প্রাচীর #নূপুর_ইসলাম #পর্ব- ১৭

0
2

#প্রাচীর
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব- ১৭

নিশাত সজলের রুমে উঁকি দিলো। তার হাতে গামছা আর টুথব্রাশ। বাথরুমে মামা গিয়ে বসে আছে। তাই ভাবলো একটু হালচালের খবর নেওয়া যাক। গতকাল সে ঘুমিয়েছে অনেক আগে। তাই মামা আসার পরে কি মিটিং হলো সেই আপডেট এখনো বলা যাচ্ছে না। তবে সকালে সব স্বাভাবিক’ই দেখলো। মা রান্না ঘরে নিজের মতো কাজ করছে, মামি মামাকে দেখানোর জন্য কাজ না করেই চরকির মতো ঘুরছে। সাবা কে দেখলো অনেকদিন পরে বই নিয়ে বসেছে। হয়ত পরীক্ষা টরীক্ষা হবে। পরীক্ষা ছাড়া এই মেয়ে পড়ালেখার ধারের কাছেও নেই। এই নিয়ে এই বাড়িতে কারো মাথা ব্যথাও নেই। যার যার মতো সে চলছে।

সজল এখনো বিছানা ছাড়েনি। নিশাতকে উঁকি দিতে দেখলো। এই মেয়ে জীবনেও ভালো হবে না। সে উঠতে উঠতে বললো, — ভেতরে আয় নিশু।

নিশাত হাসলো! হেসে ভেতরে আসতে আসতে বললো, — জেগে আছো নাকি?

— না ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কথা বলছি।

নিশাত ভেতরে এলো! চেয়ার টেনে বসতে বসতে বললো, — দোকানে বসছো আবার?

— হ্যাঁ। না বসে উপায় কি? লেখাপড়াতো শেষ করিনি। আর করবো টাই বা কি?

— বিয়ে করবে? মেয়ে টেয়ে দেখবো ?

সজল রাগী চোখে নিশাতের দিকে তাঁকালো।

— এভাবে তাঁকাচ্ছো কেন? নাকি আবার দেবদাস হওয়ার প্ল্যান করছো?

— সাত সকালে মাথা খেতে এসেছিস?

— তোমার মাথা খেয়ে আমার লাভ কি?

— তাহলে এসেছিস কেন?

— একটা কাজে।

— কি কাজে?

নিশাত কিছু বলবে তখনি কলিংবেল বাজলো। নিশাত বড় একটা শ্বাস ফেলে বললো। এই কলিংবেল আমার দুশমন সজল ভাই। যখনি ইম্পোর্ট্যান্ট কোন কথা বলতে যাই। তখনি ঘন্টার মতো আমার মাথার উপরে ঢং ঢং করে বাজতে থাকে। আর তোমার ক্যাংগারু বোন লাফাতে লাফাতে দরজা খুলবে। খুলেই দৌড়! পুরো বাড়ির আনাচে কানাচে খবর পার্সেল করবে।

হলোও তাই সাবা দৌড়ে এলো। নিশাত বিরক্ত মুখে বললো, — দেখলে, তো দেখলো। এই মেয়ের পা আমি কোনদিন গলায় ঝুলিয়ে দেই।

সজল হাসলো! সাবা গায়ে মাখলো না। কথা বার্তা যতো কম গায়ে মাখা যায় ততোই ভালো। এই যে নিশাত আপু, সে কি মাখে? মাখে না। দুনিয়া চলে দুনিয়ার মতো, সে চলে তার মতো। তাই সাবাও চলবে সাবার মতো। সে ঠোঁট টিপে হেসে বললো, — দুলাভাই এসেছে আপু।

সজলের মুখটা মলিন হলো। মন সেটা বড়ই আজব জিনিস। জানে তোমার না, তবুও মুখ ফেরাবে না। দোকানে বসে যখন মায়ের ফোন পেলো। নিশাত এসে হাজির। তার টেনশন হওয়ার কথা। হলোটা কি? তা না হয়ে হলো উৎফুল্ল। পাপী মন! তার ধারণা এই মন না থাকলে দুনিয়ায় কোন পাপ কাজ হতো না।

সে আবার কাঁথা টেনে শুতে শুতে বললো, — যাওয়ার সময় দরজাটা চাপিয়ে দিয়ে যাস।

নিশাত যেমন থাকে তেমনি রইল। সাবার দুলাভাই আসার খুশিতে তাকে তেমন বিচলিত দেখা গেল না। সে এগিয়ে সজলের পায়ের কাছে বসলো। বিরক্তি মাখা কন্ঠে বললো — শুলে কেন? ওঠো। আমার কথা আছে।

