#ধূপছায়া
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_৫২
আয়না সব সময়ের মতো দরজার সামনে দাঁড়িয়ে একটু উঁকি দিলো। আজকেও উঁকি দেওয়ার মতো কিছু নেই। পুরো দরজা হাট করে খোলা। সেই খোলা দরজা বরাবর খাটে শাহবাজ ঘুমিয়ে আছে। সব সময়ের মতো এলোমেলো, হাত-পা ছড়িয়ে। বাইরে থেকে এসে গেঞ্জি প্যান্ট কিছুই খুলেনি। যেভাবে এসেছে, সেভাবেই শুয়ে আছে।
শাহবাজ রুমে থাকলে, এই রুম তার বাঘের গুহা মনে হয়। তাই আসার ইচ্ছে, সাহস কোনটাই হয় না। আর এখন তো পুরো বাড়িতে আগুন লাগিয়ে ফেলেছে, এই অবস্থায় তো আরো না। তবে কিছুক্ষণ আগে মান্না এসেছিল। ওষুধ-পত্র সব বীণাকে বুঝিয়ে দিয়ে গেলো। দিতে দিতেই বীণা জিজ্ঞেস করলো, — অ্যাক্সিডেন্ট কিভাবে হলো?
মান্নার ধ্যান ঔষুধে ছিল। তাই জিজ্ঞেস করতেই ফট করে বলল, — ভাবির খালার বাড়িত গেলাম, সেখান থেকেই এই আকামটা হলো।
আয়নার বুক তখনি ধক করে উঠল। উঠে অবাক চোখে তাকালো। মান্না সাথে সাথেই হয়তো বুঝলো, বুঝে কথা ঘুরিয়ে বললো,— আরে, তেমন কিছু না ভাবি। গিয়েছিলাম একটু কাজে। আপনার খালার সাথে দেখা হয়েছিল, এই আর কি! সে তো আমাদের সাথেই গ্রামে এলো। বলেই তড়িঘড়ি করে সব বোঝালো, বুঝিয়ে যেন পালিয়ে বাঁচলো।
তার বাপের বাড়ির মানুষ এমন কেউ না, যে দেখা হলেই সাথে করে নিয়ে আসবে। তাই অজানা কোন ভয়ে তার বুক টিপটিপ করতে লাগল। তার খালা ঠিক আছে তো? এই বাড়ির মানুষদের তার ভরসা নেই। তাই ভয় ডর সব সাইডে রেখে এখানে এলো।
আয়না ধীরে ধীরে রুমের ভেতরে এলো। কাল সারা দিন রাত আর রুমে আসা হয়নি। রাতে হয়ত কোন কাজের লোক এসে জানালা লাগিয়ে দিয়ে গেছে। সেই লাগানো এখনো খোলা হয়নি। ফ্যান চলছে তবুও গুমোট একটা ভাব। তাই এগিয়ে আগে জানালা খুললো। শাহবাজ জীবনেও এখানের কোটা ওখানে নাড়াবে না। রুম তার কাছে শুধু পরে পরে ঘুমানোর জন্য। ঘুম ছাড়া বাড়তি কোন কাজ তার এই রুমে নেই। তাই জানালা খুলে, বাতি নিভিয়ে দিলো। দিতে দিতে মনে হলো, শাহবাজ অন্ধকার ছাড়া ঘুমায় না, আর কিছু করুক আর না করুক, রুমে এসেই আগে বাতি নেভাবে, নিভিয়ে খাটের উপরে ধপাস করে শুয়ে পড়বে।
আজ কিছুই করেনি। শরীর কি বেশি খারাপ? আয়না এগিয়ে গেলো। এগিয়ে গিয়ে উঁকি দিলো। উপুড় হয়ে শোয়া, মাথায় ব্যান্ডেজ। মুখ উল্টো পাশে থাকায় বোঝা যাচ্ছে না। জ্বর টর এসেছে নাকি? তাই দেখার জন্য নির্ভয়ে আলতো করে হাতের উপরে হাত রাখলো। কেননা সে ভালো করেই জানে, শাহবাজ ঘুমালে, দিন দুনিয়ার হুঁশ থাকে না।
তবে তাকে অবাক করে শাহবাজ শান্ত ভাবে বললো,— যাক, জামাইয়ের প্রতি দরদ আছে তাহলে?
