প্রাচীর #নূপুর_ইসলাম #পর্ব- ১৯

0
2

#প্রাচীর
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব- ১৯

নিশাত বাসে বসেই জানালা দিয়ে ওয়াহিদের গাড়িটা দেখলো। বাস থামতেই সে চোখে সানগ্লাস টানগ্লাস লাগিয়ে একশো পার্সেন ভাবওয়ালা ভাব নিয়ে গাড়ি থেকে নামলো। গায়ে কালো টিশার্ট, জিন্স। দৃষ্টি বাসের দিকে। সে চেলচেলিয়ে নিচু হয়ে গেলো।

আজকে তার ফেরার কথা ওয়াহিদ জানে। তবে কখন জানার কথা না। তার সব খবরা খবর এই লোকের হাতে থাকে। থাকুক! সেও দেখতে চায় কত খবরা খবর নিতে পারে। নিয়ে কোন ঘোড়ার ডিম করতে পারে।

তার পাশে বসেছে সুজানা নামের একটা মেয়ে। এখনো বিয়ে হয়নি। এই বাস ভর্তি তাদের’ই মতো বিভিন্ন ব্রাঞ্চের লোক। এই তিনদিনে অনেকের সাথেই ভালো পরিচয় হয়েছে। সুজানাও সেই দলের। সে চোখে মুখে মুগ্ধতা নিয়ে বললো, — লোকটা কে গো। দৃষ্টিততো আমাদের বাসের পানেই। বলেই পুরো বাসে একবার চোখ বুলালো। বুলিয়ে বললো, — কারো ভাই টাই নাকি? এমন মালদার পাটি হয়ে এই সামান্য চাকরিও কেউ করে আমার তো জানাই ছিল না।

নিশাত উত্তর দিলো না। মোবাইল বের করে মোবাইলে ধ্যান দিলো। সবাই নামুক! ধীরে সুস্থে নামা যাবে। তাছাড়া এই বেটাকে সবার সাথে পরিচয় করার কোন ইচ্ছা তার নেই। তাই সে সিটটা নামিয়ে আরেকটু আরাম করে বসলো।

সুজানার ধ্যান জ্ঞান সব ওয়াহিদের দিকে। অবশ্য শুধু তার না। যারা যারা নামছে সবাই একবার হলেও তাঁকাচ্ছে। সবাই মোটামুটি মধ্যবিত্ত ফ্যামিলির। এমন ভাবওয়ালা দেখলে তাঁকাবে এটাই স্বাভাবিক।

সুজানা জিনিস পত্র গুছাতে গুছাতে আফসোস নিয়ে বললো, — দুনিয়ার সব হ্যান্ডসামরাই টাকা পয়সার কুমির হয়ে বসে আছে। আমাদের মতো গরীবদের কি হবে বলো তো?

নিশাত মোবাইলে চোখ রেখেই বললো, — হ্যান্ডসাম হতে কখনো টাকা লাগে না বরং টাকা পকেটে থাকলেই যদু, মদু, কদু সবাই হ্যান্ডসাম।

— বলেছে তোমাকে! এই বান্দাকে দেখো, আমার তো ধারণা ছেঁড়া লুঙ্গিতেও একে গরম তাওয়ার মতো হট মনে হবে। আর তার অ্যাডামস অ্যাপল! উফ! সব ছেলেকে কিন্ত মানায় না। একে কেমন মানিয়ে গেছে।

নিশাত চোখ তুলে তাঁকালো! ওয়াহিদ তাদের এক স্যারের সাথে হাত মিলিয়ে হেসে কথা বলছে। তার অ্যাডামস অ্যাপেল তার হাসি, ঠোঁটের সাথে উঠানামা করছে। আশ্চর্য! এতদিন হলো তার তো কিছু চোখেই পড়েনি। সে ভাবার চেষ্টা করল। চেষ্টা করে যা বের হলো তা হলো, সে এই বান্দার সাথে একই বাড়িতে, একই রুমে তাছাড়া মারামারি টাইপ জাপটা জাপটিও হয়ে গেছে। তবুও এখনো ভালো ভাবে নোটিশ ও করেনি। আহারে বেচারা! কতো মেয়ে পাগল, আর এমন বিয়ে করলো, বউ পাগল হবে দূরের কথা সামান্য নোটিশও করছে না।

সে আফসোস করতে করতেই আবার মোবাইলে ধ্যান দিলো। সুজানা গুছিয়ে উঠতে উঠতে বললো, — আসি নিশাত! ভালো থেকো।

নিশাত হেসে বিদায় জানালো। সুজানা বের হবে তখনি ওয়াহিদ বাসের ভেতরে এসে দাঁড়ালো! এসে বললো, — নিশাত?

