“অচিনরেখা”
বিনতে ফিরোজ
৪.
কিছুই পাল্টায়নি। মেহরিমার চুলগুলো হালকা ঢেউ খেলানো ছিল। আজও ওরকমই আছে। ভেজা চেহারায় কিছু চুল আটকে গেছে। সানন্দেই। ডান চোখের পাশের ছোট্ট তিলটা মনোযোগ কেড়ে নিচ্ছে। ঠিক আগের মতো। মেহরিমা ওর চোখজোড়ায় বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে। ঠিক যেভাবে তাকিয়ে ছিল দাদা আফজাল বিশ্বাস হাতে আংটি পরিয়ে দেয়ার সময়। শাহরিয়ার যেন মুখস্থ পড়া রিভিশন দিলো। ঠিক ওভাবেই দেখলো মেহরিমাকে।
“এই আপা! কেমন আছো?” রুমির ঝাকুনিতে কেঁপে উঠল মেহরিমা। ঝট করে সামনে ঘুরে গেলো। তার জিভ আটকে আসছে।
“ভা..ভালো।” তড়িঘড়ি করে স্কার্ফ খুলে সেটা মাথায় জড়াতে চাইলো। হলো তার উল্টো। দুভাজের স্কার্ফটা পেঁচিয়ে দড়ি হয়ে গেল।
“এমন করছ কেন? মনে হচ্ছে তুমি পার্কিনসনের রোগী।” বাস্তবিকই মেহরিমা থরথর করে কাঁপছে। অর্ধযুগ অদর্শনের পর সম্মুখ সমরের হঠাৎ সাক্ষাতে মেহরিমা আচরণ কি স্বাভাবিক নয়?
“গলায় তো ফাঁস লেগে যাবে। দেখি আমি ঠিক করে দিচ্ছি।” সহজেই স্কার্ফটা টেনে নিয়ে মাথায় চড়িয়ে দিলো রুমি। মেহরিমার হাত মুঠোয় নিয়ে বলল, “কত্তদিন পর দেখা হলো বলো তো আপা!”
“সাত বছর।” বিড়বিড় করে বলল মেহরিমা।
“ছয় বছর নয় মাস তিন দিন।” স্পষ্ট কণ্ঠে বলল শাহরিয়ার। মেহরিমা ছলছল চোখে তাকালো। কেন কে জানে। সেই চোখে ভাসা জলের আধারে শাহরিয়ার নিজের জন্য আশা খুঁজে পেল।
“কেমন আছিস মেহরিমা?” মেঘস্বরে জিজ্ঞেস করল শাহরিয়ার।
মেহরিমা কিচ্ছু বলল না। তাকালো না পর্যন্ত। মুখ ঘুরিয়ে উঠানের দিকে দৃষ্টি তাক করলো। অভিমানের পাহাড় আকাশ ছুঁয়েছে। তার চূড়ার বরফ কি এতো সহজেই গলবে!
শাহরিয়ারের মুখের হাসি সরে গেলো। একটু আগেই যেই আশা জেগে উঠেছিল সে যেন হঠাৎ করেই মরিচিকায় রূপ নিল। শাহরিয়ার বুঝতে পারছিল তার উপস্থিতিতে মেহরিমা সহজ হতে পারছে না। কিন্তু মুখ ঘুরিয়ে নেয়ার দৃশটুকু তাকে আর দাঁড়িয়ে থাকতে দিল না। এক পলক মুখটা দর্শন করে সে ঘরে চলে গেলো।
দরজা লাগানোর শব্দে শ্বাস ফেললো মেহরিমা। নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলো। রুমির দিকে তাকাতেই দেখলো সে হাসিমুখে তাকিয়ে আছে।
“কেমন আছিস রুমি?”
“এতক্ষণে আমাকে দেখলে তুমি!” মেহরিমাকে জড়িয়ে ধরলো রুমি।
মেহরিমা হা হা করে উঠলো, “আরে আমি ঘেমে আছি একদম!”
“আমিও ঘেমে আছি। এখনও গোসল করিনি। সমান সমান!”
“কখন এসেছিস?”
“আযানের আধা ঘন্টা পর।”
“বড় হয়ে গেছিস রুমি।” রুমির মাথায় হাত রেখে বলল মেহরিমা। তার কণ্ঠের স্নেহ রুমিকে ছুঁয়ে গেলো।
“ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি। আর কদিন গেলে বিয়ে করব।”
“বিয়ে করার অনেক শখ মনে হচ্ছে।”
“অনেক! হলেই তোমার কি? তুমি কি এতদিন আমার খোজ নিয়েছ?” অভিমান ঝরে পড়ল রুমির কিশোরী কণ্ঠ থেকে।
মেহরিমা কি বলবে সে চাচার কাছে ফোন দিয়ে কিভাবে অপমানিত হয়েছে? কস্মিনকালেও তার বাড়ির কাউকে ফোন দিতে চাচা নিষেধ করেছে এটা বলা কি উচিৎ হবে?