আয়না বলতে গেলে ভয় পেয়ে লাফিয়ে উঠল। শয়তানটা আজকে ঘুমায়নি! লাফিয়ে রুম থেকে বেরুতে চাইলো। শাহবাজ চিত হয়ে শুতে শুতে বললো,– খুদায় আমায় ঠিক মতো ঘুম আসছে না। খাবার টাবার কিছু নিয়ে আসো। এমন মরার কপাল, হাসপাতাল থেকে এসেছি, বউ সেবা যত্ন করে মাথায় তুলবে, তা না ব্যাঙের মতো লাফাচ্ছে।
আয়না থমকে দাঁড়ালো! দাঁড়িয়ে ফিরে তাকালো। শাহবাজের চোখ আগের মতোই বন্ধ। তবে চিত হয়ে শোয়ায় মুখ এখন সামনে। গত দু’দিনে মুখটা শুকিয়েছে, ক্লান্ত, বিধ্বস্ত দেখেই বোঝা যাচ্ছে। আয়নার কেন জানি মায়া হলো। তাই আস্তে করে বললো,– নিচে থেকে যে এলেন, তখন খেয়ে আসবেন না?
— কেন, তুমি নিয়ে এলে কোন সমস্যা? এমন ভাব যেন কেজি পাঁচেক খাই। সেই কেজি পাঁচেক খাওন নিচে থেকে উপরে আনতে আনতে ঐ চার আঙুলের কোমর খয় হয়ে যাবে।
— আমি যদি না আসতাম?
— না এলে নাই, এই খুদা টুদাকে শাহবাজ গোনায় ধরে নাকি?
— না ধরলে, ঘুমাচ্ছেন না কেন?
— সেটাইতো করছিলাম।
আয়না আর কথা বাড়ালো না। কথার পিঠে কথা রেলগাড়ি এই শয়তানের চলতেই থাকবে। চলতে চলতে দম বেরিয়ে যাবে, তবুও হার মানবে না। তাই বেরিয়ে এলো। লোকটা আসলেই হাসপাতাল থেকে এসেছে। খোঁজ নেওয়া দরকার ছিল। সে তো আর এদের মতো শয়তান না। এই যে নেয়নি বলে মন টা এখন ভার লাগছে। আর এই বাড়িটাই কেমন জানি কুফা মার্কা। কোন কিছুই ঠিক নেই। এক ঝামেলার পর একটা লেগেই থাকে।
সে বেরিয়ে নিচে গেলো। ঘর বাড়ি ভরা খাবার, বিয়েবাড়ির দুনিয়ার কিছু এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। থাকলেও কোন ভারী খাবার আয়না নিলো না। নিলো সকালের রান্না গরম ভাত, হালকা তরকারি। সাথে নিলো ঔষুধ। বীণাকে বলতেই সকালের ঔষুধগুলো দেখিয়ে দিলো। দিতেই নিয়ে আবার রুমে এলো। হাত দিয়ে যে খাবে না, আয়না ভালো করেই জানে। তাই খাটে বসতে বসতে বললো,– উঠুন।
শাহবাজ উঠল না, তবে চোখ খুলে আয়নার দিকে তাকিয়ে রইল। ভয়ে কতো কেঁদেছে কে জানে। চোখ মুখ ফুলিয়ে ফেলেছে। এমনিতেই গোলগাল মুখ, ফুলিয়ে ফালিয়ে আরো গোলগাল বানিয়ে বসে আছে। অবশ্য বলতে গেলে সারেং বাড়ির ছায়া যখন থেকে পড়েছে, তখন থেকে কেঁদেই যাচ্ছে। আবার আরেকজন আসছে, তবে মনে হয় না সে কাঁদবে। এমন ভাবে তাকাবে, এক তাকানোতেই সব ধূলিসাৎ।
