#ধূপছায়া
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_৫৪
এরশাদ আজ অনেক দিন পরে বাড়িতে ফিরেই দাদির রুমে পা রাখলো। জয়তুন তখন জানালার পাশে বসা, পিঁড়িতে। বিকেলের কোমল আলো চোখে মুখে পড়েছে। পা দুটো সামনে মুড়িয়ে সোজ করে রাখা। মুখে পান, দৃষ্টি জানালা গলিয়ে উঠানে। ফরহাদ এসেছে, গেছে, এরশাদ এসেছে। সবই সে দেখেছে। তবে তেমন কোন ভাবান্তর হয়নি। তখনও নিজের মতো ছিল, এখনো ও আছে। এই যে এরশাদ এসেছে সে বুঝল, তবে ফিরে তাকালো না। যেভাবে বসে ছিল সে ভাবেই বসে রইল।
এরশাদ এগিয়ে সব সময়ের মতো দাদির কোল ঘেঁষে নিচে বসলো। সেই দিন দাদি কিছু করেনি, তবুও অনেক রাগ জেদ দেখিয়েছে। অবশ্য দাদি নাতিদের একই সমস্যা, মাথা বিগড়ালে কাউকে চেনে না। তাই কুঁচানো চামড়ার এই নরম দুটো হাত, নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল, — মাফ করে দাও দাদি।
জয়তুন আগের মতোই বসে রইল। এরশাদ হাত দুটো গালে ছুঁইয়ে বলল,– কথা বলবে না?
জয়তুন এবারো কিছু বললো না। তবে এরশাদ তার নরম স্বরে বলল,— তোমার এরশাদ বিয়ে করেছে, দাদি।
জয়তুন শুনলো, শুনেই আস্তে করে হাত সরিয়ে নিলো। পৃথিলা সারেং বাড়ির রক্ত, আসল রক্ত। জাফর জানতো, এরশাদ জানতো তবে এরা কেউ তাকে বলার প্রয়োজন মনে করেনি। অথচ সে ভাবতো, তার ছেলে নাতিদের মাঝে কোন আলাদা পর্দা নেই। কতো মিছে দুনিয়ার বসে বসে গর্ব করতো। জয়তুন হারে না, নিচ হয় না। অথচ মরে গিয়েও জোছনা জিতে গেছে, শায়লা চলে গিয়েও তাকে হারিয়ে গেছে। সে বুঝেনি, আসলেই বুঝেনি।
এরশাদ সরিয়ে নেওয়া হাতটা দেখলো। রক্তের যোগ না থাক, তবে দু’জনেই এক নীতির মানুষ, তাই কারো দোষ, পাপই কারো চোখে বড় মনে হয় না। এরশাদের কাছে তো আরো না, পৃথিলার দিকে চোখ তুলে কেউ তাকাক, তার সহ্য হবে না। তেমনি দাদি তার ভালোবাসার মানুষের ভাগ দিয়েছে, যত্নের সংসারের ভাগ দিয়েছে। দিয়েছে সব কিছুর। তবুও তারা যদি আঘাত করতে আসে, ছেড়ে দেবে কেন? তাই তার কাছে তার দাদিই ঠিক।
সে টেনেই আবার হাতদুটো গালে রাখলো। রেখে বলল, — কিছু বলো দাদি। শাস্তি দিতে চাও দাও। আমি মাথা পেতে নেবো।
জয়তুন ফিরে তাকালো! তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল, — আমার এক সন্তান। না দিলাম এই কোল থেকে জন্ম। তবুও সে আমার ছেলে। সে মারা গেছে। ব্যস, আমার আর কিছু নেই। আর কারোর দরকারও নেই। এটা আমার স্বামীর বাড়ি। শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত এখানেই থাকবো। তাই আমাকে আমার মতো থাকতে দে।
এরশাদ তার কোমল আবার স্বরে ডাকে — দাদি…
