ধূপছায়া #নূপুর_ইসলাম #পর্ব_৫১

0
1

#ধূপছায়া
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_৫১

শাহবাজ বাড়ি ফিরলো কিছুটা হেলে দুলে। আড়ৎ থেকে বেরিয়ে গেছে আড্ডা খানায়। সেখান থেকেই খেলো দু’ঢোক তাড়ি। যে শরীরের হাল, এই শরীরে শক্তি জোগান কি আর ঔষুধ দিতে পারে? পারে তো এই ঘোলা পানি।

সেই ঘোলা পানির শক্তিতে সব সময় বাড়িতে ফিরে যেমন জয়তুনের কাছে যায়, আজও সোজা জয়তুনের কাছেই এলো। না আজকে আর প্রিয় দাদির কোল ঘেঁষে বসলো না। বসলো দূরে, ঐ যে ঘরের কোণায় চেয়ার পাতা সেখানে। বসেই গা এলিয়ে দিলো। মাথায় যন্ত্রনা, শরীর চলছে বায়ের জোড়ে। তাই গা এলিয়ে বললো,– গল্প শোনাতে এলাম দাদি। এক জয়তুন আরার গল্প, এক জোছনার গল্প, এক আজিজের গল্প,এক এরশাদের গল্প আর সর্বশেষ এক আয়নার গল্প। শুনবে? অবশ্য না শুনতে চাইলেও বলবো। না শুনলে বুঝবা কিভাবে? জয়তুন আরার এক মাটি চাপা ছোট্ট পাপের বিজ, শিকড় – বাকড়, ডাল – পালা সব ছাড়িয়ে আজ কিভাবে বিশাল এক বৃক্ষে পরিণিত হয়েছে।

জয়তুন শান্ত চোখেই শাহবাজের দিকে তাকিয়ে রইল। আজকে জয়তুনের ঘুম ভেঙেছে সব সময়ের মতো সকালে। তবে সব সময়ের মতো বিছানা ছাড়েনি। ঐ যে নীল রঙা লোহার সিকের জানালা, সেই জানালা গলিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। তাকিয়ে তাকিয়ে জীবনের হিসেব মিলানোর চেষ্টা করলো। অন্য সব মানুষেরা মরে তো একবার, জয়তুন তার জীবনে মরেছে বারবার। একবার মরলো সন্তান না হওয়ার অপরাধে। চোখের সামনে স্বামীর বিয়ে দেখল, বউ নিয়ে ফিরতে দেখলো, দেখল তাদের সংসার। যাক, হজম হয়ে গেছে। জয়তুন কে আল্লাহ যেমন রুপ দিছে, গুণ দিছে, বুদ্ধি দিছে, তেমনি দিছে হজম করার অসীম শক্তি।

তারপর সব গুছিয়ে যখন সুখে আছে, তখন আবার মরলো। ঐ যে কাল রাত, সেই রাতে। সেটাও সয়ে গেছে। এই হাতে নাতি-নাতনিদের মানুষ করতে করতে দুঃখগুলো কবে যে হাওয়ায় মিশে গেছে। বুঝতেও পারেনি।

তারপর আবার মৃত্যু এসে হানা দিলো। এই যে গত রাতে। যাদের মানুষ করতে করতে দুঃখগুলো হাওয়ায় মিশেছে, তারাই আজ ছুঁড়ে ফেলেছে। দাদির আজকাল কতো দোষ। এই যে যেই দাদির মুখের এক কথায় উপরে দুনিয়া ভেঙে চুড়ে ফেলতো। আজ এসেছে গল্প শোনাতে। সে হাসলো, তাচ্ছিল্যের হাসি। হেসে বললো,– শোনা তোর গল্প।

শাহবাজও হাসলো। হেসে সুন্দর করে পাটে পাটে সব বললো। বলে সুন্দর করেই বললো, — আসলে আমার বাবা-মায়ের খুনি কে? আজিজ না তুমি?

