ধূপছায়া #নূপুর_ইসলাম #পর্ব_৫৩

0
1

#ধূপছায়া
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_৫৩

অন্ধকারে আচ্ছন্ন ছোট্ট একটা রুম। চারপাশে উঁচু সাদা রঙের প্রাচীর। প্রাচীরগুলো যেন একে অপরের বিপরীতে বুক উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। দাঁড়ানো প্রাচীরের বুকে ছোট্ট একটা জালি জানালা। সেই জানালা গলিয়ে ঝিরিঝিরি রোদগুলো উঁকিঝুঁকি মারছে। পৃথিলা সেই উঁকিঝুঁকি রোদের দিকে তাকিয়ে রইল। কি সুন্দর রোদের খেলা! সাধারণ, দেখতে খুবই সাধারণ। তবুও পৃথিলাকে মুগ্ধ করলো। তাই অনিমেষ তাকিয়ে রইল। অথচ চার দেয়ালের বদ্ধ ছোট্ট ঘরে দম আটকে আসার কথা। আর সে দাঁড়িয়ে আছে খুব স্বাভাবিক ভাবে। তখনই অন্ধকার ভেদ করে কেউ তার পাশ ঘেঁষে এসে দাঁড়ালো।

পৃথিলা ফিরে তাকালো। চোখ দুটো সেই আগের মতো জ্বলজ্বল করছে, ঠোঁটে সেই সুন্দর মার্জিত সরলতার হাসি। পৃথিলা আজ সেই হাসি দেখল না, চোখ দেখল না, তাকালো আগুনে ঝলসে যাওয়া সেই মুখের বাম পাশটায়। তাকিয়ে আস্তে করে হাতটা তুলে, আলতো করে সেই পোড়া গালে রাখল। কি খুশির ঝিলিক সেই জ্বলজ্বল করা চোখে। আর তখনি সেই ঝিরিঝিরি রোদের আঁকিবুঁকি গুলো আগুনের লালশিখা হয়ে গায়ে লাগলো। আর লাগতে পৃথিলা ধড়ফড়িয়ে উঠল।

উঠে নিজেকে আবিষ্কার করল সেই টিনের ছাপড়ি ঘরের চকিতে। চিকন একটা তোশক, রংচটা বালিশে। নেয়ে ঘেমে একাকার। এখানে কারেন্ট নেই, চারিদিকে অন্ধকার। ঘরের এক কোণে টিমটিম করে ছোট্ট একটা হারিকেন জ্বলছে। তবে ঘরের দরজা হাট করে খোলা। একসাইডে নদী, আরেক সাইডে ধানের জমি। সেই খোলা দরজা দিয়ে সুন্দর মৃদু্ বাতাস বইছে। তবে এই বাতাস পৃথিলার গায়ে লাগছে না, বরং শরীর দিয়ে যেন তাপ বের হচ্ছে।

এরশাদ দরজার সামনেই দাঁড়ানো। অন্ধকার বলে পৃথিলা খেয়াল করেনি। ঘুমাচ্ছে বলে ডাকেওনি। অবশ্য হাতে সিগারেট থাকলে ঠিক বুঝতে পারতো। তবে বিকেলের পর থেকে আর সিগারেটের তৃষ্ণা পায়নি। বরং এই যে এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘুমন্ত এক রাজকন্যাকে দেখছিল। এই মেয়ে কি জানে, এই দেখাটুকু তার একজনমের সাধ।

সে এগিয়েই কোমল স্বরে বললো,– কোন সমস্যা?

পৃথিলার মাথা ভো ভো করছে। এরশাদের কোমল স্বর তার কানে গেলো না। সে এরশাদের মুখের দিকে অচেনা ভঙ্গিতে তাকালো। যেন তাকে চিনছেই না। তবে স্বপ্নের মতো মুখের বা পাশে না। সব সময়ের মতো চোখে।

এরশাদ হয়ত বুঝল, কষ্টে ভেতরে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়, উপর দেখে বোঝা যায় না। সব সময় কেমন শান্ত। দেখলে মনে হয় কোন কিছু তাকে ছুঁতে পারে না। আসলে সবার আগে এ’ই ক্ষতবিক্ষত হয়। এরশাদ যতো দেখে তত মুগ্ধ হয়, বিভোর হয়। এই মেয়ে জানে না, কখনো জানবেও না। তার সব দরজার খিল দিয়েছে। সেই খিল খোলার সাধ্য এরশাদের নেই।

সে পৃথিলা থেকে চোখ ফিরিয়ে সাইডে তাকালো। হিসেবের খাতা আছে। সেখান থেকে একটা নিয়ে বাতাস করতে করতে বললো, — মাথায় পানি দেবেন?

