প্রাচীর #নূপুর_ইসলাম #পর্ব- ১৩

0
2

#প্রাচীর
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব- ১৩

নিশাতের মামা বাড়ির সব কিছু আগের মতো চললেও নিশাতের মায়ের মুখ থমথমে। নিশাতের সাথে না কথা বলছে, না তার কোন কাজ নিশাতকে ধরতে দিচ্ছে । নিশাত বেশ কয়েকবার’ই গেলো। তিনি ঝাড়া মেরে নিয়ে সব নিজেই করছেন। নিশাত আর মাথা ঘামালো না। কালকে রাতে করেছিল ছোট মাছের চচ্চড়ি। অনেকটাই রয়ে গেছে। গরম করে মুড়ির সাথে নিয়ে তাদের বসার রুমের গড়াগড়ির খাটে বসতেই ফোন বাজলো।

ফোনটা কার সে জানে। মুড়ি মাখতে মাখতেই রিসিভ করলো। ওপাশ থেকে ভেসে এলো সেই ভারী ভয়ংকর কন্ঠের হ্যালো। তার ধারণা এই হ্যালো আরেকটু জোরে বললে পুরো দুনিয়া হেলে যাবে। মানুষের কন্ঠ এমন ভয়ংকর হয় কিভাবে তার মাথায় আসে না। এই লোক কি কখনো হা হা করে হেসেছে? ভূমিকম্প হবে ভাই ভূমিকম্প। সে এক লোকমা মুখে পুরে বললো, — হুম।

ওয়াহিদের ভ্রু কুঁচকে গেলো। ভ্রু কুঁচকেই বললো, — নিশাত?

নিশাত ঠেলে মুড়ি গলার নিচে নামিয়ে বললো, — জ্বি আমিই নিশাত। আপনার বাল্য কালের হারিয়ে যাওয়া বউ। যাকে আপনারা নাকি চিরুনী তল্লাশি করে খুঁজেছেন।

ওয়াহিদ থমকালো! তার বাল্য কালের বউ! এই কথাটা তাকে থমকানোর জন্য যথেষ্ট। আর এই বউ তার কাছে পুরো একটা রহস্য। এই রহস্য হারিয়ে যাওয়ার সময় সে দেশে ছিল না। তার এক মামা বাহিরে থাকে। মায়েরও খুব ইচ্ছে ছিল বাহিরে পড়াবে। তখন বাবা, মা নতুন টাকার মুখ দেখছে। বাহিরে লেখা পড়া করাও তখন আলাদা একটা চার্ম। ব্যস! ধরে বেঁধে তাকেও পাঠানো হলো বাহিরে। সে এসবের কিছুই জানতে পারেনি। বাবা যাও জানাবে, মা মৃত্যুর হুমকি দিয়ে মুখ বেঁধে রেখেছিল। জানতে পেরেছিল সব দেশে এসে। অথচ তার মস্তিষ্ক জুড়ে একটা বিষয় আজীবনের জন্য গেঁথে গিয়েছিল। তার বিয়ে হয়েছে, ঐ সদূর নিজ দেশে তার একটা ছোট্ট বউ আছে। আর এই ছোট্ট বধু, অন্য কোন মেয়ের প্রতি আকর্ষণ তৈরি করতে পারেনি। এখনো পারে না।

তাই থমকেই বললো — সময় হবে?

নিশাতও তার মতো বললো, — না।

— ক্লিয়ার ভাবে কিছু কথা বলা দরকার ।

— কোন দরকার নেই। আমি রাজি! ফুল অ্যান্ড ফাইনাল।

ওয়াহিদ কিছুক্ষণ নিশ্চুপ রইলো! তারপর বললো, — এখন?

— এখন আবার কি? আপনি জানতে চেয়েছেন আমি বলেছি। কেটা কালের বিয়ে গোনায় ধরেতো আর লাফ দিয়েই গলায় ঝুলে যেতে পারি না। মা রাজি না। এই বাড়িতে জামাই আদর আশা করে লাভ নেই। তাই যা করার আপনি’ই করেন। আমি বাবা কোন ঝামেলা টামেলায় নেই। শুধু টাকা আছে বলে রাজি হয়েছি, তা না হলে এরকম এক দুইটা কেটা কালের বিয়ে নিশাত গোনায় ধরে নাকি?