আয়নাও একপলক তাকালো। শাহবাজ তাকিয়ে আছে এক ধ্যানে। আয়না ঢোক গিললো। গিলে সাথে সাথে চোখ ফিরিয়ে ভাতের থালায় নিলো, নিয়ে সব সময়ের মতো বলল,— আমি কিছু করিনি।
শাহবাজের ঠোঁটের কোণে হাসি ছড়িয়ে গেলো। যেতেই উঠে বসলো। বসে আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে বলল,— জানি তো।
— সত্যিই করিনি।
— ভালোতো।
আয়নার একটু হালকা হলো। তারপর বললো, — ফরহাদ ভাই আর এলোনা কেন? আশেপাশের মানুষ কানাকানি করছে।
— করুক, বীণা ঐ বাড়ি যাবে না।
আয়না অসহায় চোখে তাকালো। এই মাত্র বললো কিছু করেনি, সেটা এক্ষুণি উল্টে ফেললো। ফেলে বললো — আজিজ চাচা আমাকে সাহায্য করেছে, এই জন্য দেবেন না? বিশ্বাস করেন তাদের কোন দোষ নেই। ঐ তো আমার জন্যই করলো। আমার ভুলের জন্য বীণার জীবনটা নষ্ট করবেন না।
অন্য সময় হলে শাহবাজ তার তেজ নিয়ে ফুঁসে উঠত। তবে আজ উঠল না। আয়নাকে আর কাঁদাতে ইচ্ছে করছে না। বরং এই যে ফোলা ফোলা চোখ মুখ নিয়ে, মুখ বারাবর বসে আছে, দেখতে ভালো লাগছে, মাথার যন্ত্রনাটাও মিঠে লাগছে। আশ্চর্য!
আয়না শাহবাজের দিকে সেই ভাবেই কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। সে ভেবেছে শাহবাজ কিছু বলবে। তবে কোন হেলদোল না দেখে, চোখ ফিরিয়ে ভাতের মধ্যে নিলো। নিয়ে লুকমা মুখের সামনে তুলে ধরলো।
শাহবাজ নিলো স্বাভাবিক ভাবেই। এই মেয়ের হাতে যতবার ভাত খায়, ততবার একেক সময় একেক রকম মনে হয়। আজকে লাগছে আমৃতর মতো। কারণ কি? নাকি দুই দিন ধরে ভাত-টাত খায় না, সেই জন্য? সে সেটাই বোঝার জন্য হাত বাড়িয়ে নিজেই এক লুকমা নিলো।
আয়না হা করে তাকিয়ে কান্ডকারখানা দেখলো। হাত, পা ধোয়া নেই। সে খাইয়ে দিচ্ছে হয় না। আবার নিজের হাতেও খেতে হবে। কি পাগলের পাল্লায় যে পড়েছে, বলেই বড় করে লুকমা বানালো। বানিয়ে ঢেলে মুখের মধ্যে ঢুকিয়ে দিলো। মনে মনে বললো, নে ব্যাটা জন্মের খাওন খা।
শাহবাজ অবশ্য কিছুই বললো না, সে যা বোঝার বুঝেছে। তাই আরামছেই খেলো। আয়না দেখে বললো, — পৃথিলা আপাকে কি পেয়েছে?
— হুম।
আয়না অবাক হয়ে তাকালো। শাহবাজ সেই অবাক চোখে তাকিয়ে বলল,— এতো অবাক হওয়ার কি হলো?
— আপনি মিথ্যা বলছেন?
— মিথ্যা বলে আমার কি লাভ? তাছাড়া না পেলে, আমি এখন বাসায় থাকতাম নাকি?
— তাহলে কোথায় থাকতেন?
— কি জানি। তবে মাটি ফুঁড়ে হলেও খুঁজে বের করতাম।
— খুঁজে কি করতেন?
