ধূপছায়া #নূপুর_ইসলাম #পর্ব_৫০

0
1

#ধূপছায়া
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_৫০

আবদুল আজিজ ঘুমিয়েছে মধ্যরাতে। তাই সবসময় আযানের পরপর উঠলেও, আজ ওঠার নাম গন্ধও নেই। শেষ রাত থেকে আবার মিঠাপুকুরের আকাশ মুখ কালো করে আছে। এই নামে তো, সেই নামে। এই নামায় সকাল তো হয়েছে, তবে সূর্য আর উঁকি দিতে পারে নি। দেখতে লাগছে ভোর রাতের মতো। তাই আর বিছানাও ছাড়েনি। এমন আবহাওয়া বিছানা শরীরকে টানে। আজিজ কেও টানছে। তাছাড়া মেজাজ তার ফুরফুরে। এই ফুরফুরে মেজাজ নিয়েই আধো ঘুম, আধো জাগরণে বিছানায় গড়াগড়ি দিচ্ছে।

দিলেও পুরো বাড়ি তার নখদর্পণে। ভালো করেই জানে বিয়েবাড়ির সব আনন্দ-আয়োজন ধূলিসাৎ। ফাতিমা মুখ কালো করে বসে আছে। আত্মীয়-স্বজন সবাই কানাকানি করছে, “বউ অপয়া! কবুল বলতে না বলতেই বাপের বাড়ি ধূলিসাৎ। এই মেয়ে স্বামীর বাড়ি এলেও সব ধ্বংস করে ফেলবে।”

ফাতিমার মন যতই উদার হোক, গ্রামের চিন্তাধারার তো আর বাইরে না! তার মনও বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে। বিয়ে বউ নিয়ে যত আহ্লাদ ছিল, সবই এখন শূন্যের কোটায়। আর এসব আজিজকে বিচলিত করছে না, বরং শান্তি দিচ্ছে। সেই শান্তি নিয়েই আরামসে শুয়ে আছে। সেই শান্তির মাঝেই ফাতিমা বিরক্ত মুখে আজিজকে ডাকলো। ডাকতে ডাকতে বলল, — জব্বার আড়ৎ থেকে খবর পাঠাইছে, কী নাকি জরুরি কাজ পড়ছে। এক্ষুণি যাইতে কইছে।

ফাতিমা যত বিরক্ত হয়ে ডাকলো, আজিজ অবশ্য তার ছিটেফোঁটাও বিরক্ত হলো না। এত সহজে বিরক্ত হওয়ার মানুষ সে না। তাছাড়া জব্বার তাকে খালি খালি এই সাত সকালে খবর পাঠাবে না। তাই স্বাভাবিকভাবেই উঠল। উঠে চোখে মুখে পানি দিয়ে পাঞ্জাবিটা গায়ে চড়ালো। চড়িয়ে বেরিয়ে এলো।

যেই স্বাভাবিকভাবে বেরিয়ে এলো, সেই স্বাভাবিক অবশ্য বেশিক্ষণ টিকে থাকলো না। কেননা আড়তে পা দিয়েই দেখলো, শাহবাজ হাত পা ছড়িয়ে তার বসার জায়গায় বসে আছে, মাথায় ব্যান্ডেজ। আর সবচেয়ে বড় কথা, তার পাশেই কাচুমাচু হয়ে আয়নার খালা দাঁড়িয়ে আছে।

সে নিজেকে সামলালো। তার কাজের কোনো সাক্ষী নেই, হয়তো অন্য কোনো কারণে এসেছে। তাই এগিয়ে হালকা হেসেই বলল, — যাক, ফিরেছো তাহলে?

শাহবাজ নিজেও তার চিরচেনা ভঙিতে হাসলো! হেসে আড়মোড়া ভাঙলো। ভেঙে বলল, — সময় কম গো চাচা। কি ভাবে যে উড়ে পুড়ে এসেছি, আপনাকে বোঝাতে পারবো না। তা না হলে আপনার মতো ঘাঘু অভিনয় আমিও একটু করে দেখাতাম। তাই অভিনয় টভিনয় সাইডে রেখে সোজা বলছি, — পৃথিলা কোথায়?