“কীভাবে সরি বললে রুমি একসেপ্ট করবে?”
বোনের আহ্লাদে রুমির চোখের জল বাঁধন হারা হলো। মেহরিমার বুকে পড়ে বলল, “তোমাকে অনেক মিস করেছি আপা!”
মেহরিমার বুকটা হু হু করে উঠলো। জাবিনের আগে তো এই মেয়েটাই তার ছোট বোনের জায়গা করে নিয়েছে।
“আমিও মিস করেছি।” চাপা কণ্ঠে বলল মেহরিমা।
“আপা!” একটা তীক্ষ্ম কণ্ঠ ভেসে এলো দুজনের কানে। মেহরিমা দেখলো মেহজাবিন দরজায় দাঁড়িয়ে চোখ ছোট ছোট করে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
রুমি মেহরিমাকে ছেড়ে দিল। নাক টেনে বলল, “যাও ফ্রেশ হয়ে নাও।” পরপর কণ্ঠ নিচু করল, “জাবিন মনে হয় আমাকে পছন্দ করে না। দেখো কেমন দারোগার মতো করে তাকিয়ে আছে!”
মেহরিমা হেসে ফেলল। বলল না জাবিন তাদের কাউকেই পছন্দ করে না। বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে শুধু ঝামেলাই দেখে এসেছে মেহজাবিন। আফজাল বিশ্বাস নামক বটগাছের নিচে তাদের একই সুতোর সম্পর্ক তো মেয়েটা দেখেনি।
ঘরে এসে মেহজাবিনকে জিজ্ঞেস করলো, “এতদিন পর ওরা এলো যে?”
“জমি টমি সব বেঁচে দিতে এসেছে।” একগুঁয়ে কণ্ঠে বলল মেহজাবিন। মেহরিমা থমকে গেলো। এটা সে একদমই আশা করেনি।
“মানে?”
“মানে আবার কি? জমি বেঁচে একেবারে ঢাকায় শেকড় গাড়বে।” ওপাশের ঘরে থেকে শেলীর কণ্ঠ পাওয়া গেলো। বোনের দিকে তাকিয়ে মেহরিমা বলল, “তুই জানলি কিভাবে?”
“দুদিন মানুষ এসে এই জমি, বাড়ি দেখে গেছে। তুই কি দুনিয়ায় থাকিস? যা রুমিকে বুকে নিয়ে আহাজারি কর।”
“ও তোর বড় জাবিন!” কড়া কণ্ঠে বলল মেহরিমা।
শেলী ঘরে এসে বললেন, “ওকে ধমক দিয়ে কি লাভ? এসব খবর আমরা পাড়ার মানুষের থেকে শুনছি। তোর চাচী সারা পাড়ার মানুষের সাথে যোগাযোগ রেখেছে আমাদের সাথেই যত শ-ত্রু-তা।”
মেহরিমার আর ইচ্ছে হলো না কিছু শুনতে। কিন্তু পরেরটুকু তাকে শুনতেই হতো।
“আরো শোন! বংশের বড় ভাই! তোর শাহরিয়ার ভাইয়ের বিয়ে।” খুব স্বাভাবিকভাবে বলে জাবিন টিভি চালু করলো। মেহরিমা নিজের জায়গায় স্থির হয়ে গেলো। সম্ভবত কিছুক্ষণের জন্য তার নিশ্বাসও আটকে গেলো।
“ওদের ঘর পরিষ্কার করে যেই মহিলা সে এসে গল্প শুনিয়ে গেলো ছেলের নাকি খুব বড় ঘরে বিয়ে দেবেন আজাদ বিশ্বাস। আমাদের নাকি মুরোদ নেই মেয়ের জন্য সে চিন্তা করার।” কণ্ঠে বিতৃষ্ণা নিয়ে বললেন শেলী। বুয়াকে দিয়ে তাদের অপমান করায়। এসব সহ্য করবেন কিভাবে?
মেহরিমা খুব মন্থর গতিতে বাথরুমে গেলো। ঝর্না চালু করতেই সবুজ বোরখা ভিজে কালো হয়ে গেলো। তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল মেহরিমার ঠোঁটে। এজন্যই এত তোড়জোড় করে আসা। বেশ তো!