সেই কোমলতা জয়তুনকে ছোঁয় না। বরং নিজের মতোই বলে, — তোরা দাদিকে চিনছোস, তবে জয়তুন আরারে না। না থাক তার ক্ষমতা। তবে যে নিজের স্বামীকে দ্বিতীয়বার সুযোগ দেয়নাই, তোরা আর কী? এই যে দেখ, এই দরজা। এই দরজার ওপারে রাতের পর রাত আলতাফ দাঁড়িয়ে থেকেছে, জয়তুনের মন তখনই গলে নাই। আর তোরা ছুঁড়ে ফেলে, আবার এসেছিস দয়া দেখাতে। জয়তুন কারো দায়ায় বাঁচে না। মনের মতো বিয়ে করেছিস, যা, বউ নিয়ে থাক। তবে এই শেষ বার। আমার দরজার চৌকাঠ যেন তোকে পেরুতে না দেখি।
এরশাদ হাসলো! হেসে বলল, — কে বলেছে তোমার ক্ষমতা নেই? মুখ দিয়ে আদেশ বের করে তো দেখো।
— আমি বের করলেও তোর আর সেই সাধ্য নাই।
— ও তোমার তো কোনো ক্ষতি করেনি।
— ওই আমার সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে। এই যে দেখ, সারেং বাড়িতে পাও রাখেনাই, তবুও জয়তুনের সিংহাসনে ঠিক বসে গেছে। বসেছে বলেই সে নাই, তবুও তার হয়ে তুই গান গাইতাছোস, জাফরকে কে ডাক। সে এই মেয়ের এক ইশারায় সারেং বাড়িকে ধূলোয় মিশাতে একবার চিন্তাও করবে না।
— সে সারেং বাড়ির একমাত্র রক্ত। ছোট চাচার মেয়ে। তোমার এরশাদের বউ। আর কিছু না। বিশ্বাস করো, এই তিনের একটাও সে স্বীকার করে না। কখনো করবে বলে মনেও হয় না। ঘৃণার দিকে সে তোমার কার্বন কপি। একবার মুখ ফেরেছে তো ফেরেছে। কারো সাধ্য নেই আর কিছু করার। তাই অযথা দোষী বানিয়ে বসে আছো। তোমরাই তো নাতনি।
— নাতনি হয়ে যদি বসতো, তাহলে জয়তুনের আফসোসের কথাই আসতো না। জয়তুন বুক পেতে সিংহাসনে বসাতো। তবে সে বসেছে আমার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে। তাই মিঠাপুকুরে পা রাখতে না রাখতেই সারেং বাড়ির ধ্বংস শুরু হয়েছে। এই মেয়ের জন্যই প্রথম বার গ্রামের মানুষের সামনে আঙুল উঠেছে, এই মেয়ের জন্যই আজ আমার কেউ নাই। এই মেয়েই আমার নাতি, সম্মান, শক্তি, ভরসা, সিংহাসন সব কেড়ে নিয়েছে। তাই এই মেয়ের ক্ষমা নাই। অন্তত জয়তুনের কাছে নাই। তাই যা নিজের ইচ্ছায় বিয়া করছোস। নিজের মতো থাক।
এরশাদ কিছুক্ষণ নিশ্চুপ তাকিয়ে রইল। তারপর উঠে দাঁড়ালো। দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল,— যতোই বলো, জসিম আমার ছেলে, আমার ছেলে। নিজের কোল থেকে হলে, এভাবে মুখ ফেরাতে পারতে না দাদি। আলতাফ তোমার সাথে অন্যায় করেছিল, আমরা কেউই করিনি। আর পৃথিলা, সে তোমার কোন কিছুতেই নেই।
জয়তুন উত্তর দিলো না। মুখ ফিরিয়ে আবার জানালার দিকে তাকালো। এরশাদ সেই ফেরানো মুখটার দিকে আগের মতোই কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। সব তার হাতে, তবুও কিছু একটা ঠিক নেই, কি নেই? সে বুঝতে পারছে না। এই যে প্রিয় দাদির মুখ। এই মুখটার দিকে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে। গা ঘেঁষে বসে থাকতে ইচ্ছে করছে। অথচ কতবার এভাবে দাদি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, হিসেবও নেই। তবে আজ এমন লাগছে কেন?