— যার পাখি তার হাতে দিতাম।
— আপনারা অনেক খারাপ।
— খারাপ’ই ভালো, ভালো হলে দুনিয়ার জ্বালা।
— সে তো এখন আপনাদের বোন।
— আমাদের এক বোনই ঠিক আছে। আর দরকার নাই।
আয়না বড় একটা শ্বাস ফেললো। তার মতো পৃথিলা আপার জীবনটাও গেলো। তাই শ্বাস ফেলে ভাত আবার মাখালো। মাখিয়ে লুকমা তুলে শাহবাজের মুখের সামনে তুলেই থমকালো। এতক্ষণ সে খেয়াল করেনি। শাহবাজ আর সে স্বাভাবিক ভাবে কথা বলছে। যেন তেন স্বাভাবিক না। এই যে ছোটবেলা থেকে যেমন বড় বাবা, বড় মাকে সংসারের টুকটাক কত বিষয়ে কথা বলতে দেখেছে, ঠিক যেন তেমন?
আয়নার গলা শুকিয়ে এলো। হচ্ছে টা কি?
শাহবাজ আগের মতোই খাবার নিলো। তার দৃষ্টি এখনো আয়নার মুখের দিকে। মুখ তো না, যেন আস্ত এক আকাশ। এই থমকাচ্ছে, এই অসহায় হচ্ছে, এই ভয় পাচ্ছে, এই কি যেন ভাবছে। এক সেকেন্ডে কত ঢং যে করে! করে ভালো কথা, পেটে পেটে কর। না, সবই দেখিয়ে দেখিয়ে। তাই খাবার চিবুতে চিবুতে বলল,— আবার কি হলো?
— আপনি এভাবে কথা বলছেন কেন?
— কীভাবে?
— অন্যভাবে?
— অন্যভাবটা কি?
— আমি জানি না।
শাহবাজ ঠোঁট টিপে হাসলো। হেসে ভাত দেওয়ার জন্য ইশারা দিলো। আয়না ঝটপটই আবার এগিয়ে দিলো। এবার আর কথা বাড়ালো না। মানুষ যখন তৃপ্তি নিয়ে খায়, বোঝা যায়। শাহবাজেরটাও আয়না ঠিক বুঝলো। বুঝেই ঝটপট খাওয়ালো, শাহবাজও সুন্দর মতো খেলো। আর এই এত সুন্দর আয়নার হজম হচ্ছে না। আসলে হলোটা কি? এই শাহবাজকে তো সে চিনতেই পারছে না। নাকি এক মাথায় দু’দুবার বাড়ি। কোন সমস্যা টমস্যা হলো?
আয়না চিন্তিত ভাবেই কোণা চোখে শাহবাজকে ভালো করে খেয়াল করলো। আসলে গন্ডগোলটা কোথায়? চিন্তা করতে করতে ঔষুধও খাওয়ালো। খাইয়ে প্লেট, গ্লাস হাতে তুলে নিলো। নিচে যাবে, তখনি শাহবাজ ডাকলো, — আয়না…
আয়না ফিরে তাকালো! শাহবাজ বলল,– ভয় নেই, আমি আছি।
আয়না বুঝতে পারলো না, তবে অবাক ঠিক হলো। পৃথিলা আপাকে তো পেয়েছেই। এরশাদ ভাই নিশ্চয়ই তাকে আর কিছু বলবে না। তবে?
তাই অবাক হয়েই বলল,— আমার খালার বাসায় গিয়েছিলেন কেন?
শাহবাজ উত্তর দিলো না। শুতে শুতে সেই আগের মতো বলল, — থালা, গ্লাস রেখে তাড়াতাড়ি আসেন। বউ লাগবে আমার।
আয়না সাথে সাথে মুখ গোঁজ করলো। শাহবাজ সেই গোঁজ করা সুন্দর মুখটা দেখলো। দেখে হেসে বলল,— শরীরটা ভালো নেই গো আয়নামতি। তা না হলে, বিশ্বাস করো, এই মুখ গোঁজ করার সুযোগও পেতে না।
আয়না আর এক সেকেন্ডও দাঁড়ালো না। দৌড়ে বেরুলো। বেরুতে বেরুতে বলল,– ধুর! কিসের সমস্যা? এই যে শয়তান এসে ঠিক হাজির।
…….