মহাজন হাসলো! তার জায়গায় শাহবাজ বসা, তাই চেয়ার টেনে বসলো। বসতে বসতে বলল, — কোন পৃথিলা? ওহ! ঐ যে স্কুলের নতুন ম্যাডাম, যার জন্য তোমাগো এরশাদ, দুনিয়াকে দুনিয়া মনে করছে না। এত সম্মানের দাদি, তাকে তো কাপড়ের মতো ধুলো। আর আয়না, বাবা গো, আরেকটু হলে তো খুন করে ফেলতো।

শাহবাজের চোয়াল শক্ত হলো! তবে আগের মতোই শান্তভাবে বলল, — জ্বি সেই পৃথিলা, যে আপনার ফুপুর নাতনি, আর প্রিয় ভাইয়ের একমাত্র কন্যা।

মহাজন কিছুক্ষণ নিশ্চুপ তাকিয়ে রইল, তারপর বলল — কি চাও?

— আপতত পৃথিলা। পরের হিসাব পরে।

— কিসের পরের হিসাব?

— কতো কিছু। সেগুলো আজ থাক চাচা। আপতত শুধু এইটুকু বলেন, পৃথিলা ম্যাডাম কোথায়?

— সেটা কি আমার জানার কথা?

— না, তবে আয়না তো বললো, আপনার লোক ঘাটে থেকে নিয়ে গেছে।

মহাজনের তেমন ভাবান্তর হলো না। আয়না গাধীর উপরে সে পুরোপুরি ভরসা কখনও করেনি। এই মেয়ে আকাম তো করে, তবে হজম করতে পারে না। তাই তো নিজের এত লোক থাকতে চেয়ারম্যানের ভাড়া করা লোক ঘাটে রেখেছে। সেই হিসেবেই বলল, — আমি অনেক কিছুই করি শাহবাজ। করি বলেই, এই যে একসময় আয়নার সাথে বিয়েটা তো আমার জন্যই হলো। তা না হলে, তোমরা কবে মানুষকে মানুষ মনে করছো? আমার কাছে তো সবাই সমান। আয়না সাহায্য চাইল। আমার দিল তো দুনিয়ার বড়। তাই শুধু লোক ঠিক করে দিয়েছি। এর পরে কী হয়েছে, কোথায় গিয়েছে আমার তো জানার কথা না। তাছাড়া জেনেও আমার কোনো লাভ?

শাহবাজ এক পলকে চেয়েই, আজিজের ঢং দেখলো। দেখে বললো — যেই লাভ সারেং বাড়ির মানুষদের খুন করে হয়েছে, সেই লাভ।

মহাজন থমকালো! এই কথা শাহবাজ পর্যন্ত যাওয়ার কথা না। সে তখনই আয়নার খালার দিকে তাকালো। বুঝতে তার অসুবিধা হলো না। আয়নার মা গিট্টু লাগিয়েই মরেছে। অথচ সে ভেবেছে সব শেষ। ভুল করেছে, বড় ভুল। সে সাথে সাথেই নিজেকে সামলে বললো, — সবাই চিন্তা করছে, বাড়িত যাও শাহবাজ। অযথা কোনো আঙুল আমার দিকে তুলবা না।

— অযথা? বলেই আয়নার খালার দিকে তাকালো। তাকিয়ে বলল,– খালা শাশুড়ি, কি বলে মহাজন চাচা। আপনি কি কিছু বলবেন? হাজার হলেও বোন, বোন জামাইয়ের খুনি।

কুলসুম কিছু বললো না। তার চোখে ভয়, টলমলে পানি। সেই পানি নিয়ে এক দলা থু থু সাইডে ফেললো। আয়নার বাপ খারাপ, তবে আয়নার মা, আয়না নিষ্পাপ। এরা খুন করে কি সুন্দর অভিনয় করে। তারা তো পারে না।

আজিজ দাঁতে দাঁত চাপলো। মহাজন সে! আর দুই টাকার রাস্তার মহিলার এতো সাহস, আজিজের সামনে থু থু ফেলে। সে দাঁত চিবিয়ে বলল,– বোনের পরিণিতি থেকে কিছু শেখ কুলসুম। বেশি বাড় বেড়ে ছিল। কেমনে হাওয়ায় মিশে গেছে।

কুলসুম হাসলো! তাচ্ছিল্যের হাসি। হেসে বললো,– হাওয়ায় মেশে নি, আপনারা শেষ করছেন।

— জ্বিহা টেনে ছিঁড়ে ফেলবো।

— আমার বোনের টাও বুঝি এভাবেই ছিঁড়েছিলেন।

— কুলসুম…..

