ধূপছায়া #নূপুর_ইসলাম #পর্ব_৪৭

0
1

#ধূপছায়া
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_৪৭

দরজার টোকা পড়তেই আয়না কেঁপে উঠল। অতিরিক্ত ভয়ে যেভাবে উঠে ঠিক সেভাবে। কেঁপেই বীণার হাত খামচে ধরলো। ভয়ে তার মরি মরি অবস্থা। বাঁচানোর মতো তো কেউ নেই। তবুও এই বিপদের অথৈ সাগরে হাবুডুবু খেতে খেতে ঘুরে ফিরে একটা নামই মাথায় আসে। কেন? একটু জড়িয়ে ধরেছে বলে, নাকি একটা রাত তার সাথে ছিল বলে? তিন কবুল বলে বউ হলে এই রকম অধিকার সব পুরুষরাই দেখায়। এই আর কি? এরা জড়িয়ে ধরতেও সময় নেয় না, আবার স্বার্থে আঘাত লাগলে সেই কবুল পড়া বউকে ছুঁড়ে ফেলতেও একবার ভাবে না।

তাইতো মাথায় আসতেই আয়না সাথে সাথে ঝেড়ে ফেলে। সারেং বাড়ির কেউ ভালো না। তার বাঁচা মরায় কারো কিছু আসবে যাবেও না। এতোদিন শুধু ছিল পৃথিলা আপা। আর এখন সারেং বাড়ির মেয়ে। পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। কেউ তাকে ছাড়বে না, ঐ যে ঘুরে ফিরে যেই মানুষটার নাম মাথায় আসছে, সেও ছাড়বে না। না জেনে ক্ষতি করতে চেয়েছে, এখন কি আর করবে? কখনও না। বরং তার মাথায়ই আগে দেয়ালে ঢুকে দেবে। এই সব ঢুকাঢুকিতে তাদের হাত কাঁপে না। আয়নার বেলায় তো আরো না। তার বাবা নেই, মা নেই, শক্ত ভাবে কেউ পাশে দাঁড়াবে সেই রকমও কেউ নেই। চাইলেই তাকে যা খুশি করা যায়। তো এই আর নতুন কি?

বীণাও নিজেও কেঁপে উঠল। বিয়ের কনের কোনো হাবভাবই তার মধ্যে নেই। এমন অবস্থায় থাকার কথাও না। বরং বিয়ে, সব কিছু মাথা থেকে কখন যে বেরিয়ে গেছে, বুঝতেও পারেনি। এখন যা আছে সেটা আতঙ্ক, ভয়। ভাইদের এই রুপগুলো তো কখনও দেখেনি। তাই হজম করতে খুব কষ্ট হচ্ছে। স্কুল, আশে পাশে পিঠ পিছে কতকিছু শুনতো। তবে কখনও গা করে নি। ভেবেছে পিঠ পিছে অনেক কথাই হয়, তার মধ্যে সত্য কয়টা থাকে। আর এখন মনের অজান্তেই মন বলছে সব সত্য, সব। তার এই প্রিয় পরিচিত ভাইয়ের অচেনা অনেক রুপ আছে। তার ভাবনার বাহিরে আছে। আর সেটা ভাবতেই ভেতরটা ভেঙে এলো। সেই ভাঙার মাঝেই দরজায় আবার মৃদু টোকার শব্দ ভেসে এলো। তারা দুজনের একজনও টু শব্দ করলো না। হাত ধরাধরি করে বসে রইল। সেই বসার মাঝেই দরজার ওপাশ থেকে ভেসে এলো শান্ত একটা কণ্ঠ।

— বীণা, আমি ফরহাদ, দরজা খোল।

বীণা শোনার সাথে সাথে দরজার দিকে তাকালো। যাকে বিয়ে করবে না, করবে না বলে এতকিছু। তার এই কয়েকটা শব্দে কোন ভরসা পেলো কে জানে।ঝট করে দাঁড়িয়েই কিছুটা দৌড়ে দরজার খিল খুললো। খুলতেই ঝরঝরিয়ে কেঁদে ফেললো। আজ সন্ধ্যায় তাদের বিয়ে হয়েছে, তাদের গায়ে এখনোও বিয়ের শাড়ি, শেরওয়ানি। সেই কিছু বীণার মাথায়ও নেই। সে কেঁদেই বলল, — ফরহাদ ভাই, ভাইয়ের কি হয়েছে? এমন করছে কেন?