ইটের দেয়াল ঘেরা, তার মধ্যে ছোট ছোট ছিদ্র। সেই ছিদ্র দিয়ে লাল রঙের আগুনের ফুলকিগুলো লাল লাল জোনাকিপোকার মতো উঁকি ঝুঁকি মারছে। তার উপরে কালো ধোঁয়াগুলো মেঘ রাঙা আকাশে আঁকিবুঁকি করতে করতে মিলিয়ে যাচ্ছে। পৃথিলা সেই মিলিয়ে যাওয়া দেখলো চুপচাপ। তার শরীর ক্লান্ত, বিধ্বস্ত, পায়ে অসহ্য ব্যথা। টেনে হিঁচড়ে ভ্যানে তুলেছে, আবার টেনে হিঁচড়ে এই পর্যন্ত এনেছে। পায়ের উপর দিয়ে এক ঝড় বয়ে গেছে। তাই বেঁধে রাখা কাপড়টাও রক্তে টইটম্বুর। তবে হাত এখনো সেই শক্ত হাতের মাঝে। লাল হয়ে আছে, তবুও এক রত্তি ঢিলে হয়নি।
বরং আরও শক্তের চেয়ে শক্ত হয়েছে। শক্ত হাতে ধরেই থানা থেকে টেনে বের করেছে। করে ভ্যানের সামনে দাঁড় করিয়ে শান্ত ভাবে বলেছে, — ভালো ভাবে নিজেই উঠে বসুন, তা না হলে আমি কোলে করে ওঠাবো।
ফিরতে তো হবেই, অবশ্য পৃথিলা জানে না কোথায়। তবুও নিজেই উঠে বসলো। বসতেই এরশাদও তার পাশে বসলো। বসতেই পৃথিলা নেমে যেতে নিলো। এরশাদ হাত শক্ত করে ধরে টেনে বলো,— চুপচাপ বসুন পৃথিলা। সবাই দেখছে। এতো মানুষের সামনে নিশ্চয়ই চাইবেন না, আমি কোমর জাপটে বসি। তাছাড়া যাই করবেন, সুবিধা আমার। আয়নার ব্যাপারটা মাথায় আছে তো? তাছাড়া সারেং বাড়ির আজ পর্যন্ত কোন বিয়ে ঝামেলা ছাড়া হয়নি।
পৃথিলার মনে হলো, গলায় তার ফাঁসির পাট্টা। এ টানে তো, সেই টানে। নিশ্বাস আটকে আসে, ছটফট করে তবে দম বেরোয় না। রাগে, ঘৃণায় ঠোঁট দু’টো তিরতির করে কাঁপতে লাগলো। এরশাদ দেখলো, দেখে আরেক হাতে সিগারেট ঠোঁটের ভাঁজে রাখতে রাখতে বলল, — আমাকে বাধ্য করেছেন।
পৃথিলা কিছু বললো না। কাল রাতে ঐ তিনজনের দৃষ্টিতে যেমন ঘিনঘিন করছিল, এখনো এরশাদের পাশে বসে তার শরীর তেমনি ঘিনঘিন করতে লাগলো। আসলে তফাৎ কোথায়? এই জীবনে তার আর কতোবার মরতে হবে? কতোবার?