সুজানা হা হয়ে গেলো। হা হয়েই বললো, — আপনি নিশাতের রিলেটিভ নাকি?

ওয়াহিদ হালকা হাসলো! হেসে বললো, — হাজবেন্ড।

সুজানার হাত থেকে ব্যাগ পড়ে গেলো। সুজানা কোন রকম উঠিয়ে নিশাতের দিকে তাঁকালো। কি মেয়েরে বাবা। সে উঠেই তাড়াহুড়ো করে নামলো। ছি ছি কি লজ্জার ব্যাপার। বউয়ের সামনে জামাইয়ের দিকে কু- নজর। আল্লাহ মাফ করো।

বাস প্রায় ফাঁকা! ওয়াহিদ এসে বললো, — নামার ইচ্ছে নেই?

— ছিল! তবে আপনাকে দেখে ইচ্ছা মরে গেলো।

— ভালো! বলেই নিশাতের পাশের ছিটে বসলো।

সাথে সাথেই নিশাত দাঁড়িয়ে গেলো। দাঁড়িয়ে বললো, — চলুন যাওয়া যাক।

— বসো নিশাত।

— বাসতো আমার মামার বাড়ির না। বউ নিয়ে আরামে বসে থাকবেন।

— মামার বাড়ির হোক আর নিজের , বউ নিয়ে আরামে বসবো সেই কপাল আমার নেই।

— একদম সত্য বাণী। কোন ভেজাল নেই। এবার উঠুন।

ওয়াহিদ হাত ধরে টেনে বসালো। নিশাত হাতের দিকে তাঁকিয়ে বললো, — কোন চান্স মিস হতে দেন না, না ?

— বউয়ের হাত ধরার জন্য আবার চান্স প্রয়োজন হয় নাকি। আমার নামে দলিল, আমার ঘরে, আমার রুমে বসবাস। তাকে ছোঁয়ার জন্য চান্স না, ওয়াহিদের ইচ্ছেই যথেষ্ট।

— নিজের নাম, দাম নিয়ে এতো অহংকার কেন আপনার? যখন, তখন হাজার কিলো ওজন নিয়ে ওয়াহিদ! আবরার ওয়াহিদ বলে বলে আমার ঘাড়ের উপরে ফেলতে থাকেন। শাহরুখ খানের টুকু আর বাদ রাখেন কেন? ওয়াহিদ, আবরার ওয়াহিদ সাথে বলবেন, নাম তো সুনাই হোগা।

— আমার সব কিছুতে তোমার এতো এলার্জি কেন?

— থাকবে না? এত কষ্ট করে পড়ালেখা করে, চাকরি করে আমরা ভাব ধরতে পারি না। আর বসেন তো বাপের অফিসে। এত ভাব আসে কোথা থেকে বলেন?

ওয়াহিদ ফুস করে শ্বাস ফেললো! ফেলে বললো, — আমার কোনো জিনিস তোমার পছন্দের তালিকায় আছে?

— একদম না। আবার পরেছেন সানগ্লাস। সানগ্লাস তো ঠিক আছে ব্র্যান্ডের ব্র্যান্ডের। তবে যখনি আপনার মুখের দিকে তাঁকাচ্ছি এটা ভেঙে ফেলতে ইচ্ছে করছে। খুলেন, এক্ষুনি খুলেন। এত দামী একটা সানগ্লাস কোন সময় আমার হাতে ভেঙে যায়। আল্লাহ না করুক। আমার কাছে টাকার পয়সার মূল্য আছে।

ওয়াহিদ খুললো না, তবে উঠে দাঁড়ালো। নিশাতও উঠতে উঠতে বললো, — আপনি এসেছেন কেন? আমি বলেছি আপনাকে আসতে।

ওয়াহিদ উত্তর দিলো না। গত তিনদিন এই মেয়ে একবারের জন্য তার ফোন ধরে নি। তখন তার ইচ্ছে করেছে সোজা গিয়ে তুলে নিয়ে আসি। তবে কতো কষ্টে নিজেকে দমিয়েছে সে জানে।

সে এক হাতে নিশাতের ব্যাগ আরেক হাতে নিশাতের হাত ধরেই বাস থেকে নামলো। নিশাত বিরক্ত নিয়ে বললো, — এমন বাচ্চা পুলাপানের মতো হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন কেন? আপনার কি ধারণা, আমি রাস্তা- ঘাটে চলাচল করতে পারি না?