আকাশটা অন্ধকার হয়ে আছে। যে কোনো সময় ঝুম বৃষ্টি হতে পারে, আবার নাও হতে পারে। এই বছর মিঠাপুকুরে বৃষ্টি নেই। সেই যে গেলো, আর খবর’ই নেই। অন্য বছর এই সময় খাল- বিল, পুকুর, নদী বৃষ্টির পানিতে টইটুম্বুর থাকে। আর এবার তার ছিটেফোঁটা ও নেই।

জয়তুন শাহবাজ থেকে চোখ ফিরিয়ে আবার জানালার দিকে তাকালো। সে শুয়ে আছে আগের মতোই। তবে বৃদ্ধা জয়তুন, আজ সত্যিই বৃদ্ধ। সাদা-সোনালি চুলগুলো এলোমেলো। ভাঁজ করা চামড়ায় আর রুপোলি ঝিলিক নেই।

এমন না আম্বিয়া আসেনি। হাজার কষ্টের মাঝেও এই মেয়ে সব কাজ ঠিকমতো করে যায়। এই যে বিয়ে বাড়ির আয়োজনের ধকলের সব কাজ এক হাতেই সামলে করছে। তবে জয়তুনই ওঠেনি। আম্বিয়াকে বলেছে, একা থাকতে দে। ব্যস, সেও আর আসেনি। অন্য সময় হলে আবার এসে ঘুরে যেত, তবে জয়তুন এখন সবার চোখের বিষ।

তাই চোখ ফিরিয়ে বলল — বৃদ্ধ হইছি, হাত-রতের শক্তি ক্ষয় হইছে। এক পা কবরে। এই আছি, এই নাই। তবে আমি যেই জয়তুন, সেই জয়তুনই। আর জয়তুন কোনো কাজের কৈফিয়ত কাউরে দেয় না। কী করেছি, কেন করেছি, কোন অবস্থায় করেছি, সেগুলো সব আমার। এখন যা, তোদের যা খুশি কর। তবে একটা কথা মনে রাখিস। জসিম আমার কোল থেকে না হলেও, সে আমার সন্তান। তোদের বাপ-মা হওয়ার আগেও সে আমার সন্তান ছিল, আছে, থাকবে। এটাই সত্য।

— আর ছোট চাচা?

— সে সারেং বাড়ির বংশধর। যার জন্য জয়তুনের সাথে অন্যায় হয়েছে। তবু জয়তুন ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নেয়নি। অথচ সে গর্ভে আসার সাথে সাথেই তার সিদেসাধা দুনিয়া না-চেনা মায়ের রূপ ঠিক বদলে গিয়েছিল। অথচ জয়তুন সব সময়’ই এক। না সে কারো ডরে রুপ বদলায়, না কারো মহব্বতে। আর সেই রুপ বদলনালো গিরগিটির জন্য আজ তোদের যতো নীতি। অথচ জয়তুন হাত গুটায়ে বসে থাকলে, তোরা হতি রাস্তার কুত্তা।

— আমরা রাস্তার কুত্তার চেয়েও অধম দাদি। সে তার পরিবারকে খুন করে না।

— শাহবাজ…..

— জ্বি দাদি, আমি আপনার শাহবাজ’ই। আমি ভাবতাম আমার দাদি যা করে, সব সারেং বাড়িকে রক্ষার জন্য, আগলে রাখার জন্য। অথচ সে করে সব তার জেদের জন্য।

— তোদের বড় করেছি কোন জেদের জন্য?

— তুমি যা করো, সব নিজের জন্য। আমারাও তোমার সেই নিজের অংশ। অফসোস বুঝতে বুঝতে যুদ্ধের ঘন্টা বেজে গেলো।

জয়তুন আর রাগলো না, চেঁচিয়ে উঠল না। তবে শান্তভাবে বলল, — আমার সামনে থেকে যা শাহবাজ। তোদের কারো মুখ আমি আর দেখতে চাই না।

শাহবাজ গেল না। বরং উঠল। উঠে দাদির পাশেই শুয়ে পড়ল। শুয়ে ছোট্ট শাহবাজ যেমন বলতো, তেমন করেই বলল, — ভয় করছে, দাদি। উঁহুম, অন্য কোনো ভয় না। বড় ভাইয়ের বিপরীতে দাঁড়াবো, সেই ভয়। ছোটবেলায় তো ভয় পেলে মাথায় হাত বুলিয়ে বলতে, জয়তুন বেঁচে থাকতে কিসের ভয়?’ আজও একটু বলতো?