সে ভেতরের শ্বাসটুকু ভেতরে দমিয়ে অন্য পাশে তাকিয়ে রইল। এরশাদ একদলকে কোথায় যেন পাঠালো। আর দু-একজন নিয়ে এখানে এলো। নিয়ে এই যে ইটের চুলার সামনে এসে দাঁড় করালো, করে আগের মতোই শক্ত করে হাত ধরে দাঁড়িয়ে রইল। এই জ্বলন্ত চুলা, এই লোকটাকে শান্তি দেয়। দেয় বলেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। থাপ্পড় মেরেছে, রাগটা তো সামলাতে হবে, তার সাথে আছে হাতে সিগারেট, একটার পর একটা টানছে। এমনিতেই কাল থেকে না খাওয়া। পেট মুড়িয়ে নাড়িভুঁড়ি যে বাহিরে চলে আসছে না, পৃথিলার জন্য এটাই অনেক।
সেই অনেক নিয়ে সেও চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। দৃষ্টি ঐ যে দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা আগুনের দিকে। তবে সে জানে এই চুলায় তাকে কখনো জ্বালানো হবে না। তাকে জ্বালানো হবে ধীরে ধীরে। সে জ্বলবে, পুড়বে তবে নিঃশেষ হবে না। বাঁচা তো দূর, তার মরার ক্ষমতাও শেষ।
তখনি এরশাদ ফিরে তাকালো। পৃথিলার নিস্তেজ মুখটা দেখলো। পায়ের দিকেও একবার তাকালো।যেখানে দাঁড়িয়ে আছে রক্তে লাল হয়ে আছে। এতো কঠিন কেন এই মেয়ে? কি চাইছে, শুধু তিনটা কবুল। আর তো কিছু না। তবুও একটু নরম হয় না, এরশাদের এতো ব্যাকুলতা কি একটুও চোখে পড়ে না?
সে দীর্ঘশ্বাস ফেলেই বলল, — আমার সাথে আসুন পৃথিলা।
পৃথিলা নড়লো না, দৃষ্টি আগের মতো আগুনের দিকে রেখে বলল, — অপেক্ষা কার জন্য হচ্ছে? সাবিহা, ইমরান, না জুই?
এরশাদ হাসলো! হেসে বললো, — আপনার বুদ্ধি আমাকে সবসময়ই মুগ্ধ করে।
— এখানে বুদ্ধির কিছু নেই। এরা ছাড়া মিঠাপুকুরে আমার কোন দুর্বলতা নেই, মৃত্যুর ভয় নেই। তো? জোর টা খাটাবেন কি দিয়ে? বিশ্বাস করুন, এই চুলা দেখে আমার ভয় করছে না। বরং আফসোস হচ্ছে। কত মানুষ এই চুলায় ছাই হয়েছে, তবে পৃথিলা পারছে না।
— এই চুলায়, পৃথিলা যাওয়ার আগে এরশাদ যাবে।
পৃথিলা হাসলো! হেসে বলল, — ভালোবাসায় জোর থাকতে হয় না, থাকতে হয় মুক্তি। সেই মুক্তির পরে যদি ফিরে আসে, তাহলে সেই ভালোবাসা নিজের। আপনি যেগুলো করছেন, সেগুলো পাগলামি।
— ধরুন, মুক্ত করে দিলাম। কখনো আমাকে ভালোবাসতে পারবেন? এই যে ভয়ংকর মুখের ভয়ংকর এরশাদ, এই সব জেনেও পারবেন?
পৃথিলা উত্তর দিলো না। এরশাদ হাসলো। হেসে বলল, — একবার হ্যাঁ বলুন, পৃথিলা। মিথ্যা করে হলেও বলুন। আমি সাথে সাথে আপনার হাত ছেড়ে দেবো। বাকি জীবন আপনার ফিরে আসার পথ চেয়ে বসে থাকবো। এখন বলুন, পারবেন?
পৃথিলা এবারো উত্তর দিলো না। এরশাদ আগের মতোই হাসলো। হেসে বলল, — সবাই তো ভালোবাসেই, আমারটা পাগলামিই থাক। একবার তো ভালোবেসে বিয়ে করলেই, এবার ঘৃণা নিয়ে করেন। আমিও দেখতে চাই কোনটায় শক্তি বেশি।
পৃথিলা কিছুক্ষণ নিশ্চুপ তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, — সময় নষ্ট করছেন। আমাকে কি এমন মেয়ে মনে হয়, জোর করে কবুল বলিয়ে বিয়ে করবেন? আমি সেই কবুল পড়া বিয়ের বেড়ি পায়ে পরে বসে থাকবো? ভালোবাসার বিয়েই পারেনি, আর আপনার এখানে তো কিছুই নেই। কতদিন আটকে রাখবেন?