— তুমি সবই পারো নিশাত। বরং আমি যা পারি না তাও পারো। আর সেটাই ভয়। বলেই নিশাতকে গাড়িতে টেনে বসালো। বসিয়ে ড্রাইভিং সিটে নিজে গিয়ে বসলো।

বসতেই নিশাত বললো, — আজকে আপনার পেয়াদা কই? সব সময় তো বগলতলায় নিয়ে ঘুরেন।

ওয়াহিদ গাড়ি এক টান মেরে বললো, — আমি আমার বউয়ের কাছে, তাই তাকেও পাঠালাম বউয়ের কাছে।

— আজকে না রিসিপশন। এর জন্য না এতোদিন মরে গেলেন। এখন আবার একেক জন, একেক জনের বউয়ের জন্য এতো মরে যাচ্ছেন কেন?

— আপাতত সেটা ক্যানসেল।

— যাক! বাঁচলাম। এতো ঢং আমার গায়ে সয় না।

— নেক্সট উইকে।

— ধুর! বলেই হাই তুললো! ভোরে রওনা দিয়েছে। ঘুম ঘুম লাগছে। তার হাই দেখে ওয়াহিদ বললো, — ঘুমালে খবর আছে?

নিশাত ভ্রু কুঁচকে বললো, — ঘুমালে খবর আছে মানে কি? আমি এখন নিজের ইচ্ছায় ঘুমাতেও পারবো না?

— না।

— তো কি করবো? বসে বসে আপনার চেহেরা দেখবো।

— দেখতেও তো পারো।

নিশাত মুখ বাঁকালো! বাঁকিয়ে জানালার দিকে একটু কাত হলো। তার ঘুমের কোন ইচ্ছা ছিল না। তবে খবরের কথা শুনে ঘুম তো অবশ্যই দরকার। সে আরাম করে শুলো। শুতে শুতে বললো, — গুড নাইট আবরার ওয়াহিদ। নাম তো সুনাই হোগা।

ওয়াহিদ ঠোঁট টিপে হাসলো! হেসে এমন এক ইউটার্ন নিলো। নিশাত এক জটকায় ওয়াহিদের গায়ের উপরে এসে পড়লো। ওয়াহিদ সাথে সাথেই এত হাতে জাপটে ধরলো। নিশাত স্তব্ধ হয়ে আছে। স্তব্ধ হয়েই বললো, — একবার অ্যাক্সিডেন্ট করে মন ভরেনি?

— ভরেছিল তবে তুমি বললে আবার হানিমুনে জাহান্নামে যাবে। ব্যবস্থা তো করতে হবে তাই না। বউয়ের স্পেশাল চয়েজ বলে কথা।

নিশাত দাঁতে দাঁত পিষলো। ওয়াহিদ সেইদিনের মতোই আলতো করে কপালে ঠোঁট ছোঁয়ালো। নিশাত আগের মতোই বললো, — এই না শরীর লাগবে না।

ওয়াহিদ নিশাতকে আস্তে করে সিটে বসিয়ে দিলো। দিতে দিতে বললো, — লাগলো কোথায়? এটা মহব্বত ছিল। এতো কিছু বোঝ আর কোনটা মহব্বত এটা বোঝ না।

চটাং চটাং উত্তর দেওয়া নিশাত আজ উত্তর দিলো না। আগের মতোই কাত হয়ে জানালার দিকে তাঁকালো। স্বচ্ছ আকাশে রোদ ঝিলমিল করছে। সেই ঝিলমিল করা রোদের দিকে এক পলকে তাঁকিয়ে রইল। তাঁকাতে তাঁকাতেই চোখ বন্ধ করলো। করতেই চোখের সামনে ভাসলো, সেই এগারো বছরের নিশাত। ঝুম বৃষ্টি, কারেন্ট নেই, অন্ধকার রাত। সেই অন্ধকার ঢেলে সিঁড়ি দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে যাচ্ছে। জোরে জোরে কড়া নাড়ছে আর কেঁদে কেঁদে চিৎকার করে বলছে, ” দরজা খোল আন্টি, দরজা খোল। মা মরে যাচ্ছে। ”

নিশাত সাথে সাথেই চোখ খুললো। খুলে ওয়াহিদ যেখানে ঠোঁট রেখেছে সেখানে হাত দিয়ে মুছে ফেললো।

_____

সুবর্ণার চোখটা লেগে গিয়েছিল, ঘুমটা ছুটে গেলো দরজায় কারো নক পড়তে। সে চোখ খুলে দেখলো নিশাত দাঁড়িয়ে আছে। তাকে চোখ খুলে তাঁকিয়ে দেখতেই ভেতরে এসে গদগদ হয়ে বললো, — এখন কেমন আছেন মা? এটা কোন কথা, শুকনো মাটিতে পড়ে মাথা ফাটিয়েছেন। দেখো কান্ড! এই কথা শুনে আর টেকা যায় বলেন? খেতে পারি না, ঘুমতে গেলে বুক ধড়পড় করে। আহারে! বয়স্ক মানুষ! এ বয়সে হাড্ডি ভাঙলে আর জোড়া লাগে? সারা জীবনের জন্য কুক্কর কু। ও তো আল্লাহর রহমত মাথার উপর দিয়ে হালকা গেছে। চার দিনের কোর্স! তিন দিনে কোন রকম করে দৌড়ে এলাম। জানে পানি আছে আমার। এই যে এখন আপনাকে দেখে একটু আত্মাটা ঠান্ডা হলো।