ফরহাদ তাকিয়ে তার নববধূকে দেখলো। বিয়ের পরে তাদের শুভ দৃষ্টি হয়নি। এই যে এখন হলো। গায়ে আলুথালু শাড়ি, মাথায় ঘোমটা এলোমেলো, গহনা টিকলি টায়রা চুল সব এলোমেলো। কাজল লেপটে চিবুক ছুঁয়েছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, নববধু তাকে ভাই বলে ডাকছে। এই জমানায় এমন বিরল ঘটনা দেখেছে বলে ফরহাদের মনে পড়ে না। আসলে বিয়ে নিয়ে তো তার আলাদা ভাবনা ছিল না, সব সময় ভাব ছিল গা-ছাড়া। হয়ত আল্লাহ আজ সেই বিয়ে দিয়েই তার গায়ের রস, জান সব চিপড়ে বের করলো।করবে না কেন? আল্লাহর ফরজ জিনিস নিয়ে ভাব দেখিয়েছে। ছেড়ে দিলে হবে।

তাই বড় একটা শ্বাস ফেললো। বীণার কোন উত্তর তার কাছে নেই। এই এরশাদ তার নিজেরও অচেনা। তাই ফেলেই আয়নার দিকে তাকালো। প্রবল ঝড়ের পর প্রকৃতি যেমন শান্ত নিশ্চুপ হয়ে যায়, সারেং বাড়ির অবস্থাও তেমন। একেবারে শান্ত, নিশ্চুপ, মৃত বাড়ির ন্যায়। এরশাদ তখনই বেরিয়ে গেছে, কোথায় যাচ্ছে বলার অপেক্ষা রাখে না। যাওয়ার আগে একবার জাফরের দিকে তাকিয়ে ফরহাদকে শুধু বলল, — পারলে মান্নার সাথে শাহবাজের কাছে যা। দেখ কি অবস্থা।

— আর তুই?

— ও স্টেশনে যায়নি। স্টেশন সহ সব জায়গায় আমার লোক আছে। কারো না কারো চোখে পড়ত। আর না পড়লেও ট্রেনে উঠতে হলে টিকিট কাটতে হবে। সেই লোকই আমার। তাই ও মিঠাপুকুরেই আছে। ব্যস, খুঁজতে দেরি।

জাফর শুনে আগের মতোই শান্তভাবে বলল,– খুঁজে কি করবি, আমি বেঁচে থাকতে আমার মেয়ে কোনো পিশাচের হাতে দেবো না। কোনদিনও না।

এরশাদ তার মতোই হাসলো! হেসে চাচার কথার বিপরিতে কোনো উত্তর দিলো না। নিজের মতো বেরিয়ে গেলো। পুরো গ্রাম এখন এফোঁড় ওফোঁড় করবে বুঝতে কারো বাকি রইল না।

এরশাদ বেরুতেই ফরহাদ খেয়াল করলো, তার বাবা নেই। শুধু সে না, সবাই করলো। করে কারোই তেমন ভাবান্তর হলো না। এমন অবস্থায় কিই বা ভাবান্তর হবে, আছে হয়তো আশেপাশেই। তাই তারাও যে যার মতো বেরুলো। এখানে বসে থাকার আর মানে হয় না। ইমরানও সাবিহাকে ধরে নিজেদের ঘরে ফিরলো। ফিরতেই সাবিহা পৃথিলার সব জিনিস দেখে হাউমাউ করে কাঁদলো। কোথায়, কিভাবে আছে মেয়েটা আল্লাহ’ই জানে? তার জন্য, তার জন্যই সব হলো। যদি এখানে না আসতে বলতো, অন্তত বেঁচে থাকতো।

তারা বেরুতেই ফরহাদ আম্বিয়ার দিকে তাকালো। আম্বিয়া আজ নীরব দর্শক। যে নিজে ভালো থাকে না, অন্যের দুঃখে তার কী আসে যায়। তাছাড়া তার এই এক জীবনের বলিদান হিসেবে তার মনে হচ্ছে আল্লাহ স্বয়ং সারেং বাড়ির বিচার করেছেন। তাই তাকে তেমন বিচলিত দেখা গেলো না। সে এক সাইডে তার মতোই চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। সেই দাঁড়ানোর মাঝেই ফরহাদ বলল, — দাদিকে রুমে নিয়ে যান।