ওয়াহিদ মাত্রই ঘুম থেকে উঠেছে। অফিসে গেলে সময় পাবে না। তাই ভাবলো এখন কথা বলে নেওয়া যাক। কিন্তু কথা বলে তার ঘুম টুম উবে গেলো। ডেঞ্জারাস মেয়ে! সে তার স্বভাব মতো শান্ত ভাবেই বললো, — শুধু টাকার ব্যাপার হলে আমার তো মনে হয় তোমার অংশই যথেষ্ট । ওয়াহিদকে তো বিয়ের প্রয়োজন ছিল না। মানুষকে এতো বোকা ভাবার কারণ কি?

নিশাত ঠোঁট টিপে হাসলো! হেসে কথা ঘুরিয়ে বললো — আমি কিন্তু আমার অংশে প্রপার্টিজ আর ক্যাশ চাই। বিয়ে টিয়ের বেল আছে নাকি। আজ আছে কাল নেই। নিজের ভবিষ্যৎ আগে সেফটি। ভালো কথা কাবিন আমি দশ বিশ লাখে মানছি না।

ওয়াহিদ কিছু বললো না! উঠে পর্দা টানলো। টানতেই ঝিলমিল করা রোদ চোখে মুখে এলো। সে চোখ মুখ কুঁচকেই বললো, — তা শুভ কাজট কখন করতে চাচ্ছেন?

— আপনার যখন ইচ্ছে। কাজি টাজি রেডি করেন বান্দা হাজির।

— যদি বলি আজ’ই।

নিশাত একটু থামলো! তার মা কিচেন রুমের দরজায় চোখে পানি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নিশাত সেই ছলছল করা দৃষ্টির দিকে তাঁকিয়ে আগের মতোই বললো, — ডান।

— এটা বিসনেজ ডিল না তাসনিম নিশাত।

— তাহলে কি বলবো? কবুল, কবুল, কবুল।

— কবুল।

— জ্বি?

— কিছু না তৈরি থেকো।

নিশাত আর কিছু বললো না। ফোন কেটে দিলো!দিয়ে চুপসে যাওয়া মুড়িকে ইচ্ছে মতো ভর্তা করলো। করে উঠে কিচেন রুমের দিকে যেতে যেতে মাকে বললো, — সংসার টংসার জীবনেও আমাকে দিয়ে হবে না। তাই এই এতো চোখের পানি নাকের পানি এক করে লাভ নেই। এই মেয়ে সারা জীবন তোমার ঘাড়েই থাকবে। বলেই হাত, প্লেট ধুয়ে নিজের রুমের দিকে গেলো। একেবারে রেডি হয়ে বেরিয়ে এলো। সুলতানা কিচেন রুমের সামনেই পা ছড়িয়ে বসেছে। তার ভেতর ফেটে যেতে চাইছে। চোখের পানি নিয়েই বললো, — কোথায় যাচ্ছিস?

— কোথায় আবার অফিসে।

— তো ফোনে কি বললি?

— যা বলার বলেছি। নিতে আসলে বসিয়ে রাখবে। নতুন বউরা অপেক্ষা করাবে না কে করাবে? নিশাত বেরিয়ে গেলো। আজকে উপর থেকে স্যার আসবে। সময় মতো থাকতেই হবে।

__

সুবর্ণা আজ অনেক দিন পর নিজের হাতে রান্না করেছে। এই বাড়িতে খাবারের লোক নেই। ওয়াহিদ তো খাবারের ধারের কাছেও নেই। নিতু থাকে নিজের মতো। সে বাচ্চা হওয়ার পরে খাবার দাবার খায় খুবই মেপে মেপে। নিজের জন্য কোন কিছু করতে ইচ্ছে না। করেও না! কায়সার জীবিত থাকতে রান্নাটা তিনি নিজের হাতে করতেন। সে খেতে খুব পছন্দ করতো। আর যদি হতো তার হাতের তাহলেতো কথাই নেই।