এরশাদ উত্তর পায় না। নিজের মতো বেরিয়ে আসে। আসতেই আয়নাকে দেখলো। সে বীণার রুমের দিকে যাচ্ছিলো। তাকে দেখেই থমকে দাঁড়ালো। সাথে সাথেই ভয়ে ফর্সা মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেলো।
এরশাদ মুখে একটা শব্দও বললো না, তবে শান্ত, শীতল চোখে তাকিয়ে রইল। সেই তাকানোর বিপরীতে শাহবাজ আয়নার ঠিক পেছনে এসে দাঁড়ালো। দাঁড়িয়ে শান্ত ভাবেই বলল,— আয়না, উপরে যাও।
আয়না যেন প্রাণে বাঁচলো। ডানে বামে আর একবারও তাকালো না। দৌড়ে সোজা উপরে চলে এলো। আর প্রথমবার শাহবাজকে তার সবচেয়ে আপন মনে হলো। মনে হলো, এই মানুষটা তার পাশে থাকলে, আর কোন ভয় নেই।
এরশাদ শাহবাজের দিকে তাকিয়ে বলল,– মনে আছে, ভাইয়ের বুকে মাথা রেখে বলেছিলি, নিজ দায়িত্বে যেন ইটের চুলায় দেই।
— আছে।
— তাহলে, কিসের এতো কানামাছি খেলা?
শাহবাজ উত্তর দিলো না, এগুলো। দাঁড়ালো ভাইয়ের একেবারে সামনে। দু’ ভাইয়ের বয়সের তফাৎ অনেকটা, তবে কাঁধ বুক বরাবর। বরাবর হলেও খুব কম সময়ই এই কাঁধ দুটো একে অপরের সাথে মিলেছে। তাই শাহবাজ আজ নিজে থেকেই বড় ভাইয়ের গলা জড়িয়ে ধরলো।
এরশাদ কি একটু থমকালো? হয়তো, ভাইবোনদের মাঝে আহ্লাদ, তাদের তিন ভাইবোন কারো মাঝেই নেই। সবার আহ্লাদ ছিল জয়তুন আরা। জয়তুন আরার কাছ ঘেঁষে যত সহজে বসতে পারে, বোনের মাথায় তত সহজে হাত রাখতে পারে না। ভাইয়ের কাঁধে কাঁধ মেলাতে পারে না। এই যে যেমন, আজও পারলো না, শান্ত হয়ে সোজা চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
তবে শাহবাজ ধরলো। ধরে সেই দিনের মতো বলল, — আয়না নির্দোষ, ভাই। তার বাপ পাপ করেছে, তার মা জীবন দিয়ে সেই পাপের প্রায়শ্চিত করেছে। ওর কোনো দোষ নেই।
— আমাদের বাবা-মায়ের ছিল?
— না।
— তাহলে?