পৃথিলা উত্তর দিলো না। চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ বসে রইল। আশ পাশ থেকে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ভেসে আসছে। রাত কত হয়েছে সে বুঝতে পারলো না। কেমন জানি একটা ঘোর। সেই ঘোর ধীরে ধীরে কাটতে লাগলো। পা ফুলে ব্যথায় টনটন করছে। এতোক্ষণ ঘোরে কিছু খেয়াল না করলেও। এখন শরীর, মন, আত্মার সব ব্যথা সজাগ হতে লাগলো।

পৃথিলা সেভাবেই বসে রইল। এতোক্ষণ গায়ে বাতাস অনুভব না হলেও, এই যে এরশাদের খাতার হাত পাখার বাতাস এখন ধীরে ধীরে গায়ে লাগছে। লাগতে লাগতে শরীর শীতল হলো। এখন আর তাপ নেই।

নেই হতেই পৃথিলা চোখ খুললো! খুলে খেয়াল করলো এরশাদ ঠিক তার সামনে বসা। অবশ্য সে দূরুত্ব রেখেই বসেছে। তবুও পৃথিলার সহ্য হয় না। গা ঘিনঘিন করে, তবে কিছু বলার আর করার কিছুই আর অবশিষ্ট নেই।

সে কোনো রকম টেনে পা নাড়িয়ে আস্তে করে সোজা হয়ে বসল। তখন এরশাদ বেরিয়ে গিয়ে আর ফেরেনি। ফেরার কথাও না। থাপ্পড়, থুতু, নিজের অহম দমিয়ে এক জেদে টিকে থাকা সহজ কথা না। তাই যেই পর্যন্ত হজম না হবে, সেই পর্যন্ত পৃথিলার সামনে আসবে না। আসেওনি। এসেছে একেবারে বিকেলে। জানা কথা, একা আসেনি। বিনা ঝামেলায় সারেং বাড়ির প্রথম বিয়ে মনে হয় তাদের’ই হলো। পৃথিলা চাবি দেওয়া পুতুলের মতো কবুল বলল, সাইন করল, এরশাদেরও একই অবস্থা। তবে পার্থ্যক্য একটু তো ছিল। তার দৃষ্টি ছিল পৃথিলার উপরে, আর পৃথিলার শূণ্যে।

তার লোকের অভাব নেই, সাক্ষীরও অভাব হলো না। বিনা ঝামেলায়, খুব অল্প সময়ে খুব সুন্দর করে পৃথিলার মৃত্যু হলো। এই লোকটা সব কিছুর বিনিময়ে পৃথিলার লাশ চেয়েছে। অন্য কিছু না। তবে এই লোক বুঝেনি, বাকি সব কিছু এই লাশের কাছে নগন্য।

বিয়ের পরে সবাই বেরিয়ে গেলো। এরশাদ তখনও এই ঘরে। পৃথিলা চকিতে গা এলিয়ে দিল। লাশ হোক আর যাই হোক। রক্ত, মাংসের তো। ধকল আর কতো সইবে। তাই গা এলিয়ে দিতে দিতে বলল, — ভাগ্যিস দুনিয়ায় ঘৃণা মাপার কোন যন্ত্র নেই এরশাদ। বিশ্বাস করুন! যদি থাকতো, আমার ঘৃণার পরিমাণ দেখে আপনি শিউরে উঠতেন।

এরশাদ সব সময়ের মতো হেসেছে। হেসে তার মতোই বলেছে, — ভাগ্যিস নেই, ঘৃণার থাকলে হয়ত ভালোবাসারও থাকতো। আর বিশ্বাস করুন। আমার ভালোবাসার পরিমাণ দেখে আপনিও শিউরে উঠতেন।

পৃথিলা তখন শান্ত চোখে তাকিয়েছে, এরশাদ আর কিছু বলেনি। বরং বেরিয়ে যেতে যেতে বলেছে,– আমার একটু কাজ আছে। বাইরে বালতিতে পানি আছে। চোখে মুখে দিতে চাইলে দিন।