— চেঁচালে সত্য বদলাই না মহাজনসাব। আমরা গরীর তো, তাই এগিয়ে কিছু বলি না। তবুও আপনারা কি অনায়াসেই আমাদের মেরে ফেলেন। অযথা আমরা সেধে কিছুই করিনা, আয়নার মাও করেনি। পালিয়ে বাঁচতে চেয়েছিল। তাও দেননি? কেন ঐ যে আপনাদের মর্জি মতো যে চলেনি?

আজিজের রাগ মাথায় উঠল! তার মুখে মুখে তর্ক? তাই রাগে মুখ ফসকালো! ফসকে বললো,– না! তোদের মতো মাছি মেরে আজিজ হাত নোংরা করে না। তাই শয়তানের হাতে তুলে দিয়েছিলাম। শয়তান তাকে খুবলে খেয়েছে। এখন তোদের পালা।

শাহবাজ হাসলো! হেসে বললো,— সবার’ই একটা সময় থাকে চাচা। সেই সময় আপনার ছিল। বিশ্বাস করেন এখন আর নাই। তাই আপতত ঝামেলা চাইছি না। বাড়িতে আগুন লেগে আছে। সেই আগুন নেভানো দরকার। তাই ভালোয় ভালোয় পৃথিলাকে দিয়ে দেন। আমার ভাই ঠান্ডা, আমি ঠান্ডা, সারেং বাড়িও ঠান্ডা।

— যদি না দেই?

— সত্য টেনে বের করবো।

— প্রমাণ আছে?

— প্রমাণ না থাক, তবে সদ্য গজানো বোনের জামাই আছে।

মহাজন চমকে উঠল! ফরহাদ কই? তখনি মনে পড়লো, ঢাকা গেছে এই শয়তানকে আনতে, তো এই শয়তান এখানে, ফরহাদ কই? তবুও তার বিশ্বাস হলো না। তাই আগের মতোই বললো, — ফাঁকা ঢোক অন্য কোথাও গিয়ে মার।

— আরে ধুর! এতোদিনে শাহবাজকে এই চিনলেন চাচা? শাহবাজ আর যাই করুক, ফাঁকা কলসির মতো ঠন ঠন করে না।

আজিজ আগুন চোখে তাকালো। শাহবাজ এগিয়ে দাঁড়ালো মহাজনের ঠিক সামনে। তারপর একটু ঝুকে সেই আগুন চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, — আপনি আমার পুরো পরিবার খুন করছেন, আমি কিন্তু করবো না? আমি করবো শুধু একজনকে। আর সে আপনার কলিজার টুকরো। আমাদের ছটফট দেখে আপনি শান্তিতে ছিলেন। আপনার ছটফট দেখে বাকি জীবন আমরা শান্তিতে থাকবো।

মহাজন রাগে শাহবাজের গেঞ্জির কলার চেপে ধরলো। ধরে বলল, — আমার ছেলের কিছু হলে খুন করে ফেলবো, একেবারে খুন।

— তাহলে হিসাব বরাবর, পৃথিলা দেন, ছেলে নেন।

— কোনদিনও না, বরং বাঘের খাঁচায় এসেছিস। আমি না চাইলে বুঝি এখান থেকে বেরুতে পারবি? এমিনেও তোদের নিঃশেষ করার আমার এক জনমের ইচ্ছা। নিজে আজ সেধে এসেছিস, আজিজ ছেড়ে দেবে? তাই তুই এখানেই থাক। পৃথিলাকে তোর ভাই জীবনেও পাবেনা। রাতটুকু যেমন তেমন গেছে, তবে আজকে আয়নাকে সে কিছুতেই ছাড়বে না। আর রইল আমার ছেলে, তাকে আমি ঠিক খুঁজে নেবো।