সুবর্ণা উত্তর দিলো না। সে নিশাতের দিকে একপলকে তাঁকিয়ে রইল। তখনি আফসানা হক এলেন। মেয়ের এই অবস্থা তারা না এসে পারে। সে ধীরে ধীরে মেয়ের পাশে বসলেন। বসে বললেন, — এতো ঢংয়ের অভিনয়ের ট্রেনিং কে দিয়েছে তোমার মা?

নিশাত আগের মতোই বলল, — কি যে বলেন না নানু। সে যদি এতো ছলা কলার অভিনয় জানতো তাহলে আজ তার এই দশা হয়?

— তা ঠিক! বেটা মানুষকে বাঁধতে ছলা কলাই লাগে। এই যে কি সুন্দর আমার নাতিরে বেঁধে রাখছো। বউ যা বলে তাই ঠিক।

— আপনাদের মতো পারি কই নানু? শুধু জামাই হাতে রাখলে চলে, রাখতে হয় পুরো গুষ্টিকে। যেমন মা রাখেন। ইশ! কত কিছু যে শেখার আছে তার কাছ থেকে।

— চুপ কর অপয়া মেয়ে কোথাকার। বাড়িতে আসতে না আসতেই ধ্বংস শুরু হয়েছে। তোমার জন্য আমার মেয়ের জন্য আজ এই অবস্থা।

নিশাত শান্ত ভাবে কিছুক্ষণ তাঁকিয়ে রইল! তারপর সব সময়ের মতো হাসলো। হেসে বললো, — একদম ঠিক।

— মানে?

— মানে আপনি একদম ঠিক বলেছেন নানু। আমি’ই হয়তো অপয়া। বলেই চোখের কোণা মুছলো।

সুবর্ণা আগের মতোই তাঁকিয়ে রইলো। ওড়নার কোণা দিয়ে মুছা চোখের কোথাও পানির ছিটাফোঁটাও দেখা গেলো না। বরং তার জন্য এসব হওয়ায়, সুবর্ণার কাছে খুশি খুশি’ই মনে হলো। তাই যেমন ছিলেন তেমনি রইলেন। তবে আজ এতোটুকুও রাগলেন না ।

তখনি সুন্দর মতো একটা মেয়ে ট্রে করে স্যুপ নিয়ে এলো। সুবর্ণার পাশে বসে বললো, — ওঠতো খালামণি! ঔষুধের সময় হয়েছে। স্যুপটা খেয়ে ঔষুধটা খেয়ে নাও। তা না হলে ওয়াহিদ ভাই কিন্তু খুব রাগ করবেন। আমাকে পই পই করে বলেছেন। একটু ঊনিশ বিশও যেন না হয়।

সুবর্ণা হেসেই উঠে বসলেন! তার চোখ মুখ থেকে এখন খুশির ঝিলিক ছলকে ছলকে পড়ছে। সেই পড়ার মাঝেই বললেন, — নিশাত এটা লামিয়া। আমার চাচাতো বোনের মেয়ে। ঐ যে একদিন বললাম। ওয়াহিদের জন্য আমার খুব মনে ধরেছিল। তবে কপাল! বাবা, মা ছেলেমেয়ে কে সব সময় দিতে চায় বেষ্ট জিনিস। আর ছেলেমেয়েরা.. যাক সেসব বলে আর লাভ কি? মেয়েটা আমার কথা শুনে দৌড়ে এসেছে। এই তিনদিন আমি তো ভালো’ই পুরো সংসারটা আগলে নিয়েছে। আর তোমার একটু ফোন করারও সময় হলো না। যাক হয়ত আমার ছেলেই নিষেধ করেছে। না পেয়ে, বউ পেয়েছে। তার জন্য সাত খুন মাফ। বলেই স্যুপের বাটি এগিয়ে নিলেন। মুখে তুলে বললেন, — ইশ! তোর হাতের তুলনা হয় না রে মা। বেঁচে থাক! আল্লাহ মনের সব আশা পূরণ করুক।

নিশাত আগের মতোই হাসলো! হেসে বললো, — ভালো আছো লামিয়া?

লামিয়াও হাসলো! হেসে বললো, — একদম।

চলবে……

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here