। সেই দেওয়ার আগেই আমি সব দেখে ফেললাম। এই সারেং বাড়ির পুরো আনাচে কানাচে ঘুরি ফিরি। কে ওতো খেয়াল করে। তাই তাদের সব কথা সুন্দর মতোই শুনলাম। শুনে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালাম না, চুপচাপ সারেং বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলাম। যেতে যেতে মনে মনে একটা কথাই বললাম, — যেই সারেং বাড়িতে তার ফুপুর জায়গা হয়নি, সেই সারেং বাড়িকে আমি ধুলোয় মিশিয়ে দেবো আর দেবো জয়তুন আরাকে। তাকে আমি মৃত্যুর দেবো, ধীরে ধীরে। ব্যস, মনের আগুন মনে চেপে দিন গুনতে লাগলাম। সময় গেল, কৈশোর থেকে যুবক, ঘুবক থেকে পুরুষ। বাবার সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিলাম। নিয়ে জাল বুনতে লাগলাম। সেই জালে সেই ভয়ংকর রাতে সারেং বাড়ি ধ্বংস তো হলো, তবে জয়তুনকে পারলাম কই। ভাগ্য তার সত্যিই ভালো। তাই রয়ে গেল আফসোস। কতটা আফসোস, তুমি জানো না গো মা। সেই আফসোস নিয়ে আমি ঘুমাতে পারি না। তাই আবার জাল বুনি। এই যে, আবার সেই জালে সব আটকে ফেলেছি। এবার আর সারেং বাড়ি বাঁচতে পারবে না।

পৃথিলা অবাক হয়ে আজিজের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কোন দুঃখে দুঃখি হবে সে বুঝতে পারছে না। নিজের পরিচয়, না এই করুণ গল্পে। বরং তার মাথায় ফট করেই অন্য কিছু ঘুরে গেলো। যেতেই অবাক হয়ে বললো, — বীণার সাথে কি করবেন আপনি?

আজিজ হাসলো! হেসে বলল, — জয়তুন আরা যা আমার ফুপুর সাথে করেছে, আমিও তাই করবো। তার নাতনিকে শাড়ি দেবো, গহনা দেবো, তিন-চারটা বান্দি দেবো। আমার প্রিয় ছেলেকে দেবো। তবে তার বিনিময়ে সে আমাকে দেবে শুধু আমার বংশের বাতি, আর তার জীবন।

পৃথিলা স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। দুনিয়ার সব ভয়ংকর মুখগুলো দেখানোর জন্যই বুঝি তাকে বাঁচিয়ে রাখা। সে সেই স্তব্ধতার মাঝেই বললো, — আয়নার মাথাটাও আপনি নষ্ট করেছেন, তাই না?

আজিজ হো হো করে হাসলো। হেসে বললো, — সব শুভ কাজে বলি দিতে হয় জানো? আয়না হচ্ছে আমার সেই বলি।

— মানলাম, আপনার ফুপুর সাথে অন্যায় হয়েছে। জয়তুন আরা দোষী। তবে জয়তুন আরার ছোট্ট ছেলেটা কোনো দোষ করেনি, করেনি তার বউ, করেনি আপনার প্রিয় ভাতিজার বউ। তাহলে এক অন্যায় জয়তুন করেছে, আপনি করেছেন তার তিনগুন। তবুও কিসের এতো ক্ষোভ।

আজিজ ভ্রু কুঁচকে বলল, — আপনার ফুপু কী? দাদি হয় তোমার ।

পৃথিলা নিজের মতোই বলল, — আমার দাদির নাম হাফসা বেগম। তাঁর ছেলের নাম সাবেত, সাবেত মাহমুদ। আমি সাবেত মাহমুদ আর শায়লার বড় মেয়ে। এটাই সত্য। আর এই সত্য কখনো বদলাবে না।

আজিজ কিছুক্ষণ পৃথিলার শান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, — আমার জাফর নির্দোষ। সে শুধু পরিস্থিতির শিকার হয়েছিল।

— কোন গল্প’ই আমার ভেতরের ঘৃণাকে শেষ করতে পারবে না।

— কেন পারবে না। তোমার শরীরে তার রক্ত।

— এই রক্তকে আগলে রেখেছে আমার বাবা। তার জায়গা দুনিয়ার এমন কেউ নেই সরিয়ে ফেলবে। জন্ম দিলেই বাবা হওয়া যায় না। বাবার হতে হলে তার কাবিল হতে হয়। সেই যোগ্যতা আপনার জাফরের নেই।