ওয়াহিদ ফ্রেশ হয়ে একেবারে নিচে এলো! কাল রাতে ফিরেছে অনেক রাতে তাই মাহফুজের সাথে দেখা হয়নি। নিচে এসে দেখেই হালকা জড়িয়ে ধরলো। নিতু বলতে গেলে বেশিভাগ সময় এই বাসাই থাকে। মাহফুজদের নিজের ব্যবসা আছে। সেগুলো নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়। এই ব্যস্ততার মাঝেও এখানে দৌড়াতে হয়। নিতুর এই নিয়ে মাথা ব্যথা নেই। সে থাকে তার মতো। তাই জড়িয়ে ধরেই বললো, — সব কিছু ঠিক?

— জ্বি ভাইয়া। আপনি ভালো আছেন?

— হুম। এসো নাস্তা খাবে।

সুবর্ণা বেগম আগেই বসেছে। তার কাছ ঘেঁষে নিনিত বসা। আরেক পাশে বসলো ওয়াহিদ। সামনে নিতু, মাহফুজ। তার চোখ খুশিতে ঝিলমিল করতে লাগলো। অনেক দিন পরে তার পুরো পরিবারকে এক সাথে পেয়ে। তখনি ওয়াহিদ বললো, — আজকে আমি বিয়ে করছি ।

নিতু মাত্রই কফি মুখে নিয়েছিল। মাথায় উঠে গেলো। মাহফুজ তাড়াতাড়ি পানির গ্লাস এগিয়ে দিলো। তবে সুর্বণা শুনলো নির্বিকার ভাবে। যেন জানতো ওয়াহিদ এমন কিছু বলবে।

— আমি আসিফ কে বলে দিয়েছি। সব ব্যবস্থা করে ফেলবে।

নিতু হা করেই বললো, — এতো তাড়াতাড়ির কি হলো?

— কেন, সমস্যা কি?

— আত্মীয় – স্বজন আছে। ধীরে সুস্থে সব সুন্দর ভাবে কর।

— সব হবে! আগে বিয়ে হোক।

— আগে বিয়ে হোক মানে। বউ কি পালিয়ে যাচ্ছে?

— সেটাই গিয়েছিল! আর সুযোগ দিচ্ছি না।

নিতু বিরক্ত মুখে বললো, — মা তুমি কিছু বলবে না? তাছাড়া লামিয়ার কি হবে?

সুবর্ণা আদর করে নিনিতের মুখে খাবার তুলে দিলো। দিয়ে বললো, — আমার ছেলের যেভাবে খুশি আমিও সেই ভাবেই খুশি।

ওয়াহিদ মায়ের দিকে তাঁকালো! তাঁকালো সুবর্ণাও। ওয়াহিদ খুব কম হাসে। হাসলেও হালকা। তবে প্রায় সব সময়’ই চোখ, মুখ থাকে শান্ত, নিশ্চুপ। আজকেও তাই। তবে সুবর্ণার মনে হলো, এই শান্ত নিশ্চুপটাও আজ অন্যরকম। নাকি তার মনের ভুল। সে চোখ ফিরিয়ে নিলো। নিতেই ওয়াহিদ সব সময়ের মতো হালকা পাতলাই খেলো। খাবারের প্রতি তার এমনিতেও খুব একটা আকর্ষণ নেই। আজ আরো নেই। তাছাড়া ইমার্জেন্সি সব কাজ ক্যান্সেল করেছে। তবুও কিছু আছে সেগুলো দুপুরের আগে সব শেষ করতে হবে। তাই উঠে পড়লো। আর ঐ দিকে যার জন্য এতো কিছু সে নেচে নেচে নিজের মতো অফিসে গেছে। তাই উঠতেই নিতু চেঁচিয়ে বললো, — কোথায় যাচ্ছিস?