আম্বিয়া কিছু বলল না, এগিয়ে জয়তুন আরাকে ধরলো। জয়তুন তখন নিস্তেজ। নিস্তেজ ভাবেই উঠে দাঁড়ালো। দাঁড়িয়ে জাফরের দিকে তাকালো। তাকাতেই সেই যে আলাউদ্দিনের কথা আবার কানে বেজে উঠল, — কেন করলে এই পাপ সখী। দুনিয়াতে সব মোছা যায়, তবে পাপ না। সেটা ঘুরে ফিরে আসবেই। তুমি বিন্দু পরিমাণ করবে, সেটা অথৈ সাগর হয়ে ফিরে আসবে । এই ফেরার শেষ নেই। পিড়ির পর পিড়ি চলে, চলতেই থাকে। আর তুমি তো করলে মহাপাপ। এই মহা পাপের ভার সইতে পারবে তো?

জয়তুন পারছে না, সত্যিই আর পারছে না। কার জন্য করেছিল এই পাপ। পিড়ির পর পিড়ি চলছে। আর দেখো যাদের জন্য করেছে তারাই নিজ হাতে সেই শাস্তি দিচ্ছে। এজন্যই হয়ত বলে, আল্লাহ ছাড় দেয়, তবে ছেড়ে দেয় না। এই যে মুঠো করে জন্মের মতো ধরেছে। এই ধরা থেকে জয়তুনের আর রক্ষা নাই। একদম নাই। তাই কাঁপা কাঁপা কণ্ঠেই ডাকলো, — জাফর, এদিকে আয়। কথা আছে আমার।

জাফর ফিরেও তাকালো না। সে নিজের মতো বাহিরের দিকে এগুলো। এখন সে যাবে থানায়, অনেক হয়েছে। আম্মা, আব্বা, ভাই, ভাতিজা এই বাড়িতে তার কেউ নেই। এক আছে তার মেয়ে। জানে না কি অবস্থায় আছে। ভালো থাকলে ভালো, তবে খোঁজ না পেলে, যেই সারেং বাড়ির বাহাদুরি সবাই করে, সেই সারেং বাড়ির সব হাওয়ায় উঠিয়ে দেবে। তখন সে দেখবে টাকা পয়সা সয়- সম্পতির ছাড়া কার কতো ক্ষমতা।

ফরহাদ সবই দেখলো। দেখে কোন প্রতিক্রিয়া হলো না। এই ঝড় তো ঝড়’ই না। আসল ঝড় শুরু হবে পৃথিলাকে না পেলে। আর না পেলেই এরশাদের মাথা আবার খারাপ হবে। ভয়ংকর খারাপ। সেই খারাপ হওয়ার আগে আয়নাকে সরাতে হবে। কেননা খারাপ হলেই সব ঝড় আয়নার উপরেই এসে পড়বে। তাই তাকিয়ে বলল, — কিছুক্ষণের মধ্যে আমি শাহবাজের কাছে যাবো। তুমিও চলো।

আয়না কোনো টু শব্দ করলো না। ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো। সে ভালো করেই জানে, সে যেখানে যাবে সেখানেই বিপদ। হোক বিপদ! তবুও কেন জানি ঐ শয়তান লোকটাই তাকে টানছে। কি আজব ব্যাপার!

আয়না বেরুতেই ফরহাদ বীণার দিকে তাকিয়ে বলল, — কাপড়-টাপড় ছেড়ে হাত মুখ ধুয়ে নে। দাদির দিকে খেয়াল রাখিস।

বীণা আস্তে করে মাথা কাত করলো। ফরহাদ সেই কাত করা মুখের দিকে একপলক তাকালো। তাকিয়ে এগুবে, তখনই বীণা শেরওয়ানি টেনে ধরলো। ফরহাদ ফিরে একবার টেনে ধরা শেরওয়ানি, আরেকবার বীণার দিকে তাকালো। তাকাতেই বীণা বলল, — ভাবিকে আপনার বাবা সাহায্য করেছে। তার লোকই পৃথিলা আপাকে নৌকা করে নিয়ে গেছে।