— তোর জামাই এসেছে।

— এসেছে তো কি হয়েছে। কোলে নিয়ে দরজায় খিল দিয়ে বসে থাকবো। এই সাবা যা দুলাভাইয়ের কাছে যা। শালি আধি ঘরওয়ালি। যা আধা ঘর আপাতত সামলা। আর তুমি ওঠো আমার কথা আছে।

সজল আবার উঠল! কোন কাজ আবার তার ঘাড়ে ফেলবে কে জানে? সাবা মুখ বাঁকিয়ে চলে এলো। দুলাভাইয়ের ধারের কাছে ঘেঁষবে কি? দেখলেই কলিজা ফাঁটে। আহারে! সে কি আর একটু লম্বা টম্বা হবে না?

ওয়াহিদ বসেছে খাটে। এই চেয়ারে বসার সাহস তারও হয়নি। তবে জালাল উদ্দিন আরামছেই বসে আছে। হেনা তার পাশে দাঁড়িয়েই গদগদ করছে। জামাই যখনই আসে হাত ভরে জিনিস পত্র আনে। জামাইয়ের হাত ভালো। টাকা থাকলেও মানুষের কলিজা থাকে না। তবে এর আছে। আর এমন সোনার টুকরো জামাই পেয়েও এই মেয়ে লক্কর ঢক্কর করে। যে জামাই নিয়ে সে সংসার করছে। এমন একটা জুটলে বুঝতি রে ছেরি, কত ধানে কত চাল।

জালাল ধমকে বললো, — এখানে দাঁড়িয়ে গদগদ করছো কেন? যাও জামাইয়ের জন্য নাস্তা লাগাও। সুলতানা কই? সারা জীবন ঘরের ভেতর কচ্ছপের মতো বসে থাকলে হবে। আর নিশাত কই?

ওয়াহিদ ঘড়ির দিকে তাকালো। তার হাতে সময় আছে দু- ঘন্টা। সিঙ্গাপুরের নতুন একটা কম্পোনির সাথে তারা যুক্ত হচ্ছে। তার জন্যই আজকে মিটিং আছে। অথচ আধা ঘন্টা এমনিতেই চলে যাচ্ছে। এই মেয়ের খবরও নেই। তাছাড়া এই সপ্তাহের মধ্যে সব কাজ গুছিয়ে ফেলবে। বিয়ের রিসিপশনটা করা দরকার। নেক্সট উইকে প্ল্যান আছে, নিশাত কে ও বলা দরকার। তা না হলে যে মেয়ে, দেখা গেলো নিজের বিয়ের রিসিপশনে নিজেই নেই।

সে ঘড়ি থেকে চোখ ফিরিয়ে বললো, — এসবের প্রয়োজন নেই আঙ্কেল। নিশাতকে একটু আসতে বলুন। একটু কাজ ছিল।

এই ধিঙ্গি মেয়ের কথা আর বলো না। গেলো টা কোথায়? কোন সমস্যা হয় নি তো? অবশ্য এই মেয়ের ভরসা নেই। পুরো দুনিয়াকে অশান্তিতে রেখে শান্তিতে কাজ কারবার করার বহুত নাজির আছে। বড় করলাম তো আমরাই। তাই বাবা সাবধানে থেকো।

— জ্বি না! কোন সমস্যা নেই।

— না থাকলেতো ভালোই। তবে টেনশনে মরি! কপাল পোড়াতো এদের, তার মধ্যে আবার দিতে থাকে ডিগবাজী।

তখনই সাবা এলো! জালাল উদ্দিন ধমকে বললো, — নিশাত কই রে?

সাবা ও নিজের মতো বললো, — আমি জানি না।

— জানি না মানে? দেড় ইঞ্চি ঘর। এই ঘরে এক মানুষ লাপাতা হয় কেমনে?