জয়তুন উত্তর দিলো না, নিজের পেটের উপরে গোছানো হাত গোছানোই রইল। সেই গোছানো হাত নিয়ে আগের মতোই জানালা দিয়ে তাকিয়ে রইল। সেই তাকানোর মাঝেই, ঐ যে সেইদিন আলাউদ্দিনের কথা আবার কানে বাজলো — তোমার নাতি, এজন্যই তো ভয় সখী।”

জয়তুনের ঠোঁটে হাসি ফুটলো। সে হার মানে না, জেদের কাছে মাথা নত করে না, তেমনি এরশাদও। তাই হেসেই বলল, — মাথায় যদি হাত রাখার হয়, রাখবো এরশাদের। আমি জানি, ভালো করেই জানি। সবাই পাল্টি মারলেও এরশাদ মারবে না। আমার জসিমের খুনি এরা। সবাইকে মরতেই হবে।

শাহবাজ হাসলো। হো হো করে হাসি। হাসতে হাসতেই দাদির দিকে ফিরলো। ফিরে বলল, — ঐ যে বললাম, তুমি যা করো, নিজের জন্য করো। তা না হলে এই ভয়ংকর এরশাদ তৈরিই হতো না। একবার ভালোবেসে মাথায় হাত রেখে বোঝাতে, তাহলে ইটের ভাটায় যে চিতা এরশাদ ভাই জ্বালিয়েছে, সেটা অনেক আগেই নিঃশেষ হয়ে যেত। তবে তুমি তা দাওনি। তুমি মদদ দিয়েছো। এরশাদ ভাইয়ের রক্তে রক্তে প্রতিশোধ মিশিয়েছো।

— হ্যাঁ, এখন তো এই কথা ফুটবোই। বাপ-মায়ের খুনির মেয়ে যে এখন মনের প্রিয়সী।

— একদম! খুনি দাদি কলজে হতে পারলে, খুনির মেয়ে প্রেয়সী হওয়া বড় কথা না।

— তুই আমার সামনে থেকে যা শাহবাজ।

শাহবাজের যাওয়ার কোন নাম গন্ধ দেখা গেলো না। বরং আরেকটু আরাম করে শুলো। শুতে শুতে বলল — এতোদিন পৃথিলা চোখের বালি ছিল, এখন আয়নামতি। অথচ এই আয়নামতিকেই সারেং বাড়ির বউ করার জন্য মরে যাচ্ছিলে তুমি, তোমার সখা। সে তো ভাই আরেক পাগল। তবে এই ধ্বংসলীলা যে হবে ঠিক বুঝেছিল। বুঝেছে বলে থামাতে সামান্য চেষ্টা করেছিল।

— আলাউদ্দিনকে নিয়ে একটা হাবিজাবিও না শাহবাজ।

— হাবিজাবির কি হলো? সত্য দাদি। সে আয়নার রূপ আর সোনা-কাপালীর লোভ দেখিয়ে ভাইয়ের সাথে বিয়ে দিতে চেয়েছিল। কেন চেয়েছিল? গায়ে রুপবতী মেয়ের অভাব আছে? বিয়ে হলেই পৃথিলার বালা কাটতো। কাটতো এই ধ্বংসলীলার। সে মিঠাপুকুর এসে কি করলো, না করলো। কে মাথা ঘামাতো? আর ভাই ব্যস্ত থাকতো বউ নিয়ে। আর এই যে এতো এতো কাহিনি, হতোই না।

কিন্তু উপরে যে আছে, তার সাথে পারার সাধ্য কার? এই যে এতো এতো পাপ, সব মাটি চাপা হয়ে আছে। তাদের সাথেও তো ইনসাফ দরকার। আর আয়না, তাদের ইনসাফ হয়েই এসেছে। তোমার সখা বলেছিলো না, ” সে যে ঘরে যাবে, ঘর আলোকিত হবে?
‘আলোকিত’ মানে কি আর শুধু ঘর, সংসার, বংশের বাতি। নাগো দাদি, না। এই যে এতো এতো বছর ধরে সারেং বাড়ি পাপে অন্ধকারে ডুবে আছে, সেই অন্ধকারের পাপ দূর করায়ও আলোকিত হয়। আর আমার আয়নামতি বুঝে, না বুঝে সেই কাজগুলোই করেছে গো দাদি।

— বাপ-মায়ের খুনির মেয়ের তারিফ করতে লজ্জা করে না তোর?