পৃথিলা আর কিছুই বলে নি। উঠেও নি। বরং শরীর ছেড়ে বিছায় গা এলিয়ে দিয়েছে। এতোদিন কতোকিছু হারানোর ভয় ছিল, এখন আর কিছু অবশিষ্ট নেই। এই নেই বিহীন শূণ্য চোখে ঐ যে ছাপড়ি ঘরের উপরের সাদা মাটা টিন। সেই টিনের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল অনেকক্ষন। দু’দিন নির্ঘুম, ক্লান্ত শরীর কখন চোখ লেগে গেছে, বুঝতেও পারেনি।

পৃথিলা বসতেই সাইড থেকে ব্যাগ নিয়ে খাবার বের করতে করতে বলল,– এখন আবার জেদ দেখিয়ে বলবেন না, খাবো না।

— আমি বললে, আপনি শুনবেন?

— না।

— তাহলে আর বলে লাভ কি?

— ঠিক। তাহলে উঠুন, হাত, মুখ ধুয়ে নিন।

পৃথিলা উঠল! চুলে জট পাকিয়ে দলা হয়ে আছে। সেই দলা আজ দু’দিন পরে টেনে টুনে হাত খোঁপা করলো। করে নামবে তা আগেই এরশাদ উঠে বালতি ভরা পানি চকির সামনে নিয়ে এলো।

পৃথিলার কোন ভাবান্তর হলো না। সে নির্বিকার ভাবে চোখে, মুখে পানি দিলো। দিতেই এরশাদ নতুন একটা গামছা এগিয়ে দিলো। এখানে কিছুই নেই, আসার সময় হয়ত নিয়ে এসেছে।

পৃথিলা চুপচাপ নিলো। এরশাদও চুপচাপ খাবার এগিয়ে দিলো।

গলা, বুক শুকিয়ে চৌচির হয়ে আছে। তাই পৃথিলা আগে পানির বোতলটা এগিয়ে নিতে গেল। নতুন বোতল, মুখটা শক্ত করে আটকানো। এরশাদ দেখে নিজে হাতে তুলে নিল। নিয়ে বোতলের মুখ খুলে এগিয়ে দিল।

পৃথিলার গা জ্বলে, এই পানির বোতল ছুড়ে ফেলতে ইচ্ছে করে। তবে ইচ্ছে হলেই সব করা যায় না। অদৃশ্য এক শেকল হাতে পায়ে। কখনো এই শেকল সে ছিন্ন করতে পারবে?

পৃথিলা ভেবে পায় না। তবে হাত বাড়িয়ে ঠিক বোতল নেয়। নিয়ে গলা ভেজায়। ভিজিয়ে শান্ত ভাবে খাবার টেনে নেয় । সেই খাওয়া কতো কষ্টে গলা দিয়ে ঢেলে ঢেলে নামালো, এরশাদ চুপচাপ দেখল। দেখে বাকি খাবার হাত থেকে টেনে নিয়ে বাইরে ছুঁড়ে ফেললো। ফেলে ঔষধ এগিয়ে দিল।

পৃথিলা ঔষধও নিলো চুপচাপ। খেতেই এরশাদ পা টা একটু দেখলো। দেখে বললো,– আমরা বেরুবো, চলুন।

পৃথিলা এবারো কোনো টু শব্দ করল না। বরং নিজেই উঠল। উঠতেই চোখ মুখ কুঁচকে ফেললো। পা নাড়াতেই ব্যথা, হাঁটবে কি করে পৃথিলা জানে না। তবুও দাঁতে দাঁত চেপে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে নিজে এগিয়ে গেলো। ইটের ভাটা থেকে রাস্তা অনেকটা দূরে। সেখানেই ভ্যান রাখা। সেই পর্যন্ত আসতে পৃথিলার দম বেরিয়ে গেল। এরশাদ অবশ্য সবই দেখলো, তবে কিছুই বলল না। পৃথিলা ভ্যানে বসতেই সেও চুপচাপ ভ্যানে উঠে বসল।

পৃথিলা ভেবেছিল, তাকে সারেং বাড়িতে নিচ্ছে। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই অন্য এক অচেনা জায়গায় এসে ভ্যান থামল। মিঠাপুকুরের সব অলিগলি তার চেনা হয়ে যাচ্ছে। ভালোতো!