ফরহাদ চমকালো। চমকে অবাক হয়ে তাকালো। সেই চমকানো চোখে দিকে তাকিয়ে বীণা আগের মতোই বলল, — আমি কাউকে কিচ্ছু বলবো না। শুধু সব ঠিক করে দিন। আমি, আমার দুভাই, ভাবি, পৃথিলা আপা সবাইকে একসাথে চাই।

ফরহাদ আগের মতোই তাকিয়ে রইল। তার বাবা আবার এই সবের মধ্যে জড়িয়েছে কেন কে জানে? এরশাদের কানে গেলেই বিরাট ঝামেলা বাঁধবে। তাই বীণার কথার উত্তরে বলার মতো একটা শব্দও পেলো না। তবে ঠিক বুঝতে পারলো। কিছুই আর ঠিক হবে না, একদম না।

আর ঠিক না হওয়ার লক্ষণ শুরু হলো, ফরহাদ আয়নাকে নিয়ে বেরুতেই। জাফর চাচা রেগে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। এমন রাগে তাকে ফরহাদ কখনও দেখেছে বলে মনে পড়ে না । আর সেই রাগের মাঝেই তাকে অবাক করে, জাফর চাচা জীবনে যা কখনও করে নি, তাই আজ করলো। গেটের লোকের গালে ঠাস এক চড় বসিয়ে দিলো। তার বাড়ি, তার ঘর। সেখান থেকে তাকে বেরুতে দেবে না। এতো সাহস?

অবশ্য দিয়েও কোন লাভ হলো না। তারা তাদের মতোই চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। কেননা এরশাদ সোজা হুকুম জারি করে গেছে। ফরহাদ ছাড়া একটা পক্ষীও যেন সারেং বাড়ির দরজা না পেরুতে পারে।

আয়না অসহায় ভাবে ফরহাদের দিকে তাকালো। ফরহাদ অবশ্য এক সেকেন্ডও আর সময় নষ্ট করলো না। তাকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঢাকা যেতে হবে। শাহবাজের কি অবস্থা কে জানে? এতো ঝড় তার একা সামাল দেওয়া সম্ভব না। আর আয়নামতিকে কেউ যদি এখন বাঁচাতে পারে সেটা একমাত্র শাহবাজ।

মাগরিবের আযানটা পৃথিলার কানে এসেছে অস্পষ্টভাবে। সেই আসাও হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। কয়টা বাজে, কোথায় আছে জানেও না। তখন নোংরা হাতের স্পর্শ থেকে বাঁচার জন্য নিজের হাতে চোখ বাঁধলেও, এখন তার হাত, মুখ, পা সবই বাঁধা। সেই বাঁধা অবস্থায়’ই আছে নৌকার পাটাতনের ভেতরে। গায়ের শাড়ি ভিজে চুপচুপে। অনেকক্ষণ এভাবে পড়ে থাকার কারণে শরীর তার অসাড়। হাত পা ব্যথায় ঝিম দিয়ে আছে।

কি হয়েছে, কোন কারণে সে নিজেও জানে না। তখন কোন বিলের কথা বলল কে জানে। তবে বিলে দিকে এগুতে না এগুতেই হলো বিপত্তি। কোনো কিছু নিয়ে দু’পক্ষের ঝামেলা হয়েছে। হয়তো ক্ষেত-টেত নিয়ে। নানান মানুষের হইচই, চেঁচামেচি। গ্রাম গঞ্জে এগুলো সাধারণ ব্যাপার। তবে নৌকায় তাকে দেখা সাধারণ না। দেখা মানেই প্রমাণ। তাই তখনই তিনজনের দুজন দৌড় এলো। কোন কথা টথা নেই। যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব হাত, পা, মুখ সব বাঁধলো। বেঁধে বলতে গেলে পাটাতনের ভেতরে ছুঁড়ে ফেললো। ফেলে বিরক্তমাখা সুরে বলল, — হালার কপালই খারাপ। ঝামেলা লাগার আর সময় পায় না। বলেই সুন্দর মতো পাটানের মুখ বন্ধ করে দিলো। দিয়েই কোথায় যেন হারিয়ে গেলো।