— আমি আয়নামতিকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না।
— বাবা-মায়ের খুনির মেয়েকে ছাড়া যদি না বাঁচিস, তাহলে মরে যাওয়া-ই ভালো।
শাহবাজ হাসলো। হেসে সরে দাঁড়ালো। এতক্ষণ যে ভাইয়ের প্রতি কোমলতা ছিল, সেটা আর দেখা গেলো না। বরং সব সময়ের সেই চিরচেনা হাসি হেসে বলল, — আয়নামতিকে কিছু করতে হলে, তার আগে আমাকে মারতে হবে। আমাকে তুমি কিছুই করবে না, আমি জানি। তবে ভাই, সোজা একটা কথা বলি, তুমি আমার গায়ে টোকা না দিলেও, আয়নামতির দিকে বাড়ানো হাতে কোপ আমি ঠিক বসাবো। আর সেই হাত কার, আমি দেখবো না। বড় ভাই তো, তাই প্রথমে আবদার রাখলাম, পরে যেন আফসোস না হয়।
এরশাদ আগের মতোই শান্ত চোখে ভাইকে দেখলো। দেখে অবাক হলো না। একই বাপের রক্ত, একই স্বভাব। তফাৎ এরশাদ বুদ্ধি খাটিয়ে করে, আর শাহবাজ যা করবে সোজা। ভয় ডর ডান বাম নেই। তারপর যা হওয়ার হোক, তাতে তার কিছু আসে যায় না। তাই সে জানে, সে যেমন পৃথিলার জন্য সব করতে পারে, তার ভাইও আয়নামতির জন্য সব পারবে। তবে তার ভাই জানে না, এরশাদ এবার নিজে হাত বাড়াবে না, হাত লেলিয়ে দেবে। যেই হাতে চাইলেও কোপ বসানো যায়না।
এরশাদ বেরিয়ে এলো। যেতে যেতে দোতালায় একবার তাকালো। সব কিছু পন্ড করার ক্ষমতা একজনেরই আছে, তার ছোট চাচা। তাই যেতে যেতে সদর দরজার পাহারার লোককে বলল, — কেয়ামত হলেও ছোট চাচা যেন এই বাড়ির সদর দরজা না পেরোয়, না বাইরের কেউ ছোট চাচার সাথে কথা বলতে পারে। কোন ভাবেই না।
পৃথিলা সুন্দর করে জুঁইয়ের মাথায় দুটো বেনি তুলে দিলো। তার পায়ের ব্যথা আজ নেই বললেই চলে। ওষুধ খাচ্ছে, কমারই কথা, তবে ফোলা আছে। সে চিরুনি রেখে জুঁইকে কোলে তুলে বসালো। মেয়েটা শান্ত, তবে ঘুম থেকে উঠে তাকে দেখে অবাক হয়েছে। অবাক হয়েই বলেছে,– আমরা বেড়াইতে আইছি?
পৃথিলা মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছে,— হুম।
— মা আসেনাই?
পৃথিলা আস্তে করে দু’পাশে মাথা নাড়িয়েছে। তার নাড়ানো দেখে মন খারাপ করে বলেছে,– মা আসবো না?
পৃথিলা উত্তর দেয়নি। বসে থাকতে থাকতে শেষ রাতে চোখ লেগেছে, এরশাদ কখন বেরিয়ে গেছে জানেও না। দরজা বাইরে থেকে আটকানো, পাশের রুমে কোন কিছুই নেই, তবে তার সাথে পেছনের দিকে লাগোয়া টিনের বাথরুমের মতো করেছে। যেন বাইরে পা রাখার প্রয়োজনই না পড়ে। তবে বাইরে এক-দু’জন লোক আছে, তারাই নিয়ম করে খাবার দিয়ে যাচ্ছে। সকালের নাস্তাও দিয়ে গেছে।
পৃথিলা উত্তর না দিলেও সুন্দর করে খাইয়ে দিয়েছে, হাত, মুখ পরিষ্কার করে দিয়েছে। অবশ্য এভাবে আটকে রাখার উদ্দেশ্য কী? জুঁইকে বা কেন এখানে এনে রেখেছে ? কিছুই বুঝতে পারছে না। অবশ্য সে জানে, জিজ্ঞেস করলে সব সত্যি সত্যিই বলবে। তবে পৃথিলার ইচ্ছে করে না। কি হবে জেনে? এই লোক সব সত্যি সত্যি বলবে ঠিক, তবে কারো কিছুতেই কিছু বদলাবে না। যেটা ঠিক করেছে, সেটা করবেই।
তখনই দরজা খোলার শব্দ হলো। পৃথিলা ভেবেছে বাইরের লোকদের কেউ। কিছু হয়ত দিতে এসেছে। তবে তাকে ভুল প্রমাণ করে এরশাদ এলো। হাতে কয়েকটা ব্যাগ। কিসের ব্যাগ পৃথিলা ঝট করেই বুঝলো। অবশ্য না বোঝার কিছু নেই। গত দু’দিন একই কাপড় গায়ে। কাদা, ময়লা শুকিয়ে চট হয়ে আছে। তার মধ্যে আঁচল ছেঁড়া। তাই কাপড় টাপড় ছাড়া আনবেই বা কি?