ভ্যান থামতেই এরশাদ নেমে বলল, — আসুন?

পৃথিলা এবার ভ্রু কুঁচকে তাকাল। যেখানে ভ্যান থেমেছে, সেখানে কোনো বাড়িঘর তো দূরের কথা, কোন কিছুই নেই। এক সাইডে সোজা রাস্তা গেছে, আরেক সাইডে ধানের ক্ষেত।

এরশাদ দেখে বলল, — এই ক্ষেত দিয়ে যাবো। বেশি দূর না, এই তো দুটো ক্ষেত। বলে তার হাতের টর্চ টা পাশের জনের হাতে দিলো।

কেন দিলো পৃথিলা বুঝেনি, তাছাড়া কোথায় নিচ্ছে এই নিয়ে পৃথিলার মাথা ব্যথাও নেই। তবে সমান জায়গা আর ধানের ক্ষেতের আইল এক কথা না। অন্ধকার তবুও পৃথিলা বুঝতে পারছে, মানুষের তেমন চলাচল নেই। এবড়ো থেবড়ো আইল। তাই বড় একটা শ্বাস ফেললো! ফেলে এগুতেই, এরশাদ ঝট করে কোলে তুলে নিলো। নিয়ে এক দৌড় দিতে দিতে বলল,– কথা দিয়েছিলাম অনুমতি ছাড়া ছোঁব না। তাই বিশ্বাস করুন, এটাই শেষ, সত্যিই শেষ।

পৃথিলা কিছু বলল না। চুপচাপ শক্ত হয়ে রইল। দুটো ক্ষেত বললেও, দুটো ক্ষেতের কিছুই হলো না। বরং বেশ কিছুসময় লাগলো। আর লাগতেই গাছগাছালিতে ভরা একটা বাড়ি চোখে পড়ল। হয়তো কারেন্ট টারেন্ট নেই, অন্ধকারে তলিয়ে আছে। তবে ঘরের ভেতরে টিমটিম করে জ্বলতে থাকা হারিকে আলো ঠিক বোঝা গেলো।

এরশাদ পৃথিলাকে এনে নামালো, একেবারে ঘরের ভেতরে । আর নামতেই পৃথিলা আঁতকে উঠল। এই ঘরে টুকটাক অনেক কিছুই আছে। তার মধ্যে এক কোণে বড় সাইজের একটা খাট। সেই খাচে জুঁই শুয়ে আছে।

পৃথিলা নিজের পায়ের কথা ভুলে গেলো। চোখে, মুখে ভয় আতঙ্ক নিয়ে দৌড়ে গিয়েই হাতে মুখে হাত বোলালো। এরশাদ দেখে বলল, — কিছু হয়নি, সকাল হতেই ঠিক হয়ে যাবে।

— কি করেছেন আপনি ওর সাথে?

— কিছুই না, শরবতের সাথে একটা ঘুমের টবলেট দিয়েছি।

পৃথিলা আগুন চোখে তাকালো। এরশাদ সেই আগুন চোখের দিকে তাকালো না। দু’রাত একেবারে নির্ঘুম, তার মধ্যে এতো দৌড়াদৌড়ি। এতো ক্লান্ত লাগছে। সে জানালা খুলে দিলো। কারেন্ট নেই, ফ্যানের ব্যবস্থা করা হয়নি। তাই জানালা খুলে পৃথিলার সাইড দিয়ে খাটে উঠে, জুঁইয়ের অপর পাশে শুতে শুতে বলল, — সব খেলতো মহাজন একাই খেললো, এবার আমি একটু খেলি।

— তাই বলে এই মাছুম বাচ্চাকে তুলে আনবেন? ওর মার কথা একবার ভেবেছেন?

— হ্যাঁ! ভেবেছি। তাই সে জানে তার মেয়ে তার প্রাণ প্রিয় বান্ধবীর কাছেই আছে।

— অমানুষ।

— জ্বি শুকরিয়া।

পৃথিলা আগের মতোই তাকিয়ে রইল, এরশাদ একটু হাসলো। হেসে চোখ বন্ধ করলো। যতো ক্লান্তই থাক, সহজে তার চোখে ঘুম ধরা দেয় না। আজ শুতেই ঘুমিয়ে গেলো। আর কেন গেলো পৃথিলা না জানলেও এরশাদ জানে। ভালো করেই জানে।