পৃথিলা এভাবেই এখানে পড়ে রইল। ছুঁড়ে ফেলায় ব্যথা পেয়েছে। হাতের কুনুই, কোমর জ্বলছে। কেটেছে কি না কে জানে? তবে এই কাটা, ব্যথার চেয়েও তার ঘৃণায় গা গুলিয়ে এলো বেশি। যেই শরীরে আজ পর্যন্ত কখনও পর পুরুষের ছোঁয়া লাগেনি, আজ কি নির্ধিধায় কাগজের টুকরোর মতো ইচ্ছে মতো ধুমড়ে মুচড়ে ফেলছে। অবশ্য সে ভালো করেই জানে, এই ফেলা তো সবে মাত্র শুরু। শেষ দুপুর, নির্জন বিলে তো আর বসে বসে মুখ দেখার জন্য নিতে চায়নি।

অবশ্য সে নিজেকে তৈরি করেই তখন চুপচাপ নৌকায় বসে ছিল। হাজারবার মৃত্যুর চেয়ে একবার মরা ভালো। সাঁতার জানে না, নদীতে স্রোত ছিল। সুযোগ বুঝেই ঝাঁপিয়ে পড়তো সে। আর পড়লেই সব সমস্যার সমাধান। তাই টু-শব্দও করেনি। তবে তার ভাগ্য, এই সাধারণ সমাধান দিতেও নারাজ। তাইতো অযথাই ঝামেলা লেগে গেলো। তা না হলে আজই এই ঝামেলার কোন দরকার ছিল? না নেই । ও যে তার ভাগ্য। তাই লেগে গেছে। তার দাদি বলতো, — যা হয়, ভালোর জন্যই হয়। আমরা ধৈর্য্য রাখতে পারি না। পারলেই মানুষ দেখতো উপরে যিনি আছেন কতো নিখুঁত কারিগর।

পৃথিলা কি ধৈর্য্য ধরবে? কি জানি? তার ধারণা তার মাথাও এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। এই যে যখনি মাগরিবের আযানটা পড়ল। তার কিছুক্ষণ পড়েই পৃথিলার মনে হলো, তার পাশ ঘেঁষে কে যেন বসলো। এতো ভয়ের মাঝেও অন্য রকম ভয়ে শরীর কাটা দিলো। আসলেই সে পাগল হচ্ছে। একটা পর একটা ঘটনা মস্তিষ্ক আর নিতে পারছে না। হয়ত তাই হাবিজাবি সব কল্পনা করছে।

তখনই নৌকায় মানুষের শব্দ পাওয়া গেলো। পৃথিলা নিজের অজান্তেই চমকালো। না, মানুষের জন্য না। তারা তো আসতোই, পৃথিলা জানে। তবে চমকালো, কারণ তার মনে হলো, কেউ কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, — ভয় নেই, মহাজন আসছে।

ভয়ে আতঙ্কে পৃথিলার জমে গেলো। জমে গেলেও এক অবচেতন মন তাকে বলছে। এসব কিচ্ছু না। মন মস্তিষ্ক ভয়ে বুদ হয়ে আছে। তাই এমন মনে হয়েছে। তাছাড়া মহাজন আসবে কোথা থেকে? আজকে তার ছেলের বিয়ে। এতক্ষণে ছেলের বউকে নিয়ে বাড়িতে ফেরার কথা। আর তার ভাবনাকে সত্য প্রমাণ করে সেই তিনজনের কণ্ঠই পৃথিলা পেলো। পাওয়ার সাথে সাথেই দু’জন পাটাতনের ভেতরে চলে এলো। এসে এক ঝটকায় পৃথিলাকে টেনে বের করলো। বের করতেই চোখ থেকে গামছাটা সরালো।

রাত হয়ে গেছে। নৌকায় টিমটিম করে ছোট্ট হারিকের জ্বলছে। সেই আলোতে সামনে বসা মানুষগুলোর দিকে পৃথিলা তাকালো। তাদের দৃষ্টি অবশ্য পৃথিলার দিকে নেই। তাদের দৃষ্টি ঘুরছে পৃথিলার ভেজা কাপড়ের শরীরের আনাচে কানাচে । যেই আনাচে কানাচের ভেজা কাপড় টানা-হেঁচড়ায় প্রায় বেহাল দশা হয়ে আছে। আর আছে বলেই পৃথিলা নদীর দিকে তাকালো। তার চোখ গলিয়ে গাল বেয়ে পানি পড়ল।