●● ●● ●●
বিয়ে বাড়িতে যাওয়ার আগে মেহরিমার সাথে দেখা করতে এলো রুমি। শেলী মেয়েটার লাফঝাঁপ দেখে বিরক্তই হলেন। বাপ মায়ের কথা বলার কোনো ইচ্ছেই নেই আর মেয়ে পারলে এখানেই ঘাটি গাড়ে।
“আপা বড় খালার বাসায় যাচ্ছি।”
“আচ্ছা।” নির্বিকার কণ্ঠে বলল মেহরিমা।
রুমি খেয়াল করলো না তার মুখে দুপুরের চাপা উত্তেজনাটুকু নেই। হাওয়াই মিঠাইয়ের মতো মিলিয়ে গেছে।
“ওখানে তো বিয়ে। আসতে মনে হয় দেরি হবে। যদি তাড়াতাড়ি আসি তাহলে তোমার সাথে কিন্তু আড্ডা দেবো।”
“আচ্ছা।”
মেহরিমা তার ঘরের জানালা দিয়ে দেখলো চারজন চলে যাচ্ছে। শাহরিয়ারকে হেলতে দুলতে যেতে দেখে তার রাগ হলো। ইচ্ছে হলো সামনে যেয়ে আংটিটা মুখে ছুঁড়ে দিতে। পরক্ষনেই নিজের ছেলেমানুষী চিন্তায় হাসি পেলো মেহরিমার। তাকে তো কেউ কখনও কথা দেয়নি!
রুমি বলে গেলেও তাদের ফেরা হলো না। খালা সবাইকে আটকে দিলেন। তবে শাহরিয়ার থাকলো না। এত ভিড়-ভাট্টার মাঝে সে থাকতে পারবে না অজুহাত দেখিয়ে চলে এলো। তখন রাত প্রায় এগারোটা। ক্যাসেল ব্রিজের আশপাশে লোকজন কমতে শুরু করেছে। ঢাকার তুলনায় এখানে রাত তবে দ্রুতই হয়।
সদর দরজায় তালা ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন আরমান বিশ্বাস। ঘুমিয়ে না গেলেও শোয়ার প্রস্তুতি চলছিল। সেসময় স্টিলের দরজায় ধাক্কা শুনে তিনি এগিয়ে গেলেন।
“কে?”
“চাচা আমি। শাহরিয়ার।”
গম্ভীর মুখে দরোজা খুললেন আরমান। কোনদিকে না তাকিয়ে চলে যাচ্ছিলেন। শাহরিয়ার পিছু ডাকলো।
“কেমন আছো চাচা?”
আরমান বিশ্বাস দাঁড়ালেন বটে তবে ঘুরে তাকালেন না।
“ভালো।”
শাহরিয়ার হেসে ফেলল চাচার রাগ দেখে।
“তুমি আমার সাথে কথা বলবে না?” মেলাতে কষ্ট হয়। বাবার কাছে বকা খেলে এই চাচার কাছেই সে ছুটে ছুটে আসত। আহ! কোথায় গেলো সেসব দিন?
“আমার সাথে কথা বলার কোনো ইচ্ছা তোমাদের নেই। এটুকু তো জানি। খামাখা বিরক্ত করার কারণ দেখি না।”
দরজা বন্ধ করে আরমান বিশ্বাসের সামনে এসে দাঁড়ালো শাহরিয়ার। যেই চাচার কাঁধে চড়ে বেরিয়েছে এখন সেই চাচাই তার কাঁধ বরাবর। বিশাল জাম গাছ রাতের আধার খানিকটা বাড়িয়ে দিয়েছে। মেহরিমাদের বারান্দায় জ্বলতে থাকা এনার্জি বাল্বের আলো পুরোটা আসছে না। সেই অন্ধকারে আরমান বিশ্বাসের গম্ভীর মুখ আরো গম্ভীর লাগছে।
“আমি তোমাকে কখনো এসব বলেছি?”
“তোমাকে বলতে হবে কেন? তোমার বাবার মুখই যথেষ্ট। তারপরও তুমি বলতে চাইলে বলো। আটকে রেখেছে কে?”
আরমান বিশ্বাস যতবার তাকে তুমি করে বলছে ততবার শাহরিয়ারের ইচ্ছে হচ্ছে চাচার হাতটা ধরে বলতে “আমাকে আগের মতো করে তুই বলো চাচা। আমাকে অন্তত পর করে দিও না।”
পুরোটা না বলতে পারলেও কিছুটা বলল শাহরিয়ার, “আমাকেও পর করে দিলে?”
“তুমি আমাকে আপন রাখার কোন চেষ্টাটা করেছ?”