শাহবাজ আগের মতোই হাসলো! হেসে কলার থেকে আস্তে করে হাত সরিয়ে বললো,– আমি আমার চেলাপেলাদের বলেছি পনের বিশ মিনিট দেখবি। না ফিরলে কাম খতম। অজ্ঞান তো, তাই সময় লাগবে না। শুধু বলে এসেছি,আমার বাপ মায়ের মতোই যেন মাথাটা আলাদা হয়।

আজিজ হিতাহিত জ্ঞান হারালো। এগিয়ে ফুঁসে বললো, — আমার ছেলের গায়ে যদি ফুলের টোকাও আসেরে শাহবাজ। বিশ্বাস কর, লোক লজ্জা, সম্মান আমি কোন কিছুর দিকে তাকাবো না। তোদের পুরো গোষ্ঠীকে যে ভাবে শেষ করেছি, সেই ভাবে তোদের বাকি সবাইকেও শেষ করবো।

শাহবাজ হো হো করে হাসলো! হেসে বললো, — ভয় পেয়েছি আমি! এই যে দেখেন বাথরুমের চাপে সোজা দাঁড়াতে পারছি না। তাই যান আপনার ছেলে কোথায় বলেই দিচ্ছি। ঐ যে, দেখেন। তার খুব গর্ব ছিল তার বাপকে নিয়ে। তাই আমার, এই যে আমার খালা শাশুড়ি কারো কথাই সে বিশ্বাস করেনি। এখন?

মহাজন থমকালো! এতোক্ষণে সব তার মাথায় এলো। আর কি করেছে সেটাও বুঝতে পারলো। পারলো বলেই ধীরে ধীরে পেছনে ফিরে তাকালো। পাটের আড়ৎ দুনিয়ার হাবি যাবি দিয়ে ঠাসা। সেই ঠাসার মধ্যে অন্ধকারে তার কলিজার টুকরো চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টি শান্ত শীতল।

আজিজের শরীর কাঁপতে লাগলো। এই ছেলেটা যে তার কতো প্রিয় দুনিয়ার কেউ জানে না। শুভ্র পদ্ম ফুলের মতো তার ছেলে। তার বড় ছেলে যখন বউয়ের আঁচল ধরে চলে গেলো। তখন এক বুক কষ্টের মাঝে, এই ছেলেটা বুকে হাত রেখে বলেছিল,” আমি আছি তো। তোমাদের ছেড়ে আমি কখনও যাবো না বাবা।”

যায়ও নাই। এই যে লেখা পড়া করে, নিজের অপছন্দের চাকরি করছে, বিয়ে করছে, আরো কতো কি? হিসেব করতে গেলে হিসেব মিলবে না। তার এক কথায় এই ছেলে সব করে ফেলে।। আজ সেই ছেলের চোখে ঘৃণা কি করে দেখবে। তাই কাঁপতে কাঁপতে ঠাস করে চেয়ারে বসলো। বসতে বসতে বলল, — আমি যা করেছি সব আমার ফুপুর জন্য। তাকে জয়তুন আরা নির্মম ভাবে খুন করেছিল। কি করতাম আমি? ছোট মানুষ, প্রমাণ নাই, সাক্ষী নাই। যতোই গলা ফাটিয়ে বলতাম। কে বিশ্বাস করতো। তাই ফুপুকে ইনসাফ দিতে গিয়ে খুনি হয়ে গেছিরে আব্বাজান। তবে বিশ্বাস কর, এই পাপ করে আমার কোন আফসোস নাই, তিল পরিমাণও নাই।