আজিজ স্তব্ধ হয়েই কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর আগের মতোই বললো, — আমার জাফর ঋণের বোঝা টানতে গিয়ে যোগ্য স্বামী, যোগ্য পিতা হতে পারেনি। এই যে, এই জয়তুন আরার জন্যই। তিনি সব কিছু জসিমকে দিয়ে রেখেছিল। আর জাফরকে স্নেহের নামে এমনভাবে আটকে রেখেছে। সেই দায় থেকে সে বের হতেই পারেনি।

তাই তো তার ভালোবাসার কথা জেনেও গলা টিপে নিজের বোনের মেয়েকে জাফরের গলায় ঝুলিয়েছে। সেই ঝুলানোর দায় জাফর কত কষ্টে হজম করেছে, জয়তুন জানে না, আমি জানি। অথচ জসিম বিয়ে করেছিল নিজের পছন্দে। জসিম, এরশাদ, শাহবাজ, এদের সবকিছুতেই সে উদার। তবে জাফরের ক্ষেত্রে তা হয়নি। তবুও দুনিয়া দেখেছে, সৎ মা হয়েও কী সুন্দর বুকে আগলে রেখেছে। আর এই কারণেই আমি কাউকে ছাড়িনি। তারা থাকলে আমার জাফর ভালো থাকতো না, তাছাড়া জয়তুনের কলিজা ছেড়ার জন্যই তো এতো কিছু।

— অন্যায় অন্যায়ই হয়। জয়তুন আরা যা করেছে, সেটাও অন্যায়, আপনি যা করেছেন, সেটাও অন্যায়। একজনের পাপ কখনো অন্যজন বহন করে না। আর আপনার নির্দোষ জাফর যা করেছে, সেটাও আমার মায়ের দিক থেকে অন্যায়। তাই দয়া করে এই সব পাপের খেলা বন্ধ করুন। বীণা, আয়না ওরা নির্দোষ।”

আজিজ আগের মতোই হালকা হাসলো। হেসে বলল, — আমি বন্ধ করলেও, এরশাদ করবে না। আমি যেমন কসম খেয়েছি সারেং বাড়িকে ধুলায় মেশাবো, তেমনি সে কসম খেয়েছে, তার পরিবারকে হত্যায় যারা যারা আছে, তাদের বংশ নির্বংশ করবে। তুমি কি জানো, সেই দিন রাতে এরশাদ যেই কয়জনকে লাশ বানিয়ে ছিল, তাদের পরিবারের কেউ বেঁচে নেই। কোথায় গেছে, কী হয়েছে, প্রমাণও নেই। কেন নেই জানো? এরশাদ তাদের নির্মমভাবে হত্যা করে ইটের চুলায় জ্বালিয়ে দিয়েছে। কোনো লাশ নেই, প্রমাণও নেই। এখন বলো, তাদের কী দোষ?

পৃথিলা আর শুনতে পারলো না। এরা মানুষ? মানুষের মতো দেখতে ভয়ংকর এক পশু! সে ক্লান্তভাবে ছাউনিতে মাথা রাখলো। ভালো লাগছে না তার। কেমন গা গুলিয়ে উঠছে। তখনই নৌকা পাড়ে ভিড়লো। এমনিতেই তেমন কিছু চেনে না। তার মধ্যে রাত, কোথায় এসেছে জানেও না।

আজিজ দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, — আমার কাজ হলে আমি নিজেই তোমাকে ঢাকায় পৌঁছে দেবো। তাছাড়া আমি চাইলেও এখন ঢাকায় পৌঁছানো সম্ভব না। এরশাদ কাঁচা খেলোয়াড় না। পুরো গ্রামে তার লোক আছে। আমার বাড়িতে তো নেয়া সম্ভব না। সেই পর্যন্ত চেয়ারম্যান বাড়িতে তুমি থাকবে। সেখানে তোমার কোনো সমস্যা হবে না।

— কিসের কাজ?