ফরহাদ সারেং বাড়িতে এলো পরের দিন বিকেলে। সে ভেবেছিল ঢুকতে দেবে না, তবে সদর দরজার পাহারাদার কেউই কিছু বললো না।

বললো না বলে সে নিজের মতোই ভেতরে এলো। সব কিছু এতো এলোমেলো। হিসেব মিলাতে হিমসিম খায়। সেই খেতে খেতে ঘুরে ফিরে এক জায়গায়’ই স্থির হয়। মিঠাপুকুরে তার আর থাকা সম্ভব না। যেখানে তাকায় বাপের পাপ নজরে পড়ে, আর পড়তেই তার দম বন্ধ হয়ে আসে। অথচ এক সময় এই বাবাকে নিয়ে সে গর্ব করতো।

বাড়ির দরজা খুললো আয়না। আম্বিয়া এখন কাজ ছাড়া রুম থেকে বেরোয় না। আয়নার’ই সব করতে হচ্ছে। তার মধ্যে আরেকজন তো আছেই। ব্যথা পায় মাথায়, হাতে পায়ে কি হয় কে জানে? সব আয়নাকে দিয়ে করাবে। তবুও ভালো সে সাইজে টাইজে ছোট। তা না হলে, তার ধারণা, পা দিয়ে হাঁটতোও না। তার কোলে চড়ে চড়ে পুরো বাড়ি ঘুরতো।

তাই দরজা খুলে ফরহাদকে দেখেই বড় এক ঢোক গিললো। গিললেও সুন্দর করেই ভেতরে এনে বসালো। বসিয়ে কোন দিকে যাবে বুঝতে পারল না। এরশাদ ভাই কাল রাতে তো ভালোই, এই যে এতো বেলা আজও ফেরেনি। জয়তুন আরা এই বাড়ি তো বাড়ি, দিন দুনিয়ার হিসেব নিকেষও ছেড়ে দিয়েছে। জাফর চাচা কাল থেকে গলা দিয়ে পানির ফোটাটুকুও ফেলেনি। আয়না বেশ কয়েকবার গেছে, দরজাই খুলেনি। বাড়িতে থাকার মতো পুরুষ বলতে শাহবাজ, সে আবার গো ধরে বসে আছে, বোন কে দেবে না। সে করবেটা কি?

ফরহাদ আয়নার দিকে কিছুটা শান্ত ভাবেই তাকিয়ে রইল। সত্য জানলে, এই মেয়েটাও নিশ্চয়ই তাদের ঘৃণা করবে। অবশ্য ঘৃণার কাজই করেছে তার বাবা। অথচ তিল পরিমাণ অনুশোচনা নেই। যদি থাকতো, তার বাবা জানে না, তার ছেলে তাকে কতোটা ভালোবাসে। মাফ করতে না পারুক তবে ঘৃণা করতো না। ভাবতো যা করেছে ভালোবাসায় অন্ধ হয়েই করেছে। তবে তার ছিটেফোঁটাও নেই। বরং অন্যের দোষ দেখাতে ব্যস্ত।

তাই আয়নার দিকে তাকিয়ে শান্ত ভাবেই বললো,– এরশাদ ফিরেনি?

আয়না দু’পাশে মাথা নাড়লো। ফরহাদ সেই নিষ্পাপ মাথা নাড়ানো দেখে মৃদু হাসলো। হেসে বলল,– বীণাকে একটু ডেকে দাও আয়না।

আয়না সাথে সাথে বীণার ঘরের দিকে দৌড়ে গেলো। শাহবাজ কি বলেছে তার মাথাও নেই। বরং গিয়েই কিছু বলবে তো ভালোই, কিছু বোঝার আগে টেনে নিয়ে এলো। এনে দাঁড় করিয়ে খাবার ঘরের দিকে গেলো। জামাই মানুষ, কিছু সামনে না দিলে কেমন দেখায়।

বীণা ফরহাদকে দেখেই হকচালো। কিছু না জানলেও, বুঝতে পারছে বড় কিছু একটা হয়েছে। তা না হলে সবাই এমন বদলে যাবে কেন? বড় ভাই যাকে সব সময় সুন্দর, গোছানো, মার্জিত রুপে দেখে এসেছে, সেই আজ বড় অগোছালো, ছোট ভাই, যে দিন দুনিয়ার পরোয়াতো ভালোই। বড় ছোট কাউকে গোনায় না ধরা মানুষটা, এখন সব বিষয়ে চিন্তিত। আর এই যে সামনে বসা মানুষটা, একে সে হারে হারে চিনে। রাগ, জেদ, বিরক্ত সব সময় যার নাকের ডগায় থাকে, সে আজ শান্ত, বড়ই শান্ত। কেন? কি কারণ, সে বুঝতে পারছে না।