তখনই জব্বার দৌড়ে এলো। এসে বললো, — চেয়ারম্যান খবর পাঠাইছে, পৃথিলা আপা ভাগছে।

ফরহাদ, মহাজন, শাহবাজ কারোই কোন ভাবান্তর হলো না। ফরহাদ আগের মতোই শান্ত চোখে তার বাবার দিকে তাকিয়ে রইল। আর শাহবাজ বিস্ময় নিয়ে। তার দাদি, তার প্রিয় দাদি। যার প্রতি তার অগাদ বিশ্বাস। যে সারেং বাড়ির মানুষদের জীবন দিয়ে আগলে রাখেন। তাদের জন্য সব করতে পারে। সে’ই কি না, সারেং বাড়ির ছোট বউকে নিজ হাতে শেষ করেছে। আর তার এই পাপের ভারেই আজ সারেং বাড়ির এতো ধ্বংস।

পৃথিলা নদীর পাড়ে একটু উঁচু জায়গায় বসলো। বসে পায়ের দিকে তাকালো। পচা শামুকে পা কেটে গেছে। সামান্য কাটা না, রক্ত তরতরিয়ে বের হচ্ছে। সে হাত দিয়ে চেপে ধরলো। রক্ত থামছে না।

চেয়ারম্যান বাড়ি থেকে সে বের হয়েছে, আযানের একটু পরে। সারা রাত সদর দরজার চাবি থাকে চেয়ারম্যানের কাছে। গ্রামের মানুষের কাছে ভালো থাকতে হয়। তাই প্রতি ওয়াক্ত নামজ মসজিদে গিয়ে আদায় করে। তাই সকালে দরজা খুলে বেরিয়ে যান। সেই সুযোগেই বেরিয়ে এসেছে। অবশ্য সব হয়েছে চেয়ারম্যানের গিন্নীর জন্য।

রাতে তখন দেখা হতেই নির্বিকার ভাবে বলল,– আমি তো ভেবেছি নিজ ইচ্ছায় এসেছো?

পৃথিলা কিছুক্ষণ নিশ্চুপ তাকিয়ে রইল। তারপর বলল,– না, আমি আসিনি।

— তাহলে?

— বললে বিশ্বাস করবেন?

— বিশ্বাস করার মতো কিছু আছে?

— আছে।

— বলো শুনি।

— বলবো, তবে আপনি কি বিশ্বাস করার মতো?

সে উত্তর দেয়নি , তার এমন ভাব। তোমার যা ইচ্ছে।

পৃথিলা সব বোঝে, এই যে যেমন বুঝেছে, স্বামীর সাথে এই মহিলার মন, মহব্বতের সম্পর্ক নেই। আছে লোক দেখানো। তবে কেন জানি মানুষ চিনতে পারে না। এতো সুন্দর করে মুখোশ পড়ে থাকে, সে ধরতেই পারে না। তবুও মনের কথা শুনে ধীরে ধীরে সব বললো। যদি একটু উপকার হয়।

তার সব কথা তিনি সুন্দর ভাবেই শুনলেন। শুনে আগের মতোই নির্বিকার ভাবে বললেন,– সবই বুঝলাম, তবে আমার কিছু করার নেই। তাছাড়া কেউই অচেনা এক মেয়ের জন্য, সংসারে আগুন লাগায় না। যাও, রুমে যাও।

পৃথিলা আর কিছু বলেনি। কি বা বলার আছে। তাই চুপচাপ’ই রুমে চলে এসেছে। তবে তাকে অবাক করে, আযানের পরপর দরজায় টোকা দিয়েছে। পৃথিলা দরজা খুলতেই তাড়াতাড়ি চাদরটা গায়ে জড়িয়ে বলেছে। সদর রাস্তায় ভুলেও যাবে না। কারো না কারো চোখে ঠিক পড়ে যাবে। নদীর ঘাটে যাও। নদীর পাড় ঘেঁষে জঙ্গল। সেই জঙ্গল দিয়ে যাবে। যতোটা কাছে ভাবছো ততটাও না। যেতে যেতে আলো ফুটে যাবে। তাই মুখ ভালো করে ঢাকো। জানি না যেতে পারবে কি না, তবে যেতে পারলে সদরের ঘাট পর্যন্ত ঠিক পৌঁছে যাবে। আর থানা, হাসপাতাল যেই রাস্তায়, সেই বরাবর একটু সামনে গেলেই পাবে।

বলেই এক সেকেন্ডও নষ্ট করেনি। টেনে বের করে এনেছে। পৃথিলা জুতা পরারও সময় পায়নি। এই বাড়িতে সারেং বাড়ির মতো পাহারা নেই। তবুও দুই একজন চেয়ারম্যানের লোক আছে। তাদের চোখ বাঁচিয়ে উঠান পেঁরিয়ে দিয়েছে। দিতেই পৃথিলা তাকালো। তাকিয়ে বললো, — আপনি?