— আসলে বলতে গেলে সেই হিসেবে কাজও নেই। আমি এখন শুধু বসে বসে তামাশা দেখবো। কেননা এরশাদ তোমাকে পাবে না। না পেলে, তার বিগড়ানো মাথা আরও বিগড়াবে। সেই বিগড়ানো মাথার ঝড় আয়নার ওপর দিয়ে যাবে। মাথার চুল তো আর বাতাসে পাকে নাই। রূপবতী বউয়ের রূপে সারেং বাড়ির ছোট নাতি অনেক আগেই কুপোকাত। সেই বুঝি চুপচাপ বসে থাকবে? জয়তুন আরার দুই লাঠি নিজেরাই নিজেদের শেষ করবে। তারা শেষ হলে, জয়তুন আরা এমনিতেই শেষ। ব্যস, কাহিনী খতম।

— আয়না আপনাকে নিজের বাবার মতো বিশ্বাস করে।

— তার বাবাও করতো। তুমি হয়তো জানো না, আয়নার বাবা-মাও গায়েব। তবে তাদের গায়েব এরশাদ করেনি। আয়না যাকে বাবার মতো ভরসা করে, সে’ই করেছে।

— আপনারা সবাই পিশাচ।

— হ্যাঁ, তবে আমার ফুপু নিষ্পাপ। তার কিছু ভুল ছিল, তবে পাপ করেনি। আমার জাফর নিষ্পাপ। সে যা করেছে, দায়বদ্ধ থেকে করেছে। আর এই দায়বদ্ধতার শাস্তি সে মরমে মরমে পেয়েছে। আর আমার জাফরের মেয়েও নিষ্পাপ। তার উপর এরশাদের পাপের ছায়া আমি পড়তে দেবো না। তাই, তাদের ধ্বংসই সব সমস্যার সমাধান।

পৃথিলা গলা দিয়ে আর একটা শব্দও বেরুলো না। সে যেভাবে বসে ছিল, সেই ভাবেই বসে রইল। তার চোখের সামনে ভাসতে লাগলো, দুটো নিষ্পাপ মানুষের মুখ। বীণা আর আয়না। কী করবে সে? এই গল্পে কে ভালো, কে খারাপ, কে বেশি দোষী, সে জানতে চায় না। সে শুধু জানে, এই দুটো প্রাণ বাঁচাতে হবে। যে ভাবেই হোক বাঁচাতে হবে।

আজিজও পৃথিলাকে আর কিছু বললো না। তবে যেই তিনজন পৃথিলাকে নিয়ে গিয়েছিল, তাদের দিকে তাকিয়ে বলল, — জান বাঁচাতে চাইলে মিঠাপুকুর থেকে গায়েব হয়ে যা। সারেং বাড়ির ঘাটে তোদের নৌকা ভিড়েছে। কার নৌকা ভিড়েছে, এটা বের করা এরশাদের বা হাতের কাজ। আর যদি আমার নাম মুখে আসে, তোরা তো এরশাদের হাতেই শেষ, বাকি তোদের বউ-বাচ্চা, সেগুলোকে আমি নিজ দায়িত্বে শেষ করবো। তাই নিজেরা মরলে মরবি, তবুও আজিজের নাম যেন মুখে আসে না।

তারা তিনজন’ই ঢোক গিললো। টাকার জন্য অকাম, কুকাম তো আজ নতুন করে না। তবুও টাকার লোভ যে কতটা ভয়ংকর, আজ হাড়ে হাড়ে টের পেলো। পেয়েই রাতের আধারে গ্রাম ছাড়তে চাইলো। চাইলেই বুঝি সব পাওয়া যায়? আর যেখানে স্বয়ং এরশাদ! তাই শেষ রাতে গ্রাম থেকে বের হওয়ার আগেই ধরা পড়লো। এরশাদ অবশ্য জানে না, কী কী করেছে এরা। সে শুধু তার সব লোকদের বলেছে, গ্রাম থেকে বের হওয়ার সব রাস্তায় লোক রাখতে। যাকে সন্দেহ হবে, তাকেই ধরতে। আর ধরতেই হড়বড় করে জান বাঁচানোর জন্য তারা বলল, — তারা কিছু করেনি। বিয়ে বাড়ির লোক নিয়ে ঘাটে গিয়েছিল। তখনই একটা মেয়ে তাদের কাছে সাহায্য চায়। ব্যস, তারা সাহায্য করেছে। স্টেশনের ঘাটে নামিয়ে দিয়েছে। তারপর কোথায় গেছে জানে না।

এরশাদ শুনে সব সময়ের মতোই হাসলো। হেসে ঠোঁটে সিগারেট রাখলো। আগুন জ্বালাতে জ্বালাতে বলল,– ইটের চুলায় আগুন দিতে বল।

চলবে……

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here