— না, করে না। এই যে মন-শরীর ভালো থাকলে, তোমার পাশে শুয়ে শুয়ে সময় নষ্ট করি। ঘরে এত সুন্দর বউ আমার!

জয়তুন আর উত্তর দিলো না। দাঁতে দাঁত চেপে আগের মতোই শুয়ে রইল। শাহবাজ উঠে দাঁড়ালো। দাঁড়াতে দাঁড়াতেই আগের মতো কৌতুক সুরে বলল, — সারেং বাড়ি তৃতীয় পিড়ি, আয়নামতির দ্বারাই হবে দাদি। তাই দাঁতের সাথে দাঁতের যুদ্ধ কম করো।

— তার আগে যেন আমার মৃত্য হয়।

এবার শাহবাজ, আর কৌতুক সুরে কথা বললো না। বরং শান্ত স্বরে বলল, — আমার হায়েত নিয়ে তুমি বেঁচে থাকো দাদি। তুমি নিজের জন্য আমাদের ভালোবাসলেও, আমরা সব কিছুর ঊর্ধ্বেই তোমাকে ভালোবেসেছি। তবে আজিজ মরবে। সেটা আমার হাতে হোক বা ভাইয়ের। কিন্তু শালা সফল। তোমার সিংহাসনের দুই হাত, যুদ্ধের দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে। অথচ তুমি যদি সত্যিই আমাদের ভালোবাসতে, অন্তত আমাদের সুখের কথা ভেবে, একবার থামানোর চেষ্টা করতে। তবে তোমার সব চিন্তা এক জায়গাতেই, জয়তুন আরা!

জয়তুন এবারও কিছু বললো না। শাহবাজও দাঁড়ালো না। চেনা মানুষের নতুন নতুন রূপ দেখছে। আশ্চর্য হবে, না দুঃখ পাবে, বুঝতেই পারছে না। শালার দুই দিনের জিন্দেগী, তার মধ্যে তিন দিনই যায় একেক জনের রং দেখতে দেখতে।

শাহবাজ বলেই বেরিয়ে এলো। আসতেই বীণার সামনে পড়লো। পড়তেই বলল, — কোনো বিয়ে-টিয়ে হয়নি। লেখাপড়া করতে চাস কর, যত খুশি কর। মিঠাপুকুর গ্রামের প্রথম মেয়ে তুই হবি, যে ঢাকায় গিয়ে লেখাপড়া করেছে।

বীণা কিছুই বুঝতে পারলো না। সে অবুঝের মতো তার ছোট ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সেই তাকানোর মাঝেই শাহবাজ রুমের দিকে এগুলো। যেতে যেতে বলল, — তোর ভাবি কই?

— আমার রুমে।

— ভয় কি বেশি পেয়েছে?

বীণা উপর-নিচে মাথা নাড়ালো। শাহবাজ আর কিছু বললো না। নিজের মতো উপরে চলে গেলো। শরীর আর চলছে না, ঘুম দরকার তার।

বীণা সেই যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর রুমের দিকে এগিয়ে গেলো। আয়নাকে গিয়ে বললো,
— ছোট ভাই এসেছে।

আয়নার একবার দৌড়ে যেতে ইচ্ছে করলো। আবার সাথে সাথেই ভয়ে চুপসে গেলো। যে আগুন লাগিয়েছে, কেউ তাকে ছাড়বে না, শাহবাজও না। সে কি আর ভাই, দাদির উপরে যাবে? বরং আরও কয়েকটা দেবে। আর সেই কথা ভেবেই আরো জড়সড় হয়ে গেলো। পুরো বাড়িতে বীণাই আছে একটু ভরসার মতো। তাই আর রুম থেকে বেরই হয়নি। বের তো ভালোই সারা রাত ভয়ে দু’চোখ এক করতেও পারেনি। যখনি একটু চোখ লেগে এসেছে। তখনি মনে হয়েছে, এই বুঝি এরশাদ ভাই দরজায় এসে থাবা মারতে শুরু করল।