— বাড়ির বউদের ঘরে দাম না থাকলেও, সমাজের সামনে আছে। এরা গায়ে দাগ লাগাবে না। তাই একটু ঝাল দেখালেও জানে মারবে না।

পৃথিলা অসহায় চোখে তাকালো। তার জন্য কেউ কষ্টের মধ্যে পড়বে, এটা সে মানতে পারে না।

মহিলাটা এখন নির্বিকার নেই। বরং কোমল, কোমল স্বরেই বলল,– নামের চেয়ারম্যান গিন্নী আমি। তুমি তো গ্রামের কিছু চেনো না। সদরে জেলে পাড়ায় বউ বাজার আছে। এক রাতের সুখের বউ। সেখানের নিত্য নতুন মেয়ে ঐ যে দেখো উঠানের আরেক কোণে চৌচালা ঘর। নিশি রাতে সেই ঘরে অনায়াসেই আসে। শুধু মহাজনের জন্য হয়ত তোমার দিকে তাকাবে না। তবে অনেক দিন আগে তোমার মতোই একটা মেয়েকে আনা হয়েছিল। নিশি রাতে, ঐ যে ঐ চৌচালা ঘরে। অসম্ভব রুপবতী মেয়ে। তার সব শেষ করে নির্মম ভাবে খুন করা হয়েছিল। চাপা দেওয়া হয়েছিল, ঐ যে ঐ চৌচালা ঘরের পেছনে। তাই যদি সব ঠিক করতে পারো। তবে আয়না নামের মেয়েটিকে বলো। তার মা কোথায় শুয়ে আছে।

পৃথিলা নিস্তব্দ হয়ে তাকিয়ে রইল। সেই থাকার মাঝেই তাড়া দিয়ে বললো, ” তাড়াতাড়ি যাও। তার আসতে সময় লাগবে না।”

পৃথিলা আর দাঁড়ায়নি। অন্ধকার, জঙ্গল, কত কিছুর ভয়। সেই ভয় উপেক্ষা করে দৌড়ে এসেছে। কিভাবে এসেছে নিজেও জানে না। আসতে আসতেই হাত পা তো গাছের আঁচড়ে গেছেই, তবে পা একেবারে গেলো। কতো দূর এখনও বুঝতে পারছে না। তবে সকাল হয়ে গেছে। মেঘের কারণে অবশ্য বোঝা যাচ্ছে না কয়টা বাজে। তবুও পৃথিলা উঠল। নতুন শাড়ি, তার মধ্যে মোটা পাড়। হাজার চেষ্টা করেও ছিঁড়তে পারলো না। তাই কাটা পা নিয়েই খুঁড়াতে খুঁড়াতে এগিয়ে গেলো। যেতে যেতে এক ঘাট চোখে পড়লো। আসতে আসতে অবশ্য অনেক গুলোই ঘাট চোখে পড়েছে। তবে বসত বাড়ির ঘাট আর বাজারের ঘাটের তফাৎ আছে। তাই বুঝতে এতোটুকুও সমস্যা হলো না, এটা সদরের।

সে হাঁফ ছেড়েই ভালো করে চোখ মুখ ঢাকলো। তার অবস্থা খারাপ। এলোমেলো ঝট পাঁকানো চুল, আঁচল, কাপড় নিচ থেকে সব কাদায়, বালিতে মাখামাখি। যে কেউ দেখলে, এক পলকে পাগল ভাবা স্বাভাবিক। তাই ঢেকে ঘাট থেকে বাজারে চলে এলো। সকাল বেলা তার মধ্যে মেঘলা আকাশ। খুব একটা লোক নেই। তবুও পৃথিলা ভয়ে ভয়ে এগিয়ে গেলো। হাসপাতাল বাজারের সামনেই, তাই খুঁজে পেলো অনায়াসেই। সেই হাসপাতাল ধরে একটু এগুতে এগুতেই থমকে দাঁড়ালো। রাস্তার ওপারে থানা। তার কাঙ্খিত থানা। সে বলতে গেলে দৌড়ে গেলো।