সাবা উত্তর দিলো না। বেশি উত্তর দিলে জ্বালা আছে। চাপা খুলে হাতে আসতে পারে। নতুন দুলাভাইয়ের সামনে দরকার কি বেইজ্জতির।

— যা জামাইকে নিয়ে ঘরে বসা। আমি দেখছি, কোথায় গেলো। বলেই তিনি তার সাইজের চেয়েও বিশাল এক হুংকার ছাড়লেন। অবশ্য এই হুংকারে কারো কিছুই এলোগেলো না। যে যার মতো যেখানে আছে সেখানেই রইল।

ওয়াহিদ তাঁকিয়ে তাঁকিয়ে এই বাবা মেয়ের কনভার্সেশন দেখলো। এই বাড়ির প্রত্যেক মানুষের মাথায় গড়বড় আছে। সে উঠে দাঁড়িয়ে রুমের দিকে গেলো। যেতে যেতে সাবাকে বললো, — নিশাতকে গিয়ে আসতে বলো সাবা। আমার ইমার্জেন্সি কাজ আছে।

সাবা আবার গেলো। গিয়ে অবশ্য কিছু বললো না। আপু আর সজল ভাইয়ের মাঝে চুপচাপ বসে রইল। নিশাত আপু হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে কথা বলছে। দেখতে ভালো লাগছে। ইশ! তার আপুটা। এই বদ দুলাভাই না এলে সজল ভাইয়ের সাথে কাহিনী ঠিক হয়ে যেতো।

ওয়াহিদ নিশাতের রুম ঘুরে ঘুরে দেখলো। তেমন কিছু অবশ্য নেই। একটা খাট, আলমারি, আলনা আর একটা ছোট্ট পড়ার টেবিল। সম্ভবতো সাবার! বই টই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।

সুলতানা নাস্তা নিয়ে এলো। ওয়াহিদ সালাম দিলো। সুলতানা সালাম ফিরিয়ে বললো, — দাঁড়িয়ে আছো কেন? বসো!

ওয়াহিদ বসলো! সুলতানা অবশ্য বসলো না। বসে বলবেই বা কি? তার মাথায় আসে না। ছোট বেলা এই বিয়ের সব কিছু করেছিল কায়সার ভাই আর নাজিম। নাজিমের তেমন হেলদোল না থাকলেও কায়সার ভাই নিশাতকে নেবে মানে নেবেই। তিনিই ঠিক করলেন বিয়ে দেবেন। মুখের কথার নাকি পরে জোর থাকে না।

আসলেই থাকে না। যদি মুখে মুখে কথা হতো। আজ কি এমন কিছু হতো? হতো না! সবাই তিন কুবুলকে শুধু তিনটা শব্দ মনে করে। আসলে এই তিনটা শব্দের মধ্যে আল্লাহর রহমত থাকে, শক্তি থাকে, আল্লাহর ক্ষমতা থাকে। থাকে বলেই সাত সমুদ্র তেরো নদীর পারে থাকলেও তারা বেঁধে থাকে। সম্পূর্ণ অচেনা দুটো মানুষকে এক করে ফেলে। আবার চোখের সামনে না থাকলেও এমন এক টান তৈরি করে। মানুষটা থাকা না থাকায় কিছু আসে যায় না। সে তাকে ভেতরে ধারণ করবেই।

সুলতানার মনে হয় এই ছেলেটার ভেতরে আল্লাহ সেই টান তার মেয়ের প্রতি তৈরি করেছে। করেছে বলেই এই ছেলেটা এই বিয়েটা ভুলতেই পারেনি। তা না হলে বিয়ে করেই বিয়ের কথা কেউ মনে রাখে না। আর এই পুতুল বিয়ের মতো বিয়ে কে মনে রাখে। তার মেয়েই রাখেনি। শুধু আধা পাগল বলে। তার তো ধারণা, এই রকম মাথার তার ছেঁড়া টেঁড়া না হলে, এতদিনে তার মতোই প্রেম ট্রেম করে বিয়েও করে ফেলতো। যে বিচ্ছুর বিচ্ছুরে বাবা।

সে এগিয়ে চেয়ার নিয়ে ওয়াহিদের সামনে রাখলো! ঘরে তো আর কিছু নেই। রাখবেই বা কিসে। নাস্তার ট্রে চেয়ারে রাখতে রাখতে বললো, — আমি নিশাতকে পাঠিয়ে দিচ্ছি। তুমি নাস্তা নাও।

— আপনি বসুন আন্টি। আমাকে নিয়ে ব্যস্ত হওয়ার কিছু নেই।

সুলতানা হালকা হাসলো! কায়সার ভাইয়ের গুণ পেয়েছে। তিনি ছিলেন মাটির মানুষ, ছেলেও তেমন। তাই হেসে বললো, — তুমি নাস্তা নাও! আমি ওকে পাঠিয়ে দিচ্ছি বলেই বেরিয়ে গেলো।

ওয়াহিদ চায়ের কাপ হাতে তুলে নিলো। চুমুক দেবে তখনই মহারাণী এসে হাজির। হাতে গামছা, টুথব্রাশ। এসব নিয়ে কোথা থেকে ঘুরে এলো কে জানে। সে না তাকিয়েই চায়ে চুমুক দিলো। তার চায়ের অভ্যাস নেই। তবে খেতে ভালো লাগছে।

নিশাত এগিয়ে বললো, — আমিতো সন্ধ্যায় যেতাম’ই। বিয়ে করেছি মামার বাড়ি পরে থাকার জন্য তো না। আবার এসে ঝামেলা তৈরি করছেন কেন? আমি আগেই বলেছি জামাই আদর টাদর এখানে আশা করবেন না ।

— অন্য কিছু আশা করলে পাবো?