……

সারেং বাড়ি যেমন মৃত বাড়ির মতো নিশ্চুপ, মহাজন বাড়িরও সেই অবস্থা হলো। ফরহাদ তখনও নিশ্চুপ ছিল, এখনও নিশ্চুপ। সেই নিশ্চুপ হয়েই বাড়ি ফিরলো।
সব সময় ঝাঁজ-তেজ-বিরক্ত দেখানো ছেলেটা একেবারে নিশ্চুপভাবে নিজের রুমের দিকে গেলো। সে যে গেলো, আর কোন টু শব্দ করেনি।

আজিজও বাড়ি ফিরলো নিস্তেজ হয়ে । ফিরে শুধু ফাতিমাকে বলল, — বাড়ি খালি করো। আমি যেন একটা মানুষকেও না দেখি।

ফাতিমা কী করবে, দিশে পায় না। সব আত্মীয়-স্বজনকে হাত ধরে ক্ষমা চেয়ে যার যার বাড়ির মুখো করলো। এমন পরিস্থিতিতে সে জীবনে পড়েছে বলে মনে পড়ে না। সব দোষ ফেললো অপয়া বউয়ের ঘাড়ে। যত যাই হোক, এই বউ আর সে বাড়িতে আনবে না।

সে কথাই রাগ-জেদ নিয়ে স্বামীর কাছে বলতে গেলো। কী ঝামেলা, সে তো জানে না। সাদাসিধে মহিলা। সব সময় স্বামীর কোমল রুপ দেখে এসেছে। তবে আজ
যেতেই যা কখনও হয় নি, তাই আজ হলো। মিষ্টি কোমল স্বরের আজিজ কঠিন এক ধমক দিলো।

ফাতিমা কেঁপে উঠল। সেই কেঁপে উঠার সাথে সাথে চোখে মুখে বিস্ময়। আজিজ সেই বিস্ময় ফিরেও দেখল না। সে এগিয়ে গেল ছেলের রুমের দিকে। দরজা চাপানো। সেই চাপানো দরজা ঠেলেই ঢুকলো, ঢুকে কোমল স্বরে বললো, — যা শাস্তি দেওয়ার দে। তবে বাবার কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকিস না আব্বাজান।

ফরহাদ বসে ছিল চুপচাপ। শান্ত ভাবেই ফিরে তাকালো। তাকিয়ে বলল, — ভুলের শাস্তি হয়, পাপের না।

— ওদেরটা তোর চোখে পড়ছে না?

— ওরা কিছু করেইনি, বাবা। করেছে জয়তুন আরা।

— তার দোষে সবাই পাপি তারা।

— সেই হিসেব করার অধিকার তো তোমার না। উপরে যে আছেন, তার।

— না, মহব্বতে এতো হিসেব আসে না। উপরওয়ার আশায় বসে থাকে না। এই ধর, আমি কিছু করিনি। তোর আদর্শ বাপ। বিনা দোষে আমাকে কেউ শেষ করলো। তুই কী করতি? যেই বাপের নামে একটা কটু কথা সহ্য করতে পারিস না, তাকে বিনা অপরাধে শেষ করলে, কী করতি? বল, কি করতি?

— এই প্রশ্নটা তুমি একবার তোমার প্রিয় ফুপুর ছেলেকে জিজ্ঞেস করো, পারলে তার মেয়েকে একবার জিজ্ঞেস করো। তোমার প্রিয় ফুপু যেমন ছিল, তার ছেলেও হুবহু সেই রকম। তারা ভুল করে, অনুতপ্ত হয়, অপরাধ দেখলে মুখ খুলে। এমনকি হাজার অপরাধ দেখলে কঠিন হয়, তবে পাপ করতে পারবে না।

তবে এই প্রশ্নের উত্তর আমি দিতে পারবো না বাবা। কারণ, আমি তোমার সন্তান। যেই অসুস্থ পাপের রক্ত তোমার শরীরে, সেই রক্ত যে আমার শরীরেও। তাই চিন্তা-ধারণাও একই রকম। আর এজন্যই আমি তোমাকে ঘৃণা করছি না, করছি নিজেকে। একজন নিকৃষ্ট পিতার সন্তানকে।