পৃথিলা জুঁইকে বুকে জড়িয়ে চুপচাপ বসে রইল। এরশাদ ফিরে এই দৃশ্যটুকুই দেখলো। এই মেয়েটা যেভাবে থাকে, সেভাবেই তার দেখতে ভালো লাগে।এই যে জুঁইকে বুকে জড়িয়ে অন্য দিকে চোখ ফিরিয়ে বসে আছে। এই দৃশ্যটুকুতেও সে মুগ্ধ হয়ে গেলো। আর মুগ্ধ হয়েই তাকিয়ে রইল। আর খেয়াল করলো, মনের যতো অস্থিরতা সব কেমন হাওয়ায় মিশে গেলো।
মিঠাপুকুরে সন্ধ্যার আগে আগে এক ঘটনা ঘটে গেলো। মহাজন বাড়িতে পুলিশের পা পড়ল। আশপাশ তো ভালোই, এলাকার মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ল। গ্রামগঞ্জে পুলিশ সহজ বিষয় না। এক তো নাম শুনলেই সবাই আতঙ্কে থাকে, তার মধ্যে মহাজন তাদের প্রিয়, সম্মানের ব্যক্তি যেমন তেমন, তেমনি আবার প্রভাবশালী একজন। আর এই রকম মানুষের বাড়িতে পুলিশের আগমন আশ্চর্যের ঘটনাই বটে।
আজিজ পুলিশকে দেখে ভ্রু কুঁচকে তাকালো। এরশাদ চুপ বসবে না, সে জানে। তবে সব সময় যা করে, ভেবেছিল সেই রকমই করবে। ভেবেছিল, অন্য সব মানুষের মতো রাতের আঁধারে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করবে। তাই নিজের দিক থেকে সে ঠিক তৈরি হয়েই বসে ছিল। তার লোক তো আর কম নেই। তাছাড়া সারেং বাড়ি একা, আর তার সাথে আছে চেয়ারম্যান। চাইলেই ঝট করে কিছু করতে পারবে না। এরশাদের যত ক্ষমতাই থাক। সে তো অন্য সবার মতো গ্রামের সাধারণ মানুষ না। মহাজন, গ্রামের মহাজন সে । নিজের লোক তো যেমন তেমন গ্রামের অধিকাংশ মানুষও তার সাথে। তাই কিছুটা নিশ্চিন্তেই ছিল। সেখানে পুলিশের কাহিনী কী?
সে ভ্রু কুঁচকেই পুলিশদের বসার ঘরে বসালো। বসিয়ে চা নাস্তার কথা বলতেই অফিসার বলল,
— এই সবের প্রয়োজন নেই, মহাজন সাব। তাছাড়া আমাদের ফিরতে হবে। এখন আপনি গণমান্য ব্যক্তি। চেয়ারম্যান শুনতেই রেগে আছেন। তবে আমাদের কিছু করার নেই। জলজ্যান্ত সাক্ষী হাতে। তাই চাইছি, যা হওয়ার এখানেই শেষ হোক। না হলে আমাদের আর উপায় থাকবে না।
আজিজ আগা মাথা কিছুই বুঝতে পারলো না, সে আগের মতোই ভ্রু কুঁচকে বললো, — হয়েছে টা কী?