ফরহাদ বীণার অবস্থা বুঝলো। বুঝে বলল, — বস, আমি শুধু কয়েকটা কথা বলবো।

বীণা জড়সড় ভাবেই ফরহাদের সামনে বসলো। বসতেই ফরহাদ কিছুক্ষণ নিশ্চুপ বসলো। তারপর আস্তে করে বলল,– আমি যখন ঢাকা পড়তে যাই। তখন এক মেয়ের প্রেমে পড়ি। তোর মতোই, পড়া লেখার জন্য সে জান প্রাণ দিতে পারে। লেখা পড়া ছাড়া ডান,বাম কোন কিছুতেই সে নেই। তার এই নাইতেই আমি প্রেমে পড়লাম। প্রথম প্রেম, দিন দুনিয়া ভুলেই পড়লাম। কতো সময়, কতোটা ধৈর্য্য নিয়ে আমার দিকে তাকে ফেরালাম, সেটা বলে বোঝাতে পারবো না। আমরা দু’বছরের মতো সম্পর্কে ছিলাম। এই দু’বছর আমার কেটেছে স্বপ্নের মতো। আমি তার বিষয়ে খুব সিরিয়াস ছিলাম। তবে তার হয়ত অন্য কিছু চাওয়ার ছিল। থাকতেই পারে। তাই সুন্দর মতো যদি সম্পর্ক শেষ করতো, আমার আফসোস থাকতো না। তবে সে আমার সাথে করেছে ছলনা। আমার সাথে সম্পর্ক রেখেই, আরেকজনের সাথে জড়িয়েছে। আমি তাদের হাতে, নাতে ধরেছিলাম। বইয়ের নেশা ছাড়িয়ে তাকে প্রেম শিখিয়েছিলাম আমি, সেই শেখানোই আমার উপরে ভারী পড়েছে।

প্রথম ভালোবাসা তো, ধোকাটা হজম হয়নি। এতোটা ঘৃণা ভেতরে জমা হয়েছিল, কোন মেয়েকেই আর সহ্য হতো না। তার মধ্যে তার হাবভাব অধিকাংশ’ই তোর সাথে মেলানো। তাই তোকে দেখলেই চট করে রাগ মাথায় উঠে যেত। পড়াতেই চাইনি, এরশাদ জোর করলো। আর নিষেদ করতে পারিনি। তবে সেই না পারার রাগ, জেদ, বিরক্ত সব তোর উপরেই ফেলেছি। তবে সত্য বলছি, সেই প্রেমের ছিটেফোঁটাও এখন আর আমার ভেতরের কোথাও নেই।

এই শক্রবারে আমি ঢাকা চলে যাবো, একেবারে। কেউ মানুক আর না মানুক, একটা পবিত্র সুঁতোয় আমরা বাঁধা। বলেই ফরহাদ একটু থামলো! থেমে ঢোক গিলে গলাটা ভিজেয়ে বলল,– আমার সাথে যাবি, বীণা?

বীণা থমকে তাকিয়ে রইল। শাহবাজ সাইডে থেকে সবই শুনলো। সে দোতলা থেকে দেখেছে, ফরহাদ এসেছে। তাই নিজের তেজ নিয়েই নামছিল। তবে ফরহাদের কথায় থমকে সে নিজেও দাঁড়ালো। যদি আয়না দোষ না থাকে, সেখানে ফরহাদও নির্দোষ। তবে ফরহাদের সাথে জড়ালে, তার বোনের জীবনের ঝুঁকি আছে। অবশ্য যদি সব কিছুর মায়া ছাড়তে পারে, তবে আর থাকবে না। তার মনে হলো, ফরহাদ সেই মায়া ফেলেই এসেছে। তাই আর এগুলো না, বীণার যেটা ভালো লাগে করুক। তাছাড়া সারেং বাড়ি ভেঙে গেছে। সে একদিকে, ভাই একদিকে, দাদি একদিকে, জাফর চাচাতো সবাইকে ভাবছে শত্রু। তাও ভালো ঘরে খিল এটে বসে আছে। বেরুলেই সত্য কানে যাবে। তখন কি করবে কে জানে? আর এমন অবস্থায় বীণার মাথায় এর চেয়ে শক্ত হাত আর কে রাখবে?