— আমার সাথে ডাবল মিনিংগিরি করতে আসবেন না।

— করলে কি করবে, ঘুষি মেরে নাকের মানচিত্র বাদলাবে?

— করলে করতেও পারি।

— প্লিজ! একদিন করে ফেলো তো।

— কেন?

ওয়াহিদ উত্তর দিলো না। আরেকবার চায়ে চুমুক দিলো। নিশাত দু- হাত বুকে বেঁধে বিরক্ত মুখে বললো, — কথা বলছেন কেন?

ওয়াহিদ চায়ের কাপ রাখলো। রেখে উঠে দাঁড়ালো। এগিয়ে দাঁড়ালো নিশাতের সামনে। নিশাতের পেছনে টেবিল। দু- সাইডে হাত রেখে একটু ঝুঁকে বললো, — বললে হজম হবে?

নিশাত আগের মতোই দাঁড়িয়ে রইল। দাঁড়িয়ে বললো, — হজম টজমের কথা আমায় বলে লাভ নেই। আমি কচি খুকি না। বরং একটু চোখ ঘুরাই আপনার’ই বদহজম হয়ে যাবে।

— আচ্ছা?

— জ্বি?

— ঘুরাও দেখি?

— আমাকে গাধা মনে হয়?

— একদম না।

— তাহলে সরে দাঁড়ান। পা নিশপিশ করছে আমার। পরে ঊনিশ থেকে বিশ হলে, বংশ রক্ষা করতে কষ্ট হয়ে যাবে।

ওয়াহিদ ঠোঁট টিপে হাসলো! হেসে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। দাঁড়িয়ে সময় দেখলো। এই সময়, এতো দৌড়ে যাচ্ছে কেন? সে সময় দেখে বললো, — অফিসে যাবে?

— হ্যাঁ!

— আমি বসছি। রেডি হয়ে এসো।

— আপনার সাথে যাবো না।

— কেন?

— লাভ নেই তাই।

— মাহফুজের সাথে আছে বুঝি।

— হ্যাঁ।

— ভালো! কালকে কথা দিয়ে বাসায় ফেরোনি কেন?

— আমাকে এতো ভালো বউ মনে করার কারণ কি?

— কোন কারণ নেই।

— সেটাই! এখন আসুন। সময় মত আমি ঠিক পৌঁছে যাবো। বলেই নিশাত বেরুতে গেলো। তাকে রেডি হতে হবে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এতো খেজুরের আলাপের দরকার কি? তখনই কিসের মধ্যে পা বাজলো কে জানে। সে উড়ে পড়তে গেলো। এই পড়া পড়লে নাক, মুখ আর আস্ত থাকতো না। তবে ওয়াহিদ ধরে ফেললো! একে অবশ্য শুধু ধরা বলা চলে না। বলতে গেলে ঝাপটে ধরেছে।

নিশাত আবাক হয়ে বললো, — আপনি আমাকে লেং মেরেছেন?

ওয়াহিদ আগের মতোই হাসলো! আরেকটু ভালো ভাবে জড়িয়ে ধরতে ধরতে বললো, — আমাকেও এতো ভালো ভাবার কারণ কি?

কোন কিছুকে গোনায় না ধরা নিশাত রাগে থরথর করে কাঁপতে লাগলো। কেঁপেই যতো শক্তি আছে পা উঁচু করতে গেলো। ওয়াহিদ সেই পা ধরেই তাকে শূণ্যে তুলে ফেললো! কপালের সাথে কপাল মিলিয়ে বললো, — রোবট থেকে মানুষ বানালাম মাত্র। এই যে রাগে কাঁপছো, রোবট কাঁপে বুঝি? এরপর ধীরে ধীরে নারীও বানিয়ে ফেলবো। আর সেই নারীর একমাত্র অনুভূতি হবে এই আবরার ওয়াহিদ।

চলবে……

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here