— ফরহাদ…

— চেঁচিয়ো না বাবা। আমার কষ্টের পরিমাপ তুমি করতে পারবে না, বুঝতেও পারবে না। যদি বুঝতে, তাহলে প্রতিশোধ নিতে তোমার প্রিয় পুত্রকে ব্যবহার করতে পারতে না। পারতে না তার ভরসা, বিশ্বাস, ভালোবাসাকে বলি দিতে।

আজিজ উত্তর দিতে পারে না। তবে ফাতিমা দরজায় দাঁড়িয়ে ফুঁপিয়ে উঠে। উঠে এগিয়ে বলে, — কী করছেন আপনি আমার ছেলের সাথে, বলেন কী করছেন?

আজিজ এবারো উত্তর দেয় না। তবে ফরহাদ মায়ের উদ্দ্যেশে বলে, — নতুন কিছু করেনি মা। সামান্য খুন করেছে। যেই খুনে তার আফসোস নেই, তিল পরিমাণও নেই। তবে তফাৎ এটাই, এতদিন অন্যকে করেছে, আজ করেছে নিজের প্রিয় সন্তানকে।

ফাতিমা মুখে আঁচল চাপলো। আজিজ অসহায় ভাবে ডাকলো, — ফরহাদ….

— ফরহাদ মরে গেছে বাবা, তুমি তোমার সন্তানকে নিজ হাতে খুন করেছো।

……

অন্ধকার মেঘের কোল ঘেঁষে সূর্য উঁকি দিয়েছে। এই তো কিছুক্ষণ’ই হলো। মেঘের সাথে যুদ্ধ জিতে, একটু যেন মুচকি হাসলো । তবে সেই হাসিতে আগুন ঝড়াতে পারে না। বরং সকালের কচি আলোর মতো ঝিকিমিকি করছে। অথচ বেলা তখন ঘড়িতে এগোরোটা ছুঁইছুঁই।

সেই কচি আলোয় গা ভাসিয়ে এরশাদ বসে আছে থানার এরিয়ার একটু পাশে। মোটা একটা গাছের শিকড়ে। হাতে সিগারেট। বেশ কয়েকটা ফিল্টার সামনেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। একটার পর একটা টেনে শেষ করেছে।

তবে ভয়ংকর মুখ এখন শান্ত। যাদের এতোকাল খুঁজেছে, আজ সবাই তারা সামনে। খুশি হওয়ার কথা, তবে খেয়েছে ধাক্কা।

অবশ্য খাওয়া স্বাভাবিক। এতো এতো খোঁজের মধ্যে আজিজের কথা মাথায় আসেনি। অথচ কী সুন্দর নাকের ডগায় ঘুরে বেড়িয়েছে।

ফরহাদের সাথে গলায় গলায় ভাব থাকলেও, তার সাথে সেই ভাব কখনও হয়নি। তবে সম্মান ছিল। আর দেখো, সেই-ই কী সুন্দর তাদের ধ্বংসের জাল বুনেছে। এমনকি তার বোনের দিকেও হাত বাড়িয়েছে।
এরশাদ সব সময়ের মতো হাসলো। তার সেই নিষ্পাপ, সরলতার হাসি। ছোটবেলায় হাসলেই মা মাথায় হাত বুলিয়ে বলতো, “মাশাআল্লাহ, আমার ছেলের হাসি দেখলেই প্রাণ জুড়িয়ে যায়।” অথচ সেই হাসিই এখন একেক জনের কাছে আতঙ্ক, ভয়ংকর।

এরশাদ উঠল! এতক্ষণ মনে ঝড়ের তাণ্ডব ছিল।
সবার যে পরিণতি হয়েছে, আজিজেরও হবে। এতে দ্বিতীয়বার ভাবার কিছু নেই। তবে বাকি সবাইকে নিয়ে ছিল।

একদিকে প্রাণপ্রিয় বন্ধু, আরেকদিকে ছোট ভাইয়ের বউ। ঝড় তো হবেই। তবে সেই ঝড় এখন শান্ত। কেননা সিন্ধান্ত নেওয়া শেষ।