— আপনাদের গ্রামের ছেলে ইমরান, তার বউ। আপনার নামে কেস ফাইল করেছে। তার বান্ধবী দু’টো দিন ধরে গায়েব। সারেং বাড়িতে বিয়ে ছিল, সেই সুযোগে আপনি নাকি তাকে সরিয়েছেন?
আজিজের রাগে চোয়াল শক্ত হলো। শক্ত করেই বললো,– কথা সত্য! তবে আমি সরাইনি, কিন্তু তাকে আটকে রাখা হয়েছিল। সারেং বাড়ির ছোট বউ আমার কাছে সাহায্য চেয়েছিল। আমি তাকে সাহায্য করেছি।
— কেস সারেং বাড়ির ছোট বউয়ের নামেও হয়েছে। তবে আপনি তাকে গুটির চাল হিসেবে চালিয়েছেন, সেই হিসেবে। তাছাড়া আটকে রাখা হয়েছিল এমন কোন প্রমাণও নেই। যেহেতু বান্ধবীর বাড়িতে এসেছে, বান্ধবীর বাড়িতেই তো থাকবে। অসুস্থ ছিল, স্কুল থেকে ছুটির দরখাস্ত নিয়েছে, তাই বাড়ি থেকে আর বের হয়নি।
— সব সাজানো নাটক।
— হতে পারে। তবে আপনি মেয়েটাকে খুন করার জন্য আপনাদের এলাকার তিনজন লোক ভাড়া করেছেন। প্রমাণ মেটাতে তাদের খুন করে সারেং বাড়ির ইটের ভাটার নদীর পারে ফেলেছেন। তবে ভাগ্য আপনার খারাপ। দু’জন মরলেও একজন বেঁচে আছে। অবশ্য বলতে গেলে অবস্থা খুবই খারাপ। সদর হাসপাতালে এই যাচ্ছে তো ঐ যাচ্ছে। চোখ উপড়ে ফেলেছেন, হাত-পায়ের হাড্ডি তো ভালোই, আসল জায়গাও ছেঁচে ভর্তা। এতোটা নির্দয় না হলেও পারতেন। মানে মারবেন, মারেন, কী দরকার এত টর্চার করার? তবে যেমন করেছেন, তেমন সুন্দর করে আপনার কাহিনী বলে দিয়েছে।
আজিজ দাঁতে দাঁত চাপলো। এই সব কার কাজ, সে ভালো করেই জানে। তাই দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
— এমন পিশাচের মতো কাজ এই গ্রামে একজনই করে। আর কে, আপনি ভালো করেই সেটা জানেন।
— সেটাতো আপনের টাও জানলাম। মানুষের কতো রুপ যে থাকে।
— কি বলতে চান আপনে?
— আমি কিছুই বলতে চাই না। তবে প্রমাণ যেই দিকে, আমাদের দৌড়ও সেই দিকে। তাই মেয়েটা কোথায় বলে দিন, ঝামেলা শেষ হোক।
— কত টাকায় এই বুলি বের হচ্ছে?
অফিসার হাসলো! আজিজ সেই হাসি দেখে বললো, — তার ডাবল পাবেন।
অফিসার উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, — এখন আর সম্ভব না, মহাজন সাব। লোক জানাজানি হয়ে গেছে। আমাদেরও গায়ের ড্রেস সাদা রাখতে হয়। তাই মেয়েটা কোথায় আছে বলুন। আর কেন দুনিয়া থেকে সরাতে চেয়েছিলেন, সেটাও যদি একটু খোলাসা করেন, তবে আপনার হয়ে কিছু একটা করা যেত পারতো। তাছাড়া অচেনা একটা মেয়ে, দু’দিন হলো গ্রামে এসেছে, তার সাথে আপনার শত্রুটা কিসের?