ওয়াহিদ বেরুতে বেরুতে বললো, — নিজের চরকায় তেল দে।

— ওহ, বিয়ের নাম নিতে না নিতেই বোন এখন অন্য চরকা হয়ে গেছে।

ওয়াহিদ উত্তর দিলো না। নিজের মতো বেরিয়ে গেলো। নিতু রাগ নিয়ে মায়ের দিকে তাঁকালো। সুবর্ণা অবশ্য আগের মতোই স্বাভাবিক। সে মাহফুজের দিকে তাঁকিয়ে বললো, — হঠাৎ করে সব হচ্ছে। বেয়াই বেয়ানকে একটু জানিয়ে রেখো। মনে যেন কষ্ট না রাখে।

মাহফুজ হালকা হাসলো! এই বাড়ি নিয়ে তার বা তার বাবা মায়ের কোন মাথা ব্যথা নেই। বিয়ে করে ব্যাচেলরের মতো জীবন তার। অনেক আশা নিয়েই বিয়ে করেছিল। সেই আশার এখন ছিটেফোঁটাও নেই।

বিয়ে নিয়ে নিশাতের মাথা ব্যথা না থাকলেও। সুলতানা অস্থির হয়ে মরছেন। কি করে মেয়েকে ফেরাবেন তিনি দিশে পান না। নিজের জীবন শেষ, তার মন বলছে মেয়েটারও শেষ হবে। সেই টেনশনে কোন কাজে মনও দিতে পারছে না। থালাবাটি ধুতে গিয়ে এক গ্লাস ভেঙেছেন। হেনা কিছুক্ষণ গজগজ করল। আবার তরকারি কুটতে গিয়ে নিজের পুরো আঙুল ফালা করে ফেলেছেন। এখন সেটাই চেপে ধরে পানিতে চুবিয়ে বসে আছেন। তখনি কলিং বেল বাজলো। সে মাথা ঘামালো না। সাবা বাসায় থাকলে ঘরের যেই কোনায়’ই থাক সে দৌড়ে যাবে। গেলোও তাই। যে স্পিডে দৌড়ে গেছে সেই স্পিডেই দৌড়ে এলো। এসে হাঁপিয়ে বললো, — সেই দিনের ট্রাক ওয়ালা এসেছে। সাথে ইয়া লম্বা এক লোক। দুনিয়ার খাবার টাবার নিয়ে হাজির।

সুলতানা বারো টেনশনে বুঝতে পারলো না। আঙুল চেপে’ই বেরিয়ে এলো। আসতেই থমকালো। বয়সে চেহেরা অনেকটাই পরির্বতন হয়েছে তবে চিনতে সমস্যা হলো না। তার হাত থেকে আঙুল ছুটে গেলো। ছুটতেই রক্তে পুরো মাখামাখি হয়ে গেলো।

ওয়াহিদ এগিয়ে এসে আঙুল চেপে ধরলো। সুলতানা হকচকিয়ে গেলো। ওয়াহিদ আসিফের দিকে তাঁকিয়ে বললো, — নিচে দোকান আছে। ওয়ান টাইম ব্যান্ডেজ পাও কি না দেখো।

আসিফ বেরিয়ে গেলো। ফিরে এলো কিছু সময়ের মাঝেই। ওয়াহিদ সুলতানার হাতে ব্যান্ডেজ লাগিয়ে বললো, — আমি জানি, আমার কোন শব্দে আপনার ঘৃণা কমবে না আন্টি। তবুও দোয়া চাইতে এলাম। প্রথমবার সেই বুঝ না থাক, এবার আছে। তাই সবার দোয়া নিয়েই এগুবো। বলেই নিচু হয়ে সালাম করলো। সুলতানা কিছু বললো না তবে আস্তে করে মাথায় হাত রাখলো।

রাখবে না কেন? সে তো সুবর্ণা না। না কখনো সুবর্ণার মতো হতে পারবে। সে যে সুলতানা! সাধাসিদে সুলতানা। যে তার স্বামীকে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করতো। করতো বলেই তাকে স্বামীর করা পাপের বোঝা বইতে হয়েছে। হারাতে হয়েছে অনাগত সন্তানকে। সেই সন্তান নিষ্পাপ! নিষ্পাপ জেনেও সে সুবর্ণার মতো হতে পারবে না। না পারবে তার মতো প্রতিশোধ নিতে।

চলবে…..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here