এরশাদের দুটো জায়গায় এসে কোনো সম্পর্ক নেই। এক. তার প্রতিজ্ঞা, দুই পৃথিলা। তাই সবার যা পরিণতি হয়েছে, এদেরও হবে। এই বিষয়ে সে কাউকে এক চুল ছাড় দেবে না।

এরশাদ থানার ভেতরে গেলো। থানার কাজ থানার মতোই চলছে। পৃথিলাকে বসানো হয়েছে অন্য রুমে।
এরশাদকে কিছু বলতে হয়নি। কালাম নিজেই নিজের কাজ করেছে।

হাসপাতাল কাছে। পৃথিলার পা দেখেই ডাক্তার এনেছে।
তবুও এই মেয়ে ভাঙবে না। ডাক্তারকে কিছু করতেই দেয়নি। জানা কথা, এরশাদের কিছুই সে নেবে না। তবে এক কনস্টেবলের থেকে কাঁচি নিয়ে শাড়ির আঁচলের কোণা কেটেছে। কেঁটে সেটা দিয়ে নিজেই পা ভালো করে বেঁধেছে।

এরশাদ দরজায় দাঁড়াতেই পৃথিলা এক পলক তাকালো। তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিলো। চোখে মুখে সব সময়ের মতো বিরক্তি। এরশাদ দেখলো। দেখে স্বাভাবিক ভাবে এগিয়ে চেয়ার টেনে তার সামনে বসলো। বসে বলল, — সোজাই বলি, আমি আপনাকে সময় দিতে চেয়েছিলাম। তবে জোর করতে বাধ্য করলেন। কাজী আসছে, বিয়ে পড়ানো হবে।

পৃথিলা চমকালো। চমকে এরশাদের দিকে তাকালো। অতিরিক্ত কষ্টে, আবেগে অন্য সবার মতো চিৎকার, চেঁচামেচি, চোখের পানি সে ফেলতে পারে না। আজও পারলো না। ব্যস, শান্ত নদীর মতো শান্ত হয়ে গেলো।
গিয়ে বলল, — চেষ্টা করে দেখতে পারেন। আপনাদের মতো এত ক্ষমতা না থাক, তবে এই মুখ দিয়ে আপনার নামে কবুল কখনও বের হবে না।

— হবে। খারাপ মানুষের কোনো দায় নেই, তবে ভালো মানুষের আছে। তারা হেঁটে যাওয়া রাস্তার পাশে ভিক্ষুকের দুঃখও এড়াতে পারে না।

পৃথিলার বাড়তি একটা কথাও বলতে ইচ্ছে করলো না। সে উঠল। এই রুম থেকে বের হবে, এরশাদ হাত ধরলো। আর ধরতেই পৃথিলা অবাক চোখে তাকালো।

এরশাদ সেই অবাক চোখের দিকে তাকিয়ে উঠে দাঁড়ালো। দাঁড়িয়ে আরো ভালো করে হাত মুঠোয় নিতে নিতে বলল, — আগেই বলেছিলাম পৃথিলা, একটা জিনিস ছাড়া আর কোনো কিছুতেই জোর করবো না। সেই একটা জিনিসটা আজ করবো। বিশ্বাস করুন, এই একটা জিনিসের জন্য আমি সবচেয়ে নিকৃষ্ট পথে নামতে হলেও নামবো।

সব মানুষের’ই ধৈর্য্যর একটা সীমা আছে। পৃথিলার সেই সীমা যেন আজ শেষ হলো। আর হতেই ঠাস করে এক চড় এরশাদের গালে বসিয়ে দিলো। দিয়ে বললো, — হাত ছাড়ুন।

এরশাদের রাগ জেদ এরশাদের ভয়ংকর মুখে বোঝা গেলো না। তবে তার হাতের মুঠোয় হাতটা ছাড়া তো অনেক দূরের কথা, আরো শক্ত করেই ধরলো।

চলবে……..

আমার প্রথম ইবুক #পিছুডাক প্রকাশিত হয়েছে আপনের প্রিয় #বইটই অ্যাপে। ইচ্ছে হলে পড়তে পারেন। লিংক কমেন্ট বক্সে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here