তখনি আয়না এসে নাস্তার ট্রে রাখলো। ফরহাদ, বীণা কেউ নাস্তার দিকে তাকালো না। শাহবাজ দেখলো! এই ভেনদি তো জনমকার ভেনদি। তাই উপরে দিকে যেতে যেতে চেঁচালো, — আয়না….

আয়না চমকে উঠল। এই কণ্ঠ শুনেই চমকে উঠা তার অভ্যাস হয়ে গেছে। তাই নিজেকে সামলে মুখ গোঁজ করে উপরে দিকে গেলো। সে একটু এদের কথা শুনতে চেয়েছিল। ধুর! সব কিছুতে শয়তানটার বেগড়া না বাজালে পেটের ভাত হজম হয় না।

আয়না যেতেই ফরহাদ আগের মতোই বললো,— তোদের বাড়িতে যেই ডাকাতের ঘটনাটা ঘটেছিল। সেটায় আমার বাবার কাজ ছিল। কেন ছিল, সেটা আমি বলতে চাই না। সেটা তোর ভাইদের ব্যাপার। যদি বলতে চায় বলবে। তবে সত্য এটাই তোর বাবা, মায়ের খুনি আমার বাবা। তাই যে কোন সিন্ধান্ত নেওয়ার আগে ভালো করে ভেবে নিবি। কেননা, এবার আমি, আমার বাবার জন্য কোন সিন্ধান্ত নিচ্ছি না। নিচ্ছি নিজের জন্য। তাই এই সম্পর্কে কোন ফাঁক থাকবে না। আমি নিজে তোর সব দায়িত্ব নেবো। তোর ইচ্ছা, তোর স্বপ্ন সব কিছুই আমার। তবে আমার দায়িত্ব থেকে তুইও কোন পিছ পা হতে পারবি না। না পারবি কোন অবহেলা করতে।

বীণা থমকে আছে। সেই থমকে যাওয়া চোখের কোণা থেকে পানি গড়িয়ে পড়ল। এখন বুঝতে পারছে, সব কেন এতো এলোমেলো।

ফরহাদ সেই গড়িয়ে পড়া পানি দেখলো। দেখে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,— আমি ট্রেনের দুটো টিকিট কাটবো। ট্রেন ছাড়ার শেষ এক সেকেন্ড পর্যন্তও তোর অপেক্ষা করবো। বাকি তোর ইচ্ছা। বলেই ফরহাদ বেরিয়ে এলো। বেরুতেই এরশাদের সাথে দেখা হলো। সে দাঁড়িয়ে আছে সদর দরজার সামনে। চুপচাপ, তবে আজ সব সময়ের মতো হাতে সিগারেট নেই। ফরহাদ হাসলো। যাক, নেশা কাটানোর ঔষুধ তাহলে পেয়ে গেছে।

বলেই ধীরে ধীরে এগুলো! এগুলো এরশাদও। পাশাপাশি দাঁড়ানো বন্ধু, আজ দাঁড়ালো মুখোমুখি। দাঁড়াতেই ফরহাদ বললো,– খবর পৌঁছাতে সময় লাগেনা তোর ?

— কি করবো? মুখোশ পরা সবাই।

— সেটাতো তুই ও পরে থাকিস।

— ভালো, তবে শুনে রাখ। আমার বোন যাবে না।

— সেটা ওকে ভাবতে দে।

— ভেবেও লাভ কি? আমি তোদের ছাড়বো না।

— আমার গলায় তুই ছুরি চালাতে পারবি?

এরশাদ নির্দ্বিধায় বললো — হ্যাঁ! পারবো।

ফরহাদও তার মতো বললো, — বেশ! তাহলে নিশ্চিন্তে থাক। তুই আসতে পারলে, আমি নিজে গলা পেতে দেবো।

চলবে……

আমার প্রথম ইবুক #পিছুডাক প্রকাশিত হয়েছে আপনের প্রিয় #বইটই অ্যাপে। ইচ্ছে হলে পড়তে পারেন। লিংক কমেন্ট বক্সে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here