মৃত্যু আসলে কী? শুধু দেহ থেকে রূহটা বের হওয়া ? না, মৃত্যু হলো এই যে রূহটা বের হওয়ার আগে যেই ভয়ংকর সময়টা যায় সেটা। এই যে পৃথিলা মরছে, মরতে মরতে দোয়া করছে, রূহটা তাড়াতাড়ি বের হয়ে যাক। তাড়াতাড়ি যাক। যতো তাড়াতাড়ি যাবে ততোই তাড়াতাড়ি মুক্তি। তবে সে জানে, পৃথিলা নামক মেয়েটার জীবনে কিছুই সহজভাবে হয় না, রূহটাও সহজে বের হবে না।

তখনই একজন এগিয়ে আসতে গেলো। আরেকজন টেনে ধরলো। ধরে বলল, — আমি আগে যাবো, বড় কে?

এগিয়ে আসা লোকটা মুখ কালো করে বলল, — সারাদিন তো আমি বইসা বইসা পাহারা দিলাম।

— হাত-পা বাঁধা। মেয়েও তো লক্ষী সামান্ত মেয়ে। দেখ একটা টু শব্দও করেনি। তো পাহারা দেওয়ার কী হলো! তাছাড়া সারা রাত পড়ে আছে। যতবার খুশি যাস। এখন সর। মেজাজ গরম করবি না।

পৃথিলা আর শুনতে পারলো না। বিপদে সবাই বাঁচার আকুতি করলেও, সে আকুতি করলো মৃত্যুর। তাড়াতাড়ি মৃত্যুর। সেই আকুতির মাঝেই লোকটা এগিয়ে এলো, এসে পায়ের বাঁধন খুললো। খুলতেই পৃথিলা মৃদু হাসলো। ভুল করে ফেলেছে আহাম্মকের দল। বলেই যা কখনো করার কথা চিন্তাও করেনি, তাই আজ করলো। লোকটার মুখ বরাবর লাথি বসালো। বসিয়ে চোখের পলকে উঠে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়লো। পড়তে পড়তে স্বস্তির একটা নিশ্বাস ফেললো। গায়ে প্যাঁচানো কাপড়, হাত বাঁধা। রূহটা বের হতে সময় লাগবে না।

লোকগুলো হকচকিয়ে গেলো। তাদের কাছে টর্চ নেই। হারিকেনের মৃদু আলোয় কোথায় পড়েছে, বোঝাও গেলো না। তখনি ওপাশে আরেকটা বড় নৌকা এলো। পানির উপরে পড়ল টর্চের আলো। পড়তেই ওপাশ থেকে আজিজ হুঙ্কার ছাড়লো। বয়স হয়েছে, শরীর ভারী, তা না হলে নিজেই ঝাঁপিয়ে পড়ত। সেটা সম্ভব নয় বলেই হুঙ্কার ছেড়ে বলল, — কিছু যদি হয়, খুন করে ফেলবো রে হারামজাদা! পানি থেকে তোল, তাড়াতাড়ি তোল।

পানিতে কোনো হুটোপুটি নেই, বাঁচার তাগিদ নেই। যেখানে নৌকা রাখা, নদীর শেষ, বিলের দিকটা শুরু। তাই স্রোতও নেই। তবে পড়ার কারণে বুদবুদ উঠছে। সেই উঠা দেখেই ঠিক সেই জায়গায় তিনজন সাথে সাথে ঝাঁপিয়ে পড়লো। পড়তে দেরি, খুঁজে পেতে দেরি হয়নি। তবে ততক্ষণে পৃথিলা প্রায় নিস্তেজ, হাত পা ছেড়ে দিয়েছে। সেই অবস্থায় টেনে পাড়ে আনলো।

আজিজের নৌকা পাড়ে ভিড়তেই দৌড়ে নামলো। বিয়ের জন্য পাঞ্জাবির উপর চাদর ভাঁজ করে সাইডে নিয়েছিল। সেই চাদর মেলে পৃথিলাকে জড়িয়ে নিলো। নিয়ে পেটে চাপ দিলো। দুনিয়ার পানি খেয়েছে। জানটা না বেরিয়ে গেলেই হয়।

চলবে…..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here