দাঁড়ালেন না আরমান। হনহন করে চলে গেলেন। শাহরিয়ার দাঁড়িয়ে রইলো ঠায়। সত্যিই তো সে কিছু করেনি। একবার চাচার সাথে কথা বলতে চাওয়ার অভিযোগে আজাদ বিশ্বাস তাকে চড় মে-রে-ছিলেন। অনার্স প্রথম বর্ষ পড়ুয়া শাহরিয়ারের জন্য সেটা চরম অপমানদায়ক ছিল। সেই অভিমান থেকেই আর কখনও চেষ্টা করা হয়নি। ক্রোধ দেখানো হয়েছে ভুল জায়গায়। বোকার মতো কাজ করেছে শাহরিয়ার। এখন আফসোস করাটা বৃথা।
মেহরিমা কথা না শুনলেও দৃশ্যটা দেখলো। বেহায়া মন একবার উঠানে নেমে যেতে চাইলো। তবে আরমান বিশ্বাস যখন দরজায় তালা দিলেন তখন নিজেকে কষে একটা ধমক দিয়ে ভেতরে চলে গেলো মেহরিমা। মেহজাবিন ঘুমিয়ে গেছে মশারি না টাঙিয়েই।
তার শোয়ার প্রস্তুতি যখন শেষ তখন রুমি ফোন দিল। বিকেলে যাওয়ার সময় নাম্বার নিয়ে গিয়েছিল।
“আপা ভাইয়া কি গেছে?”
“হু।”
“কেমন মানুষ দেখো! বলেছি যেয়ে একটু জানাবে তা উনার ফোন দিতে কত কষ্ট।”
মেহরিমা কিছু বলল না। রুমি বলল, “আপা ভাইয়া না কিছু খায়নি রাতে। বিরিয়ানি রান্না করেছিল খালামণি। রাতে তো এসব ভারী খাবার ভাইয়া খায় না।” মেহরিমা শুনতে পেল চাচী রুমিকে বকছে।
“এসব ওকে বলছিস কেন গাধা!”
রুমি বোধহয় এত কিছু ভেবে বলেনি। বিব্রত কণ্ঠে বলল, “তুমি মনে হয় শুয়ে পড়েছিল না? আচ্ছা ঘুমাও তাহলে।”
মেহরিমাকে দ্বিধার সাগরে ভাসিয়ে রুমি ফোন কেটে দিলো।
~চলমান~
বিপত্তি বাঁধলো পঞ্চাশে যেয়ে। আবার কনফিউশন। ঘড়ি দেখল জুঁই। তেত্রিশ মিনিট শেষ। আর সাতাশ মিনিট আছে। চেপে রাখা শ্বাসের গতি আবার বাড়তে শুরু করলো। চোখ বন্ধ করলো জুঁই। সাথে সাথে জেসমিন হাসানের মুখটা ভেসে উঠলো। তার ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষার কথা মনে পড়লো। Do or die Do or die… আবার দাগাতে শুরু করলো জুঁই। কিন্তু এবার কনফিউশনের চেয়েও ভয়াবহ সমস্যা পড়ল সে। বুকমিনস্টার ফুলারিনের সংকেত ভুলে গেছে সে। অপশন দেখেও কোনোভাবে মনে পড়ছে না। C60 ছিল নাকি C61? কোনোভাবেই মনে করতে পারল না জুঁই। কান্না পেলো তার। এই বার্জেলিয়াসের ঘটনা যেন না ভুলে যায় সেজন্য এটাকে স্টিকি নোটে লিখে মাথার কাছে লাগিয়ে রেখেছিল। তবুও ভুলে গেলো। এটার শোকে পরবর্তী নাম্বারে নিউটনীয় বলবিদ্যার সবচেয়ে সহজ সূত্রটা মনে করতে পারল না জুঁই। হতাশায় মাথা চেপে ধরলো সাথে সাথে। শ্বাস ঘন হয়ে আসছে। বুক উঁচু নিচু হচ্ছে খুব দ্রুত। জুঁই বুঝতে পারছে তার মস্তিষ্কে অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। হাত কাঁপতে শুরু করেছে। কলম রেখে জামায় হাত মুছলো জুঁই। হাতের তালু ঘেমে গেছে। স্যার বললেন, “তোমাদের আর বিশ মিনিট সময় আছে। Only twenty minutes!”
***
ই-বুক “কৌমুদী”
https://link.boitoi.com.bd/qvDe
মূল্য: ৩০ টাকা (ঈদ উপলক্ষ্যে ১০% ছাড়ে ২৭ টাকা)
শুধুমাত্র বইটই থেকে