এরশাদ উত্তর দিলো না। ইটের ভাটায় টিনের ছাপড়ি ঘর আছে। এখানে এসে বসে হিসেব নিকেশ করে। সেই ঘরে পৃথিলাকে টেনে নিয়ে গেলো। গিয়ে বসালো।
বসিয়ে হাত ছেড়ে পায়ের কাছে বসে কোমল করে পা’টা ধরলো। ধরে দেখতে দেখতে বলল, — অনেক ভুগবেন? এতো জেদি কেন আপনি পৃথিলা?
— আপনি কি?
— আমি পাগল। আপনিই না সেই দিন বললেন।
পৃথিলা আর কিছুই বললো না। চুপচাপ আগের মতো বসে রইল। তবে এরশাদ কাপড়ের গিঁট খুলে পানি দিয়ে ধীরে ধীরে সুন্দর করে পরিষ্কার করল। তারপর অন্য কাপড় দিয়ে শক্ত করে আবার বেঁধে দিলো। দিতে দিতে বলল, — অনেক সময় লাগবে, তাই চাইলে আরাম করতে পারেন।
— কিসের সময়?
— আমার লোকেরা শহরে গেছে।
পৃথিলার কেন জানি, বুকটা কেঁপে উঠলো। কাঁপা কাঁপা স্বরেই বললো, — কেন?
— আপনার বোনের নামতো মিথিলা তাইনা। দুপুর দুটোয় আপনার বোনের কলেজ ছুটি হয়, তারপর দেড়-দুই ঘণ্টা এক স্যারের কাছে টিউশন নেয়। তারপর রিকশা করে বাসায় ফেরে। সেই রিকশা থেকে মিঠাপুকুরে আসতে সময় তো লাগবেই।
পৃথিলা শান্ত চোখে এরশাদের দিকে তাকিয়ে রইল। যেন এরশাদ যা বলছে, সে বুঝতে পারছে না। তবে এরশাদ জানে, এই বুদ্ধিমতি মেয়েকে বেশি বোঝানোর দরকার নেই। তাই সেই শান্ত চোখের দিকে তাকিয়ে বললো,— হিসেবে আপনার একটু ভুল হয়েছে। সাবিনা, ইমরান, জুঁই, এরা না। আমি এমন জায়গায় হাত দেবো, যাতে আপনার দ্বিতীয় আর কোন রাস্তা না থাকে।
— আমার বাবা জানলে আপনাকে খুন করে ফেলবে।
— জানলে তো! স্কুল-কলেজ থেকে হাজার হাজার মেয়ে প্রতিনিয়ত গায়েব হচ্ছে। এই আর নতুন কি! তাছাড়া পুলিশ যতোই ভালো, তার ততো শত্রু। আপনার বাপেরও শত্রুর অভাব নেই। তাই তারেকের কেসের যেমন কোনো তাল পাচ্ছে না, তেমনি ছোট মেয়েরটাও পাবে না।
পৃথিলা বিস্ময় চোখেই কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তার মাথা ভো ভো করে ঘুরছে। কোন পাপের শাস্তি পাচ্ছে সে? তাই তাকিয়ে বলল, — তারেককে কি আপনি খুন করেছেন?
এরশাদ স্বাভাবিক ভাবেই বলল, — হ্যাঁ।
— কেন?
— এমনিই। আমার আগে সে আপনাকে পেলো কেন?