আজিজ কিছুই বললো না। তবে ঠিক বুঝল, তাকে চারদিক থেকে আটকে ফেলা হয়েছে। এখন নয় পৃথিলাকে খুনের দায় শিকার করতে হবে, না হয় বলতে হবে কেন পৃথিলাকে সরাতে চেয়েছিল। সেটা বলতে গেলেই সেই ডাকাতির প্রসঙ্গ আসবে। আর আসলেই এক খুনের জায়গায় লাগবে পুরো সারেং বাড়ির খুনের দায়।
পুলিশ আফসোসের মতো মাথা নাড়ালো। নাড়িয়ে বলল, — উপায় রাখলেন না। আসুন, মহাজন সাব। আমাদের যেতে হবে।
এই কথা শুনেই মহাজনের লোক সব ক্ষেপে গেলো। তাদের জীবন যাবে, তবে মহাজনকে নিতে দেবে না। আশপাশের মানুষ, তাদের লোক মিলে পুরো গন্ডগোল লেগে গেলো। পুলিশ সেই ব্যবস্থা নিয়েই এসেছে। গ্রামের মানুষদের আবার কলিজা এ। তাই বন্দুক তাক করে বলল, — আমাদের কাজ, আমাদের করতে দিন। তা না হলে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবো।
গ্রামের মানুষ সরলো, তবে মহাজনের লোক সরলো না। পুলিশ আজিজের দিকে তাকিয়ে বলল, — এখন একদিকে ঝামেলা আছে, পুলিশের গায়ে হাত দিলে আরেক ঝামেলা হবে। এতো দিক সামাল দিতে পারবেন?
আজিজ আগুন চোখে তাকালো! তাকিয়ে বলল,
— দেখে নেবো আমি সবাইকে।
— তার জন্য আগে বাঁচতে হবে, মহাজন সাব। বিশ্বাস করেন, আপনার এই মহলের চেয়ে জেলে আপনি বেশি নিরাপদ। তাই দোয়া করেন, এমন কিছু মিরাক্কেল হোক, পাশার চাল উল্টে যায়। তা না হলে আপনি বাঁচতে পারবেন না।
আজিজ আর কথা বাড়ালো না। ইশারায় সব লোককে সরতে বললো। তারা সরতেই এক গ্রাম লোকের সামনে মহাজন পুলিশের জিপে উঠে বসল। ফাতিমা মরা বাড়ির মতো চিৎকার শুরু করলো। গ্রামের মহিলারা তাকে গিয়ে ধরলো। ধরলেও সবার চোখে মুখে বিস্ময়। যার গায়ে আজ পর্যন্ত কোন ফুলের দাগ পড়েনি, আজ সে আসামী হয়ে থানায় যাচ্ছে! তারা বিস্ময় নিয়েই মুখে আঁচল চাপলো। চেপে বলতে লাগলো, — পাপ লাগবো গো, পাপ। ফেরেশতার মতো মানুষ। এই পাপেই সব ধ্বংস হইবো।
তবে এতো মানুষের ভিড়ে আরেকজনও শান্ত চোখে প্রিয় বাবাকে দেখল। সে মাত্রই বাড়ি ফিরেছে। এতো লোকজন দেখে আর ভেতরে যায়নি। রাস্তার পাশেই চুপচাপ দাঁড়ালো। পুলিশের জিপ গাড়ি পাশ দিয়ে যেতেই আজিজ ছেলের দিকে তাকালো। তাকাতেই দাঁতে দাঁত চেপে বলল,– দুইটা কুপুত্র জন্ম দিয়েছি আমি।
ফরহাদ হেসে ফেললো। অবশ্য এই হাসি তার বিষন্নতাকে আড়াল করতে পারে না। বরং আরো কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়।
চলবে…..
আমার প্রথম ইবুক #পিছুডাক প্রকাশিত হয়েছে আপনের প্রিয় #বইটই অ্যাপে। ইচ্ছে হলে পড়তে পারেন। লিংক কমেন্ট বক্সে।