সাত সকালে থানায় একা একটা মেয়ে। সে ভেবেছিল, যেতেই সবাই অবাক হবে। তবে সেই রকম কিছুই দেখা গেলো না। কনস্টেবল এগিয়ে অফিসার ইন চার্জের রুমে নিয়ে গেলো। যেতেই সে অতি ভদ্রভাবে বসালো। বসিয়ে বলল,— বলুন, কী সাহায্য করতে পারি?

— আমি পৃথিলা। মুগদা থানার অফিসার ইন চার্জ সাবেত মাহমুদের মেয়ে।

— বুঝলাম, তো?

— আমার সাহায্য দরকার। প্লিজ। আমার বাবাকে একটু খবর পাঠানোর ব্যবস্থা করুন।

অফিসার পৃথিলাকে পানির গ্লাস এগিয়ে দিলো। দিতে দিতে পেছনে তাকালো। নিচে রক্তের ছোপ ছোপ দাগ, পা কেটেছে বোধহয়। সে চোখ ফিরিয়ে বলল, — আমরা অবশ্যই সাহায্য করবো। তবে কেউ এসে বললেই তো আমরা ফট করে আরেক থানায় নোটিশ জানাতে পারি না। আপনি আপনার সমস্যা খুলে বলুন।

পৃথিলা ঢোক গিললো। অফিসারের জায়গা থেকে সে একদম ঠিক। কেউ দৌড়ে এসে বললেই তারা শুনবে কেন? তাদের নিয়ম আছে। তাই সুন্দর করেই আবার সব গুছিয়ে বলল। বীণা, আয়নার কথাও বললো। আজিজের কথাও বললো। ভয়, আতঙ্ক, সারা রাত নির্ঘুম। তারমধ্যে অন্ধকারে জঙ্গল টঙ্গল পেঁরিয়ে সে ক্লান্ত। ক্লান্ত ভাবেই হরবর করে সব বললো।

বলতে বলতেই সিগারেটের গন্ধ তার নাকে লাগলো। আর লাগতেই ফট করে পেঁছনে তাকালো।

এরশাদ দাঁড়িয়ে আছে, সাদা শার্ট গায়ে। তবে মার্জিত গোছানো ভাব টা নেই। কেমন যেন অগোছালো, কুঁচানো। তবে সব সময়ের মতো হাতে সিগারেট। আর মুখ ভয়ংঙ্করের চেয়েও ভয়ংঙ্কর।

পৃথিলা ভয় পেলো না, অবাকও হলো না। অফিসারের দিকে ফিরে তাকালো। তাকিয়ে বলল,– টাকার কাছে বিক্রি না হলেও পারতেন।

অফিসারের কোনো ভাবান্তর হলো না। আসলে এরশাদ থানায় এসে বসে আছে শেষ রাত থেকে। এসে এক কথাই বলল, ” সে ঘুরে ফিরে এখানেই আসবে। ব্যস, তাকে আমার চাই। এখন আপনাদের কী লাগবে বলুন।

এমন সুযোগ কোনো অফিসারই হাতছাড়া করবে না। কয়টাকাই বা বেতন! তাই রাজি হয়েছে অনায়াসেই। তবে এই জল যে এতো গভীর, সে ভাবতে পারেনি। গ্রামের বড় তিন মাথার দখলদার। মহাজন, চেয়ারম্যান, এরশাদ। ঝামেলা লাগলে কাকে সামাল দেবে?

চলবে….

আমার প্রথম ইবুক #পিছুডাক । প্রকাশিত হয়েছে #বইটই অ্যাপে। ইচ্ছে হলে পড়তে পারেন। লিংক কমেন্ট বক্সে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here