পৃথিলার মুখে আর একটা শব্দও এলো না। আস্তে করে চোখ বন্ধ করে বেশ কিছুসময় সেই ভাবেই বসে রইল। এখন বুঝল, পত্রিকায় তার ছবি কেন আসেনি। সব এরশাদ আগেই সরিয়েছে, যেন সে থাকে সব কিছুর ধরা ছোঁয়ার বাইরে। আটকে রাখার জন্য খাঁচাটা তৈরি করেছে ধীরে ধীরে। পৃথিলা তিল পরিমাণ ও আঁচ করতে পারে নি। অথচ লোকে বলে সে বুদ্ধিমতি। আর দেখো তার জীবন ভরাই ভুল। আর এই ভুলে তার নিজের জীবনতো গেছেই। এখন তার জন্য যদি, তার ছোট বোনের কিছু হয়, নিজেকে কি কখনো ক্ষমা করতে পারবে? মরে গেলেও না।
পৃথিলা চোখ খুললো! খুলে নিস্তেজভাবে বলল, — কি চান আপনি? পৃথিলার এই দেহটা? এই দেহটার জন্য এতো কিছু আপনার?
এরশাদ উত্তর দিলো না। সে বেরোনের জন্য এগুলো।
পৃথিলা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলো! হেসে বললো,– যান দিয়ে দিলাম, কাজী আসতে বলুন, আর হ্যাঁ, একটু দাঁড়ান?
এরশাদ সাথে সাথে দাঁড়ালো। দাঁড়াতেই একদলা থুথু এরশাদের গায়ে এসে পড়লো। পৃথিলা দেখে বলল, — আজকে থেকে তো আর আমি পৃথিলা থাকবো না। লাশ হবো! তাই হওয়ার আগে শেষ ইচ্ছাটা পূরণ করলাম।
এরশাদ এবারো কিছু বললো না, শান্ত চোখে একবার তাকালো। তারপর বেরিয়ে গেলো।
…….
সোহাগ আজ লাইব্রেরি খুলেছে দেরিতে। মেঘলা আকাশ, তার মধ্যে গত কয়েকদিন আর দোকানের পাল্লা খোলা হয়নি। শ্বশুর ইন্তেকাল করেছে। না গিয়ে তো আর উপায় নেই। বড় মেয়ের জামাই, দায়িত্বও মেলা। দোয়া না পড়িয়ে তো আর ফেরা যায় না। আজই ফিরলো। ফিরতে ফিরতে কিছুটা দেরি হয়ে গেছে। তাই দোকানও খুলতে দেরি হয়ে গেলো।
আর খুলেই দেখলো, ধুলা-বালি সব বই, খাতা, মালামালের উপরে দুধের সরের মতো বিছিয়ে আছে। এবার মেঘ-বৃষ্টিতো কম। ধুলা-বালির জ্বালায় আর জান বাঁচে না। বলেই হাতে নেকড়া তুলে নিলো, নিয়ে ঝাড়তে ঝাড়তে কোণার দিকে যেতেই ধুলো জমা একটা চিঠির খামের উপরে চোখ পড়লো।
পড়তেই ভ্রু কুঁচকে এগিয়ে হাতে তুলে নিলো। নিয়ে ঝাড়তেই চিঠির উপরে রাবারের সাথে ছোট্ট একটা চিরকুট, সাথে দশ টাকার একটা নোট নজরে পড়লো। আর পড়তেই ভ্রু কুঁচকে গেলো। এই চিঠি এলো আবার কোথা থেকে! দেখতো জ্বালা। কার না কার কে জানে। তাই টাকা রেখে ফেলে দেওয়ার জন্য হাত উঠালো। তখনি কি হলো কে জানে? রাস্তার ওপারে চায়ের দোকানের চা-টা এগিয়ে দেওয়ার ছেলেটার দিকে চেঁচিয়ে বলল, — ওই জামাল….
— কি ভাই?
— এদিকে আয়।
ছেলেটা রাস্তা পাড়ি দিয়ে দৌড়ে এলো। আসতেই চিঠির খাম আর দশটা দিয়ে বলল, — যা পোস্ট করে আয়। আর বাকি টাকা তোর।
ছেলেটা একগাল হাসলো! হেসে দৌড়ে গেলো।
চলবে…….
আমার প্রথম ইবুক #পিছুডাক প্রকাশিত হয়েছে আপনের প্রিয় #বইটই অ্যাপে। ইচ্ছে হলে পড়তে পারেন। লিংক কমেন্ট বক্সে।

